রাত তখন ঠিক ২টা ১৭ মিনিট।
তাহমিদ হঠাৎ ঘুম ভেঙে উঠে বসলো। বুকটা ধড়ফড় করছে, যেন কেউ তাকে দৌড় করিয়ে এনেছে অনেক দূর থেকে। ঘরটা অন্ধকার, শুধু জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে বিছানার এক কোণে পড়ে আছে।
সে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইল। তারপর বুঝতে পারল—সে আবার সেই একই স্বপ্নটা দেখেছে।
একটা বিশাল, ফাঁকা শহর।
চারদিকে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। কোনো মানুষ নেই, কোনো গাড়ির শব্দ নেই। শুধু বাতাসে কেমন একটা ঠাণ্ডা, অস্বস্তিকর গন্ধ। আর দূরে একটা ঘড়ি—একটা বিশাল টাওয়ারে লাগানো ঘড়ি—যেটা বারবার ২:১৭-তেই থেমে যাচ্ছে।
তাহমিদ চোখ মুছে উঠে দাঁড়াল। সে ফোনটা হাতে নিল।
২:১৭ AM।
সে থমকে গেল।
“কাকতালীয়?”—নিজেকে প্রশ্ন করল সে।
কিন্তু ব্যাপারটা এখানেই শেষ নয়।
গত ৭ দিন ধরে সে ঠিক এই একই সময়েই ঘুম থেকে উঠছে, আর একই স্বপ্ন দেখছে।
⏳ অদ্ভুত শুরু
পরদিন সকালে তাহমিদ তার বন্ধুর সাথে দেখা করতে গেল। তার বন্ধুর নাম রাফি—একজন টেক-গিক, সবকিছুতেই লজিক খোঁজে।
তাহমিদ সবকিছু খুলে বলল।
রাফি একটু হেসে বলল,
“দোস্ত, এটা ক্লাসিক ‘রিপিটিং ড্রিম’। তুই হয়তো স্ট্রেসে আছিস।”
তাহমিদ মাথা নাড়ল,
“না, ব্যাপারটা শুধু স্বপ্ন না। আমি ওই জায়গাটা ফিল করি… যেন আমি সত্যিই সেখানে ছিলাম।”
রাফি এবার একটু সিরিয়াস হলো।
“ঠিক আছে। আজ রাতে একটা এক্সপেরিমেন্ট করি। তুই ঘুমানোর আগে একটা ভয়েস রেকর্ডার অন রাখিস। দেখি তুই ঘুমের মধ্যে কিছু বলিস কিনা।”
🌙 রাতের পরীক্ষা
রাত ১টা ৫০।
তাহমিদ বিছানায় শুয়ে আছে। পাশে ফোন—রেকর্ডিং অন।
তার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে এল।
...
হঠাৎ সে আবার সেই শহরে।
চারপাশ ফাঁকা। বাতাসে অদ্ভুত ঠাণ্ডা।
সে এবার হাঁটতে শুরু করল। আগেরবারগুলোতে সে শুধু দাঁড়িয়ে থাকত, কিন্তু এবার কিছু একটা তাকে এগোতে বাধ্য করছে।
দূরের সেই ঘড়ির টাওয়ারটা এবার আরও পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে।
ঘড়িতে আবারও—২:১৭।
কিন্তু এবার কিছু একটা আলাদা।
ঘড়ির নিচে একটা দরজা।
তাহমিদ ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
তার বুক ধড়ফড় করছে।
দরজাটা অল্প খোলা।
সে হাত বাড়িয়ে দরজাটা ঠেলে খুলল।
🕰️ সময়ের ভেতরে
দরজার ভেতরে ঢুকতেই সে যেন অন্য জগতে চলে এল।
ভেতরে অসংখ্য ঘড়ি—দেয়ালে, ছাদে, মেঝেতে। সব ঘড়িই একসাথে টিকটিক করছে।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার—সব ঘড়ির সময় আলাদা।
কেউ ১৯৯৮ দেখাচ্ছে, কেউ ২০৪৫, কেউ আবার ১৭৮২।
তাহমিদ হাঁ করে চারপাশ দেখছে।
হঠাৎ পেছন থেকে একটা কণ্ঠ শোনা গেল—
“তুমি দেরি করে ফেলেছো।”
তাহমিদ ঘুরে দাঁড়াল।
একজন বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে আছে। লম্বা সাদা দাড়ি, চোখে অদ্ভুত জ্যোতি।
“আপনি কে?”—তাহমিদ জিজ্ঞেস করল।
বৃদ্ধ ধীরে হেসে বলল,
“আমি সময়ের রক্ষক।”
⚠️ সত্যের মুখোমুখি
তাহমিদ হতভম্ব।
“এটা কোথায়?”
বৃদ্ধ বলল,
“এটা সময়ের কেন্দ্র। এখানে সব সময় একসাথে থাকে।”
“আমি এখানে কেন?”
