Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: কনসেন্ট পেপার

March 30, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

54
View

একটা সময় কোথায় যেন আটকে আছে বা একটা সময়কে আটকে রাখার তীব্র ইচ্ছাটা স্নেহাকে এখনো আত্মহননের পথে তেমন একটা উদ্বুদ্ধ্ব করতে পারতেছে না বলে স্নেহার মনে হচ্ছে। ঘড়ির কাটা রাত তিনটা সতের মিনিটের ঘরে। জেনেভা ক্যাম্প থেকে আসা পার্সেল স্নেহার মস্তিষ্ককে সজাগ রাখতে কাজ করতেছে। গত দেড় মাসের অভিজ্ঞতা বলে, এই ধোঁয়ার জার্নিই আপাতত জাগতিক যন্ত্রণার তীব্রতা থেকে যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে তাকে আড়াল করে রাখতেছে। তা নাহলে ভেতর থেকে সম্পূর্ণভাবে ফাঁকা একটা মানুষ কোন যুক্তিতে আর কীসের জন্যই বা এত তীব্র হাহাকার নিয়ে বেঁচে আছে- স্নেহার মনে প্রশ্ন জাগে।

বাস্তবে আবিরের অনুপস্থিতি তার জীবনে এক ভয়াবহ শূন্যতার সৃষ্টি করছে যার সঙ্গে সে কখনোই পরিচিত ছিল না আবির চলে যাওয়ার আগে। আবির ছিল তার জন্য একটা প্যাটার্নাল ট্রান্সফারেন্স। আব্বার মৃত্যুর পর যে বিশাল মানসিক শূন্যতা তৈরি হইছিল, স্নেহা অবচেতনভাবেই আবিরের মধ্যে আব্বার ছায়া বা সেই নির্ভরতা খুঁজছে এবং পুরাপুরি নির্ভরশীলও হয়ে পড়ছিল গত দুই বছরে।।

আব্বার ভালোবাসা বা তার অভাববোধ সে আবিরের ওপর ট্রান্সফার বা স্থানান্তরিত করে দিছিল। এটা যে খুব সচেতনভাবে সে করছে, এমনটা স্নেহার মনে হয় না। কন্যা সন্তানের বাবা হওয়ার কারণে আবিরের মধ্যে স্নেহা ওর নিজের বাবার অনেক ছায়া দেখতে পারছে। ওই আচরণগুলাই এই প্যাটার্নাল ট্রান্সফারে ভূমিকা রাখছে বলে মনে হয় স্নেহার।

স্নেহা জানে পৃথিবীতে একমাত্র আব্বাই তাকে ভালোবাসতেন, তার ধারের কাছেও কেউ কোনোদিন স্নেহাকে ভালোবাসে নাই। অথবা আব্বা ছাড়া হয়তো কেউ তাকে আসলে ভালোই বাসে নাই কখনো। আব্বার কথা ওই মুহূর্তে খুব মনে পড়লো। দুনিয়ায় সে যত যা-ই করেছে, আব্বার কাছ গিয়ে ছায়াশীতল আশ্রয় তার মিলতো।

আব্বার ক্যান্সার ধরা পড়তে অনেক লেট হয়ে গেছিল। ২০২২ সালে এনজিওর প্রজেক্টের কাজে প্রায় মাসখানিক আব্বাকে রামু-উখিয়ায় থাকতে হইতেছিল। তখন রোজার মাস। আব্বার জ্বর-কাশি লেগেই ছিল, আব্বা ততটা গুরুত্ব দেয় নাই সিজনাল জ্বর-কাশি ভেবে। কিন্তু এক মাস পর ঢাকায় ফিরলে তার শরীর দ্রুত খারাপ হতে থাকে।

কাশির সঙ্গে যেদিন প্রথম রক্ত পড়লো, মূলত ওইদিনই বিষয়টাকে সিরিয়াসলি নিয়ে আব্বা ডাক্তারের কাছে যান। টিবি হইছে জানিয়ে প্রায় এক মাস আব্বার টিবির ট্রিটমেন্ট চলে। তাতেও যখন অবস্থার উন্নতি না হয়ে ঘন ঘন কাশির সঙ্গে রক্ত আসা শুরু করলো, তখন আব্বা অন্য ডাক্তারের কাছে গেলেন।

