*****চৌধুরী বাড়ির ধ্বংসবাণী*****
আশ্বিনের সেই দিনটি ছিল অদ্ভুত রকমের ভারী এবং নিস্তব্ধ । আকাশের বুক জুড়ে মেঘেরা এমনভাবে ঝুলে ছিল, যেন তারা মাটির খুব কাছে নেমে এসে নীলমাধবপুর গ্রামটাকে শ্বাসরোধ করে মারতে চায় । আমি একাকী এক জরাজীর্ণ গরুর গাড়িতে করে আসছিলাম। চারদিকের প্রকৃতিতে এক অদ্ভুত রিক্ততা; জনহীন ধূ ধূ প্রান্তর আর মরা ঘাসের ওপর দিয়ে গাড়িটা যখন ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে এগোচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল আমি জীবন্ত কোনো জগত ছেড়ে এক প্রেতপুরীর দিকে ধাবিত হচ্ছি।
বহু বছর পর আমি এই এলাকায় ফিরছি। ছোটবেলার অভিন্নহৃদয় বন্ধু অরুণাভ চৌধুরীর এক জরুরি এবং অত্যন্ত কাতর চিঠি আমাকে বাধ্য করেছে এই জনমানবহীন প্রান্তরে আসতে । চিঠির প্রতিটি ছত্রে ছিল এক তীব্র আকুলতা, এক অদৃশ্য আতঙ্কের ছাপ, যা অস্বীকার করার উপায় আমার ছিল না ।
অবশেষে সন্ধ্যার ঠিক আগ মুহূর্তে, যখন দিগন্তের আলো ম্লান হয়ে এক অপার্থিব ধূসর ছায়া চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে, ঠিক তখনই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই কুখ্যাত 'চৌধুরী বাড়ি' ।
প্রথম দেখাতেই আমার অন্তরাত্মা এক অসহ্য বিষণ্ণতায় ভরে গেল । আমি জানি না কেন, কিন্তু সেই ইমারতটির দিকে তাকালে মনে হয় যেন কোনো এক আদিম অভিশাপ তার প্রতিটি ইটে লেপ্টে আছে । সাধারণত প্রকৃতি বা স্থাপত্যের কোনো ধ্বংসাবশেষ দেখলে মনের মধ্যে এক ধরণের কাব্যিক বা রোমাঞ্চকর অনুভূতি জাগে, কিন্তু চৌধুরী বাড়ির ক্ষেত্রে তা ঘটল না । সেখানে ছিল কেবল এক অমোঘ নির্লিপ্ততা আর হৃদয়ে গেঁথে যাওয়া এক গভীর শূন্যতা ।
আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম বাড়িটার দিকে। তার বিবর্ণ দেয়ালগুলো শেওলায় ঢাকা, ইটের খাঁজে খাঁজে গজিয়ে ওঠা অশ্বত্থ আর বটের শিকড়গুলো যেন এক বিশাল অজগরের মতো বাড়িটাকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে শ্বাসরোধ করছে । সব চেয়ে ভয়ংকর লাগছিল বাড়ির জানলাগুলোকে। লম্বাটে, সরু সেই জানলাগুলো যেন কোনো মৃত মানুষের চোখের মতো নির্নিমেষ চেয়ে আছে আমার দিকে—একেবারে ভাবলেশহীন, শূন্য । বাড়ির চারপাশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা কয়েকটা সাদা মরা গাছের গুঁড়ি যেন কঙ্কালের মতো দাঁড়িয়ে এই ধ্বংসলীলার সাক্ষী দিচ্ছে ।
গাড়ি থেকে নেমে আমি যখন বাড়ির সামনের সেই বিশাল দিঘিটির পাড়ে দাড়ালাম, আমার সারা শরীর এক অজানা শিহরণে কেঁপে উঠল । দিঘির জল কুচকুচে কালো, তাতে কোনো ঢেউ নেই, কোনো প্রাণের স্পন্দন নেই। সেই নিথর জলের আয়নায় যখন চৌধুরী বাড়ির উল্টো প্রতিচ্ছবি ফুটে উঠল, তখন মনে হলো জলের নিচেও বুঝি এক অভিশপ্ত জগত সমান্তরালে বাস করছে । জানলাগুলোর সেই 'চোখ' দিঘির কালচে জল থেকে যেন আমায় বিদ্রূপ করছিল ।
অরুণাভ চৌধুরীর চিঠিতে তার অসুস্থতার কথা ছিল ঠিকই, কিন্তু এই বাড়িটার পরিবেশ দেখে মনে হলো অসুস্থতা কেবল মানুষের শরীরে নয়, এই মাটির পরতে পরতে মিশে আছে । কথিত আছে, চৌধুরী বংশের রক্তে এক অদ্ভুত উন্মাদনা আর বিষাদ মিশে আছে যা বংশপরম্পরায় চলে আসছে । তাদের পরিবারে কোনো শাখা-প্রশাখা নেই; কেবল এক পুরুষ থেকে অন্য পুরুষে এই জমিদারি আর এই অভিশপ্ত রক্ত প্রবাহিত হয়েছে । নীলমাধবপুরের সাধারণ মানুষ তাই বাড়িটা আর তার মালিকদের আলাদা করে দেখতে জানে না; তাদের কাছে এই বাড়ি আর এর বাসিন্দারা মিলেমিশে একাকার হয়ে যাওয়া এক অস্তিত্ব, যার নাম 'চৌধুরী বাড়ি'।
