[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]
২০২৪ সালের ভয়ংকর দুঃসহ দিনগুলার কথা মনে করতে করতে রাত থেকে কখন যে ভোর হয়ে গেল টেরই পায় নাই স্নেহা। বন্ধ জানালার কাঁচ ভেদ করে ফজরের আজানের ধ্বনি কানে আসতেই বহুদিন বাদ ভোরের প্রার্থনায় দাঁড়াতে মন চাইলো ওর। কিন্তু কী যেন একটা রাত থেকে ওই একইভাবে ওকে ওই একই জায়গাতে আটকে রাখছে। শরীরটা উঠিয়ে নামাজের প্রস্তুতি নেওয়ার শক্তি যোগাতে পারলো না কয়েকবার চেষ্টা করেও। সামনে বারান্দার দরজাটা খোলাই ছিল সারা রাত। ভোরের আলো ফোটার এখনো বাকি আছে কিছুটা সময়। গত রাতের তুমুল বৃষ্টিপাতের কারণেই হয়তো চারপাশের ওয়েদার এখনো ঠান্ডা হয়ে আছে।
একটা অদ্ভুত ঠান্ডা-নিশ্চুপ পরিবেশে গতরাতে ফ্লোরের যে পাশটায় ও মিষ্টির দুনিয়ায় পারাপারের জন্য বসছিল, এখনো ঠিক ওইপাশে ওই অবস্থাতেই বসে আছে। মাঝে কয়েকবার পা দুইটা লম্বা করছে অথবা ভাঁজ। এর বাইরে ওর স্থানের কোনো হেরফের হয় নাই। এরমধ্যে বেগম আখতার, গুলাম আলী, মেহদি হাসান, কোল্ডপ্লে, লিংকিং পার্ক, ড্রিম থিয়েটার, বাগধারা, ব্লু টাচ, হাইওয়ে, ইন্ডালো, ব্ল্যাক, ইম্যাজিন ড্রাগন্স, বিয়ন্সে, পিঙ্ক ফ্লয়েড, অনুভ জৈন আর জেমস ঘুরে আজানের বিরতির পর স্পটিফাইয়ের আমোন প্লেলিস্টে বেজে উঠছে ওয়ারফেজের রুপকথা। গানটা বাজতেই টানা ৪৮ ঘণ্টা নির্ঘুম স্নেহা চোখটা বন্ধ করলো কিছুক্ষণের জন্য। গানের প্রতিটা শব্দ যেন ও অনুভব করতে চাইলো গভীর মনোযোগে-
বলেছিলে খুঁজো না আমায়
আমি যদি কভু হারিয়ে যাই, যেতে দিও আমায়
এলো সেদিন, তুমি হারিয়ে গেলে
মনে এলো, বলেছিলে তুমি হারিয়ে যাবে যে…
প্রতিটা শব্দ ওর হৃদয় আর মস্তিষ্কের একদম গভীরে ঢুকে বাড়ি খাইতেছিল। চোখটা ও বন্ধই রাখে আগের মতো। কোরাসের লাইনে গিয়ে ওই অবস্থাতেই ও সুর মেলালো-
মোরা কেঁদেছি একই দুঃখে, হেসেছি একই সুখে
কখনো ভাবিনি তুমি চলে যাবে
এভাবে রেখে আমায় একাকী…
এই লাইনগুলা ওকে অনেককিছু মনে করিয়ে দিতেছে। ও চোখ খোলে। মূহূর্তেই ওর মেমোরি ওকে ভ্রমণে নিয়ে যায় নভেম্বর, ২০২৩ এর দিনগুলাতে। আবিরের সঙ্গে ওর পরিচয় হইছিল ডেটিং অ্যাপ বাম্বলে। দীর্ঘদিনের একলা জীবনে মাঝে মাঝে যখন নিঃসঙ্গতা ভর করতো, ডেটিং অ্যাপে র্যান্ডম মানুষের সঙ্গে চ্যাট করে কিছু সময় পার হতো ওর। চ্যাটিং উইথ স্ট্রেঞ্জারস! খুব কম মানুষের সঙ্গেই ও ৪-৫ দিনের বেশি কথা কন্টিনিউ করতে পারতো। বাংলাদেশের পুরুষদের সেন্স অফ হিউমার, ফ্লার্টিং স্কিল, ইন্টেলেকচুয়্যাল লেভেল আর ম্যানারিজমের দশা দেখে ও প্রচণ্ড রকমের হতাশ হয়ে পড়ছিল এক সময়। আবিরের সঙ্গে ম্যাচ হওয়ার ঘণ্টা খানিক আগেই অ্যাপটা আনস্টল করার কথাও ভাবতেছিল মনে মনে। এরমধ্যেই আবিরের সঙ্গে ম্যাচ হয়ে প্রাথমিক আলাপও শুরু হয়ে গেল।
