*****অভিশপ্ত বাঁকের প্রহরী*****
আকাশের রঙ তখন ফিকে হয়ে আসা জমাটবদ্ধ রক্তের মতো লালচে-বেগুনি। দিনের আলো নিভে আসার এই সন্ধিক্ষণকে পাহাড়ি মানুষেরা বলে ‘নেকড়ে বেলা’। হিমালয়ের পাদদেশ ঘেঁষে বয়ে চলা গঙ্গা এই অঞ্চলে এসে কিছুটা শান্ত হলেও তার গভীরতা আর স্রোতের টানে এক ধরনের আদিম হিংস্রতা লুকিয়ে আছে। আমি যখন পাহাড়ের সেই খাড়া খাঁজে দাঁড়ালাম, নিচ থেকে উঠে আসা কুয়াশা আমার চারপাশকে এক মায়াবী চাদরে ঢেকে দিচ্ছিল। হিমশীতল হাওয়া পাইন আর দেবদারু গাছের পাতায় ধাক্কা খেয়ে এক অদ্ভুত শাঁ শাঁ শব্দ তুলছে, যা অনেকটা কান্নার মতো শোনায়।
আমি পাহাড়ের একেবারে কিনারে গিয়ে দাঁড়ালাম। নিচে কয়েকশ ফুট গভীর খাদ। সেই খাদের নিচে গঙ্গার একটি সংকীর্ণ বাঁক, যেখানে পাহাড়ের পাথরগুলো জলের তোড়ে ক্ষয় হয়ে হয়ে বিচিত্র আকার ধারণ করেছে। জল সেখানে পাথরে ধাক্কা খেয়ে সাদা ফেনা তৈরি করছে, আর সেই শব্দের প্রতিধ্বনি পাহাড়ের গায়ে ধাক্কা খেয়ে বার বার ফিরে আসছে। ঠিক সেই মুহূর্তে, বাতাসের সেই প্রবল গর্জনের মধ্যেও একটা তীক্ষ্ণ কণ্ঠস্বর আমার কানে এসে বিঁধল।
“হেই! উপরে কে?”
শব্দটা এতটাই অতর্কিত ছিল যে আমি কিছুটা ভারসাম্য হারিয়ে ফেললাম। নিজেকে সামলে নিয়ে নিচে তাকালাম। কুয়াশার পাতলা আস্তরণ ভেদ করে নিচ তলায় যা দেখলাম, তাতে আমার শিরদাঁড়া দিয়ে একটা হিমশীতল স্রোত বয়ে গেল। প্রায় পাঁচশ ফুট নিচে, গঙ্গার সেই বিপজ্জনক বাঁকের কাছে একটি ছোট, জীর্ণ কাঠের নৌকা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে। নৌকার ওপর একজন মানুষ। তার পরনে তামাটে রঙের লম্বা এক আলখাল্লা, মাথায় উস্কোখুস্কো জট পাকানো চুল।
সবচেয়ে অদ্ভুত ছিল তার হাতের ভঙ্গি। তার বাম হাতে একটি দীর্ঘ বাঁশের লগি, যার মাথায় একটি গাঢ় লাল রঙের চওড়া কাপড় শক্ত করে পেঁচানো। লগিটি সে আকাশের দিকে সোজা তুলে ধরেছে, যেন সে ওপরের কাউকে কোনো চরম বিপদের সংকেত দিচ্ছে। কিন্তু তার চোখ আমার দিকে ছিল না। সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল নদীর মাঝখানের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ঘূর্ণির দিকে, যেখানে জল অদ্ভুতভাবে নীল থেকে মিশমিশে কালো হয়ে যাচ্ছে। নদীর ধারের বাতাস তখন এতটাই উন্মাতাল যে মনে হচ্ছিল আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস গঙ্গা শুষে নিচ্ছে।
আমি দুই হাত চুঙির মতো করে মুখে লাগিয়ে চিৎকার করে উত্তর দিলাম, “আমি একজন পরিব্রাজক! পাহাড়ের ওপর থেকে পথ হারিয়েছি! নিচে নামার কোনো চেনা পথ আছে কি?”