ওইখানেই মূলত তার লাং ক্যান্সারের ব্যাপারে সন্দেহ করা হয়। কিন্তু বাংলাদেশের চিকিৎসার বেহাল দশার সিস্টেমে আবারও আব্বার ভুল ট্রিটমেন্ট হয়। আনোয়ারা ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে আসা রিপোর্টে ক্যান্সারের কোনো আলামত পাওয়া যায় না। আরো প্রায় দিন পনের টিবির ট্রিটমেন্ট চলার পর আব্বার শারীরিক অবস্থার আরো অবনতি ঘটলে সিদ্ধান্ত হয় শ্যামলীর বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে আরেকবার বায়োপসি পরীক্ষা করার।

প্রায় মাস দুয়েক ভুল ট্রিটমেন্টের পর শেষ পর্যন্ত  বাংলাদেশ স্পেশালাইজড হাসপাতালে আব্বার লাং ক্যান্সারের ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায়, সেটাও লাস্ট স্টেজে! এই দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর চরম বিতৃষ্ণা থেকে এর মাত্র ১ সপ্তাহের মধ্যেই আব্বাকে কলকাতার টাটা মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যাওয়া হয় ট্রিটমেন্টের জন্য।

এপ্রিল ২০২২ থেকে জানুয়ারি ২০২৪ পর্যন্ত আব্বা অসংখ্য কেমো আর ইমিউন থেরাপির ধকল সহ্য করছেন একজন রিয়েল ফাইটারের মতো। কিন্তু জানুয়ারি, ২০২৪ এ আব্বা স্ট্রোক করেন। ততদিনে ক্যান্সার আব্বার সবগুলা অর্গানকে একটা একটা করে কাবু করে ফেলে। 

ব্রেনে ছড়িয়ে যাওয়ার পর আব্বার টোটাল ফিজিক্যাল সিস্টেম কলাপ্স করে। মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে সে একে একে ভুলতে থাকেন সবকিছু, এমন কী স্নেহার নামটাও! আব্বা মারা যান ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৪। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, ওই মাসেই স্নেহার জন্ম! তার জন্মের মাসটাকে চিরদিনের জন্য আব্বা শোকাবহ করে চলে গেলেন। এরপর থেকে স্নেহার আর জন্মদিন উদযাপন বা জন্ম তারিখও মনে রাখার আগ্রহ চলে গেছে।

কী অসহনীয় শারীরিক যন্ত্রণা সহ্য করে যে আব্বা চলে গেলেন, ক্যান্সারে আক্রান্ত কোনো রোগীর সঙ্গে সার্বক্ষণিক না থাকলে এটা কারো পক্ষে বোঝা সম্ভব না। এই মধ্যরাতে আব্বার ওই অসহনীয় যন্ত্রণার চিত্রগুলা স্নেহার মনে পড়লো। স্নেহা কাছে গেলে শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রণা নিয়েও আব্বা মুখে একটা হাসি আনার চেষ্টা করে বলতেন- সব ঠিক আছে। কিন্তু স্নেহা ঠিকই বুঝতো, কিছুই ঠিক নাই। কিছুই আর ঠিক হবে না কোনোদিন। আব্বার মৃত্যু কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে স্নেহার দায়িত্ব বোধের বয়সকে বাড়িয়ে দিছিল।

বাবার মৃত্যুতে কাঁদা বা চুপচাপ একটা কর্নারে বসে শোক পালন করার সময় আর সুযোগটাও ছিল না স্নেহার। ২৪ তারিখ সকাল থেকেই আব্বার শরীরে প্রচণ্ড যন্ত্রনা শুরু হয়। এর ৪-৫ দিন আগে থেকে সে সম্পূর্ণ খাওয়া-দাওয়া বন্ধ করে দিছিল। টাটা মেডিকেল হাসপাতাল থেকে আব্বার অনকোলজিস্ট ডাঃ অর্নব ভট্টাচার্য আব্বাকে দেশে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দেন।

