Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: ফানা

March 28, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

183
View

[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]

বৃষ্টির মধ্যে ঠিক কতক্ষণ বারান্দায় শুয়ে এভাবে ভিজছে স্নেহা, হিসাব রাখে নাই। তবে অনুমান করতেছে, ঘণ্টা দুয়েকের বেশি হবে। ভেজা কাপড়ের ঠান্ডাটা আর সহ্য করতে না পারায় দুনিয়ার বাস্তবতায় আপাতত ফিরতে পারলো। এতটা সময় ও ভিন্ন একটা জগতের ভেতর ছিল, শরীরের কাঁপুনিটা অসহনীয় মাত্রায় শুরু না হলে সম্ভবত আরো দীর্ঘক্ষণ ওই জগতেই কাটিয়ে দিতে পারতো, হয়তো পুরাটা রাতই। এখনো কিছুটা ঘোরের মধ্যে থেকেই ওর মনে হলো।

ম্যাজিক রিয়ালিজম বলে কি সত্যিই কোনোকিছু মানুষ রিয়েল লাইফে এক্সপেরিয়েন্স করতে পারে? বারান্দার ফ্লোর থেকে উঠতে উঠতে এই কয়েক ঘণ্টার জার্নির এক্সপেরিয়েন্স নিয়ে অসংখ্য প্রশ্ন মাথায় আসা শুরু হলো। সেসবের উত্তর বা ব্যাখ্যা ও এখন খুঁজতে যাইতেছে না। প্রশ্নগুলা যতক্ষণ পর্যন্ত বিক্ষিপ্ত থাকবে, উত্তরগুলাও ঠিকঠাক নিজেদের পথ চিনে আসতে পারবে না বলে ধারণা করলো ও। আপাতত মাথার ভেতর থেকে ক্রমাগত আসা প্রশ্নগুলাকে ঠিকভাবে ল্যান্ড করার জন্য স্পেস দেবে বলেই সিদ্ধান্ত নিলো।

একইসঙ্গে ও নিজেকে আগের তুলনায় কিছুটা শান্ত, আবার কিছুটা অস্থিরতার মধ্যেও আবিষ্কার করলো। ঘরে ঢুকে আলো জ্বালাতে গিয়ে ওর পা টললো কিছুটা।। প্রথমে ভাবতেছিল ভূমিকম্প, কিন্তু ঘরের ফ্যানের দিকে তাকিয়ে বুঝতে পারলো, কম্পন ভূমিতে না বরং ওর মাথায় হইছে। এই মুহূর্তে মাথা চক্কর দেওয়ার বিষয়টার চেয়ে আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ সিরিয়াল বাই সিরিয়াল ওর সামনে উঁকি মারতেছে। মাথায় চক্কর দেওয়ার ব্যাপারটা তাই প্রায়োরিটি লিস্টে বিশেষ পাত্তা পেল না। ওর মনে হলো, এই মুহূর্তে সর্বপ্রথম কাজ হইতেছে শাওয়ার নেওয়া আর গায়ের ভেজা কাপড়গুলা থেকে শরীরটাকে মুক্তি দেওয়া। মাত্রই ও ওয়াশরুমের দিকে যেতে পা বাড়াইতেছিল, ওই মুহূর্তেই ফোনের রিংটোনটা বাজে। এর আগেও বাজতে পারে, ও হয়তো খেয়াল করে নাই।

এত ঘণ্টা ফোনের কথা মনেও ছিল না। আবির চলে যাওয়ার পর ফোন কাছে রাখার বিশেষ দরকারও পড়ে না ওর। অফিস যায় না যে কত দিন, না কি তা কত মাসে গিয়ে গড়াইছে- ওই হিসাব রাখার তোয়াক্কাও করতেছে না। ফলে না দুনিয়া রাখে ওর খবর, না ও রাখে দুনিয়ার খবর! গত দুই মাস ধরে অন্তত তাই চলতেছে। মাঝখানে আম্মার অসুস্থতাটাই না চাইলেও ওকে দুনিয়ার কাছে কিছুটা ধরাশায়ী করে রাখছে- বেডসাইড টেবিলের উপর রাখা ফোনটা হাতে নিতে গিয়ে ভাবলো ও। নয়তো দুনিয়া থেকে আক্ষরিকভাবেই পুরাপুরি বিচ্ছিন্ন হয়েই কাটিয়ে দিতে পারতো একটা দীর্ঘ সময়।

