Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: উমরাও জান

March 30, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

120
View

দিনের বেলার আবির সন্ধ্যাবেলায় বারে ঢুকলেই হয়ে যেত আরেক মানুষ। ড্রিংক করতেছে। দেশ-বিদেশের নানা রকম সব গল্প বলতেছে। গান, কবিতা, ধর্ম, রাজনীতি, দর্শন…কী ছিল না ওদের কনভার্সেশনে! এত স্বতঃস্ফূর্ত ছিল প্রতিটা মুহূর্ত! মাঝে মাঝে স্নেহার চন্দ্রিমার ফ্ল্যাটে অদ্ভুত ইনটেন্স রাত থেকে ভোর কাটতো দুইজনের। স্নেহার কাছে ওইসব স্বপ্নের মতোই মনে হতো। খুব শিগগিরই স্বপ্ন ভেঙে যাবে, এটা অবশ্য মাঝে মাঝেই ওর গাট ফিলিং ওকে সতর্ক করার ট্রাই করতেছিল।

আবিরের ব্যক্তিত্বের, আবিরের পোলাইটনেসের আকর্ষণে স্নেহা এতটাই অন্ধ হয়ে গেছিল, কোনো গাট ফিলিংকেই তখন ও আমলে নেওয়ার প্রয়োজন বোধ করে নাই। এরমধ্যে দুইজনের একবার ব্লক-আনব্লক খেলাও চলছে কয়েকদিন। আবির ব্লক করে আবার আনব্লক করছিল। স্নেহা এই ব্লক-আনব্লকের খেলা দেখে মজা করে আবিরকে খোঁচা মারা টেক্সট করার পর আবার সব ঠিক হয়ে যায়, কথাও শুরু হয়, দেখাও।

তবে মাস খানিকের মধ্যেই স্নেহার গাট ফিলিংটা সত্য হয়ে সামনে আসে। একটা চমৎকার সন্ধ্যা থেকে ভোর একসঙ্গে কাটানোর পর ডিসেম্বরের শীতের রাতে প্রচণ্ড সুন্দর আর আরামের একটা ঘুম দেয় দুইজনই। ঘুমের মধ্যে মাঝে মাঝেই আবির কেঁপে ওঠলে স্নেহা পিঠে হাত রাখতেই কাঁপা বন্ধ হয়ে যেত। ওইদিন সকালে ঘুম থেকে ওঠে আবির স্নেহাকে ওর অফিসের কাছে নামিয়ে দিয়ে আদাবরে ওর খালার বাসায় চলে যায়।

অফিসে গিয়েও আগের রাতের ঘোর কাটে না স্নেহার। বেশ খোশ মেজাজে কাজ করতে করতে ও গান শুনতেছিল আর মাঝে মাঝে আবির খালার বাসায় পৌঁছালো কি না, অফিস যাবে কি না- এসব দুই-একটা টেক্সট আদান-প্রদান করে যাইতেছিল। এত সুন্দর সন্ধ্যা-রাত আর ভোর, এমন কী সকাল কাটানোর পর বিকালবেলা স্নেহার জন্য যে এমন এক সারপ্রাইজ আবির ঠিক করে রাখছিল, এমনটা অন্তত ওইদিনের জন্য স্নেহা কল্পনাও করে নাই। তবে আঁচ করতে পারতেছিল খুব শিগগিরই হয়তো এমন কিছু ঘটতে পারে।

ওইদিন বিকালে হঠাৎই আবির টেক্সট করে জানতে চায় স্নেহা কী করতেছে, কাজে বিজি কি না। স্নেহার মন আর মস্তিষ্ক তখনও আগের রাতের সুন্দর মুহূর্তগুলার হ্যাংওভারে ছিল। ও ওইসব প্রশ্নের উত্তর দিতেছিল দুষ্টুমিতে। পুরাদমেই সদ্য প্রেমে পড়া এক প্রেমিকার মেজাজে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরই আবির লিখলো- স্নেহা, আই নিড টু মুভ অন। মাই এক্স ইজ ব্যাক। আই কান্ট ডু দিজ সিমালটেনিয়াসলি উইথ টু গার্লস। দ্যাটস হোয়াট আই'ম। মাই ওয়ার্ক, মাই এথিক্স অর হোয়াটএভার ইট'স রেস্ট্রিক্ট মি ফ্রম ডুয়িং ইট।