উনি জানিয়ে দেন ফিজিক্যালি আব্বা আর কোনো ট্রিটমেন্ট নেওয়ার মতো অবস্থায় নাই। স্নেহা তখনই বুঝতে পারে, আর খুব বেশি সময় বাকি নাই আব্বার চলে যাওয়ার। কিন্তু এই চরম সত্যটা জানার পরও মেনে নেওয়া কঠিন হয়ে পড়ছিল তার জন্য। ২১ ফেব্রুয়ারি দুপুর সাড়ে বারোটার ফ্লাইটে কলকাতা থেকে আব্বাকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে স্নেহা। মাঝে শুধু ২২ আর ২৩ দুই দিন আব্বা ছিলেন।

২৩ তারিখ রাতে যখন স্নেহা আব্বার কাছে যায়, আব্বা তার পাশের বালিশটা দেখিয়ে স্নেহাকে ডাকে। স্নেহা গিয়ে ওই বালিশে শোয়। আব্বা স্নেহাকে একটা ছোট্ট শিশুর মতো জড়িয়ে ধরে চোখ বন্ধ করে। আব্বা হয়তো টের পাচ্ছিলেন সময় ফুরিয়ে যাচ্ছে, শেষবারের মতো মায়ের মমতা খুঁজতেছিলেন নিজের সন্তানের কাছে। স্নেহা আব্বার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে গাইতেছিল- “ধীরে ধীরে আ রে বাদল, ধীরে ধীরে আ, মেরা বুলবুল সো রাহা হে, শোরগোল না মাচা…।”

ছোটবেলায় স্নেহাকে আব্বা এই গান শোনাতে শোনাতে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়াতেন। ওই রাতে আব্বাকেও একইভাবে ঘুম পাড়ালো স্নেহা। পরদিন সকাল থেকে আব্বার শরীরে প্রচণ্ড জ্বালাপোড়া শুরু হয়। শরীরের ভেতরের যন্ত্রণা এত তীব্র হয়ে উঠে যে আব্বা গায়ে জামা-কাপড় রাখতে পারতেছিলেন না। দুপুরের দিকে অবস্থা আরো খারাপ হলে অ্যাম্বুলেন্সে আব্বাকে নেওয়া হয় জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে।

স্নেহার ধারণা ছিল আব্বা খেতে পারছেন না, হাসপাতালে নিয়ে তাকে স্যালাইনের মাধ্যমে খাবার দিতে পারলেই সে আবার বাসায় ফিরে আসতে পারবেন। কিন্তু অ্যাম্বুলেন্স থেকে নামানোর পরই ইমার্জেন্সিতে থাকা ডিউটি ডাক্তার জানান আইসিইউতে নিতে হবে।

স্নেহাকে তখন রিসিপশনে দৌড়াতে হচ্ছিল আইসিইউর বিল দিতে। পেপার্সের ফরমালিটিস আর বিল ক্লিয়ার না হওয়া পর্যন্ত ট্রিটমেন্ট শুরু করার নিয়ম নাই তাদের! স্নেহা যখন রিসিপশনে দাঁড়িয়ে কাঁপা কাঁপা হাতে যাবতীয় পেপার্স ফিল আপ করছে, ঠিক ওই মুহূর্তেই আবার খবর আসে, আব্বাকে লাইফ সাপোর্টে নেওয়া হবে।

রিসিপশন থেকে আবার নতুন পেপার্স দেওয়া হলো পূরণ করার জন্য। পরিবারের রেসপন্সেবল অথোরিটি হিসেবে স্নেহাকেই সব পেপার্সে সই-স্বাক্ষর করতে হইতেছিল। কিন্তু লাইফ সাপোর্টের ট্রিটমেন্ট শুরু হবে পেমেন্ট ক্লিয়ারের পরই। প্রায় পঞ্চাশ হাজার টাকার মতো ক্যাশ ওই সময় হাতে ছিল না।

