সেই মুখহীন নারীমূর্তির বরফ শীতল হাত যখন আমার গলার চারপাশটা পেঁচিয়ে ধরল, আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। যক্ষটা তার বিশাল কালো থাবা আমার বুকের কাছে নিয়ে এল। তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে পচা মাংসের গন্ধ। মতি মিয়া ওপর থেকে অমানুষিক গলায় চিৎকার করে বলছে— "রক্ত দাও! ওর রক্ত দিলেই আমরা এই অভিশপ্ত সম্পদ নিয়ে মুক্ত হতে পারব!"
ঠিক সেই মুহূর্তে আমার মনে পড়ল ডায়েরির সেই নকশাটার কথা। নকশায় লেখা ছিল— 'রক্তের বিনিময়ে মুক্তি, কিন্তু আগুনের বদলে বিনাশ।' ### বাঁচার শেষ চেষ্টা
আমার পকেটে তখনো আমার লাইটারটা ছিল। আমি চরম কষ্টে হাতটা পকেটে ঢোকানোর চেষ্টা করলাম। যক্ষটা যখন তার ধারালো নখ দিয়ে আমার বুক আঁচড়াতে শুরু করল, অসহ্য যন্ত্রণায় আমি চিৎকার করে উঠলাম। কিন্তু সেই চিৎকারের মাঝেই আমি লাইটারটা বের করতে সক্ষম হলাম।
আমি জানতাম, এই ধনাগারের ভেতর যে পুরনো কাপড়ের পুটলি আর শুকনো হাড় আছে, তাতে আগুন লাগাতে পারলে একটা সুযোগ তৈরি হতে পারে। আমি লাইটারটা জ্বালিয়ে সরাসরি যক্ষের সেই কুয়াশাচ্ছন্ন অবয়বের দিকে ধরলাম।
আগুনের শিখা স্পর্শ করার সাথে সাথে এক বিভৎস চিৎকার করে যক্ষটা পিছিয়ে গেল। অশরীরী আত্মারা আগুনকে ভয় পায়! আমি সেই সুযোগে নারীমূর্তির বাঁধন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম এবং পাশের একটা জ্বলন্ত লণ্ঠন ছুড়ে মারলাম ধনাগারের সেই পুরনো কাপড় আর কাঠের সিন্দুকগুলোর ওপর।
ধ্বংসের তাণ্ডব
নিমেষের মধ্যে পুরো ভূগর্ভস্থ কক্ষটা আগুনের লেলিহান শিখায় ছেয়ে গেল। যক্ষ আর কঙ্কালগুলো আগুনের তাপে গলতে শুরু করল। তাদের চিৎকার তখন আর ভয়ংকর নয়, বরং করুণ শোনাচ্ছিল। পুরো বাড়িটা কাঁপতে শুরু করল— যেন বড় কোনো ভূমিকম্প হচ্ছে।
আমি পাগলের মতো সুড়ঙ্গের সেই ভাঙা সিঁড়ি দিয়ে ওপরে ওঠার চেষ্টা করলাম। ধোঁয়ায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। কোনোমতে দোতলার সেই ভাঙা আয়নাওয়ালা ঘরে পৌঁছালাম। মতি মিয়া সেখানে দাঁড়িয়ে ছিল, কিন্তু এবার আর সে হাসছে না। আগুনের তাপে তার চামড়া খসে পড়ছে, আর তলা থেকে বেরিয়ে আসছে হাড়গোড়।
সে আর্তনাদ করে বলল, "তুই কী করলি? তুই আমাদের চিরতরে শেষ করে দিলি!"
আমি কোনো উত্তর না দিয়ে ঘরের জানালা দিয়ে সোজা নিচের বাগানের ঝোপের ওপর ঝাঁপ দিলাম। পেছনে ফিরে দেখি, পুরো জমিদার বাড়িটা দাউদাউ করে জ্বলছে। আর সেই আগুনের শিখার মাঝে আমি অসংখ্য কালো ছায়াকে আকাশে মিলিয়ে যেতে দেখলাম। মতি মিয়ার শেষ চিৎকার বাতাসে মিলিয়ে গেল।
পরের দিন সকালে
সকালে যখন জ্ঞান ফিরল, আমি নিজেকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে আবিষ্কার করলাম। গ্রামের লোকজন আমাকে বাগানের ঝোপে পড়ে থাকতে দেখে উদ্ধার করেছে। তারা আমাকে জানাল, ওই পুরনো বাড়িটা গত রাতে বজ্রপাতে ভস্মীভূত হয়ে গেছে।
কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, পুলিশ যখন ওই ধ্বংসস্তূপ তল্লাশি করল, তারা সেখানে কোনো ধনাগার বা কঙ্কাল খুঁজে পায়নি। এমনকি মতি মিয়া নামের কোনো কেয়ারটেকারের কোনো হদিসও মেলেনি। ওখানকার মানুষের মতে, ওই বাড়িটা গত ২০ বছর ধরে জনমানবহীন পরিত্যক্ত হয়ে পড়ে ছিল।
এক অমীমাংসিত রহস্য
আমি সুস্থ হয়ে ঢাকা ফিরে আসি। কিন্তু আজও মাঝরাতে আমি হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে উঠি। মনে হয় আমার খাটের নিচে কেউ নখ দিয়ে আঁচড় কাটছে। আর যখনই আমি আয়নার সামনে দাঁড়াই, আমার মনে হয় আমার প্রতিচ্ছবির পেছনে একটা ছায়া দাঁড়িয়ে আছে— যার মুখ নেই।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার কী জানেন? হাসপাতালে যখন আমার জামাকাপড় ফেরত দেওয়া হয়, তখন সেই কালো ডায়েরিটা আমার পকেটে ছিল না। কিন্তু আমার ডান হাতের তালুতে গভীর ক্ষত দিয়ে বড় বড় অক্ষরে লেখা হয়ে আছে: 'আমরা আসছি।' আমি জানি না এই গল্পটা পড়ার পর আপনাদের কেমন লাগছে, কিন্তু আমি জানি— এই অভিশাপ শেষ হয়নি। হয়তো পরের মেহমান হতে পারেন আপনি!