Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: উইথড্রয়াল

March 27, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

131
View

একটা সকাল থেকে সন্ধ্যা স্নেহার নির্জনে; একা, নিজের সঙ্গে কাটতেছে বহুদিন পর। কোনো কোনো ঘটনার পর মানুষের জীবন আর আগের মতো হয় না কিংবা স্বাভাবিক বলতে যেটা বোঝায়, সেই স্বাভাবিকতাকে কখনোই আর ছুঁতে পারে না মনে হয়। স্নেহা ভাবে, ওকে মনে হয় এইভাবেই একটা বদ্ধ ঘরে সুঁই-আগুনের খেলাতেই বাকিটা জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে। এর বাইরে আর কোনোকিছুই ও এখন আর করতে পারতেছে না। আবার বৃষ্টি নামবে। হঠাৎ বৈশাখ মাসের মতো একটা ঝড়ো হাওয়া বইতে লাগলো। সূর্য ডোবা দেখার জন্য সন্ধ্যা হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে বারান্দার ফ্লোরে এসে যেভাবে বসছিল স্নেহা, এখনো ঠিক সেভাবেই বসে আছে। দুই পা ভাঁজ করা। পায়ের দুই পাশ দিয়ে দুই হাত গিয়ে থুতনির ঠিক নিচ বরাবর স্পর্শ না করে সামনের দিকে মুঠোবন্দী।

একবার বৃষ্টি শুরু হলে বসুন্ধরা থেকে বের হওয়া একটা যন্ত্রণার বিষয় হয়ে দাঁড়াবে, কিন্তু এই ফ্ল্যাট থেকে বের হয়ে অন্য কোথাও যাওয়ার প্রতি তেমন একটা আগ্রহও ওর হইতেছে না এই মুহূর্তে। আবিরের সঙ্গে কাটানো ওই বেহেশতি ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের পর তো বহুদিন একা কোনো ফ্ল্যাটে ও থাকতে পারে নাই। এমন কী অনেকদিন পর্যন্ত আফতাবনগরের ফ্ল্যাটে অথবা নিকেতনে আম্মার বাসায় নিজের রুমে একা চোখ বন্ধ করলেও ওর সাফোকেশন শুরু হতো। ওই সময়টা রাতের পর রাত ফিলফ্রেশ আর রিভোট্রিল খেয়ে স্নেহার ঘুমের প্রতীক্ষায় শুয়ে-বসে সময় কাটাতে হইছে। তিন মাস পর অনেকটা বাধ্য হয়েই ওর আফতাবনগরের ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিতে হইছিল। প্রতি মাসে ভাড়া দিতে হইতেছিল ২৮ হাজার, সঙ্গে তিন হাজার টাকা সার্ভিস চার্জ। অথচ নিজের ফ্ল্যাটে ও থাকতে পারতেছিল না কারো স্মৃতির তীব্রতায়! এটা ভাবা যায়? যে কেউ শুনলেই ওকে পাগল বলবে। অবশ্য ও তো পাগলই, স্নেহা ভাবে।

কত মানুষ ভালোবেসে, আদর করে ওকে “পাগলী” ডাকছে জীবনে। আব্বা তো অহরহ একটা টান দিয়ে বলতেন- আরেএএএএএ…আমার পাগলীটা! আহারে! কতদিন আব্বার এই ডাকটা ও শোনে না ভাবলো! আর কোনোদিন এই ডাক ও শুনতেও পারবে না। কারো পাগল ডাকাতে কোনোদিন স্নেহার কোনো সমস্যা হয় নাই, কিন্তু আবির ওকে পাগল ডাকলেই ও প্রচণ্ড ট্রিগারড হতো। একবার চোখ বন্ধ করে আবিরের পাগল ডাকটা মনে করতেই রাজশাহীতে প্রচণ্ড ড্রাঙ্ক অবস্থায় আবিরের অবয়বটা ভেসে আসলো স্নেহার চোখের সামনে। আবিরকে ওই মুহূর্তে ঠিক আবিরের মতো লাগতেছিল না। মনে হইতেছিল, ও অন্য কোনো মানুষ। ওই মানুষটাকে স্নেহা চেনে না, ওইবারই যেন তাকে ও প্রথম দেখছে। ওই মানুষটার চোখে আবিরের মতো মায়া ছিল না। ছিল প্রচণ্ড ক্রোধ। ঘৃণা কি ছিল? ওই আবিরকে স্নেহার সহ্য হচ্ছিল না। এখনো হইতেছে না। স্নেহা ওই দৃশ্য দেখা বন্ধ করতে চাইলো, পারলো না। চোখ খোলার পরও স্পষ্ট দেখতে পারলো গাড়ির মধ্যে বসে আবির স্নেহাকে চিৎকার করে বলতেছে- তুমি একটা পাগল! ইউ নিড মেডিকেল হেল্প! আবির যখন ওকে পাগল বলতো, রাগের মাথাতেই বলতো। কিন্তু স্নেহার তাতে কষ্ট হতো খুব। এখনো হইতেছে।

