একটা সময় কোথায় যেন আটকে আছে বা একটা সময়কে আটকে রাখার তীব্র ইচ্ছাটা স্নেহাকে এখনো আত্মহননের পথে তেমন একটা উদ্বুদ্ধ করতে পারতেছে না বলে ওর মনে হইতেছে। ঘড়ির কাটা এখন রাত তিনটা সতের মিনিটের ঘরে। জেনেভা ক্যাম্প থেকে আসা পার্সেলটা ওর মস্তিষ্ককে পূর্ণ গুরুত্বের সঙ্গে সজাগ রাখার দায়িত্ব পালন করে যাইতেছে। গত দেড় মাসের অভিজ্ঞতা বলে, এই ধোঁয়ার জার্নিই আপাতত জাগতিক সকল যন্ত্রণার তীব্রতা আর যুক্তি-তর্ক থেকে ওকে আড়াল করে রাখতেছে। তা না হলে, ভেতর থেকে সম্পূর্ণ ফাঁকা আর অস্তিত্ব বিলীন হয়ে যাওয়া একটা মানুষ কোন যুক্তিতে বা কীসের জন্যই এত তীব্র হাহাকার নিয়েও বেঁচে থাকবে? ওর মনে প্রশ্ন জাগে!
প্রকৃতপক্ষে, আবিরের অনুপস্থিতি এই মুহূর্তে এক ভয়াবহ শূন্যতা সৃষ্টির পাশাপাশি স্নেহার জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে। ওদের দুইজনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার আগে এই অসীম শূন্যতার অনুভূতির সঙ্গে স্নেহার পরিচয় অথবা কোনো ধরনের সংযোগই কখনো ছিল না। আবির ছিল ওর প্যাটার্নাল ট্রান্সফারেন্স। আব্বা চলে যাওয়ার পর স্নেহার জীবনে যে বিশাল মানসিক শূন্যতা তৈরি হইছিল, অবচেতনভাবেই আবির ওই শূন্যতা পূরণে বিকল্প হয়ে ওঠছিল। গত দুই বছরে আবির হয়ে ওঠছিল স্নেহার পুরা পৃথিবী। ওকে ঘিরে তৈরি হওয়া ওই পৃথিবীটা এখন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। স্নেহার পুরা পৃথিবীটাই এখন ফাঁকা আর বীভৎস রকমের শূন্য। ওর ভেতর-বাহির, পুরাটাই এখন এক জনশূন্য মরুভূমি। ও এখন কেবল এক অস্তিত্বহীন সত্তা। সমস্ত প্রস্তুতি নিয়ে যে চূড়ান্ত বিদায়ের প্রতীক্ষায় স্থির বসে আছে!
আব্বার প্রতি তীব্র ভালোবাসা প্রায় সহজাত প্রবৃত্তিতেই কখন যেন আবিরের মাঝে স্নেহা প্রতিস্থাপন করে ফেলে! এই ট্রানজিশনটা যে খুব কনসাশলি অথবা পরিকল্পিতভাবে হইছে, স্নেহার তা মনে হয় না। কন্যাসন্তানের বাবা হওয়ার কারণে আবিরের অনেক আচরণেই স্নেহা আব্বার প্রতিচ্ছবি দেখতে পারতো। আবিরের ওই মায়াভরা আচরণগুলাই অবচেতনে ‘প্যাটার্নাল ট্রান্সফার’-এর গ্রাউন্ড তৈরি করছিল। স্নেহা জানে, এই পৃথিবীতে একমাত্র আব্বাই ওকে আনকন্ডিশনালি ভালোবাসতেন। অন্য কেউ কোনোদিন আব্বার মমতার ধারের কাছেও আসতে পারে নাই। হয়তো আব্বা ছাড়া ওকে কেউ আসলে কোনোদিন ভালোই বাসে নাই। স্নেহার খুব আব্বাকে মনে পড়ে এখন। দুনিয়ায় ও যত যাই করুক, আব্বার কাছে গেলে একটা ছায়াশীতল আশ্রয় মিলতো।