স্নেহা ওই মোমেন্টে ওই টেক্সটগুলা বিশ্বাস করতে পারতেছিল না। ও এতটাই শকড হয় ওই টেক্সট দেখে যে উত্তরে কী লিখবে বুঝতে পারে না। অনেকক্ষণ ভাবার পর শুধু লেখে- ইয়া, শিওর। মুভ অন। বেস্ট অফ লাক ফর বোথ অফ ইউ। আবির লেখে, প্লিজ টেক কেয়ার অফ ইউরসেলফ। ইউ আর দ্য মোস্ট ওয়ান্ডারফুল ওম্যান আই হ্যাভ এভার মেট। আই'ম সর‍্যি। ইট'স টাফ, বাট ইট'স রিকোয়ার্ড। সাইয়োনারা। শেষ টেক্সটের পর মুহূর্তেই স্নেহার নম্বরটা আবির ব্লক করে দেয় হোয়াটসঅ্যাপ থেকে।

পুরা ঘটনাটা এত হুট করেই ঘটে যে স্নেহা প্রসেস করতে পারে না কী ঘটলো আসলে। কেনই বা ঘটলো! এর আগের দিন সারা সন্ধ্যা-রাত আবির ওর সঙ্গে ছিল। দে হ্যাড ওয়ান্ডারফুল মোমেন্টস টুগেদার। ওইদিন সকালে স্নেহাকে অফিসের কাছে নামিয়ে যখন আবির বিদায় নিতেছিল, স্নেহা কুডেন্ট ইভেন গেট এনি কাইন্ড অফ হিন্ট যে এমন কিছু ঘটতে পারে বিকালবেলাতেই। হুট করে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ওর এক্স ব্যাক করলো? কোত্থেকে করলো? এই কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সব ঠিকও হয়ে গেল? নাকি ও আগে থেকেই জানতো? শেষ একটা দিন স্নেহার সঙ্গে কাটাতে চাইছিল বলে কালকে এই ব্যাপারে কিছু বলে নাই ইচ্ছা করেই?

ওইদিন আর অফিসে কোনো কাজই স্নেহা করতে পারলো না। বাসায় চলে গেল। ঘণ্টার পর ঘণ্টা কতক্ষণ ঘরের ভেতর, কতক্ষণ ব্যালকনিতে পায়চারি করে উত্তর খুঁজতে থাকলো নানা প্রশ্নের। কিন্তু কিছুতেই কিছু মিলাতে পারলো না। সন্ধ্যা পার হয়ে রাত, রাত পার হয়ে মধ্যরাত…স্নেহার অস্থিরতা বাড়া শুরু হলো। ও তখনও ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারতেছিল না। মনে করতেছিল, কয়দিন আগে যেমন আবির ব্লক-আনব্লক খেলতেছিল, এবারও বোধহয় তাই করতেছে। দুইদিন পর ঠিকই আবার আনব্লক করে দেবে।

একদিন…দুইদিন…তিনদিন…চারদিন…সময় যেতে থাকে, আবির আর আনব্লক করে না। এরমধ্যেই আব্বার শরীর প্রচণ্ড খারাপ হওয়ায় টাটা মেডিকেল সেন্টারে নিয়ে যেতে হয় ইমার্জেন্সি। স্নেহা ওই সময় যেতে পারে না ভিসা না থাকার কারণে। আম্মা একাই নিয়ে যায়। টাটাতে যাওয়ার একদিন পর আব্বার শরীর আরো বেশি খারাপ হয়ে পড়ে। আম্মা ফোন করে কান্নাকাটি শুরু করলে নিজেকে সামলানো মুশকিল হয়ে পড়ে স্নেহার।

আব্বার অবস্থার খবর শুনে দেরি না করে স্নেহা দ্রুতই ভিসার জন্য পাসপোর্ট জমা দেয় ইন্ডিয়ান ভিসা সেন্টারে। কবে ভিসা পাবে, এর নিশ্চয়তা নাই। মনটা ওর অস্থির হয়ে থাকে আব্বার জন্য। এরমধ্যে এই রকম উইয়ার্ড একটা আচরণ করে আবিরের ব্লক করে চলে যাওয়া স্নেহাকে ভীষণ এক মানসিক চাপের মধ্যে ফেলে। নিজের প্রতি ওর খুব বাজে একটা ফিল হওয়া শুরু হয়। এক সপ্তাহ, দুই সপ্তাহ…পনেরদিনের মাথায় স্নেহার মানসিক অবস্থা পুরাপুরিই আনটলারেবল হয়ে ওঠে।