লোকটি নড়ল না। তার দেহভঙ্গি ছিল কোনো প্রাচীন প্রস্তর মূর্তির মতো অনড়। সে আমার উত্তরের কোনো পাত্তাই দিল না। তার সেই রহস্যময় নীরবতা আমাকে যেন আরও বেশি আকর্ষিত করল। মনে হলো, এই মানুষটির কাছে এমন কোনো গোপন খবর আছে যা এই নির্জন পাহাড় আর নদী ছাড়া আর কেউ জানে না। পাহাড়ের গায়ে একটি প্রাচীন, খসখসে পথ আমার চোখে পড়ল। এটি নামমাত্র পথ; পাথরগুলো এবড়োখেবড়ো, আর্দ্র কাদা আর শ্যাওলায় ঢাকা। স্থানীয় কিংবদন্তি অনুযায়ী, কয়েকশ বছর আগে বৌদ্ধ সন্ন্যাসীরা এই পথটি তৈরি করেছিলেন ধ্যানমগ্ন হওয়ার জন্য।
আমি নামতে শুরু করলাম। প্রতিটি ধাপ ছিল জীবনের এক একটি পরীক্ষা। ডানপাশে খাড়া পাহাড়ের দেয়াল আর বামপাশে অতল খাদ। কুয়াশার কারণে পায়ের তলার পাথরগুলো দেখা যাচ্ছিল না। নামার সময় মনে হচ্ছিল, বাতাস যেন এক অদৃশ্য হাত দিয়ে আমাকে পেছন থেকে ধাক্কা দিয়ে নিচে ফেলে দিতে চাইছে। পাথরের ফাঁক দিয়ে যখনই নিচে তাকাচ্ছিলাম, দেখছিলাম সেই লাল নিশানটি বাতাসের তোড়ে পতপত করে উড়ছে। ওই লাল রঙটা যেন এই ধূসর আর কালো পাহাড়ের বুকে এক ফোঁটা তাজা রক্ত।
পথের মাঝপথে আমি একবার থামলাম। আমার ফুসফুস তখন অক্সিজেনের অভাবে হাপরের মতো ওঠানামা করছে। পাহাড়ের সেই খাঁজে বসে আমি আবার লোকটিকে দেখলাম। এখন সে নৌকা থেকে নেমে তীরের বালিতে দাঁড়িয়েছে। তার হাতের সেই লাল লগিটি এখন বালিতে পোঁতা। সে দুই হাত দিয়ে নিজের মুখ ঢেকে রেখেছে, যেন সে এমন কিছু দেখছে যা দেখার সাহস তার নেই। তার এই অস্বাভাবিক ভঙ্গি আমাকে বিচলিত করল। আমি কি কোনো পাগলের পাল্লায় পড়লাম? নাকি এই নির্জন উপত্যকায় কোনো অলৌকিক নাটকের মঞ্চায়ন হচ্ছে?
পাথরগুলো এতটাই পিচ্ছিল ছিল যে কয়েকবার আমি আছাড় খেতে খেতে বাঁচলাম। হাতের নখ দিয়ে পাহাড়ের গায়ে জন্মানো ঘাস আর লতা আঁকড়ে ধরে আমি যখন অবশেষে নদীর সমতলে পা রাখলাম, তখন আমার পরনের কাপড় ছিঁড়ে গেছে, হাত-পা ছড়ে গিয়ে রক্ত বের হচ্ছে। কিন্তু সেদিকে আমার খেয়াল ছিল না। আমার সমস্ত মনোযোগ তখন সেই মানুষটির দিকে।
নিচে পৌঁছানোর পর গঙ্গার রূপ ওপরের চেয়েও ভয়াবহ মনে হলো। ঢেউগুলোর গর্জন এখানে বজ্রপাতের মতো শোনায়। পাহাড়ের দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে সেই শব্দ বহুগুণ বেড়ে যায়। নদীর পাড়ে কোনো জনমানুষ নেই, কোনো পাখির ডাক নেই। কেবল আছে জলের অবিরাম হাহাকার।
রঘুনাথ—পরে জেনেছিলাম তার নাম—ধীরে ধীরে আমার দিকে ফিরে তাকাল। তার মুখখানা যেন আগ্নেয়গিরির লাভার মতো পোড়া মাটির রঙে রাঙানো। গভীর বলিরেখা তার কপালে ইতিহাসের মতো আঁকা। তার চোখের মণি দুটো ঘোলাটে, কিন্তু তার ভেতরে একটা তীব্র জ্বালা লুকিয়ে আছে। সে আমার দিকে কয়েক কদম এগিয়ে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে এক ধরনের আভিজাত্য ছিল, যা কোনো সাধারণ মাঝির থাকার কথা নয়।
“সাহেব, আপনি কি মরণকে ভয় পান না?” তার প্রথম প্রশ্নটিই আমাকে স্তব্ধ করে দিল। তার কণ্ঠে এক ধরনের ধাতব শীতলতা ছিল, যা পাহাড়ের এই বরফঠাণ্ডা হাওয়ার চেয়েও ধারালো।
আমি কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে বললাম, “আমি শুধু একজন ভ্রমণকারী। ওপর থেকে আপনাকে দেখে কৌতূহল সামলাতে পারলাম না। আপনার হাতের ওই লাল কাপড়টা কিসের প্রতীক? এখানে কি কোনো বিপদ আছে?”
