Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: শ্রেষ্ঠাংশে

April 4, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

210
View

[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]

বৈশাখ মাস শুরু না হওয়ার আগেই প্রতিদিন তুফানের মতো বাতাস ছুটে এসে বৃষ্টি নামাইতেছে। এখনো বসন্ত চলে। বারান্দায় ঘণ্টা খানিক আগে ফেলে আসা প্রখর রোদটা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বেমালুম উধাও হয়ে গেল। জানালা দিয়ে মেঘেদের মিছিলে চোখ রাখলো স্নেহা। থোকা থোকা মেঘেরা উড়ে এসে আকাশের ঠিক মাঝ বরাবর ভিড় করতেই অন্ধকার নেমে আসলো আসমান-জমিন, ভেতর-বাহিরের সবখানটাতে। খুব মনোযোগে মেঘেদের আলিঙ্গনে নেমে আসা আঁধার দেখতে দেখতে ওর মনে হলো- কেউ যেন আকাশের ওই বিশাল বুকটাতে একটা আস্ত স্নেহা এঁকে দিয়ে আসছে! নাকি আকাশটাই নিজ দায়িত্বে স্নো হোয়াইটের মিররের শ্রেষ্ঠাংশে অবতীর্ণ হয়ে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখাইতেছে স্নেহাকে?

অনেকদিন পর ‘শ্রেষ্ঠাংশ’ শব্দটা মনে পড়লো। বলা যেতে পারে, বহু বছর পর। নব্বই দশকের শুক্রবার বিকালগুলাতে মানুষের বাড়ি বাড়ি টেলিভিশন থেকে ফুল ভলিউমে ভেসে আসতো সিনেমার নানা সংলাপ। ছেলে থেকে বুড়া, জোয়ান থেকে গুঁড়া- ফ্যামিলির সবাই একসঙ্গে শুয়ে-বসে পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র দেখতো ঘরে ঘরে। তখনো অধিকাংশ মানুষের বাড়িতে সাদা-কালো টিভি ছিল। কারো বাড়িতে রঙিন টিভি থাকা মানেই বিরাট কিছু। দুইটার একটাও নাই, এমন বাড়ির সংখ্যাও নেহাৎ-ই কম ছিল না। ওইসব বাড়ির ‘বই’ পোকা সদস্যরা দুপুরের খাবার খেয়েই টেলিভিশনওয়ালা প্রতিবেশির বাড়িতে চলে যেতেন বই দেখার খায়েশে। স্নেহার দাদীর বয়সী মুরুব্বীরা সিনেমাকে ওই সময় 'বই' বলেই ডাকতেন। ‘বই’ ডাকার এই চল কি শুধু বিক্রমপুরবাসীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল কি না, তা অবশ্যই ওর জানা নাই। তবে দাদীর বয়সী ওই মুরুব্বিদের কাছে সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় ছিল নাগ-নাগিনী সর্বস্ব মিথোলজিক্যাল ‘বইগুলা’।

শুক্রবারের ওই বই শুরুর প্রথমেই বড় হরফে স্ক্রিনে লেখা থাকতো- ‘শ্রেষ্ঠাংশে’। এর নিচের নামগুলা একেক সময় আলমগীর থেকে শাবানা, রাজ্জাক থেকে ববিতা, গোলাম মোস্তফা থেকে সুজাতা, খলিল থেকে রওশন জামিল, আনোয়ার থেকে আনোয়ারা…নানা নামে বদল হতো। ওইখান থেকেই স্নেহার ‘শ্রেষ্ঠাংশ’র সঙ্গে পরিচয়। এক সময় নিজের শৈশবের কথা স্মরণ করলেই ও ট্রমাটাইজড হয়ে যেত। ইদানিং শৈশবের অনেক স্মৃতিই ওকে নস্টালজিক করে তোলে বলে মনে হলো। পুরানো ক্ষতের উপর নতুন দগদগে ক্ষত স্থান করে নেওয়ায় এমন ঘটতেছে কি না, কে জানে!  শৈশবের ওই সময়টায় আরো কিছুটা সময় থাকতে ইচ্ছা করলো ওর। ওই বয়স পর্যন্ত ভয়ানক ইনসিডেন্টগুলার সঙ্গে ওর পরিচয় না ঘটার কারণে হবে হয়তো। কতই বা বয়স হবে তখন? পাঁচ কী ছয়! নানীর বাড়ির তুলনায় দাদীর বাড়িতে গিয়ে থাকতে বেশি ভালো লাগতো ওর। যদিও ওই সুযোগ খুব কমই আসতো, আম্মার পারমিশনও মিলতো না তেমন।