ওই সময় একমাত্র রাকিনকেই স্নেহা সবকিছু বলতে পারতো। রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটানো স্নেহাকে রাকিন নানাভাবে বোঝানোর চেষ্টা করতো ব্যাপারটাকে একটা এক্সিডেন্ট ভেবে ভুলে যাওয়ার ট্রাই করতে। মুখে ওইটা বললেও রাকিন স্নেহার মানসিক অবস্থা নিয়ে ভীষণ চিন্তাতে পড়ে গেছিল। এরমধ্যে কলকাতা থেকে খবর আসলো আব্বাকে ভেন্টিলেশনে নেওয়া হইছে, অবস্থা বেশ ক্রিটিক্যাল। স্নেহার ভিসা তখনও হয় নাই।

একদিকে আব্বাকে হারানোর ভয়, অন্যদিকে এত বিশ্রীভাবে অ্যাব্যান্ডন হওয়ার ফিলিং স্নেহার সেল্‌ফ এস্টিম ভেঙে চুরমার করে দিতেছিল। নিজের এগজিসটেন্স নিয়েই ও সন্ধিহান হয়ে পড়তেছিল বার বার। পৃথিবীর সমস্ত কিছুই ওর বড্ড বেশি অসহনীয় লাগা শুরু হলো। স্নেহা যখন চরম বিপর্যস্ত অবস্থায়, ওই সময় হুট করেই একদিন বিকালে ওর অফিসের নিচে রাকিন কালো টয়োটা অ্যালিয়নটা নিয়ে হাজির হয়ে গেল। স্নেহাকে কল দিয়ে নিচে নামিয়ে ওই মুহূর্তেই নিয়ে গেল একজন সাইকোলজিস্টের কাছে।

পর পর টানা ৫ দিন সাইকোলজিস্টের কাছে গিয়েও স্নেহা হিলিং প্রসেসের ভেতর যেতে পারতেছিল না। বরং যতবার ওই ঘটনাগুলা নিয়ে সাইকোলজিস্টের সঙ্গে ও আলাপ করে বাসায় ফিরতেছিল, ততবারই ওর ব্রেকডাউন হইতেছিল। স্নেহার কন্ডিশন দেখে ওর সাইকোলজিস্টই একজন সাইকিয়াট্রিস্ট দেখাতে সাজেস্ট করলেন।

এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সাইকিয়াট্রিক ডিপার্টমেন্টের হেড প্রফেসর ডাঃ ফারুক হোসেন স্নেহার পূর্বপরিচিত হওয়ায় দেরি না করে পরদিনই ও তার চেম্বারে গিয়ে হাজির হয়। ওইদিনই ফারুক ভাইয়ের কাছ থেকে স্নেহা প্রথম জানতে পারে ও বিপিডি বা বর্ডার লাইন পারসোনালিটি ডিজঅর্ডার নামের একটা মানসিক কন্ডিশন ফেস করতেছে ওই সময়। এর আগ পর্যন্ত বিপিডি সম্পর্কে ওর কোনো ধারণাই ছিল না। বিপিডির কোনো সিম্পটমও ছিল না ওর মধ্যে।

একটা দীর্ঘ সময় স্নেহা একাই জীবন কাটাইছে। আবিরের সঙ্গে পরিচয়ের আগে প্রায় আট বছর নিজের সিঙ্গেল জীবন দিব্যি উপভোগ করতেছিল ও। এরমধ্যে অনেকেই স্নেহার জীবনে এসে চলেও গেছে। তাদের কারো চলে যাওয়াতে সামান্য উফ্‌ শব্দটুকুও স্নেহার মন-মুখ-মস্তিষ্ক থেকে বের হয় নাই কখনী। এমন কী বিপুলের সঙ্গে ছয় বছরের সংসার জীবনের শেষটাও হইছিল একদম মন থেকে সব ধুয়ে-মুছেই। ঠিক যেই মুহূর্তে স্নেহা সিদ্ধান্ত নিতে পারছিল আর একদিনও বিপুলের সঙ্গে ও এক ছাদের নিচে থাকতে চায় না, ঠিক তখনই ও বের হয়ে আসতে পারছিল। অথচ আবিরের সঙ্গে মাত্র এক মাসের ঘনিষ্ঠতার পর ওর চলে যাওয়ার প্রভাব স্নেহার জীবনে এত ভয়াবহভাবে পড়বে, এমন কিছু ও কোনোদিন ভাবতেই পারে নাই।