আমি যখন পায়ে হেঁটে বাড়ির প্রধান ফটকের দিকে এগোলাম, তখন এক অদ্ভুত বাষ্পীয় কুয়াশা চারপাশ থেকে আমায় ঘিরে ধরল । এ যেন সাধারণ কুয়াশা নয়, বরং দিঘির পচা জল আর পুরনো দেয়ালের স্যাঁতসেঁতে থেকে উঠে আসা এক বিষাক্ত ধোঁয়া, যার রঙ সীসার মতো ধূসর।
বাড়ির সদর দরজাটি বিশাল এবং কাঠের তৈরি। আমি দরজায় আঘাত করতেই এক গম্ভীর প্রতিধ্বনি পুরো প্রাসাদের ভেতর গুমরে উঠল। একজন বয়স্ক চাকর, যার পা ফেলার শব্দ পাওয়া যায় না, নিঃশব্দে দরজা খুলে দিল এবং আমায় ভেতরের অন্ধকার বারান্দা দিয়ে নিয়ে চলল । ভেতরের আসবাবপত্রগুলো প্রাচীন, ধুলোমাখা এবং ত তালি দেওয়া জরাজীর্ণ । দেয়ালে ঝুলে থাকা পুরনো ঢাল-তলোয়ার আর বীরপুরুষদের তৈলচিত্রগুলো ঝোড়ো হাওয়ায় মাঝে মাঝে নড়ে উঠছিল এবং এক অদ্ভুত ধাতব শব্দ করছিল । মনে হচ্ছিল, প্রতি পদক্ষেপে আমি বর্তমান সময় থেকে কয়েকশ বছর পেছনে কোনো এক অন্ধকার অতীতে তলিয়ে যাচ্ছি।
সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার সময় আমার সাথে দেখা হলো বাড়ির পারিবারিক কবিরজ বা ডাক্তারের । লোকটার মুখমণ্ডলে এক অদ্ভুত ধূর্ততা আর বিভ্রান্তি মিশে ছিল । সে আমার দিকে একপলক চেয়েই কোনো কথা না বলে দ্রুতপদে নিচে নেমে গেল । তার সেই চাউনি আমার মনের আশঙ্কাকে আরও বাড়িয়ে দিল।
অবশেষে সেই বিশাল ঘরের সামনে পৌঁছালাম যেখানে অরুণাভ অপেক্ষা করছিল। চাকরটি নিঃশব্দে কবাট খুলে দিয়ে সরে দাঁড়াল । ঘরের ভেতরটা অত্যন্ত উঁচু এবং অন্ধকার । সরু জানলাগুলো এত উঁচুতে যে সেখান থেকে আসা ক্ষীণ রক্তিম আলো মেঝে পর্যন্ত পৌঁছাতে পারছে না । ঘরের কোণগুলো অন্ধকারে ঢাকা, সেখানে কী আছে তা বোঝার উপায় নেই । চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অসংখ্য পুরনো বই আর বাদ্যযন্ত্র । এক ধরণের গুমোট, বিষাদময় বাতাস যেন সেই ঘরের প্রতিটি কোণে রাজত্ব করছে ।
সোফা থেকে উঠে এল এক ছায়াময় মূর্তি। সে অরুণাভ । তার ফ্যাকাশে মুখ, কোটরগত চোখ আর উস্কোখুস্কো রেশমি চুল দেখে আমি স্তব্ধ হয়ে গেলাম । এ কি সেই আমার শৈশবের বন্ধু? তার গায়ের চামড়া যেন মৃত মানুষের মতো সাদাটে হয়ে গেছে । অরুণাভ এক অদ্ভুত অস্থিরতায় আমায় জড়িয়ে ধরল—সে এক আড়ষ্ট আন্তরিকতা, যা কেবল একা থাকা কোনো আর্ত মানুষের পক্ষেই সম্ভব ।
সে যখন কথা বলতে শুরু করল, তার কণ্ঠস্বর কখনো নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছিল, আবার কখনো এক অদ্ভুত উত্তেজনায় কাঁপছিল । সে জানাল তার সেই রহস্যময় ব্যধির কথা। এক অদ্ভুত স্নায়বিক দুর্বলতা, যা তাকে কোনো তীব্র গন্ধ, কড়া আলো কিংবা রুক্ষ শব্দ সহ্য করতে দেয় না । সে কেবল তার বাবার পুরনো সেতারের মৃদু ঝঙ্কার আর নরম সুতির কাপড় সহ্য করতে পারে । কিন্তু তার কথার চেয়েও বেশি ভয়াবহ ছিল তার চোখের দৃষ্টি—সেখানে আমি দেখতে পাচ্ছিলাম এক আসন্ন মৃত্যুর ছায়া, এক অমোঘ পরিণতির আতঙ্ক ।
অরুণাভ জানাল, সে একা নয়, এই বাড়িতে তার জমজ বোন মৃণালিনীও আছে, যে মৃত্যুশয্যায় । আমি যখন তার কথা শুনছিলাম, ঠিক তখনই ঘরের অন্যপ্রান্তের অন্ধকার চিরে একটি ছায়ামূর্তি ধীরপদে চলে গেল । পরনে তার সাদা বসন, মুখটা অস্পষ্ট । সে একবারের জন্যও আমাদের দিকে ফিরে চাইল না । আমার মনে হলো যেন কোনো জীবন্ত মানুষ নয়, বরং এক ছায়া এই অভিশপ্ত প্রাসাদের দেয়াল ভেদ করে চলে গেল । অরুণাভ তার মুখটা দু-হাতে ঢেকে ফেলল এবং আমি লক্ষ্য করলাম তার আঙুলের ফাঁক দিয়ে কান্নার জল গড়িয়ে পড়ছে ।