নানীর বাড়িতে ওর টান ছিল একটাই- ছোট মামা। ছোট মামা বাসায় থাকলে কাঁধে চড়েই দিন পার হয়ে যেত ওর। মেজো মামা ছাড়া সব মামারাই ওকে ভীষণ আদর-স্নেহ দিছেন। ছোট মামা দিছেন সবচেয়ে বেশি। বড় মামাকে তেমন একটা কাছে পায় নাই। মেজো মামা ছিলেন প্রচণ্ড রগচটা লোক, কিন্তু উনিও আসলে আদরই করতেন। কিছু মানুষ বোধহয় আদর-ভালোবাসা এক্সপ্রেস করার কোমল ভাষাটাই জানে না। ঝাড়ি দিয়ে কথা বলাটাই তাদের আদর। বড় হতে হতে ও খেয়াল করছে- মেজো মামার নরমাল কথা বলার টোনটাই ঝাড়ির মতো। শুনলেই মনে হবে- বকাবকি করতেছেন। নানু বাড়ির সবাই নানাজানের পর মেজো মামাকে জমের মতো ভয় পেত। বাড়ির কোনো মেয়েরা ছাদে পর্যন্ত উঠতে পারতো না উনার ভয়ে। তখন এত বিল্ডিং ছিল না ঢাকা শহরে। স্নেহার নানু বাড়ি, আর উল্টা দিকে হালিম সাহেবের বাড়ি ছাড়া, পাঁচতলা আর কোনো বিল্ডিংই ছিল না ওই এলাকায়।

মালিবাগ বা চৌধুরীপাড়া থেকেও নানুবাড়ির বিল্ডিং দেখা যেত। মেজো মামা দূর থেকে যদি ভুলক্রমেও কখনো বাড়ির কোনো নারী সদস্যকে ছাদে আবিষ্কার করতেন, ওইদিন আর তার খাবার খাওয়া লাগতো না। উনার কথা শুনেই মোটামুটি পেট ভরে যেত। স্নেহা অবশ্য বুঝতে শেখার পর কারো গায়ে উনাকে হাত তুলতে দেখে নাই, তবে শুনছে। আগে নাকি ছোটখাটো অপরাধে তার কাছ থেকে চড়-থাপ্পর খাওয়া ছিল নিত্যদিনের বিষয়। আম্মাকে নাকি উনি একবার বেল্ট দিয়ে বেধড়ক পিটাইছিলেন আব্বার সঙ্গে কথা বলতে দেখার অপরাধে। তাও উনি নিজে দেখেন নাই। এলাকার কেউ তার কানে এই তথ্য পৌঁছাইছিলেন। বলা বাহল্য, আব্বা-আম্মা তখনও স্নেহার আব্বা-আম্মা হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন নাই বলেই এই মাইরটা আম্মাকে খাইতে হইছিল। ওই আমলে তাদের মতো সম্ভ্রান্ত পরিবারের মেয়ের এই রকম অপরাধ অমার্জনীয় হিসেবেই গণ্য করা হতো।