সে হাসল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক গভীর ক্লান্তি। সে তার হাতের সেই লাল লগিটা বালি থেকে উপড়ে নিল। কাপড়ের প্রান্তটা বাতাসে দুলতে লাগল। “বিপদ?” সে আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল। “বিপদ তো আমাদের রক্তে সাহেব। গঙ্গার এই বাঁকটা হলো মহাকালের মুখ। এখানে জল যখন ঘোরে, তখন সে একা ঘোরে না, সাথে নিয়ে ঘোরে শত শত অপার্থিব আত্মা। আমার সাত পুরুষ এই ঘাটে সংকেত দেওয়ার কাজ করেছে। এই লাল কাপড়টা কেবল মাঝিদের জন্য নয়, এটা তাদের জন্য যারা এই নদী থেকে আর কখনো ফিরে আসেনি।”
সে আমাকে ইশারা করল তার ছোট গুহার মতো কুটিরে যাওয়ার জন্য। পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা সেই কুটিরের ভেতর তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। শুধু এক কোণে একটি ছোট মাটির প্রদীপ টিমটিম করে জ্বলছে। সেই আলোয় দেখলাম ঘরের একপাশে একটি বিশাল লোহার ঘণ্টা ঝুলছে, যা মরিচায় ঢাকা। মেঝের ওপর পড়ে আছে কিছু পুরনো পাণ্ডুলিপি আর ডায়েরি।
আমি গুহার ভেতরে ঢুকতেই এক ধরনের ভিজে মাটির আর পচা ফুলের গন্ধ আমার নাকে এল। মনে হলো আমি কোনো মানুষের ঘরে নয়, বরং কোনো প্রাচীন সমাধির ভেতর ঢুকে পড়েছি। রঘুনাথ প্রদীপের আলোটা একটু বাড়িয়ে দিল। তার ছায়া গুহার দেয়ালে বিশাল এক দৈত্যের মতো ফুটে উঠল।
“বসুন সাহেব,” সে মাটির মেঝেতে একটা পুরনো চট দেখিয়ে বলল। “গঙ্গার তীরে রাত কাটানো অত সহজ নয়। আজ রাতে আপনি যা শুনবেন বা দেখবেন, তা হয়তো আপনার বাকি জীবনের ঘুম কেড়ে নেবে। কিন্তু যেহেতু আপনি নিজের পায়ে হেঁটে এই মরণফাঁদে পা দিয়েছেন, তাই সত্যটুকু জেনে যাওয়াই ভালো।”
আমি চুপচাপ বসে রইলাম। বাইরে গঙ্গার গর্জন তখন আরও তীব্র হয়েছে। মনে হচ্ছে নদী যেন পাহাড়ের দেয়ালগুলো ভেঙে ফেলার চেষ্টা করছে। রঘুনাথ তার ডায়েরিটা কোলের ওপর রাখল। প্রদীপের কাঁপা কাঁপা আলোয় তার মুখটা রহস্যময় দেখাচ্ছিল। আমি জানতাম, এই অন্ধকার গুহার ভেতরে আজ এক নতুন পৃথিবীর দ্বার খুলতে যাচ্ছে।
গুহার ভেতরে প্রদীপের শিখাটা অস্থিরভাবে কাঁপছিল, যেন বাইরের উন্মত্ত বাতাস পাথরের দেয়াল ভেদ করে ভেতরে ঢোকার পথ খুঁজছে। রঘুনাথ তার কোলের ওপর রাখা জীর্ণ ডায়েরিটার ওপর হাত রাখল। ডায়েরির মলাটটা পশুর চামড়ায় তৈরি, যা সময়ের আবর্তে কুঁচকে গিয়ে কালচে বর্ণ ধারণ করেছে। গুহার স্যাঁতসেঁতে পরিবেশে এক ধরনের প্রাচীন গন্ধ—পুরনো কাগজ আর পচা ধূপের সংমিশ্রণ—আমার নাকে আসছিল।
রঘুনাথ প্রদীপের আলোটা আরও একটু কাছে টেনে নিল। তার আঙুলগুলো ডায়েরির পাতায় বিচরণ করছিল যেন সে কোনো পবিত্র ধর্মগ্রন্থ স্পর্শ করছে।
“সাহেব,” সে শুরু করল, তার কণ্ঠস্বর এখন গুহার দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে দ্বিগুণ গভীর শোনাচ্ছে, “এই ডায়েরিটা আমার ঠাকুরদার আমলের। এতে এই ঘাটের প্রতিটি বড় দুর্ঘটনার হিসাব লেখা আছে। কিন্তু আপনি কি জানেন, দুর্ঘটনার চেয়েও ভয়ঙ্কর হলো তার পূর্বাভাস? গঙ্গা মা যখন কাউকে নিজের পেটে টানেন, তার আগে তিনি সবসময় একটা সংকেত পাঠান। কিন্তু সেই সংকেত বোঝার ভাগ্য—বা দুর্ভাগ্য—সবার হয় না।”
সে ডায়েরির একটি পাতা উল্টাল। পাতাজুড়ে অদ্ভুত সব নকশা আর তারিখ লেখা। ১৯৩০ সাল, ১৫ই আগস্ট। পেন্সিলে আঁকা একটি ছবি—একটি বিশাল পালতোলা নৌকা জলের ঘূর্ণিতে তলিয়ে যাচ্ছে, আর পাড়ে দাঁড়িয়ে একজন মানুষ হাত তুলে চিৎকার করছে।
“এটা দেখুন,” রঘুনাথ পেন্সিলের স্কেচটার ওপর আঙুল রাখল। “আমার বাবা তখন ছোট। আমার ঠাকুরদা তখন এই ঘাটের সংকেতদাতা। সেই রাতে আকাশ পরিষ্কার ছিল, কোনো ঝড় ছিল না। কিন্তু মাঝরাত্রিতে ঠাকুরদা হঠাৎ দেখলেন নদীর ঠিক মাঝখানে, যেখানে স্রোত সবচেয়ে বেশি, সেখানে একটা লাল লণ্ঠন জ্বলছে। তিনি ভাবলেন কোনো নৌকা বিপদে পড়েছে। কিন্তু কাছে গিয়ে দেখলেন, সেখানে কোনো নৌকা নেই। শুধু শূন্য বাতাসে একটা লণ্ঠন ঝুলছে, আর তার নিচে একটা ছায়ামূর্তি। সেই মূর্তিটি এক হাত দিয়ে নিজের চোখ ঢেকে রেখেছিল, আর অন্য হাত দিয়ে পাগলের মতো ইশারা করছিল দূরে সরে যাওয়ার জন্য।”
আমি রঘুনাথের চোখের দিকে তাকালাম। সেখানে কোনো মিথ্যে বলার লেশমাত্র নেই। সে এক অদ্ভুত ঘোরের মধ্যে কথা বলছে।
“পরদিন সকালে,” রঘুনাথ বলতে লাগল, “কাশী থেকে আসা এক বিশাল বজরা ঠিক ওই জায়গাতেই কোনো অদৃশ্য পাথরে ধাক্কা খেয়ে চুরমার হয়ে যায়। আশি জন যাত্রী ছিল তাতে। তাদের হাহাকার আজও এই পাহাড়ের গায়ে কান পাতলে শোনা যায় সাহেব। ঠাকুরদা সেই দৃশ্য দেখার পর পাগল হয়ে গিয়েছিলেন। তিনি সারারাত চিৎকার করতেন—‘কেন আমি তাদের বাঁচাতে পারলাম না? কেন সে আমার সংকেত শুনল না?’”