ওইদিন সন্ধ্যাতেই আবির ওকে ড্রিংকের অফার করে। দেখা করতে চায় বনানীর একটা বারে। ও ব্যাপারটাকে কোনো রকমে এড়িয়ে যায়। কথা নাই বার্তা নাই, ওইদিনই প্রথম কথা, আবার ওইদিনই দেখা করতে চলে যেতে হবে- পুরুষদের ব্যাপারে এত ডেসপারেট ও কখনোই ছিল না। আব্বার শরীর ওই সময় থেকেই খারাপ হতে শুরু করছিল। ও তখন থাকে চন্দ্রিমা মডেল টাউনের ফ্ল্যাটে, একা। অফিস রিং রোডে। সপ্তাহে একদিন ও আব্বাকে দেখতে যাওয়ার সময় পেত। নিকেতন থেকে নিজের বাসায় চলে আসলেই আবার মনটা পড়ে থাকতো আব্বার কাছে। এরকম একটা অস্থির মন খারাপের সময় ছাড়াও, কেউ একজন ডেটিং অ্যাপে কয়েক ঘণ্টার আলাপেই ড্রিংকের অফার করবে আর অমনিই ও দৌড়ে চলে যাবে, ওর পারসোনালিটি ওই লেভেলের ছিল না কখনোই। ওইদিন রাত দশটা পর্যন্ত আবির নানাভাবে ওকে দেখা করার জন্য কনভেন্স করতে থাকে। এখনো ও স্পষ্ট ওই কনভার্সেশন মনে করতে পারে।
রাত দশটার দিকেও আবির টেক্সট পাঠিয়ে বলছিল- নাইট ইজ স্টিল ইয়ং! ইউ ক্যান কাম। আই উইল ড্রপ ইউ হোম, ডোন্ট ওয়ারি। ও খুব সচেতনভাবে আবারও এড়ায়। ওই রাতে বার থেকে বাড়ি ফিরে আবির ওর সঙ্গে চ্যাট করতেছিল। ও তখন জানতে চাইলো ডেটিং অ্যাপের প্রোফাইলে দেওয়া ছবির মানুষটা সত্যিই আবির কি না। এর আগে দুই-একজন অন্যের ছবি ইউজ করে ওর সঙ্গে কথা বলছিল, ওই অভিজ্ঞতার আলোকে কিছুটা অবিশ্বাস করা ওর জন্য জায়েজই ছিল। যদিও ও খুব পোলাইটলিই জানতে চাইছিল- ডোন্ট টেক ইট আদারওয়াইজ, ইজ ইট রিয়েলি ইউ ইন দিস পিকচার? আই মিন, আই হ্যাভ সাম ব্যাড এক্সপেরিয়েন্স উইথ ফিউ পিপল। দ্যাটস হোয়াই আই'ম আস্কিং।
ওর প্রশ্নে আবির সঙ্গে সঙ্গেই ভিডিও কল করার অনুমতি চায়। দুই বছর চার মাস পরও ওই ভিডিও কল করার পর আবিরের- ইয়েস, ইটস মি! সি… বলে দেওয়া হাসিটা ও স্পষ্ট চোখের সামনে দেখতে পারতেছে। ওর হাসি এত ইনোসেন্ট, এত সুন্দর! পুরুষ মানুষের এত সুন্দর হাসি ও জীবনে খুব কম দেখছে। দেখে নাই বললেই চলে! আব্বার হাসিও আবিরের মতোই সুন্দর ছিল। নাহ, তুলনাটা ঠিক হলো না। দুইজনের হাসি দুই রকম সুন্দর এবং পৃথিবীর অন্য কারো হাসির সঙ্গেই এই দুইজনের হাসি কম্পারেবল না বলে সিদ্ধান্তে পৌঁছালো