পুরা দুনিয়াটাই তো ওর কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে চলে গেছে, কীসের সঙ্গেই বা আর ও সংযোগ মেইন্টেইন করে চলবে- এই ভাবনায় একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলতে গিয়ে বৃষ্টির ভেতর ওই জার্নিটার কথা মনে পড়লো ওর। দীর্ঘশ্বাসটাকে বের হতে না দিয়ে আটকালো সচেতনভাবেই। আম্মার ফোন না, স্ক্রিনে তাকিয়ে ও ওয়াশরুমের দিকে হাঁটা দিলো। পৃথিবীতে এখন আম্মা ছাড়া আর কারো সঙ্গে ওর সংযোগ না থাকলেও চলবে। অসুস্থ কোটায় আম্মাকে গ্রাউন্ড দেওয়া হইছে। দুনিয়ার আর কাউকে তা দিতে ও বাধ্য না। 

শাওয়ার নিতে খুব বেশি সময় নেয় না। ঝটপট ওয়াশরুম থেকে বের হয়ে বেডসাইড টেবিলের উপরের ড্রয়ার থেকে লেখার প্যাডটা হাতে নিয়ে গোটা গোটা অক্ষরে সিরিয়াল বাই সিরিয়াল লিখতে থাকে-

১। আজকে রাতে বসুন্ধরাতে থাকার সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো।

২। প্রেশার সম্ভবত ফল করার কারণে মাথা ঘুরানোর ঘটনা ঘটছে, কিছু একটা খেতে হবে।

৩। ব্যাগে রিভোট্রিল, ফিলফ্রেশ আর ওলিয়ানজ আছে; ফার্মেসি থেকে রাতের জন্য ম্যাক্স প্রো, প্রোডেপ আর বেকলোফেন আনতে হবে। রিভোট্রিল বা ফিলফ্রেশ আজকে রাতে খাওয়া যাবে না, উল্টা রিয়্যাকশন হতে পারে।

৪। দেলোয়ার ভাইকে কল দিয়ে আরো কিছু মিষ্টি ইমার্জেন্সি পাঠাও বাইকে করে বসুন্ধরায় পাঠাতে বলতে হবে।

৫। সারাদিন শরীর যা যা গ্রহণ করছে, তাতে রুচির অবস্থা নাজেহাল, অল্পতে এনার্জি দেওয়ার জন্য ডিম, কলা আর খেজুর খেলেই চলবে। ডিম-খেজুর ফ্রিজে আছে। নিচে গিয়ে কলার খোঁজ করতে হবে। অল্টারনেটিভ- দুইটা ডিম সেদ্ধ।

৬। মিষ্টি খাওয়ার মাঝপথে যেন কোনো গোলযোগ না ঘটে, এরজন্য স্পেয়ার দুইটা থ্রি মি.লি সিরিঞ্জ আর চারটা বিশ টাকা দামের লাইটার কিনতে হবে।

৭। বেশি করে পানি খেতে হবে, না ইচ্ছা করলেও বোতল কাছে রাখতে হবে মনে রাখার জন্য।

৮। বাইরের কাজ শেষ করে এসে শান্ত হয়ে আম্মাকে কল দিতে হবে, সম্ভব হলে ভিডিও কল। খেয়াল রাখতে হবে যেন অনবরত এবং অতিরিক্ত কথা না বলা হয়।