স্নেহা দৌড়ে চলে গেল সীমান্ত স্কয়ারের নিচের এটিএম বুথে। টাকা তুলে আবার দৌড়াতে দৌড়াতে হাসপাতালের রিসিপশনে। রিসিপশনে টাকা দিতে না দিতেই ডিউটি ডাক্তার ডেকে নিলেন দোতলার আইসিইউর বাইরে একটা ছোট্ট রুমে। একটা কনসেন্ট পেপার এগিয়ে তাতে স্বাক্ষর দিয়ে যেকোনো পরিস্থিতির জন্য তৈরি থাকতে বলা হয় স্নেহাকে। নিচে আম্মা বসা। আত্মীয়স্বজনরাও কেউ কেউ তখন খবর পেয়ে হাসপাতালে আসা শুরু করছিলেন। কে আসছেন, কে কী বলছেন, স্নেহার মাথায় তখন কিছুই যাচ্ছে না।

৫ মিনিট সে কনসেন্ট পেপারটার দিকে তাকিয়ে থেকে আস্তে আস্তে তা ফিল আপ করে স্বাক্ষর করলো স্নেহা। ডাক্তার তাকে ভেতরে গিয়ে আব্বার কানের কাছে দোয়া পড়ে আসতে বললেন। স্নেহা ভেতরে গেল। আব্বার সমস্ত নাক-মুখে অসংখ্য নল লাগানো। ভাইটাল সাইন মনিটরে বিপ বিপ সাউন্ড হচ্ছে। ক্রমশ আব্বার হার্ট বিট, অক্সিজেন লেভেল আর রক্তচাপ কমে যাচ্ছে।

স্নেহা আব্বার কপালে হাত রেখে কানের কাছে কয়েকবার কালেমা তাইয়্যিবা পড়লো। একবার সূরা ইয়াসিন। সেদিন লাইলাতুল বরাতের রাত। মাগরিবের আজান দেওয়ার ঠিক কয়েক মুহূর্ত আগে জানানো হলো, আব্বার লাইফ সাপোর্ট খুলে ফেলার সিদ্ধান্ত নিছেন দায়িত্বে থাকা ডাক্তাররা। স্নেহা বুঝে উঠার আগে অথবা কাঁদার সময়টুকু পাওয়ার আগেই তার হাতে ধরিয়ে দেওয়া হয় ডেথ ডিক্লারেশন পেপার।

দায়িত্ব ওখানেই শেষ হয় না।  আব্বার গোসল কোথায় হবে, জানাজা কখন আর কোথায় হবে, দাফন কোথায় করা হবে- একে একে এ রকম অসংখ্য সিদ্ধান্ত নিতে হয় স্নেহাকে। রাতে আব্বাকে নিকেতনের বাসার গ্যারেজে ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সে রাখা হয়। রাত তিনটা পর্যন্ত স্নেহাকে বাসায় আসা আত্মীয়স্বজনের খাওয়া আর ঘুমের জায়গার ব্যবস্থার তদারকি করতে হয়।

রাত তিনটার কিছু পরে যখন সবাই যে যার মতো ঘুমে অথবা দোয়া পড়ায় ব্যস্ত, স্নেহা তখন ফ্রিজার অ্যাম্বুলেন্সের জানালার পাশে গিয়ে আব্বার সঙ্গে শেষবারের মতো কথা বলার সুযোগ পায়। লাইফ সাপোর্টের নলের কারণে কি না স্নেহা জানে না, আব্বার নাকের কাছে রক্তের আবছা দাগ দেখতে পেল সে। কপালটায় ঠান্ডায় বিন্দু বিন্দু পানি জমে আছে। স্নেহা অনেকক্ষণ জানালার কাঁচটা স্পর্শ করে দাঁড়ানোর পর আব্বাকে বললো- আমাকে মাফ করে দিও, আব্বা। আমি তোমার ব্যর্থ সন্তান। এই দুনিয়ায় তোমাকে যন্ত্রণা দেওয়া ছাড়া আর কিছু দিতে পারি নাই। অনেকদিন ঘুম হয় নাই তোমার, এবার একটু আরামে ঘুমাও।