বাইরে তখন ঝোড়ো হাওয়া বাড়তে শুরু করেছে । নীলমাধবপুরের সেই নির্জন প্রান্তরে চৌধুরী বাড়ির দেয়ালে আছড়ে পড়া হাওয়ার শব্দ যেন কোনো এক প্রেতাত্মার আর্তনাদ । আমি বুঝতে পারলাম, আগামী কয়েক সপ্তাহ এই প্রাসাদে আমার যাপন হতে যাচ্ছে কোনো এক ভয়াবহ নাটকের প্রথম দৃশ্য মাত্র ।
চৌধুরী বাড়িতে আমার প্রথম রাতটি কাটল এক ভয়াবহ অস্বস্তিতে। বিশাল সেই শোয়ার ঘরের সিলিং থেকে ঝুলে থাকা পুরনো ঝাড়লণ্ঠনটা বাতাসের ঝাপটায় মাঝে মাঝে দুলে উঠছিল, আর তার আলো-ছায়ার খেলায় ঘরের কোণগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠছিল। সারা রাত আমি শুনতে পেলাম এক অদ্ভুত খসখসে শব্দ—যেন কেউ দেয়ালের ওপাশ থেকে নখ দিয়ে ইটের গাঁথুনি আঁচড়াচ্ছে।
সকালে যখন অরুণাভর সাথে জলখাবারের টেবিলে দেখা হলো, দিনের আলোতেও তাকে দেখে মনে হলো সে যেন কোনো অন্ধকার পাতালপুরী থেকে উঠে এসেছে। তার গায়ের পাঞ্জাবিটা কুঁচকানো, চোখ দুটো টকটকে লাল। আমরা যখন খাচ্ছিলাম, বিশাল ডাইনিং হলের সেই গুমোট নিস্তব্ধতা ভাঙল এক বৃদ্ধার আগমনে। তিনি এই বাড়ির পুরনো দাই-মা, যাকে সবাই 'কুসুম পিসি' বলে ডাকে। কুসুম পিসি এক কোণে দাঁড়িয়ে থরথর করে কাঁপছিলেন এবং অরুণাভর দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিলেন যেন তিনি কোনো আসন্ন ধ্বংস দেখতে পাচ্ছেন।
অরুণাভ আমায় নিয়ে তার গ্রন্থাগারের দিকে গেল। যেতে যেতে সে অদ্ভুত সব কথা বলতে লাগল। তার মতে, এই বাড়ির প্রতিটি জড়বস্তু—পাথরের মেঝে, নোনা ধরা দেয়াল, এমনকি দরজার পাল্লাগুলোও অনুভব করতে পারে। সে বলল, "বন্ধু, তুই কি বিশ্বাস করিস যে একটা বংশের অভিশাপ কেবল মানুষের শরীরে নয়, তার বাস্তুভিটাতেও গেঁথে যায়? এই বাড়িটা আমাদের মুক্তি দেবে না।"
ঠিক সেই মুহূর্তে আমি লক্ষ্য করলাম, হলের শেষ প্রান্তে একটি ভারী কাঠের দরজা, যা শেকল দিয়ে তালাবদ্ধ করা। দরজার গায়ে খোদাই করা আছে অদ্ভুত সব তান্ত্রিক চিহ্ন। আমি কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, "ওটা কিসের ঘর অরুণ?"
অরুণাভর মুখ মুহূর্তের মধ্যে ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে তোতলামি করে বলল, "ওটা... ওটা আমাদের কূলদেবীর পুরনো ঘর। ওদিকে যাস না কোনোদিন। ওটা নিষিদ্ধ।" কিন্তু আমি লক্ষ্য করলাম, অরুণাভ যখন কথাটি বলছিল, তখন সেই বন্ধ দরজার ওপাশ থেকে একটা অতি ক্ষীণ কান্নার আওয়াজ ভেসে এল—যেন কোনো এক নারী বহু দূর থেকে সাহায্য চাইছে।
অরুণাভ আমায় তার সেতার শোনানোর জন্য বসল। সে যখন তার দীর্ঘ আঙুলগুলো তারের ওপর রাখল, তখন সুর বের হলো না; বের হলো এক বিষাক্ত বিলাপ। সেই সুরের মাঝে আমি যেন নীলমাধবপুরের শত বছরের হাহাকার শুনতে পাচ্ছিলাম। হঠাত্ বাজনা থামিয়ে সে চিৎকার করে উঠল, "মৃণালিনী! তুই আবার কেন ওখানে গেলি?"
আমি চমকে তাকিয়ে দেখি, গ্রন্থাগারের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে মৃণালিনী। পরনে তার ধবধবে সাদা শাড়ি, হাতে একটি পিতলের প্রদীপ—কিন্তু প্রদীপটি নেভানো। তার চোখ দুটো খোলা, কিন্তু সেখানে কোনো মণিকে দেখা যাচ্ছে না, কেবল সাদা অক্ষিগোলক। সে আমাদের কারো দিকেই তাকাচ্ছিল না। সে ধীর পায়ে ঘরের মাঝখান দিয়ে হেঁটে চলে গেল। মৃণালিনীর চলাফেরার মধ্যে কোনো মানুষের ছন্দ ছিল না, মনে হচ্ছিল যেন সে শূন্যে ভাসছে। সে যখন পাশ দিয়ে গেল, ঘরের তাপমাত্রা মুহূর্তের মধ্যে হিমাঙ্কে নেমে গেল।
অরুণাভ কাঁপতে কাঁপতে বলল, "ও ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে। ওর শরীরে আর প্রাণ নেই, আছে কেবল এই অভিশপ্ত বাড়ির মায়া।"