মিরপুরের দাদী বাড়ির পরিবেশটা ছিল নানী বাড়ির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সবাই একসঙ্গে এক বাড়িতেই ভিন্ন ভিন্ন ঘরে থাকতেছে। একই রান্নাঘর যেটাকে বলা হতো পাকের ঘর, সেখানে বাড়ির সবার জন্য রান্না চলতেছে। সবার জন্য একটাই কমন গোসলখানা ছিল, পাশেই ছিল একটা আলাদা টয়লেট। ওইটাই ব্যবহার করতে হতো সবাইকে। দাদীর বাড়ির ভেতরে ছিল বিশাল একটা নারিকেল আর বড়ই গাছ। বাইরে কূয়ার এক পাশে আরেকটা বড়ই গাছ, আর অন্য পাশে ছিল পেয়ারা গাছ। মগবাজারে নানী বাড়ির বিশাল বিল্ডিংয়ের তুলনায় মিরপুরের একতলা দাদীর বাড়িটা কম সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন হলেও ওইখানেই ওর বেশি আপন-আপন ফিল হতো। দাদী বাড়ির কাজিনগুলাও ছিল সব পিঠাপিঠি। বদ্ধ ফ্ল্যাটে একলা বড় হওয়া স্নেহার কাছে মিরপুরের বাড়িটা ছিল একটা ব্রিদিং স্পেস।

ওই পাঁচ-ছয় বছর বয়সে কোনো শুক্রবার যদি ওর মিরপুরে থাকা হতো, বিকাল হলেই বাইরের দিকের জানালাটায় দেখতো- গাদাগাদি করে মানুষের জটলা থেকে জোড়ায় জোড়ায় চোখ তাকিয়ে আছে ঘরের ভেতরে থাকা টেলিভিশন স্ক্রিনে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দিব্যি ওইখানে দাঁড়িয়ে সিনেমা দেখতো এলাকার বিভিন্ন বাড়ির বিভিন্ন বয়সী লোকজন, মিল্লাত ক্যাম্প থেকেও আসতো বিহারী ভাষাভাষী বিভিন্ন বয়সী নারী-শিশুরা। যাদের ওই বাড়িতে একটু বেশি এক্সেস ছিল, তারা দাঁড়াতো বাড়ির ভেতরে সিনেমা চলতে থাকা ঘরের দরজার বাইরে। এরচেয়ে সামান্য বেশি যাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল, তারা জায়গা পেত ঘরের দরজার ভেতর অব্দি, তবে বিছানা পর্যন্ত না, নিচে। বিছানায় উঠার মতো ঘনিষ্ঠদের বাড়িতে ততদিনে সাদা-কালো, কোনো না কোনো একটা হলেও টিভি মজুদ ছিল। স্নেহার দাদী বাড়িতে ছিল রঙিন টিভি। ওদের বাড়িতেও তাই। যদিও ওদের ফ্ল্যাটে সিনেমা দেখতে কেউই ভিড় জমাতো না।

ওরা তখন ইস্কাটনের মতো পশ এলাকায় থাকে। ওই এলাকায়, বিশেষ করে স্নেহাদের বিল্ডিং-এ টেলিভিশনবিহীন পরিবার ছিল বলে ওর মনে পড়ে না। বরং বিল্ডিংয়ের ছাদে নাট্যশিল্পী দম্পতি ফেরদৌসী আর রামেন্দু মজুমদারের ফ্ল্যাটের জন্য বিশাল সাইজের একটা ডিশ অ্যান্টেনা লাগানো ছিল। উনারা দোতলায় থাকতেন, স্নেহারা তিনতলায়। স্নেহাদের টিভির সঙ্গে সংযুক্ত অ্যান্টেনা দুইটা একটু নাড়াচাড়া করলে মাঝে মাঝে ঝির ঝির স্ক্রিনে কলকাতার দূরদর্শন চ্যানেলের শব্দ শোনা যেত। এর কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য ওদের বাসাতেও ডিশ অ্যান্টেনারের লাইন চলে আসে। এরও বহু আগে নানীর বাড়ির ডিশ লাইনে এটিএন নামের একটা চ্যানেল দেখার কথা ওর মনে পড়ে। এটিএন বাংলা না, হিন্দি এটিএন। বাংলাদেশে তখনো বিটিভি ছাড়া অন্য কোনো চ্যানেলের জন্ম হয় নাই।