ও। ইন পারসন দেখা করার আগেই ভিডিও কলে ওই প্রথম দেখা ওদের দুইজনের। ঠিক ওই মুহূর্ত থেকেই আবিরের হাসিতে মুগ্ধ হয়ে পড়ছিল ও। মানুষের মৃত্যুর আগে জীবনের সব সুন্দর মুহূর্তগুলা নাকি ৬০ সেকেন্ডের জন্য মৃত্যুপথযাত্রীর চোখের সামনে দৃশ্যমান হয়। স্নেহার ধারণা, ওর মৃত্যুর আগের ৬০ সেকেন্ডের ওই আনন্দের মুহূর্তের ফ্ল্যাশব্যাকে ও আবিরের হাসি অবশ্যই দেখতে পারবে। এর পরদিন সন্ধ্যাতেই অবশ্য ওদের ইন পারসন দেখা হয়। দ্যাট ওয়াজ সামথিং সো মেমোরেবল। ৫ নভেম্বর, ২০২৩।
স্নেহার জন্য দিনটা মেমোরেবল হলেও আবিরের হয়তো ওই দিনের জন্য সারা জীবন আফসোস থাকবে। ওর জীবনে ওই দিনটা না আসলে আজকে হয়তো ওর জীবন এইভাবে তছনছ হতো না। কিন্তু কার কবে কখন কার সঙ্গে পরিচয় হবে, সংযোগ ঘটবে বা দেখা হবে- ওই কন্ট্রোল কি আর মানুষের হাতে থাকে সবসময়? এসব সংযোগের মালিক তো খোদা, বিয়োগেরও। একমাত্র খোদাই ভালো জানেন- কখন কাকে তিনি কার জার্নিতে যুক্ত করবেন, কেন করবেন, কী উদ্দেশ্যে করবেন, কেনই বা আবার ওই জার্নি থেকে গলা ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেবেন এক গভীর মহাশূন্যতায়। দুনিয়ায় এক ন্যানো সেকেন্ড বা এরচেয়ে কম সময়ের বাতাসও খোদার ইশারা ছাড়া বইতে পারবে না। যা কিছু ঘটে, তা ঘটার বলেই ঘটে। এসব ঘটনার ভালো-মন্দের যে বিচারের ভার, ওইটাও খোদার উপরই ন্যাস্ত। তিনিই ভালো জানেন কোনটা ভালো, আর কোনটাই বা মন্দ। আমরা কেবল শেক্সপিয়রের ম্যাকবেথ নাটকের ওই উইচগুলার মতো বলতে পারি- “ফেয়ার ইজ ফাউল, ফাউল ইজ ফেয়ার।” ও ভাবে, দ্যাটস একচুয়্যালি লাইফ! কারো ভালোতে কারো মন্দ হতে পারে, কারো মন্দতে অন্য কারো ভালো। জগতের সকলের ভালো তো আর এক সমান্তরালে মেলে না। তাহলে তো বছরের পর বছর প্যালেস্টাইনে ইসরায়েল নারকীয় হামলাযজ্ঞ চালাতে পারতো না।
ইসরায়েল-প্যালেস্টাইন দুই রাষ্ট্রের কাছেই জেরুসালেম দখল করা গুরুত্বপূর্ণ। ইসরায়েল দাবি করে, জেরুসালেমের ওপর তাদের সার্বভৌম অধিকার আছে। ১৯৬৭ সালের যুদ্ধে তারা পূর্ব জেরুসালেম দখল করছে। এরপর থেকে ওইটাই তাদের রাজধানী। যদিও এর কোনো আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নাই। অন্যদিকে ফিলিস্তিনিরা পূর্ব জেরুসালেমকে চায় তাদের রাজধানী হিসাবে। ইহুদিদের কাছে ইসরায়েল হলো তাদের প্রতিশ্রুত ভূমি। ইহুদি ধর্মগ্রন্থে ওই ভূমি ঈশ্বরের পক্ষ থেকে তাদের জন্য প্রদত্ত বলে তারা বিশ্বাস করে। বিশেষ করে জেরুজালেম শহর তাদের জন্য অত্যন্ত পবিত্র বলে তোরাহ বা হিব্রু বাইবেলে উল্লেখ আছে। ওইখানে তাদের প্রাচীন সব মন্দিরের ইতিহাস জড়ানো।
