দিনের বেলার আবির সন্ধ্যাবেলায় বারে ঢুকলেই হয়ে যেত আরেক মানুষ। ড্রিংক করছে। দেশ-বিদেশের নানা রকম সব গল্প বলছে। গান, কবিতা, ধর্ম, রাজনীতি, দর্শন…কী ছিল না তাদের কনভার্সেশনে! এত স্বতঃস্ফূর্ত ওদের প্রতিটা মুহূর্ত! মাঝে মাঝে স্নেহার চন্দ্রিমার ফ্ল্যাটে অদ্ভুত ইনটেন্স রাত থেকে ভোর কাটতো তাদের। স্নেহার কাছে সেসব স্বপ্নের মতো, খুব শিগগিরই স্বপ্ন ভেঙে যাবে, এটা অবশ্য মাঝে মাঝেই তার গাট ফিলিং তাকে সতর্ক করার ট্রাই করতেছিল।
আবিরের ব্যক্তিত্বের, আবিরের পোলাইটনেসের আকর্ষণে স্নেহা এতটাই অন্ধ হয়ে গেছিল যে কোনো গাট ফিলিংকেই সে আমলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে নাই তখন। এরমধ্যে দুইজনের ব্লক-আনব্লক খেলাও চলছে কয়েকদিন। আবির ব্লক করে আবার আনব্লক করছিল। স্নেহা এই ব্লক-আনব্লকের খেলা দেখে মজা করে আবিরকে খোঁচা মারা টেক্সট করার পর আবার সব ঠিক হয়ে যায়, কথাও শুরু হয়, দেখাও।
তবে মাস খানিকের মধ্যেই স্নেহার গাট ফিলিং সত্য হয়ে সামনে আসে। একটা চমৎকার সন্ধ্যা থেকে ভোর একসঙ্গে কাটানোর পর ডিসেম্বরের ঠান্ডা রাতে প্রচণ্ড সুন্দর আর আরামের একটা ঘুম দেয় দুইজনই। ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝেই আবির কেঁপে উঠলে স্নেহা পিঠে হাত বুলাতো, তাতে আবিরের কাঁপা বন্ধ হয়ে যেত। ওইদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে আবির স্নেহাকে ওর অফিসের কাছে নামিয়ে দিয়ে আদাবরে ওর খালার বাসায় চলে যায়।
অফিসে গিয়েও আগের রাতের ঘোর কাটে না স্নেহার। বেশ খোশ মেজাজে কাজ করতে করতে সে গান শুনতেছিল আর মাঝে মাঝে আবির খালার বাসায় পৌঁছালো কি না, অফিস যাবে কি না- এসব দুই-একটা টেক্সট আদান-প্রদান করে যাইতেছিল। এত সুন্দর সন্ধ্যা-রাত আর ভোর, এমন কী সকাল কাটানোর পর বিকালবেলা স্নেহার জন্য যে এমন এক সারপ্রাইজ আবির ভেবে-চিন্তে রাখছিল, এমনটা অন্তত ওইদিনের জন্য স্নেহা কল্পনা করে নাই। তবে আঁচ করতে পারতেছিল, খুব শিগগিরই হয়তো এমন কিছু ঘটতে পারে।
ওইদিন বিকালে হঠাৎই আবির টেক্সট করে জানতে চায় স্নেহা কী করতেছে, কাজে বিজি কি না…স্নেহার মন আর মস্তিষ্ক তখনও আগের রাতের সুন্দর মুহূর্তগুলার হ্যাংওভারে ছিল। সে ওইসব প্রশ্নের উত্তর দিতেছিল দুষ্টুমিতে, পুরাদমেই সদ্য প্রেমে পড়া এক প্রেমিকার মেজাজে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আবির লিখলো- স্নেহা, আই নিড টু মুভ অন। মাই এক্স ইজ ব্যাক। আই কান্ট ডু দিজ সিমালটেনিয়াসলি উইদ টু গার্লস। দ্যাটস হোয়াট আই'ম। মাই ওয়ার্ক, মাই এথিক্স অর হোয়াটএভার ইট'স রেস্ট্রিক্ট মি ফ্রম ডুয়িং ইট।