কাগজটা ভাঁজ করতে করতে দেলোয়ার ভাইকে ফোন দেওয়ার কথা ভাবা মাত্রই ফোনটা আবার বাজলো। বসের ফোন। প্রতিদিনই ফোন দেন। আগে উনি ভাই, পরে বস। ফোন না ধরার যথাযথ কারণ যে আছে, সেটা উনাকে ফোন ধরে ফর্মালিটিজের মাধ্যমে বলার কিছু নাই। বস-সাবঅর্ডিনেটের সম্পর্ক মাথায় নিয়ে হেলাল ভাই ফোন দিতেছেন বলে ওর মনে হয় না। দুনিয়া থেকে ওর বিচ্ছিন্নতায় বিচলিত হয়েই নিশ্চয় উনি ফোন দিতেছেন। যারা স্নেহার আশেপাশে থাকে; ওকে কাছ থেকে চেনে-জানে, তাদের কাছে এসবের ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ না দিলেও যে চলে, এটা ও জানে। অবশ্য এদের চেয়ে বেশি কাছে আসার পরও অনেকেই ওর অনেককিছু বোঝে নাই। তাদের ওই না বোঝদার ভাবনাগুলাকেই তো শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করলো ও! এখন আর গলাবাজি করে দোষটাই বা অন্যকে দেয় কী করে- এটা ভাবতে গিয়ে নিজেকেই ও বলে- নাহ, ঠিক আছে! রিয়েলিটি মেনে নাও যে তুমিই সকল নষ্টের মূল। রিয়েলিটি মেনে নিয়ে যাও- বাকিটা জীবন অশান্তি ভোগ করো!

নিজের উপর কিছুটা মেজাজ খারাপ হতে গিয়েও তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারলো মুহূর্তের জন্য। মেজাজ খারাপ পরেও করতে পারবে। এর আগে দেলোয়ার ভাইকে কল করে মিষ্টির অর্ডার না দিলে জেনেভা ক্যাম্প থেকে বসুন্ধরায় ডেলিভারি পৌঁছাতে রাত বারোটা বেজে যাবে। এসব বিষয়ে অপেক্ষা করা খুবই পেইনফুল একটা বিষয়- নিজেকে এই কথা স্মরণ করিয়ে দিতে গিয়ে অনেকদিন পর ওর মুখে একটা হাসি আসে। মলিন হলেও মন থেকে আসা হাসি। হঠাৎ এই সিচ্যুয়েশনে আবিরের অস্থিরতার কথা মনে পড়ে গেল। ভুলক্রমে যদি কোনোদিন আবিরকে কোথাও ওর জন্য অপেক্ষা করতে হতো, কতবার যে ও কই, কতদূর, আর কতক্ষণ লিখে টেক্সট পাঠাতো! নিজেও অস্থির থাকতো, ওকেও টেক্সটের পর টেক্সট দিয়ে অস্থির করে তুলতো। আবিরের ওইসব টেক্সটের উত্তরে প্রতিবারই ও লিখে পাঠাতো- আমার তো হেলিকপ্টার নাই যে উড়ে চলে আসবো। যার আছে, তাকে ডাকো! দিস ইজ ঢাকা, ম্যান! অলমোস্ট নেয়্যার, আরেকটু। আর কোনোদিন যদি ওকে শর্ত দিতো ও না যাওয়া পর্যন্ত আবির ড্রিংক শুরু করতে পারবে না, তাহলেই হতো! একটু পর পর লিখে পাঠাতো, দিস ইজ কাইন্ড অফ টর্চার! আমি জাস্ট একটা পেগ নেবো।

স্নেহা বড় করে লিখে পাঠাতো- নাআআআআহ! উত্তরে বেচারা আবির লিখতো- আর কতক্ষণ? কিছুক্ষণ আগের আটকে ফেলা দীর্ঘশ্বাসটা এখন ছাড়লো ও। আবিরের জন্য বুকের ভেতরটা কেমন একটা মোচড় দিয়ে উঠছে। নাহ, এইজন্য না যে জাদুবাস্তবতা ছাড়া আবিরের উপস্থিতি অনুভব করার অধিকার এবং ক্ষমতা ও এ জন্মের জন্য হারিয়ে ফেলছে। বরং এইজন্য যে নিজের কাছ থেকে মুক্ত করতে গিয়ে আবিরকে ওর খুব বাজে একটা সিচ্যুয়েশনের মধ্যে ফেলতে হলো; এইজন্যও যে দুইটা বছর আবিরকে আঁকড়ে ধরে বাঁচতে গিয়ে ও আবিরকে নিজের পুরা পৃথিবী বানিয়ে ফেলছিল। চোখটা বন্ধ করে ও ভাবে- আব্বা মারা যাওয়ার পর আবির হয়ে উঠছিল ওর ভালোবাসা-রাগ-জেদ-কষ্ট-আনন্দ সমস্ত কিছুরই কেন্দ্রবিন্দু। এ কারণে অনেক সময় ও একটা স্বেচ্ছাচারী, জেদী বাচ্চার মতো ওর সঙ্গে রাগ-জেদ দেখাতো, চিৎকার করতো। কত সময় গেছে ওর সঙ্গে পাগলের মতো চিৎকার করে কত আজেবাজে কথা বলছে। একটাবার ওর চিন্তাও হয় নাই যে লোকটা দিনের পর দিন ওর ওই আচরণ টলারেট করতেছে চুপচাপ। হয় ভয়ে, না হয় ওর যন্ত্রণা বুঝতে পেরেই।

