নির্ঘুম থাকার রেকর্ড সৃষ্টি করায় সম্ভবত গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ডে নিজের নাম শিগগিরই দেখতে পারবে স্নেহা। টানা ৭২ ঘণ্টা নিদ্রাবিহীন থেকে একটা রৌদ্রোজ্জ্বল সকালের সাক্ষী হওয়ার ফাঁকে এমনটাই অনুভূতি হইতেছে তার। একইসঙ্গে সে খেয়াল করলো, তার কাপের কফি বহু আগে শেষ হলেও এখনো ‘এই চুমুক দিতে যাচ্ছে’ ভঙ্গীতে সে কাপটা ধরে আছে।
বিষয়টা বোঝার চেষ্টা করলো। ইদানিং নিজের অনেককিছুই বুঝতে তার কিছুটা সময় লাগে। আরেকবার কফি খাওয়ার ইচ্ছা, আবার কিচেনে যেতে অনীহা- এই দুইটার মেলবন্ধনে সম্ভবত কফি শেষ হওয়ার পরও এভাবে কাপটা ধরে থাকতে উদ্বুদ্ধ হইছে সে। নিজের মস্তিষ্কে মোটামোটি এমন একটা যুক্তি স্নেহা দাঁড় করাতে পারলো। যুক্তির পাহাড়ের নিচে দুনিয়ার সকল উইয়ার্ড কাজকেও বৈধতা দেওয়া যায় বলে তার মনে হলো এই মুহূর্তে।
এই যে সে খুব সিস্টেম্যাটিক ওয়েতে নিজের ধ্বংস একজন বহিরাগত দর্শক হিসেবে গ্যালারিতে বসে পর্যবেক্ষণ করতেছে, এর পেছনেও চাইলে স্ট্রং কোনো যুক্তি সে দাঁড় করিয়ে দিতে পারবে। এর জন্য জাস্ট কিছুক্ষণের ভাবনা আর নিজের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে তাতে জয়লাভ করতে পারাই যথেষ্ট। আবিরের সঙ্গে নিজের সম্পর্ক নিয়েও সে এইভাবে দিনের পর দিন আর রাতের পর রাত যুক্তি-তর্কে সময় পার করছে।
ভেতরে ভেতরে বহু বিতর্ক প্রতিযোগীতায় অংশ নেওয়ার পর একসময় যুক্তি-তর্কে নিজের সঙ্গে নিজেই সে জয়লাভ করে। এই বিজয়ই মূলত তাকে তথাকথিত সমাজের চোখে অগ্রহণযোগ্য সম্পর্কের ট্যাবু থেকে বের করে এনে একটা পবিত্র আত্মিক বন্ধনের অনুভূতি ফিল করাতে পারছিল। ওই সম্পর্ক নিয়ে তার সামান্যতম কোনো পাপ বোধ নাই, কখনোই ছিল না। তার কাছে ভালোবাসা মানে ভালোবাসাই- একজন পুরুষের প্রতি নারীর বা একজন নারীর প্রতি পুরুষের। এর বাইরের হিসাব স্নেহা করতে যায় না।
আবির সম্পর্কে মাহমুদ ভাইয়ের ‘ওম্যানাইজার’ ট্যাগটাকে স্নেহার কখনোই সত্য বলে মনে হয় নাই। হুট করেই স্নেহার এই শব্দটা মনে পড়লো। মাহমুদ ভাইয়ের সঙ্গে যতবার কথা হইছে, এই শব্দটা সে বহুবার ইউজ করছে। ভদ্রলোক স্ট্রেইট কাট কথা বলেন, বাস্তববাদী, লজিক দিয়ে ঘটনার বিশ্লেষণ করেন, উনার অনেক কথা পরে মিলেও গেছে- সব ঠিক আছে। কিন্তু একইসঙ্গে তার ভেতর প্রচণ্ড অবিশ্বাস আর নেগেটিভিটি স্নেহা সেন্স করতে পারছে প্রথম দিন থেকেই। এত নেগেটিভিটি নিয়ে মানুষ ঘুমায় কী করে কে জানে!
মানুষকে একইসঙ্গে বিশ্বাস আর অবিশ্বাস দুইটাই ক্ষেত্র বিশেষে করা উচিত, এটা নিয়ে স্নেহার তেমন তর্ক নাই। কিন্তু আশেপাশের সবকিছুকে অথবা সব মানুষকে অহেতুকই অবিশ্বাস করে কারো পক্ষে স্বস্তিতে দম নেওয়া কীভাবে সম্ভব- মাথার মাঝখানটা হালকা চুলকাতে গিয়ে ভাবলো স্নেহা! তবে এটা ঠিক, একবার যখন স্নেহার ভেতর কাউকে বা কিছু নিয়ে অবিশ্বাস ঢুকে যায়, এরপর ওই ব্যক্তি বা বস্তুর প্রতি বিশ্বাস আনাটা একটু কঠিনই হয় তার জন্য। তখন শুধু মনে হতে থাকে মিথ্যা বলতেছে নাকি অথবা কোনোকিছু মনে হয় হাইড করতেছে। অনেকে আবার কাস্টমাইজ করে সত্য-মিথ্যার মিশ্রনে নিজের সুবিধা মাফিক কথা বানিয়ে বলে দেয়। এইটা আরো ভয়ংকর।
স্নেহা তার মরহুমা প্রাক্তন শাশুড়ির কথা স্মরণ করলো। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুক। ভদ্রমহিলার ক্যারেক্টার বেশ অদ্ভুত ছিল। উনি অযথাই অনর্গল মিথ্যা এবং বানোয়াট কথা বলে যেতেন ঘণ্টার পর ঘণ্টা। খামাখাই, কোনো কারণ ছাড়া। এটা তার স্বভাবের একটা স্বাভাবিক অংশ ছিল। প্রথম প্রথম স্নেহা তার ওই অযথা বলা মিথ্যা কথাগুলা সরল মনে বিশ্বাসও করে ফেলতো। কিন্তু বিপুলকে ওইগুলো নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলে স্নেহা দেখতো বেচারা খুব চিপার মধ্যে পড়ে ইতস্তত বোধ করতেছে।
একদিন বিপুল নিজে থেকেই স্নেহাকে বলছে- আম্মার বয়স হইছে তো, অনেক কথা উল্টাপাল্টা বলেন। সব এত পাত্তা দিও না। ওই ঘটনার পর থেকে স্নেহা উনার সব কথাই মোটামোটি যাচাই-বাছাই করতে গিয়ে দেখতো- অধিকাংশেরই কোনো ভিত্তি নাই। উনি কি প্যাথলজিক্যাল লায়ার ছিলেন নাকি কম্পালসিভ লায়ার? স্নেহা একটু চিন্তা করে সিদ্ধান্তে আসে- নাহ, উনি ছিলেন হ্যাবিচুয়াল লায়ার। মিথ্যা বলতে বলতে ওইটা তার অভ্যাসে পরিণত হইছিল।
আবিরকে তাহলে কোন ক্যাটাগরিতে ফেলা সমীচীন হবে, এই ভাবনা আসতেই স্নেহার মনে হলো, আবির আসলে ইকুইভোকেটর। মিথ্যার চেয়ে বেশি ওর ভেতরে ছিল অস্পষ্টতা। আবিরের ধারণা- স্নেহা সত্য সহ্য করতে পারে না, রিয়্যাক্ট করে। অথচ স্নেহা রিয়্যাক্ট করতো ওর অস্পষ্টতায়; ওর অর্ধেক সত্যে, ওর ঠিক সময়ে ঠিক কথা না বলতে পারায় আর ভুল টাইমিংয়ে বেওয়াকুফের মতো কথা বলার কারণে। স্নেহা রিয়্যাক্টও শুরু করে বহু পরে। কবে থেকে, ওই টাইমফ্রেম হয়তো আবির মনে করতে পারবে, কিন্তু কেন রিয়্যাক্ট করা শুরু করছিল, স্নেহা শতভাগ নিশ্চিত আবির তা কোনোদিনও ভেবে বের করতে পারে নাই, রিয়েলাইজও করে নাই।
