Posts

নন ফিকশন

কবরস্থানের কান্না পর্ব ৩ শেষ পর্ব

April 3, 2026

Md Josam

Original Author MD samim sikdar

Translated by MD Shamim sikdar

7
View

কবরস্থানের কান্না — শেষ পর্ব

আমি বুঝে গিয়েছিলাম—এটা কোনো স্বপ্ন না।

প্রথম রাত, দ্বিতীয় রাত… সবকিছু বাস্তব ছিল।
কারণ বাস্তব জিনিসই শরীরে দাগ রেখে যায়।

আমার হাতের নখের ভেতর জমে থাকা মাটি…
আমার আঙুলের কাটা দাগ…
আর সবচেয়ে ভয়ংকর—আমার কানের ভেতর এখনও বাজতে থাকা সেই কান্না।

আমি আর পালানোর চেষ্টা করিনি।

কারণ একটা জিনিস পরিষ্কার হয়ে গিয়েছিল—
আমি যেখানেই যাই, সেটা আমার সাথে যাবে।

পরের ৩ দিন আমি ঘুমাইনি।

চোখ বন্ধ করলেই দেখি—
মাটির নিচে অসংখ্য মুখ, হাত বাড়িয়ে আছে…
শ্বাস নিতে পারছে না…
চোখ দিয়ে মাটি বের হচ্ছে…

চতুর্থ রাতে… আমি নিজেই সিদ্ধান্ত নিলাম।

আমি আবার সেখানে যাবো।

সব শেষ করতে হলে…
আমাকে শুরুতে ফিরতে হবে।

রাত ২টা ১৭।

আমি আবার দাঁড়িয়ে আছি সেই কবরস্থানের সামনে।

এইবার গেট বন্ধ ছিল।

কিন্তু আমি ছুঁতেই—
“ক্যাঁচ…” করে নিজে নিজেই খুলে গেল।

ভেতরে ঢুকতেই ঠান্ডা বাতাস গায়ে লাগল।
এই ঠান্ডা কোনো সাধারণ ঠান্ডা না—
এটা যেন মৃত মানুষের নিঃশ্বাস।

চারদিকে তাকালাম।

সব কবর আগের মতো শান্ত।
কোনো হাত নেই… কোনো শব্দ নেই…

কিন্তু আমি জানতাম—
ওরা আছে। শুধু অপেক্ষা করছে।

আমি ধীরে ধীরে সেই জায়গার দিকে হাঁটলাম—
যেখানে প্রথমবার তাকে দেখেছিলাম।

হঠাৎ…

“তুমি এসেছো…”

আমি থেমে গেলাম।

সে দাঁড়িয়ে আছে।

এইবার… আগের মতো না।

তার চুল সরে গেছে।

আমি তার মুখটা পরিষ্কার দেখতে পেলাম।

তার মুখ অর্ধেক পচে গেছে…
চামড়া খুলে গিয়ে নিচে কালো মাটি…
আর সেই ফাঁকা চোখের গর্তের ভেতর…
ধীরে ধীরে কিছু নড়ছে।

ছোট ছোট… সাদা… পোকা।

আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল।

“শেষ করতে এসেছো?” — সে বলল।

আমি কাঁপা গলায় বললাম,
“তোমরা কী চাও?”

সে ধীরে ধীরে হাসল।

“সত্য…”

হঠাৎ চারপাশের মাটি কাঁপতে শুরু করল।

একটা… দুইটা… তারপর সব কবর।

মাটি ফেটে যেতে লাগল।

আর সেই ফাটল থেকে…
একটার পর একটা… হাত বের হতে লাগল।

কিন্তু এবার শুধু হাত না।

মুখ।

পুরো শরীর।

তারা মাটি ঠেলে বের হয়ে আসছে—
অর্ধেক পচে যাওয়া… চোখ ফাঁকা… কেউ কেউ এখনও নড়ছে।

তাদের মুখে একটাই শব্দ—

“শ্বাস… নিতে পারি না…”

আমি পেছাতে লাগলাম।

“এগুলো কী?!” — আমি চিৎকার করলাম।

সে ধীরে ধীরে আমার দিকে এগিয়ে এল।

“আমাদের কেউ মারে নাই…”
“আমাদের… জীবিত পুঁতে ফেলা হয়েছে…”

আমার মাথা ঘুরে উঠল।

“কে করেছে?”