এর পরদিন বাদ জোহর স্নেহার দাদাবাড়ি মিরপুরের এলাকার মসজিদে আব্বার জানাজা হয়। জানাজা শেষে কালশী কবরস্থানে স্নেহার দাদীর কবরের কাছাকাছি আব্বাকে দাফন করা হলো। দাফনকার্য সম্পন্ন করে স্নেহা নিকেতনের ফ্ল্যাটে যায় আম্মার সঙ্গে। যদিও ওই সময় স্নেহা থাকতো চন্দ্রিমা মডেল টাউনের ফ্ল্যাটে। নিকেতনের বাড়িতে গিয়ে স্নেহা একটা শাওয়ার নিয়ে যখন বিছানায় গিয়ে মাত্র বসলো, ঠিক ওই সময় আবিরের টেক্সট আসে।

ওইটাই সম্ভবত স্নেহাকে লেখা আবিরের সবচেয়ে লম্বা আর মনের ভেতর থেকে আসা একমাত্র সত্যিকারের অনুভূতি সম্পন্ন টেক্সট ছিল। আব্বা চলে যাওয়ার প্রায় ২৪ ঘণ্টা পর স্নেহা কাঁদতে পারলো, হাহাকার জড়ানো চিৎকারে স্নেহা কেঁদে নিজেকে উপলব্ধি করাতে পারলো- আব্বা আর এই পৃথিবীতে নাই। সারা জীবনের জন্য স্নেহা পিতৃহারা হলো, ভালোবাসা শূন্যও হলো। পৃথিবীতে তাকে ভালোবাসা একমাত্র ব্যক্তিটাও তাকে ছেড়ে চলে গেছে না ফেরার দেশে।

আবিরের ওই চমৎকার টেক্সটটা স্নেহাকে দায়িত্ব বোধের খোলস থেকে বের হয়ে অবশেষে বাবা হারানোর শোকের অনুভূতিতে কাঁদার সুযোগ করে দিছিল। সম্ভবত ঠিক ওই মুহূর্ত থেকেই আবিরের প্রতি কিছুটা ডিপেন্ডেন্ট হয়ে পড়ছিল স্নেহা, এবং তা সম্পূর্ণ অবচেতন মনেই। যদিও ওই সময় আবির-স্নেহার সম্পর্ক অতটা গভীর ছিল না।

এর আগে কিছু তিক্ত অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়েও তাদের দুজনকে যেতে হইছিল, ফলে সম্পর্কটা তখনও পর্যন্ত ছিল ফরমাল। আবিরকে যে স্নেহা ভালোবাসে, তখনও পুরাপুরি এটা স্নেহা বুঝে উঠতে পারে নাই। এর আগেই অনেক ঘটনা ঘটে গেছিল। তবে আবিরকে সে প্রচণ্ড পছন্দ প্রথম থেকেই করতো।

আবির ছিল স্নেহার কাছে অন্য আর আট-দশটা পুরুষের চেয়ে সম্পূর্ন ব্যতিক্রম। ওর ব্যক্তিত্বের আকর্ষণে না পড়ার কোনো কারণ স্নেহা খুঁজে পায় নাই তখন পর্যন্ত। তাই কিছু চড়াই-উতরাইয়ের ভেতর দিয়ে গেলেও ভালো লাগার অনুভূতিতে সেসব খুব একটা প্রভাব ফেলতে পারে নাই।

ঠিক দুই বছর এক মাস ৫ দিন পর এই মধ্যরাতে স্নেহার যখন আবিরের ওই দীর্ঘ ইমোশনাল টেক্সটটার কথা মনে পড়লো, ওর ভেতরে এখনো যতটুকু হৃদয় অবশিষ্ট আছে, এর অন্তঃস্থল থেকে কৃতজ্ঞতা বোধ অনুভব করলো। আবিরের কাছে স্নেহার আরো অসংখ্য বিষয়ে কৃতজ্ঞতা বোধ আছে। 