আব্বার ক্যান্সারটা ধরা পড়তে অনেক বেশি দেরি হয়ে গেছিল। ২০২২ সালে এনজিওর একটা প্রজেক্টের কাজে প্রায় এক মাস আব্বা রামু-উখিয়ায় ছিলেন। তখন থেকেই জ্বর-কাশিটা থাকলেও সিজনাল ফ্লু ভেবে সে ইগনোর করতেছিলেন। কিন্তু ঢাকায় ফেরার পর তার শরীর খুব দ্রুতই খারাপ হতে থাকে। কাশির সঙ্গে প্রথম যেদিন রক্ত পড়লো, ওইদিনই মূলত বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নিয়ে উনি ডাক্তারের কাছে গেলেন। নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর টিবি হইছে ভেবে প্রায় এক মাস তার ভুল ট্রিটমেন্ট চললো। অবস্থার উন্নতি তো হয়ই নাই, উল্টা কাশির সঙ্গে ব্লাড আসাটা কনস্ট্যান্ট হয়ে গেল। এর পরই আব্বা একটা সেকেন্ড ওপিনিয়নের জন্য গেলেন আরেক ডাক্তারের কাছে।
ওখানেই প্রথম লাং ক্যান্সারের সন্দেহ করা হয়। কিন্তু এই দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার লুপহোলে পড়ে আব্বা আবারও ভুল ট্রিটমেন্টের শিকার হন। আনোয়ারা ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বায়োপসি রিপোর্টে ক্যান্সারের কোনো আলামতই ধরা পড়লো না। আরো পনেরো দিন টিবির ট্রিটমেন্ট চলা কালে আব্বার কন্ডিশন সিভিয়ারলি ডিটেরিওরেট করে। সিদ্ধান্ত হয় বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে আবারও আব্বার বায়োপসি আর পেট স্ক্যান করা হবে। প্রায় দুই মাস ভুল ট্রিটমেন্টের পর স্পেশালাইজড হাসপাতালের রিপোর্টে আব্বার লাং ক্যান্সার ধরা পড়ে, তাও লাস্ট স্টেজে। দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার ওপর চরম বিতৃষ্ণা নিয়ে আব্বাকে এক সপ্তাহের মধ্যেই কলকাতার টাটা মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হলো।
এপ্রিল ২০২২ থেকে জানুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত অসংখ্য কেমো আর ইমিউনোথেরাপির ধকল আব্বা একজন রিয়েল ফাইটারের মতো সহ্য করে গেছেন। কিন্তু জানুয়ারি ২০২৪-এ হঠাৎই স্ট্রোক করার পর নিজের অদম্য লড়াই করার শক্তিটা আব্বা হারাতে থাকেন। ক্যান্সার ততদিনে তার শরীরের প্রতিটা ভাইটাল অর্গান একে একে কাবু করে ফেলে। ব্রেনে ছড়িয়ে পড়ার পর আব্বার টোটাল ফিজিক্যাল সিস্টেম কোলাপ্স করলো। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানেই সব ভুলতে থাকলেন উনি, এমনকি স্নেহার নামটাও তার স্মৃতি থেকে ব্লার হয়ে গেল।
আব্বা চলে গেলেন ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪। ভাগ্যের কী বীভৎস পরিহাস! এর মাত্র তিন দিন পরই স্নেহার জন্মদিন! নিজের জন্মের মাসে আব্বা ওর জন্য একটা পারমানেন্ট ট্র্যাজেডি বানিয়ে দিয়ে চলে গেলেন। এই মাস ওর জন্য শোকের এক অনিবার্য লিগ্যাসিও হয়ে থাকলো। এরপর থেকে জন্মদিনের কোনো অস্তিত্বই স্নেহার কাছে আর নাই।