বৃষ্টির ফোটা পড়া শুরু হলো আরেকটা জোরে বাতাস হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে। ঘরের লাইটটা সন্ধ্যায় জ্বালায় নাই স্নেহা, বারান্দা থেকে ঘরেও ঢুকে নাই। জানালাটা খোলাই ছিল। বাতাসের দমকে পর্দাগুলা উড়াউড়ি শুরু করে দিলো। প্রচণ্ড শব্দে হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকানোর পর ইলেকট্রিসিটিটাও চলে গেল। ওর বাতি নেভানো ঘরটাকে আর নতুন করে অন্ধকার হতে হলো না, বরং কিছুটা দূরে থাকা বাড়ির ফ্ল্যাটগুলাকে একে একে অন্ধকার হতে দেখা গেল।কিছুটা সময় এমন অন্ধকারেই থাকতে ইচ্ছা করলো স্নেহার। কিন্তু ও জানে, কয়েক মিনিটের মধ্যেই সবগুলা বাড়ির জেনারেটর বিকট শব্দে চালু হয়ে আবার চারপাশ আলো করে তুলবে। মাঝে মাঝে নির্জনতার মতো অন্ধকারও মানুষের কতটা কাঙ্ক্ষিত হয়ে ওঠে! এই মুহূর্তে অন্ধকারকে ওর ভীষণ প্রয়োজনীয় মনে হলো। কোথাও এখন সামান্য আলো দেখা গেলেও সেখানে আবিরের অবয়ব দেখতে পাবে বলে মনে হচ্ছে ওর। আবিরকে না, আবিরের ভেতর ওই অচেনা মানুষটাকে। আবার হয়তো প্রচণ্ড রাগ নিয়ে ওই মানুষটা চিৎকার করে বলবে- ইউ নিড মেডিকেল হেল্প!

আশ্চর্যের বিষয়! স্নেহা আশেপাশের বাড়িগুলার দিকে খেয়াল করে দেখলো কোথাও জেনারেটর এখনো চালু হয় নাই। সুনসান আই ব্লকের এই রোডটা অন্ধকারে আরো বেশি সুনসান হয়ে ওঠছে। এইখানে কোনো বাড়িই একটার সঙ্গে আরেকটা গা ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়ে নাই। বরং এই রোডে একটা বাড়ি থেকে অন্যটা বেশ ভালো রকম দূরত্বেই অবস্থান করতেছে। এ কারণেই স্নেহা এখানে এই স্টুডিও এপার্টমেন্টটা ভাড়া নিছিল। যদিও এই ফ্ল্যাটটা ওর চন্দ্রিমা মডেল টাউনের ফ্ল্যাটটার মতো অত বিশাল আর খোলামেলা না। তবুও তুলনামূলকভাবে নির্জন আর ছিমছাম এলাকা বলে স্নেহা প্রথমদিন ফ্ল্যাট দেখতে এসেই এডভান্সের টাকা দিয়ে যায়।