সেই বিকেলে আমি যখন বাগানের দিকে হাঁটতে গেলাম, সেখানে এক বীভৎস দৃশ্য দেখলাম। বাগানের প্রতিটি গাছ মরে কালো হয়ে গেছে, কিন্তু তাদের ডালগুলো একে অপরের সাথে এমনভাবে জট পাকিয়ে আছে যেন তারা কেউ কাউকে ছাড়তে চাইছে না। হঠাত্ ঝোপের আড়াল থেকে কুসুম পিসি বেরিয়ে এলেন। তিনি আমার হাতটা খপ করে ধরে ফিসফিস করে বললেন, "বাবা, পালিয়ে যাও! এই বাড়িতে রাত নামলে মড়ারা কথা বলে। অরুণ বাবা যা বলছে সব সত্যি নয়। মৃণালিনী দিদিমণি একা নন, তাঁর সাথে আরও কেউ একজন আছে যে এই বাড়ির মাটির নিচে লুকানো।"
আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। কুসুম পিসির কথা শেষ হওয়ার আগেই বাড়ির বারান্দা থেকে অরুণাভর ডাক এল। রাতে যখন ডিনারের জন্য আমরা বসলাম, তখন হঠাত্ মোমবাতিগুলো একসাথে দপ করে নিভে গেল। ঘোর অন্ধকারে আমি অনুভব করলাম, আমার ঠিক পেছনে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। তার নিঃশ্বাসের শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছিল, যা ছিল পচা মাংসের গন্ধযুক্ত। অরুণাভ বিড়বিড় করছিল, "সে এসেছে... সে আমাদের নিতে এসেছে।"
আমি পকেট থেকে দেশলাই জ্বালিয়ে ধরতেই দেখলাম, সেখানে কেউ নেই। কিন্তু মেঝের ধুলোয় আমি দুটি আলাদা ধরণের পায়ের ছাপ দেখতে পেলাম—একটি মৃণালিনীর অতি ক্ষুদ্র পায়ের ছাপ, আর অন্যটি কোনো এক বিশালাকার নখরযুক্ত প্রাণীর।
অরুণাভ তখন পাগলের মতো হাসতে লাগল। সেই হাসির শব্দে যেন বাড়ির দেয়ালগুলো কাঁপতে লাগল। সে আমাকে জানাল যে, তাদের বংশের এক পূর্বপুরুষ নাকি অমরত্বের আশায় বাড়ির নিচতলায় এক ভয়ংকর তান্ত্রিক সাধনা করেছিলেন, যার ফলে চৌধুরী বংশের প্রথম সন্তানকে সবসময় এক অশরীরী শক্তির ছায়া হয়ে থাকতে হয়।
সেদিন গভীর রাতে আমি যখন নিজের ঘরে ঘুমানোর চেষ্টা করছি, তখন হঠাত্ অনুভব করলাম আমার খাটের নিচে কিছু একটা নড়ছে। নিস্তব্ধতায় স্পষ্ট শুনতে পেলাম এক নারীর ফিসফিস কণ্ঠস্বর, "আমাকে মুক্ত করো... ও আমাকে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারতে চায়।"
আমি বুঝতে পারলাম না এটা কি আমার মনের ভুল নাকি এই বাড়ির দীর্ঘদিনের জমানো কোনো অন্ধকার ইতিহাস। মৃণালিনী কি সত্যিই অসুস্থ, নাকি তাকে কোনো বিশেষ উদ্দেশ্যে বন্দি করে রাখা হয়েছে? অরুণাভর ভালোবাসার আড়ালে কি কোনো চরম প্রতিশোধ লুকিয়ে আছে?
দ্বিতীয় অধ্যায়ের শেষে আমি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। নিচে সেই কুচকুচে কালো দীঘির জলে চাঁদের আলো প্রতিফলন হচ্ছিল না, বরং মনে হচ্ছিল জলের নিচ থেকে হাজার হাজার চোখ আমার দিকে তাকিয়ে আছে। আমি বুঝলাম, এই বাড়িতে আমি কেবল একজন অতিথি নই, আমি হয়ে উঠেছি এক ভয়ংকর ট্র্যাজেডির সাক্ষী, যেখান থেকে ফেরার পথ হয়তো অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে।
চৌধুরী বাড়িতে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত যেন আমার স্নায়ুর ওপর এক অদৃশ্য হাতুড়ির আঘাত দিচ্ছিল। সেই ঘটনার পর দুদিন কাটল এক অসহ্য থমথমে নিস্তব্ধতায়। বাড়ির চাকর-বাকরদের কাউকেই আর দেখা যাচ্ছে না, কেবল কুসুম পিসিকে মাঝে মাঝে করিডরের অন্ধকারে ছায়ার মতো মিলিয়ে যেতে দেখি। অরুণাভ এখন দিনের বেশির ভাগ সময় কাটায় সেই তালাবদ্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে, বিড়বিড় করে কার সাথে যেন কথা বলে।
তৃতীয় দিনের দিন সকালে অরুণাভ আমার ঘরে এল। তার গলার স্বর এতটাই নিচু যে মনে হচ্ছিল সে যেন কবর থেকে কথা বলছে। সে জানাল, "মৃণালিনী আর নেই। সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে।"