স্নেহা ওই মোমেন্টে ওই টেক্সটগুলা বিশ্বাস করতে পারতেছিল না। ও এতটাই শকড হয় ওই টেক্সটগুলা দেখে যে কী লিখবে বুঝতে পারে না। শুধু লেখে- ইয়া, শিওর। মুভ অন। বেস্ট অফ লাক ফর বোথ অফ ইউ। আবির লেখে, প্লিজ টেক কেয়ার অফ ইউরসেলফ। ইউ আর দ্য মোস্ট ওয়ান্ডারফুল ওম্যান আই হ্যাভ এভার মেট। আই'ম সর্যি। ইট'স টাফ বাট ইট'স রিকোয়ার্ড। সাইয়োনারা। শেষ টেক্সটের পর মুহূর্তেই স্নেহার নম্বরটা আবির ব্লক করে দেয় হোয়াটসঅ্যাপ থেকে।
পুরা ঘটনাটাই এত হুট করে ঘটে যে স্নেহা প্রসেস করতে পারে না কী ঘটলো আসলে। কেনই বা ঘটলো! এর আগের সারা সন্ধ্যা-রাত আবির ওর সঙ্গে ছিল। দে হ্যাড ওয়ান্ডারফুল মোমেন্টস টুগেদার। ওইদিন সকালে স্নেহাকে অফিসের কাছে নামিয়ে যখন আবির বিদায় নিতেছিল, স্নেহা কুডেন্ট ইভেন গেট এনি কাইন্ড অফ হিন্ট যে এমন কিছু ঘটতে পারে ওইদিন বিকালেই। হুট করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ওর এক্স ব্যাক করলো! কোত্থেকে করলো? এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সব ঠিকও হয়ে গেল? নাকি ও আগে থেকেই জানতো, শেষ একটা দিন স্নেহার সঙ্গে কাটাতে চাইছিল বলে কালকে এই ব্যাপারে কিছু বলে নাই ইচ্ছা করেই?
ওইদিন আর অফিসে কোনো কাজই স্নেহা করতে পারলো না। বাসায় চলে গেল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কতক্ষণ ঘরের ভেতর, আবার কতক্ষণ ব্যালকনিতে পায়চারি করে স্নেহা উত্তর খুঁজতে থাকলো নানা প্রশ্নের। কিন্তু কিছুতেই কিছু মিলাতে পারলো না। সন্ধ্যা পার হয়ে রাত, রাত পার হয়ে মধ্যরাত…স্নেহার অস্থিরতা বাড়া শুরু হলো। ও তখনও ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারতেছিল না। মনে করতেছিল কয়দিন আগে যেমন আবির ব্লক-আনব্লক খেলতেছিল, এবারও বোধহয় তাই করতেছে। দুইদিন পর ঠিকই আবার আনব্লক করে দেবে।
একদিন…দুইদিন…তিনদিন…চারদিন…সময় যেতে থাকে, আবির আর আনব্লক করে না। এরমধ্যেই আব্বার শরীর প্রচণ্ড খারাপ হওয়ায় টাটা মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যেতে হয় ইমার্জেন্সি। স্নেহা ওই সময় যেতে পারে না ভিসা না থাকার কারণে। আম্মা একাই নিয়ে যায়। টাটাতে যাওয়ার একদিন পর আব্বার শরীর আরো বেশি খারাপ হয়ে পড়ে। আম্মা ফোন করে কান্নাকাটি শুরু করলে নিজেকে সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে স্নেহার।
