কবরস্থানের কান্না
সেই রাতটার কথা আজও ভুলতে পারিনি।
ঘড়িতে তখন রাত ১টা ৪৩। চারদিক এতটাই নিস্তব্ধ ছিল যে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দও কানে বাজছিল। বাইরে হালকা কুয়াশা, আর দূরের কুকুরের মাঝে মাঝে ডেকে ওঠা—সব মিলিয়ে একটা অস্বাভাবিক চাপা ভয় তৈরি হচ্ছিল।
আমি তখন গ্রামে ছিলাম, নানার বাড়ি। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে, চারপাশে খোলা মাঠ, বাঁশঝাড় আর ঠিক বাড়ির পেছনেই একটা পুরোনো কবরস্থান। ছোটবেলা থেকেই শুনে এসেছি—ওই কবরস্থানে রাতে নাকি কেউ যায় না।
কারণ… সেখানে নাকি “কেউ” কাঁদে।
আমি এসব বিশ্বাস করতাম না। সবসময় ভাবতাম—এগুলো গ্রাম্য মানুষের কুসংস্কার।
কিন্তু সেদিন…
হঠাৎ করেই আমার ঘুম ভেঙে গেল। কেন ভাঙল বুঝতে পারছিলাম না। চারদিকে অন্ধকার, শুধু জানালা দিয়ে একটু চাঁদের আলো ঢুকছে। আমি উঠে বসতেই একটা শব্দ কানে এল।
কেউ… কাঁদছে।
প্রথমে মনে হলো ভুল শুনছি। কিন্তু না… আবারও এল।
ধীরে, চাপা, বুক ফাটা কান্না।
“হুহ… হুহ…”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
শব্দটা স্পষ্টই আসছে—বাড়ির পেছনের কবরস্থান থেকে।
আমি নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করলাম—হয়তো কোনো মানুষ, হয়তো কোনো পশু… কিন্তু সেই কান্নার মধ্যে এমন একটা যন্ত্রণা ছিল, যা স্বাভাবিক না।
কৌতূহল আর ভয়—দুটোই একসাথে কাজ করছিল।
আমি ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নামলাম। দরজাটা খুললাম খুব আস্তে, যাতে কোনো শব্দ না হয়।
বাইরে বের হতেই ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগল।
চারদিক নিস্তব্ধ। কিন্তু সেই কান্না… এখন আরও স্পষ্ট।
আমি হাঁটতে শুরু করলাম কবরস্থানের দিকে।
প্রতিটা পা ফেলতে ফেলতে মনে হচ্ছিল, কেউ যেন আমার পেছনে তাকিয়ে আছে।
বাঁশঝাড়ের ভেতর থেকে হালকা খসখস শব্দ আসছিল। কিন্তু পেছনে তাকানোর সাহস হচ্ছিল না।
কবরস্থানের গেটটা আধখোলা ছিল।
আমি থামলাম।
কান্নাটা এখন ঠিক সামনে থেকে আসছে।
ধীরে ধীরে গেট ঠেলে ভেতরে ঢুকলাম।
ভেতরে ঢুকেই একটা অদ্ভুত গন্ধ নাকে এল—ভেজা মাটি আর পচা ফুলের মিশ্রণ।
চাঁদের আলোয় সারি সারি কবর দেখা যাচ্ছে। কিছু পুরোনো, কিছু নতুন।
কান্নাটা আসছে ডান দিকের এক কোণা থেকে।
আমি এগোলাম।
হৃদপিণ্ড এত জোরে ধুকপুক করছিল যে মনে হচ্ছিল কেউ শুনে ফেলবে।
যত এগোচ্ছি, তত ঠান্ডা লাগছে। যেন হঠাৎ করে তাপমাত্রা কমে গেছে।
অবশেষে আমি তাকে দেখলাম।
একটা মেয়ে।
সাদা কাপড়ে ঢাকা, লম্বা চুল সামনে ঝুলে আছে।
সে একটা কবরের পাশে বসে আছে, মাথা নিচু করে… কাঁদছে।
আমি থেমে গেলাম।
গলা শুকিয়ে কাঠ।
আমি নিজেকে বোঝালাম—এটা হয়তো কোনো মানুষ, হয়তো কারো আত্মীয়…
আমি ধীরে ধীরে বললাম,
“কে… কে তুমি?”