ডিসেম্বর ২০২৪ এর কথা মনে পড়ে গেল স্নেহার; যেবার আবিরকে ও ওর ভালোবাসার ব্যাপারে এক্সপ্রেস করলো, কত সুন্দর করে ও হাত ধরে আবিরকে বুঝাইছিল যেন কোনোকিছু না লুকায় ওর কাছ থেকে, সব বিষয়ে স্পষ্ট থাকতে। ওর যেন কোনোকিছু গেইজ করে সময় কাটাতে না হয়। কিন্তু নাহ, আবির ওর স্বভাবসুলভ কাস্টমাইজ করেই যখন যেটুকু প্রয়োজন মনে করছে বলছে, বা বলে নাই।
অস্পষ্ট আর ভাসা ভাসা একটা দুনিয়ায় থাকতে থাকতে স্নেহাকে কিছু বিষয়ে কৌশলী হতে হইছে। সেটাও অনেক পরে, অনেককিছু আবির হাইড করার কারণে। এক সময় আবিরের কোনোকিছু নিয়েই নিজে থেকে কোনো প্রশ্ন স্নেহা করতো না। ও নিজে থেকে বললে শুনতো, নাহলে নাই। কিন্তু নানা কারণে একটা সময় অনেককিছু জানতে স্নেহাকে উদ্যোগী হতে হইছে। এসব খুব ফালতু কাজ-কারবার। স্নেহার এসব থার্ড ক্লাস কাজকর্ম পছন্দ ছিল না কোনোকালেই। নিজের সমস্ত ইনোসেন্স এসব কৌশলী হতে গিয়ে তাকে বিসর্জন দিতে হইছে ভাবতেই আবিরের উপর মেজাজটা খিঁচে গেল তার। আবিরের জন্য মাহমুদ ভাইয়ের মতো মানুষই ঠিক আছে, মেজাজ খারাপের চোটে স্নেহার ঠিক এইটাই মনে হলো এখন।
কিন্তু মাহমুদ ভাই যে আবিরকে চ্যান্স পেলেই ওম্যানাইজার ট্যাগ দেন, ওইটা স্নেহার পছন্দ না। বরাবরই আবিরকে নিয়ে নেগিটিভ কিছু বলতে নিলে স্নেহা বিরক্ত বোধ করছে। শেষের দিকে তো ও বাধ্য হয়ে বলেই ফেলতো- বাদ দেন না, ভাই। কে কেমন তা আমরা জাজ করার কে। আবির নারীবাজ হলেও স্নেহার কিছু যায় আসে না। কিন্তু স্নেহার বিশ্বাস আবির তা না।
নারীর প্রতি পুরুষের এবং পুরুষের প্রতি নারীর আর্কষণ একটা চিরন্তন বিষয়। সাধু-সন্ত ছাড়া এই চিরন্তন আকর্ষণকে এড়ানো একজন সাধারণ মানুষের পক্ষে বেশ কঠিন। কেউ হয়তো তা প্রকাশ করে নির্দ্বিধায়, কেউ বা গোপন রেখে সাধু সাজার ভান করে। আবিরকে গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করার পর স্নেহার মনে হইছে- যে সময়টা তাদের পরিচয় হইছে, ওর ওয়াইফ এবরোডে থাকার কারণে হয়তো ও কিছুটা লোনলি ছিল, দীর্ঘদিন নারীসঙ্গ থেকেও হয়তো বিচ্ছিন্ন ছিল।
যদিও ড্রাঙ্ক হয়ে ও নিজের মুখেই বলছে স্নেহার আগেও কয়েকজনের সঙ্গে নাকি সে দেখা করছে, বারে ডেটেও গেছে। তারা কেউই আবিরের প্রকৃত পরিচয় জানে না, এমন তথ্যও সে-ই দিছে স্নেহাকে। একমাত্র স্নেহাই নাকি জানছে। যদিও এই বিষয়ে ক্রেডিট স্নেহারই। ও নাকি ইভেন নিজের নামও ভুলভাল বলে দেখা করছে ওইসব নারীদের সঙ্গে।
সত্য-মিথ্যা অবশ্য স্নেহা জানে না। ও যা বলছে, তা-ই স্নেহার এখন মনে পড়লো। নিজের প্রফেশনাল আইডেন্টিটির কারণে যত্রতত্র নারীদের সান্নিধ্যে যাওয়াটা আবিরের সম্ভব ছিল বলে মনে হয় না স্নেহার, তাও আবার ওর মতো অ্যাংজাইটিতে ভোগা একটা লোকের পক্ষে তো আরো না। স্নেহার সঙ্গে পরিচয়ের প্রথমদিকে আবিরের একজন নারীর প্রতি পুরুষসুলভ আকর্ষণটাই বোধহয় কাজ করছিল।
একইসঙ্গে একজন ইন্টেলেকচুয়্যাল পুরুষ হিসেবে আবিরের সেপিওসেক্সুয়াল সত্তা স্নেহার বুদ্ধিবৃত্তিক পারসোনালিটির প্রতিও আকর্ষিত হয় সম্ভবত। কিন্তু যেহেতু আবির একটা সিস্টেমেটিক কাঠামোর ভেতর বড় হইছে এবং ওর প্রফেশনাল লাইফও হাইলি স্ট্যাকচারড, রেস্ট্রিকটেড এবং সিস্টেমেটিক, তাই আকর্ষণের মাঝেও রিয়েলিটি আর লজিক ওকে তাড়া করে বেড়াইছে সবসময়। ভালোলাগা আর আকর্ষণের অনুভূতি থাকার পরও এই সম্পর্কের মোর্যালিটি নিয়ে পরিচয়ের কয়দিন পর থেকেই আবিরের মধ্যে একটা দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেছিল।
তবে বিষয়টা এমনও না যে যোগাযোগ রাখার ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও প্রেশারে, ভয়ে, সহমর্মীতায়, কৃতজ্ঞতায় কিংবা করুণায় আবির স্নেহার সঙ্গে যোগাযোগ রাখছিল। সে তার নিজের ইচ্ছাতেই এই যোগাযোগ রাখছে এবং সেটা তার ভালো লাগতো বলেই রাখছে। এখন সে যতই আবোল-তাবোল কথাই বলুক না কেন, এসব স্নেহা গোনায় ধরে না আর। বরং শেষদিনের আজাইরা কথাগুলা মনে পড়লে রাজশাহীতে দেওয়া থাপ্পড়ের চেয়েও আরো অনেক বেশি স্ট্রং থাপ্পড় আবিরের গালে বসাতে মন চায় মাঝে মাঝে। স্নেহার আফসোস হয় এই ভেবে- শেষদিন কেন আবিরের আবোল-তাবোল কথার জন্য একটা থাপ্পড় যে ওর পাওনা থাকলো, সেটা স্নেহা বললো না! কোনোদিন সুযোগ পেলে অবশ্যই তা কড়ায়গণ্ডায় সে শোধ করবে, এটাও ওকে বলা দরকার ছিল।
আবিরের সমস্যা মূলত শুরু হইছিল যখন থেকে স্নেহা ওর পরিবারের সদস্যদের খবরাখবর জানা শুরু করলো কিংবা পরিবারের সদস্য পর্যন্ত পৌঁছে গেল। তখন থেকে মূলত ওর অস্বস্তির সূত্রপাত হইছে। ওইটা ভালো হইছে কি না খারাপ হইছে, এসব পুরানো তর্কে স্নেহার মাথা ঘামাতে মন চাইলো না এখন। খামাখাই তাতে মন আর মেজাজের উপর চাপ ফেলা হবে।
এসব ভাবনার মাঝেই রোদের প্রকৃতি বদলে যাওয়া টের পেল স্নেহা। মিষ্টি রোদটা চলে গিয়ে সূর্যের তাপ কিছুটা বাড়তেছে। কিছুক্ষণ আগের ওয়েদারের কোমল ভাবটা আর না। হাতে থাকা কফির কাপটা নিয়ে সে ঘরে ঢুকলো। বৃষ্টির কারণে গত সন্ধ্যা থেকে বন্ধ থাকা জানালার স্লাইডটা খুলে ঘরে আলো ঢুকতে দিলো।
