Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: শ্রেষ্ঠাংশে

April 4, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

123
View

বৈশাখ মাস শুরু না হতেই প্রায় প্রতিদিনই তুফানের মতো বাতাস এসে বৃষ্টি নামতেছে। এখনো বসন্ত চলে। বারান্দায় ঘণ্টা খানিক আগে ফেলে আসা প্রখর রোদটা অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই বেমালুম উধাও হয়ে গেল। জানালা দিয়ে মেঘেদের মিছিলে চোখ রাখলো স্নেহা।

থোকা থোকা মেঘেরা উড়ে এসে আকাশের ঠিক মাঝ বরাবর ভিড় করতেই অন্ধকার নেমে আসলো আসমান-জমিন, ঘর আর বাহিরের সবখানটাতে। খুব মনোযোগে মেঘেদের আলিঙ্গনে নেমে আসা আঁধার দেখতে দেখতেই স্নেহার মনে হলো- কেউ যেন আকাশের ওই বুকটাতে একটা আস্ত স্নেহা এঁকে দিয়ে আসছে! নাকি আকাশটাই নিজ দায়িত্বে স্নো হোয়াইটের মিররের শ্রেষ্ঠাংশে অবতীর্ণ হয়ে স্নেহাকে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখাচ্ছে?

অনেকদিন পর ‘শ্রেষ্ঠাংশ’ শব্দটা মনে পড়লো। বলা যেতে পারে বহু বছর পর। নব্বই দশকে শুক্রবার বিকালে মানুষের বাড়ি বাড়ি টেলিভিশন থেকে ফুল ভলিউমে ভেসে আসতো সিনেমার নানা সংলাপ। ছেলে থেকে বুড়া, জোয়ান থেকে গুঁড়া- ফ্যামিলির সবাই একসঙ্গে শুয়ে-বসে পূর্ণদৈর্ঘ্য বাংলা চলচ্চিত্র দেখতো।

তখনো অধিকাংশ মানুষের বাড়িতে সাদা-কালো টিভি। কারো বাড়িতে রঙিন টিভি থাকা মানে বিরাট কিছু। দুইটার একটাও নাই, এমন বাড়ির সংখ্যাও নেহাৎ-ই কম ছিল না। এসব বাড়ির ‘বই’ পোকা সদস্যরা দুপুরের খাবার খেয়েই টেলিভিশনওয়ালা প্রতিবেশির বাড়িতে চলে যেতেন।

স্নেহার দাদীর বয়সী মুরুব্বীরা সিনেমাকে 'বই' বলেই ডাকতেন ওই সময়। তাদের সবচেয়ে বেশি আকর্ষণ ছিল নাগ-নাগিনীর সাপের বইগুলাতে। শুক্রবারের ওই বই শুরুর প্রথমেই বড় হরফে ‘শ্রেষ্ঠাংশে’ লেখা থাকতো, এর নিচের নামগুলা একে একে আলমগীর থেকে শাবানা, খলিল থেকে আনোয়ারা…নানা নামে বদল হতো। ওইখান থেকেই স্নেহার শ্রেষ্ঠাংশের সঙ্গে পরিচয়।

এক সময় নিজের শৈশবের কথা স্মরণে করলেই ট্রমাটাইজড হয়ে যেত স্নেহা। ইদানিং শৈশবের অনেক স্মৃতিই তাকে নস্টালজিক করে তোলে বলে মনে হলো তার। পুরানো ক্ষতের উপর নতুন দগদগে ক্ষত স্থান করে নেওয়ায় এমন ঘটতেছে কি না, কে জানে!  শৈশবের ওই সময়টায় আরেকটু থাকতে ইচ্ছা করলো স্নেহার। তখনও ভয়ানক ইনসিডেন্টগুলার সঙ্গে ওর পরিচয় হয় নাই, তাই হয়তো।