মেয়েটা কান্না থামাল।
ধীরে… খুব ধীরে… সে মাথা তুলল।
আর তখনই আমি বুঝলাম—এটা মানুষ না।
তার মুখে কোনো চোখ নেই।
শুধু ফাঁকা কালো গর্ত… আর সেই গর্ত থেকে যেন অন্ধকার বের হচ্ছে।
তার ঠোঁট ফাঁক হয়ে আছে… আর সে এক অদ্ভুত বিকৃত হাসি দিল।
“তুমি… শুনতে পেয়েছো…” — সে ফিসফিস করে বলল।
আমার পা জমে গেল।
দৌড়াতে চাইছিলাম, কিন্তু শরীর নড়ছিল না।
সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল।
তার পা মাটিতে ছোঁয় না—ভাসছে।
“অনেকদিন পর কেউ আমার কান্না শুনল…”
তার গলার শব্দ যেন একসাথে অনেকগুলো মানুষের।
আমি পেছাতে লাগলাম।
হঠাৎ আমার পায়ের নিচে কিছু একটা চাপা পড়ল।
নিচে তাকিয়ে দেখি—একটা ভাঙা কবরফলক।
তাতে লেখা—
“মৃত্যু: ২০০৯
নাম: রিমা…”
আমি আবার তাকালাম সামনে।
মেয়েটা নেই।
চারদিকে নিস্তব্ধতা।
আমি ভাবলাম—সব শেষ। হয়তো আমি বেঁচে গেছি।
ঠিক তখনই…
আমার কানের কাছে ঠান্ডা নিঃশ্বাস।
“আমি এখানেই আছি…”
আমি ধীরে ধীরে মাথা ঘুরালাম।
সে… আমার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে।
এবার তার মুখ একদম কাছে।
আর সেই ফাঁকা চোখের গর্তের ভেতর যেন কিছু নড়ছে।
হঠাৎ সে আমার হাত ধরে ফেলল।
তার হাত বরফের মতো ঠান্ডা… আর অস্বাভাবিক শক্ত।
“আমাকে… কেউ ছাড়েনি…”
“আমাকে… মাটির নিচে রেখে গেছে… জীবিত…”
আমার শরীর কেঁপে উঠল।
সে হঠাৎ চিৎকার করে কাঁদতে শুরু করল—
এত জোরে, এত বিকৃতভাবে… যেন পুরো কবরস্থান কেঁপে উঠছে।
চারপাশের সব কবর থেকে যেন ফিসফিস শব্দ আসতে লাগল।
“আমাদেরও… শোনো…”
“আমাদেরও…”
আমি আর থাকতে পারলাম না।
সর্বশক্তি দিয়ে হাত ছাড়িয়ে দৌড় দিলাম।
পেছন থেকে সেই কান্না, সেই চিৎকার, সেই ফিসফিস—সব একসাথে আসছিল।
আমি দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়িতে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলাম।
সারা রাত জেগে ছিলাম।
ভোর হলে সাহস করে আবার কবরস্থানের দিকে গেলাম।
সব কিছু স্বাভাবিক।
কিন্তু…
যে জায়গায় মেয়েটাকে দেখেছিলাম, সেখানে একটা নতুন কবর।
মাটিটা একদম তাজা।
আর তার ওপর একটা ছোট কাগজ।
আমি কাঁপা হাতে সেটা তুলে পড়লাম।
লেখা ছিল—
“তুমি শুনেছো…
তুমি আবার আসবে…”
সেই রাতের পর আমি আর কখনো ওই গ্রামে যাইনি।
কিন্তু মাঝে মাঝে…
গভীর রাতে…
ঘুম ভেঙে গেলে…
আমি এখনও শুনতে পাই—
দূরে কোথাও…
কেউ কাঁদছে।
আর কখনো কখনো…
আমার কানের কাছে ফিসফিস করে—
“ফিরে এসো…”
(এগুলো কল্পনাভিত্তিক গল্প কেউ সিরিয়াস নেবেন না)
(সকল পর্ব এসে গেছে সার্চ করে অথবা চ্যানেলে গিয়ে দেখুন, পর্ব ৩ পর্যন্ত আছে।