বহু বছর ধরে গড়ে তোলা স্নেহার স্ট্রং নারীর অবয়বটা মাত্র এক মাসের নৈকট্যে আবির পুরাপুরি ভেঙে গুঁড়া গুঁড়া করে দিয়ে গেল! নিজেকে এত ভার্নারেবল সিচ্যুয়েশন ৩৬ বছরের জীবনে স্নেহা এর আগে কখনো দেখে নাই। এমন কী বিপুল যখন সংসার জীবনে জ্বলন্ত সিগারেট স্নেহার হাতে চেপে ধরে ড্রাগসের টাকা আদায় করতে চাইতো, ওই সময়ও স্নেহা ইস্পাত সমান দৃঢ় ওর ব্যক্তিত্বকে বিলীন হতে দিত না। প্রতিবাদ করতো, বিপুলকে সংশোধনের চেষ্টাও করতো। যেদিন মন থেকে বিপুলের ছায়াকে ও ওঠিয়ে ফেলতে পারছিল, এরপর পায়ে ধরে কেঁদে মাফ চেয়েও কোনো লাভ বিপুলের হয় নাই। স্নেহার ‘না’ মানে ‘না-ই’ ছিল।

খুব অল্প বয়সে একটা ট্রমাটিক সংসার জীবন পার করার পর কারো সঙ্গে আর সংসার করার সাধ, ইচ্ছা, আগ্রহ কোনোটাই স্নেহার আর কখনো জাগে নাই। অত্যন্ত সচেতনভাবে ও কোনোদিন আর কাউকে বিয়ে না করার সিদ্ধান্ত নিছিল বিপুলের সঙ্গে একদম কাগজে-কলমে বিচ্ছেদ ঘটার দিনই। আবিরকেও বিয়ে করার কোনো ইচ্ছা স্নেহার হয় নাই। ২০২৩ সালের ওই এক মাসের মধ্যে এমন ভাবনার তো প্রশ্নই ওঠে না, পরবর্তী দুই বছরে যখন ওরা একটা সম্পর্কের ভেতর দিয়ে গেছে, তখনও না।

অতীতের ভাবনা থেকে বের হয়ে স্নেহা বারান্দায় তাকাতেই দেখলো ভোরের আলো বসুন্ধরার আই ব্লকের বারান্দার আঙিনাটায় এসে আরেকটা সকাল বেঁচে থাকায় স্নেহাকে ওর অস্তিত্বের উপস্থিতির ফিলিংটা দিয়ে গেল। এখনো ওয়েদার বেশ চমৎকার- একটা না বেশ গরম, না বেশ ঠান্ডা ভাবের মেজাজে অবস্থান করতেছে। স্নেহার মনে হলো এক কাপ ব্ল্যাক কফি বানিয়ে বারান্দায় বসে সকালটা উপভোগ করলে মন্দ হয় না! কিন্তু প্রায় ৪৮ ঘণ্টা টানা জেগে থাকা এবং রাতে খেজুর-ডিম-কলা খাওয়ার প্ল্যান করেও শেষ পর্যন্ত খালি পেটেই মিষ্টি চালানের ফলস্বরূপ ওর সমস্ত শরীরে ও এক ধরনের অসাড়তা টের পেল।

বাইরে ঠান্ডা বাতাস, ওয়েদারও চমৎকার। তবুও স্নেহা টের পেল ওর শরীর ঘামতেছে দর দর করে। এই মুহূর্তে মিষ্টি কিছু মুখে দিলে হয়তো ঠিক লাগতো। প্রেশার ফল করছে সম্ভবত। এই ফ্ল্যাটে নিয়মিত না থাকার কারণে তেমন কিছুই রাখা হয় না ফ্রিজে। তবে রাকিনের আম্মি হেলেনা আন্টি ওমরাহ থেকে ফিরে এক প্যাকেট খেজুর দিছিল স্নেহাকে। ওইটা এই বাসার ফ্রিজে কী মনে করে যেন ও এনে রাখছিল। কিন্তু খেজুর আনতে গেলেও তো কয়েক কদম হেঁটে ওকে ডাইনিং স্পেস পর্যন্ত যেতে হবে। স্নেহা টের পেল ওর মাথাটা ভয়ংকর রকম ঘুরানো শুরু করছে। সামনের সবকিছুই ঝাপসা হয়ে আসতেছে। চোখটা বন্ধ করে ও একবার পড়লো- লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ।