নিজেকে আর আটকাতে পারলো না। আবিরের জন্য ওর বুকটা ফেটে কান্না চলে আসে। আটকানোর চেষ্টাও করলো না। কাঁদতে দিলো। এই কান্না ওর জন্য না, এই কান্না নিজের যন্ত্রণা বা কষ্টের জন্য না। এই কান্না আবিরের জন্য। যা ও সহ্য করে গেছে, যা ও এখন সহ্য করতেছে, যা ও বাকি জীবন সহ্য করবে- ওর বুকফাটা কান্না আবিরের ওই সমস্ত যন্ত্রণার জন্য, ওই সমস্ত যন্ত্রণার কারণ স্নেহা নিজে হওয়ার জন্য। কাঁদতে কাঁদতেই ও বলতে থাকে- ও কোনোদিন আবিরকে এটা বলার সুযোগটাও পাবে না যে ও যা করছে, সেটা ছাড়া এখান থেকে বের হওয়ার আর কোনো পথ ওর জানা ছিল না। নিজেকে এই গিল্ট ফিলের ভেতর না নিলে ও বারবারই আবিরকে এভাবেই যন্ত্রণা দিয়ে যেত। আবিরও এখান থেকে কখনো বের হতে পারতো না। কিন্তু এটা করেও কি ওর আসলেই একজনের ছায়া থেকে আরেকজন বের হতে পারছে? না কি পারবে কখনো?

ওর মনে পড়ে, এইচএসসির বোর্ড পরীক্ষায় একাউন্টিংয়ে জাবেদা, খতিয়ান, রেওয়ামিল সব ঠিকঠাক মেলানোর পরও উদ্ধৃত্তপত্রে ডেবিট-ক্রেডিটের হিসাব মিলিয়ে আসতে পারে নাই। জগতের কিছু হিসাব মেলানোর হাজার চেষ্টা করলেও মেলানো যায় না, অথবা সম্ভব হয় না। আবিরের নাম নিয়ে এই ফাঁকা ফ্ল্যাটটায় নিজের সমস্ত হাহাকার ও চিৎকার করে কেঁদে বের করতেছে। আবির…আবির…আবির…যতক্ষণ না ওর শ্বাস নেওয়া কষ্টকর হয়ে উঠলো, আবিরের নাম এভাবেই ও চিৎকার করে ডেকে বুক ভাসালো। 

সন্ধ্যার বৃষ্টির সময় বারান্দাতে শুয়ে ও যে জগত থেকে ঘুরে আসছিল, সেখানে আবিরের সঙ্গে ওর দীর্ঘ এক আলাপ হয়। অদ্ভুত ব্যাপার হচ্ছে- ওরা ওইখানে কোনো ঝগড়া করে নাই। একে-অপরের উপর কোনো দোষ বা দায় চাপায় নাই, কোনো অভিযোগও করে নাই। রাজশাহীতে পোস্টিংয়ের আগে আবির যেমন ঢাকায় এসে স্নেহার সঙ্গে দেখা করতো, ঠিক ওই সময়গুলার মতো ওরা দীর্ঘক্ষণ শুধু গল্পই করছে। আবির পাশে থাকলে ও যেমন শান্ত-চুপচাপ লক্ষ্মী মেয়ে হয়ে থাকতো, আজকেও তাই ছিল। আবির একটু হুইস্কি গেলার পর যেমন রাজ্যের সব গল্পের ঝুলি খুলে ধরতো, সেটাই আজকে করেছে। প্রতিবারের মতো আজকেও আবির ওর যে একটা চাইনিজ গার্লফ্রেন্ড ছিল, এটা মেনশন করতে ভুলে নাই। দীর্ঘক্ষণ গল্প করার পর বিদায় নেওয়াটাও সুন্দর ছিল। ও আরেকটু থাকার জেদ করে নাই। মন খারাপ করে গালও ফুলিয়ে রাখে নাই। আবিরও যাওয়ার সময় ও কষ্ট পায়, এমন কোনো আক্কেল ছাড়া কথা বলে নাই।