সে থেমে গেল।

তার মাথা ধীরে ধীরে ঘুরল…
আর সে আঙুল তুলল—

আমার দিকে।

“তুমি।”

আমার বুক থেমে গেল।

“না… এটা মিথ্যা…”

“আমি কিছু করিনি!”

হঠাৎ আমার মাথার ভেতর প্রচণ্ড ব্যথা শুরু হলো।

একটার পর একটা ছবি ভেসে উঠতে লাগল—

আমি…
এই একই কবরস্থান…
রাত…

আমি একা না।

আমার সাথে আরও কয়েকজন।

আমরা মাটি খুঁড়ছি।

কেউ কাঁদছে—
“আমাকে ছাড়ো! আমি বাঁচতে চাই!”

আমরা শুনছি না।

আমরা তাকে ঠেলে দিচ্ছি গর্তে।

মাটি ঢেলে দিচ্ছি।

তার হাত উপরে উঠছে…
আমার হাত ধরে ফেলছে…

“বাঁচাও…”

আমি…
আমি তার হাত সরিয়ে দিচ্ছি।

মাটি চাপা দিচ্ছি।

তার চিৎকার বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

আমি মাটিতে পড়ে গেলাম।

“না… না… এটা আমি না…”

কিন্তু স্মৃতিগুলো থামছে না।

একজন না… দুইজন না…

অনেকজন।

আমরা…
লোকজন ধরে এনে…

জীবিত কবর দিতাম।

কারণ—

এই জমি আমাদের ছিল।

আমরা চেয়েছিলাম কেউ যেন এখানে না আসে।

আমরা ভয় তৈরি করেছিলাম।

কিন্তু…

যাদের পুঁতেছিলাম…

তারা মরে যায়নি।

তারা অপেক্ষা করছিল।

আমি মাথা তুলে তাকালাম।

সবাই… আমাকে ঘিরে দাঁড়িয়ে।

তাদের চোখ ফাঁকা…
কিন্তু তারা আমাকে দেখছে।

“এখন মনে পড়েছে?” — সে বলল।

আমি কাঁদতে লাগলাম।

“আমি… আমি ভুল করেছি…”

“আমাকে ক্ষমা করো…”

সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল।

“আমরা চেয়েছিলাম… কেউ আমাদের কথা শুনুক…”

“তুমি শুনেছিলে…”

“তাই তুমি ফিরে এসেছো…”

হঠাৎ সব হাত একসাথে আমার দিকে বাড়ল।

এইবার… আমি পালালাম না।

আমি বুঝে গিয়েছিলাম—

এটাই শেষ।

তারা আমাকে ধরে ফেলল।

ঠান্ডা, ভেজা হাত…
আমার শরীর জড়িয়ে ধরল।

ধীরে ধীরে… আমাকে মাটির দিকে টানতে লাগল।

আমি শেষবার আকাশের দিকে তাকালাম।

চাঁদটা মেঘে ঢেকে গেল।

চারদিক অন্ধকার।

মাটি আমার বুক ঢেকে ফেলল।

গলা… মুখ…

শ্বাস নিতে পারছি না।

আমি চিৎকার করতে চাইলাম—

কিন্তু গলা দিয়ে শুধু মাটি ঢুকছে।

শেষবার…

আমি শুনলাম—

“এখন… তুমি বুঝবে…”

অন্ধকার।

নিঃশ্বাস নেই।

শুধু চাপ…

মাটি…

আর অসংখ্য কণ্ঠ—

“এখানে… থাকো…”

পরদিন সকালে…

গ্রামের লোকজন দেখল—

একটা নতুন কবর।

কেউ জানে না কে।

কেউ নাম জানে না।

কবরের ওপর শুধু একটা দাগ।

নখ দিয়ে আঁচড়ানো।

ভেতর থেকে।

তারপর থেকে…

প্রতি রাতে…

সেই কবরস্থান থেকে কান্না শোনা যায়।

কিন্তু এখন…

একটা কণ্ঠ না।

দুইটা।

একটা পুরোনো…

আর একটা নতুন।

আর যদি কোনোদিন…
তুমি সেই কান্না শুনে ফেলো…

তাহলে মনে রেখো—

তারা শুধু ডাকছে না…
তারা অপেক্ষা করছে… তোমার জন্য।

Comments

    Please login to post comment. Login