ভোরের মিষ্টি আলোটা বারান্দা ভেদ করে স্নেহার ঘরে এসে ওর শরীরে লাগতেই ঐশ্বরিক একটা শক্তি ফিল করতে পারলো ও। এত দ্রুত এই জীবন শেষ হওয়ার না, তা ও খুব ভালো করেই জানে। এই জীবনের আরো অনেক ক্ষয় বাকি রয়ে পড়ে আছে। তিলে তিলে তা নিঃশেষ করবে এই শূন্য দেহটাকে। স্নেহা হাসে। ওর মনে পড়ে উমরাও জানের কথা। আবিরকে ও প্রায়ই বলতো, আবিরের জীবনে ও হলো উমরাও জানের মতো। রেখা-ফারুক শেখের ওই ফিল্মটা বেশ কয়েকবার আবিরকে দেখতে সাজেস্টও করছিল স্নেহা। তবে গল্পের প্লট কিছুটা শেয়ার করাতে সম্ভবত ও তেমন একটা আগ্রহ পায় নাই দেখার। বিশেষ করে নিজেকে কেন স্নেহা আবিরের জীবনের উমরাও জান বলতো, এইটা বোঝার পরই সম্ভবত ও আরো বেশি অনাগ্রহী হইছে। এটা মনে করে অনেকটা উচ্চস্বরেই হেসে দিয়ে স্নেহা গাইতে থাকলো-

ইস আঞ্জুমান মেঁ আপকো আনা হ্যায় বার বার
দিওয়ার ও দার কো গোউর সে পেহছান লিজিয়ে
দিল চিজ ক্যায়া হ্যায় আপ মেরি জান লিজিয়ে…

স্নেহার মনে পড়ে উমরাও জান নামে একটা কবিতাও ও লিখছিল গত বছর সেপ্টেম্বরের দিকে। নো ডাউট যে ওইটা আবিরের উদ্দেশ্যেই লেখা। এইখানে সন্দেহের কোনো অবকাশ থাকার কথাই না! নিজের কবিতা যদিও ওর মুখস্ত থাকে না, তবু ও ওই কবিতাটা মনে করার চেষ্টা করলো। কারো কবিতাই ওর মুখস্ত থাকে না। সিলভিয়া, পো, নেরুদা আর জীবনানন্দের দুই একটা কবিতার লাইন হয়তো মনে থাকে। ওহ নাহ, জয় গোস্বামীর স্নান আর মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়ের কয়েকটা লাইনও বোধহয় ওর সবসময়ই মনে থাকে। ওহ অফকোর্স! মালতীবালা বালিকা বিদ্যালয়ের লাইন ও কীভাবে ভুলতে পারে! সঙ্গে সঙ্গেই স্নেহা আবৃত্তি করে-

বেণীমাধব, বেণীমাধব, এতদিনের পরে
সত্যি বলো, সেসব কথা এখনো মনে পড়ে?
সেসব কথা বলেছো তুমি তোমার প্রেমিকাকে?
আমি কেবল একটি দিন তোমার পাশে তাকে
দেখেছিলাম আলোর নীচে; অপূর্ব সে আলো!
স্বীকার করি, দুজনকেই মানিয়েছিল ভালো
জুড়িয়ে দিলো চোখ আমার, পুড়িয়ে দিলো চেখ
বাড়িতে এসে বলেছিলাম, ওদের ভালো হোক…

হা হা হা! স্নেহা আবারও উচ্চস্বরে হেসে ওঠে। সমস্ত ফ্ল্যাটটা গম গম করে ওর ওই হাসির শব্দে। এই মুহূর্তে যেইভাবেই হোক উমরাও জান কবিতাটা মনে করার চেষ্টা করলো ও। এটা ও আজকে সকালের সার্ভাইবাল টাস্ক হিসেবে নিয়ে ফেললো একেবারে। এরপর ওর ভাবনায় আসলো, এই মুহূর্তে ফয়েল পেপারের কারুকার্যে বিরতি দিতে হবে অন্তত ঘণ্টা খানিকের জন্য। নতুন একশ টাকার নোট দিয়ে বানানো পাইপ, পাঁচ টাকার কয়েন, সুঁইমাথার লাইটার আর হেল্পার লাইটারসহ অর্ধেক গলা মিষ্টিসমেত ফয়েল পেপারটাকে ও এক পাশে সুন্দর করে গুছিয়ে রাখলো। এরপর স্পটিফাইতে উমরাও জানের দিল চিজ ক্যায়া হ্যায় আপ মেরি ছেড়ে সোজা চলে গেল ওয়াশরুমে।

