[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]
নির্ঘুম থাকার রেকর্ড সৃষ্টি করায় সম্ভবত নিজের নাম শিগগিরই গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ডে দেখতে পারবে স্নেহা। টানা ৭২ ঘণ্টা নিদ্রাবিহীন থেকে রৌদ্রোজ্জ্বল এই সকালের সাক্ষী হওয়ার ফাঁকে এমন অনুভূতিই হইতেছে ওর। একইসঙ্গে ও খেয়াল করলো, কাপের কফি বহু আগে শেষ হলেও এখনো ও ‘এই চুমুক দিতে যাচ্ছে’ ভঙ্গীতে কাপটা ধরে রাখছে। বিষয়টা ও বোঝার চেষ্টা করে। ইদানিং নিজের অনেককিছু বুঝতেই ওর কিছুটা সময় লাগতেছে। আরেকবার কফি খাওয়ার ইচ্ছা, কিন্তু কিচেনে যাওয়ার অনীহার মেলবন্ধনে সম্ভবত কফি শেষ হওয়ার পরও কাপটা ওইভাবে ধরে থাকতে উদ্বুদ্ধ হইছে ও- মোটামোটি এমন একটা যুক্তি ও নিজের মস্তিষ্কে দাঁড় করালো। যুক্তির পাহাড়ের নিচে দুনিয়ার সকল উইয়ার্ড কাজকেও বৈধতা দেওয়া যায় বলে মনে হলো ওর।
এই যে ও খুব সিস্টেম্যাটিক ওয়েতে নিজের ধ্বংস একজন বহিরাগত দর্শক হিসেবে গ্যালারিতে বসে পর্যবেক্ষণ করতেছে- এর পেছনেও চাইলে হাজার না হলেও একটা স্ট্রং যুক্তি ও দাঁড় করাতে পারবে নিঃসন্দেহে। এর জন্য জাস্ট কিছুক্ষণের ভাবনা আর নিজের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে তাতে জয়লাভ করতে পারাই যথেষ্ট। আবিরের সঙ্গে ওর সম্পর্ক নিয়েও এইভাবে দিনের পর দিন আর রাতের পর রাত নিজের সঙ্গে ও যুক্তি-তর্কে সময় পার করছে। বহু বিতর্ক প্রতিযোগীতায় অংশ নেওয়ার পর একসময় ফাইনাল রাউন্ডে ও নিজের বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে সক্ষম হয়। ওই বিজয়ই মূলত তথাকথিত সমাজের চোখে অগ্রহণযোগ্য সম্পর্কের ট্যাবু থেকে বের করে এনে একটা পবিত্র আত্মিক বন্ধনের অনুভূতি ওকে ফিল করাতে পারছিল। ওদের সম্পর্ক নিয়ে ওর সামান্যতম কোনো পাপ বোধ নাই, কখনো ছিলও না। ভালোবাসা মানে ওর কাছে- ভালোবাসাই; একজন পুরুষের প্রতি নারীর বা একজন নারীর প্রতি পুরুষের। এর বাইরের হিসাব ও করতে যায় না।
আবির সম্পর্কে মাহমুদ ভাইয়ের ‘ওম্যানাইজার’ ট্যাগটাকে ওর কখনোই সত্যি বলে মনে হয় নাই। হুট করেই এই শব্দটা মনে পড়লো ওর। মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে যতবার ওর কথা হইছে, এই শব্দটা উনি বহুবার ইউজ করছে। ভদ্রলোক স্ট্রেইট কাট কথা বলেন ঠিকই; বাস্তববাদী, লজিক দিয়ে ঘটনার বিশ্লেষণ করেন, উনার অনেক কথা পরে বাস্তবতার সঙ্গে মিলছেও- সব ঠিক আছে, কিন্তু একইসঙ্গে উনার ভেতর প্রচণ্ড অবিশ্বাস আর নেগেটিভিটি স্নেহা সেন্স করতে পারছে প্রথম দিন থেকেই। এত নেগেটিভিটি নিয়ে মানুষ ঘুমায় কী করে কে জানে!
মানুষকে একইসঙ্গে বিশ্বাস আর অবিশ্বাস দুইটাই ক্ষেত্র বিশেষে করা উচিত- এটা নিয়ে স্নেহার তেমন তর্ক নাই। কিন্তু আশেপাশের সবকিছুকে অথবা সব মানুষকে অহেতুকই অবিশ্বাস করে কারো পক্ষে স্বস্তিতে দম নেওয়া কীভাবে সম্ভব- মাথার মাঝখানটা হালকা চুলকাতে গিয়ে ভাবলো ও। তবে এটা ঠিক- ওর ভেতর যদি একবার কাউকে বা কিছু নিয়ে অবিশ্বাস ঢুকে, ওই ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি এরপর বিশ্বাস আনাটা একটু কঠিনই হয় ওর জন্য। শুধু মনে হতে থাকে- মিথ্যা বলতেছে নাকি? অথবা কোনোকিছু মনে হয় হাইড করতেছে, নিশ্চিত! অনেকে আবার কাস্টমাইজ করে সত্য-মিথ্যার মিশ্রনে নিজের সুবিধা মাফিক কথা বানিয়ে বলেন। এইটা আরো বেশি সাংঘাতিক!
স্নেহা ওর মরহুমা প্রাক্তন শাশুড়ির কথা স্মরণ করে। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুক। ভদ্রমহিলার ক্যারেক্টার বেশ অদ্ভুত ছিল। অযথাই উনি অনর্গল মিথ্যা এবং বানোয়াট কথা বলে যেতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কোনো কারণ ছাড়া, খামাখাই! এটা উনার স্বভাবের একটা স্বাভাবিক অংশ ছিল। প্রথম প্রথম উনার ওই অযথা বলা মিথ্যা কথাগুলা সরল মনে ও বিশ্বাসও করে ফেলতো। কিন্তু বিপুলকে ওইসব নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে দেখতো- বেচারা খুব চিপার মধ্যে পড়ে ইতস্তত বোধ করতেছে। একদিন বিপুল নিজে থেকেই ও বলে- আম্মার বয়স হইছে তো, অনেক কথা উল্টাপাল্টা বলেন। সব এত পাত্তা দিও না। ওই কথা শোনার পর থেকে উনার সব কথাই মোটামোটি যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে ও দেখতে পাইলো- অধিকাংশেরই কোনো ভিত্তি নাই। উনি কি প্যাথলজিক্যাল লায়ার ছিলেন, নাকি কম্পালসিভ লায়ার? ও একটু চিন্তা করে সিদ্ধান্তে আসে- নাহ, উনি ছিলেন হ্যাবিচুয়াল লায়ার। মিথ্যা বলতে বলতে ওইটা তার অভ্যাসে পরিণত হইছিল।
আবিরকে তাহলে কোন ক্যাটাগরিতে ফেলা সমীচীন হবে? এই ভাবনা আসতেই ওর মনে হলো- আবির আসলে ইকুইভোকেটর। মিথ্যার চেয়ে বেশি ওর ভেতরে ছিল অস্পষ্টতা। ওর ধারণা- স্নেহা সত্য সহ্য করতে পারে না, রিয়্যাক্ট করে। অথচ স্নেহা রিয়্যাক্ট করতো ওর অস্পষ্টতায়; ওর অর্ধেক সত্যে, ওর সঠিক সময়ে সঠিক কথাটা না বলতে পারার কারণে, আর ভুল টাইমিংয়ে বেওয়াকুফের মতো বলা বাকওয়াজগুলার জন্য। স্নেহা রিয়্যাক্ট শুরুও করছে বহু পরে। কবে থেকে, ওই টাইমফ্রেম হয়তো আবির মনে করতে পারবে। কিন্তু কেন ও রিয়্যাক্ট করা শুরু করছিল, ও শতভাগ নিশ্চিত যে আবির তা কোনোদিনও ভেবে বের করতে পারে নাই, রিয়েলাইজও করে নাই।