কী অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করে যে আব্বা চলে গেলেন। ক্যান্সারের শারীরিক যন্ত্রণা কতটা ডিভাস্টেটিং, চব্বিশ ঘণ্টা ক্যান্সারে আক্রান্ত কোনো রোগীর পাশে না থাকলে এই পৃথিবীর কারো পক্ষেই কোনোদিন তা বোঝা সম্ভব না। এই মধ্যরাতে আব্বার ওই অসহনীয় যন্ত্রণার চিত্রগুলা স্নেহার মনে পড়লো। ও কাছে গেলে শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়েও আব্বা মুখে একটা হাসি আনার চেষ্টা করে বলতেন- সব ঠিক আছে। কিন্তু স্নেহা ঠিকই বুঝতো, কিছুই ঠিক নাই। কিছুই আর ঠিক হবে না কোনোদিন।
আব্বার মৃত্যু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে স্নেহার দায়িত্ববোধের বয়সকে এক ধাক্কায় বাড়িয়ে দেয়। বাবার জন্য কাঁদা বা চুপচাপ কোথাও দাঁড়িয়ে শোক পালন করার মতো সময় বা সুযোগ কোনোটাই ওর হয় না। ২৪ তারিখ সকাল থেকেই আব্বার শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রনা শুরু হয়। এর দিন চারেক আগে থেকেই উনি খাওয়া-দাওয়াও পুরাপুরি বন্ধ করে দিছিলেন। এর ৩ দিন আগে ২১ ফেব্রুয়ারি, কোনো ট্রিটমেন্ট নেওয়ার মতো ফিজিক্যাল কন্ডিশনে আব্বা আর নাই জানিয়ে টাটা মেডিকেল সেন্টারের অনকোলজিস্ট ডাঃ অর্ণব ভট্টাচার্য আব্বাকে ঢাকায় ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।
স্নেহা তখনই বুঝে ফেলে- বিদায় আসন্ন, খুব বেশি সময় আর হাতে নাই হয়তো। কিন্তু এই চরম সত্যটা জানা আর মেনে নেওয়ার মধ্যে বিরাট ফারাক আছে। ওই সত্যটা মেনে নেওয়া ছিল ওর জীবনের সবচেয়ে বড় ট্রমা। ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুর সাড়ে ১২টার ফ্লাইটে আব্বাকে নিয়ে ও ঢাকায় ফেরে। মাঝে শুধু ২২ আর ২৩- এই দুইটা দিনই আব্বা ছিলেন। ২৩ তারিখ রাতে স্নেহা কাছে গেলে আব্বা তার পাশে রাখা বালিশটা দেখিয়ে ওকে ইশারায় ডাকলেন। স্নেহা গিয়ে ওই বালিশে শোয়ামাত্র আব্বা একটা ছোট্ট শিশুর মতো ওকে জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করেন। সময় যে শেষ হয়ে আসতেছে, উনি বোধহয় বুঝতে পারতেছিলেন। সন্তানের স্পর্শেই তাই হয়তো মায়ের মমতা খুঁজতেছিলেন শেষবারের মতো।
স্নেহা আব্বার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে গুন গুন করে- “ধীরে ধীরে আ রে বাদল, ধীরে ধীরে আ, মেরা বুলবুল সো রাহা হে, শোরগোল না মাচা…।” ছোটবেলায় আব্বা এই গান গেয়ে ওকে ঘুম পাড়াতেন। ওই রাতে স্নেহাও একইভাবে আব্বাকে ঘুম পাড়ালো। পরদিন সকাল থেকে আব্বার শরীরে প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া শুরু হয়। যন্ত্রণায় গায়ে থাকা কাপড়ও আব্বা সহ্য করতে পারতেছিলেন না। দুপুরে অবস্থা আরো বেশি খারাপ হলে অ্যাম্বুলেন্সে করে তাকে জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে নেওয়া হয়।