খবরটা শুনে আমি স্তম্ভিত হয়ে গেলাম। যদিও জানতাম সে অসুস্থ, কিন্তু এত দ্রুত সব শেষ হয়ে যাবে তা ভাবিনি। অরুণাভ এক অদ্ভুত অনুরোধ করল। সে চাইল না মৃণালিনীকে এখনই দাহ করা হোক। তার মতে, চৌধুরী বংশের মৃতদেহগুলো নাকি সহজে শান্ত হয় না। সে চাইল মৃণালিনীর কফিনটি অন্তত দিন দশেকের জন্য বাড়ির নিচের সেই পুরনো 'অন্ধকূপ' বা মাটির ভাণ্ডারে রাখা হোক। এই সেই অন্ধকার কুঠুরি, যা শত বছর আগে নাকি পরিবারের অবাধ্য সদস্যদের শাস্তি দেওয়ার জন্য তৈরি হয়েছিল।
অরুণাভকে একা এই মানসিক অবস্থায় রাখা নিরাপদ মনে করলাম না, তাই আমিই তাকে সাহায্য করতে রাজি হলাম। আমরা দুজনে মিলে মৃণালিনীর নিথর দেহটি একটি ভারী কাঠের কফিনে শায়িত করলাম। কফিনটি যখন বন্ধ করার জন্য ঢাকনা তুললাম, তখন আমি শিউরে উঠলাম। মৃণালিনীর গাল তখনও ফ্যাকাশে হয়নি, বরং এক অদ্ভুত লালচে আভা তার মুখে লেগে ছিল। সব চেয়ে ভয়ংকর ছিল তার ঠোঁটের কোণ—মনে হচ্ছিল মৃত্যুর পরও সে যেন কোনো এক বিভীষিকাময় জয়ে মৃদু হাসছে।
আমরা মশাল হাতে বাড়ির একদম তলদেশের সেই সংকীর্ণ সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামতে লাগলাম। দেয়ালগুলো নোনা ধরা, আর বাতাস এতটাই ভারী যে নিশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সেখানে সারি সারি লোহার খাঁচা আর মরচে ধরা শিকল ঝুলে আছে—অতীতের কোনো এক নিষ্ঠুরতার সাক্ষ্য হিসেবে। আমরা কফিনটি একটি বেদীর ওপর স্থাপন করলাম। অরুণাভ হঠাত্ কফিনের কাছে ঝুঁকে পড়ে কাঁদতে শুরু করল, কিন্তু সেই কান্নার শব্দ মানুষের মতো ছিল না, অনেকটা ডুকরে ওঠা হায়নার মতো।
ফেরার সময় আমি লক্ষ্য করলাম, মাটির নিচের সেই গোলকধাঁধায় আরও একটি দরজা আছে, যা পাথরের বড় বড় চাঁই দিয়ে বন্ধ করা। অরুণাভ আমার কৌতূহল বুঝতে পেরে ফিসফিস করে বলল, "ওখানে আমাদের আদি পুরুষদের অভিশাপ বন্দি করে রাখা হয়েছে। মৃণালিনীকে এখানে রাখার কারণ হলো, সে যেন ওপরের পৃথিবীতে আবার ফিরে না আসে।"
মৃণালিনীকে নিচে রেখে আসার পর অরুণাভর স্বভাব পুরোপুরি বদলে গেল। সে এখন আর সেতার বাজায় না, বই পড়ে না। সে সারাদিন কোনো এক অদৃশ্য শব্দের প্রতিক্ষায় থাকে। মাঝরাতে আমি শুনতে পাই, সে তার ঘরের মেঝেতে দ্রুত পায়ে পায়চারি করছে আর দেয়ালে কান পেতে কী যেন শুনছে। তার চোখগুলো এখন অস্বাভাবিক বড় হয়ে গেছে, যেন সে এমন কিছু দেখছে যা আমি দেখতে পাচ্ছি না।
চতুর্থ রাতে আমি যখন নিজের ঘরে একা, হঠাত্ জানালার বাইরে সেই কালো দীঘির দিক থেকে এক করুণ কান্নার সুর ভেসে এল। মনে হলো কোনো নারী জলের গভীর থেকে আমায় ডাকছে। আমি জানালা খুলতেই দেখলাম, দিঘির ওপর এক অদ্ভুত নীলচে কুয়াশা নাচছে। সেই কুয়াশার মাঝখানে আমি পরিষ্কার দেখলাম—মৃণালিনীর অবয়ব! সে দিঘির ওপর দিয়ে হেঁটে আসছে বাড়ির দিকে। কিন্তু তার পা দুটো মাটিতে পড়ছে না।
আমি আতঙ্কে পিছিয়ে এলাম। ঠিক তখনই কুসুম পিসি আমার ঘরে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকলেন। তাঁর চোখেমুখে চরম আতঙ্ক। তিনি বললেন, "সর্বনাশ হয়েছে বাবা! অরুণ বাবা ভুল করেছেন। মৃণালিনী দিদিমণিকে যেখানে রাখা হয়েছে, সেখান থেকে ফেরার পথ একটাই—রক্তের পথ। আপনি এখনই পালান, এই বাড়ি আজ রাতেই আমাদের সবাইকে গিলে খাবে।"
আমি পিসিকে কিছু জিজ্ঞাসা করার আগেই করিডর দিয়ে এক বিকট অট্টহাসি ভেসে এল। সেটা অরুণাভর হাসি। আমি ঘর থেকে বেরিয়ে দেখি, অরুণাভ সেই কুঠুরির চাবিটা হাতে নিয়ে নাচছে। তার জামাকাপড় ধুলোয় মাখা, যেন সে মাটি খুঁড়ে উঠে এসেছে। সে চিৎকার করে বলছে, "সে আসছে! সে একাই আসছে না, সাথে নিয়ে আসছে আমাদের বংশের সেই আদি তান্ত্রিককে! আজ চৌধুরীদের শেষ রাত!"