আব্বার অবস্থার খবর শুনে দেরি না করে স্নেহা দ্রুতই ভিসার জন্য পাসপোর্ট জমা দেয় ইন্ডিয়ান ভিসা সেন্টারে। কবে ভিসা পাবে, তার নিশ্চয়তা নাই। মনটা অস্থির হয়ে আছে আব্বার জন্য। এরমধ্যে এই রকম উইয়ার্ড একটা আচরণ করে আবিরের ব্লক করে চলে যাওয়া স্নেহাকে ভীষণ এক মানসিক চাপের মধ্যে ফেলে। নিজের প্রতি ওর খুব বাজে একটা ফিল হওয়া শুরু হয় কেন জানি। এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ…পনেরদিনের মাথায় স্নেহার মানসিক অবস্থা পুরাপুরিই আনটলারেবল হয়ে উঠে।
ওই সময় একমাত্র রাকিনকেই স্নেহা সবকিছু বলতে পারতো। রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটানো স্নেহাকে রাকিন নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করতো ব্যাপারটাকে একটা এক্সিডেন্ট ভেবে ভুলে যাওয়ার ট্রাই করতে। মুখে ওইটা বললেও রাকিন স্নেহার মানসিক অবস্থা নিয়ে ভীষণ চিন্তাতে পড়ে গেছিল। এরমধ্যে কলকাতা থেকে খবর আসলো আব্বাকে ভেন্টিলেশনে নেওয়া হইছে, অবস্থা বেশ ক্রিটিক্যাল। স্নেহার ভিসা তখনও হয় নাই।
একদিকে আব্বাকে হারানোর ভয়, অন্যদিকে এত বিশ্রীভাবে অ্যাব্যান্ডন হওয়ার ফিলিং স্নেহার সেল্ফ এস্টিম ভেঙে চুরমার করে দিচ্ছিল। নিজের এগজিসটেন্স নিয়েই ও সন্ধিহান হয়ে পড়তেছিল বার বার। পৃথিবীর সমস্ত কিছুই ওর বড্ড বেশি অসহনীয় লাগা শুরু হলো। স্নেহা যখন চরম বিপর্যস্ত অবস্থাতে, ওই সময় হুট করেই একদিন বিকালে স্নেহার অফিসের নিচে রাকিন ওর কালো টয়োটা অ্যালিয়নটা নিয়ে হাজির হয়ে গেল। স্নেহাকে কল দিয়ে নিচে নামিয়ে ওই মুহূর্তেই নিয়ে গেল একজন সাইকোলজিস্টের কাছে।
পর পর টানা ৫ দিন সাইকোলজিস্টের কাছে গিয়েও স্নেহা হিলিং প্রসেসের ভেতর যেতে পারতেছিল না, বরং যতবার ওই ঘটনাগুলা নিয়ে সাইকোলজিস্টের সঙ্গে ও আলাপ করে বাসায় ফিরতেছিল, ততবারই ওর ব্রেকডাউন হইতেছিল। স্নেহার কন্ডিশন দেখে ওর সাইকোলজিস্টই একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে সাজেস্ট করলেন ৫ দিন পর। এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাইকিয়াট্রিক ডিপার্টমেন্টের হেড প্রফেসর ডাঃ ফারুক হোসেন স্নেহার পূর্বপরিচিত হওয়ায় স্নেহা দেরি না করে পরদিনই তার চেম্বারে গিয়ে হাজির হলো। ওইদিনই ফারুক ভাইয়ের কাছ থেকে স্নেহা প্রথম জানতে পারে ও বিপিডি বা বর্ডার লাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার নামের একটা মানসিক কন্ডিশন ফেস করতেছে ওই মুহূর্তে। এর আগ পর্যন্ত বিপিডি সম্পর্কে ওর কোনো ধারণাই ছিল না। বিপিডির কোনো সিম্পটমও ছিল না ওর মধ্যে।