ডিসেম্বর ২০২৪ এর কথা মনে পড়ে গেল ওর। পরিচয়ের ১৩ মাস পর ওইবার ও আবিরের কাছে ওর ভালোবাসার ব্যাপারে কনফেস করে। হাতে হাত রেখে কত সুন্দর ভাবে আবিরকে ও বুঝিয়ে বলছিল- ওর কাছ থেকে কোনোকিছু না লুকিয়ে যেন সব ব্যাপারে স্পষ্ট থাকে, ওকেও স্পষ্ট রাখে, ওর যেন কোনোকিছু গেইজ করে সময় কাটাতে না হয়। কিন্তু নাহ! ও ওর স্বভাবসুলভ কাস্টমাইজ ওয়েতেই যখন যেটুকু প্রয়োজন মনে করছে- বলছে, বা বলে নাই। অস্পষ্ট আর ভাসা ভাসা একটা দুনিয়ায় থাকতে থাকতে ইভেনচুয়্যালি স্নেহাকে কিছু বিষয়ে কৌশলী হতে হইছে। তবে সেটা অনেক পরে আর অনেককিছু আবির হাইড করার কারণে।
এক সময় আবিরের কোনোকিছু নিয়েই ও নিজে থেকে কোনো প্রশ্ন করতো না। নিজে থেকে কিছু বললে শুনতো, নাহলে নাই। কিন্তু নানা কারণেই একটা সময় কিছু বিষয় জানতে ওকে উদ্যোগী হতে হইছে। এসব খুব ফালতু কাজ-কারবার। এসব থার্ড ক্লাস কাজকর্ম ওর পছন্দ ছিল না কোনোকালেই। এরকম কৌশলী হতে গিয়ে নিজের সমস্ত ইনোসেন্স ওকে বিসর্জন দিতে হইছে ভাবতেই আবিরের উপর মেজাজটা খিঁচে গেল ওর। ওর জন্য মাহমুদ ভাইয়ের মতো মানুষই ঠিক আছে, মেজাজ খারাপের চোটে স্নেহার ঠিক এইটাই মনে হইতেছে এখন। কিন্তু মাহমুদ ভাই যে আবিরকে চ্যান্স পেলেই ওম্যানাইজার ট্যাগ দেন, ওইটা ওর পছন্দ না। কখনোই ও এইটা শুনতে পছন্দ করে নাই। আবিরকে নিয়ে নেগিটিভ কিছু বললে কিংবা ইভেন বলার চেষ্টা করলেও ও বিরক্ত বোধ করছে বরাবরই। শেষের দিকে তো ও বাধ্য হয়ে বলেই ফেলতো- বাদ দেন না, ভাই। কে কেমন তা আমরা জাজ করার কে? অনেস্টলি আবির নারীবাজ হলেও ওর কিছু যায় আসে না। কিন্তু ওর কেন যেন বিশ্বাস- আবির তা না। এমন কী এখনও ও এইটাই বিশ্বাস করে।
নারীর প্রতি পুরুষের এবং পুরুষের প্রতি নারীর আর্কষণ একটা চিরন্তন বিষয়। সাধু-সন্ত ছাড়া এই চিরন্তন আকর্ষণকে এড়ানো যেকোনো সাধারণ মানুষের পক্ষে বেশ কঠিন। কেউ হয়তো তা প্রকাশ করেন নির্দ্বিধায়, কেউ বা গোপন রেখে সাধু সাজার ভান করেন। আবিরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর ওর মনে হইছে, যে সময়টা ওদের পরিচয় হয়, ওয়াইফ এবরোডে থাকার কারণে হয়তো ও কিছুটা লোনলি ছিল, নারীসঙ্গ থেকেও হয়তো বিচ্ছিন্ন ছিল দীর্ঘদিন। যদিও ড্রাঙ্ক হয়ে ও নিজের মুখেই বলছে স্নেহার আগে আরো কয়েকজনের সঙ্গে নাকি ও দেখা করছে। ডেটেও গেছে বারে। ওই ভদ্রমহিলাদের কেউই নাকি ওর প্রকৃত পরিচয় জানেন নাই, এমন তথ্যও ও-ই দিছে স্নেহাকে। ও নাকি ইভেন নিজের নামও ভুলভাল বলে দেখা করছে ওইসব নারীদের সঙ্গে। একমাত্র স্নেহাই নাকি ওর আসল পরিচয় জানতে পারছে। যদিও এই বিষয়ে ক্রেডিট স্নেহারই। ওইসব ভদ্রমহিলাগণ ওর পরিচয় জানতে পারেন নাই কারণ হিসেবে স্নেহার বরাবরই মনে হইছে- তাদের কারোরই ওর প্রতি বিশেষ কোনো আগ্রহ তৈরি হয় নাই সম্ভবত। কোনো নারী প্রকৃত অর্থে আগ্রহী হয়ে উঠলে কারো পরিচয় বের করা খুব কঠিন কিছু না! ইটস নট অ্যাবাউট হাউ পাওয়ারফুল শি ইজ ফর গেটিং ইট, ইট'স অল এবাউট হাউ ডেসপারেটলি শি ওয়ান্টস টু গেট ইট!
যাই হোক, ওইসব ভদ্রমহিলাদের সঙ্গে ওর দেখা হওয়া না হওয়ার বিষয়ে সত্য-মিথ্যা কোনোটাই স্নেহা নিশ্চিত বলতে পারবে না। আবির যা এবং যতটুকু ওকে বলছে, ওইটাই জাস্ট ও রিকল করলো। নিজের প্রফেশনাল আইডেন্টিটির কারণে যত্রতত্র নারীদের সান্নিধ্যে যাওয়াটাও আবিরের সম্ভব ছিল বলে মনে হয় না ওর। তাও আবার ওর মতো অ্যাংজাইটিতে ভোগা একজন লোকের পক্ষে তো আরো না। ওর সঙ্গে পরিচয়ের প্রথমদিকে একজন নারীর প্রতি পুরুষের সহজাত আকর্ষণটাই বোধহয় আবিরের কাজ করছিল। একইসঙ্গে একজন ইন্টেলেকচুয়্যাল পুরুষ হিসেবে আবিরের সেপিওসেক্সুয়াল সত্তা স্নেহার বুদ্ধিবৃত্তিক পারসোনালিটির প্রতিও আকর্ষিত হয় সম্ভবত। কিন্তু যেহেতু আবির একটা সিস্টেমেটিক কাঠামোর ভেতর বড় হইছে এবং ওর প্রফেশনাল লাইফও হাইলি স্ট্যাকচারড, রেস্ট্রিকটেড, তাই আকর্ষণের মাঝেও রিয়েলিটি আর লজিক ওকে তাড়া করে বেড়াইছে সবসময়। ভালোলাগা আর আকর্ষণের অনুভূতি থাকার পরও এই সম্পর্কের মোর্যালিটি নিয়ে পরিচয়ের কয়দিন পর থেকেই ওর মধ্যে একটা বড়-সড় দ্বন্দ্বও শুরু হয়ে যায়।
তবে বিষয়টা এমনও না যে যোগাযোগ রাখার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও প্রেশারে, ভয়ে, সহমর্মীতায়, কৃতজ্ঞতায় কিংবা করুণা থেকে স্নেহার সঙ্গে ও দুই বছর যোগাযোগ মেইন্টেইন করছে। ও ওর নিজের ইচ্ছাতেই এবং ভালো লাগা থেকেই যোগাযোগ রাখছিল। এখন ও যতই আবোল-তাবোল কথাই বলুক না কেন, এসব স্নেহা গোনায় ধরে না আর। বরং শেষদিনের আজাইরা কথাগুলা মনে পড়লে রাজশাহীতে দেওয়া থাপ্পড়ের চেয়েও আরো অনেক বেশি স্ট্রং একটা থাপ্পড় ওর গালে বসাতে মন চায় মাঝে মাঝে। স্নেহার আফসোস হয় যে শেষদিন কেন আবিরের আবোল-তাবোল কথার জন্য একটা থাপ্পড় যে ওর পাওনা থাকলো, এটা ও বলতে পারলো না! মনেই ছিল না! কোনোদিন সুযোগ পেলে অবশ্যই কড়ায়গণ্ডায় ও এই থাপ্পড় শোধ করবে, এটা অবশ্যই ওকে বলা দরকার ছিল!