হঠাত্ বাড়ির মেঝের নিচ থেকে এক প্রচণ্ড কম্পন শুরু হলো। দেয়ালের পুরনো পলেস্তারা খসে পড়তে লাগল। আমি বুঝতে পারলাম, মৃণালিনীর মৃত্যু আসলে কোনো স্বাভাবিক ঘটনা ছিল না। এটি ছিল কোনো এক অন্ধকার যজ্ঞের অংশ। অরুণাভ তার নিজের বোনকে উৎসর্গ করেছে কোনো এক অশুভ শক্তির কাছে, কিন্তু সেই শক্তি এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে।
আমি যখন অরুণাভর কাছে যাওয়ার চেষ্টা করলাম, তখন সে এক ধাক্কায় আমায় সরিয়ে দিল। তার গায়ের শক্তি এখন মানুষের চেয়েও অনেক বেশি। সে সেই শেকল দিয়ে তালাবদ্ধ কূলদেবীর ঘরের দিকে ছুটে গেল। তালাটা অলৌকিক এক শক্তিতে নিজে নিজেই খুলে গেল। ভেতরে ঘুটঘুটে অন্ধকার। সেই অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এল এক পচা মাংসের দুর্গন্ধ।
অরুণাভ সেই অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে হাত বাড়িয়ে দিল। আমি দেখলাম, অন্ধকারের ভেতর থেকে একজোড়া সাদা হাড়ের মতো হাত বেরিয়ে এসে অরুণাভকে ভেতরে টেনে নিচ্ছে। অরুণাভর শেষ আর্তনাদ পুরো প্রাসাদে প্রতিধ্বনিত হলো।
আমি ভয়ে নিচে নেমে এলাম। কিন্তু আমি জানতাম না, মৃণালিনী যাকে আমরা মৃত ভেবে কফিনে বন্দি করে এসেছি, সে এখন ঠিক আমার পেছনেই সিঁড়ির অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে সেই নেভানো প্রদীপটি এখন জ্বলছে এক অদ্ভুত রক্তিম আলোয়।
৩য় অধ্যায়ের শেষ মুহূর্তে আমি বুঝতে পারলাম, নীলমাধবপুরের এই ধ্বংসস্তূপ থেকে আমার জীবিত ফেরা প্রায় অসম্ভব। বাড়িটা কেবল নড়ছে না, বাড়িটা যেন দীর্ঘ ঘুম থেকে জেগে ওঠা এক দানবের মতো হাঁ করে আমাদের সবাইকে গিলে নেওয়ার জন্য প্রস্তুত হচ্ছে।
মৃণালিনীকে সেই অন্ধকার ভূগর্ভস্থ কক্ষে রেখে আসার পর সাতটি দিন কেটে গেল। এই সাতটি দিন নীলমাধবপুরের আকাশে সূর্য উঠেছিল কি না, তা আমার জানা নেই। কারণ, চৌধুরী বাড়ির প্রতিটি জানলা ভারী পর্দায় ঢাকা, আর বাতাসের সেই বিষাক্ত ধূসর বাষ্প এখন যেন বাড়ির অন্দরমহলেও জেঁকে বসেছে। অরুণাভর অবস্থা এখন বর্ণনার অতীত। সে এখন আর আমার সাথে কথা বলে না। সে সারাদিন তার ঘরের মাঝখানে একটা পাথরের মূর্তির মতো বসে থাকে, তার মাথাটা একপাশে হেলানো—যেন সে দেয়ালের ওপাশ থেকে আসা কোনো অতিপ্রাকৃত কম্পন শোনার চেষ্টা করছে।
সেই ভয়ংকর রাতটি যখন এল, বাইরে তখন আশ্বিনের অকাল দুর্যোগ শুরু হয়েছে। মেঘের গর্জনে আকাশ ফেটে চৌচির হয়ে যাচ্ছিল, আর ঝোড়ো হাওয়া চৌধুরী বাড়ির পুরনো খিলানগুলোতে আছড়ে পড়ে এমন এক শব্দ করছিল, যেন হাজার হাজার আত্মা একসাথে আর্তনাদ করে উঠছে। আমি আমার ঘরে একা, তন্দ্রাচ্ছন্ন হওয়ার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু হঠাত্ করেই এক তীব্র আতঙ্ক আমার মেরুদণ্ড দিয়ে বয়ে গেল। আমার মনে হলো, নিচতলার সেই লোহার দরজাটা কেউ সজোরে ধাক্কা দিচ্ছে।
ঠিক সেই মুহূর্তে আমার ঘরের দরজাটা সশব্দে খুলে গেল। হাতে একটি ম্লান মোমবাতি নিয়ে অরুণাভ ভেতরে ঢুকল। তার চোখ দুটো যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে, ঠোঁট দুটো নীল হয়ে গেছে। সে ফিসফিস করে বলল, "তুমি কি শুনতে পাচ্ছ না? ও কি তোমার কানে পৌঁছাচ্ছে না?"
আমি তাকে শান্ত করার জন্য সোফায় বসলাম। আমি জানতাম, এই অবস্থায় তাকে একা ছাড়া যাবে না। আমি মেজ থেকে একটি পুরনো হাতে লেখা পুঁথি কুড়িয়ে নিলাম। এটি ছিল এই চৌধুরী বংশেরই কোনো এক প্রাচীন কবির লেখা 'মায়াপুরী'র উপাখ্যান। আমি ভাবলাম, গল্প পড়ে শোনালে হয়তো অরুণাভর বিক্ষিপ্ত মনটা একটু শান্ত হবে।
বাইরে তখন বিদ্যুতের চমকানি ঘরটাকে এক এক পলকের জন্য সাদা আলোয় ভাসিয়ে দিচ্ছিল। আমি পড়তে শুরু করলাম। পুঁথির সেই গল্পে ছিল এক বীর যোদ্ধার কাহিনী, যে এক মায়াবী প্রাসাদের লোহার দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকছে। গল্পের সেই অংশে যখনই লেখা ছিল—'বীর যোদ্ধা তার গদা দিয়ে লোহার কপাটে আঘাত করলেন এবং এক প্রচণ্ড ধাতব শব্দে পুরো দুর্গ কেঁপে উঠল'—ঠিক সেই মুহূর্তেই বাস্তব জগতের কোথাও থেকে এক ক্ষীণ কিন্তু তীক্ষ্ণ ধাতব প্রতিধ্বনি ভেসে এল।
আমি থমকে গেলাম। আমার বুক ধড়ফড় করতে লাগল। অরুণাভ নড়ল না, কিন্তু তার কান দুটো যেন আরও খাড়া হয়ে উঠল। আমি নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম—হয়তো বাইরের ঝড়ে কোনো জানলার পাল্লা আছড়ে পড়েছে।
আমি আবার পড়তে শুরু করলাম। গল্পে ছিল, যোদ্ধা যখন ভেতরে ঢুকলেন, তখন এক ড্রাগন চিৎকার করে উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির দূরবর্তী কোনো অংশ থেকে এক দীর্ঘ, করুণ আর্তনাদ ভেসে এল। সেই আওয়াজ মানুষের কি না, তা বোঝা অসম্ভব। তা ছিল এক আদিম যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ।
আমি পুঁথিটা হাত থেকে নামিয়ে রাখলাম। ঘরটা এখন বরফের মতো ঠাণ্ডা। আমি লক্ষ্য করলাম, অরুণাভ তার চেয়ারটা দরজার দিকে ঘুরিয়ে বসেছে। সে দুলছে—ধীরে ধীরে, ছান্দিক ভঙ্গিতে। সে বিড়বিড় করতে শুরু করল, তার কথাগুলো প্রথমে অস্পষ্ট থাকলেও ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠল।
"আমি শুনছি... অনেকদিন ধরেই শুনছি... তুই কি ভাবিস আমি জানি না? যেদিন আমরা ওকে সেই অন্ধকার কুঠুরিতে রেখে এলাম, তার পরদিন থেকেই আমি শুনতে পাচ্ছিলাম ও কফিনের ভেতরে নখ দিয়ে আঁচড়াচ্ছে! আমি শুনছিলাম ও সেই লোহার দরজাটা টানছে! ও বেরিয়ে এসেছে! ও এখন সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠছে! ওর পায়ের ভেজা শাড়ির শব্দ আমি শুনতে পাচ্ছি!"