হিন্দি এটিএনে সারাদিনই একটার পর একটা গান চলতে থাকতো। বিশেষ করে ঋষি কাপুর আর দিব্যা ভারতীর একটা গান জাতীয় সংগীতের মতো সারাদিন ননস্টপ বাজতে থাকতো কিছুক্ষণ পর পরই। এত উইয়ার্ড ছিল গানটা। অফকোর্স নব্বই দশক মানেই কুমার শানু! শুধু অনুরাধা পাড়োয়ালের জায়গায় ওই গানের নারী কণ্ঠে ছিলেন অলকা ইয়াগনিক। গানটার শুরুর দৃশ্যে ঋষি কাপুর একটা পায়েল হাতে নিয়ে দিব্যা ভারতীকে বলেন- “পায়েলিয়া...হো হো হো”...এর পর মুহূর্তেই একটা উঁচু পাহাড়ের উপর তাকে দেখা যায় অসংখ্য হলুদ লেহেঙ্গা পরিহিত নারীদের মাঝখানে নাচতে নাচতে আরো দেড় মিনিট “পায়েলিয়া হো হো হো”-ই বলে যাইতেছেন!

ডিশের লাইন না থাকা পরিবারগুলার জন্য বিটিভি ছিল তখন একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম। কোথাও কেউ নেই, অয়োময় আর সংশপ্তকের মতো নাটকগুলা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলাতে বেশ জনপ্রিয় ছিল। হাতে হাতে তখন স্মার্টফোন তো দূরের কথা, মোবাইল ফোনই ছিল না। অধিকাংশ মানুষ ল্যান্ডলাইনের ফোন ব্যবহার করতেন। সেটাও ছিল না অনেক বাড়িতে। জীবন তাই আজকের মতো অস্থির আর যান্ত্রিক ছিল না। বাড়ির সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার রেওয়াজটা যেমন তখন ছিল, একসঙ্গে বসে বিটিভির নাটকের পাশাপাশি ইত্যাদি আর ছায়াছন্দের মতো অনুষ্ঠানগুলার জন্যও সবাই অপেক্ষায় থাকতো প্রতি মাসে। নব্বই-ই সম্ভবত পারিবারিক ও সামাজিক সৌহার্দ্যতার শেষ দশক ছিল। এখন আমরা পাশের ফ্ল্যাটে বাস করা পরিবারে কয়জন সদস্য আছে, অথবা তাদের নাম-পরিচয়ই বা কী, সেটাও জানি না। মানুষ-মানুষে এখন যোজন যোজন দূরত্ব। এমন কী একসঙ্গে একই ছাদের নিচে থাকা মানুষরাও কেউ কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে খোঁজ করাকে ডিস্টার্বেন্স ভেবে এড়ায়ে যায় অনেক সময়।

আকাশে মেঘের ভারী গর্জনের শব্দে নব্বই দশক থেকে ছিটকে বসুন্ধরার এই অন্ধকারাচ্ছন্ন কোজি ফ্ল্যাটের বাস্তবতায় ফিরতে হলো স্নেহাকে। মেঘেরা ক্রমাগত এমনভাবে ডাকতেছে যেন তারা বিশেষ কাউকে এই ডাক শোনানোর কোনো বিশেষ প্রকল্প হাতে নিছে। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি ডাক শুনলেই কেবল তাদের ওই তর্জন-গর্জন কমবে, এর আগে থামবে না কিছুতেই। ওরা মাইন্ড করেও এভাবে গর্জন শুরু করতে পারে, স্নেহা ভাবলো! আকাশের বিশাল ক্যানভাসে আঁকা নিজের চিত্রকর্ম দেখে অথবা আকাশ নিজেই নিজের বুকটাকে আয়না বানিয়ে স্নেহাকে ওর ভেতর-বাহির সব দেখিয়ে দিতেছে, অথচ ও ওইটা পাত্তা নিয়ে দিয়ে পড়ে আছে ৪০ বছর আগের মেমোরিতে! এই ইগনোরেন্স সম্ভবত বিশাল হৃদয়ের অধিকারী আকাশের দম্ভে হালকা আঘাত করছে। কিন্তু স্নেহা পাত্তাই বা কেন দেবে? ও তো স্নো হোয়াইট না, ওর জীবনটাও কোনো রূপকথা না! এমন কী পৃথিবীর দিকে মুখ করে ঝুলে থাকা ওই বিশাল আয়না চরিত্রটার কাছে ও জানতেও চায় নাই- মিরর, মিরর অন দ্য হাই, হু ইজ দ্য ডার্কেস্ট অফ দেম অল? তারপরও দ্য ডার্কেস্ট সৌল অফ দ্য ওয়ার্ল্ডকে কেন জোরজবরদস্তি নিজের রেপ্লিকার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে হবে? আকাশের দিকে আরেকবার তাকিয়ে ওর উপলব্ধি হলো- জগতে কালো অনেককিছুই সুন্দর। অন্ধকারও মায়াবী হয়ে উঠে মাঝে মাঝে। কিন্তু স্নেহার যে প্রতিচ্ছবি ওকে এখন দেখানো হইতেছে, তাতে মায়ার ছিটেফোঁটাও নাই। পুরাটাই ভয়ংকর, একইসঙ্গে কদর্যও! ও আরেকবার দেখার জন্য তাকাতেই আকাশের বুক ভেঙেচুরে নেমে এলো- বৃষ্টি।