বাইরে গঙ্গার গর্জন হঠাৎ বেড়ে গেল। মনে হলো নদী যেন গুহার দেয়ালে সজোরে চড় মারছে। রঘুনাথ ডায়েরিটা বন্ধ করে আমার দিকে ঝুঁকে এল। তার চোখ দুটো এখন প্রদীপের আলোয় জ্বলছে।
“এখন আসল কথা শুনুন। গত এক মাস ধরে, প্রতি রাতে ঠিক ১২টার সময়, আমি সেই একই ছায়ামূর্তিকে দেখছি। সে ঠিক ওখানেই দাঁড়ায় যেখানে আমি নৌকা নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। তার হাতে একটা রক্তিম নিশান থাকে, ঠিক আমার লগির মতো। সে উন্মত্তের মতো নিশানটা দোলায় আর এক হাত দিয়ে নিজের চোখ ঢেকে রাখে। সে চিৎকার করে বলে—‘সাবধান! সাবধান! ভগবানের দোহাই, পথ খালি করো!’”
রঘুনাথের হাত কাঁপছিল। সে আমার একটা হাত খপ করে ধরে ফেলল। তার হাতের তালু বরফের মতো ঠাণ্ডা।
“সাহেব, আমি যখন প্রথমবার তাকে দেখলাম, আমি ভাবলাম আমার চোখের ভুল। কিন্তু পরের দিন ভোরে আমি খবর পেলাম, ওপরের পাহাড়ে ধস নেমে চারজন তীর্থযাত্রী গঙ্গায় ভেসে গেছেন। দ্বিতীয়বার যখন তাকে দেখলাম, তার কয়েক ঘণ্টা পরেই একটা মালবাহী নৌকা চরে আটকে ভেঙে গেল। আজ রাতে... আজ রাতে আমি তাকে আবার দেখেছি। তার মানে বড় কোনো বিপদ আসছে। এমন কোনো প্রলয় যা আমি আটকাতে পারব না।”
আমি নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে বললাম, “রঘুনাথ, আপনি হয়তো এই নির্জনতায় থেকে থেকে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। এই নির্জন উপত্যকা, একাকীত্ব আর গঙ্গার এই কর্কশ শব্দ যে কারো মাথায় ভ্রম তৈরি করতে পারে। বিজ্ঞান বলে এগুলো চোখের ভুল, আলোর প্রতিসরণ মাত্র।”
রঘুনাথ এক করুণ হাসি হাসল। “বিজ্ঞান? বিজ্ঞান কি জানে সাহেব এই পাথরের নিচে কত প্রাণ গুমরে মরছে? বিজ্ঞান কি শুনতে পায় সেই বিদেহী আত্মার আর্তনাদ? আপনি যদি বিজ্ঞান বিশ্বাস করেন, তবে আজ রাতটা আমার সাথে এই গুহার বাইরে কাটান। আজ পূর্ণিমা নয়, কিন্তু আজ গঙ্গার জল কালোর চেয়েও কালো হয়ে গেছে। আজ রাতে সে আবার আসবে।”
আমি স্থির করলাম, আজ আমি এর শেষ দেখে ছাড়ব। হয়তো রঘুনাথকে সুস্থ করার জন্য এটাই একমাত্র পথ—তাকে দেখানো যে বাইরে কিছুই নেই।
আমরা গুহা থেকে বেরিয়ে এলাম। বাইরে তখন ঘুটঘুটে অন্ধকার। গঙ্গার ওপর দিয়ে বয়ে আসা হাওয়া আমাদের হাড় পর্যন্ত কাঁপিয়ে দিচ্ছে। রঘুনাথ সেই বালিতে পোঁতা লাল লগিটা তুলে নিল। তার পাশে দাঁড়িয়ে আমি দিগন্তের দিকে তাকালাম। কুয়াশা এতটাই ঘন যে নদীর ওপার দেখা যাচ্ছে না। শুধু জলের অবিরাম হাহাকার আর বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ।
হঠাৎ, পাহাড়ের কোণে রাখা সেই পুরনো লোহার ঘণ্টাটি নিজে থেকেই বেজে উঠল। টিং... টিং... টিং...
মরিচাপড়া সেই ঘণ্টার আওয়াজ এই নিস্তব্ধতায় কামানের গোলার মতো ফাটল। কোনো বাতাস ছিল না, কেউ তাকে স্পর্শ করেনি, কিন্তু ঘণ্টাটি দুলছে। রঘুনাথ থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। সে লড়িটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে গঙ্গার সেই কালো জলের দিকে আঙুল বাড়াল।
“দেখুন সাহেব! দেখুন! সে এসে গেছে!”