অরুণাভর কণ্ঠস্বর এখন এক উন্মত্ত চিৎকারে রূপ নিল। সে দাঁড়িয়ে উঠে দরজার দিকে আঙুল উঁচিয়ে ধরল। "ও এখন দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে! ও আমাকে নিতে এসেছে!"
ঠিক সেই মুহূর্তে ঘরের বিশাল ওক কাঠের দরজা দুটো এক প্রচণ্ড দমকা হাওয়ায় হাট করে খুলে গেল। বাইরের করিডর অন্ধকারে ডুবে আছে, কিন্তু ঠিক দরজার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে এক রক্তমাখা শ্বেতবস্ত্র পরিহিত নারীমূর্তি—মৃণালিনী! তার সাদা শাড়িতে কাদার দাগ, হাতে সেই নখ দিয়ে আঁচড়ানোর চিহ্ন স্পষ্ট। দীর্ঘ সাতদিন অন্ধকূপে আটকে থেকে তার শরীর জীর্ণ হয়ে গেছে, কিন্তু তার চোখে এখন এক অমানবিক প্রতিহিংসার আগুন।
সে টলতে টলতে ঘরের ভেতরে ঢুকল। তার প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল ভারি এবং শব্দযুক্ত। অরুণাভ তখন ভয়ার্ত শিশুর মতো মেঝেতে কুঁকড়ে গেছে। মৃণালিনী তার সামনে এসে দাঁড়াল। হঠাত্ এক মুহূর্তের জন্য যেন তাদের দুজনের মধ্যে এক নীরব কথোপকথন হয়ে গেল। তারপর মৃণালিনী এক গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে অরুণাভর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
দুজনে মিলে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ল। মৃণালিনী তার শীতল হাতে অরুণাভকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল। আমি স্পষ্ট দেখলাম, অরুণাভর শরীরটা একবার কেঁপে উঠে নিথর হয়ে গেল। ভয় আর উত্তেজনায় তার হৃৎপিণ্ড স্তব্ধ হয়ে গেছে। আর মৃণালিনীও তার শেষটুকু নিঃশেষ করে দিয়ে অরুণাভর লাশের ওপরই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করল।
আমি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালাম না। আমার বিচারবুদ্ধি লোপ পেয়েছিল। আমি উন্মত্তের মতো ঘর থেকে বেরিয়ে দৌড়াতে শুরু করলাম। করিডরের সেই অন্ধকারের মাঝে মনে হচ্ছিল মৃত পূর্বপুরুষদের ছবিগুলো প্রাণ ফিরে পেয়েছে, তারা আমায় বাধা দিতে চাইছে।
আমি যখন সেই বিশাল সদর দরজা দিয়ে বাইরে বেরিয়ে আসলাম, তখন আকাশের সেই রক্তিম চাঁদের আলোয় এক অদ্ভুত দৃশ্য দেখলাম। চৌধুরী বাড়ির ঠিক মাঝখান দিয়ে যে সূক্ষ্ম ফাটলটা ছিল, তা এখন এক বিশাল গহ্বরে পরিণত হয়েছে। বিদ্যুতের আলোয় দেখলাম, সেই বিশাল প্রাসাদটা যেন ব্যথায় কাঁপছে।
আমি দিঘির ওপাড় পর্যন্ত পৌঁছানোর আগে একবার পেছন ফিরে তাকালাম। দেখলাম, সেই অতিকায় ইমারতটি মাঝখান থেকে দু-ভাগ হয়ে যাচ্ছে। এক প্রচণ্ড গর্জনে ধসে পড়ছে শত বছরের আভিজাত্য, গোপন পাপ আর অভিশাপ। পুরো বাড়িটা ধুলোর মেঘ উড়িয়ে সেই কুচকুচে কালো দিঘির জলের তলায় তলিয়ে গেল। জলের ওপর কেবল কয়েকটা বুদবুদ উঠল, আর তারপর সব শান্ত।
নীলমাধবপুরের সেই নির্জন প্রান্তরে এখন আর চৌধুরী বাড়ি নেই। সেখানে এখন কেবল এক বিশাল দিঘি, যার নিথর কালো জলের নিচে চাপা পড়ে আছে এক অভিশপ্ত বংশের শেষ ইতিহাস। আমি একা, সেই ধ্বংসস্তূপের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁপতে লাগলাম, আর আমার কানের পাশে তখনো অরুণাভর সেই শেষ কথাগুলো প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল—"সে আসছে!"