বয়স কত হবে তখন? পাঁচ কী ছয় বছর। নানীর বাড়ির তুলনায় দাদীর বাড়িতে গিয়ে থাকতে বেশি ভালো লাগতো ওর। তবে ওই সুযোগ কমই হতো। আম্মার অনুমতিও মিলতো না। নানীর বাড়ির টান ছিল একটাই- ছোট মামা। ছোট মামা বাসায় থাকলে তার কাঁধে চড়েই দিন পার হয়ে যেত স্নেহার। মেজো মামা ছাড়া সব মামারাই আদর করতো ওকে, ছোট মামা সবচেয়ে বেশি। বড় মামাকে সে তেমন পায় নাই।

মেজো মামাও আসলে আদরই করতেন। কিছু মানুষ বোধহয় আদর-ভালোবাসা এক্সপ্রেস করার কোমল ভাষাটাই জানে না। ঝাড়ি দিয়ে কথা বলাটাই তাদের আদর। বড় হতে হতে স্নেহা খেয়াল করছে, মেজো মামার নরমাল কথা বলার টোনটাই এই রকম। শুনলেই মনে হবে বকাবকি করতেছেন। নানু বাড়ির সবাই নানাজানের পর মেজো মামাকে জমের মতো ভয় পেত। তার ভয়ে বাড়ির কোনো মেয়েরা ছাদে পর্যন্ত উঠতে পারতো না।

তখন এত বিল্ডিং ছিল না। স্নেহার নানু বাড়ি আর উল্টা পাশে হালিম সাহেবের বাড়ি ছাড়া পাঁচতলা আর কোনো বিল্ডিংই ওই এলাকায় ছিল না। মালিবাগ বা চৌধুরীপাড়া থেকেও নানুবাড়ির বিল্ডিং দেখা যেত। মেজো মামা দূর থেকেও যদি ভুলক্রমে বাড়ির কোনো মেয়েকে কখনো ছাদে আবিষ্কার করতেন, ওইদিন তার আর খাবার খাওয়া লাগতো না। মেজো মামার কথা শুনেই মোটামুটি পেট ভরে যেত।

স্নেহা অবশ্য বুঝতে শেখার পর মেজো মামাকে কারো গায়ে হাত তুলতে দেখে নাই, তবে শুনছে। আগে নাকি ছোটখাটো অপরাধে তার কাছ থেকে চড়-থাপ্পর খাওয়া ছিল নিত্যদিনের বিষয়। আম্মাকে নাকি সে বেল্ট দিয়ে বেধড়ক পিটাইছিলেন আব্বার সঙ্গে কথা বলতে দেখার অপরাধে। তাও উনি নিজে দেখেন নাই। এলাকার কেউ মেজো মামার কানে এই তথ্য পৌঁছাইছিলেন। বলা বাহল্য, আব্বা-আম্মা তখনও স্নেহার আব্বা-আম্মা হওয়ার আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করেন নাই! ওই আমলে আম্মার মতো সম্ভ্রান্ত ফ্যামিলির মেয়ের এই অপরাধ অমার্জনীয় হিসেবেই গণ্য হতো।

মিরপুরের দাদী বাড়ির পরিবেশটা ছিল নানী বাড়ির চেয়ে সম্পূর্ণ আলাদা। সবাই একসঙ্গে এক বাড়িতেই ভিন্ন ভিন্ন ঘরে থাকতেছে। একই রান্নাঘর যেটাকে বলা হতো পাকের ঘর, সেখানে রান্না করতেছে৷ বাড়ির সবার জন্য একটাই গোসলখানা, আরেকটা আলাদা টয়লেট ছিল। দাদী বাড়ির ভেতরে বিশাল একটা নারিকেল আর বড়ই গাছ ছিল। বাইরেও কূয়ার এক পাশে আরেকটা বড়ই গাছ, অন্য পাশে পেয়ারা গাছ। 