আমি চোখ কচলে নদীর মাঝখানের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন ঘন অন্ধকারে তাকালাম। প্রথমে কিছুই দেখতে পেলাম না। কিন্তু ধীরে ধীরে, কুয়াশা ভেদ করে একটা ঝাপসা অবয়ব ফুটে উঠতে লাগল। কুয়াশার আস্তরণ চিরে একটা রক্তিম আভা জ্বলে উঠল। হ্যাঁ, আমি ভুল দেখছি না! নদীর ঠিক মাঝখানে, যেখানে প্রবল ঘূর্ণি জলকে পেঁচিয়ে ধরছে, সেখানে একটা দীর্ঘ ছায়ামূর্তি দাঁড়িয়ে। তার পরনে তামাটে রঙের আলখাল্লা, অবিকল রঘুনাথের মতো। তার হাতে একটা লাল নিশান বাতাসের বিপরীতে পাগলের মতো উড়ছে।
সবচেয়ে ভয়াবহ ছিল সেই শব্দ। বাতাসের শব্দের ওপর দিয়ে একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এল, যা কোনো মানুষের হতে পারে না—সেটা যেন হাজার হাজার মানুষের হাহাকারের সম্মিলিত রূপ। “সাবধান! নিচে ওখানে! সাবধান! ভগবানের দোহাই, পথ খালি করো!”
মূর্তিটি তার বাম হাত দিয়ে নিজের চোখ দুটো চেপে ধরে আছে, যেন সে এমন কোনো বিভীষিকা দেখছে যা অবর্ণনীয়। সেই দৃশ্য দেখে আমার শরীরের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। আমি চিৎকার করতে চাইলাম, কিন্তু আমার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। আমি এক পা পিছিয়ে গেলাম, কিন্তু আমার পা বালিতে আটকে গেল।
হঠাৎ এক ঝলক প্রবল বাতাস ধুলো আর বালু উড়িয়ে আমাদের চারপাশটা আচ্ছন্ন করে ফেলল। যখন সেই ঝাপসা ভাবটা কাটল, দেখলাম নদীর মাঝখানটা জনশূন্য। কেউ নেই সেখানে। কেবল গঙ্গার ঢেউগুলো আগের মতোই উন্মত্তের মতো বয়ে যাচ্ছে।
রঘুনাথ ধপ করে বালির ওপর বসে পড়ল। তার মুখটা ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। সে ফিসফিস করে বলল, “এটা তৃতীয়বার সাহেব। এবার আর রক্ষা নেই। এবার সে কার জন্য এসেছে? আমার জন্য? নাকি আপনার জন্য? নাকি অন্য কারো জন্য যা আমরা জানি না?”
আমি স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। বিজ্ঞানের সব যুক্তি আমার মাথা থেকে ধুয়ে মুছে গেছে। আমি নিজের চোখে যা দেখলাম, তা অস্বীকার করার কোনো পথ নেই। রঘুনাথের সেই বিষণ্ণ মুখ আর নদীর মাঝখানের সেই ভৌতিক নিশান—সব মিলিয়ে আমার মনে হলো আমি এক অনন্ত অন্ধকারের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছি।
রাত যত গভীর হতে লাগল, গঙ্গার গর্জন তত বেশি বাড়তে লাগল। রঘুনাথ বালির ওপর উপুড় হয়ে পড়ে বিড়বিড় করে প্রার্থনা করতে শুরু করল। আমি বুঝতে পারলাম, এই নির্জন উপত্যকায় আজ রাতে মহাকাল তার নিজের খেলা খেলতে শুরু করেছে।
গুহার বাইরে গঙ্গার সেই আদিম অন্ধকার যেন আমাদের গিলে খেতে আসছিল। দ্বিতীয়বার সেই ছায়ামূর্তিকে দেখার পর আমার শরীরের প্রতিটি শিরা-উপশিরা জমে বরফ হয়ে গিয়েছিল। রঘুনাথ বালির ওপর নিথর হয়ে বসে ছিল, তার দৃষ্টি অপলক—নদীর সেই কালচে ঘূর্ণির দিকে নিবদ্ধ। বাতাসের হাহাকার এখন আর কেবল শব্দ নয়, মনে হচ্ছিল তা কোনো যন্ত্রণাতর মানুষের দীর্ঘশ্বাস।
“সাহেব,” রঘুনাথের কণ্ঠস্বর জীর্ণ কাগজের শব্দের মতো খসখসে শোনাল, “সে চলে গেছে। কিন্তু সে তার কাজ করে দিয়ে গেছে। তৃতীয়বার দেখা দেওয়ার অর্থ হলো—হিসাব চুকিয়ে ফেলা। আজ রাত শেষ হওয়ার আগেই গঙ্গা মা তার প্রাপ্য বুঝে নেবেন।”
আমি কাঁপতে কাঁপতে কোনোমতে বললাম, “রঘুনাথ, চলুন এখান থেকে পালাই। ওপরের পাহাড়ে আমার হোটেলে চলে যাই। এই জায়গাটা অভিশপ্ত, এখানে থাকা মানে মৃত্যুকে আমন্ত্রণ জানানো।”
রঘুনাথ এক অদ্ভুত করুণ হাসি হাসল। “পালিয়ে কোথায় যাবেন সাহেব? গঙ্গা মা যার নাম ধরে ডাকেন, সে হিমালয়ের চূড়ায় উঠলেও নিস্তার পায় না। আমার সাত পুরুষ এই মাটির সাথে মিশে আছে, আমি কোথায় যাব? আমার নিয়তি এই লাল নিশানেই লেখা।”