অন্যদিকে মুসলিমদের কাছে প্যালেস্টাইনের ভূমি, বিশেষ করে জেরুজালেম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ওইখানে আছে ইসলামের তৃতীয় পবিত্রতম মসজিদ- আল আকসা। এই সমস্যা শুধু রাজনৈতিক বা ভূখণ্ডের না, বিশ্বাসেরও। এক পক্ষ মনে করে, তারা তাদের ধর্মীয়ভাবে নির্ধারিত ভূমি ফিরে পাইছে বা রক্ষা করছে। আর অন্য পক্ষ মনে করে, তাদের পবিত্র ভূমি ও অধিকার দখল হয়ে গেছে। এই কারণে আপস করা খুব কঠিন হয়ে পড়ছে। এখানে শুধু জমি না, ধর্মীয় অনুভূতি, পবিত্রতা আর আস্থার প্রশ্নও জড়িয়ে আছে। ও মনে মনে এসব ভাবতে গিয়ে চিন্তা করে- তাহলে এই দুই পক্ষের মধ্যে কাদের দাবিকে যৌক্তিক বলে খালি চোখে বিচার করা জায়েজ হবে?
ইসরায়েল শক্তি ও সমৃদ্ধশালী দেশ। বিশ্ব মোড়ল হিসেবে তারা একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করে আছে সারা বিশ্বে। অন্যদিকে প্যালেস্টাইন বছরের পর ইসরায়েল দ্বারা নির্যাতিত ও নিপীড়িত। যেকোনো মানবিক মানুষই মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানোকে নিজের দায়িত্ব মনে করবে। বিশ্বের প্রায় প্রতিটা দেশের সচেতন নাগরিক ওই বিচারে প্যালেস্টাইনে হামলার বিরুদ্ধে নিজেদের ভয়েজ রেইজ করার চেষ্টা জারি রাখছে। কিন্তু ইসরায়েল আর প্যালেস্টাইনের অধিবাসীদের মধ্যে যে বহু পুরানো ভূমির মালিকানার লড়াই- তাতে কোনো একপক্ষের ফেভারে রায় দেওয়ার ক্ষমতা সম্ভবত কেউই রাখে না। ঠিক তেমনই, ওর জীবনে যেই দিন বা দিনগুলার স্মৃতি স্মরণীয় হিসেবে আমৃত্যু গণ্য হবে বলে ও মনে করে, আবিরের জন্য ওই দিনগুলার প্রতিটা মুহূর্তই সম্ভবত “ভুল” হিসেবে কাউন্টেড হবে। এইখানে কে ঠিক বা কে বেঠিক- ওইটা জাজ করা ডিফিকাল্ট। আল্লাহর কাছে বরং ওই দায়িত্ব ছেড়ে দেওয়া বুদ্ধিমত্তার কাজ।
৫ নভেম্বরের সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত প্রচণ্ড ইনটেন্স একটা সময় কাটে স্নেহার। আবিরের অবশ্য বোধহয় ওইসব স্মৃতি খুব একটা মনে রাখার প্রয়োজন ছিল না কখনোই। এখন তো আরো প্রশ্নই উঠে না। তবে স্নেহার জন্য ওই সন্ধ্যা থেকে রাতটা ছিল ভীষণ অন্য রকম এক অভিজ্ঞতা। ৩৬ বছর বয়সে ও যেন ‘সবেমাত্র যৌবনে’ ফিরে গেছিল। বনানীর ওই আলো আধারির বারে, পরম যত্নে ফ্রুট প্ল্যাটার থেকে একটা একটা ফল খুব যত্ন সহকারে আবির ওকে মুখে তুলে