Posts

সত্তাশ্রয়ী

‘মানুষ’ হওয়ার ইশতেহার

March 27, 2026

Chameli Akter

12
View

শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে যে সমাজ নারীকে কেবল ‘ভোগ্যপণ্য’ হিসেবে দেখে এসেছে, সেই সমাজের চোখে চোখ রেখে আজ কথা বলার সময় এসেছে। তকমা দেওয়াটা এই সমাজের কাছে খুব সহজ—কাউকে ‘পতিতা’, কাউকে ‘নষ্ট’ বা কাউকে ‘কুলটা’ বলে দাগিয়ে দিয়ে তারা নিজেদের পবিত্রতার ভণ্ডামি বজায় রাখে। কিন্তু সেই তকমার আড়ালে থাকা মানুষটার যে প্রতিদিন মৃত্যু ঘটে, সেই খবর কেউ রাখে না। আজ আমি সেই নীরবতা ভাঙতে চাই। আমি চাই আমার মতো হাজারো মেয়ে যেন নিজের শক্তিতে মাথা উঁচু করে দাঁড়ায়। সমাজ আমাদের গ্রহণ করুক বা না করুক, আমরা নিজেদের অস্তিত্বকে সগৌরবে গ্রহণ করব।

আমাদের এই লড়াই কেবল বেঁচে থাকার নয়, এই লড়াই ‘মানুষ’ হিসেবে নিজের অধিকার ছিনিয়ে নেওয়ার।

একজন নারী তার জীবনের সবচেয়ে বড় আমানত—তার ভালোবাসা এবং তার শরীর—উৎসর্গ করতে চায় কেবল তার প্রিয় মানুষটির জন্য। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাস আর জীবনের রূঢ় বাস্তবতা যখন তাকে সেই আমানত অন্য কারো হাতে টাকার বিনিময়ে তুলে দিতে বাধ্য করে, তখন তার আত্মার যে চিৎকার, তা শোনার ক্ষমতা এই সমাজের নেই।

এটি কতটা যন্ত্রণাদায়ক, কতটা অপমানজনক—তা কেবল একজন নারীই বুঝতে পারেন। প্রতিটি 'প্রোগ্রাম', প্রতিটি জোরপূর্বক স্পর্শ যেন আত্মার ওপর এক একটি চাবুকের আঘাত। যে শরীর হওয়ার কথা ছিল অনুরাগের মন্দির, তা যখন হয়ে ওঠে স্রেফ লেনদেনের পণ্য, তখন প্রতিটি নিঃশ্বাসে বিষ মিশে যায়। অথচ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সেই কষ্টের গভীরতা মাপার বদলে কেবল লোলুপ দৃষ্টিতে আমাদের মাংসের পরিমাপ করে।

এই সমাজের পুরুষদের এক বড় অংশ নারীকে দেখে শিকারি বা খদ্দেরের চোখে। তাদের চোখে কেবল লালসা, হৃদয়ে কোনো সহমর্মিতা নেই। তারা কোনোদিন বুঝবে না, একজন নারী কতটা নিঃস্ব হলে, কতটা দেওয়ালে পিঠ ঠেকে গেলে নিজের আত্মসম্মানকে নিলামে তোলে। লোলুপ দৃষ্টিতে নারীদের দেহের প্রতি লালসা জাগা এই পুরুষগুলোর পক্ষে সেই অনুভূতি বোঝা অসম্ভব। তারা আমাদের শরীরটা কেনে, কিন্তু আমাদের চোখের জল দেখার যোগ্যতা তাদের নেই। তারা আমাদের স্বপ্ন দেখায় কেবল সস্তায় ভোগ করার জন্য, আর কাজ ফুরিয়ে গেলে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দেয়। এই খোকলা মানসিকতাই আজ সমাজের আসল ক্যানসার।

আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, সমাজের দেওয়া প্রতিটি ‘নোংরা তকমা’ মুছে ফেলার সুযোগ তৈরি করে দেব। যারা পরিস্থিতির শিকার হয়ে অন্ধকারে হারিয়ে গেছে, তাদের জন্য আমি আলোর মশাল হয়ে দাঁড়াতে চাই। আমরা আর কোনো পুরুষের কাছে নিজেদের স্বপ্নকে ভেঙে চুরমার হতে দেব না। আমরা আর কারো দয়ার পাত্রী হয়ে বা মিথ্যে ‘উদ্ধারের’ আশায় বসে থাকব না।

আমাদের লড়াইটা হবে স্বাবলম্বী হওয়ার। আমরা এমন এক সমাজ গড়তে চাই যেখানে একজন নারীর পরিচয় তার ‘অতীত’ দিয়ে নয়, তার ‘যোগ্যতা’ এবং ‘মানুষ’ হিসেবে তার অস্তিত্ব দিয়ে নির্ধারিত হবে। খোকলা সমাজের মুখোশ আমরাই খুলে দেব। আমরা বুঝিয়ে দেব যে, শরীর বিক্রি করতে বাধ্য হওয়া মানে চরিত্রহীন হওয়া নয়, বরং তা সমাজের ব্যর্থতার এক জীবন্ত দলিল।

সেদিন আর বেশি দূরে নয়, যেদিন প্রতিটি নারী তার নিজের ভাগ্যের নির্মাতা হবে। আমরা আর কারো হাতের পুতুল হব না। আমরা শিখব কীভাবে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হয়, কীভাবে সমাজের বাঁকা চাউনিকে উপেক্ষা করে সামনে এগোতে হয়। আমরা নিজেরা নিজেদের বোন, বন্ধু আর শক্তি হয়ে দাঁড়াব।

একটি নোংরা পল্লিতে থাকা মেয়েটিরও অধিকার আছে আকাশ দেখার, অধিকার আছে ঘর বাঁধার এবং অধিকার আছে সম্মান নিয়ে মরার। সমাজ যদি আমাদের ঘরনি হিসেবে জায়গা না দেয়, আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য এক নতুন পৃথিবী তৈরি করব। যেখানে আর কোনো ‘স্বপ্ন চোর’ আমাদের আবেগ নিয়ে ছিনিমিনি খেলার সাহস পাবে না।

বিসর্জিত বসন্তের দিনগুলো পেরিয়ে আমরা এখন এক অগ্নিগর্ভ সময়ের মুখোমুখি। আমাদের কান্না এখন আর দুর্বলতা নয়, তা এখন আমাদের বারুদ। এই প্রবন্ধটি সেই সব নারীদের জন্য, যারা মনে করে তারা একা। মনে রেখো, তোমার লড়াইয়ে তুমি একা নও। আমরা সবাই মিলে এক বিশাল সমুদ্র হয়ে এই সমাজের সমস্ত নোংরামি ধুয়ে মুছে দেব।

আমরা মানুষ হিসেবে জন্মেছি, এবং মানুষ হিসেবেই আমাদের প্রাপ্য অধিকার ছিনিয়ে নেব। সেদিন কোনো তকমা আমাদের আটকাতে পারবে না। আমরা হব মুক্ত, স্বাধীন এবং অপরাজেয়

Comments

    Please login to post comment. Login