রোদের তীব্রতা বাড়লেও বাইরে হালকা একটা বাতাস টের পাইতেছে স্নেহা। আরেক কাপ ব্ল্যাক কফি বানাতে গিয়ে তার মনে পড়ে- আবিরেরও সকাল হয় ব্ল্যাক কফিতে। ওর হার্টে কিছুটা জটিলতা আছে, ক্যাফেইনে সেটা বাড়তে পারে জানার পরও এর উপর ওর কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই। সকাল থেকে রাত অব্দি অগণিত কফির কাপে তার চুমুক দেওয়ার সিলসিলা চলতেই থাকে।
স্নেহা ভাবে- মানুষ তো মূলত এমনই। যার যেটায় নেশা, নিজেকে সেটা থেকে বিরত রাখার নিয়ন্ত্রণ অধিকাংশ মানুষেরই থাকে না। কফির ধোঁয়া উঠা কাপটা নিয়ে ঘরের ফ্লোরে গিয়ে বসে স্নেহা। প্রথম চুমুকটা দিয়ে সশব্দে বলে উঠে- আহ! কফিটা এই ৭২ ঘণ্টার নির্ঘুম ক্লান্তিকর যাত্রায় বেশ টনিকের মতো কাজে করতেছে বলে মনে হলো তার। মুখে কফির স্বাদটা নিয়ে একবার সে ভাবার চেষ্টা করে- তার জীবনে কোন নেশাটা সবচেয়ে বেশি তাকে ভোগাইছে? বেশ খানিকক্ষণ ভাবার পর মনে হলো- বস্তুগত কোনো নেশাতে তার আসক্তি ছিল না কোনোদিন, কোনো নেশার আসক্তি তাকে ভোগাতেও পারে নাই কখনো।
আবিরের সঙ্গে পরিচয়ের আগে টানা আড়াই বছর সে মদ স্পর্শও করে নাই, স্নেহার স্পষ্ট মনে আছে। এই পুরাটা সময় সে বন্ধু-বান্ধবের দেওয়া পার্টিতে ঠিকই গেছে, এমন কী বন্ধু-বান্ধবকে সঙ্গ দিতে বারেও পর্যন্ত গেছে, তবুও কেউ তাকে এক বিন্দু মদ গেলাতে পারে নাই অনেক অনুরোধেও। কয়েক বছর আগে তার নিউরোলজিক্যাল সমস্যা ধরা পড়ার পরই সে মদ্যপানে বিরতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিছিল। খুব সুন্দরভাবে তা মেইন্টেইনও করতেছিল।
আবিরের সঙ্গে পরিচয়ের পরই মূলত সে আবার মদের চক্করে পড়ে। শুধু চক্করে পড়ে বললে ভুল বলা হবে। ডিসেম্বর ২০২৪ থেকে সেপ্টেম্বর ২০২৫ টানা নয় মাস শুধুমাত্র আবিরের মেমোরি রি-কল করার জন্য প্রায় প্রতিদিনই স্নেহা কিংফিশারে গিয়ে পেগের পর পেগ পাসপোর্ট, ব্যালেন্টাইন নয়তো বা ভ্যাট সিক্সটি নাইন গিলতে থাকতো। এই আনুষ্ঠানিকতায় হাজার থেকে লক্ষতে গিয়ে খরচের অংক ঠেকতেছিল, তাতেও কোনো ভ্রক্ষেপ ছিল না তার।
তবে এ বছর জানুয়ারি মাসে আবিরের অ্যালকোহলিক রূপটা প্রচণ্ড নগ্নভাবে ওর কাছে ধরা পড়লে মদের প্রতি পুরাপুরি আগ্রহ হারায় স্নেহা। ২৮ জানুয়ারির পর সে আর মদ স্পর্শও করে নাই। এই ফ্ল্যাটের ওয়ারড্রবের প্রথম ড্রয়ারে একটা পাসপোর্টের বোতল এখনো ইনটেক অবস্থায় আছে। ফেব্রুয়ারিতে ওর বন্ধু শিমুল কানাডায় যাওয়ার আগে জন্মদিনের গিফট হিসেবে বোতলটা দিয়ে গেছিল। দুই-তিন মাস পার হয়ে গেছে তবুও এই বোতল খোলার বা এর ভেতরের পানীয় পানের কোনো সুপ্ত বা জাগ্রত বাসনা তার মন আর মস্তিষ্কের দূর দূরান্তেও উঁকি মারে নাই।
মন শব্দটা মাথায় আসতেই কেমন একটা যেন ফিল হলো স্নেহার! হোয়াটএভার, সে ভাবে- তার মন নাহয় জলে ভাসা পদ্ম হয়ে ভাসতে ভাসতে ফেরার পথ হারিয়ে ফেলছে, কিন্তু মস্তিষ্কটা তো এখনো বলবৎ আছে। অধিকাংশ মানুষই তো মস্তিষ্কের ডিরেকশনেই জীবনটাকে দিব্যি আনন্দে কাটিয়ে দিতেছে, মনের ইচ্ছার ধারই তারা ধারে না। অথচ স্নেহা সেই শৈশব থেকে শুনে আসতেছে- "পিরিতি এই জগতে জাতি কূলের ধার ধারে না।" কানাই শীলের লেখা।
অনেকদিন পর গানটা মনে পড়লো। "ওরে যার সঙ্গে যার মন মজেছে, সে তো তারে আর ছাড়ে না" লাইনটা গুন গুন করে হালকা একটু হাসলো সে। কেন হাসলো, সেটা বোঝার চেষ্টা আপাতত করতেছে না। বরং এই গানের পরের দিকে- "দেখো চাতকের রীতি, মেঘের সাথে তার পিরিতি, ওরে যায় মরিয়া তবু চাতক অন্য পানি পান করে না" লাইনগুলার সঙ্গে নিজের সিচ্যুয়েশনের মিল খুঁজে পেয়ে তার হতাশই লাগলো কিছুটা।
আবিরকে একবার স্নেহা জিজ্ঞেস করছিল, সে জীবনে কোনোদিন নিজের হৃদয়ের কথা শুনে কিছু করছে কি না? উত্তরে আবির বলছিল- দুই-একবার করছে এবং পরে সেসব নিয়ে তাকে রিপেন্টও করতে হইছে। আবির স্নেহার সঙ্গে তার সম্পর্ক বা যোগাযোগের বিষয়টাকে ইঙ্গিত দিয়েই রিপেন্টের কথাটা বলছিল হয়তো। স্নেহার তখন এ রকমই মনে হইছিল। আবার নাও হতে পারে এমন। মানুষের মনের ভেতর প্রবেশ করে তাদের ভাবনা বোঝার ক্ষমতা তো আছে কেবল অন্তর্যামীর।
এক সময় স্নেহার মনে হতো সে আবিরকে অনেক বোঝে, ও কিছু না বললেও বুঝতে পারে। কিন্তু দুই বছর পর মনে হইছে- সে আবিরকে বিন্দুমাত্র চেনে নাই। রিপেন্ট বিষয়ক আলাপে আবির স্নেহার সঙ্গে নিজের সম্পর্কের ইঙ্গিত করুক বা না করুক, স্নেহা যে আবিরের জীবনে একটা অনুশোচনা, এটা বুঝতে কোনো ইঙ্গিত স্নেহার দরকার হয় না।
এই বছর জানুয়ারির ২০ থেকে ২৮ তারিখ পর্যন্ত লম্বা একটা সময় আবিরকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ হইছে স্নেহার। মাঝে শুধু ২২-২৩ দুইদিন ও শ্বশুর বাড়ি ঘুরতে গেছিল। ২৪ তারিখে ফিরে এসেই আবার ওই বারেই তার যেতে হইছে। খুবই অদ্ভুত বিষয় যে বারের বাইরে অন্য কোনো জায়গাতেই সে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না।
স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে কি করে না, সেটা বোঝার চেষ্টাও কখনো স্নেহা ওকে করতে দেখে নাই। জানুয়ারির ওই সময়টাতে স্নেহার মনে হইছে- আবিরের আগ্রহ বা নেশা কোনোটাই নারীতে না, অ্যালকোহলে। মানুষের প্রতি আবিরের ঠিক কতটুকু প্রকৃত অনুভূতি আছে, এটা নিয়ে স্নেহা বেশ সন্দিহান।