খাওয়াইতেছিল ওই রাতে। অনেকটা জোর করে, অধিকার নিয়েই। স্নেহার সামনে ছিল ভদকার গ্লাস। একটা সময় ও শুধু ভদকাই খেত। হুইস্কির স্মেল তখন খুব একটা পছন্দ করতো না। আর এখন হুইস্কি উইদ রেড বুল ছাড়া খেতেই পারে না! এই অভ্যাস আবিরের কাছ থেকে পাওয়া। আগে দুইজন আলাদা আলাদা ভদকা-হুইস্কি খেলেও, লাস্ট পেগটা হুইস্কি নিয়ে হাফ-হাফ ভাগ করে খেত। ওইটা ছিল ওদের সিগনেচার এন্ডিং ড্রিংক। ওই রাতে ওর ভদকার গ্লাসের চারপাশে খুব যত্নে লেবুর কারুকার্য চালিয়ে ড্রিঙ্কে হালকা ভিট লবণ ছিটিয়ে দিতেছিল আবির। এরপর এরচেয়ে আরো বেশি যত্নে টিস্যু পেপার দিয়ে গ্লাসের বাইরে লেগে থাকা লেবুর রস মুছে ওকে খাওয়ার জন্য আগাইয়া দিতেছিল।
গল্পে গল্পে কখন যে ওরা একে অপরের হাত ধরছিল, ঠিক কোন প্রেক্ষাপটে, স্নেহার মেমোরিতে এখন আর ওই ইনসিডেন্ট ততটা স্পষ্ট না। তবে কোনো এক কথা বলতে কানের কাছে আবিরের মুখ আসতেই দুজনের মধ্যে চুম্বক আকর্ষণের মতো কিছু একটা ঘটছিল, ওই মোমেন্টটা ওর মেমোরিতে এখনো অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে উপস্থিত আছে। এর পর মুহূর্তে খুব স্পনটেইনিয়াসলিই ওরা বারের আবছা আলোতে একটা দীর্ঘ চুমুর ঘোরে চলে যায়। বার টেন্ডার, বাউন্সার অথবা ওদের মতো যারা অন্য কাস্টমার আছেন- কে তখন ওদের দেখতেছে বা কী ভাবতেছে, ওইসব এক মুহূর্তের জন্যও ওদের দুইজনকে বদার করতে পারে নাই তখন।
প্রথম চুমু খাওয়ার পর কিছুটা সরে গিয়ে আবার ওরা এরচেয়ে দীর্ঘ আরেকটা চুমুতে হারিয়ে গেছিল কিছুটা সময়। এরপর আরো কিছুক্ষণ ভদকা-হুইস্কি আর আড্ডার পর মধ্যরাতের কাছাকাছি সময় স্নেহাকে ওর বাসায় ড্রপ করে দিয়ে আসতে চাইলো আবির। বাড়ি ফেরার পথে উবারের টয়োটা করোলার গাড়ির গ্লাস কিছুটা খোলা ছিল দুইজনের দুই পাশে। রাতের হালকা বাতাস আর সন্ধ্যা থেকে রাত অব্দি মদের নেশায় পুরাটা রাস্তায় আবার ওরা চুমুতে চুমুতে যেন মধ্য বয়সী থেকে পৌঁছে গেল সদ্য পা রাখা যুবক-যুবতীতে। বনানী থেকে কখন গাড়ি গিয়ে পৌঁছালো মোহাম্মদপুরে, দুইজনের কেউই তা টের পেল না। ওই রাতে বাসার নিচে নামিয়ে দেওয়ার সময় আবিরকে ফ্ল্যাট দেখতে যেতে ইনভাইট করে স্নেহা। উবারের গাড়িটা ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে বলে রাত পৌঁনে বারোটায় ওরা ফ্ল্যাটে উঠে। এরপর পাক্কা এক ঘণ্টা বাসার ইন্টারকমের ফোনটা বাজতেই থাকে, আবিরের ফোনে উবার ড্রাইভারেরও কল আসতে থাকে ক্রমাগত। কিন্তু ওদের দুইজনের কেউই ওই এক ঘণ্টা জগতের কোনো ডিস্টার্বেন্সেই বদার হয় না। পুরাটা সময় গভীর ঘোর আর ধ্যানে ওরা মগ্ন থাকলো একে অপরের ভেতরে।