আবিরের সমস্যা মূলত শুরু হইছিল স্নেহা ওর পরিবারের সদস্যদের খবরাখবর পাওয়া শুরু করার পর থেকে। তখন থেকেই মূলত ওর অস্বস্তির সূত্রপাত হইছে। ওইটা ভালো হইছে কি না খারাপ হইছে, এসব পুরানো তর্কে ওর মাথা ঘামাতে মন চাইলো না এখন। খামাখাই তাতে মন আর মেজাজের উপর চাপ ফেলা হবে। এসব ভাবনার মাঝেই রোদের প্রকৃতি বদলে যাওয়া টের পেল ও। মিষ্টি রোদটা ফেড আউট হয়ে সূর্যের তাপ কিছুটা বাড়তেছে। কিছুক্ষণ আগের ওয়েদারের কোমল ভাবটা আর নাই। হাতে থাকা কফির কাপটা নিয়ে ও ঘরে ঢুকলো। বৃষ্টির কারণে গত সন্ধ্যা থেকে বন্ধ থাকা জানালার স্লাইডটা খুলে দিয়ে ঘরে আলো ঢুকতে দিলো স্নেহা। রোদের তীব্রতা বাড়লেও বাইরে হালকা একটা বাতাস টের পাওয়া যাইতেছে। আরেক কাপ ব্ল্যাক কফি বানাতে গিয়ে ওর মনে পড়ে- আবিরেরও সকাল হয় ব্ল্যাক কফিতে। ওর হার্টে কিছুটা জটিলতা আছে। ক্যাফেইনে সেটা আরো বাড়ার সম্ভাবনা আছে জানার পরও এর উপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই ওর। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত কাউন্টলেস কফির কাপে চুমুক দেওয়ার সিলসিলা ওর চলতেই থাকে।
মানুষ তো মূলত এমনই- স্নেহা ভাবে। যার যেটায় নেশা, নিজেকে তা থেকে বিরত রাখতে পারার নিয়ন্ত্রণ অধিকাংশ মানুষেরই থাকে না। কফির ধোঁয়া উঠা কাপটায় প্রথম চুমুক দিয়ে সশব্দে ও বলে উঠে- আহ! এই ৭২ ঘণ্টার নির্ঘুম ক্লান্তিকর যাত্রায় কফিটা বেশ টনিকের মতো কাজে করতেছে বলে মনে হইতেছে। মুখে কফির স্বাদটা নিয়ে একবার ভাবার চেষ্টা করে- ওর জীবনে কোন নেশাটা সবচেয়ে বেশি ওকে ভোগাইছে? বেশ খানিকক্ষণ ভাবার পর মনে হলো- বস্তুগত কোনো নেশাতে কখনোই ওর কোনো আসক্তি ছিল না। কোনো নেশার আসক্তি ওকে ভোগাতেও পারে নাই কখনো। আবিরের সঙ্গে পরিচয়ের আগে টানা আড়াই বছর ও মদ স্পর্শও করে নাই। এই পুরাটা সময় বন্ধু-বান্ধবের দেওয়া পার্টিতে ও ঠিকই গেছে। এমন কী বন্ধু-বান্ধবকে সঙ্গ দিতে বারেও পর্যন্ত গেছে। তবুও কেউ ওকে এক বিন্দু মদ গেলাতে পারে নাই অনেক অনুরোধেও। কয়েক বছর আগে ওর নিউরোলজিক্যাল সমস্যা ধরা পড়ার পরই ও মদ্যপানে বিরতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিছিল। খুব সুন্দরভাবে তা মেইন্টেইনও করতেছিল।
মূলত আবিরের সঙ্গে পরিচয়ের পরই ও আবার মদের চক্করে পড়ে। শুধু চক্করে পড়ছে বললে ভুল বলা হবে। ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ টানা নয় মাস শুধুমাত্র আবিরের মেমোরি রি-কল করার জন্য প্রায় প্রতিদিনই ও কিংফিশারে নিয়ম করে গিয়ে পেগের পর পেগ পাসপোর্ট, ব্যালেন্টাইন নয়তো বা ভ্যাট সিক্সটি নাইন গিলছে। এই আনুষ্ঠানিকতায় হাজার থেকে লক্ষতে গিয়ে খরচের অংক ঠেকলেও কোনো ভ্রক্ষেপ ছিল না ওর। তবে এই বছর জানুয়ারিতে আবিরের অ্যালকোহলিক রূপটা প্রচণ্ড নগ্নভাবে ওর কাছে ধরা পড়লে মদের প্রতি ও পুরাপুরিই আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। ২৮ জানুয়ারির পর ও আর একদিনের জন্যও মদ স্পর্শ করে নাই। এই ফ্ল্যাটের ওয়ারড্রবের প্রথম ড্রয়ারেই একটা পাসপোর্টের বোতল ইনটেক অবস্থায় আছে। ফেব্রুয়ারিতে ওর বন্ধু শিমুল কানাডায় যাওয়ার আগে জন্মদিনের গিফট হিসেবে বোতলটা দিয়ে গেছিল। দুই-তিন মাস পার হয়ে গেছে, তবুও ওই বোতল খোলার বা ওর ভেতরের পানীয় পানের কোনো সুপ্ত বা জাগ্রত বাসনাও ওর মন অথবা মস্তিষ্কের কোথাও দূর দূরান্তেও উঁকি মারে নাই।
মন শব্দটা মাথায় আসতেই কেমন একটা যেন ফিল হলো! হোয়াটএভার- ও ভাবে। ওর মন নাহয় জলে ভাসা পদ্ম হয়ে ভাসতে ভাসতে ফেরার পথ হারিয়ে ফেলছে, কিন্তু মস্তিষ্কটা তো এখনো বলবৎ আছে। অধিকাংশ মানুষই তো মস্তিষ্কের ডিরেকশনেই জীবনটাকে দিব্যি আনন্দে কাটিয়ে দিতেছেন, মনের ইচ্ছার ধারই তারা ধারেন না। অথচ সেই শৈশব থেকে ও শুনে আসতেছে- "পিরিতি এই জগতে জাতি কূলের ধার ধারে না।" অনেকদিন পর গানটা মনে পড়লো। "ওরে যার সঙ্গে যার মন মজেছে, সে তো তারে আর ছাড়ে না" লাইনটা গুন গুন করে হালকা একটু হাসলো ও। কেন হাসলো, সেটা বোঝার চেষ্টা আপাতত করতেছে না। বরং "দেখো চাতকের রীতি, মেঘের সাথে তার পিরিতি, ওরে যায় মরিয়া তবু চাতক অন্য পানি পান করে না" লাইনটার সঙ্গে নিজের সিচ্যুয়েশনের মিল খুঁজে পেয়ে ওর হতাশই লাগলো কিছুটা।
আবিরকে একবার ও জিজ্ঞেস করছিল, ও জীবনে কোনোদিন নিজের হৃদয়ের কথা শুনে কিছু করছে কি না? উত্তরে আবির বলছিল- দুই-একবার করছে এবং পরে সেসব নিয়ে ওকে রিপেন্টও করতে হইছে। স্নেহার সঙ্গে নিজের সম্পর্ক বা যোগাযোগের বিষয়টাকে ইঙ্গিত দিয়েই হয়তো ও রিপেন্টের কথাটা বলছিল। স্নেহার তখন ওই রকমই মনে হইছিল। আবার নাও হতে পারে এমন। মানুষের মনের ভেতর প্রবেশ করে ভাবনা বোঝার ক্ষমতা তো আছে কেবল অন্তর্যামীর। এক সময় ওর মনে হতো আবিরকে ও অনেকটাই বোঝে, আবির কিছু না বললেও বুঝতে পারে। কিন্তু দুই বছর পর মনে হইছে- আবিরকে ও বিন্দুমাত্র বোঝে নাই, একটুও হয়তো চিনতেও পারে নাই। রিপেন্ট বিষয়ক আলাপে আবির ওর সঙ্গে নিজের সম্পর্কের ইঙ্গিত করুক বা না করুক, ও যে আবিরের জীবনে একটা অনুশোচনা- এটা বুঝতে কোনো ইঙ্গিতই ওর দরকার পড়ে না।
এই বছর জানুয়ারির ২০ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত লম্বা একটা সময় আবিরকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হইছে স্নেহার। মাঝে শুধু ২২-২৩ দুইদিন ও শ্বশুর বাড়িতে ছিল। ২৪ তারিখে ফিরেই আবার ওই বারেই ওর যেতে হইছে। খুবই অদ্ভুত বিষয় যে বারের বাইরে অন্য কোনো জায়গাতে দেখা করতেই ও স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে নাই কখনো। স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে কি করে না- সেটা বোঝার চেষ্টাও কখনো ওকে করতে দেখে নাই স্নেহা। জানুয়ারির ওই সময়টায় স্নেহার জেনুইনলি মনে হইছে- আবিরের আগ্রহ বা নেশা কোনোটাই নারীতে না, অ্যালকোহলে। মানুষের প্রতি আবিরের ঠিক কতটুকু প্রকৃত অনুভূতি আছে, এটা নিয়েও ও বেশ সন্দিহান হয়ে পড়ে। ওর ধারণা, নিজেকে ছাড়া কাউকেই আবির কোনোদিন ঠিকঠাক ভালোবাসতে পারে নাই, কিংবা ভালোবাসার অনুভূতিও ওর ঠিকমতো জানা নাই। ও ভয়াবহ লেভেলের অ্যালকোহলিক। মদের সামনে কোনো নিয়ন্ত্রণই ওর থাকে না। এমন কী ড্রাঙ্ক অ্যান্ড ড্রাইভের কারণে ওর বিরুদ্ধে অফিসিয়াল ইনকোয়ারি হওয়ার পরও না। যদিও ওই ঘটনার জন্যও স্নেহাকেই ও দায়ী ভাবে!