৭২ ঘণ্টা! ঠিকঠাক হিসাব করলে অবশ্য ঘণ্টার হিসাব আরেকটু বাড়ার কথা। তিন রাতের হিসাব করতেছে বলে ও বায়াত্তরেই আটকে আছে। নিদ্রাহীন সময়ের হিসাব রাখাটাকে ওর হার্ডওয়্যার অর্থাৎ মস্তিষ্ক অতো গুরুত্বপূর্ণ ভাবতেছে না হয়তো। এইজন্যই এই বিষয়ে পূঙ্খানুপুঙ্খ ডিটেলিংয়ে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করে নাই। এটা হার্ডওয়্যারের প্রায়োরিটি লিস্টে এনলিস্টেডই না হয়তো। তারও তো নিজস্ব প্রায়োরিটি লিস্ট থাকতেই পারে, হোক না হয় সে স্নেহার শরীরের একটা অংশ মাত্র। দিলের উপর যদি তার হুকুমতের ক্ষমতা না থাকে, দিমাগকেও তো নিজের পছন্দে কিছু করতে দেওয়া উচিত ওর, স্নেহা ভাবে। দিমাগের যদি এই বিনিদ্র যাপনকে ইম্পোর্টেন্স মনে হতো, সে নিজেই এতক্ষণে পাই পাই ক্যালকুলেট করে ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ড পর্যন্ত আপডেট দিয়ে দিতো। কমবখত সফটওয়্যার কোমায় চলে যাওয়াতে বেচারা হার্ডওয়্যারের উপর বেশ চাপ পড়ে যাইতেছে। নিজের মস্তিষ্কের প্রতি ও সহমর্মী হয়ে উঠলো হঠাৎ করে। যদিও হৃদয় আর ব্রেইনের এমন নামকরণে নিজেকে ওর উইন্ডোজ ৯৮ ফিল হওয়া শুরু হইছে- অচল, অকার্যকর আর ব্যাকডেটেড!

এত সুন্দর সুন্দর বিশেষণে কী ভাবলেশহীনভাবে শরীরের বিভিন্ন অংশকে ও ডেকে যাইতেছে! গতকাল পর্যন্তও নিজের প্রতি এক ধরনের মায়া ও ফিল করতে পারতেছিল। মনে করার চেষ্টা করে আবারও- ইয়েস! মস্তিষ্কে হালকা চাপ দিয়ে নিশ্চিত হয়। কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের প্রতি কোনো ধরনের মায়া-মহব্বতই ও আর ফিল করতেছে না লাগলো। এই ফিল করতে না পারাটা কি সাময়িক? নাকি ৯৯ বছরের জন্য লিজ নিয়ে বসত গড়ছে- এ বিষয়ে বিস্তারিত ভাবার মতো এনার্জি পাওয়া গেল না শরীরে। আহারে- মুখ থেকে শব্দটা বের হতেই ও হেসে দিলো। নাহ, নিজের জন্য পুনরায় মায়া উথলে পড়ার কারণে সশব্দে ও এমন আহারে' বলে উঠে নাই। যেকোনো কিছুর প্রতি মায়া বোঝাতে আবির এই শব্দটা ঠিক একই রকম টোনেই প্রতিবার বলে উঠতো। এখনো হয়তো বলে। স্নেহা তো আর এখন শুনতে পারতেছে না, তাই পাস্ট টেন্সে ঘটনার রেফারেন্স টানাটাই গ্র্যামাটিক্যালি ওর কারেক্ট মনে হলো।