টানা কয়েকদিন এরপর এভাবেই বনানীর বারে সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত অনেক গল্পে, অনেক ভালোলাগার ঘোরে কেটে গেল দুইজনের। আবির প্রথমদিনই ওকে জানিয়ে দিছিল, হি ইজ ম্যারিড। হি হ্যাজ অ্যা ডটার। ওই সময় আবির জানাইছিল, ওর ওয়াইফ এবরোডে আছেন। সঙ্গে এও বলছিল- থিংগস আর নট গোয়িং ওয়েল বিটউইন দেম। ওরা অনেকদিন যাবতই সেপারেট আছে, এমন তথ্যই স্নেহাকে দিছিল ও। আরো জানাইছিল, খুব সম্ভবত ওদের ডিভোর্স হয়ে যেতে পারে। যদিও এর পরবর্তী দুই বছরে এই কথা স্নেহা ওর মুখে বহুবার বহু ঘটনাতেও শুনছে। স্নেহার মনে আছে, ওই সময়ের কনভার্সেশনগুলাতে আবির ওর ওয়াইফকে ‘এক্স’ বলে সম্বোধন করতেছিল বারবার। হোয়্যার এজ দে ওয়্যার স্টিল লিগ্যালি ম্যারিড কাপল! তবে ওই মুহূর্তে আবির যা-ই বলতেছিল, স্নেহা ওটাকেই ধ্রুব সত্য ভেবে নিয়ে স্রোতের সঙ্গে গা ভাসিয়ে গেছে।
বহু বছর পর কোনো পুরুষের সান্নিধ্যে ওর ভেতর একটা এক্সাইটমেন্ট কাজ করতেছিল। এক ধরনের প্রশান্তিও ছিল ওই মুহূর্তগুলাতে। নাহ, সম্ভবত ভুল বলা হলো! জীবনে ওই রকম এক্সাইটমেন্ট আর প্রশান্তি এর আগে কখনোই ও এক্সপেরিয়েন্স করে নাই কোনো পুরুষের সঙ্গে। দ্যাট ওয়াজ সামথিং নিউ ফর হার। সামথিং এডভেঞ্চারাস, সামথিং টু এক্সপ্লোর! আর এ কারণেই ওই মুহূর্তগুলা দ্রুত হারিয়ে ফেলার ভয়টাও অবচেতন মনে ওর ভেতরে কাজ করতেছিল। নিজের কপাল সম্পর্কে ওর এত ভালো ধারণা ছিল যে ও খুব ভালো করেই জানতো- ওর জীবনে যা কিছু খুব প্রিয়, খুব বেশি দিন ওইসবের স্থায়িত্ব থাকে না। নিজের চমকপ্রদ ভাগ্যের ভবিষ্যত তাই ওই আনন্দের মুহূর্তগুলার ফাঁকে ফাঁকেই ওকে হঠাৎ হঠাৎ ভয়ও দেখাইতেছিল।
পরিচয়ের প্রথমদিনই আবির ওর সম্পর্কে সব বলে, শুধু একটা জিনিসই হাইড রাখে- প্রফেশনাল আইডেন্টিটি। ও ম্যারিড জানিয়ে স্নেহাকে আবির বলছিল, এতে যদি ওর সমস্যা থাকে যোগাযোগ রাখতে বা ও যদি এই যোগাযোগ আর না রাখতে চায়, দ্যাটস টোটালি ফাইন। ওই সিদ্ধান্তকে ও রেসপেক্ট করবে। স্নেহা ততক্ষণে আবিরে এতটাই মুগ্ধ হয়ে পড়ছিল, অন্যকিছু নিয়ে ভাবার অবকাশই ওর ছিল না। কিন্তু ওই যে, ওর চমকপ্রদ ভাগ্য! ওইটা ওর পিছু ছাড়বে কেন? পর পর কয়েকদিন টানা তীব্র আকর্ষণে ডেট করার পর আবির হুট করেই একদিন বারের মধ্যে এক ইন্টিমেট সিচ্যুয়েশনে স্নেহার ভেতর