মগবাজারে নানী বাড়ির বিশাল বিল্ডিংয়ের তুলনায় একতলা মিরপুরের দাদী বাড়িটাতে কম সুযোগ-সুবিধা সম্পন্ন থাকলেও ওইখানেই স্নেহার বেশি আপন-আপন ফিল হতো। দাদী বাড়ির কাজিনগুলাও ছিল সব পিঠাপিঠি। মিরপুরের বাড়ি তাই বদ্ধ ফ্ল্যাটে একলা বড় হওয়া স্নেহার কাছে ছিল একটা ব্রিদিং স্পেস। ওই পাঁচ-ছয় বছর বয়সে কোনো শুক্রবার যদি মিরপুরে থাকা হতো, বিকাল হলেই বাইরের দিকের জানালাটায় স্নেহা মানুষের জটলা লেগে থাকতে দেখতো। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দিব্যি ওইখানে দাঁড়িয়ে সিনেমা দেখতো এলাকার অনেকেই। যাদের ওই বাড়িতে একটু বেশি এক্সেস ছিল, তারা দাঁড়াতো বাড়ির ভেতরে যেই ঘরটায় সিনেমা চলতেছে, ওই ঘরের দরজার কাছে।

এরচেয়ে সামান্য বেশি যাদের ঘনিষ্ঠতা ছিল, তারা জায়গা পেত ঘরের দরজার ভেতর অব্দি, তবে বিছানা পর্যন্ত না। বিছানায় উঠার মতো ঘনিষ্ঠদের বাড়িতে ততদিনে সাদা-কালো টিভি হলেও মজুদ ছিল। স্নেহার দাদী বাড়িতে তখন রঙিন টিভি ছিল। স্নেহাদের বাড়িতেও তাই। যদিও স্নেহাদের বাসায় সিনেমা দেখতে কেউ ভিড় জমাতো না।

ওরা তখন ইস্কানের মতো পশ এলাকায় থাকে। ওই এলাকায়, বিশেষ করে স্নেহাদের বিল্ডিং-এ টেলিভিশন বিহীন পরিবার ছিল বলে তার মনে পড়ে না। বরং বিল্ডিংয়ের ছাদে নাট্যশিল্পী দম্পতি ফেরদৌসী আর রামেন্দু মজুমদারের বিশাল সাইজের একটা ডিশ অ্যান্টেনা লাগানো ছিল।

উনারা দোতলায় থাকতেন, স্নেহারা তিনতলায়। স্নেহাদের টিভির সঙ্গে সংযুক্ত অ্যান্টেনা দুইটা একটু নাড়াচাড়া করলে মাঝে মাঝে ঝির ঝির স্ক্রিনে কলকাতার দূরদর্শনের শব্দ শোনা যেত। এর কিছুদিনের মধ্যেই অবশ্য স্নেহাদের বাসাতেও ডিশ অ্যান্টেনার লাইন চলে আসে।

এরও বহু আগে নানী বাড়ির ডিশ লাইনে এটিএন নামের একটা চ্যানেল দেখতো স্নেহা। এটিএন বাংলা না। হিন্দি এটিএন। বাংলাদেশে তখন বিটিভি ছাড়া কোনো চ্যানেলের জন্ম হয় নাই। হিন্দি এটিএনে সারাদিনই একটার পর একটা গান দেখাতো। বিশেষ করে ঋষি কাপুর আর দিব্যা ভারতীর একটা গান জাতীয় সংগীতের মতো বাজতেই থাকতো কিছুক্ষণ পর পর। এত উইয়ার্ড ছিল গানটা।

অফকোর্স নব্বই দশক মানেই কুমার শানু, শুধু অনুরাধা পাড়োয়ালের জায়গায় নারী কণ্ঠে ছিলেন অলকা ইয়াগনিক। গানের শুরুর মুহূর্তে ঋষি কাপুর একটা পায়েল হাতে নিয়ে দিব্যা ভারতীকে বলে “পায়েলিয়া...হো হো হো”...এর পর মুহূর্তেই একটা উঁচু পাহাড়ের উপর তাকে দেখা যায় অসংখ্য হলুদ লেহেঙ্গা পরিহিত নারীদের মাঝখানে নাচতে নাচতে আরো দেড় মিনিট “পায়েলিয়া হো হো হো”-ই গাইতেছেন৷