এ রকম অসংখ্য ছোট ছোট ঘটনা মনে করতে গিয়ে স্নেহার মনে হলো- কখন যে সে আব্বার অনুপস্থিতিতে নিজের সবচেয়ে বড় আশ্রয়স্থলে আবিরকে প্রতিস্থাপন করছিল, তা সে নিজেও জানে না। আবিরের সান্নিধ্যে সে একটা ছোট্ট শিশু হয়ে উঠতো, কখনো চঞ্চল-ছটফটে-জেদী বালিকা, কখনো উন্মাদ কিশোরী, কখনো এক নিষিদ্ধ প্রেমিকা, কখনো বা মায়ের মতো মমতাময়ী।

পৃথিবীতে আবিরই একমাত্র পুরুষ যে প্রচণ্ড ইনটেন্স একটা জার্নির ভেতর দিয়ে স্নেহার সমস্ত বয়সের এক্সপেরিয়েন্স গত দুই বছরে করালো। আবিরের ইমোশনাল ইলিটারেসি নিয়ে স্নেহার হাজারও অভিযোগ থাকার পরও স্নেহা এটা খুব ভালো মতো জানে, পৃথিবীতে স্নেহার আব্বার পর একমাত্র আবিরই তার সমস্ত পাগলামী-রাগ-জেদ সহ্য করছে।

স্নেহা এটাও জানে, আব্বার পর যদি কেউ সত্যিই ওর ক্যারিয়ার, জীবন, যাপন ব্যবস্থা, সুস্থতা নিয়ে কনসার্ন থাকছে- সেটাও একমাত্র আবিরই! আবির ঠিক আব্বার মতোই মাথায় হাত দিয়ে আদর করে দিতো স্নেহাকে। কপালেও চুমু খেত। একজন পুরুষ তার পরম পছন্দের নারীর ক্ষেত্রেই শুধু এরকম জেসচার শো করতে পারে বা শো করে।

আবির কখনো এক মুহূর্তের জন্যও স্নেহার খারাপ চায় নাই বা ওর কষ্ট হোক- এমন প্রত্যাশা করে নাই। কিন্তু মানুষ যা প্রত্যাশা করে, তার প্রতিফলন সবসময় ঘটে না অথবা তারাই ঘটাতে পারে না, হয়তো তা নিজেদের সীমাবদ্ধতার কারণেই। স্নেহা মনে করার চেষ্টা করে ওইদিনগুলার কথা। আব্বা মারা যাওয়ার মাত্র ১২ দিনের মাথায় স্নেহা ওর শরীরের পরিবর্তন টের পায়।

এর প্রায় দুই মাস আগে থেকে পিরিয়ড বন্ধ থাকলেও আব্বাকে নিয়ে ঢাকা-কলকাতা-ঢাকার বিভিন্ন হাসপাতালে দৌড়ঝাপে ওইদিকে বিশেষ মনোযোগ দেওয়ার সময় স্নেহার হয় নাই। আব্বা মারা যাওয়ার পর পর অনেকগুলা ঘটনা খুব দ্রুতই ঘটে স্নেহার সঙ্গে। এক, আবিরের সঙ্গে মিচ্যুয়াল সম্মতিতে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত। তবে এরও আগে, নিজের শরীরে আরেকটা প্রাণের অস্তিত্ব টের পাওয়া।

৩৬ বছর বয়সের একজন সিঙ্গেল নারী সন্তানসম্ভবা! বাংলাদেশের মতো দেশে বসে এম আর ব্যতিত আর কোনো বিকল্প ভাবার অবকাশ স্নেহার ছিল না। এই দায় থেকে সে আবিরকে মুক্ত রাখতে চাইছে, যেহেতু এই অ্যাক্সিডেন্টে স্নেহারও সমান দায় ছিল। স্নেহার বরং তখন মনে হইছে- তার দায়টাই ওইখানে বেশি ছিল। এ কারণেই সে আবিরকে কিছুই জানায় নাই।