চন্দ্রিমার ফ্ল্যাটটা বিশাল ছিল, প্রায় ১৪৫০ স্কয়ার ফিটের। কোনো ফ্যামিলির জন্য ওইটা বিশাল বাসা না মনে হলেও স্নেহার একার জন্য ওই ফ্ল্যাটটা মোটামোটি একটা ফুটবল খেলার মাঠই ছিল। সেখানে ও মহাআনন্দে একা জীবন কাটিয়ে দিতেছিল। ২০২৩-২০২৪ সাল! ওই ফ্ল্যাটে থাকতেই তো আবিরের সঙ্গে প্রথম পরিচয় হলো ওর। ওই ফ্ল্যাটে বসেই আবিরের সঙ্গে প্রথম ফোনে কথা, ভিডিও কলে দেখা। ওই ফ্ল্যাট থেকেই প্রথম ডেটে যাওয়া, ওই ফ্ল্যাটেই আবিরের প্রথম রাতে থাকা। চন্দ্রিমার ওই বাসা যখন ছাড়ে, আবিরের সঙ্গে ওর যোগাযোগ তখন সাময়িক বন্ধ ছিল। ওই ফ্ল্যাটটা স্নেহা ছাড়তো না। এত স্মৃতি ওখানে জমানো ছিল। এখন অবশ্য এরচেয়ে বেশি স্মৃতি জমে গেছে এনচ্যানটেডে। ওই ফ্ল্যাটটা বাড়ির মালিক বিক্রি করে দেওয়ায় ছাড়তে হইছিল। তাও মাত্র পনের দিনের নোটিশে ওকে ফ্ল্যাটটা ছাড়তে বলা হইছিল। মালিকের জানা ছিল এই শহরে স্নেহার বাপের বাড়ি আছে, তাই একদিনের নোটিশে বাড়ি ছাড়তে বললেও অন্তত ওর রাস্তায় গিয়ে থাকতে হবে না।

ভদ্রলোক সম্ভবত কোনো বিপদে পড়ে ফ্ল্যাটটা খুব তাড়াহুড়ায় বিক্রি করে দিছিলেন। পনের দিনের নোটিশে ফ্ল্যাট ছাড়তে বলাতে বেশ কয়েকবার উনি স্নেহাকে কল করে আদবের সঙ্গে দুঃখপ্রকাশও করেন। ওই ফ্ল্যাটে স্নেহা ওর জীবনের খুব ভালো কিছু সময় কাটাইছে, খারাপ সময়ও। সেভেন্থ ফ্লোরের ওই ফ্ল্যাটটায় চারপাশ দিয়েই আলো-বাতাস ঢুকতো। বারান্দায় দাঁড়ালেই দেখা যেত তুরাগ নদী। ও প্রায়ই সন্ধ্যাতে তুরাগের পাড়ে হাঁটতে চলে যেত। ফ্ল্যাটটা যেদিন ছাড়ে, সব মালামাল নিয়ে লেবাররা নিচে চলে যাওয়ার পর ফাঁকা রুমে দাঁড়িয়ে স্নেহা খুব কাঁদছিল। ওর মনে হইতেছিল আবিরের সঙ্গে ওর প্রথম দিনগুলার স্মৃতি ও ওইখানে ফেলে রেখে চলে আসতেছে।

একই ঘটনা আফতাবনগরের ফ্ল্যাটটা ছাড়ার সময়ও হইছে। ওই ফ্ল্যাটটায় আবির একদিনই আসছিল। দিনেরবেলা কয়েক ঘণ্টা শুধু ঘুমাইছে ওইখানে। দুপুরের পর ওঠে তো স্নেহা ওকে খাওয়ালো। এরপর ফার্মেসি গেল নাপা এক্সট্রা কিনতে। ফার্মেসি থেকে ফিরে তো কিছুক্ষণ কথা বলার পর সন্ধ্যাতে ওরা এয়ারপোর্টেই চলে গেছিল। ওই একটা দিনের কয়েক ঘণ্টার স্মৃতিই এমনভাবে ওই ফ্ল্যাটটাতে জড়িয়ে গেল যে স্নেহা এরপর আর ওইখানে একা থাকতেই পারলো না। এত তীব্রভাবে আবিরের স্মৃতি ওইখানে মনে পড়তো, দিনে দিনে ওর ওইখানে প্রচণ্ড লোনলি ফিল হওয়া শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত আর না পেরে ফ্ল্যাটটাই ছেড়ে দিতে হলো। ওই ফ্ল্যাট ছাড়ার সময়ও স্নেহা অঝোরে বাচ্চা মানুষের মতো কাঁদতেছিল। ওইখানে কান্নাটা থামাতে ওকে বেশ বেগ পাইতে হইছে। শুধুমাত্র একটা সকাল থেকে সন্ধ্যা কয়েক ঘণ্টার স্মৃতি হলেও ওই সময়টা ছিল স্নেহার ৪৫ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের ওই বেহেশতি মুহূর্তের স্মৃতির ভেতরে। এইজন্যই ওর কষ্টটা বেশি হইছে।