ডিশের লাইন না থাকা পরিবারগুলার জন্য তখন বিটিভিই ছিল একমাত্র বিনোদনের মাধ্যম। কোথাও কেউ নেই, অয়োময় আর সংশপ্তকের মতো নাটকগুলা শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পরিবারগুলাতে বেশ জনপ্রিয় ছিল। হাতে হাতে স্মার্টফোন দূরের কথা, মোবাইল ফোন তখন ছিল না।

অধিকাংশ মানুষ ল্যান্ডলাইনের ফোন ব্যবহার করতো, সেটাও ছিল না অনেক বাড়িতে। জীবন তাই আজকের সময়ের মতো অস্থির আর যান্ত্রিক ছিল না। বাড়ির সবাই মিলে একসঙ্গে বসে খাবার খাওয়ার রেওয়াজটা যেমন তখন ছিল। একসঙ্গে বসে বিটিভির নাটকের পাশাপাশি ইত্যাদি আর ছায়াছন্দের মতো অনুষ্ঠানগুলার জন্যও সবাই অপেক্ষায় থাকতো।

নব্বই-ই সম্ভবত পারিবারিক ও সামাজিক সৌহার্দ্যতার শেষ দশক ছিল। এখন আমরা পাশের ফ্ল্যাটে বাস করা পরিবারে কয়জন সদস্য আছে অথবা তাদের নাম-পরিচয়ই বা কী, সেটাও জানি না। মানুষ মানুষে এখন যোজন যোজন দূরত্ব। এমন কী, একসঙ্গে একই ছাদের নিচে থাকা মানুষরাও কেউ কারো ব্যক্তিগত ব্যাপারে খোঁজ করাকে ডিস্টার্বেন্স ভেবে এড়ায়ে যায়।

আকাশে মেঘের ভারী গর্জনের শব্দে নব্বই দশক থেকে ছিটকে বসুন্ধরার এই অন্ধকারাচ্ছন্ন কোজি ফ্ল্যাটের বাস্তবতায় ফিরতে হলো স্নেহাকে। মেঘেরা ক্রমাগত এমনভাবে ডাকতেছে যেন তারা বিশেষ কাউকে এই ডাক শোনানোর জন্যই ডেকে যাইতেছে। কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি ডাক শুনলেই তাদের তর্জন-গর্জন কমে যাবে।

ওরা মাইন্ড করেও এভাবে গর্জন শুরু করতে পারে, স্নেহা ভাবলো! আকাশের বিশাল ক্যানভাসে আঁকা নিজের চিত্রকর্ম দেখে অথবা আকাশ নিজেই তার বুকটাকে আয়নায় বানিয়ে স্নেহাকে ওর ভেতর-বাহির সব দেখিয়ে দিলো, অথচ সে ওইটা পাত্তা নিয়ে দিয়ে পড়ে ছিল ৪০ বছর আগের মেমোরিতে!

কিন্তু স্নেহাই বা পাত্তা কেন দেবে? সে তো স্নো হোয়াইট না, তার জীবনটাও কোনো রূপকথা না। এমন কী পৃথিবীর দিকে মুখ করে ঝুলে থাকা ওই বিশাল আয়না চরিত্রটার কাছে সে জানতেও চায় নাই- মিরর, মিরর অন দ্য হাই, হু ইজ দ্য ডার্কেস্ট অফ দেম অল? তারপরও দ্য ডার্কেস্ট সৌল অফ দ্য ওয়ার্ল্ডকে কেন জোরজবরদস্তি নিজের রেপ্লিকার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে হবে?