৮ মার্চ, ২০২৪ রাতে স্নেহা প্রেগন্যান্সি টেস্টের পজেটিভ রিপোর্ট পায়। পরদিন খুব সকালেই সে চলে যায় ধানমন্ডির মেরী স্টোপসে। আল্ট্রাসনোগ্রাফিতে জানা যায় স্নেহার ভেতরে থাকা প্রাণটার ততদিনে হার্টবিট চলে আসছে। আল্টাসনো শেষে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ে স্নেহা। বেসিনের কলটা ছেড়ে অনবরত মুখে পানির ঝাপটা দিতে থাকে। বেসিনের ওই পানির সঙ্গে চোখের পানিও মিলিয়ে যেতে থাকে। দুইটাকে আলাদা করে ওই মুহূর্তে দুর্বল হতে চাইতেছিল না সে।

একটা অদ্ভুত জার্নির ভেতরে মেরী স্টোপসের দুপুর থেকে বিকালের কয়েক ঘণ্টা কাটে তার। আস্তে আস্তে কাটতে থাকে এনেস্থেশিয়া। একটা অপরাধীর মতো ছটফট মন তখন মেরী স্টোপসের ওই কেবিনটা থেকে বের হয়ে চন্দ্রিমার ফ্ল্যাটে ফেরত যেতে অস্থির হয়ে উঠে। কিন্তু ডাক্তার এসে জানায় তার এত ভয়ংকর ব্লিডিং হয়েছে, তারা তাকে ওই রাতে রিলিজ দেওয়ার মতো রিস্ক কোনোভাবেই নেবে না।

একদিকে স্নেহার শরীরে স্যালাইন চলে, অন্যদিকে ব্লাড। প্রায় ঘোরের ভেতর দিয়েই মেরী স্টোপসে ৯ মার্চের রাতটা কাটে তার। এ রকম একটা ঘটনা অথবা দুর্ঘটনাতে যে তার একা ডিল করতে হলো সবকিছু, এর বহিঃপ্রকাশ একমাত্র লেখার মাধ্যমেই সে করতে পারে।

এর বাইরে কাউকে দোষারোপ করা অথবা কাউকে এই বিষয়ে দায়গ্রস্ত করা কিংবা কাউকে ইন ফ্যাক্ট এই বিষয়ে জানানোও স্নেহার প্রয়োজন মনে হয় নাই। এর মাত্র তিন দিন পর আবির টেক্সট করে দেখা করতে চায়। এসব বিষয়ে সে কিছুই জানে না। স্নেহা খুব সচেতনভাবেই আবিরকে এই বিষয় থেকে দূরে রাখতে চাইছিল।

স্নেহা চায় নাই এই ঘটনা জেনে আবির ভয় পাক অথবা অ্যাংজাইটিতে ভুগুক, অথবা মনে করুক একটা টিপিক্যাল নারীর মতো স্নেহা তাকে এই বিষয় জানিয়ে জিম্মি অথবা ব্ল্যাকমেইল করতে চাইছে। ততদিনে স্নেহা বুঝে গেছে ওর হৃদয়ে আবিরের প্রতি যে অনুভূতি, সেটা আর শুধু ভালোলাগার মধ্যে সীমাবদ্ধ নাই।

বরং তীব্র এক ভালোবাসার জন্যই ওকে এই পুরা ব্যাপারটা থেকেই স্নেহা দূরে রাখতে চাইছে। স্নেহা তিন দিন পর আবিরের সঙ্গে দেখা করে। আবির ওইদিন স্নেহাকে জানায়, হি নিডস টু মুভ অন। হি লাভস হিজ ফ্যামিলি, হিজ ডটার। স্নেহার কাছ থেকে সে মুক্তি চায়। 