স্নেহার ধারণা ছিল; আব্বা যেহেতু খেতে পারতেছিলেন না, হাসপাতালে দুই-একদিন স্যালাইন দেওয়ার পর তাকে বাসায় নিয়ে যাওয়া যাবে। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানোর পরই ইমার্জেন্সির ডিউটি ডাক্তার আব্বাকে আইসিইউতে নিতে হবে জানালেন। স্নেহাকে তখন আইসিইউতে ভর্তি করানোর কাগজপত্র ফিল আপ করে বিল দেওয়ার জন্য রিসিপশনে দৌড়াতে হলো। বিল আর পেপার্সের ফরমালিটিস শেষ না হওয়া পর্যন্ত ট্রিটমেন্ট শুরু করার নিয়ম নাই তাদের। রিসিপশনে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে ও যখন পেপার্সগুলা ফিল আপ করতেছিল, তখনই আবার খবর আসে- আব্বাকে লাইফ সাপোর্টে নিতে হবে।
রিসিপশন থেকে স্নেহাকে আবার নতুন কিছু পেপার্স দেওয়া হয় পূরণ করতে। পরিবারের রেসপন্সিবল অথোরিটি হিসেবে সব পেপার্সে ওকেই তখন সই-স্বাক্ষর করতে হইতেছিল। ওইদইকে পেমেন্ট ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত লাইফ সাপোর্টের ট্রিটমেন্টও শুরু করা হবে না, ওইটাই যেহেতু নিয়ম! হাতে প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকা ক্যাশ না থাকায় স্নেহা দৌড়াতে দৌড়াতেই সীমান্ত স্কয়ারের নিচে এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলে আনলো। রিসিপশনে টাকা জমা দিতে না দিতেই ডিউটি ডাক্তার ওকে দোতলার আইসিইউ'র বাইরে একটা ছোট রুমে ডেকে নিলেন।
স্নেহার সামনে উনি একটা কনসেন্ট পেপার দিয়ে সাইন করতে বলেন। ও যখন কনসেন্ট পেপারটা হাতে নিয়ে এর কাজটা কী বোঝার চেষ্টা করতে যাবে, যেকোনো পরিস্থিতির জন্য ওকে তখন প্রস্তুত থাকতে বলে ডাক্তার আইসিইউর ভেতরে চলে গেলেন। নিচের ফ্লোরে আম্মা তসবীহ হাতে নিয়ে বসে ছিলেন। আত্মীয়স্বজনরাও কেউ কেউ খবর পেয়ে ততক্ষণে হাসপাতালে আসা শুরু করছিলেন। কে আসতেছেন বা কে কী বলতেছেন, স্নেহার মাথায় তখন আর কিছুই ঢুকতেছিল না।
কনসেন্ট পেপারটার দিকে টানা ৫ মিনিট তাকিয়ে থাকার পর সাক্ষর করে স্নেহা। ডাক্তার ওকে আব্বার কানের কাছে শেষবার দোয়া পড়তে আইসিইউর ভেতরে পাঠালেন। আব্বার নাকে-মুখে অসংখ্য নল লাগানো। ভাইটাল সাইন মনিটরে বিপ বিপ সাউন্ডের সঙ্গে ক্রমশ কমতে থাকলো আব্বার রক্তচাপ আর অক্সিজেনও। ঠান্ডা হয়ে আসা আব্বার কপালটা ছুঁয়ে কানের কাছে কয়েকবার ও কালেমা তাইয়্যিবা পড়ে। একবার সূরা ইয়াসিন। লাইলাতুল বরাতের রাত ছিল সেদিন। মাগরিবের আজান দেওয়ার ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে ডাক্তাররা আব্বার লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার সিদ্ধান্ত জানালেন। স্নেহা কিছু বুঝে ওঠার অথবা এক ফোঁটা চোখের পানি ফেলবার আগেই ওর হাতে ধরিয়ে দেওয়া হলো- ডেথ ডিক্লারেশন পেপার।