আকাশটায় আরেকবার তাকানোর পর স্নেহার উপলব্ধি হলো, জগতে কালো অনেককিছুই সুন্দর, অন্ধকারও মায়াবী হয়ে উঠে মাঝে মাঝে। কিন্তু স্নেহার যে প্রতিচ্ছবি তাকে এখন দেখানো হইতেছে, তাতে মায়ার ছিটেফোঁটাও নাই। পুরাটাই ভয়ংকর, একইসঙ্গে কদর্যও! সে আরেকবার দেখার জন্য তাকাতেই আকাশের বুক ভেঙেচুরে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেল।

৭২ ঘণ্টা! ঠিকঠাক হিসাব করলে অবশ্য ঘণ্টার হিসাব এখন আরো বাড়ার কথা, স্নেহা ভাবে। তিন রাতের হিসাব করতেছে বলে সে বায়াত্তরেই আটকে আছে। নিদ্রাহীন সময়ের হিসাব রাখাটাকে স্নেহার হার্ডওয়্যার অর্থাৎ মস্তিষ্ক অতো গুরুত্বপূর্ণ ভাবতেছে না হয়তো, এইজন্যই এই বিষয়ে পূঙ্খানুপুঙ্খ ডিটেলিংয়ে যাওয়ার প্রয়োজন বোধ করে নাই। এটা তার প্রায়োরিটি লিস্টে এনলিস্টেডই না হয়তো।

তারও তো নিজস্ব প্রায়োরিটি লিস্ট থাকতেই পারে, হোক না হয় সে স্নেহার শরীরের অংশ। দিলের উপর তার হুকুমতের ক্ষমতাই না থাকে, দিমাগকেও তো নিজের পছন্দে কিছু করতে দেওয়া উচিত তার, স্নেহা ভাবে। দিমাগের যদি এই বিনিদ্র যাপনকে ইম্পোর্টেন্স মনে হতো, সে নিজেই এতক্ষণে পাই পাই ক্যালকুলেট করে ঘণ্টা, মিনিট, সেকেন্ড পর্যন্ত আপডেটেড ভার্সন দিয়ে দিতো।

কমবখত সফটওয়্যার কোমায় চলে যাওয়াতে বেচারা হার্ডওয়্যারের উপর বেশ চাপ পড়ে যাইতেছে। স্নেহা নিজের মস্তিষ্কের প্রতি সহমর্মী হয়ে উঠলো হঠাৎ করে। যদিও এর মুহূর্তেই হৃদয় আর ব্রেনের এমন নামকরণে নিজেকে তার উইন্ডোজ ৯৮ ফিল হওয়া শুরু হলো- অচল, অকার্যকর আর ব্যাকডেটেড!

এত সুন্দর সুন্দর বিশেষণে নিজেকে খুব ভাবলেশহীনভাবেই তুলনা করলো স্নেহা। গতকাল পর্যন্ত নিজের প্রতি সে একটা মায়া ফিল করতে পারতেছিল। স্নেহার মনে করার চেষ্টা করে আবারও। ইয়েস! মস্তিষ্কে হালকা চাপ দিয়ে নিশ্চিত হয়। তার মনে হয়, এই মুহূর্তে সে নিজের প্রতি কোনো মায়া আর ফিল করতেছে না। এই না করতে পারাটা কি সাময়িক, নাকি ৯৯ বছরের জন্য লিজ নিয়ে বসত গড়ছে, এ বিষয়ে বিস্তারিত ভাবার মতো এনার্জি পাওয়া গেল না শরীরে।

আহারে! মুখ থেকে শব্দটা বের হতেই হেসে দিলো স্নেহা। নাহ, তার নিজের জন্য পুনরায় মায়া উথলে পড়ার কারণে সে সশব্দে 'আহারে' বলে উঠে নাই। আবির যেকোনো কিছুর প্রতি ওর মায়া বোঝাতে এই শব্দটা প্রতিবার ঠিক একই টোনে বলতো। এখনো হয়তো বলে। স্নেহা তো আর এখন শুনতে পারতেছে না, তাই পাস্ট টেন্সে ঘটনার রেফারেন্স টানাটাই গ্র্যামাটিক্যালি ওর কারেক্ট মনে হলো।