আবিরের সঙ্গে তো কিংফিশারের বাইরে অন্য কোনো জায়গায় সময় কাটানোর স্মৃতি ওর খুবই সামান্য। ওই দুইটা ফ্ল্যাট ছাড়ার সময় স্নেহার তাই মনে হইতেছিল- চাইলেও তো ওই জায়গাগুলাতে গিয়ে ও আর স্মৃতি হাতড়াতে পারবে না কখনো। আবিরের কথা খুব মনে পড়লেই আগে ও কিংফিশারে চলে যেত। ওখানে বসে ভাবতো- আবিরও ওর পাশেই বসে আছে। হুইস্কির গ্লাসে রেড বুল আর লেবু মিক্স করতেছে। একটু পরই চিয়ার্স বলতে গ্লাসটা আগাইয়া দেবে। এমন কত কত দুপুর থেকে বিকাল, বিকাল থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে রাত, এমন কী মধ্যরাত পর্যন্ত স্নেহা কিংফিশারে কাটিয়ে দিছে শুধুমাত্র আবির পাশে বসে আছে ফিল করার জন্য। এটাও তো এক ধরনের পাগলামী, ও ভাবে। আবিরের এসব স্মৃতি জড়ো করেই তো ওকে বাঁচতে হবে, এটা তো ও সবসময়ই জানতো। যতটা পারতো স্মৃতি জমিয়ে রাখতো তাই নানাভাবে। স্মৃতি ছাড়া তো ওর কাছে আর কিছু নাই। আগে আবিরকে আর কোনোদিন দেখতে পারবে না ভাবলেই দমবন্ধ হয়ে আসতো, আর এখন!

আবিরের সঙ্গে কোনোদিনই হয়তো আর দেখা হবে না স্নেহার। হয়তো না…এখানে তো আর কোনো ‘যদি’ বা ‘হয়তো’ থাকার কিছু নাই। এটা এখন নিশ্চিতই- খুব ছোট্ট এই দুনিয়ার অলি-গলি পথে স্নেহার সঙ্গে আবিরের অথবা আবিরের সঙ্গে স্নেহার কোনোদিনই আর এ জন্মে দেখা হবে না। যতটা সহজে এই ভাবনা ও ভাবতে পারছে বলে কয়েক মুহূর্ত আগেও ওর মনে হইতেছিল, অতটা স্বাভাবিকতায় স্থির থাকা গেল না খুব বেশি সময়। খারাপ লাগা শুরু হলো। এই খারাপ লাগার অনুভূতিটা ঠিক কোনো কিছুর মাধ্যমেই কাউকে বোঝানোর মতো না। কেমন যেন! একটা কষ্ট, একটা দুঃখ, একটা বেদনা, একটা বিষণ্নতা বোধ, একটা ভয়াবহ শূন্যতা- একটা মৃত্যু সমান বিচ্ছেদ ভাবনায় স্নেহার বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। একটা ভয়ংকর চাপ ফিল করে ও। বুকে-মাথায়, শরীরের পুরো ডান পাশটাতেই। ওই চাপটা ফিল করতে করতেই ও ভাবে- আবির তো অন্তত এই বিচ্ছিন্নতার কারণে ভালো আছে। স্নেহার ভয়ে আর ওকে জীবন কাটাইতে হইতেছে না। ওর যন্ত্রণা, রাগ, জেদ-অভিমান আবিরকে আর সহ্যও করতে হইতেছে না।