দায়িত্ব ওখানেই শেষ হলো না। আব্বার গোসল, জানাজা, দাফন- একে একে এ রকম অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিতে হইতেছিল স্নেহাকে। ওই রাতে ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সে আব্বাকে রাখা হয় নিকেতনের বাসার গ্যারেজে। রাত তিনটা পর্যন্ত আত্মীয়স্বজনের খাওয়া আর ঘুমের জায়গার তদারকি করে কেউ কেউ যখন ঘুমে বা দোয়া-দুরুদ পড়তে ব্যস্ত, স্নেহা তখন চুপচাপ গ্যারেজে গিয়ে আব্বার সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলার সুযোগ পেল।
লাইফ সাপোর্টের নলের কারণে কি না, কে জানে, আব্বার নাকের কাছে ও রক্ত শুকিয়ে কালো হয়ে যাওয়া আবছা দাগ দেখলো। কপালে বরফের কারণে বিন্দু বিন্দু পানি জমে ছিল। অনেকক্ষণ অ্যাম্বুলেন্সের জানালার কাঁচটা ধরে দাঁড়িয়ে থাকার পর স্নেহা আব্বাকে বলে- আমাকে মাফ করে দিও, আব্বা। আমি তোমার ব্যর্থ সন্তান। এই দুনিয়ায় যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই দিতে পারি নাই তোমাকে। অনেকদিন ঘুম হয় নাই তোমার, এবার একটু আরামে ঘুমাইয়ো।
পরদিন বাদ জোহর মিরপুরে স্নেহার দাদাবাড়ির পাশের মসজিদে আব্বার জানাজা পড়া হলো। এরপর কালশী কবরস্থানে স্নেহার দাদীর কবরের কাছাকাছি দাফন করা হয় আব্বাকে। দাফনকার্য সম্পন্ন করে আম্মার সঙ্গে ও নিকেতনের ফ্ল্যাটে যায়। যদিও ওই সময় ও চন্দ্রিমা মডেল টাউনের ফ্ল্যাটে একা থাকতো। নিকেতনে গিয়ে শাওয়ার নিয়ে যখন ও বিছানায় গিয়ে মাত্র বসলো, ঠিক ওই সময়ই আবিরের টেক্সট আসে। ওইটাই সম্ভবত স্নেহাকে লেখা আবিরের সবচেয়ে দীর্ঘ আর মনের ভেতর থেকে আসা একমাত্র সত্যিকারের অনুভূতিসম্পন্ন টেক্সট ছিল।
আব্বা চলে যাওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর স্নেহা কাঁদতে পারলো। হাহাকার জড়ানো চিৎকারে ও কেঁদে নিজেকে উপলব্ধি করালো- আব্বা আর এই পৃথিবীতে নাই। সারা জীবনের জন্য স্নেহা পিতৃহারা হলো, ভালোবাসা শূন্যও। পৃথিবীতে ওকে একজন মানুষই ভালোবাসতেন, সেও ওকে একা রেখে চলে গেলেন। আবিরের ওই চমৎকার দীর্ঘ টেক্সটটাই স্নেহাকে দায়িত্ববোধের খোলস থেকে বের করে বাবা হারানোর শোকে কাঁদার সুযোগ করে দিলো।
সম্ভবত ওই মুহূর্ত থেকেই, সম্পূর্ণ অবচেতন মনে স্নেহা আবিরের ওপর কিছুটা ডিপেন্ডেন্ট হয়ে পড়ছিল। যদিও তখন ওদের সম্পর্ক অতটা গভীর ছিল না; বরং আগের কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার কারণে তখনও পর্যন্ত সম্পর্কটা ফরমালই ছিল। স্নেহা যে আবিরকে ভালোবাসে, তখনও পুরাপুরি বুঝে ওঠে নাই ও। এর আগেই অনেক ঘটনা ঘটে যায়। তবে আবিরকে ও প্রথম থেকেই প্রচণ্ড পছন্দ করতো। আবির ছিল ওর কাছে আর আট-দশটা পুরুষের চেয়ে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