চৌধুরী বাড়ির সেই অতিকায় কাঠামোটি যখন দীঘির কালো জলে বিলীন হয়ে গেল, তখন চারদিকের প্রকৃতিতে এক অদ্ভুত, স্তব্ধ ভয়াবহতা নেমে এল। আমি তখনো সেই কর্দমাক্ত মাটির ওপর হাঁটু গেঁড়ে বসে হাঁপাচ্ছিলাম। আমার চোখের সামনে তখনো ভাসছিল সেই দৃশ্য—মৃণালিনীর রক্তমাখা হাত আর অরুণাভর সেই শেষ আর্তনাদ। ঝোড়ো বাতাস হঠাত্ থেমে গেছে, কিন্তু আকাশের সেই রক্তিম চাঁদটা যেন আরও বড় হয়ে দেখা দিল। মনে হলো, চাঁদটা কোনো এক ক্রূর হাসিতে ফেটে পড়ছে এই ধ্বংসলীলা দেখে।
আমি টলতে টলতে উঠে দাঁড়ালাম। নীলমাধবপুর গ্রামটা যেন চিরকালের মতো ঘুমিয়ে পড়েছে। কিন্তু সত্যিই কি সব শেষ হয়েছে? আমি যখন সেই বিশাল গহ্বর বা দিঘিটির দিকে তাকালাম, দেখলাম জলের ওপর তখনও কিছু বুদবুদ উঠছে। হঠাত্ মনে হলো, জলের অতল থেকে কোনো এক তান্ত্রিক সুরের প্রতিধ্বনি ভেসে আসছে। সেই সেতারের বিষাদময় রাগিণী, যা অরুণাভ বাজাত। আমি কান চেপে ধরলাম, কিন্তু সেই সুর যেন আমার মস্তিষ্কের ভেতরেই বাজছে।
আমি যখন গ্রাম ছাড়ার জন্য সেই পুরনো রাস্তা দিয়ে দ্রুত হাঁটতে শুরু করলাম, রাস্তার মোড়ে বটগাছের নিচে কাউকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম। কুসুম পিসি। তাঁর হাতে সেই পুরনো পুঁথিটা, যা আমি অরুণাভর ঘরে ফেলে এসেছিলাম। পিসি আমার দিকে তাকিয়ে এক ম্লান হাসলেন। তিনি বললেন, "পালাও বাবা, যত দূরে পারো চলে যাও। কিন্তু জেনে রেখো, এই বাড়ির ইতিহাস মরে না। চৌধুরী বাড়ির রক্ত যাদের শরীরে আছে, তাদের মৃত্যু নেই—তারা কেবল রূপ বদলায়।"
পিসি তাঁর হাত বাড়িয়ে দিলেন আমার দিকে। আমি দেখলাম তাঁর হাতের চামড়াগুলো যেন মাছের আঁশের মতো ঝিকমিক করছে। আমি ভয়ে চিৎকার করে পিছিয়ে গেলাম এবং আর পেছনে না তাকিয়ে দৌড়াতে লাগলাম। আমার মনে হলো, আমার পেছনে কুসুম পিসি নয়, বরং শত শত বছরের সেই অভিশপ্ত চৌধুরীদের ছায়া আমায় অনুসরণ করছে।
মাসের পর মাস কেটে গেল। আমি ফিরে এলাম আমার চিরচেনা শহরে, মানুষের ভিড়ে। কিন্তু আমার জীবন আর আগের মতো রইল না। রাতে যখনই বৃষ্টি নামে, বা ঝোড়ো হাওয়া দেয়ালের গায়ে আছড়ে পড়ে, আমি শিউরে উঠি। অন্ধকার ঘরে একা থাকলে আমার মনে হয়, দেয়ালের ওপাশ থেকে কেউ নখ দিয়ে আঁচড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে আয়নার দিকে তাকালে আমার নিজের চোখের মণিতে আমি অরুণাভর সেই উন্মত্ত চাউনি দেখতে পাই।
আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি নীলমাধবপুরের সেই ঘটনার কথা লিখে সবাইকে জানাতে, কিন্তু প্রতিবারই কলম ধরলে কাগজের ওপর কেবল কালচে দাগ পড়ে যায়, যেন কোনো অদৃশ্য শক্তি আমায় বাধা দিচ্ছে। লোকে বলে আমি স্নায়বিক রোগে ভুগছি, কিন্তু আমি জানি—আমি কেবল এক পতনশীল প্রাসাদের সাক্ষী নই, আমি সেই অভিশাপের এক জীবন্ত বাহক হয়ে উঠেছি।
বছরখানেক পর, এক অদ্ভুত তাড়নায় আমি আবারও ফিরে গেলাম নীলমাধবপুরে। কিন্তু সেখানে গিয়ে আমি যা দেখলাম, তাতে আমার রক্ত হিম হয়ে গেল। যেখানে সেই বিশাল চৌধুরী বাড়ি ছিল, সেখানে এখন কোনো দিঘি নেই। সেখানে কেবল এক ধূ ধূ প্রান্তর, আর সেই প্রান্তরের মাঝখানে গজিয়ে উঠেছে হাজার হাজার রক্ত-লাল রঙের ফুল। গ্রাম্য লোকেরা বলে, সেই ফুলগুলোর গন্ধ নিলে নাকি মানুষের হিতাহিত জ্ঞান থাকে না, তারা কেবল মাটির নিচে কান পেতে কিছু শোনার চেষ্টা করে।
আমি বুঝতে পারলাম, চৌধুরী বাড়ি মরেনি। সে মাটির নিচে শিকড় গেঁড়েছে। অরুণাভ আর মৃণালিনী এখন সেই মাটির প্রাণ হয়ে মিশে আছে। আমি যখন সেখান থেকে ফিরছিলাম, হঠাত্ মাটির নিচ থেকে এক ক্ষীণ কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম—"বন্ধু, তুই কি শুনতে পাচ্ছিস?"
আমি আর দাঁড়াইনি। আমি জানি, এই রহস্যের কোনো শেষ নেই। চৌধুরী বাড়ির পতন মানে এক অশুভ শক্তির শেষ হওয়া নয়, বরং তার এক নতুন রূপে জন্ম নেওয়া। নীলমাধবপুর আজ এক নিষিদ্ধ ভূমি, আর আমার স্মৃতিতে সেই রক্তিম চাঁদটা আজও এক দুঃস্বপ্নের মতো জ্বলজ্বল করছে।
***সমাপ্ত***