ইনহেলার থেকে দুইটা পাফ নিয়ে ও পানি খেয়ে শান্ত হয়ে বসে। হোয়াটসঅ্যাপের নোটিফিকেশনের সাউন্ডে ফোনটা হাতে নিয়ে আবরারের মেসেজ দেখে- আপা, আপনি ঠিক আছেন? আমি কয়েকদিন ধরে অনেক ট্রাই করেও আপনাকে রিচ করতে পারছি না বলে চিন্তা হচ্ছে। ওইদিনের পর আপনি কেমন আছেন জানতে পারছি না। আবির ভাই-ই বা কেন ওইদিন ওইটা করলেন, আমি এখনো পর্যন্ত বুঝে উঠতে পারিনি। মিনিমাম ফিলিংস বা এটাচমেন্ট থাকলে শেষটা কেউ এভাবে করে না। আপনি কেন কিছু বলছিলেন না, এটাতে আমি অবাক হচ্ছিলাম। আপনি কীভাবে ডিল করছেন একা, জানি না। যদি আমার সঙ্গে কথা বলার প্রয়োজন হয়, প্লিজ নক দেবেন। অ্যান্ড প্লিজ, আপা…নো মোর ড্রাগস। ইট উইল কিল ইউর রিয়েল ইমোশন। টেক কেয়ার।

টেক্সটা পড়ে ও ওদের শেষ দিনের কনর্ভাসেশন মনে করার চেষ্টা করতে গিয়েও থেমে যায়। ওই কনভার্সেশন মনে করার ইচ্ছা করলো না। ওইটা মনে করে করেই তো এতগুলা দিন ও নিজেকে পুড়িয়ে অঙ্গার করলো। যন্ত্রণাও পেল। যে যন্ত্রণা খোদা কপালে লিখে রাখছেন, তা "চাহিবামাত্র গ্রাহককে দিতে বাধ্য থাকিবেন"-এর মতো; ওইটা আসবেই, যতই মানুষ তা ঠেকানোর চেষ্টা করুক না কেন। যেইভাবে ক্রমাগত যন্ত্রণা থেকে নিজেদের বের করার জন্য নিজের সঙ্গে সঙ্গে আবিরকেও ও একটা অনির্দিষ্টকালের জন্য বিরাট অশান্তির মধ্যে ফেলে দিছে, ওই সময় ওইটার চেয়ে ভালোভাবে ক্লোজার টানা যে কারো জন্যই হয়তো ডিফিকাল্ট হতো। স্নেহা ভাবে; আবির তো আর ফেরেশতা না, বরং ও আর আট-দশজনের মতো ত্রুটিপূর্ণ মানুষ। ও একটু হেসে নিজেকেই বলে- নাহ, আর আট-দশজনের তুলনায় একটু বেশি গাধা টাইপেরই লোকই ও।

শেষদিন ও ইচ্ছা করেই আবিরকে কোনো প্রশ্ন করে নাই। কোনোকিছু বলেও নাই। ও বুঝতে পারতেছিল, আবিরকে ওই সময় কোনো প্রশ্ন করলে লাভ হতো না। বরং ওই সময়ের তিক্ততাটাই কেবল বাড়তো। এমনিতেই শেষটা যথেষ্ঠ কদর্য ছিল! ওই কনভার্সেশন ও ওর স্মৃতির আনাচে-কানাচেও রাখতে চায় না। ও আবিষ্কার করলো, আবিরের সঙ্গে একমাত্র ওই কনভার্সেশনের স্মৃতিটাই শুধু ও শিফট+ডিলিট করে চিরদিনের জন্য মুছে ফেলতে চায়। এছাড়া বাদ বাকি প্রতিটা মুহূর্তই ও খুব যত্নে বুকের ভেতরে তুলে রাখবে। গরু যেমন জাবড় কাটে, স্নেহাও মাঝে মাঝে সেগুলা বের করে খুলে খুলে দেখবে আর স্মৃতির জাবড় কাটবে।