আবিরের ব্যক্তিত্ব আর মায়ার আকর্ষণে না পড়ার কোনো কারণ স্নেহা তখনও পর্যন্ত খুঁজে পায় নাই। ফলে কিছু চড়াই-উতরাই থাকলেও ভালো লাগার জায়গায় তা খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারে নাই। ঠিক দুই বছর এক মাস ৫ দিন পর এই মধ্যরাতে স্নেহার যখন আবিরের ওই দীর্ঘ টেক্সটটার কথা মনে পড়লো, ওর ভেতরে এখনো যতটুকু হৃদয় অবশিষ্ট আছে, এর অন্তঃস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা বোধ অনুভব করলো। আবিরের কাছে ওর আরও অসংখ্য বিষয়ে কৃতজ্ঞতা বোধ আছে।
এ রকম ছোট ছোট অসংখ্য ঘটনার কথা ভাবতে গিয়ে স্নেহার মনে হলো, আব্বার অনুপস্থিতিতে কখন যে ও নিজের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থলে আবিরকে প্রতিস্থাপন করে ফেলছিল, ও নিজেও তা জানে না। আবিরের কাছে থাকলে ও কখনো একটা ছোট্ট শিশু হয়ে ওঠতো; কখনো চঞ্চল-ছটফটে-জেদী বালিকা, কখনো উন্মাদ কিশোরী, কখনো এক নিষিদ্ধ প্রেমিকা, আর কখনো বা মায়ের মতো মমতাময়ী। পৃথিবীতে আবিরই একমাত্র পুরুষ- যে এক প্রচণ্ড ইনটেন্স জার্নির মধ্য দিয়ে গত দুই বছর স্নেহার সমস্ত বয়সের এক্সপেরিয়েন্স একইসঙ্গে ফিল করানোর সামর্থ্য আর ক্ষমতা রাখছে।
আবিরের ইমোশনাল ইলিটারেসি কিংবা ওর বিহেভিয়র প্যাটার্ন থেকে শুরু করে নানা কিছু নিয়েই স্নেহার হাজারও অভিযোগ থাকতে পারে, আবিরেরও নিশ্চয় স্নেহাকে নিয়ে হাজারটা অভিযোগ আছে। কিন্তু মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত স্নেহা পরিপূর্ণ সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করার পাশাপাশি দ্ব্যর্থহীনভাবে স্বীকার করে আবিরকে কৃতজ্ঞতা জানাবে এই কারণে- পৃথিবীতে আব্বার পর একমাত্র আবিরই ওর সমস্ত পাগলামী-রাগ-জেদ-অভিমান সহ্য করছে। স্নেহা এটাও জানে, আব্বার পর যদি কেউ সত্যিই ওর ক্যারিয়ার, জীবন, যাপন ব্যবস্থা, সুস্থতা নিয়ে জেনুইনলি কনসার্ন ছিল- সেটাও একমাত্র আবিরই।
আবির ঠিক আব্বার মতোই মাথায় হাত দিয়ে আদর করে দিতো স্নেহাকে, চুমু খেত কপালেও। একজন পুরুষ কেবলমাত্র তার পছন্দের নারীর ক্ষেত্রেই এ রকম জেসচার শো করেন। মৃত্যুর আগে কোনো কিছু নিয়ে যদি স্নেহার আফসোস থাকে, সেটা একমাত্র আবিরের হাত ওর মাথা থেকে ওঠে যাওয়ার আফসোসটাই থাকবে। আবির কখনো জেনেশুনে এক মুহূর্তের জন্যও স্নেহার খারাপ চায় নাই বা ওর কষ্ট হোক- এমন প্রত্যাশাও করে নাই। স্নেহা এটা খুব ভালো করেই জানে। কিন্তু মানুষ যা প্রত্যাশা করে, এর প্রতিফলন সবসময় ঘটে না। অথবা তারাই হয়তো নিজেদের সীমাবদ্ধতার কারণে ঘটাতে পারে না।
স্নেহা ওই দিনগুলার কথা মনে করার চেষ্টা করে। আব্বা মারা যাওয়ার মাত্র ১২ দিনের মাথায় ও নিজের শরীরে পরিবর্তন টের পায়। প্রায় দুই মাস যাবত ওর পিরিয়ড হইতেছিল না। কিন্তু আব্বাকে নিয়ে ঢাকা-কলকাতা-ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপে ওই বিষয়ে মনোযোগ দেওয়ার সময় তখন ওর হয় নাই। আব্বা মারা যাওয়ার পরপর অনেকগুলা ঘটনা খুব দ্রুতই ওর সঙ্গে ঘটে- আবিরের সঙ্গে মিউচুয়্যাল সম্মতিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্নের সিদ্ধান্ত হলো। এর আগে, নিজের শরীরের ভেতর ও আরেকটা প্রাণের অস্তিত্ব টের পেল।