আবিরের ফ্যামিলি রাজশাহীতে মুভ করে গত বছরের ২৭ এপ্রিল। এর আগে মার্চ-এপ্রিল মাসের প্রতি শুক্রবারই আবিরের সঙ্গে দেখা করতে রাজশাহীতে ফ্লাই করছে স্নেহা। তাও আবার ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখ সন্ধ্যায় রাজশাহীর বারে বসে “ডোন্ট কাম হেয়্যার লাইক দিজ এগেইন” শোনার পরের ঘটনা এইগুলা। আবিরকে একটু দেখার জন্য ওই অপমানটাও ও ইগনোর করে নিজের চোখে কাপড় বেঁধে রাখছিল আত্মসম্মান বোধ থেকে চোখ লুকাতে। আবিরের ফ্যামিলি রাজশাহীতে যাওয়ার একদিন আগেও সকাল থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত ও আবিরের সঙ্গে সময় কাটিয়ে আসছে। ২৭ এপ্রিলের পর হাজার মন চাওয়ার পরও রাজশাহী যাওয়া বা ওইখানে যাওয়ার কথা আবিরকে বলাও ওর সম্ভব হয় না। মে থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত দেখতে ইচ্ছা করার কথাটাও ও ইতস্তত বোধের কারণে বলতে পারে না। কিন্তু ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ক্রমাগত যে ওদের দেখা হইছে, কাছাকাছি থাকা হইছে- একসঙ্গে কাটানো ওই সময়ের স্মৃতিগুলা তখন দেখা না হওয়ার শূন্যতাকে ভারী করে তুলতেছিল।
একেকটা দিন পার হইতেছিল আর না দেখতে পারার শূন্যতা বোধের যন্ত্রণা ওর ভেতরে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠতেছিল। এর ইমপ্যাক্ট পড়া শুরু হলো ওদের প্রতিদিনের কনভার্সেশনে। কোনো কারণ ছাড়া অথবা অল্পতেই রেগে যাওয়া, বাঁকাভাবে কথা বলা, অযথাই জেদ দেখানো, অস্থির হয়ে উঠা, সামান্য ঘটনাকে ইস্যু করে আবিরকে আজে-বাজে কথা শোনানো- দিনকে দিন এইগুলা বেড়েই চলতেছিল। স্নেহা বুঝতেছিল আবিরের সঙ্গে ও ঠিক আচরণ করতেছে না; কিন্তু ওর মনের ভেতর ছটফট করতে থাকা আবিরকে দেখার তীব্র বাসনা এসব আচরণ থেকে ওকে বিরতও রাখতে পারতেছিল না। ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ইচ্ছা করলেই দেখা করতে চলে যাওয়ার অভ্যস্ততাটা যখন মে-জুনে এসে ওকে ফিল করালো- চাইলেই ও আর প্লেনে উঠে রাজশাহী চলে যেতে পারবে না; তীব্র ইচ্ছা করলেও আর যখন মন চাইবে দেখা করতে পারবে না, ওর কণ্ঠ শুনতে মন অস্থির হয়ে উঠলেও আর ফোনে কথা বলার আবদার করতে পারবে না যখন-তখন, কিংবা চাইলেই ভিডিও কলে আবিরের হাসিটাও আর দেখতে পারবে না আগের মতো করে- এইসব রেস্ট্রিকশনের ফিলিং ভেতরে ভেতরে ওকে রক্তাক্ত করতেছিল প্রতি মুহূর্ত।
ওর ধৈর্য্যের সীমা পুরাপুরি ভেঙে পড়তেছিল। একেকটা দিন যাইতেছিল আর ওর মনে হইতেছিল- একটা দীর্ঘ অনিশ্চয়তার ভেতরই বাকি জীবনটা ওকে কাটিয়ে দিতে হবে। ওর প্রতীক্ষারা তবু ফুরাবে না। দেখা হওয়া না হওয়া নিয়ে আবিরের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। ওই উদাসীনতার উপলব্ধিটা ওকে আরো বেশি যন্ত্রণা দিত। আবির তখন পুরাদস্তুর ফ্যামিলি ম্যান। আগের ওই সিঙ্গেল জীবন তখন নাই, যেখানে চাইলেই স্নেহার যখন খুশি প্রবেশ করতে পারবে। এই সীমানা আর সীমাবদ্ধতা ওকে অস্থির করে তুলতেছিল ক্রমাগত। এপ্রিলের ২৮ তারিখ অর্থাৎ আবিরের ফ্যামিলি রাজশাহীতে যাওয়ার পরদিন খুব সকালে ওর গুড মর্নিং টেক্সট আসে স্নেহার কাছে। ওইদিন থেকে প্রতিদিনই ও অফিসে ঢুকেই প্রথমে স্নেহাকে গুড মর্নিং টেক্সট দেওয়া শুরু করে। দিনের মধ্যে আরও কয়েকবার স্নেহা অফিসে কি না, লাঞ্চ করলো কি না, কাজ করতেছে কি না, অ্যাসাইনমেন্টে গেল কি না, কোথায় অ্যাসাইনমেন্টে গেল, সেইফ আছে কি না, বাসায় কখন ফিরলো- এ রকম অসংখ্য টেক্সটে ও স্নেহার সঙ্গে কানেক্টেড থাকার চেষ্টা করে গেছে। ২৮ এপ্রিলের আগে এত ঘন ঘন রুটিন করে টেক্সট ও খুব কমই পাঠাইছে; যখন কথা বলতে ইচ্ছা করতো, তখনই শুধু টেক্সট দিতো।
স্নেহা বুঝতে পারতেছিল, ও যেন লো আর লোনলি ফিল না করে অথবা ফ্যামিলির সঙ্গে আছে বলে আবির ওকে ইগনোর করতেছে- এমন না ভাবে, তাই ও যতটা সম্ভব কানেক্টেড থাকতে ওর যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাইতেছিল। প্রতিরাতে অফিস থেকে বাসায় ফেরার আগে প্রতিদিনের শেষ টেক্সটটা করতো ও। স্নেহা ডিনার করছে কি না কনফার্ম হয়ে বলতো- মাথায় হাত রাখছি, ঘুমাও। স্নেহার মনটা অসম্ভব ভালো হয়ে যেত ওই একটা টেক্সটে। ভৌগিলিক দূরত্ব সত্ত্বেও আবিরের হাতটা ও ঠিকই নিজের মাথার উপরে ফিল করে ঘুমাতে যেত। কোনোদিন যদি আবির মাথায় হাত রাখার কথা লিখতে ভুলে যেত, রাজ্যের অভিমান নিয়ে ও নির্ঘুমই কাটিয়ে দিতো ওই রাতটা।
৭ জুন, ২০২৫ ছিল কোরবানির ঈদ। এর দুইদিন আগে আবিরকে না জানিয়ে রাজশাহী যায় স্নেহা। অনেক বছর পর টানা ৫ দিনের ঈদের ছুটি পেয়েও ওর মনটা খারাপ ছিল। ওই ছুটি দিয়ে ও কী করবে ভাবতে ভাবতে কোনো প্রিপারেশন ছাড়াই মুহূর্তের ভাবনায় ৪ জুন রাতে রাজশাহী যাওয়ার বাসে গিয়ে উঠে পড়ে। আবির যে শহরে আছে, ওই শহরে ঈদের ছুটিটা কাটিয়ে চুপচাপ আবার ঢাকায় ফিরে আসার প্ল্যান ছিল ওর। আবির যেহেতু তখন ওর ফ্যামিলির সঙ্গে ছিল, তাই ওকে কিছু না জানানোর সিদ্ধান্তই নেয় ও। একই শহরে থাকার অনুভূতি, অনেকদিন দেখা না হওয়ার অস্থিরতাকে কিছুটা কমাবে হয়তো- এমনটাই ও মনে করছিল।
৫ জুন রাতে আবির কল করে। ওইদিন সন্ধ্যায় স্নেহা অভিমান করে ওকে বলছিল- অনেকদিন ওর কণ্ঠ শোনে নাই, ও কি কোনো এক ফাঁকে একটা কলও করতে পারে না? ওর সেটা ইচ্ছাও করে না কখনো? এপ্রিলের পর ওইটাই ছিল আবিরের প্রথম ফোন কল। আবিরের কণ্ঠ শুনে সঙ্গে সঙ্গেই ও বুঝতে পারে- হি ইজ ড্রাঙ্ক। যদিও প্রথমে আবির স্বীকার করে না। কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে বোঝাতে চায়, ও একদম সোবার এবং ঠিকঠাক আছে। কিন্তু স্নেহার জেরায় বেশিক্ষণ সত্য লুকাতে পারে না, স্বীকার করে। স্নেহা যে ওই সময় রাজশাহীতেই ছিল, ইচ্ছা করেই ও হাইড করে। ফোন রাখার কিছুক্ষণ আগে শুধু বলে- যদি দেখা করার কোনো সুযোগ হয়, জানাইয়ো। তোমাকে অল্প একটু দেখেই চলে আসবো। এর উত্তরে আবির প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বলে উঠে- ডোন্ট কাম হেয়্যার। আই কান্ট লিভ মাই ফ্যামিলি অ্যান্ড গো টু মিট ইউ লাইক দিস। ইউ হ্যাভ টু আন্ডারস্ট্যান্ড মাই লিমিটেশনস। যেই টোনে ও কথাগুলো বলে, তাতে প্রচণ্ড বাজে ফিল হয় স্নেহার। নিজেকে ওর কীটের চেয়েও তুচ্ছ এবং অপ্রয়োজনীয় মনে হতে থাকে আবিরের জীবনে। আবিরকে নিজের লিমিটেশনের বাইরে গিয়ে এর আগেও কখনো ও কিছু করতে বলে নাই, তখনও না, এর পরেও না।