স্নেহা অনুমান করতে পারে, ওইদিন আবির কোন মানসিক কন্ডিশনে ছিল। ওর প্রতি প্রচণ্ড রাগ আর হয়তো কিছুটা ঘৃণাও মেশানো থাকলে থাকতে পারে- এমন মিশ্র ফিলিং নিয়েই আবির নিজেকে ডিফেন্ড করে যাইতেছিল। কিন্তু রিয়েলিটি ইজ সামথিং ডিফরেন্ট! উই ক্যান ডিফেন্ড আওয়ারসেলভস টু আদার উইদ অ্যা থাউজেন্ড আর্গুমেন্টস অর ডিনাই দেম অলটুগেদার। বাট দেয়্যার ইজ নো ওয়ে ফর এস্কেপিং ফ্রম আওয়ার য়ৌন সেলফ। সুনার অর লেটার, উই অল হ্যাভ টু এন্সার টু য়ৌন কনশেন্স ফর হোয়্যাট উই হ্যাভ ডান। উই অল মাস্ট এন্সার। দেয়্যার ইজ নো আদার ওয়ে। স্নেহা ভাবে- চাইলে অনেককিছু দিয়েই ওইদিন আবিরকে ও চুপ করিয়ে দিতে পারতো। যুক্তি দিতে পারতো ওর কথার প্রেক্ষিতে। তাতে কী লাভটা হতো? তর্কেই শুধু জেতা হতো, যন্ত্রণা কারোই কমতো না। ও অনেককিছু বোঝে না, বা ধরে নিতেছে…আচ্ছা না থাক, মেনেই নিতেছে যে ও অনেককিছু সত্যিই বোঝে না। কিন্তু কোনটা ভয় আর কোনটা কেয়ার, এর পার্থক্য ও ঠিকই বোঝে। স্নেহা বা আবির- কেউই পুরাপুরি সাদা অথবা পুরাপুরি কালো কোনো লাইনে দাঁড়িয়ে নিজেদের কৃতকর্মকে জাস্টিফাই করতে পারবে না। ওদেরকে একটা গ্রে লাইনে গিয়েই শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নিতে হবে।

যেই প্রচণ্ড অস্থির একটা সময়ে এসব ঘটনার সূত্রপাত হয়, আবির-স্নেহা দুইজনই দুইজনের জায়গা থেকে প্রচণ্ড ভার্নারেবল সিচ্যুয়েশনে ছিল। কারোরই নিজেরটা রেখে অন্যের পেইনটা ফিল করে কিছু করার মতো কন্ডিশন ছিল না তখন। কিন্তু স্নেহা এখন মনে করে, এটা একদিন না একদিন হতোই। ওইবার না হয়ে হয়তো পরেরবার বা তার পরেরবার। কিছু জিনিস এত তীব্র থাকে, এর শেষটাও হয়তো সব ভেঙেচুরেই হতে হয়। কিছুক্ষণ ও চুপ করে বসে থাকে। ওর ভাবনায় আসে- আবরারকে আজকে সন্ধ্যার জার্নিটার কথা শেয়ার করলে ও ক্লিনিক্যাল ব্যাখ্যা দিতে এটাকে কেমিক্যাল রিয়্যাকশন বলে চালিয়ে দেবে নিঃসন্দেহে। বলবে অতিরিক্ত কেমিক্যাল শরীরে প্রবেশের কারণে মস্তিষ্কে হ্যালুসিনেশন হইতেছে। আজকের কনভার্সেশনের পুরাটাকেই ও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করতে চাইবে রিয়েলিটি অথবা মেডিকেল টার্ম কী বলে- এইসব যুক্তি দিয়ে। এটা ভাবতে ভাবতে ওর নিজেকে মনে হলো হাজিমি। 