৩৬ বছর বয়সের একজন সিঙ্গেল নারী সন্তানসম্ভবা! বাংলাদেশের মতো দেশে বসে এমআর ব্যতিত আর কোনো বিকল্প ভাবার অবকাশ ওর ছিল না। এই দায় থেকে আবিরকে ও মুক্ত রাখতে চাইছে, যেহেতু এই ইনসিডেন্টে ওর নিজেরও সমান দায় আছে। স্নেহার বরং তখন মনে হইছে, আবিরের চেয়ে ওর দায়টাই ওইখানে বেশি। এ কারণেই ও আবিরকে কিছুই জানায় না। ৮ মার্চ ২০২৪ রাতে ও প্রেগন্যান্সি টেস্টের পজেটিভ রিপোর্ট পায়। পরদিন সকালেই চলে যায় ধানমন্ডির মেরী স্টোপসে।
ওইখানে আল্ট্রাসনোগ্রাফির রিপোর্টে জানা যায়, ভেতরের প্রাণটার ততদিনে হার্টবিট চলে আসছে। আল্টাসনোর রুম থেকে বের হয়ে স্নেহা ওয়াশরুমে ঢুকে। বেসিনের কলটা ছেড়ে অনবরত ও মুখে পানির ঝাপটা দিতে থাকে। কলের পানি আর চোখের পানি এক হয়ে বেসিন ওয়েস্ট দিয়ে চলে যাইতেছিল কোনো এক অজানা নর্দমায়। ওই দুই পানি আলাদা করে নিজেকে ওই মুহূর্তে দুর্বল করতে চাইতেছিল না স্নেহা।
একটা অদ্ভুত জার্নির ভেতরে মেরী স্টোপসের দুপুর থেকে বিকালের কয়েক ঘণ্টা কাটে ওর। ধীরে ধীরে কাটতে থাকে এনেস্থেশিয়া। অপরাধীর মতো ওর ছটফট মন তখন মেরী স্টোপসের ওই কেবিন থেকে বের হয়ে চন্দ্রিমার ফ্ল্যাটে ফিরতে অস্থির হয়ে ওঠে। কিন্তু ডাক্তার এসে জানান- ওটিতে ওর ভয়ংকর ব্লিডিং হওয়ায় ওই রাতে ওকে রিলিজ দেওয়ার রিস্ক তারা নেবেন না।
একদিকে ওর শরীরে স্যালাইন চলে, অন্যদিকে ব্লাড। প্রায় ঘোরের ভেতর দিয়েই ৯ মার্চের রাতটা ওই ক্লিনিকে কাটিয়ে দেয় ও। এমন একটা ইনসিডেন্ট ওকে একা ডিল করতে হইছে- এর বহিঃপ্রকাশ একমাত্র লেখার মাধ্যমেই ও করতে পারতো। তাই করছিল। এর বাইরে কাউকে দোষারোপ করা অথবা কাউকে এই বিষয়ে দায়গ্রস্ত করা কিংবা কাউকে ইন ফ্যাক্ট এটা ইনফর্ম করাও ওর প্রয়োজন মনে হয় নাই।
এর মাত্র তিন দিন পর আবির টেক্সট করে দেখা করতে চাইলো। এসব বিষয়ে কিছুই জানে না ও। স্নেহা খুব সচেতনভাবেই আবিরকে এই বিষয় থেকে দূরে রাখতে চাইছিল। ও চায় নাই এই ঘটনা জেনে আবির ভয় পাক অথবা অ্যাংজাইটিতে ভুগুক। কিংবা কখনো মনে করুক, একটা টিপিক্যাল নারীর মতো স্নেহা ওকে এই বিষয় জানিয়ে ব্ল্যাকমেইল করতে চাইছে। ততদিনে স্নেহা বুঝে গেছে, ওর হৃদয়ে আবিরের প্রতি যে অনুভূতি, ওইটা আর শুধু ভালোলাগার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই। বরং তীব্র এক ভালোবাসার জন্যই ওই পুরা ইনসিডেন্ট থেকেই ও আবিরকে দূরে রাখছিল।