স্নেহার ধারণা নিজেকে ছাড়া কাউকেই আবির কোনোদিন ভালোবাসতে পারে নাই, ওই অনুভূতিও ওর জানা নাই। ও ভয়াবহ লেভেলের অ্যালকোহলিক, মদের সামনে ওর কোনো নিয়ন্ত্রণই থাকে না। এমন কী ড্রাঙ্ক অ্যান্ড ড্রাইভের কারণে ওর বিরুদ্ধে অফিসিয়াল ইনকোয়ারি হওয়ার পরও না। যদিও আবির এরজন্য স্নেহাকেই দায়ী ভাবে।
গত বছর ২৭ এপ্রিল আবিরের ফ্যামিলি রাজশাহীতে মুভ করে। এর আগে মার্চ-এপ্রিল মাসের প্রতি শুক্রবারই আবিরের সঙ্গে দেখা করতে রাজশাহীতে ফ্লাই করছে স্নেহা। তাও আবার ফেব্রুয়ারির ১৫ তারিখ সন্ধ্যায় রাজশাহীর বারে বসে “আর কখনো এখানে এসো না” বলার পরের ঘটনা এগুলা। আবিরকে একটু দেখার জন্য ওই অপমানটাও স্নেহা ইগনোর করে চোখে কাপড় বেঁধে রাখছিল নিজের আত্মসম্মান বোধ থেকে চোখ লুকাতে।
২৭ এপ্রিল আবিরের ফ্যামিলি আসার আগের দিনও সকাল থেকে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা পর্যন্ত স্নেহা রাজশাহীতে আবিরের সঙ্গে সময় কাটিয়ে ঢাকায় ব্যাক করছে। ওর ফ্যামিলি রাজশাহীতে থাকায় ইচ্ছা করলেও স্নেহা ওইখানে যাওয়ার কথা বলতে পারতেছিল না মে থেকে জুনের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত। কিন্তু একইসঙ্গে ফেব্রুয়ারি থেকে এপ্রিল পর্যন্ত ক্রমাগত দেখা হওয়া, কাছাকাছি থাকা আর একসঙ্গে সময় কাটানোর স্মৃতিগুলা বারবারই ওই না দেখার অনুভূতিটাকে তীব্র যন্ত্রণাময় করে তুলতেছিল। একেকটা দিন পার হচ্ছিল আর দেখা না হওয়ার যন্ত্রণা স্নেহার ভেতরে তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠতেছিল।
এই যন্ত্রণারই রিয়্যাকশন দেখা যাচ্ছিল আবিরের সঙ্গে ওর দৈনন্দিন কনভার্সেশনে। অল্পতেই রেগে যাওয়া, বাঁকাভাবে কথা বলা, অযথাই জেদ দেখানো, অস্থির আচরণ করা, খুব সামান্য ঘটনাকে ইস্যু করে আবিরকে আজে-বাজে কথা শোনানো- দিনকে দিন এগুলা বেড়েই চলতেছিল। স্নেহা বুঝতে পারতেছিল সে ঠিক করতেছে না, কিন্তু তার মনের ভেতর ছটফট করতে থাকা আবিরকে দেখার তীব্র বাসনা এসব আচরণ থেকে তাকে বিরতও রাখতে পারতেছিল না।
ফেব্রুয়ারি-এপ্রিল ইচ্ছা করলেই দেখা করতে চলে যাওয়ার অভ্যস্ততাটা যখন মে-জুনে এসে স্নেহাকে ফিল করালো- চাইলেই সে আর রাজশাহী চলে যেতে পারবে না; তীব্র ইচ্ছা করলেও সে এখন আর ওইভাবে দেখা করতে পারবে না, চাইলেই সে ফোনে কথা বলার আবদার করতে পারবে না কিংবা চাইলেই সে ভিডিও কলে আবিরের হাসিটাও আর দেখতে পারবে না- এইসব রিয়েলাইজেশন স্নেহাকে ভেতরে ভেতরে রক্তাক্ত করতেছিল প্রতি মুহূর্ত।
ওর ধৈর্য্যের সীমাও ভেঙে পড়তেছিল পুরোপুরি। একেকটা দিন যায় আর স্নেহার মনে হয়- একটা দীর্ঘ অনিশ্চয়তার ভেতর তাকে বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে হবে। ওর প্রতীক্ষারা তবু ফুরাবে না। দেখা হওয়া না হওয়া নিয়ে আবিরের কোনো ভ্রুক্ষেপ ছিল না। এটা আরো বেশি যন্ত্রণা দিত স্নেহাকে। আবির তখন পুরাদস্তুর ফ্যামিলি ম্যান। আগের ওই সিঙ্গেল জীবনে তখন সে নাই, যেখানে চাইলেই স্নেহার যখন খুশি প্রবেশাধিকার ছিল। এই উপলব্ধি তাকে অস্থির করে তুলতেছিল ক্রমাগত।
এপ্রিলের ২৮ তারিখ অর্থাৎ ওর ফ্যামিলি রাজশাহীতে যাওয়ার পরদিন খুব সকালে আবিরের মর্নিং টেক্সট আসে। ওইদিন থেকে প্রতিদিনই ও অফিসে ঢুকেই প্রথমে স্নেহাকে টেক্সট করতো। দিনের মধ্যে আরও কয়েকবার স্নেহা অফিসে কি না, লাঞ্চ করলো কি না, কাজ করতেছে কি না, এসাইনমেন্টে কোথায় গেল, বাসায় কখন ফিরলো- এ রকম অসংখ্য টেক্সটে আবির স্নেহার সঙ্গে কানেক্টেড থাকার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। ২৮ এপ্রিলের আগে এত ঘন ঘন টেক্সট রুটিন করে খুব কমই পাঠাতো আবির। যখন কথা বলতে ইচ্ছা করতো, শুধু তখনই টেক্সট দিতো।
স্নেহা বুঝতে পারতেছিল, ও যেন লো আর লোনলি ফিল না করে অথবা ফ্যামিলির সঙ্গে আছে বলে আবির ওকে ইগনোর করতেছে- এমন না ভাবে, তাই আবির যথাসাধ্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল ঘন ঘন স্নেহার খোঁজ খবর নিতে। প্রতিরাতে অফিস থেকে বাসায় ফেরার আগে প্রতিদিনের শেষ টেক্সটটা করতো ও। স্নেহা ডিনার করছে কি না কনফার্ম হয়ে বলতো- মাথায় হাত রাখছি, ঘুমাও। স্নেহার মনটা অসম্ভব ভালো হয়ে যেত আবিরের ওই টেক্সটে। ভৌগিলিক দূরত্বের মধ্যেও মাথার উপর আবিরের হাতটা ফিল করেই ঘুমাতে যেত সে। কোনোদিন যদি আবির মাথায় হাত রাখার কথা লিখতে ভুলে যেত, রাজ্যের অভিমান নিয়ে স্নেহা সারা রাত নির্ঘুম কাটাতো।
গত বছর ৭ জুন ছিল কোরবানির ঈদ। এর দুইদিন আগেই স্নেহা রাজশাহী যায় আবিরকে না বলে। অনেকদিন পর ঈদে ৫ দিনের ছুটি পাওয়ার পর স্নেহার মনটা খারাপ ছিল। এই ছুটিতে সে কী করবে ভাবতে ভাবতে কোনো প্রিপারেশন ছাড়া, মুহূর্তের ভাবনাতেই ৪ জুন রাতে রাজশাহী যাওয়ার বাসে গিয়ে উঠে পড়ে সে। স্নেহা ভাবছিল আবির যে শহরে আছে, ওইখানে ঈদটা পালন করে চুপচাপ আবার ঢাকায় ফিরে আসবে। ওকে জানাবে না। একই শহরে থাকার অনুভূতি তার ভেতরের অস্থিরতাকে কিছুটা কমাবে হয়তো, এমনটা ওর মনে হইছিল।
