সাত রাস্তার ফুটপাথে হাটছি। গরম পড়া শুরু করেছে। দরদর করে ঘামছি। আসরের আযানের আগে, মাইকে বললো, একটা বাচ্চা মারা গিয়েছে, নামাযের পরে তার জানাযা।
পাঞ্জেগানা নামাযের ধার দিয়ে ম্যালাদিন যাওয়া হয় না, কিন্তু যদি শুনি কারো জানাজা, সেটা কেন জানি মিস দেই না। নিজে একা মানুষ, মরলে আমার কি হবে কে জানে – হয়তো সে কারনে …
এক গাদা ঠান্ডা পানি দিয়ে লম্বা সময় ধরে অযু করেছি, মসজিদের এসির বাতাসে এখন শীত লাগা শুরু হয়েছে। একটা ঝরঝরা ভাবও কাজ করছে। আমার পাশে একজন বয়স্ক মানুষ দাড়িয়েছেন। গাল ভাঙ্গা, ঘোলাটে চোখের নিচটা ফোলা। এপ্রিল মাসের শেষ বিকেলে ভদ্রলোক গায়ে লাল শাল জড়িয়ে মসজিদে এসেছেন ! শাল দেখে বোঝা যায় বনেদী ঘরের লোক।
জানাযার নামাযের আগে যে ৩/৪ মিনিট সময় পেলাম, উসখুস ভাব আর চাপতে না পেরে তাকে জিজ্ঞেসই করে বসলাম, ‘স্যার, এই গরমে শাল গায়ে দিয়েছেন, আপনার কি জ্বর ?’
ভদ্রলোক একগাল হাসি দিয়ে আমার দিকে ভালো করে তাকালেন। সম্ভবত স্যার ডাকায় খুশী হয়েছেন। বাঙ্গালী স্যার ডাক শুনতে ভালোবাসে।
- আমি বাবা ক্যান্সারের রোগী। প্যাঙ্ক্রিয়াসে ক্যান্সার। লাস্ট স্টেজ …
বলেই ভদ্রলোক আবার শুকনো হাসি দিলেন। ঘোলাটে ধূসর চোখ। আমি তার চোখের দিকে তাকিয়ে আছি।
ছোটবেলায় পৃথিবীর রহস্য জানার খুব আগ্রহ ছিল আমার। এই বয়সে এসে বুঝি, পৃথিবীর সব রহস্য মানুষের পক্ষে জানা সম্ভব না। একটা সময়ে মানুষকে স্রোতে গা ভাসিয়ে দেয়া লাগে …
লাশবাহী গাড়ি চলে যায়। মানুষের ভীর কমে আসে। ভদ্রলোক পা টেনে টেনে ফুটপাথ ধরে হাটছেন। আমার ল্যাবএইডে যাবার কথা, আমি ভদ্রলোকের চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে আছি। কি জানি পাখিদের কিচিরমিচির থামার নাম নাই। ডপলার সাহেবের শব্দের সূত্র মেনে কিনা কে জানে - ভদ্রলোক যত দূরে যাচ্ছেন, আলোর বিপরীতে তার ছায়া তত ছোট হয়ে আসছে …
আর কদিন পরে যে মানুষ মারা যাবে জেনে গিয়েছে, কারো জানাযায় দাঁড়ালে তার মনে কিসের অনুভূতি হয় ? তিনি কি কোন অন্ধকার দেখতে পান ? তার কি চারপাশের সব চিন্তা — প্রার্থনার সকল সময় শূন্য মনে হয় ? নামাযের দোয়া কি তার মুখে জড়িয়ে আসে ? ভাগ্যকে তিনি কিভাবে মেনে নেন ? চোখ বেয়ে অসময়ে যে পানি গালে গড়ায় – তার কি কোন কারন তিনি জানেন ?
তার কি কাউকে জড়িয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে ? যে অদৃশ্য তিনি দেখতে পারেন, কাউকে কি সেটা বলে যেতে ইচ্ছে করে?
আমার নানী যখন চলে যাবেন, আমার হাত ধরে বলতেন, ‘ ও নাতী, আমি কিন্তু ভয় পাইতেসি না। একদম ভয় পাইতেসি না। তুই চিন্তা করিস না ও ভাই, তুই মন খারাপ কইরলে নানু কানমু …’
অথচ তার চোখে আমি দিব্যি দেখতাম এক অদ্ভুত ঘোরলাগা ভয়। চোখ বেয়ে যে পানি গড়াতো, তাতে স্পষ্ট মানুষ হিসেবে জন্মাবার অসহায়ত্ব। হাপানীর প্রতি টানে, তিনি যেন সবাইকে কিছু একটা বলতে চাইতেন।
প্রকৃতি আমার নানীকে সে সুযোগ দেয়নি …
-রাকীবামানিবাস
২রা এপ্রিল, ২০২৬