তিন দিন পর স্নেহা আবিরের সঙ্গে দেখা করে। আবির ওকে জানায়- হি নিডস টু মুভ অন। হি লাভস হিজ ফ্যামিলি, হিজ ডটার। স্নেহার কাছ থেকে ও মুক্তি চায়। তখনো তিন দিন আগের শরীরের ধকল পুরাপুরি সামলে ওঠে নাই স্নেহা। শরীর-মন দুইটাই ক্লান্ত আর বিধ্বস্ত। আবিরের ওই মুক্তি চাওয়ার মিনতিতে ওর ভীষণ মায়া হয়। মুক্তির কথা শুনে ও মনে মনে হাসেও। কোনো মানুষকে কি আরেকটা মানুষ মুক্তি দিতে পারে? না সেটা দেওয়া সম্ভব? মানুষ তো জন্ম থেকেই চিরবন্দি। মৃত্যুর আগে কোনো মুক্তিই তো আসলে পার্মানেন্ট না।
নিজের এইসব ভাবনার কিছুই ও আবিরকে বলে না। আবিরের মুক্তি প্রার্থনার উত্তরে শুধু একগাল হেসে বলে- আমার কাছ থেকে তুমি মুক্ত। ওইদিন রাতে চন্দ্রিমার ফ্ল্যাটে ফিরে টেলিগ্রাম অ্যাকাউন্ট ডিলিট করে দেয় ও। ওইটাই ছিল আবিরের সঙ্গে ওর একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম। আব্বা চলে গেলেন; শরীরে একটা নতুন প্রাণ আসলো, যাকে এই দুনিয়ায় একা আনার সাহস ওর হলো না, অপরাধীর মতো বিদায় দিতে হলো। এরপর চলে গেল আবিরও। পুরা পৃথিবীটাই ওর কেমন যেন থমকে যাইতেছিল।
অফিস যাইতেছে, বাসায় ফিরতেছে…একটা অদ্ভুত অনুভূতিশূন্য সময় স্নেহাকে কাটাতে হইতেছিল। ক্রমাগত ওই শূন্যতা ওর এগজিসটেন্স সম্পর্কেই ওকে সন্দিহান করে তুলতেছিল। মানসিক অবসাদের ডালপালা চারপাশ থেকে ওকে ঘিরে ধরতেছিল প্রচণ্ড বিশ্রীভাবে। ভেন্টিলেশনের কোনো জায়গা ছিল না ওর। নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলা কারো সঙ্গে শেয়ার করার সুযোগও ওর ছিল না আবিরের প্রাইভেসির কথা চিন্তা করে।
এর মাস খানেক পর এক রাতে এক বসাতেই এইসব ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটা ফিকশন লেখে স্নেহা। পরদিন সকালেই একটা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পাবলিশডও হলো। ঘুণাক্ষরেও ওর ধারণা ছিল না, ওই এক মাসের যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতার মাঝেও আবির ওর সোশ্যাল মিডিয়া স্টক করে যাইতেছিল। খুব স্বভাবতই ওই ফিকশন আবিরের চোখ এড়ায় নাই। ও সেটা পড়েও। ওই ঘটনার অংশীদার যে ও নিজে, এটা বুঝতেও ওর অসুবিধা হয় না কোনো।
রোজার মাস চলতেছিল। বিকেল ৪টায় অফিস ছুটির পর স্নেহা সোজা বাসায় চলে যেত। ওইদিন বাসায় ফিরে ফ্রেশ হতে যাওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে ওর কাছে আবিরের টেক্সট আসে। তাও আবার ডিরেক্ট ফোন থেকে। আবির লেখে- আই নিড টু টক, ক্যান ইউ নক মি অন টেলিগ্রাম? শুধু ওর পারসোনাল নম্বর থেকেই না, অফিশিয়াল নম্বর থেকেও একই টেক্সট পাঠায় এর পরপরই। ওই টেক্সট স্নেহার কাছে ওই সময় একদমই এক্সপেক্টেড ছিল না। এর কিছুদিন আগে কিংফিশারে বসে ও মুক্তি চেয়ে চলে যাওয়ার পর ওর স্মৃতি নিয়েই বাকিটা জীবন স্নেহা কাটিয়ে দেবে ভাবছিল। কিন্তু ওই বিকালে আবিরের টেক্সট এই ভাবনায় চ্ছেদ ঘটালো।