কবরস্থানের কান্না — দ্বিতীয় পর্ব
আমি ভেবেছিলাম সব শেষ।
নিজেকে বোঝাতাম—ওটা একটা দুঃস্বপ্ন ছিল।
একটা রাত… একটা ভুল… একটা ভয়।
কিন্তু কিছু জিনিস ভুলে থাকা যায় না।
আর কিছু জিনিস… তোমাকে ভুলতে দেয় না।
ঘটনার প্রায় ১৭ দিন পর থেকে শুরু হলো।
প্রথমে খুব ছোট ছোট বিষয়।
রাতে ঘুমানোর সময় মনে হতো কেউ আমার বিছানার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
চোখ খুললেই—কেউ নেই।
তারপর… আয়নায় সমস্যা শুরু হলো।
একদিন দাঁত ব্রাশ করতে গিয়ে হঠাৎ লক্ষ্য করলাম—আমার পিছনে কিছু একটা নড়ল।
আমি সাথে সাথে ঘুরে দাঁড়ালাম।
কেউ নেই।
আবার আয়নায় তাকালাম।
আমার পিছনে…
এক সেকেন্ডের জন্য…
একটা সাদা অবয়ব দাঁড়িয়ে ছিল।
আমি জমে গেলাম।
এরপর থেকে প্রতিদিন… একটু একটু করে… সে কাছে আসতে লাগল।
প্রথমে দূরে।
তারপর দরজার পাশে।
তারপর আমার ঠিক পিছনে।
আর একদিন…
আমি আয়নায় তাকিয়ে দেখলাম—
সে আমার কাঁধের ওপর ঝুঁকে আছে।
তার ফাঁকা চোখের গর্ত… আমার চোখের সাথে লেগে আছে।
আমি চিৎকার করে উঠলাম।
সেই রাতেই আবার শুনলাম সেই কান্না।
“হুহ… হুহ…”
কিন্তু এবার… দূর থেকে না।
আমার ঘরের ভেতর থেকে।
আমার বিছানার নিচ থেকে।
আমার শরীর অবশ হয়ে গেল।
ধীরে ধীরে নিচে তাকালাম।
বিছানার নিচে… অন্ধকার।
কিন্তু সেই অন্ধকারের ভেতর… কিছু নড়ছে।
হঠাৎ—
একটা হাত বের হয়ে এল।
মাটিতে পচে যাওয়া, কালচে, কাঁদামাখা হাত।
সেটা ধীরে ধীরে আমার পায়ের দিকে এগিয়ে আসছে।
আমি লাফ দিয়ে উঠে দরজার দিকে দৌড় দিলাম।
কিন্তু দরজা খুলল না।
কেউ যেন বাইরে থেকে ধরে রেখেছে।
পেছন থেকে… সেই কণ্ঠ—
“তুমি তো শুনেছিলে…”
আমি ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়ালাম।
সে দাঁড়িয়ে আছে।
ঠিক সেই একই—সাদা কাপড়, লম্বা চুল… আর চোখ নেই।
কিন্তু এবার তার মুখে একটা নতুন জিনিস।
তার ঠোঁটের কোণ ফেটে গেছে…
আর ভিতর থেকে কালো কিছু বের হচ্ছে… যেন মাটি।
“আমাকে ভুলে গেছো?” — সে ফিসফিস করে বলল।
আমি কাঁপতে কাঁপতে বললাম,
“তুমি… তুমি কি চাও?”
