Posts

নন ফিকশন

মায়ের অপেক্ষা

March 28, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

5
View

শিরোনাম: মায়ের অপেক্ষা
শীতের সকাল। কুয়াশায় ঢাকা পুরো গ্রামটা যেন নিস্তব্ধ হয়ে আছে। মাটির ছোট ঘরের সামনে বসে আছে রহিমা খাতুন। তার চোখ দুটো রাস্তার দিকে—যেন কেউ আসবে, খুব প্রিয় কেউ।
তার ছেলে, রাকিব।
তিন বছর আগে শহরে গেছে কাজের জন্য। যাওয়ার দিন বলেছিল—
“মা, আমি টাকা পাঠাবো, তুমি আর কষ্ট করো না।”
রহিমা খাতুন সেদিন শুধু হাসছিল। চোখে পানি ছিল, কিন্তু সে লুকিয়ে রেখেছিল।
প্রথম কয়েক মাস ঠিকই টাকা এসেছিল। মাঝে মাঝে ফোনও করত রাকিব—
“মা, তুমি ঠিক আছো তো?”
রহিমা বলত—
“আমি ভালো আছি বাবা, তুই নিজের খেয়াল রাখ।”
কিন্তু তারপর হঠাৎ করেই সব বন্ধ হয়ে গেল।
না কোনো টাকা, না কোনো ফোন।
গ্রামের মানুষ নানা কথা বলতে শুরু করল—
“শহরে গিয়ে ছেলে মাকে ভুলে গেছে।”
“নতুন জীবন পেয়ে পুরনো সব ফেলে দিয়েছে।”
কিন্তু রহিমা খাতুন এসব কথা বিশ্বাস করল না।
সে শুধু বলত—
“আমার ছেলে এমন না। ও আসবেই।”
প্রতিদিন সকাল হলেই সে দরজার সামনে বসে থাকে।
দুপুর গড়ায়, বিকেল নামে—তবুও সে উঠে না।
কারণ তার বিশ্বাস—আজ হয়তো আসবে।
শীত গেল, গরম এলো, তারপর বর্ষা।
মাটির ঘরের চাল থেকে পানি পড়ে, তবুও সে একা সেই ঘরেই থাকে।
খাওয়ার কষ্ট, ওষুধের কষ্ট—সব সহ্য করে।
একদিন পাশের বাড়ির খালা এসে বলল—
“এইভাবে আর কতদিন বসে থাকবি? ছেলে তো আর আসবে না।”
রহিমা খাতুন ধীরে বলল—
“মা কি কখনো সন্তানের জন্য অপেক্ষা ছাড়তে পারে?”
দিন যায়, মাস যায়।
রহিমার শরীর ভেঙে পড়তে থাকে।
চোখের দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে যায়, হাঁটতেও কষ্ট হয়।
তবুও প্রতিদিন সে দরজার সামনে এসে বসে।
একদিন সন্ধ্যায়, আকাশে হালকা বৃষ্টি পড়ছে।
গ্রামের রাস্তায় একটা গাড়ি ঢুকল।
এই গ্রামে গাড়ি খুব একটা আসে না, তাই সবাই অবাক হয়ে তাকাল।
গাড়ি থামল রহিমার ঘরের সামনে।
দরজা খুলে একজন যুবক নামল।
মুখে দাড়ি, শরীর শুকিয়ে গেছে—চেনা যায় না সহজে।
সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
— “মা…”
শব্দটা খুবই ক্ষীণ।
রহিমা প্রথমে শুনতে পায়নি।
আবার ডাক—
— “মা… আমি রাকিব…”
এইবার সে কেঁপে উঠল।
চোখ মেলে তাকাল—
ঝাপসা চোখে কিছুই ঠিকমতো দেখা যায় না, কিন্তু সেই কণ্ঠস্বর…
সে উঠে দাঁড়াতে গিয়ে পড়ে যাচ্ছিল, রাকিব দৌড়ে এসে তাকে ধরে ফেলল।
— “মা… আমি দেরি করে ফেলেছি…”
রহিমার হাত কাঁপছে, সে ছেলের মুখ ছুঁয়ে দেখছে—
যেন বিশ্বাস করতে পারছে না।
— “তুই সত্যি আমার রাকিব?”
রাকিব কাঁদতে কাঁদতে বলল—
“হ্যাঁ মা… আমি তোমার সেই রাকিব…”
তারপর সে সব বলল—
শহরে কাজ করতে গিয়ে একদিন দুর্ঘটনায় পড়ে।
দীর্ঘদিন হাসপাতালে ছিল।
মোবাইল হারিয়ে যায়, কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারেনি।
অবশেষে সুস্থ হয়ে অনেক কষ্টে ঠিকানা জোগাড় করে ফিরে এসেছে।
রহিমা কিছুই বলল না।
সে শুধু ছেলেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল।
কিন্তু সেই জড়িয়ে ধরা বেশিক্ষণ টিকল না।
রহিমার হাত ধীরে ধীরে ঢিলে হয়ে গেল।
রাকিব চিৎকার করে উঠল—
“মা! মা! কথা বলো!”
কোনো উত্তর নেই।
তার মা, যে তিন বছর ধরে প্রতিদিন অপেক্ষা করেছে—
সে তার ছেলেকে শেষবারের মতো দেখে, চুপচাপ চলে গেল।
রাকিব মাটিতে বসে কাঁদছে।
তার কণ্ঠে শুধু একটাই কথা—
“মা… আমি ফিরে এসেছি… তুমি কেন আর একটু অপেক্ষা করলে না…”
বৃষ্টির পানি আর তার চোখের পানি এক হয়ে গেল।
সেই দিন গ্রামের সবাই বুঝল—
একজন মা কতটা ভালোবাসতে পারে, আর কতটা কষ্ট নিয়ে অপেক্ষা করতে পারে।
শেষ।

Comments

    Please login to post comment. Login