কিন্তু আবিরের ওই টোনটা হঠাৎই ওর কানে ওই একই টোনে জীবন্ত হয়ে বাজলো মনে হতেই ও ফয়েল পেপার খোঁজা শুরু করে। হাতে নিয়েও অনেকক্ষণ যাবত এই-সেই ভাবনায় ফয়েল পেপারটা বারবার নিচে রেখে দিতেছিল সেই সকাল থেকে। ওর কানে মাত্র বেজে উঠা শব্দের উৎস খুঁজতে, কিংবা এই উদ্ভট ঘটনার ব্যবচ্ছেদ করার জন্য তিন রাত নির্ঘুম মস্তিষ্ককে চাপ দিতে ইচ্ছা করলো না। এরচেয়ে ফয়েল পেপারে অপেক্ষারত অর্ধ গলিত মিষ্টিটাকে পুনর্বার বিগলিত হতে দেওয়াই ওর উত্তম মনে হলো। তাতে মস্তিষ্কও বরং কিছুটা আলোড়িত বোধ করবে। দীর্ঘ এক টানে ফয়েল পেপারের এপার থেকে সম্পূর্ণ ওপার গিয়ে কোনো বিরতি ছাড়াই সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিয়ে আবার ওপার থেকে চলে আসলো এইপারে। এই পারাপারে, মুহূর্তেই আবছা আলো-ছায়ার ঘরটা সম্পূর্ণ ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠলো।

স্নেহা থেমে দম নেয়। হালকা একটা কাশির দমক সামলিয়ে কপাল থেকে চোখ পর্যন্ত বেঁকে নেমে আসা চুলটাকে সরানোর সময় নিজের শরীরটায় প্রচণ্ড ঠান্ডা ফিল হলো ওর। একটা লম্বা দম নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পর চোখটা বন্ধ করে মিনিট খানিক নীরবে বৃষ্টির শব্দ শোনার চেষ্টা করলো নীরব থেকে। যথারীতি মস্তিষ্ক ওকে হতাশ করলো না। ওই নীরবতার মুহূর্তে ধোঁয়ার স্পর্শে আলোড়িত মস্তিষ্ক গভীর আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো- একটু আগে পাস্ট টেন্স থেকে টেনে আনা ওই আহারের মায়াটা কেন বিদায়পূর্ব আবিরের মধ্যে বিন্দুমাত্রও দেখা গেল না? স্নেহা কি ওর কাছে এতটাই অসহনীয় ছিল? মস্তিষ্কের আচানক এমন প্রশ্নে ও অপ্রস্তুত একটা হাসি মুখে আনার চেষ্টা করতে গিয়েই উত্তর সাজিয়ে নেয়- ও আগে নির্দয় হইছে বলে আবিরও হইছে হয়তো! ওর অ্যাক্টটাকে আবির হয়তো বিশ্বাসঘাতকতা, আঘাত বা আক্রমণ হিসেবে কাউন্ট করছে। বিশ্বাসঘাতকতা কিংবা আঘাতের জবাবে পাল্টা আঘাত করেই ও হিসাব ক্লোজ করতে চাইছে সম্ভবত। যদি তাই চেয়ে থাকে, ওর পরিকল্পনা মোতাবেক অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে ও তা করতে পারছে!