একটা দীর্ঘ সময় স্নেহা একাই জীবন কাটাইছে। আবিরের সঙ্গে পরিচয়ের আগে প্রায় আট বছর নিজের সিঙ্গেল জীবন দিব্যি উপভোগ করতেছিল সে। এরমধ্যে অনেকেই স্নেহার জীবনে এসে চলেও গেছে, তাদের কারো চলে যাওয়াতে সামান্য উফ্ শব্দটুকুও স্নেহার মন-মুখ-মস্তিষ্ক থেকে বের হয়নি। এমন কী বিপুলের সঙ্গে ছয় বছরের সংসার জীবনের শেষটাও হইছিল একদম মন থেকে সব ধুয়ে-মুছেই। ঠিক যেই মুহূর্তে স্নেহা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল আর একদিনও বিপুলের সঙ্গে ও এক ছাদের নিচে থাকতে চায় না, ঠিক তখনই ও বের হয়ে আসতে পারছিল। অথচ আবিরের সঙ্গে মাত্র এক মাসের ঘনিষ্ঠতার পর ওর চলে যাওয়ার প্রভাব স্নেহার জীবনে এত ভয়াবহভাবে পড়বে, এমন কিছু স্নেহা কোনোদিন ভাবতে পারে নাই।
বহু বছর ধরে গড়ে তোলা স্নেহার স্ট্রং নারীর অবয়বটা মাত্র এক মাসের নৈকট্যে আবির পুরাপুরি ভেঙে গুঁড়া গুঁড়া করে দিয়ে গেল! নিজেকে এত ভার্নারেবল সিচ্যুয়েশনে ৩৬ বছরের জীবনে স্নেহা এর আগে কখনো দেখে নাই। এমন কী বিপুল যখন সংসার জীবনে জ্বলন্ত সিগারেট স্নেহার হাতে চেপে ধরে ড্রাগসের টাকা আদায় করতে চাইতো, ওই সময়ও স্নেহা ইস্পাত সমান দৃঢ় তার ব্যক্তিত্বকে বিলীন হতে দিত না। প্রতিবাদ করতো, বিপুলকে সংশোধনের চেষ্টা করতো। যেদিন থেকে মন থেকে বিপুলের ছায়াকে উঠিয়ে ফেলতে পারলো স্নেহা, এরপর পায়ে ধরে কেঁদে মাফ চেয়েও কোনো লাভ বিপুলের হয় নাই। স্নেহার ‘না’ মানে ‘না-ই’ ছিল।
খুব অল্প বয়সে একটা ট্রমাটিক সংসার জীবন পার করার পর কারো সঙ্গে আর সংসার করার সাধ, ইচ্ছা, আগ্রহ কোনোটাই স্নেহার কখনো জাগে নাই। অত্যন্ত সচেতনভাবে সে আর কোনোদিন কাউকে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিছিল বিপুলের সঙ্গে একদম কাগজে-কলমে বিচ্ছেদ ঘটার দিন থেকেই। আবিরকেও বিয়ে করার কোনো ইচ্ছা স্নেহার হয় নাই। ২০২৩ সালের ওই এক মাসের মধ্যে এমন ভাবনার তো প্রশ্নই উঠে না, পরবর্তী দুই বছরে যখন একটা সম্পর্কের ভেতর দিয়ে গেছে, তখনও না।
অতীতের ভাবনা থেকে বের হয়ে স্নেহা বারান্দায় তাকাতেই দেখলো ভোরের আলো বসুন্ধরার আই ব্লকের বারান্দার আঙিনাটায় এসে তাকে আরেকটা সকাল বেঁচে থাকার আর নিজের অস্তিত্বের উপস্থিতির প্রমাণ দিতেছে। এখনো ওয়েদার বেশ চমৎকার- একটা না বেশ গরম, না বেশ ঠান্ডা ভাবের মেজাজে অবস্থান করতেছে। স্নেহার মনে হলো এক কাপ ব্ল্যাক কফি বানিয়ে বারান্দায় বসে সকালটা উপভোগ করলে মন্দ হয় না! কিন্তু প্রায় ৪৮ ঘণ্টা টানা জেগে থাকা এবং রাতে খেজুর-ডিম-কলা খাওয়ার প্ল্যান করেও শেষ পর্যন্ত খালি পেটেই মিষ্টি চালানের ফলস্বরূপ স্নেহা ওর সমস্ত শরীরে এক ধরনের অসাড়তা টের পেল।