৫ জুন রাতে আবির স্নেহাকে কল করে। স্নেহাই অভিমান করে বলতেছিল অনেকদিন ওর কণ্ঠ শোনে না, সে চাইলে কি একটা কল করতে পারে না কোনো এক ফাঁকে? এপ্রিলের পর ওইটাই ছিল স্নেহাকে করা আবিরের প্রথম ফোন কল। ফোনে আবিরের কণ্ঠ শুনেই স্নেহা বুঝতে পারলো ও কিছুটা ড্রাঙ্ক। যদিও আবির প্রথমে ড্রিংক করার ব্যাপারটা অস্বীকার করে। একটা কাশি দিয়ে গলা পরিষ্কার করে বোঝাতে চায় সে একদম সোবার এবং ঠিকঠাক আছে। কিন্তু স্নেহার জেরায় বেশিক্ষণ আর সত্য লুকাতে না পেরে স্বীকার করে।
স্নেহা যে রাজশাহীতে ছিল, আবিরকে জানায় না ইচ্ছা করেই। ফোন রাখার কিছুক্ষণ আগে শুধু বলছিল- যদি দেখা করার কোনো সুযোগ হয়, জানাইয়ো। তোমাকে অল্প একটু দেখেই চলে আসবো। এর উত্তরে আবির বলে উঠে- ডোন্ট কাম হেয়্যার। আই কান্ট লিভ মাই ফ্যামিলি অ্যান্ড গো টু মিট ইউ লাইক দিস। ইউ হ্যাভ টু আন্ডারস্ট্যান্ড মাই লিমিটেশনস। আবির যেই টোনে কথাগুলো বলে, প্রচণ্ড বাজে ফিল হয় স্নেহার। নিজেকে তার কীটের চেয়েও তুচ্ছ এবং অপ্রয়োজনীয় মনে হতে থাকে আবিরের জীবনে। আবিরকে সে তার লিমিটেশনের বাইরে গিয়ে এর আগেও কিছু করতে বলে নাই, তখনও না।
কল কাটার পর প্রচণ্ড কষ্ট আর অভিমানে সে আবিরকে টেক্সট পাঠিয়ে বলে- তোমার ফ্যামিলিকে ছেড়ে আমি কোনোদিন আমার কাছে আসতে বলি নাই। আমি শুধু বলছি তোমার সম্ভব আর সুযোগ হলে জানাতে। না সম্ভব হলে তো জোর করে করতে বলি নাই কিছু। যদি জোরই করতে হতো, তাহলে তো বলতাম আমি এখন রাজশাহীতে, এখনই দেখা করতে হবে। তুমি না দেখা করতে পারলে প্রেশার ফিল করবা বলেই রাজশাহীতে এসেও আমি জানাই নাই। আমি তো তোমার সঙ্গে দেখা করতেও আসি নাই। আসছি যে এখনো বলতাম না, তোমার আচরণে বলতে বাধ্য করলা। আর কোনোদিনও তোমাকে দেখা করার কথা বলবো না।
উত্তরে প্রায় ঘণ্টা খানিক পর আবির লিখে পাঠায়- আই'ম সর্যি, স্নেহা। আই ওয়াজ লিটল বিট ড্রাঙ্ক। হোয়াট দ্য হেল আর ইউ ডুয়িং ইন রাজশাহী? গো ব্যাক টু ঢাকা। মায়ের সঙ্গে ঈদ করো গিয়ে। এখানে একা এভাবে থেকো না, প্লিজ। স্নেহা লেখে- পদ্মার পাড়ের নীরবতায় ঈদের ছুটিটা কাটাতে আসছিলাম, তোমাকে বিরক্ত করতে না। আমার জন্য টেনশন করো না। আই'ম ওকে। টেক কেয়ার।
ওই টেক্সটের পর ৭ তারিখ ঈদের দিন ভোর পর্যন্ত আবিরকে ব্লক করে রাখে স্নেহা। আনব্লক করার পর পরই আবিরের ঈদ মোবারক টেক্সট আসে। এর ঘণ্টা খানিক পর আবির যখন স্নেহার সঙ্গে কিছুক্ষণের জন্য দেখা করতে পারবে বলে টেক্সট পাঠায়, স্নেহা তখন ঢাকায় ফ্লাই করার জন্য শাহ মখদুম এয়ারপোর্টের বোর্ডিং গেট পার করছে। হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে ল্যান্ড করার পর আবিরের টেক্সটের উত্তরে স্নেহা লেখে- আই'ম ইন ঢাকা।
অফিসিয়াল কারণে ঈদের দিনই ঢাকায় ফেরে স্নেহা। ঈদের আগেরদিন সন্ধ্যায় ইন্টেরিম গভমেন্টের প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ইউনূস ২০২৬ সালের জুনে নির্বাচনের ঘোষণা দেন জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া ভাষণে। এতেই বিএনপিসহ যারা ওই বছরের অর্থাৎ ২০২৫ এর ডিসেম্বরে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দাবি জানিয়ে আসছিল, তাদের মধ্যে অস্থিরতা আর উত্তেজনা শুরু হয়ে যায়। স্নেহা বিএনপি বিট কাভার করে তাই চাঁন রাতের ১২টার দিকে হেলাল ভাই স্নেহাকে ফোন করে এই বিষয়ে একটা স্টোরি লিখতে বলছিল।
একে তো প্রায় মধ্যরাত, এর উপর পরদিন ঈদ। স্বভাবতই বিএনপির হেভিওয়েট অথবা স্থায়ী কমিটির নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও কাউকে পাওয়া যায় নাই। কোনো নেতার কমেন্ট ছাড়া স্টোরি অসম্পূর্ণ থাকবে বলে স্নেহা সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নিলো। এরমধ্যেই হেলাল ভাই রাত সাড়ে চারটায় স্নেহাকে দেওয়া এসাইনমেন্টে সে অকৃতকার্য হইছে- এমন একটা গায়ে জ্বালা ধরা টেক্সট পাঠায়।
এমনিতেই আবিরকে ব্লক করে রাখায় সারাদিন ওদের কথা হয় নাই; এর উপর সে রাজশাহীতে যেই যেই প্লেসগুলাতে আবিরের সঙ্গে সময় কাটাতো, সবগুলা ঘুরে এসে আরো ডিপ্রেসড অবস্থায় হোটেলের ব্যালকনিতে ও অস্থির পায়চারি করতেছিল। এরমধ্যে হেলাল ভাইয়ের এই রকম ঠেস দেওয়া টেক্সটে মেজাজ কন্ট্রোলে থাকলো না স্নেহার।
ছুটির মধ্যেও তাকে কাজের প্রেশার দেওয়া অপেশাদারী আচরণ মেনশন করে সে একগাদা কথা হেলাল ভাইকে টেক্সটে লিখে পাঠালো, সঙ্গে এটাও লিখলো- এই টেক্সটের জন্য আমাকে শোকজ অথবা চাকরিচ্যুত করার অধিকার আপনি রাখেন। করেন। আই'ম রেডি ফর দ্যাট। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে এবং অফিসের ইমার্জেন্সি প্রয়োজনে সাংবাদিকদের ছুটি বাতিল করার এখতিয়ার সম্পাদক রাখেন, এটা স্নেহা খুব ভালোভাবে জানে। এরপরও সে কড়া ভাষায় হেলাল ভাইকে টেক্সট পাঠায় মূলত আবিরের সঙ্গে দেখা না হওয়ার ফ্রাস্ট্রেশনে।