ওই রাতে কলে কনভার্সেশন শেষ হলে প্রচণ্ড কষ্ট আর অভিমানে আবিরকে ও টেক্সটে লিখে পাঠায়- তোমার ফ্যামিলিকে ছেড়ে আমি কোনোদিনই আমার কাছে তোমাকে আসতে বলি নাই, আবির। আমি শুধু বলছি, তোমার সম্ভব আর সুযোগ হলে জানাতে। না সম্ভব হলে তো জোর করে কিছু করতে বলি নাই। যদি জোরই করতে হতো, তাহলে তো বলতাম আমি এখন রাজশাহীতে, এখনই দেখা করতে হবে। দেখা করতে পারলে তুমি প্রেশার ফিল করবা, মন খারাপও। এইজন্য রাজশাহীতে এসেও আমি জানাই নাই। তোমার সঙ্গে তো আমি দেখা করতেও আসি নাই। এখনো আসার কথা জানাতাম না, তোমার আচরণের কারণে জানাতে বাধ্য করলা। তোমাকে আমি আর কোনোদিনই দেখা করার কথা বলবো না। আই'ম সর্যি একচুয়্যালি!
এর উত্তরে প্রায় ঘণ্টা খানিক পর আবির লিখে পাঠায়- আই'ম সর্যি, স্নেহা। আই ওয়াজ লিটল বিট ড্রাঙ্ক। হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ডুয়িং ইন রাজশাহী? গো ব্যাক টু ঢাকা। মায়ের সঙ্গে ঈদ করো গিয়ে। এখানে একা এভাবে থেকো না, প্লিজ। স্নেহা রিপ্লাই দেয়- পদ্মার পাড়ের নীরবতায় ঈদের ছুটিটা কাটাতে আসছিলাম, তোমাকে বিরক্ত করতে না। আমার জন্য টেনশন করো না। আই'ম ওকে। টেক কেয়ার। ওই টেক্সট দেওয়ার পর ৭ তারিখ ঈদের দিন ভোর পর্যন্ত আবিরকে ও ব্লক করে রাখে। ঈদের দিন সকাল আটটায় আনব্লক করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই ওর ঈদ মোবারক লেখা টেক্সট আসে। এর ঘণ্টা খানিক পর যখন ও স্নেহার সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্য দেখা করতে পারবে জানিয়ে টেক্সট পাঠায়, স্নেহা তখন ঢাকায় ফ্লাই করার জন্য শাহ মখদুম এয়ারপোর্টের বোর্ডিং গেট পার হইতেছিল। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে ল্যান্ড করার পর আবিরের টেক্সটের জবাবে লিখে পাঠায়- আই'ম ইন ঢাকা।
অফিসিয়াল কারণে ঈদের দিন সকালেই ও ঢাকায় ফেরে। এর আগেরদিন সন্ধ্যায় ইন্টেরিম গভমেন্টের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস ২০২৬ সালের জুনে ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন হওয়ার ঘোষণা দেন জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে। ওই ঘোষণার পর বিএনপিসহ যারা ২০২৫ এর ডিসেম্বরে নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসতেছিল, তাদের মধ্যে শুরু হয় চরম অস্থিরতা। দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ জন গোষ্ঠীর সর্ববৃহৎ ধর্মীয় উৎসবের ঠিক একদিন আগে কথা নাই, বার্তা নাই, হঠাৎই রাজনৈতিক অঙ্গনকে উত্তেজিত করে তোলেন দ্য গ্রেট নোবেল লরিয়েট! স্নেহা যেহেতু বিএনপি বিট কাভার করে, তাই রাত ১২টার একটু আগে কল করে হেলাল ভাই একটা স্টোরি লিখতে বলে।
একে তো প্রায় মধ্যরাত, এর উপর পরদিন ঈদ- স্বভাবতই বিএনপির হেভিওয়েট অথবা স্থায়ী কমিটির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে তখন পাওয়া গেল না। কোনো নেতার কমেন্ট ছাড়া স্টোরি অসম্পূর্ণ থাকবে বলে ও সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু রাত সাড়ে চারটায় হেলাল ভাই টেক্সট দিয়ে ওকে- শি হ্যাজ ফেইলড ইন হার জব! এমনিতেই আবিরকে ব্লক করে রাখায় সারাদিন ওদের কথা হয় নাই; এর উপর ওইদিন দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজশাহীতে আবিরের সঙ্গে কাটানো সবগুলা জায়গায় একা একা ঘুরে আসার পর ওর আরো বেশি ডিপ্রেসড লাগতেছিল। অলমোস্ট পুরা রাতই অস্থিরতায় হোটেলের ব্যালকনিতে ও পায়চারি করতেছিল। এরমধ্যে হেলাল ভাইয়ের ওই রকম ঠেস মারা টেক্সট দেখে মেজাজ আর কন্ট্রোলে রাখতে পারলো না। ছুটির মধ্যেও কাজের প্রেশার দেওয়া অপেশাদারী আচরণ মেনশন করে ও একগাদা কথা লিখে পাঠালো হেলাল ভাইকে। সঙ্গে আরো লিখলো- এই টেক্সটের জন্য আমাকে শোকজ অথবা চাকরিচ্যুত করার অধিকার আপনি রাখেন। গো এহেড। আই'ম রেডি ফর দ্যাট। রাষ্ট্রের যেকোনো গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে, কিংবা অফিসের যেকোনো ইমার্জেন্সি প্রয়োজনে সাংবাদিকদের ছুটি বাতিল করার এখতিয়ার সম্পাদক রাখেন, এটা ও খুব ভালোভাবেই জানে। এরপরও কড়া ভাষার ওই টেক্সটটা ও বসকে পাঠায় মূলত আবিরের সঙ্গে দেখা না হওয়ার ফ্রাস্ট্রেশনে।
হেলাল ভাই এই অডিসিটির উত্তরে লেখেন- পুলিশ, সাংবাদিক, ডাক্তার, এসব সেবামূলক পেশায় ছুটি বলে কিছু থাকে না। রেস্ট নাও, সকালে স্টোরিটা জমা দিও। সকাল পর্যন্ত যদিও অপেক্ষা করতে হয় না ওর। এর মিনিট পনের পরই ফজরের নামাজের জন্য উঠা এক বিএনপির নেতা ওর টেক্সটের উত্তরে জুনে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণায় প্রতিক্রিয়া জানিয়ে উত্তর লিখে পাঠান।
মাত্র কয়েকটা সেনটেন্সে তিনি জানান-"রাজনৈতিক দলগুলার সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা ছাড়াই এভাবে হুট করে প্রধান উপদেষ্টার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করায় শুধু আমরাই নই, পুরা জাতিই বিস্মিত! দুই-একটা ছাড়া প্রায় সব দলই ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে দেশে দ্রুত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছি আসছে। এরপরও হুট করে জুনে নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হতাশাজনক।"