তখনো তিন দিন আগের ধকল পুরাপুরি সামলে উঠে নাই স্নেহা। শরীর ক্লান্ত-বিধ্বস্ত। আবিরের ওই মুক্তি চাওয়ার মিনতিতে ওর ভীষণ মায়া হলো। মুক্তির কথা শুনে স্নেহা মনে মনে হাসে আর ভাবে- কোনো মানুষকে কি আরেকটা মানুষ মুক্তি দিতে পারে? না সেটা দেওয়া সম্ভব? মানুষ তো জন্মানোর পর থেকেই চিরবন্দি। মৃত্যুর আগে কোনো মুক্তিই পার্মানেন্ট না।

নিজের এইসব ভাবনা আবিরকে সে বলে না। আবিরের মুক্তি প্রার্থনার উত্তরে সে শুধু হেসে বলে- আমার কাছ থেকে তুমি মুক্ত। ওইদিন চন্দ্রিমার ফ্ল্যাটে ফিরে টেলিগ্রাম একাউন্ট ডিলিট করে দেয় স্নেহা। ওইটাই আবিরের সঙ্গে তার একমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম ছিল। আব্বা চলে গেল; শরীরে একটা নতুন প্রাণ আসছিল যাকে এই দুনিয়ায় একা আনার সাহস তার ছিল না, অপরাধীর মতো নিশ্চিহ্ন করতে হলো সেটাও। এরপর চলে গেল আবির! পুরা পৃথিবীটা কেমন যেন থমকে যাচ্ছিল স্নেহার।

অফিস যাচ্ছে, বাসায় ফিরছে…একটা অদ্ভুত অনুভূতি শূন্য সময় তাকে কাটাতে হচ্ছিল, যা ক্রমাগত তাকে নিজের এগজিসটেন্স সম্পর্কে সন্দিহান করে তোলে। মানসিক অবসাদের ডালপালা চারপাশ থেকে তাকে ঘিরে ধরতেছিল প্রচণ্ড বিশ্রীভাবে। ভেন্টিলেশনের কোনো জায়গা ছিল না তার। নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলা কারো সঙ্গে ভাগ করে নেওয়ারও তার সুযোগ ছিল না আবিরের প্রাইভেসির কথা চিন্তা করে।

এর মাস খানিক পর রাতে এক বসাতেই এসব ঘটনার প্রেক্ষিতে স্নেহা একটা ফিকশন লিখে ফেললো। পরদিন সকালে তা পাবলিশও হলো একটা অনলাইন প্ল্যাটফর্মে। স্নেহার ঘুণাক্ষরেও ধারণা ছিল না, এই এক মাসের যোগাযোগ বিছিন্নতার মাঝেও স্নেহার সোশ্যাল মিডিয়া ঠিকই স্টক করে যাচ্ছিল আবির। খুব স্বভাবতই ওই ফিকশন তার চোখ এড়ায় নাই। সে ওইটা পড়ে। ওই ঘটনার অংশীদার যে সে, এটা বুঝতেও তার অসুবিধা হয় না।

রোজার মাস ছিল। বিকাল ৪টায় অফিস ছুটির পর বাড়িতেই ফিরে যেত স্নেহা। ওইদিন অফিস শেষে বাসায় ফিরে ফ্রেশ হতে যাওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে আবিরের টেক্সট পেলো সে। তাও ডিরেক্ট ফোন থেকে- আই নিড টু টক। ক্যান ইউ নক মি অন টেলিগ্রাম?

শুধু পারসোনাল নম্বর থেকেই না, অফিশিয়াল নম্বর থেকেও একই টেক্সট পাঠায় এর পরপরই। আবিরের টেক্সট স্নেহার কাছে এক্সপেকটেড ছিল না ওই মুহূর্তে। এর কিছুদিন আগে কিংফিশারে বসে ওকে মুক্ত করে দেওয়ার কথা বলার পর স্নেহা আবিরের স্মৃতি নিয়েই বাকিটা জীবন কাটিয়ে দেবে ভাবছিল। ওই বিকালে আবিরের টেক্সট সেই ভাবনায় চ্ছেদ ঘটালো।

চলবে…

Comments

    Please login to post comment. Login