আবির কি তাহলে আজকে শিমামোতো হয়ে আসছিল? হা হা হা…বেশ জোরেই হেসে দেয় ও। আবিরকে দেওয়া ওর প্রথম বইটা ছিল সাউথ অফ দ্য বর্ডার, ওয়েস্ট অফ দ্য সান। ওই বই পড়া শেষ করার পর এর ফিনিশিং নিয়ে ওর মন ভীষণ খারাপ হইছিল। এটা নিয়ে ওদের দুইজনের অনেক কনভার্সেশনও হইছে ওই সময়। স্নেহা ভাবে, মুরাকামির গল্পে শিমামোতোর এগজিসটেন্সটাই একটা জাদুবাস্তবতা অথবা ম্যাজিক রিয়ালিজম। আজকে সন্ধ্যায় আবিরের এগজিসটেন্সটাও তাই। তাহলে তো ও মুরাকামির গল্পের নায়িকার মতোই স্নেহার জগতে এসে হানা দিছে। আবার হাসলো স্নেহা। ওর মনে হলো, রাকিন আসলে ঠিকই বলে- সারা জীবন ও নায়কের ভূমিকাই পালন করে গেছে! নাহ, ও থামে। ভুল! বাস্তবে তো শেষ পর্যন্ত ও আবিরের কাছে খলনায়িকাতে পরিণত হইছে! ডেবিট-ক্রেডিটের হিসাব এখানেও এত সহজে মিলবে না!

ও সিদ্ধান্ত নেয়, আজকে সন্ধ্যার জার্নি নিয়ে আবরার সঙ্গে কোনো কথা ও বলবে না। যে জুনুনে ও পৌঁছে গেছিল, এর শেষটা এনিহাউ এভাবেই হতো বলে আজকে সন্ধ্যার পর থেকে বারবার ওর মনে হইতেছে। আর ওই যে সন্ধ্যার জার্নি অথবা যদি এই জার্নির সিলসিলা সামনেও জারি থাকে, এটা হচ্ছে ওই স্তর, যেটা বলে বলে ও আবিরকে অস্বস্তিতে ফেলে দিতো আগে। দিস ইজ একচুয়্যালি ফানা! ও অবশ্য এর অন্য নামটা বলে আবিরের লেগ পুল করতো- মউত! ও টের পায়, আবির চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ও নিঃশেষ হয়ে গেছে। নিজেকে বিলীন করে দিছে। দেহত্যাগের আগে এখন যতটুকু আয়ু ওর আছে, এটা ওকে কাটাতে হবে আবিরের সঙ্গে আজকের সন্ধ্যার মতো এমন জার্নির ভেতর দিয়েই। যন্ত্রণা কারো কি কমলো তাতে? হিসাবও কি মিললো? উঁহু…স্নেহা মাথা নাড়ায়। সেটা তো এইচএসসি পরীক্ষাতেও মিলে নাই! কিন্তু আবির যেই যন্ত্রণাগুলা জেনে বুঝে দিছে? এমন কী শেষদিনও!

আবারও হাসে ও। অনেকক্ষণ আগে মিষ্টির ডেলিভারি চলে আসছে বসুন্ধরায়। মিষ্টির প্যাকেট সামনে নিয়েই ও এতক্ষণ কেঁদেকেটে দুনিয়া ভাসাইতেছিল। এখন মনে পড়তেই ফয়েল পেপারটা নোটবুকের ভেতর থেকে বের করে সুঁইয়ের মাথায় আগুন ধরাতে গিয়ে ও নিজেকে বললো- ইয়ং লেডি, ডু ইউ রিয়েলি থিংক ইট এন্ডস হেয়্যার? নোপ! ফয়েল পেপারের এই মাথা থেকে ওই মাথা পর্যন্ত একবার এক নিঃশ্বাসে টান দেওয়ার পর দম নেয়। স্পটিফাইটা খুলে চালিয়ে দেয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়-

তার আর পর নেই
নেই কোনো ঠিকানা
যা কিছু গিয়েছে থেমে
যাক থেমে যাক না…

মনে রেখ আমিও ছিলাম
ছোট্ট জীবন আর যত হাসি গান
আমি তোমাকে দিলাম
আমিও ছিলাম মনে রেখ…

চেজিং দ্য ড্রাগন: কনসেন্ট পেপার

Comments

    Please login to post comment. Login