সে ধীরে ধীরে হাসল।
“চলো…”
“আমাকে যেখানে রেখে গেছে… সেখানে নিয়ে চলো…”
হঠাৎ আমার মাথা ঘুরতে শুরু করল।
ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেল।
আমি বুঝতেই পারলাম না কখন আমি মাটিতে পড়ে গেলাম।
আমি যখন জ্ঞান ফিরে পেলাম—
আমি আমার ঘরে ছিলাম না।
আমি দাঁড়িয়ে আছি…
সেই কবরস্থানে।
কিন্তু এটা আগের মতো না।
সব কবর ভাঙা।
মাটি উল্টে গেছে।
আর চারদিকে… হাত।
শুধু হাত।
মাটির নিচ থেকে বের হয়ে আছে অসংখ্য হাত—কেউ কাঁপছে, কেউ নড়ছে।
আর সবগুলো হাত… আমার দিকে বাড়ানো।
“বাঁচাও…”
“আমাদের বের করো…”
“আমরা বেঁচে আছি…”
শত শত কণ্ঠ একসাথে ফিসফিস করছে।
আমি চিৎকার করতে চাইলাম—কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না।
ঠিক তখন… সে আবার এল।
আমার সামনে।
“দেখছো?” — সে বলল।
“আমরা কেউ মরিনি…”
“আমাদের মেরে ফেলা হয়নি…”
“আমাদের… পুঁতে ফেলা হয়েছে…”
আমার শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে একটা কবরের দিকে ইশারা করল।
“ওখানে খুঁড়ো…”
আমি না চাইলেও… আমার হাত নিজে নিজে নড়তে লাগল।
আমি মাটি খুঁড়তে শুরু করলাম।
নখ ভেঙে যাচ্ছিল… হাত কেটে রক্ত বের হচ্ছিল…
তবুও থামতে পারছিলাম না।
কিছুক্ষণ পর—
আমি কিছু একটা ছুঁলাম।
নরম… ভেজা…
আমি সেটা টেনে তুললাম।
একটা মুখ।
মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকা… এখনও নড়ছে।
তার চোখ খুলে গেল।
সে হাঁ করে নিঃশ্বাস নিতে চাইল—
“বাঁচাও…”
তারপরই তার মুখ ভেঙে গুঁড়ো হয়ে গেল।
আমি পেছনে পড়ে গেলাম।
চিৎকার করে উঠলাম।
“এগুলো… কী?!”
সে ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এল।
“এটাই সত্য…”
“তুমি শুনেছিলে… তাই তুমি এখন আমাদের…”
হঠাৎ সব হাত একসাথে নড়তে শুরু করল।
সব কবর থেকে… সব দিক থেকে…
হাতগুলো বের হয়ে এসে আমাকে ধরতে লাগল।
আমার পা, হাত, শরীর—সবকিছু শক্ত করে চেপে ধরল।
আমি লড়াই করছিলাম… কিন্তু পারছিলাম না।
তারা আমাকে টেনে নিচ্ছে…
মাটির নিচে।
আমি চিৎকার করছিলাম—
“বাঁচাও! কেউ আছে?!”
ঠিক তখন…
আমি আবার সেই কণ্ঠ শুনলাম।
কানের কাছে।
“এবার… তুমি কাঁদবে…”
আমার শরীর অর্ধেক মাটির নিচে ঢুকে গেছে।
ঠান্ডা… ভেজা… অন্ধকার…
হঠাৎ আমার চোখের সামনে অন্ধকার হয়ে গেল।
আমি হঠাৎ উঠে বসলাম।
আমি আমার ঘরে।
ঘাম ভেজা শরীর… বুক ধড়ফড় করছে।
আমি চারদিকে তাকালাম।
সব স্বাভাবিক।
আমি ভাবলাম—সবটাই দুঃস্বপ্ন।
ঠিক তখন…
আমার নখের নিচে ব্যথা অনুভব করলাম।
হাতের দিকে তাকালাম।
আমার নখ ভাঙা…
আর ভিতরে মাটি ঢুকে আছে।
আমার বুক কেঁপে উঠল।
ধীরে ধীরে বিছানার নিচে তাকালাম।
অন্ধকার।
কিন্তু সেই অন্ধকারের ভেতর…
দুটো চোখ জ্বলছে।
আর একটা কণ্ঠ—
“আরও আছে…”
সেই রাতের পর থেকে…
আমি আর ঘুমাতে পারি না।
কারণ…
যখনই আমি চোখ বন্ধ করি—
আমি অনুভব করি…
কেউ আমাকে নিচে টানছে।
আর দূরে কোথাও…
একটা না…
শত শত কণ্ঠ একসাথে কাঁদছে—
“আমাদের বের করো…”
“নাহলে… তুমি আমাদের সাথেই থাকবে…”
⚠️ (শেষ… নাকি শুরু?)
(সকল পর্ব এসে গেছে সার্চ করে অথবা চ্যানেলে গিয়ে দেখুন, পর্ব ৩ পর্যন্ত রয়েছে.)