স্নেহার যুক্তিতে মস্তিষ্ক বেশ রসিকতার সঙ্গেই আবার বলে- বাহ! মানুষের সাইকোলজি বেশ মজার আছে! ভালোবাসার রেসিপ্রোকেট করতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়া ব্যক্তি আঘাতের রেসিপ্রোকেটে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপন করে না। সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রচণ্ড নির্দয়ভাবে পাল্টা আঘাতটা ঠিকই করে! মস্তিষ্কের এসব কথার ফাঁদে এই মুহূর্তে পা দিতে গেলে ১৭ মার্চ রাতে আবিরের সঙ্গে ৭৫ মিনিটের ফোন কনভার্সেশনটা এখন ওকে মনে করতে হবে। এই মুহূর্তে ওইটা নিজেকে রিমান্ডে নিয়ে উল্টা করে বেঁধে পেটানোর মতোই ফিলিং দেবে ওকে। মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো আবার। মাথার ডান পাশে কেমন যেন ব্যথাও ফিল হইতেছে। সামনের বারান্দাটা ঝাপসা লাগলো চোখে। চোখ বন্ধ করে মাথার দুই পাশ হাত দিয়ে কিছুক্ষণ চেপে ধরে একদম নিশ্চুপ বসে থাকলো ও। কোনো ভাবনা না, কোনো চিন্তা না, কোনো প্রশ্ন না, কোনো উত্তর অথবা যুক্তি-তর্কও না। সাইলেন্ট…শ্‌শ্‌শ্‌। ধীরে ধীরে পুরাপুরি নিস্তব্ধতায় নিজের গহীনে ঢুকে গিয়ে ও নীরব বসে থাকে নিজের সঙ্গে।

বেশ অনেকটা সময় এভাবেই কাটানোর পর মেঘের ঘন ঘন গর্জনের শব্দে চোখ খুলে তাকালো। পুরা বিষয়টা বেশ একটা ধ্যানের ফিল দিলো ওকে। নিজেকে কিছুটা শান্ত লাগে, কিছুটা ক্লান্তও। বৃষ্টি এখনো থামে নাই। ফোনটা হাতে নিয়ে ওর আঙুল ঘুরতে থাকে স্পটিফাইয়ের “আমোন” প্লেলিস্টে। বাগধারার প্রতিচ্ছবি গানটা প্লে করে আবারও চোখ বন্ধ করে থাকলো একইভাবে। তবে এবার ও বাইরের বৃষ্টির শব্দও শুনতে পারলো, ভেতরের ধ্যানে তা সমস্যা করতেছে না। গানের প্রতিটা শব্দও শুনতে পারতেছে বেশ শান্ত মনে-

ভেসে আসো তুমি আমার স্বপনে
আঁধারের কালো অন্ধকারে
মরি আমি তোমার নেশায়
তোমার ছবি এঁকে যাই…

ওই নীরবতার মধ্যেই স্নেহার মনে পড়ে- বিদায় পর্বে শেষবারের মতো আবির ওকে কিছু বলার জন্য রিকোয়েস্ট করতেছিল। ওই রিকোয়েস্টে যথেষ্ট আন্তরিকতাও ছিল, নিঃসন্দেহে। যদিও এর আগ পর্যন্ত পুরা কনর্ভাসেশনেই ওর টোন ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। স্নেহার কিছু বলার ছিল না আসলে। ওর কিছুই বলার নাই জানানোর পরও আবির আবার কিছু বলার জন্য রিকোয়েস্ট করে। শেষ পর্যন্ত ও বলে, তবে আবিরকে অ্যাড্রেস করে না। ফোন কলের কনফারেন্সে তৃতীয় আরেকজন ওই বিদায়ের সাক্ষী হয়ে ছিলেন- স্নেহার থেরাপিস্ট আবরার। তাকে অ্যাড্রেস করেই ও বলে- উনি (আবির) যেন আর কোনোদিন, কোনো পরিস্থিতিতেই আমার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করেন। দুই বছরে অসংখ্যবার রাগ করে, জেদ দেখিয়ে, অভিমানে এ কথা আবিরকে বহুবার শোনালেও, সম্ভবত ওই রাতেই ও প্রথম মিন করে বলছিল।

একটা দীর্ঘশ্বাসের ভেতর ওই রাতের পুরা কনভার্সেশনটা মনে পড়ার আগে বৃষ্টির আর গানের শব্দে আবারও মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে ও-

যদি কোনোদিন ভুল করে মনে পড়ে যায়
স্মৃতির পাতায় খুঁজে পাই,
যদি কোনোদিন মেঘের ভাঁজে তোমাকে হারাই
বৃষ্টির শব্দে খুঁজে যাই…

চেজিং দ্য ড্রাগন: হিজ এক্সিলেন্সি

Comments

    Please login to post comment. Login