কিন্তু আবিরের ওই টোনটা হঠাৎই স্নেহার কানে একই উচ্চারণে জীবন্ত হয়ে বাজলো মনে হতেই স্নেহা ফয়েল পেপারটাকে খোঁজা শুরু করলো। অনেকক্ষণ যাবত হাতে নিয়েও বারবার এই-সেই ভাবনায় আবার নিচে রেখে দিচ্ছিল সেই সকাল থেকে। মাত্র শোনা শব্দের উৎস খুঁজতে কিংবা এই উদ্ভট ঘটনার ব্যবচ্ছেদ করার জন্য তিন রাত নির্ঘুম মস্তিষ্ককে চাপ দিতে ইচ্ছা করলো না তার। এরচেয়ে ফয়েল পেপারে অপেক্ষারত অর্ধ গলিত মিষ্টিটাকে পুনর্বার বিগলিত হতে দেওয়া যেতে পারে। তাতে মস্তিষ্কও বরং কিছুটা আলোড়িত বোধ করবে।

দীর্ঘ এক টানে ফয়েল পেপারের এপার থেকে সম্পূর্ণ ওপার গিয়ে কোনো বিরতি ছাড়াই আবার সঙ্গে সঙ্গে ঘুরিয়ে ওপার থেকে এপারে আসতেই আবছা আলো-ছায়ার ঘরটা ধোঁয়ায় পরিপূর্ণ হয়ে গেল। স্নেহা দম নিলো। হালকা একটা কাশির দমক সামলিয়ে কপাল থেকে চোখ পর্যন্ত বেঁকে নেমে আসা চুলটাকে সরানোর সময় নিজের সারা শরীরে প্রচণ্ড ঠান্ডা ফিল হলো তার।

যথারীতি মস্তিষ্ক তাকে হতাশ করলো না। একটা লম্বা দম নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার পর চোখটা বন্ধ করে মিনিট খানিক নীরবে বৃষ্টির শব্দ শুনতে থাকলো সে। ওই নীরবতার মুহূর্তেই ধোঁয়ার স্পর্শে আলোড়িত মস্তিষ্ক গভীর আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলো- একটু আগে পাস্ট টেন্স থেকে টেনে আনা ওই আহারের মায়াটা কেন বিদায়পূর্ব আবিরের মধ্যে বিন্দুমাত্র দেখা গেল না? স্নেহা তার কাছে কি এতটাই অসহনীয় ছিল?

মস্তিষ্কের আচানক এমন প্রশ্নে স্নেহা অপ্রস্তুত হাসির চেষ্টায় বলে-  সে এর আগে নির্দয় হইছে বলে আবিরও হইছে হয়তো। তার অ্যাক্টটাকে আবির হয়তো আঘাত বা আক্রমণ হিসেবে কাউন্ট করছে। আঘাতের জবাবে পাল্টা আঘাত দিয়েই হিসাব ক্লোজ করতে চাইছে সে। তার পরিকল্পনা মোতাবেক অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে সে তা করতে পারছে।

স্নেহার যুক্তিতে মস্তিষ্ক বেশ রসিকতার সঙ্গেই স্নেহাকে বলে উঠে- বাহ! মানুষের সাইকোলজি বেশ মজার আছে! ভালোবাসার রেসিপ্রোকেট করতে না পেরে কান্নায় ভেঙে পড়া ব্যক্তি আঘাতের রেসিপ্রোকেটে বিন্দুমাত্র কালক্ষেপন করে না। সমস্ত শক্তি দিয়ে প্রচণ্ড নির্দয়ভাবে পাল্টা আঘাতটা ঠিকই করে!

