ঘটনাটা আমার এক বড় ভাইয়ের সাথে ঘটেছিল। তিনি পেশায় একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। কাজের প্রয়োজনে তাকে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে বেড়াতে হয়। ঘটনাটা সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরের এক পরিত্যক্ত নীলকুঠির কাছের। তখন রাত আনুমানিক ২টা ৩০ মিনিট।
সেই নিস্তব্ধ প্রহর
বড় ভাই (যার নাম আমি গোপনেই রাখছি) সেদিন তার সাইট থেকে ফিরছিলেন। সাথে ছিল তার পুরোনো পালসার বাইকটা। কুয়াশা আর বৃষ্টির ছাঁটে রাস্তাটা প্রায় দেখাই যাচ্ছিল না। হঠাৎ নীলকুঠির মোড়টা পার হতেই তার বাইকটা কোনো কারণ ছাড়াই বন্ধ হয়ে গেল। চারপাশটা এত নির্জন যে নিজের হার্টবিট নিজেই শুনতে পাচ্ছিলেন তিনি। হঠাত করেই চারপাশের বাতাসটা কেমন যেন পচা ড্রেনের মতো গন্ধ হয়ে উঠল—ঠিক যেন মরা পশুর পচা মাংসের গন্ধ।
বড় ভাই যখন বাইকটা স্টার্ট দেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, ঠিক তখন রাস্তার পাশের বড় শ্যাওড়া গাছটার ওপর থেকে একটা ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ এল। তিনি টর্চটা জ্বালাতেই দেখলেন, কুচকুচে কালো একটা অবয়ব ডালের ওপর উল্টো হয়ে বসে আছে। তার হাত-পাগুলো অস্বাভাবিক লম্বা, ঠিক যেন মরা মানুষের হাড়ের ওপর চামড়া টেনে লাগানো। প্রাণীটার মুখ বলে কিছু নেই, শুধু যেখানে চোখ থাকার কথা, সেখানে দুটো গর্ত দিয়ে গলগল করে কালো আলকাতরার মতো কিছু একটা বের হচ্ছে।
সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, সেই প্রাণীটা এবার কথা বলতে শুরু করল। কিন্তু সেটা কোনো মানুষের গলা না। মনে হচ্ছিল যেন কয়েকশ মানুষ একসাথে গোঙাচ্ছে। সে বড় ভাইয়ের নাম ধরে ডাকল। "তোর ঘাড়ের রক্তটা কি খুব মিষ্টি?"—এই কথা বলে সে গাছ থেকে এক লাফে নিচে নামল। নামার সময় তার শরীরের হাড়গুলো কড়কড় করে ভাঙার শব্দ হলো।
ভাইয়া পালানোর চেষ্টা করলেন, কিন্তু তার পা দুটো যেন মাটির সাথে আটকে গেছে। প্রাণীটা যখন তার একদম সামনে এল, ভাইয়া দেখলেন ওর পেটের কাছটা চেরা, আর সেখান থেকে নাড়িভুঁড়িগুলো ঝুলছে। সে তার সেই লম্বা নখওয়ালা হাত দিয়ে ভাইয়ার গলার কাছে ধরল। ভাইয়া অনুভব করলেন ওর হাতটা বরফের চেয়েও ঠান্ডা।
ঠিক ওই মুহূর্তে ভাইয়া তার পকেটে থাকা একটা ছোট লোহার চাবি দিয়ে প্রাণীটার চোখে আঘাত করার চেষ্টা করেন। প্রাণীটা এক বিকট চিৎকার দিল—যে চিৎকারে মনে হলো পুরো আকাশটা ছিঁড়ে পড়বে। পরক্ষণেই চারপাশে একটা ধোঁয়াটে কুয়াশা তৈরি হলো। যখন কুয়াশা কাটল, তখন আর কেউ নেই। শুধু বড় ভাইয়ের জামার কলারটা ছিঁড়ে ঝুলে আছে আর সেখানে চারটা লম্বা নখের কালচে দাগ।
ভাইয়া কোনোমতে গ্রামে ফিরে আসেন। কিন্তু আসল ভয়টা শুরু হলো সাত দিন পর। ভাইয়া যখন আয়নার সামনে দাঁড়ালেন, দেখলেন তার কলারের সেই চারটা দাগ ধীরে ধীরে পচতে শুরু করেছে। ডাক্তাররা কোনো রোগ ধরতে পারল না। আর প্রতি রাতে তিনি শুনতে পান, তার জানালার ওপাশে সেই একই ফ্যাসফ্যাসে গলায় কেউ বলছে, "তোর রক্তটা আমি এখনো খাইনি... আমি আসছি।"
ভাইয়া আজ আর আমাদের মাঝে নেই। এক অমাবস্যার রাতে তার রুমের ভেতর থেকে তার আর্তনাদ শোনা গিয়েছিল। সকালে দরজা ভেঙে দেখা যায়, রুমের ভেতরটা রক্তে মাখামাখি, আর ভাইয়ার শরীরের সব হাড় এমনভাবে মচকানো যেন কেউ তাকে তুলাধুনো করেছে। কিন্তু সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, রুমের সব দরজা-জানালা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল।
এই কাহিনীটা কোনো ফিকশন হিসেবে না, বরং একটা অমিমাংসিত রহস্য হিসেবেই সবার কাছে থেকে গেছে। যারা একা রাতে এটা পড়ছেন, একবার আপনার পেছনের দরজাটা চেক করে নিন—সেটা কি সত্যিই বন্ধ আছে?