সে উঠে দাঁড়াল। তার চলনে এক ধরনের অদ্ভুত শান্ত ভাব দেখা দিল, যেন সে কোনো অনিবার্য সত্যকে মনে-প্রাণে গ্রহণ করে নিয়েছে। সে ধীর পায়ে গুহার ভেতর ঢুকল এবং সেই পুরনো ডায়েরিটা হাতে নিল। ডায়েরির শেষ পাতায় সে নিজের আঙুলের ডগা দিয়ে প্রদীপের কালি মাখিয়ে একটা চিহ্ন আঁকল—একটি ভাঙা নৌকার পাল আর একটি নিভে যাওয়া লণ্ঠন।
“এটা আমার শেষ চিহ্ন সাহেব,” সে ডায়েরিটা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল। “যদি কাল সকালে আমি না থাকি, তবে এটা ওপরের দুনিয়ায় নিয়ে যাবেন। মানুষকে বলবেন, গঙ্গার এই বাঁকে কেবল জল বয় না, এখানে সময় আর মৃত্যু হাত ধরাধরি করে হাঁটে।”
রাত তখন প্রায় শেষ। পুবের আকাশে কালচে নীল আভা ফুটে উঠছে, কিন্তু কুয়াশা কমেনি বরং আরও ঘন হয়ে পাহাড়ের গা বেয়ে নিচে নেমে এসেছে। দৃশ্যমানতা এখন শূন্যের কোঠায়। রঘুনাথ তার সেই দীর্ঘ বাঁশের লগিটা হাতে নিল। লাল কাপড়টা কুয়াশায় ভিজে ভারী হয়ে ঝুলে আছে।
হঠাৎ, পাহাড়ের ওপর থেকে একটা অদ্ভুত শব্দ ভেসে এল। সেটা কোনো বাতাসের শব্দ নয়। একটা যান্ত্রিক গর্জন। কোনো বিশাল স্টিমার বা মালবাহী জাহাজ পাহাড়ের কোল ঘেঁষে নদীর বাঁক দিয়ে এগিয়ে আসছে। ইঞ্জিনের ধকধক শব্দ প্রতিধ্বনিত হয়ে পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে এক ভয়াবহ তান্ডব তৈরি করল।
রঘুনাথ বিদ্যুৎবেগে নদীর পাড়ে দৌড়ে গেল। “সাহেব! কুয়াশা খুব ঘন! ওরা পাথরটা দেখতে পাবে না! ওদের ফেরাতে হবে!”
সে উন্মাদের মতো সেই ভিজে লাল নিশানটা মাথার ওপর ঘোরাতে শুরু করল। কুয়াশার দেয়াল ভেদ করে স্টিমারের সার্চলাইটের একটা তীব্র সাদা আলো রঘুনাথের ওপর আছড়ে পড়ল। আমি ওপরের পাহাড়ের রাস্তায় দাঁড়িয়ে সব দেখতে পাচ্ছিলাম। স্টিমারটি প্রচণ্ড গতিতে সেই বিপজ্জনক বাঁকের দিকে ধেয়ে আসছে।
আমি চিৎকার করলাম, “রঘুনাথ! সরে আসো! ওটা থামবে না! ওটা তোমার দিকেই আসছে!”
কিন্তু রঘুনাথ নড়ল না। সে যেন পাথরের মতো জমে গেছে। সে তার বাম হাত দিয়ে নিজের চোখ দুটো ঢেকে ফেলল—ঠিক সেই ছায়ামূর্তিটির মতো। আর ডান হাত দিয়ে সেই লাল নিশানটি পাগলের মতো দোলাতে লাগল। তার কণ্ঠস্বর ইঞ্জিনের গর্জনের ওপর দিয়ে ফেটে পড়ল—“সাবধান! নিচে ওখানে! সাবধান! ভগবানের দোহাই, পথ খালি করো!”
সবকিছু ঘটল চোখের পলকে। স্টিমারটি যখন বাঁক নিতে গেল, তার বিশাল লোহার কাঠামোটি সজোরে তীরের পাথরে ধাক্কা খেল। এক প্রচণ্ড শব্দে পাহাড় কেঁপে উঠল। স্টিমারের বিশাল হালটি ঝড়ের বেগে রঘুনাথের ওপর আছড়ে পড়ল।
আমি উন্মাদের মতো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নিচে নেমে এলাম। পাথরে হাত-পা ছড়ে একাকার, কিন্তু আমার কোনো বোধ ছিল না। যখন আমি সেই লাল লণ্ঠনের খুঁটির কাছে পৌঁছালাম, দেখলাম চারিদিক নিস্তব্ধ। কুয়াশা ধীরে ধীরে কাটতে শুরু করেছে। স্টিমারটি নদীর মাঝখানে থেমে আছে, তার সার্চলাইটের আলো এখনো কাঁপছে।
রঘুনাথের নিথর দেহটি সেই লাল নিশানে জড়িয়ে বালির ওপর পড়ে আছে। তার মুখখানা অদ্ভুত শান্ত, যেন কোনো দীর্ঘ যুদ্ধ শেষে সে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তার চোখ দুটো খোলা, কিন্তু সেই আতঙ্কের রেশ আর নেই—সেখানে কেবল এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
স্টিমারের চালক, এক বিশালদেহী মানুষ, কাঁপতে কাঁপতে নৌকা নিয়ে তীরের কাছে এল। তার মুখ ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে। সে আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরল।
“সাহেব! আমি ওকে মারতে চাইনি!” সে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। “আমি কুয়াশার ভেতর থেকে চিৎকার করছিলাম—‘সাবধান! নিচে ওখানে! সাবধান! ভগবানের দোহাই, পথ খালি করো!’ কিন্তু ও সরল না কেন? ও কেন ঠিক ওভাবেই দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিল যেন ও আগে থেকেই জানত আমি আসছি? ওর এক হাত কেন চোখের ওপর চাপা দেওয়া ছিল? ও কি পাগল ছিল সাহেব?”