বাইরে ঠান্ডা বাতাস, ওয়েদারও চমৎকার, তবুও স্নেহা টের পেল অর শরীর ঘামতেছে দর দর করে। এই মুহূর্তে মিষ্টি কিছু মুখে দিলে হয়তো ঠিক লাগতো। প্রেশার ফল করছে সম্ভবত। এই ফ্ল্যাটে নিয়মিত না থাকার কারণে তেমন কিছুই রাখা হয় না ফ্রিজে। তবে রাকিনের মা হেলেনা আন্টি ওমরাহ থেকে ফিরে এক প্যাকেট খেজুর দিছিল স্নেহাকে, ওইটা এই বাসার ফ্রিজে কী মনে করে যেন ও এনে রাখছিল। কিন্তু খেজুর আনতে গেলেও তো কয়েক কদম হেঁটে তাকে ডাইনিং স্পেস পর্যন্ত যেতে হবে। স্নেহা টের পেল ওর মাথাটা ভয়ংকর রকম ঘুরানো শুরু করছে, সামনের সবকিছুই ঝাপসা হয়ে আসতেছে। চোখটা বন্ধ করে ও একবার পড়লো- লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।
ভোরের মিষ্টি আলোটা বারান্দা ভেদ করে স্নেহার ঘরে এসে ওর শরীরে লাগতেই ঐশ্বরিক একটা শক্তি ফিল করতে পারলো স্নেহা। এত দ্রুত এই জীবন শেষ হওয়ার না, সে খুব ভালো করেই তা জানে। এই জীবনের আরো অনেক ক্ষয় বাকি রয়ে গেছে, তিলে তিলে তা নিঃশেষ করবে এই শূন্য দেহটাকে। স্নেহা হাসে। ওর মনে পড়ে উমরাও জানের কথা। আবিরকে সে প্রায়ই বলতো, আবিরের জীবনে সে হইলো উমরাও জানের মতো। রেখা-ফারুক শেখের ওই মুভিটা বেশ কয়েকবার আবিরকে দেখতে সাজেস্টও করছিল স্নেহা। তবে গল্পের প্লট কিছুটা শেয়ার করাতে সম্ভবত ও তেমন একটা আগ্রহ পায় নাই দেখার, বিশেষ করে নিজেকে কেন স্নেহা আবিরের জীবনের উমরাও জান বলতো, এইটা বোঝার পরই সম্ভবত ও আরো বেশি অনাগ্রহী হইছে। এটা মনে করে অনেকটা উচ্চস্বরেই হেসে দিয়ে স্নেহা গাইতে থাকলো-
"ইস আঞ্জুমান মেঁ আপকো আনা হ্যায় বার বার
দিওয়ার ও দার কো গোউর সে পেহছান লিজিয়ে
দিল চিজ ক্যায়া হ্যায় আপ মেরি জান লিজিয়ে…"
স্নেহার মনে পড়ে সে উমরাও জান নামে একটা কবিতাও লিখছিল গত বছর সেপ্টেম্বরের দিকে। নো ডাউট যে ওইটা আবিরের উদ্দেশ্যেই লেখা। এইখানে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকার কথাই না! নিজের কবিতা যদিও তার মুখস্ত থাকে না, তবু সে ওই কবিতাটা মনে করার চেষ্টা করলো। কারো কবিতাই তার মুখস্ত না। সিলভিয়া, পো, নেরুদা আর জীবনানন্দের দুই একটা কবিতার লাইন হয়তো তার মনে আছে। ওহ নাহ, জয় গোস্বামীর স্নান আর মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়ের কয়েকটা লাইনও বোধহয় তার মনে আছে। ওহ অফকোর্স! মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়ের লাইন সে কীভাবে ভুলতে পারে, নিজেকেই বলে স্নেহা! সঙ্গে সঙ্গেই সে ওইখান থেকে তার প্রিয় লাইনগুলা আবৃত্তি শুরু করলো-
"বেণীমাধব, বেণীমাধব, এতদিনের পরে
সত্যি বলো, সে সব কথা এখনো মনে পড়ে?
সে সব কথা বলেছো তুমি তোমার প্রেমিকাকে?
আমি কেবল একটি দিন তোমার পাশে তাকে
দেখেছিলাম আলোর নীচে; অপূর্ব সে আলো!