কমেন্টটা স্টোরিতে অ্যাড করে ভোর পাঁচটার মধ্যেই হেলাল ভাইকে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠিয়ে দেয় ও। সঙ্গে সঙ্গে উনি ওইটা নিউজরুমে ফরওয়ার্ড করে তখনই পাবলিশ করার নির্দেশ দেন। স্নেহাকে উনি ঢাকায় ব্যাক করতে বলে নাই বা ছুটিও ক্যান্সেল করেন নাই। ও নিজেই নিজের ছুটি ক্যান্সেল করে ঢাকায় ফিরে আসে, এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি অফিসে গিয়ে কাজও শুরু করে দেয়। ওই রাতে আবির ওকে টেক্সটে জানায়- ১৪ তারিখ কিছু সময়ের জন্য দেখা করতে টাইম ম্যানেজ করতে পারবো মনে হয়, এখনো শিওর না। আই উইল লেট ইউ নো সুন। দেখা করার বিষয়ে স্নেহা ওকে কিছুই বলে নাই, ঢাকায় ফেরার আগেও না, ঢাকায় ফিরেও না। আবির নিজে থেকেই ওই টেক্সট দেয়। সম্ভবত গিল্ট ফিলিংয়ের জন্য, অথবা কী জন্য, কে জানে!
দুইদিনের মধ্যে দেখা করতে পারার সম্ভাব্য তারিখটাও আবির নিজেই কনফার্ম করে, অথচ এর ৭ মাস পর স্নেহার থেরাপিস্টের কাছে ও স্টেটমেন্ট দেয়- নিষেধ করার পরও নাকি স্নেহা ওইবার জোর করে রাজশাহী গেছিল ওর সঙ্গে দেখা করার জন্য। আর এই কারণেই নাকি ওর অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেছে! স্নেহার সঙ্গে দেখা করার জন্য ওইদিন ওকে ওয়ার্কস্টেশনের বাইরে আসতে হইছিল। ও মনে করে, স্নেহা ওইদিন না গেলে ওর বের হওয়া লাগতো না। মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে ও এক্সিডেন্টও করতো না। অথচ তারিখটা যেমন আবিরের দেওয়া, ঢাকা থেকে মদ নেওয়ার অনুরোধটাও ওরই ছিল।
ড্রাঙ্ক অবস্থায় ওর গাড়ি চালানো নিয়ে স্নেহা সবসময়ই ভয়ে থাকতো। ১৪ জুন ও রাজশাহী পৌঁছানোর পর দেড় ঘণ্টার জন্য আবির দেখা করতে আসে। এয়ারপোর্ট থেকে ও হোটেলে পৌঁছানোর আগেই আবির পার্কিংয়ে ওয়েট করতেছিল। ঘণ্টা দেড়েক গাড়ির মধ্যে বসেই ওরা কথা বলে। আবির হালকা ড্রিঙ্ক করে পরদিন সকালেও আসতে পারে জানিয়ে চলে যায়। ১৫ জুন সকাল নয়টায় ও টেক্সট করে জানায় ওর গাড়ির টায়ার বার্স্ট হইছে। আগেরদিন কথা প্রসঙ্গে কয়েকদিন পরই ওর ঢাকায় আসার পসিবিলিটির কথা জানাইছিল ও। স্নেহা তাই গাড়ির টায়ার বার্স্ট হওয়ার কথা শুনে বলে- আসা লাগবে না। কয়দিন পর তো ঢাকায় আসতেছোই। ওই টেক্সটে স্নেহা বিন্দুমাত্র রাগ-জেদ-অভিমান দেখায় নাই। কিন্তু টেক্সটের মূল সমস্যাটা এখানেই- এখানে কেবল শব্দগুলাই দেখা যায়, শব্দগুলা বলার এক্সপ্রেশনটা দেখা যায় না। ফলে স্নেহার ওই সহজে মেনে নেওয়া টেক্সটটাকে সম্ভবত আবির বিশ্বাস করতে পারে নাই। ও ভাবছে- দেখা না করলে স্নেহা মন খারাপ করবে, অশান্তিও।
সকালে আবিরের সঙ্গে দেখা হওয়ার এক্সাইটমেন্টে রাতে এক ফোঁটাও ঘুমাই নাই ও। গাড়ির টায়ার বার্স্ট হওয়ায় যেহেতু দেখা হওয়ার আর সম্ভাবনা নাই, ও শাওয়ার নিতে চলে যায়। ফিরে এসে ব্রেকফাস্ট করার পর একটা লম্বা ঘুম দেবে বলে ঠিক করে রাখে ও। কিন্তু শাওয়ার শেষে রুমে এসে দেখে আবিরের অসংখ্য টেক্সট জমে আছে টেলিগ্রামে। লাস্ট টেক্সটটায় লেখা- ম্যানেজড অ্যা কার, কামিং…। ওই টেক্সট দেখে ওর মনটা গোলাপ জামুনের মতো তুলতুলে হয়ে উঠে। ও ভাবে- লোকটা ওকে একটু ভালো ফিল করাতে কত প্যারা নেয় মাঝে মাঝে! যদিও নিজেদের সমস্ত কিছুর ক্লোজার টানার দিনে ভালোলাগার সমস্ত অনুভূতিকেই আবির জাস্ট আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিছে কয়েক মুহূর্তে।
১৫ জুন সকাল এগারোটায় স্নেহার হোটেলের উল্টা পাশে একটা ক্যাটক্যাটা ব্লু সেডান গাড়ি নিয়ে হাজির হয় আবির। কার গাড়ি, কী সমাচার কিছুই ও জানতে চায় নাই। ঘণ্টা খানিক গাড়িতে বসে এটা-সেটা গল্প করার ফাঁকে ওর নিয়ে যাওয়া ব্যালেন্টাইন গল গল করে গিলতে থাকে আবির। বারবার ধীরে খাওয়ার কথা বলার পরও ওকে থামামো যায় নাই। পুরাটা মদ শেষ হওয়ার পর হঠাৎই ও বলে- আই হ্যাভ টু গো। এভাবে মদ গেলায় স্নেহা আরো কিছুক্ষণ পর যাওয়ার জন্য রিকোয়েস্ট করলেও ও তাতে পাত্তা দেয় না। কয়েকবার রিকোয়েস্ট করেও যখন কথা শোনানো গেল না, স্নেহা মেজাজ খারাপ করে গাড়ি থেকে নেমে গেল। নামার পর রাস্তার পাশে থাকা দোকান থেকে কয়েক বোতল পানি কিনে গাড়ির জানালা দিয়ে দেওয়ার সময় শেষ ট্রাই হিসেবে বলে- ইউ ক্যান বেয়ারলি কিপ ইয়োর আইজ ওপেন। হাউ আর ইউ গোয়িং টু ড্রাইভ? প্লিজ, লিসেন টু মি- রেস্ট অ্যা লিটল বিট বিফোর ইউ লিভ। বাট আবির তখন নিজের বেটাগিরি আর হায়ারার্কির হেডম দেখাতে প্রায় বন্ধ হয়ে আসা ওর চোখ দুইটা টেনে খোলার চেষ্টা করতে করতে একটা তাচ্ছিল্যের হাসিতে উত্তর দেয়- ম্যাডাম, ইফ ইউ ক্যান রিমেম্বার- আই'ম অ্যা সোলজার! আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে মুহূর্তেই ও গাড়ি নিয়ে চলে যায় কয়েক গজ দূরত্বে। রাস্তার মোড় থেকে গাড়িটা বাঁদিকে অদৃশ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত স্নেহা একই জায়গাতে দাঁড়িয়ে থাকে।
রাজশাহী শহর থেকে বীর উত্তম শহীদ মাহবুব ক্যান্টনমেন্টের দূরত্ব ২০ মিনিটের। নরমালি আবির যাওয়ার আধা ঘণ্টা পর টেক্সট করে পৌঁছাইছে কি না খোঁজ নিতো স্নেহা। কিন্তু ওইদিন ওর বিহেভে এতটাই বিরক্ত হয় যে হোটেলের রুমে ফিরে টেক্সট না করেই ঘুমিয়ে পড়ে। ঘুম ভাঙে আবিরের টেক্সটের শব্দে। ডোন্ট কল মি- আবিরের এমন টেক্সটে কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যায় ও, অবাকও হয়। নিজে থেকে ও কখনোই ওকে কল করে নাই কোনোদিন। ফ্যামিলির সঙ্গে থাকলে তো আরও না। তাছাড়া আবির ওকে কখনোই এই ধরনের টেক্সট আগে করে নাই। বহু দ্বিধাদ্বন্দ্বে ও রিপ্লাই লেখে- আমি কবে আবার তোমাকে কল দিলাম নিজে থেকে!