বৃদ্ধ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর বলল—
“কারণ তুমি ফাঁদে পড়েছো।”
“কিসের ফাঁদ?”
“সময়-লুপ।”
তাহমিদের শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
“মানে?”
বৃদ্ধ বলল,
“তুমি একই সময়ের মধ্যে আটকে গেছো—২:১৭। যতক্ষণ না তুমি লুপটা ভাঙতে পারছো, তুমি বারবার একই মুহূর্তে ফিরে আসবে।”
তাহমিদ গিলল।
“কিভাবে ভাঙব?”
বৃদ্ধ তার দিকে তাকাল,
“তোমাকে সেই ভুলটা ঠিক করতে হবে—যেটা তুমি করেছিলে ৭ দিন আগে।”
🧠 হারিয়ে যাওয়া স্মৃতি
তাহমিদ চোখ কুঁচকে ভাবতে লাগল।
৭ দিন আগে?
সে চেষ্টা করল মনে করতে।
হঠাৎ তার মাথায় একটা দৃশ্য ভেসে উঠল।
রাস্তায় হাঁটছে সে।
একটা ছেলে রাস্তা পার হতে যাচ্ছিল।
একটা গাড়ি দ্রুত আসছিল।
তাহমিদ দেখেছিল।
কিন্তু সে কিছু করেনি।
সে ভেবেছিল—“আমার সমস্যা না।”
...
তারপর—
একটা ধাক্কার শব্দ।
💥 ভয়ংকর উপলব্ধি
তাহমিদ হঠাৎ চিৎকার করে উঠল,
“না… না… আমি পারতাম তাকে বাঁচাতে!”
বৃদ্ধ ধীরে মাথা নাড়ল।
“হ্যাঁ। কিন্তু তুমি করনি। আর সেই মুহূর্তটাই তোমাকে এই লুপে আটকে দিয়েছে।”
তাহমিদের চোখে পানি চলে এল।
“আমি কি আবার সুযোগ পাব?”
বৃদ্ধ বলল,
“প্রতিবার ২:১৭-তে তুমি ফিরে যাও। প্রতিবারই তুমি সেই মুহূর্তে পৌঁছাতে পারো… যদি তুমি মনে রাখতে পারো।”
“কিন্তু আমি তো ভুলে যাই!”
বৃদ্ধ মৃদু হেসে বলল,
“এইবার না।”
🔁 বাস্তবে ফেরা
হঠাৎ সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।
তাহমিদ চোখ খুলল।
সে তার বিছানায়।
ফোনে সময়—২:১৭ AM।
কিন্তু এবার তার মাথায় সব পরিষ্কার।
সে দৌড়ে বের হয়ে গেল।
🏃♂️ সময়ের বিরুদ্ধে দৌড়
রাস্তায় পৌঁছাতে তার ৩ মিনিট লাগল।
তার হৃদপিণ্ড যেন বুক ফেটে বের হয়ে আসবে।
সে জানে—আর মাত্র কিছু সেকেন্ড আছে।
দূরে সে দেখল—ছেলেটা রাস্তা পার হতে যাচ্ছে।
আর গাড়িটা আসছে।
সবকিছু যেন স্লো মোশনে।
তাহমিদ চিৎকার করল—
“থামো!!!”
কিন্তু ছেলে শুনল না।
তাহমিদ দৌড়ে গিয়ে তাকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল।
ঠিক সেই মুহূর্তে—
গাড়িটা তার পাশ দিয়ে সজোরে চলে গেল।
🌅 লুপের শেষ
সবকিছু থেমে গেল।
পুরো পৃথিবী যেন এক মুহূর্তের জন্য নিস্তব্ধ।
তারপর—
একটা উষ্ণ আলো চারপাশে ছড়িয়ে পড়ল।
তাহমিদ চোখ বন্ধ করল।
☀️ নতুন সকাল
সে আবার চোখ খুলল।
সূর্যের আলো তার মুখে পড়ছে।
সে তার নিজের বিছানায়।
ফোনে সময়—৮:৩০ AM।
সে উঠে বসলো।
সবকিছু স্বাভাবিক।
কিন্তু তার ভেতরে কিছু বদলে গেছে।
🧩 শেষ সত্য
সেদিন সন্ধ্যায় সে আবার সেই জায়গায় গেল।
ছেলেটা সেখানে দাঁড়িয়ে।
হাসছে।
“ভাইয়া, ধন্যবাদ… আপনি না থাকলে…”
তাহমিদ মৃদু হাসল।
“কোনো সমস্যা না।”
সে আকাশের দিকে তাকাল।
মনে মনে বলল—
“আমি বুঝেছি… সময় শুধু ঘড়ির কাঁটা না। এটা আমাদের সিদ্ধান্ত।”
🌌 শেষ কথা
সেদিন রাত ২:১৭-তে তাহমিদের আর ঘুম ভাঙেনি।
কারণ এবার—
সে মুক্ত।
4
View
Comments
-
Sanat Karmakar 5 hours ago
খুব সুন্দর হয়েছে, ধন্যবাদ