মস্তিষ্কের এসব কথার ফাঁদে এই মুহূর্তে পা দিতে গেলে ১৭ মার্চ রাতে আবিরের সঙ্গে ৭৫ মিনিটের ফোন কনভার্সেশনটা এখন তাকে মনে করতে হবে। এই মুহূর্তে ওইটা নিজেকে রিমান্ডে নিয়ে উল্টা করে বেঁধে পেটানোর মতোই ফিলিং দেবে।

মাথাটা চক্কর দিয়ে উঠলো আবার। মাথার ডান পাশটায় একটা ব্যথাও ফিল করতেছে। সামনের বারান্দাটাও ঝাপসা লাগলো চোখে। চোখ বন্ধ করে মাথার দুই পাশে হাত দিয়ে চেপে কিছুক্ষণ একদম নিশ্চুপ বসে থাকলো। কোনো ভাবনা না, কোনো চিন্তা না, কোনো প্রশ্ন না, কোনো উত্তর অথবা যুক্তি-তর্কও না। সাইলেন্ট…শ্‌শ্‌শ্‌…ধীরে ধীরে সে পুরাপুরি নিস্তব্ধতায় নিজের গহীনে ঢুকে গিয়ে নীরব বসে থাকে নিজের সঙ্গে।

বেশ অনেকটা সময় এভাবেই কাটে। আবারও মেঘের ঘন ঘন গর্জনে চোখটা খুললো। বেশ একটা ধ্যানের ফিল দিলো পুরা বিষয়টা। নিজেকে কিছুটা শান্তও লাগতেছে স্নেহার, কিছুটা ক্লান্তও। বৃষ্টি এখনো থামে নাই। ফোনটা হাতে নিয়ে তার আঙুল ঘুরতে থাকে স্পটিফাইয়ের “আমোন” প্লে লিস্টে। বাগধারার প্রতিচ্ছবি গানটা প্লে করে আবারও একইভাবে চোখ বন্ধ করে থাকলো। তবে এবার বাইরের বৃষ্টির শব্দ সে শুনতে পারতেছে, ভেতরের ধ্যানে তাতে সমস্যা করলো না। গানটাও সে শুনতে পারতেছে বেশ শান্ত মন নিয়ে-

ভেসে আসো তুমি আমার স্বপনে
আঁধারের কালো অন্ধকারে
মরি আমি তোমার নেশায়
তোমার ছবি এঁকে যাই…

ওই নীরবতার মধ্যেই স্নেহার মনে পড়ে, বিদায় পর্বে শেষবারের মতো আবির ওকে কিছু বলার জন্য রিকোয়েস্ট করতেছিল। ওই রিকোয়েস্টে যথেষ্ট আন্তরিকতাও ছিল। যদিও এর আগ পর্যন্ত পুরা কনর্ভাসেশনে ওর টোন ছিল সম্পূর্ণ বিপরীত। স্নেহার কিছু বলার ছিল না আসলে। সে কিছু বলেও না। কিছু বলার নাই বলার পরও আবির আবার রিকোয়েস্ট করে।
 

স্নেহা শেষে বলে। তবে আবিরকে অ্যাড্রেস করে না। ফোন কলের কনফারেন্সে তৃতীয় আরেকজন এই বিদায়ের সাক্ষী হয়ে ছিল- স্নেহার থেরাপিস্ট আবরার। স্নেহা তাকে বলতে থাকে- উনি যেন আর কোনোদিন আমার সঙ্গে কোনো ধরনের যোগাযোগ না করে। দুই বছরে অসংখ্যবার রাগ করে, জেদ দেখিয়ে, অভিমানে আবিরকে এ কথা বহুবার বলছে স্নেহা, কিন্তু সম্ভবত ওই বারই প্রথম মিন করে বলছে। একটা দীর্ঘশ্বাসের ভেতরই ওই রাতের পুরা কনভার্সেশন মনে পড়ার আগে বৃষ্টি আর গানটায় আবার মনোযোগ দেওয়ার চেষ্টা করে সে-

যদি কোনোদিন ভুল করে মনে পড়ে যায়
স্মৃতির পাতায় খুঁজে পাই,
যদি কোনোদিন মেঘের ভাঁজে তোমাকে হারাই
বৃষ্টির শব্দে খুঁজে যাই…


 

চলবে…

Comments

    Please login to post comment. Login