শঙ্কা ঢুকিয়ে দিয়ে বলে- স্নেহা, ইফ আই এভার গেট লস্ট, ডোন্ট ট্রাই টু ফাইন্ড মি। অথচ এর সামান্য আগেই প্রচণ্ড মায়া নিয়ে ও স্নেহাকে বলতেছিল- আমার যদি ক্ষমতা থাকতো, তোমাকে আমি আমার কাছে নিয়ে রেখে দিতাম। প্রচণ্ড ইন্টেন্স মোমেন্টের ভেতর হঠাৎ করেই ওর ওই কন্ট্রাডিক্টরি কথায় কিছুক্ষণ আগের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে ভাটা পড়ে স্নেহার।
প্রিয় কিছু হারানোর অবচেতন মনের ভয়টা সঙ্গে সঙ্গেই মাথা চাড়া দিয়ে জেগে উঠে। নিজেকে সামলে ও বলে- আই ডোন্ট লাইক দিস কাইন্ড অফ মিস্টিরিয়াস বিহেভিয়র, আবির। আই ডোন্ট লাইক ইট এট অল। যেটা বলার সরাসরি বলো। আবির সরাসরি কিছুই বলতে পারে না। চুপ হয়ে যায়। এরপরের দুই বছরও আবির সরাসরি কিছু বলতে পারছে খুব কম সময়ই। যখন বলছে, তখন হয়তো এমনভাবেই বলছে, যা তীরের মতো বুকে বিদ্ধ হয়ে স্নেহাকে প্রতিবার শুধু রক্তাক্তই করে গেছে। নয়তো বা ভুল সময় ভুলভাবে এক্সপ্রেস করে সুন্দর মোমেন্টগুলাকে ও নষ্ট করছে।
স্নেহা এখন বুঝতে পারে, এইটা আবিরের পারসোনালিটির সীমাবদ্ধতা। অথচ এর জন্য কত রাগ-অভিমান দিনের পর দিন ও আবিরের উপর করছে। ওইটাই হয়তো আবিরের ক্যারিক্টারিস্টিকস। ওইটাই ও। ওভাবেই ও বেড়ে উঠছে। ওভাবেই ও মানুষের সঙ্গে ডিল করে। হাজার চাইলেও তো তা পরিবর্তন করা সম্ভব না; তাতে অন্য কেউ কষ্ট পাক, বা না পাক। ওই সময় থেকেই স্নেহা টের পায়, সন্ধ্যার ফিজিক্যাল আবির আর দিনেরবেলায় টেক্সটের সোবার আবির- দুইটা সম্পূর্ণ ভিন্ন মানুষ! আবির যখন হুঁশে ফিরতো, তখন ওর ভেতর গিল্ট ফিল কাজ করতো। ও জানতো ওদের সম্পর্ককে ও কখনোই এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না। স্নেহাকে ওর ভালো লাগতো ঠিকই, কিন্তু ওর যে একটা সম্পূর্ণ ভিন্ন দুনিয়া ওই বারের বাইরে সুসজ্জিত অবস্থাতে আছে, মদের নেশা কাটলেই হয়তো তা মনে পড়তো ওর। এই কারণেই কিছুদিনের মধ্যে স্নেহার সঙ্গে হঠাৎ হঠাৎই ও উইয়ার্ড সব আচরণ শুরু করলো।
ক্লিয়ার কোনোকিছুই আবির বলতে পারতো না- তখনো, এরপরও। পরিচয়ের শুরুর কয়েকদিন পর ও শুধু বলতো- ইউ আর সো ডিফরেন্ট। আই হ্যাভ নেভার মেট সামওয়ান লাইক দ্যাট। ইউ আর নট লাইক দোজ ওম্যান আই মেট বিফোর। ইউ আর সো সফট, সো পিউর, সো সেন্সেটিভ। আই মিস ইউ, ইউর কোম্পানি। আই'ম লুজিং মাই শিট! ইট'স নট গুড ফর মি। আই ডোন্ট ওয়ান্ট এনি কমিটমেন্ট। নাইদার আই ক্যান মেক। ইউ ডিজার্ভ হ্যাপিনেস, বেটার ইন ইউর লাইফ।