হেলাল ভাই এই অডিসিটির উত্তরে লেখেন- পুলিশ, সাংবাদিক, ডাক্তার- এইসব সেবামূলক পেশায় ছুটি বলে কিছু থাকে না। রেস্ট নাও, সকালে স্টোরিটা জমা দিও। সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হয় না, এর মিনিট পনের পরই ফজরের নামাজের জন্য উঠা এক বিএনপির নেতা স্নেহার টেক্সটের উত্তরে জুনে নির্বাচনের তারিখ ঘোষণায় নিজের প্রতিক্রিয়া জানিয়ে উত্তর পাঠায়।
মাত্র কয়েকটা সেনটেন্সে তিনি জানান-"রাজনৈতিক দলগুলার সঙ্গে কোনো প্রকার আলোচনা ছাড়াই এভাবে হুট করে প্রধান উপদেষ্টার নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করায় আমরা বিস্মিত। প্রায় সব দলই ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচন দিয়ে দেশে দ্রুত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছি। এরপরও হুট করে জুনে নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হতাশাজনক।"
বক্তব্যটা যুক্ত করে ভোর পাঁচটার মধ্যেই স্নেহা হেলাল ভাইকে হোয়াটসঅ্যাপে স্টোরিটা পাঠায়। সঙ্গে সঙ্গে উনি স্টোরিটা নিউজরুমে ফরওয়ার্ড করে দ্রুত পাবলিশ করার নির্দেশ দেন। হেলাল ভাই স্নেহাকে ঢাকায় ব্যাক করতে বলে নাই বা ছুটিও ক্যান্সেল করান নাই। স্নেহা নিজেই নিজের ছুটি ক্যান্সেল করে ঢাকায় ফিরে এসে অফিস করা শুরু করে দেয়। ওই রাতেই আবির স্নেহাকে টেক্সটে লেখে- ১৪ তারিখ কিছু সময়ের জন্য দেখা করতে টাইম ম্যানেজ করতে পারবো মনে হয়, এখনো শিওর না। আই উইল লেট ইউ নো সুন।
দুইদিনের মধ্যে তারিখটা আবির কনফার্মও করে। তবুও এর ৭ মাস পর সে স্নেহার থেরাপিস্টের কাছে স্টেটমেন্ট দেয়- মানা করার পরও স্নেহা নাকি ওইবার জোর করে রাজশাহী যায়, যার ফলে ওর অনেক বড় ক্ষতি হয়ে গেছে। স্নেহার সঙ্গে দেখা করার জন্য ওইদিন তাকে ওয়ার্কস্টেশনের বাইরে আসতে হইছিল। আবির মনে করে, স্নেহা ওইদিন না গেলে সে বের হতো না, মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে এক্সিডেন্টও করতো না। অথচ তারিখটা যেমন আবিরের দেওয়া, ঢাকা থেকে মদ নেওয়ার অনুরোধটাও সে-ই করছিল।
মদ্যপ অবস্থায় তার গাড়ি চালানো নিয়ে সবসময়ই স্নেহা ভয়ে থাকতো। ১৪ জুন স্নেহা রাজশাহী পৌঁছানোর পর দেড় ঘণ্টার জন্য আবির দেখা করতে আসে। এয়ারপোর্ট থেকে স্নেহা হোটেলে পৌঁছানোর আগেই আবির হোটেলের পার্কিংয়ে ওয়েট করতে থাকে। ঘণ্টা দেড়েক গাড়ির মধ্যে বসেই ওরা কথা বলে। আবির হালকা ড্রিঙ্ক করে পরদিন সকালেও আসতে পারে জানিয়ে চলে যায়। ১৫ জুন সকাল নয়টায় আবির টেক্সট করে জানায় ওর গাড়ির টায়ার বার্স্ট হইছে।
আগেরদিন কথা প্রসঙ্গে দশ-এগারো দিন পর আবির ওর ঢাকায় আসার পসিবিলিটির কথা স্নেহাকে জানায়, স্নেহা তাই গাড়ির টায়ার বার্স্ট হওয়ার কথা শুনে আবিরকে লেখে- আজকে আসা লাগবে না। কয়দিন পর তো ঢাকায় আসতেছোই। কোনো রকম জেদ না দেখিয়ে স্নেহার এই সহজে মেনে নেওয়াটা আবির সম্ভবত বিশ্বাস করতে পারে নাই। সে ভাবছে ও না আসলে স্নেহা অশান্তি করবে।
আবিরকে ওই টেক্সট দেওয়ার পর স্নেহা শাওয়ার নিয়ে ব্রেকফাস্ট করতে যাবে চিন্তা করে। এরপর রুমে ফিরে একটা লম্বা ঘুম দেবে। শাওয়ার নিয়ে রুমে এসে দেখে আবিরের অসংখ্য টেক্সট জমে আছে টেলিগ্রামে। লাস্ট টেক্সটটায় লেখা- ম্যানেজড অ্যা কার, কামিং…। আবিরের ওই টেক্সট দেখে স্নেহা ভাবে- লোকটা ওকে একটু ভালো ফিল করাতে কত প্যারা নেয় মাঝে মাঝে। যদিও শেষ বিদায়ের কনভার্সেশনে এসব ভালোলাগার সমস্ত অনুভূতিকেই আবির জাস্ট আস্তাকুঁড়ে ছুঁড়ে ফেলে দিছে মুহূর্তের ভেতরে।
১৫ জুন সকাল এগারোটায় স্নেহার হোটেলের উল্টা পাশে একটা ক্যাটক্যাটা ব্লু সেডান গাড়ি নিয়ে হাজির হয় আবির। কার গাড়ি, কী সমাচার স্নেহা জানতে চায় না ওর কাছে। ঘণ্টা খানিক গাড়িতে বসে এটা-সেটা গল্প করার ফাঁকে স্নেহার নিয়ে যাওয়া ব্যালেন্টাইন গল গল করে গিলতে থাকে সে। স্নেহা আস্তে খেতে বলার পরও সে থামলো না। পুরাটা মদ শেষ হওয়ার পর হঠাৎই বলে উঠলো- আই হ্যাভ টু গো।
এভাবে মদ গেলায় স্নেহা আরো কিছুক্ষণ পর যাওয়ার জন্য রিকোয়েস্ট করে। কিন্তু আবির ওই কথা পাত্তাই দিলো না। কয়েকবার রিকোয়েস্ট করেও যখন কথা শোনানো গেল না, স্নেহা মেজাজ খারাপ করে গাড়ি থেকে নেমে গেল। গাড়ি থেকে নেমে শেষ আরেকবার ট্রাই করলো আবিরকে থামানোর। ও ঠিকমতো চোখও খুলতে পারতেছিল না সে সময়, স্নেহা সেটাও ওকে বলে। কিন্ত আবির কোনোকিছু না শুনে গাড়ি টান দিয়ে চলে যায়।
রাজশাহী শহর থেকে আবিরের ওয়ার্কস্টেশনের দূরত্ব আধা ঘণ্টার। নরমালি আবির চলে যাওয়ার আধা ঘণ্টা পর স্নেহা টেক্সট করে খোঁজ নেয় ও ঠিকমতো পৌঁছালো কি না। ওইদিন আবির কথা না শোনায় রাগে কোনো টেক্সট পাঠালো না। হোটেলের রুমে ফিরে কিছুক্ষণের মধ্যে ঘুমিয়ে পড়লো স্নেহা।
ঘুম ভাঙলো আবিরের টেক্সটে- ডোন্ট কল মি। টেক্সটটা পাওয়ার পর স্নেহা কিছুটা দ্বিধায় পড়ে যায়। আবিরকে কখনোই স্নেহা নিজে থেকে কল করে নাই কোনোদিন। ওর ফ্যামিলি সঙ্গে থাকলে তো আরও না। তাছাড়া আবির ওকে এ ধরনের টেক্সট এর আগে কোনোদিনই পাঠায় নাই। বহু দ্বিধাদ্বন্দ্বে স্নেহা রিপ্লাই লেখে- আমি কবে আবার তোমাকে কল দিলাম নিজে থেকে!
