Posts

গল্প

তুলসী

March 28, 2026

Sanat Karmakar

71
View

***  তুলসী ***

বাচ্ছা মেয়েটা বারো /তেরো বছরের হবে, প্রায় ই আসে আমাকে বক ফুল দিতে  আমার বক ফুলের বড়া খেতে খুব ভালো লাগে । সব সময় পাওয়া যায় না, বছরে এক দু মাস খেতে পাওয়া যায়, বাইরে থেকে চেচাচ্ছে মা মা দরজা খোলো , আমি দরজা খুলে বললাম কিরে তুলসী বেশ কয়েকদিন আসিস নি তো, তুলসী বলল গাছে আর বকফুল নেই গো মা সব শেষ হয়ে গেছে, আমি বললাম বকফুল নেই তো কেন এসেছিস, তুলসী বলল মা তোমাদের ওই বাগানটা পরিষ্কার করে দেবো  ? আমি বললাম না, তুলসী আবার বলল ও মা দিই না, তোমাদের এই বাগানটা পরিষ্কার করে। তখন আমি বললাম ঠিক আছে করগে কিন্তু ক টাকা নিবি বল । তুলসী বলল  টাকা লাগবে না, আমাকে একটু খেতে দিও তাহলেই হবে । আমি বললাম ঠিক আছে যা গিয়ে পরিষ্কার কর।  আধঘন্টা পর তুলসী ডাক দিল মা ও মা একবার দেখো না গো, বাগানটা ঠিক মতো পরিষ্কার হয়েছে কিনা, আমি তো দেখে অবাক, এত সুন্দর পরিষ্কার করেছে এ বাচ্চা মেয়েটা, তারপর মেয়েটাকে বললাম তুই ওখানে বস গিয়ে,আমি তোকে খেতে দিচ্ছি। তুলসীকে একটু বেশি বেশি করে খাবার দিলাম, কিন্তু দেখি তুলসী না খেয়ে খাবারগুলো একটা প্যাকেটের মধ্যে ভরে নিচ্ছি, আমি বললাম কিরে তুলসী তুই খাচ্ছিস না খাবার নিয়ে যাচ্ছিস কেনো ? তুলসী বললো বাড়ি গিয়ে খাব। আমি বললাম বাড়ি গিয়ে খাবি কেন  ? তোকে এখনই খেতে হবে। তুলসী বলল আমার মায়ের খুব অসুখ, কালকে সরকারি হাসপাতালে দেখিয়েছিলাম অনেক ওষুধ দিয়েছে, কিছু না খেয়ে ওষুধ  খাওয়া যাবেনা,ডাক্তার বাবু বলেছে তাই বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছি, আগে মাকে দেবো তারপর যা থাকবে সেটা আমি খেয়ে নেব । তুলসীর কথা শুনে দুচোখে জল নেমে এলো, হাজার চেষ্টা করেও নিজেকে আর সামলাতে পারলাম না। আমি আবার ঘর থেকে কিছু খাবার নিয়ে এসে তুলসিকে নিজের হাতে খাইয়ে দিলাম। তারপর তুলসীকে বললাম চল আজকে তোর মায়ের সঙ্গে দেখা করব।  তুলসীর বাড়িতে ঢুকতেই তুলসির মা জিজ্ঞেস করল, ইনি কে মা তুলসি আমি তো চিনতে পারছি না, তখন তুলসী বলল কেন মা আমি যে বাড়িতে বক ফুল দিই না ওই মা টা । আজকে আমাকে নিজের হাতে খাইয়ে দিয়েছে জানো মা। তোমার অসুখ হওয়ার আগে যেমন তুমি আমাকে খাওয়াতে ঠিক সেরকম ভাবে। তুলসী কথা শুনে তার মা কানতে লাগলো, কি আর করবো মা তোর কপাল, সাত বছর আগে তোর বাবা আমাদের ছেড়ে চলে গেছে, তারপর থেকেই তো যত দুঃখ কষ্ট, আর আমার এই ভয়ানক অসুখ কবে যে ভালো হবে কিছুই বুঝতে পারছি না। তুই বড় হলে কি করবি, কি করে যে তোর বিয়ে দেব কিছুই বুঝতে পারছি না মা।
         তাদের মা-মেয়ের কথা শুনে আমার নিজের চোখে আবার জল নেমে এলো, আমি বললাম দিদি তোমার মেয়েকে যে শিক্ষা দিয়েছো, তা কোন সরকারি স্কুল দিতে পারবে না, এই শিক্ষা একজন মা আর বাবায় দিতে পারে। তুলসীর মাকে জিজ্ঞাসা করল, আচ্ছা দিদি তুলসির বাবা মারা গেল কি করে, তুলসির মা উত্তর দিল আমার ভুলের জন্য, ওর বাবার একটা ছোট দোকান ছিল, আমাদের মোটামুটি ভালই চলে যেত বেশ সুখেই ছিলাম, আমাদের মা মেয়েকে খুব খেয়াল রাখত, আর আমি ছিলাম বরাবরই একটু রাগী টাইপের, আমার একটাই ভুল শুধু মুখে মুখে তর্ক করতাম, একদিন আমার সঙ্গে এই তর্ক করার কারণে তুমুল ঝগড়াই পরিণত হল, তারপর বুকে হাত দিয়ে বসে পড়ল, পরে ডাক্তার এসে জানালো উনার হার্ট অ্যাটাক হয়েছে মারা গেছে, এই পৃথিবীতে উনি আর নেই, তারপর থেকে আমার এই দুর্দশা। কথা বলতে বলতে তুলসীর মা হাউ মাউ করে কানতে কানতে বলল আমার সব শেষ হয়ে গেছে দিদি। আমার অসুস্থ শরীর নিয়ে আমি আর কিছু ভাবতে পারিনা।
      তখন আমি বললাম একটা কথা বলব দিদি, আমার তো কোন সন্তান নেই, তোমার মেয়েকে আমায় দেবে ? তুলসীর মা বলল এ আপনি কি বলছেন, আমি কাকে নিয়ে বাঁচবো ?
 আমি বললাম তুমি তুলসীর কাছেই থাকবে, শুধু তোমার বাড়িটা পরিবর্তন করে আমার বাড়িতে গিয়ে থাকবে, আমার স্বামী বাইরে চাকরি করে আমি একা একা থাকি তাহলে আমারও ভালো লাগবে, তাছাড়া আজকের পর থেকে তোমার ও তুলসী সমস্ত দায়িত্ব আমার । তোমাকে নিয়ে কোন চিন্তা করতে হবে না । তুলসীর মা ভাবলো যাইহোক মেয়েটা আমার দুবেলা দুটো খেয়ে তো বাঁচবে, তাই সে রাজি হয়ে গেল, আমি বললাম ওকে সামনের মাসে স্কুলে ভর্তি করে দেব, আর তোমাকে ভাল ডাক্তার দেখিয়ে সুস্থ করব, চলো আমার সঙ্গে চলো।
     তুলসী বললো মা তুমি আমাকে স্কুলে ভর্তি করাবে, কি মজা! আমার স্কুলে পড়া করতে খুব ভালো লাগে। তুলসীর এক মুখ নিষ্পাপ হাসি দেখে আমার মনটা জুড়িয়ে গেল।

       (কলমে সনৎ )

Comments

    Please login to post comment. Login

  • Sanat Karmakar 5 hours ago

    তুলসী, গল্পের নাম, আশাকরি ভালো লাগবে