উত্তরে আবির লিখে পাঠায়- আই'ম ফাকড আপ! আই'ম ফাকড আপ, স্নেহা! আই'ম জাস্ট ফাকড আপ! ওই টেক্সট দেখে স্নেহা প্রচণ্ড রকম ভয় পেয়ে যায়। ওর মনটা অজানা আশঙ্কায় আতংকিত হয়ে ছটফট করতে থাকলে ও আবিরকে লেখে- কী হইছে, আবির? আবির, ইউ ওকে? সব ঠিক আছে তো? কোথায় তুমি? আবির, প্লিজ এন্সার দাও। তুমি ঠিক আছো? আবির টেক্সট দেয়- এক্সিডেন্ট। ডোন্ট কল মি। আই'ম কলিং ইউ সুন। গিভ মি সামটাইম। মোবাইলের স্ক্রিনে এক্সিডেন্ট শব্দটা দেখেই ওর শরীর কাঁপা শুরু হয়ে গলা শুকাতে থাকে। ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার এসির নিচে বসেও টের পায় দরদর করে ঘেমে ওর শরীরটা ভিজে যাচ্ছে। প্রচণ্ড অস্থিরতায় ও আবারও আবিরকে লেখে- শিট!!! তুমি ঠিক আছো? হোয়্যার আর ইউ? তোমার কিছু হয় নাই তো? প্লিজ, এন্সার মি আবির। কারো কিছু হইছে? ইউ ওকে? আই'ম স্কেয়ার্ড! আমাকে জানাও প্লিজ।
প্রায় আধা ঘণ্টা পর আবির জানায় ও ঠিক আছে, কারো কোনো ক্ষতিও হয় নাই, তবে ওর ওয়াইফ এরমধ্যেই ওর জিওসিকে ড্রিংক করে এক্সিডেন্ট করছে জানিয়ে কমপ্লেইন করছেন। ব্লু সেডানটা ওর ওয়াইফের ছিল। এক্সিডেন্টে গাড়ির সামনের অংশে বেশ ভালো ক্ষতি হইছে। স্নেহা আবারও আতঙ্কিত হয় কমপ্লেইনের কথা শুনে। ড্রিঙ্ক অ্যান্ড ড্রাইভ ওর প্রফেশনে একটা বিরাট অপরাধ। এর উপর ও করছে এক্সিডেন্ট। এর আগেও একবার ওর ওয়াইফ ওর বিরুদ্ধে ড্রাঙ্ক হওয়ার কমপ্লেইন করছে বলে স্নেহাকে আবির জানাইছিল। দুইবার ড্রাঙ্ক হওয়ার কমপ্লেইন, তাও আবার ওয়াইফের কাছ থেকে, এর কনসিকুয়েন্স চিন্তা করে স্নেহার প্রচণ্ড অস্থির লাগা শুরু হয়। কিন্তু ও শান্ত থাকার চেষ্টা করে আবিরকে শান্ত রাখার জন্য। ওই মুহূর্তে আবিরকে শান্ত রাখা সবচেয়ে জরুরি বলে ওর মনে হয়। ও আবিরকে লিখতে থাকে- কাম ডাউন, প্লিজ। প্লিজ, রেস্টলেস হইয়ো না। এভ্রিথিং উইল বি ওকে। তুমি জাস্ট শান্ত থাকো। কিন্তু ততক্ষণে ওর মন আর মস্তিষ্ক অকোপাইড হয়ে উঠে এই ভাবনায়- ও রাজশাহীতে না গেলে বোধহয় আবিরকে এমন সিচ্যুয়েশনে আদৌ পড়তেই হতো না। নিজেকে ওই ঘটনার জন্য স্নেহার দোষী মনে হওয়া শুরু হলো ওই মুহূর্ত থেকেই।
কিছুক্ষণ পর আবির আবার টেক্সট পাঠায়- স্নেহা, আমি যদি সব ফেলে এখনই তোমার কাছে চলে আসি, আমাকে চালাতে পারবা? ওই টেক্সট ওর কাছে খুবই অপ্রত্যাশিত ছিল। একদিকে ও যেমন বুঝতে পারতেছিল- ড্রাঙ্ক আবির, ওয়াইফের কমপ্লেইনের কারণে ক্ষিপ্ত ও হতাশ আবির এবং এত বড় প্রফেশনাল পজিশন হোল্ড করে এমন একটা ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার চিন্তাতে অসহায় আর ভীত আবির ওই সময় আবেগে টেক্সটটা লিখে পাঠাইছে। সুস্থ চিন্তা থেকে না। তবুও ওর হৃদয়টা ওই টেক্সট দেখে কয়েক মিনিট স্টাক হয়ে ছিল। বুকের ভেতরে থাকা ওর ব্লু বার্ডটা চিৎকার করে তখন আবিরকে বলতে চাইতেছিল- আমার কাছে চলে আসো। আই উইল বি উইদ ইউ ইন এভ্রি আপস অ্যান্ড ডাউন রেস্ট অফ দ্য লাইফ। কিন্তু বাস্তবতা ওকে দিয়ে লেখায়- পাগলের মতো কথা বলো না, আবির। সঙ্গে সঙ্গেই রিপ্লাই আসে- আই'ম সিরিয়াস। তুমি বললে আমি এখনই সব ছেড়ে শহরের দিকে রওনা হবো। ভেবে দেখো। স্নেহা লেখে- পাগলামী ছাড়ো। ইউ হ্যাভ অ্যা ডটার। সব ঠিক হয়ে যাবে, হ্যাভ পেশেন্স। আবির এর জবাবে শুধু লেখে- হুম!