আবির লিখলো- আই'ম ফাকড আপ! আই'ম ফাকড আপ, স্নেহা! আই'ম জাস্ট ফাকড আপ! ওই টেক্সট দেখে স্নেহা ভয় পেয়ে যায়। ওর মনটা অজানা আশঙ্কায় আতংকিত হয়ে আবিরকে লেখে- কী হইছে, আবির? আবির, ইউ ওকে? সব ঠিক আছে তো? কোথায় তুমি? আবির, প্লিজ এন্সার দাও। তুমি ঠিক আছো? একটু পর আবির উত্তর দেয়- এক্সিডেন্ট। আই'ম কলিং ইউ সুন। গিভ মি সামটাইম।
এক্সিডেন্ট শব্দটা দেখেই স্নেহার শরীর কাঁপা শুরু হয়ে গলা শুকাতে থাকে। ২৪ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রার এসির নিচে বসেও স্নেহা টের পায় দরদর করে ঘেমে ওর শরীরটা ভিজে যাচ্ছে। প্রচণ্ড অস্থিরতায় ও আবারও আবিরকে লেখে- তুমি ঠিক আছো? হোয়্যার আর ইউ? তোমার কিছু হয় নাই তো? প্লিজ, এন্সার মি আবির। কারো কিছু হইছে? ইউ ওকে?
প্রায় আধা ঘণ্টা পর আবির প্রথমে জানায় ও ঠিক আছে, কারো কোনো ক্ষতিও হয় নাই তবে ওর ওয়াইফ এরমধ্যেই ওর বসকে এই ও ড্রিংক করে এক্সিডেন্ট করছে জানিয়ে কমপ্লেইন করছে। ব্লু সেডানটা ওর ওয়াইফের ছিল, এক্সিডেন্টে গাড়ির সামনের অংশে বেশ ভালো ক্ষতি হইছে। স্নেহা আবারও আতঙ্কিত হয়ে পড়ে কমপ্লেইন করার কথা শুনে।
ড্রিঙ্ক অ্যান্ড ড্রাইভ ওর প্রফেশনে একটা বিরাট অপরাধ। এর উপর ও করছে এক্সিডেন্ট। এর কনসিকুয়েন্স চিন্তা করে আবির রেস্টলেস হয়ে পড়ে। স্নেহা আবিরকে শান্ত হতে বলে, কিন্তু ওর মনটাও তখন অস্থির হয়ে উঠে। ততক্ষণে স্নেহার মনে এটাও আসে- ও রাজশাহীতে না গেলে বোধহয় এমন সিচ্যুয়েশনে আবিরকে পড়তে হতো না। নিজেকে এই ঘটনার জন্য স্নেহার দোষী মনে হতে লাগে।
এর কিছুক্ষণ পর আবির স্নেহাকে লেখে- স্নেহা, আমি যদি সব ফেলে এখনই তোমার কাছে চলে আসি, আমাকে চালাতে পারবা? আবিরের এই টেক্সট স্নেহার কাছে খুবই অপ্রত্যাশিত ছিল। একদিকে ও যেমন বুঝতে পারতেছিল- ড্রাঙ্ক আবির, ওয়াইফের কমপ্লেইনের কারণে ক্ষিপ্ত ও হতাশ আবির এবং এত বড় প্রফেশনাল পজিশন হোল্ড করে এমন একটা ঘটনার মুখোমুখি হওয়ার চিন্তাতে অসহায় আর ভীত আবির ওই সময় আবেগে ওই টেক্সটটা লিখছে, সুস্থ চিন্তা থেকে না। তবুও ওর হৃদয়টা ওই টেক্সট দেখে কয়েক মিনিট স্টাক হয়ে ছিল।
স্নেহার বুকের ভেতরে থাকা ব্লু বার্ডটা চিৎকার করে তখন আবিরকে বলতে চাইতেছিল- আমার কাছে চলে আসো। আই উইল বি উইদ ইউ ইন এভ্রি আপস অ্যান্ড ডাউন। কিন্তু বাস্তবতা স্নেহাকে দিয়ে লেখায়- পাগলের মতো কথা বলো না, আবির। আবির সঙ্গে সঙ্গেই লেখে- আমি সিরিয়াস। তুমি বললে আমি এখনই সব ছেড়ে শহরের দিকে রওনা হবো। ভেবে দেখো। স্নেহা আবার লেখে- পাগলামী ছাড়ো। ইউ হ্যাভ অ্যা ডটার। সব ঠিক হয়ে যাবে, হ্যাভ পেশেন্স। আবির কিছুক্ষণ পর লিখে পাঠায়- হুম!
আবিরের এক্সিডেন্ট পরবর্তী ওই সময়গুলার কথা ভাবতে ভাবতে স্নেহার খেয়াল হয় প্রথম চুমুকের পর কফির কাপটা ওইভাবেই সে পাশে ফেলে রাখছিল। এতক্ষণে কিছুটা ঠান্ডাও হয়ে পড়ছে। গরম করতে যেতে ইচ্ছা না করায় ঠান্ডা হয়ে আসা কফিতেই চুমুক দিতে গিয়ে স্নেহার মনে পড়লো- আবিরের ওই এক্সিডেন্টের জন্য নিজেকে দোষারোপ করে সে বহু রাত নির্ঘুম কাটিয়ে দিছে।
রাতের পর রাত তাহাজ্জুদের সিজদায় আল্লাহর কাছে চোখের পানি ফেলে আবিরকে প্রফেশনাল শাস্তির হাত থেকে বাঁচানোর জন্য দোয়া করে গেছে। অথচ আবির নিজেও যে এই ঘটনার জন্য স্নেহাকে দায়ী করে ওর সবকিছু স্নেহার কারণে ধ্বংস হইছে ভাবতেছিল, এই রকম আশা স্নেহা সত্যিই করে নাই। এক্সিডেন্টের নয়দিন পর ২৪ জুন ঢাকার শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ডোমেস্টিক টার্মিনালে দাঁড়িয়ে আবির স্নেহাকে লিখছিল- ইউ হ্যাভ ডেস্ট্রয়েড মাই এভ্রিথিং!