আমি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার কানে তখনও রঘুনাথের বলা সেই কথাগুলো বাজছে। সে কোনো ভুত দেখেনি, সে কোনো বিভ্রম দেখেনি। সে আসলে গত এক মাস ধরে নিজেরই অপঘাত মৃত্যুর ছায়া দেখে আসছিল। গঙ্গা মা তাকে সতর্ক করেছিলেন, কিন্তু সেই সতর্কবার্তাই ছিল তার অমোঘ নিয়তি। রঘুনাথ নিজেকে বাঁচাতে পারত না, কারণ সে নিজেই ছিল সেই সংকেতদাতা—যে অন্যের পথ পরিষ্কার করতে গিয়ে নিজের পথ হারিয়ে ফেলেছে।
সূর্য যখন পাহাড়ের চূড়ায় উঁকি দিল, গঙ্গার জল তখন রঘুনাথের বুকের রক্ত মেখে লাল হয়ে বয়ে যাচ্ছিল। আমি রঘুনাথের সেই ডায়েরিটা বুকের সাথে চেপে ধরলাম। পাহাড়ের সেই নির্জন বাঁকে এখনো বাতাসে কান পাতলে শোনা যায় এক করুণ প্রতিধ্বনি—“সাবধান!”
আমি যখন ধীরে ধীরে পাহাড়ের সেই পিচ্ছিল পথ ধরে ওপরে উঠে আসছিলাম, একবার পেছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম, সেই লাল নিশানটি অর্ধেক বালিতে পোঁতা, বাতাসের তোড়ে শেষবারের মতো পতপত করে কাঁপছে—যেন গঙ্গার এই অতল রহস্যের একমাত্র সাক্ষী হয়ে সে সেখানেই থেকে যাবে অনন্তকাল।
গঙ্গার সেই রক্তিম নিশান আর নেই, কিন্তু আজও যখন ঘন কুয়াশা নামে, মাঝিরা বলে তারা সেই লাল আলো দেখতে পায়। তারা বলে, রঘুনাথ আজও সেই ঘাটে দাঁড়িয়ে আছে—অন্যদের সাবধান করতে, যাতে আর কোনো পথিক এই মরণফাঁদে পা না দেয়।
রঘুনাথের নিথর দেহটি যখন বালির ওপর পড়ে ছিল, তখন পাহাড়ের খাঁজ দিয়ে ভোরের প্রথম আলো এসে পড়েছিল তার শান্ত মুখে। স্টিমার থেকে নেমে আসা চালক—যার নাম ছিল করিম চাচা—সে বালিতে হাঁটু গেড়ে বসে পড়েছিল। তার হাত কাঁপছিল, চোখে ছিল এক অবর্ণনীয় আতঙ্ক।
আমি তার পাশে গিয়ে বসলাম। করিম চাচা বিড়বিড় করে বলছিল, “সাহেব, আমি তো এই পথে বিশ বছর জাহাজ চালাই। কুয়াশায় আমার চোখ কখনো ধোঁকা খায়নি। কিন্তু আজ... আজ যা দেখলাম, তা কোনো জ্যান্ত মানুষের কাজ হতে পারে না।”
আমি তাকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম। করিম চাচা বলতে লাগল, “আমি যখন বাঁকটা নিচ্ছিলাম, তখন হঠাৎ কুয়াশার বুক চিরে একটা অদ্ভুত লাল আলো জ্বলে উঠল। মনে হলো কেউ একজন লণ্ঠন দোলাচ্ছে। কিন্তু সেই আলোর নিচে কোনো মানুষ ছিল না। ছিল একটা কালো ছায়া। আমি জাহাজের সাইরেন বাজালাম, চিৎকার করলাম—‘নিচে ওখানে! সাবধান! ভগবানের দোহাই, পথ খালি করো!’ কিন্তু সেই ছায়াটা নড়ল না। সে ঠিক ওভাবেই দাঁড়িয়ে হাত নাড়ছিল যেন সে আমাকে ডাকছে।”
আমি শিউরে উঠলাম। করিম চাচার বর্ণনা হুবহু রঘুনাথের দেখা সেই ‘ছায়ামূর্তি’র মতো। করিম চাচা আরও বলল, “যখন আমি রঘুনাথের একদম কাছাকাছি পৌঁছালাম, তখন দেখলাম সে তার বাম হাত দিয়ে নিজের চোখ দুটো ঢেকে রেখেছে। ঠিক যেন সে দেখতে চায় না জাহাজটা তাকে পিষে ফেলছে। আমি ব্রেক কষলাম, কিন্তু ওই পাথরের ঘূর্ণি আমাকে টেনে নিয়ে গেল ওর ওপর।”
আমি বুঝতে পারলাম, রঘুনাথ যে দৃশ্যটি এক মাস ধরে দেখে আসছিল, সেই একই দৃশ্য করিম চাচাও দেখেছে। তবে তফাৎ একটাই—রঘুনাথ দেখেছিল তার নিজের মৃত্যুকে, আর করিম চাচা দেখেছিল তার নিজের হাতের হওয়া একটি অবধারিত হত্যাকাণ্ডকে।