এক্সিডেন্ট পরবর্তী ওই সময়গুলার কথা ভাবতে ভাবতে স্নেহার খেয়াল হয়, প্রথম চুমুকের পর কফির কাপটা ওইভাবেই ও পাশে ফেলে রাখছিল। এতক্ষণে কিছুটা ঠান্ডাও হয়ে পড়ছে। গরম করতে যেতে ইচ্ছা না করায় ঠান্ডা কফিতেই চুমুক দিতে গিয়ে ওর মনে পড়লো- নিজেকে ওই এক্সিডেন্টের জন্য দোষারোপ করে কত রাত যে ও নির্ঘুম কাটাইছে। রাতের পর রাত তাহাজ্জুদের সিজদায় আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে আবিরকে প্রফেশনাল শাস্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য দোয়া করে গেছে। অথচ আবির নিজেও যে ওই ঘটনার জন্য স্নেহাকেই দায়ী মনে করে ওর সবকিছু স্নেহার কারণে ধ্বংস হইছে ভাবতেছিল- এই রকম আশা সত্যিই ও করে নাই। এক্সিডেন্টের নয়দিন পর ২৪ জুন, ওই ঘটনাকে ইঙ্গিত করে ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডোমেস্টিক টার্মিনালে দাঁড়িয়ে স্নেহাকে ও টেক্সটে জানাইছিল- ইউ হ্যাভ অলরেডি ডেস্ট্রয়েড মাই এভ্রিথিং!
ওই টেক্সটটার কথা মনে পড়তেই একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো স্নেহা। এপ্রিল, ২০২৫ এর পর থেকে নিজের কর্মকাণ্ডে নিজেকেই ওর অপরিচিত লাগা হয়। সারা জীবন নিজেকে যেভাবে ও চিনে আসছিল- এর সমস্ত কিছুই ভেঙে পড়তেছিল একটু একটু করে। নিজের ইনোসেন্স আর সহজ সত্তাটা দূরে কোথাও হারিয়ে ফেলে ক্রমশ একটা একগুঁয়ে, জেদী, রুক্ষ, কর্কশ মানুষের ছাপ দেখতে পারতেছিল ও নিজের ভেতরে। কোন ফাঁকে যে ওর ভেতরে একটা হিংস্র পশু প্রবেশ করে বসবাস শুরু করলো, স্নেহা এখনো ঠিক বুঝে উঠতে পারে নাই। আবিরকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে ও ধূর্ত শিয়ালের মতো আচরণ শুরু করছিল। ওর মতো একটা সরল মানুষ সবকিছুই ভাবতেছিল জটিলভাবে। এতক্ষণ পর ওর উপলব্ধি হলো- সমগ্র জীবনে আবিরই ছিল ওর একমাত্র নেশা, যাকে ও নির্দ্বিধায় বলতে পারে- পারহেপ্স ইউ আর দ্য বেস্ট ড্রাগস আই হ্যাভ এভার টেস্টেড ইন মাই লাইফ! চোখটা বন্ধ করে ও বুঝলো- এই উইথড্রয়ালের পেইন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওকে ভোগাতে থাকবে সম্ভবত। এসব ভাবনা গতকাল সন্ধ্যা থেকে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও ওর বুকে প্রচণ্ড ভারী একটা চাপ ফিল করালো। চাপটা ধীরে ধীরে ব্যথাতে রূপান্তরিত হইতেছে। যেভাবেই হোক, ব্যথাটাকে এখন পাত্তা না দিয়ে এড়াতে হবে বলে ও মনস্থির করে। যদিও ও বিশ্বাস করে- নির্জন ফাঁকা ফ্ল্যাটেই ওর মৃত্যু হবে, মানুষ থেকে দূরে, সম্পূর্ণ একা! ওর আরো ধারণা, ওর মৃত্যুর খবর মানুষ জানবে লাশে পচন ধরার পরে। এর আগে কেউ টেরও পাবে না, খোঁজও নেবে না।
যেহেতু এই দুনিয়ার সঙ্গে ওর পারস্পরিক সংযোগের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে, ফলে শেষটা এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা তো কোনোভাবেই এখন ঘটতে দেওয়া যাবে না। বুকের ব্যথাটা টের পেতে পেতেই ওর মনে হয়- যন্ত্রণারও তো একটা প্রোপার ক্লোজার লাগে, মানুষ জোরজবরদস্তি ক্লোজার টেনে চলে গেলেই তো আর সবকিছু আবার আগের নিয়মে স্বয়ংক্রিয়ভাবে চলা শুরু করে না। ঘাড় ঘুরিয়ে বেডসাইড টেবিল থেকে মোবাইলটা হাতে নেয় ও। অনেকক্ষণ গান বন্ধ এই ঘরে। মিষ্টির ধোঁয়া আর গান- এগুলাই তো এখন ওকে এই প্রচণ্ড বিপর্যস্ত সময়ে সঙ্গ দিয়ে যাইতেছে। সকালে যত্নে তুলে রাখা অর্ধ গলিত মিষ্টি সমেত ফয়েল পেপারটা হাতে নিয়ে ও এইসবের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানায় গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে। এরপর স্পটিফাই ওপেন করে আমোন প্লেলিস্টটা এড়িয়ে সোজা চলে যায় সার্চ অপশনে। এফ-এ-এ-এস-এল-ই স্পেস জি-এইচ-ইউ-এল-এম স্পেস এ-এল-আই লিখে ইন্টার চাপলে সার্চ অপশনের প্রথমেই ওর কাঙ্ক্ষিত গান চলে আসে।
প্লে বাটনটা চেপে ও একটা লম্বা দম ভেতরে নিয়ে ছাড়ে, এরপর চোখ বন্ধ করে শোনার চেষ্টা করে। গজলের ওই সুরে হারাতে গিয়ে ওর মনে হয়- শেষ পর্যন্ত তো আবির ওকে ধ্বংসকারী হিসেবে প্রমাণ করতে পারছে। হি ইজ সাকসেসফুল। ক্রমাগত নিজের সম্পর্কে আবিরের অবিশ্বাস-সন্দেহ-ভয়ে ও বোধহয় নিজেকে সত্যিই ধ্বংসকারী ভাবা শুরু করে দিছিল একটা সময়। ওই রকম অ্যাক্টও তাই ওর করতে হলো শেষমেশ। সারা জীবন ও কারোর কোনো ক্ষতির কারণ হয় নাই বলে ৩৮ বছর যাবত যে প্রাইডের সঙ্গে ও জীবন কাটাইয়া আসছে, কাঁচের আয়নার মতো তা ঝনঝন শব্দে ভেঙে পড়ছে অবশেষে! কিন্তু এছাড়া কি আর কোনো উপায় ছিল এই ব্ল্যাক হোল থেকে বের হওয়ার? অথবা আবিরকে বের করার? বুকের চাপটা আরো বেশি ভারী হয়ে ব্যথার তীব্রতা বাড়তে থাকে। ব্যথার তীব্রটাকে ইগনোর করে ও মনোযোগ দিতে চাইলো ওস্তাদ গুলাম আলীতে-
রাত ভর পিছলি হি আহাট কান মে আতি রাহি
ঝাঁক কর দেখা গলি মে, কোয়ি ভি আয়া না থা…
ফাসলে…
ফাসলে অ্যায়সে ভি হোঙ্গে, ইয়ে কাভি সোচা না থা…
ইয়াদ কার কে অউর ভি তকলিফ হোতি থি, আদিম
ভুল জানে কে সিওয়া অব কোয়ি ভি চারা না থা…
ফাসলে…
ফাসলে অ্যায়সে ভি হোঙ্গে, ইয়ে কাভি সোচা না থা…
চোখ বন্ধ করে স্নেহাও সুর মিলিয়ে গাইলো- “ফাসলে… হুম…ফাসলে…অ্যায়সে ভি হোঙ্গে, ইয়ে কাভি সোচা না থা…সামনে বেয়ঠা থা মেরে অউর ও মেরা না থা…”। গজলের সুর আর কথায় বুকের ব্যথা অনুবাদিত হয়ে চিক চিক করে উঠলো চোখের দুই কোণ। কিছুক্ষণ পরই গড়িয়ে এসে জমতে থাকে চিবুক বরাবর। "ফাসলে…হুম…ফাসলে…অ্যা…ফাসলে…অ্যায়সে ভি হোঙ্গে…"- অনবরত ও এই লাইনগুলা গাইতে গিয়ে ভাবলো- এক সময় নিশ্চয় সমস্ত ব্যথাই সহনশীল হয়ে উঠবে!