ওই টেক্সটটার কথা মনে পড়তেই একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললো স্নেহা। এপ্রিল, ২০২৫ এর পর থেকে নিজের কর্মকাণ্ডে নিজেকে স্নেহার অপরিচিত লাগা হইছিল একটা সময়। সারা জীবন নিজেকে যেভাবে ও চিনে আসছিল, সমস্ত কিছু যেন ভেঙে পড়তেছিল একটু একটু করে। নিজের ভেতর ইনোসেন্ট, সহজ সত্তাটা দূরে কোথাও হারিয়ে ফেলে ক্রমশ একটা একগুঁয়ে, জেদী, রুক্ষ, কর্কশ মানুষের ছাপ দেখতে পারতেছিল। কোন ফাঁকে যে ওর ভেতরে একটা হিংস্র পশু বাস করা শুরু করলো, স্নেহা এখনো বুঝে উঠতে পারে নাই।
আবিরকে হারিয়ে ফেলার ভয়ে সে ধূর্ত শিয়ালের মতো আচরণ শুরু করছিল। তার মতো একটা সরল মানুষ সবকিছুই ভাবতেছিল জটিলভাবে। স্নেহার এতক্ষণ পর উপলব্ধি হলো- ওর সমগ্র জীবনে আবিরই ছিল একমাত্র নেশা যাকে ও নির্দ্বিধায় বলতে পারে- পারহেপ্স ইউ আর দ্য বেস্ট ড্রাগস আই হ্যাভ এভার টেস্টেড! স্নেহা চোখটা বন্ধ করে বুঝলো- এই উইথড্রয়ালের পেইন মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ওকে ভোগাতে থাকবে সম্ভবত। এসব ভাবনা গতকাল সন্ধ্যা থেকে দীর্ঘ বিরতির পর আবারও স্নেহার বুকে প্রচণ্ড ভারী একটা চাপ ফিল করালো।
চাপটা ধীরে ধীরে ব্যথাতে রূপান্তরিত হলো। যে করেই হোক এই ব্যথাকে এখন পাত্তা না দিয়ে এড়াতে হবে, স্নেহা ভাবে। যদিও সে বিশ্বাস করে- তার মৃত্যু হবে নির্জন ফাঁকা ফ্ল্যাটে, একা। তার আরো ধারণা, ওই মৃত্যুর খবর মানুষ জানবে লাশে পচন ধরার পর। এর আগে কেউ টেরও পাবে না, খোঁজও নেবে না।
যেহেতু এই দুনিয়ার সঙ্গে তার পারস্পরিক সংযোগের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে, ফলে শেষটা এমন হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেটা তো কোনোভাবেই এখন ঘটতে দেওয়া যেতে পারে না, বুকের ব্যথাটা টের পেতে পেতেই তার মনে হয়। যন্ত্রণারও তো একটা প্রোপার ক্লোজার লাগে, শুধু মানুষ জোরজবরদস্তি ক্লোজার টেনে গেলেই তো আর সবকিছু আবার আগের নিয়মে চলা শুরু করে না।
ঘাড় ঘুরিয়ে বেডসাইড টেবিল থেকে মোবাইলটা হাতে নেয় স্নেহা। অনেকক্ষণ গান বন্ধ এই ঘরে। মিষ্টির ধোঁয়া আর গান- এগুলাই তো এখন তাকে এই প্রচণ্ড বিপর্যস্ত সময়ে সঙ্গ দিয়ে যাইতেছে। সকালে যত্নে তুলে রাখা অর্ধ গলিত মিষ্টি সমেত ফয়েল পেপারটা হাতে নিয়ে স্নেহা কৃতজ্ঞতা জানায় এদের কাছে। এরপর স্পটিফাই ওপেন করে আমোন প্লেলিস্টটা এড়িয়ে সোজা চলে যায় সার্চ অপশনে। এফ এ এ এস এল ই স্পেস জি এইচ ইউ এল এম স্পেস এ এল আই লিখে ইন্টার চাপতেই চলে আসে যা সে মনে মনে ওই সময় তীব্রভাবে অনুভব করতেছিল।
চোখটা বন্ধ করে। গজলের ওই সুরে হারাতে গিয়ে তার মনে হয়- শেষ পর্যন্ত তো আবির স্নেহাকে ওর জীবনের ধ্বংসকারী হিসেবে প্রমাণ করতে পারছে। হি ইজ সাকসেসফুল। ক্রমাগত নিজের সম্পর্কে আবিরের অবিশ্বাস-সন্দেহ-ভয়ে স্নেহা বোধহয় নিজেকে সত্যিই ধ্বংসকারী ভাবা শুরু করে দিছিল একটা সময়, ওই রকম অ্যাক্টও তাই করতে হলো তার শেষমেশ।
সারা জীবন সে কারোর কোনো ক্ষতির কারণ হয় নাই বলে যে প্রাইড নিয়ে চলতো- কাঁচের আয়নার মতো তা ঝনঝন শব্দে ভেঙে পড়লো অবশেষে! কিন্তু এছাড়া কি আর কোনো উপায় ছিল এই ব্ল্যাক হোল থেকে বের হওয়ার অথবা আবিরকে বের করার? বুকের চাপটা আরো বেশি ভারী হয়ে ব্যথার তীব্রতা বাড়লো। ওই বোধটাকে ইগনোর করে সে মনোযোগ দিতে চাইলো ওস্তাদ গুলাম আলীতে-
রাত ভর পিছলি হি আহাট কান মে আতি রাহি
ঝাঁক কর দেখা গলি মে, কোয়ি ভি আয়া না থা…
ফাসলে…
ফাসলে অ্যায়সে ভি হোঙ্গে, ইয়ে কাভি সোচা না থা…
ইয়াদ কার কে অউর ভি তকলিফ হোতি থি, আদিম
ভুল জানে কে সিওয়া অব কোয়ি ভি চারা না থা…
ফাসলে…
ফাসলে অ্যায়সে ভি হোঙ্গে, ইয়ে কাভি সোচা না থা…
চোখ বন্ধ করে সেও সুর মিলিয়ে গাইলো- “ফাসলে… হুম…ফাসলে…অ্যায়সে ভি হোঙ্গে, ইয়ে কাভি সোচা না থা…সামনে বেয়ঠা থা মেরে অউর ও মেরা না থা…”। গজলের সুর আর কথায় বুকের ব্যথা অনুবাদিত হয়ে চোখের কোণায় চিক চিক করে উঠলো। কিছুক্ষণ পরই গড়িয়ে যেতে লাগলো চিবুক বরাবর। "ফাসলে…হুম…ফাসলে…অ্যা…ফাসলে…অ্যায়সে ভি হোঙ্গে…"- অনবরত স্নেহা এই লাইনগুলা গাইতেছে আর ভাবতেছে- এক সময় নিশ্চয় সমস্ত ব্যথাই সহনশীল হয়ে উঠবে।
চলবে…