এসব ভেবে হলেও তো স্নেহার কষ্ট কিছুটা কম পাওয়া উচিত। কিন্তু মন তো! মনকে কি আর উচিত-অনুচিতের নিয়মে বাধার ক্ষমতা ওর আছে? নিজের শরীরের ওই একটা অংশের কাছেই তো ও আটকা পড়ে আছে। স্নেহা ভাবে- মন্দাক্রান্তা সেন যেখানে বলছেন, “হৃদয় অবাধ্য মেয়ে, তাকে কি শাস্তি দেবে, দিও,” স্নেহা তো সেখানে অতি তুচ্ছ, সামান্য! এই যে দুঃখ বোধটা; এই যে কষ্ট লাগা, আবিরের সঙ্গে আর দেখা হবে না, ওর হাসিটা আর দেখতে পারবে না, ওর কণ্ঠটা আর শুনতে পারবে না, ও আর কোনোদিন স্নেহা বলে ওকে ডাকবে না, ও আর স্নেহার দুনিয়াতেই কখনো থাকবে না, স্নেহাও কোনোদিন আর ওর দুনিয়ায় এগজিস্ট করবে না। মানে, এই পৃথিবীতে ওরা দুইজনই বেঁচে থাকবে, কিন্তু আর…

এই যে এসব ভাবনাগুলা থেকে থেকে সারাক্ষণ মাথা আর বুকে ভীষণ যন্ত্রণা দেয়। এগুলা মনে পড়লেই বুকে একটা ভারী পাহাড়সম চাপ অনুভব করে ও। এটা ঠিক কতদিন পর, কত রাত আরো নির্ঘুম কাটালে, কতভাবে নিজেকে আর নেশার ঘোরে অন্যমনস্ক রাখলে, কতবার যন্ত্রণায় না পেরে চিৎকার করে ওঠলে, কতবার নিজের সঙ্গে অভিনয়ে আর পেরে না ওঠে কান্নায় ভেঙে পড়লে…স্বাভাবিক হবে? স্নেহা ভাবতে থাকে। যন্ত্রণা পেতে পেতে এক সময় তো সেটাও সহনশীল হয়ে যায়। নিউ-নরমাল না কী যেন বলে? স্নেহা টার্মটা মনে করার চেষ্টা করে। এমন কী যেন একটা টার্ম কোভিডের সময় চালু হলো না? এক সময়ের অস্বাভাবিকতা যখন জীবনের স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে ওঠে, ওইটাকেই তো নিউ-নরমাল বলে বোধহয়। স্নেহার এটা কবে থেকে হবে? অনেক সময় লাগবে? অনেক বছর? মৃত্যুর আগে ও পারবে মেনে নিতে? কষ্ট হয় যে খুউউউউউব…এত কষ্ট আর ভালো লাগে না ওর। নিজের জন্য মায়া হয়। ইদানিং এ রকম অসহায়ত্ব দেখলে স্নেহার খুব ইচ্ছা করে নিজেকে একটু আদর করে দিতে।

আবার ছোটবেলায় ফিরে যেতে মন চায় ইদানিং। খুব ছোট হয়ে যেতে ইচ্ছা করে। অনেক ছোট। যত ছোট হয়ে গেলে কোনোকিছু নিয়েই ওকে আর ভাবতে হবে না কখনো। এসবের মধ্যেই হঠাৎ নিজেকে ও প্রশ্ন করে- আবির কি এখন ওকে ঘৃণা করে? ওর কথা ভাবলেই নিশ্চয় আবিরের প্রচণ্ড রাগ হয়? এই ভাবনায় বুকটা কেঁপে ওঠে ওর। ও ভাবে- শেষ পর্যন্ত বাকিটা জীবন ওর আবিরের চোখে ঘৃণিত হয়ে বেঁচে থাকতে হবে? কিন্তু এর পরপরই মনে হয়, ঘৃণার অনুভূতিটা থাকার জন্য তো ভালোবাসার অনুভূতিটা আগে থাকা লাগবে। ঘৃণা আর ভালোবাসা দুইটাই খুব তীব্র অনুভূতি। একটা না থাকলে, অন্যটা থাকে না। ভালোবাসা ফুরালে এর বিপরীতে আসে উদাসীনতা, ঘৃণা না। আবির তো ওর ব্যাপারে আগে থেকেই উদাসিন। যেখানে ভালোবাসাই ছিল না কোনোদিন, সেখানে ঘৃণা কি আসে? স্নেহা উত্তর মেলাতে পারে না। কী একটা দ্বন্দ্ব কাজ করে ওর নিজের ভেতরে। ওর মনে হয়, আবিরের অনেক কথা শেষ দিনও পুরাপুরি সত্য ছিল না। আর কিছু ও স্ট্রেইট চিন্তা করতে পারে না। শুধু ভাবে- আবিরের ঘৃণাটাই কি শেষ পর্যন্ত প্রাপ্য ছিল ওর? বোধহয়…