স্বীকার করি, দুজনকেই মানিয়েছিল ভালো
জুড়িয়ে দিলো চোখ আমার, পুড়িয়ে দিলো চেখ
বাড়িতে এসে বলেছিলাম, ওদের ভালো হোক…"
হা হা হা! স্নেহা আবার উচ্চস্বরে হেসে উঠে। সমস্ত ফ্ল্যাটটা গম গম করে উঠে ওর ওই উচ্চস্বরের হাসিতে। স্নেহা এই মুহূর্তে যেইভাবেই হোক তার উমরাও জান কবিতাটা মনে করার চেষ্টা করলো। এটা সে আজকে সকালের সার্ভাইবাল টাস্ক হিসেবে নিয়ে ফেললো একেবারে। এরপর তার ভাবনায় আসলো- এই মুহূর্তে ফয়েল পেপারের কারুকার্যে বিরতি দিতে হবে অন্তত ঘণ্টা খানিকের জন্য। নতুন একশ টাকা নোট দিয়ে বানানো পাইপ, পাঁচ টাকার কয়েন, সুঁইমাথার লাইটার আর হেল্পার লাইটারসহ অর্ধেক গলা মিষ্টিসমেত ফয়েল পেপারটাকে সে এক পাশে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখলো। এরপর স্পটিফাইতে উমরাও জানের দিল চিজ ক্যায়া হ্যায় আপ মেরি ছেড়ে সোজা চলে গেল ওয়াশরুমে।
আশা ভোসলের চমৎকার নাটখাটি সিডাক্টিভ ভয়েজে বেশ কয়েকবার একই লাইন "ইস আঞ্জুমান মেঁ আপকো…ইস আঞ্জুমান মেঁ আপ…ইস আঞ্জুমান মেঁ আপকো…ইস আঞ্জুমান মেঁ আপকো…আনা হ্যায় বার বার…আনা হ্যায় বার বার…" শুনতে শুনতে ওয়াশরুমের বেসিন থেকে পানি নিয়ে ক্রমাগত মুখে ঝাপটা দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের লেখা উমরাও জান কবিতাটা স্নেহার মনে পড়লো। এরপর সে কিচেনে ঢুকে চটপট একটা ব্ল্যাক কফি বানিয়ে বারান্দার ফ্লোরে বসে নিজের লেখা ওই উমরাও জান কবিতাটা আবৃত্তি করা শুরু করলো-
আমারে কোনোদিন ‘ভালোবাসো নাই’র চেয়ে
কম দুঃখজনক-
তোমারে ‘না পাওয়া’ লাগে।
কোন দুঃখের দিকে তাকাইলে
কোন দুঃখরে ইগনোর করা যাবে-
জগৎ অযৌক্তিক লাগে এইসব ভাবনায়।
তোমার আধো সত্য, আধো মিথ্যার চেয়ে
কম দুঃখজনক-
আমারে কোনোদিন ‘ভালোবাসলা না’রে লাগে।
তাও ভালো; কোনো এক দুঃখের রাতে,
নেরুদার মতো লিখতে হবে না আমারেও-
“আমি তারে ভালোবাসতাম
কদাচিৎ আমারে ভালোবাসতো সেও।"
বরং লেখা যাইতে পারে চাইলে-
সে আমারে পুরাটাই পাইলো,
আমি তারে পাইছিলাম কখনো কখনো...
কবিতাটা পড়া শেষ করে স্নেহা একটা বিদ্রুপের হাসি ছুঁড়ে দিলো নিজের উদ্দেশ্যে! এরপর ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিতে দিতে আবার চলে গেল ডিসেম্বর, ২০২৩ এর মেমোরিতে! ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৩ থেকে জানুয়ারি ৭, ২০২৪! মাত্র ২৬ দিন! আবিরকে ফিরে আসতে হইছিল স্নেহার কাছে। তবে সেটা নিজের ইচ্ছায় না, অনেকটা বাধ্য হয়ে। নিজের অবস্থান ক্লিয়ার করে ক্ষমা চাওয়ার জন্য। এর মাত্র কয়েকদিন আগেই লিঙ্কডইন ঘাটাতে গিয়ে স্নেহা আবিরের আইডি আবিষ্কার করে, ওর আসল পরিচয়ও। দ্যাট ওয়াজ সো শকিং ফর স্নেহা। ওইটা দেখার পর অনেকক্ষণ ধরে নিজেকে একটা পরিত্যক্ত টিস্যুর মতো ফিল হইতেছিল তার। সে ডিল করতে পারলো না ব্যাপারটা। তার মনে হলো আবির রাষ্ট্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীর পাওয়ারফুল পজিশন হোল্ড করে বলেই ওকে এভাবে হুট করেই একটা লেইম এক্সকিউজ দিয়ে অ্যাব্যান্ডন করে যেতে পারছে।
কোনোভাবেই ওই ভাবনা সে প্রসেস করতে পারতেছিল না ব্রেনে। লিঙ্কডইনে স্নেহা আবিরকে একটা টেক্সটও করে নিজের এই পরিচয় লুকানোর কারণ জানতে চেয়ে। আবির ওই টেক্সট পাওয়ার পর ওইখান থেকেও স্নেহাকে ব্লক করে দেয়। সেদিন ছিল ডিসেম্বরের ২৭ তারিখ। এর মাত্র ১১ দিন পর ৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের শেষ বিতর্কিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যস্ততম সন্ধ্যায় স্নেহার হোয়াটসঅ্যাপে একটা আননৌন নম্বর থেকে টেক্সট আসে- হ্যালো!
চলবে…