আমরা রঘুনাথের দেহটি তার সেই ছোট গুহায় নিয়ে গেলাম। গুহার ভেতরে সেই প্রদীপটি তখনো নিভু নিভু করে জ্বলছিল। টেবিলের ওপর রাখা ছিল সেই পুরনো ডায়েরি। করিম চাচা ডায়েরির পাতা উল্টাতে উল্টাতে হঠাৎ একটা পাতায় এসে থমকে গেল। সেখানে রঘুনাথ লিখে রেখেছিল—“আজ রাতে আমার উত্তরাধিকারী আসবে। সে আমার রক্ত দেখবে, কিন্তু আমার শব্দ শুনতে পাবে না।”
করিম চাচা কান্নায় ভেঙে পড়ল। সে বুঝতে পারল, রঘুনাথ আগে থেকেই জানত আজ কী হতে চলেছে। এই পাহাড়ে, এই নদীর বাঁকে সময় কোনো সরল রেখায় চলে না। এখানে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যৎ একাকার হয়ে গেছে।
রঘুনাথের মৃত্যুর পর বেশ কয়েকদিন কেটে গেছে। পুলিশ আর তদন্তকারীরা এসেছিল, তারা এটাকে একটা ‘দুর্ঘটনা’ বলে ফাইল বন্ধ করে দিয়েছে। কুয়াশা আর যান্ত্রিক ত্রুটিকে দায়ী করা হয়েছে। কিন্তু আমি জানি, সত্যটা ওই ফাইলের পাতায় নেই। সত্যটা আছে ওই ভিজে বালিতে আর পাহাড়ের সেই নির্জন গুহায়।
আমি রঘুনাথের সেই ডায়েরিটা সাথে করে শহরে নিয়ে এসেছিলাম। কিন্তু অদ্ভুত বিষয় হলো, ডায়েরির পাতাগুলো দিন দিন সাদা হয়ে যাচ্ছিল। যেন রঘুনাথের মৃত্যুর সাথে সাথে তার বংশের ইতিহাসও মুছে যেতে চাইছে।
এক মাস পর, আমি আবার সেই পাহাড়ে ফিরে গেলাম। এবার আর পথিক হিসেবে নয়, বরং এক অজানা টানে। পাহাড়ের চূড়ায় দাঁড়িয়ে নিচে তাকালাম। দেখলাম, সেই ছোট নৌকাটি এখনো সেখানেই বাধা আছে, তবে তা এখন জীর্ণ আর শ্যাওলায় ঢাকা। রঘুনাথের সেই কুটিরটি ধসে পড়েছে।
কিন্তু সবচেয়ে চমকে দেওয়ার মতো দৃশ্য দেখলাম সূর্যাস্তের সময়। কুয়াশার ভেতর দিয়ে আবার সেই লাল আলো জ্বলে উঠল। আমি ওপর থেকে পরিষ্কার দেখলাম—একজন মানুষ হাতে লাল নিশান নিয়ে নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে। সে ওপরের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করছে।
আমার বুকের ভেতর ধক করে উঠল। আমি কি ভুল দেখছি? নাকি রঘুনাথ আবার ফিরে এসেছে? আমি কান পাতলাম। বাতাসের শব্দে যেন আবার সেই পুরোনো কণ্ঠস্বর ভেসে এল—“হেই! উপরে কে?”
আমি বুঝতে পারলাম, রঘুনাথ মরে গিয়েও মরেনি। সে এখন এই পাহাড় আর গঙ্গার সেই বিপজ্জনক বাঁকের চিরস্থায়ী সংকেতদাতা হয়ে গেছে। সে এখন প্রতিটি পথিককে সাবধান করে দেয়, যাতে তারা সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি না করে।
আমি আর নিচে নামার সাহস পেলাম না। আমি শুধু ওপর থেকে রঘুনাথের সেই বিদেহী আত্মার উদ্দেশ্যে হাত নাড়লাম। গঙ্গার জল তখনো বয়ে যাচ্ছিল নিরবধি।
আমি আমার শহরে ফিরে এলাম, কিন্তু আমার মনের ভেতর এখনো সেই ঘণ্টার শব্দ বাজে—টিং... টিং... টিং...। যখনই কোনো কুয়াশাচ্ছন্ন রাত আসে, আমি জানালার বাইরে তাকিয়ে সেই লাল আলো খুঁজি। আমি জানি, রঘুনাথ এখনো সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। সে এখনো সেই মহাকালের পাহারাদার হিসেবে নিজের দায়িত্ব পালন করছে।
গঙ্গার সেই রক্তিম নিশান কখনো নিভবে না। এটি কেবল একটি মৃত্যু নয়, এটি একটি অনন্ত সতর্কবার্তা—যা মানুষকে মনে করিয়ে দেয় যে প্রকৃতির রহস্যের কাছে আমাদের বিজ্ঞান আর দম্ভ কতটা তুচ্ছ।