এখনো দূরের বাড়িগুলার কোনো ফ্ল্যাটে আলো জ্বলে নাই। সবাই কি এই মুহূর্তে ওর মতোই মনেপ্রাণে অন্ধকারই চাইতেছে? আজকে রাত আর কোথাও কোনো আলো চায় না ও। আলো মানেই তো আবির! আবিরও না, আবিরের ভেতরের ওই অন্য মানুষটা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টির বদলে হঠাৎই ঝুম বৃষ্টি নামে খোলা ওই বারান্দায়। স্নেহা একইভাবেই বসে থাকে। আকাশে আবার ঘন ঘন বিদ্যুৎ চমকানো শুরু হলো। ওই আলোকেও স্নেহার ভয় হইতেছিল। তুমুল বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই ও জোরে জোরে তিনবার “লা ইলাহা ইল্লা আনতা, সুবহানাকা ইন্নি কুনতু মিনাজ জলিমিন” পড়ে। আবিরের ভেতর অন্য মানুষটাকে দেখার ভয় ওর কিছুটা কমে। যদিও ভেতরের অ্যাংজাইটি ভাবটা পুরাপুরি যায় নাই তখনো। কেমন যেন একটা অস্থিরতা, কেমন একটা ছটফট লাগে ওর।

ভিজতে ভিজতেই ও বারান্দার ফ্লোরটাতে শুয়ে পা দুইটাকে ভাঁজ করে দুই হাত দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে রাখলো। ধীরে ধীরে দম নেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে টের পেল, সমস্ত শরীর কাঁপতেছে। আবিরের মধ্যে ওই অপরিচিত মানুষটার মুখের অবয়ব ধীরে ধীরে ওর চোখের সামনে থেকে ঝাপসা হয়ে চলে যাইতেছে দূরে। কিন্তু স্নেহা দেখলো, এবার আবির আবির হয়েই ওই অন্ধকারে ওর মুখোমুখি এসে বসলো। ওই অন্য মানুষটা আবিরের ভেতর থেকে চলে যেতেই ওর চোখে-মুখে কী যে এক মায়া, কী যে আদর লেগে থাকতে দেখলো স্নেহা! কিছুক্ষণ ওর দিকে তাকিয়ে থাকার পর স্নেহার মনে হলো, আদর আদর কণ্ঠে আবির ওকে বলতেছে- মাথায় হাত রাখছি, স্লিপ। স্লিপ লাইক অ্যা বেবি। অন্য কোনো কিছু নিয়ে আর চিন্তা করো না এখন। জাস্ট স্লিপ। ওর হালকা ঘুম পেলো, কিন্তু ও চোখের সামনে আবিরকে দেখতে পাইতেছে এখনো। ওর দিকে তাকিয়েই ও ভাবতেছে, আবির তো আর কোনোদিন আসলে ওর মাথাতে হাত রেখে বলবে না- মাথায় হাত রাখছি, ঘুমাও।

ঘরের ভেতর থাকা ব্লু-টুথ স্পিকারটায় কি এতক্ষণ গান বাজতেছিল? মনে করার চেষ্টা করে স্নেহা। মনে পড়ে না। এখন বাজতেছে। ও একইভাবেই শুয়ে বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতে শুনলো ওস্তাদ গুলাম আলী কী দরদ দিয়ে ওকে শোনাইতেছেন- “চোরি চোরি হাম সে তুম আ কার মিলে থে জিস জাগাহ…মুদ্দাতেঁ গুজারিন পার আব তাক য়ো ঠিকানা ইয়াদ হে…হাম কো আব তাক আশিকি কা য়ো জামানা ইয়াদ হে…”।

চেজিং দ্য ড্রাগন: ফানা

Comments

    Please login to post comment. Login