আশা ভোসলের চমৎকার নাটখাটি সিডাক্টিভ ভয়েজে বেশ কয়েকবার একই লাইন "ইস আঞ্জুমান মেঁ আপকো…ইস আঞ্জুমান মেঁ আপ…ইস আঞ্জুমান মেঁ আপকো…ইস আঞ্জুমান মেঁ আপকো…আনা হ্যায় বার বার…আনা হ্যায় বার বার…" শুনতে শুনতে ওয়াশরুমের বেসিন থেকে পানি নিয়ে ক্রমাগত মুখে ঝাপটা দিতে গিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজের লেখা উমরাও জান কবিতাটা স্নেহার মনে পড়লো। এরপর ও কিচেনে ঢুকে চটপট একটা ব্ল্যাক কফি বানিয়ে বারান্দার ফ্লোরে বসে ওই উমরাও জান কবিতাটা চোখ বন্ধ করে পড়ে গেল-
 

আমারে কোনোদিন ‘ভালোবাসো নাই’র চেয়ে
কম দুঃখজনক-
তোমারে ‘না পাওয়া’ লাগে।

কোন দুঃখের দিকে তাকাইলে
কোন দুঃখরে ইগনোর করা যাবে-
জগৎ অযৌক্তিক লাগে এইসব ভাবনায়।

তোমার আধো সত্য, আধো মিথ্যার চেয়ে
কম দুঃখজনক-
আমারে কোনোদিন ‘ভালোবাসলা না’রে লাগে।

তাও ভালো; কোনো এক দুঃখের রাতে,
নেরুদার মতো লিখতে হবে না আমারেও-
“আমি তারে ভালোবাসতাম
কদাচিৎ আমারে ভালোবাসতো সেও।"

বরং লেখা যাইতে পারে চাইলে-
সে আমারে পুরাটাই পাইলো,
আমি তারে পাইছিলাম কখনো কখনো...

কবিতাটা পড়া শেষ করে স্নেহা একটা বিদ্রুপের হাসি ছুঁড়ে দিলো নিজের উদ্দেশ্যে! এরপর ব্ল্যাক কফিতে চুমুক দিতে দিতে আবার চলে গেল ডিসেম্বর, ২০২৩ এর মেমোরিতে! ১৩ ডিসেম্বর, ২০২৩ থেকে জানুয়ারি ৭, ২০২৪! মাত্র ২৬ দিন! আবিরকে ফিরে আসতে হইছিল স্নেহার কাছে। তবে নিজের ইচ্ছায় না, অনেকটা বাধ্য হয়ে। নিজের অবস্থান ক্লিয়ার করে ক্ষমা চাওয়ার জন্য। এর মাত্র কয়েকদিন আগেই লিঙ্কডইন ঘাটাতে গিয়ে স্নেহা আবিরের আইডি আবিষ্কার করে, ওর আসল পরিচয়ও। দ্যাট ওয়াজ সো শকিং ফর হার।

ওইটা দেখার পর অনেকক্ষণ ধরে নিজেকে একটা পরিত্যক্ত টিস্যুর মতো ফিল হইতেছিল ওর। ও ডিল করতে পারলো না ব্যাপারটা। ওর মনে হলো আবির রাষ্ট্রের একটা গুরুত্বপূর্ণ বাহিনীর পাওয়ারফুল পজিশন হোল্ড করে বলেই ওকে এভাবে হুট করেই একটা লেইম এক্সকিউজ দিয়ে অ্যাব্যান্ডন করে যেতে পারছে। কোনোভাবেই ওই ভাবনা ও প্রসেস করতে পারতেছিল না ব্রেইনে। 

লিঙ্কডইনে স্নেহা আবিরকে একটা টেক্সটও করে নিজের পরিচয় লুকানোর কারণ জানতে চেয়ে। আবির ওই টেক্সট পাওয়ার পর ওইখান থেকেও স্নেহাকে ব্লক করে দেয়। ওইদিন ছিল ডিসেম্বরের ২৭ তারিখ। এর মাত্র ১১ দিন পর ৭ জানুয়ারি আওয়ামী লীগের শেষ বিতর্কিত দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ব্যস্ততম সন্ধ্যায় স্নেহার হোয়াটসঅ্যাপে একটা আননৌয়ন নম্বর থেকে টেক্সট আসে- হ্যালো!

চেজিং দ্য ড্রাগন: দিলসা কয়ি কামিনা নেহি

Comments

    Please login to post comment. Login