আমার বড়মামা বাংলাদেশের কিংবদন্তী চিকিৎসকদের একজন। বেচারার কপাল খারাপ, নিজে যে রোগের ডাক্তার; তার মা সে রোগে ভুগছে। বেচারা খুব অসহায়ের মত বাংলাদেশের সবচেয়ে সেরা চিকিৎসক, প্রফেসর ডাক্তার এবিএম আবদুল্লাহকে মায়ের চিকিৎসায় ধরে এনেছেন।
প্রফেসর আবদুল্লাহ নিজের রোগী ছাড়া অন্যকে দেখতে কোথাও যান না। নানু যে হাসপাতালে ছিলেন, সেখানে বাহির থেকে চিকিৎসককে ডেকে আনা যায় না। মামার জন্যে সব নিয়ম থেমে গেল। করিডরের দেয়ালে পিঠ ঠেকিয়ে তিনি অ্যামেরিকা, ইংল্যান্ড, সিঙ্গাপুরের সবচেয়ে সেরা ডাক্তারদের সাথে ভিডিও কলে যোগাযোগ করছেন। যোগাযোগ করছেন বললে ভুল হবে, তিনি ভিডিও কলে চিৎকার করে হাউ-মাউ করে কাঁদছেন। চোখের সামনে মা মারা যাচ্ছে, সে কিচ্ছু করতে পারছে না। দুনিয়ার ডাক্তাররা করিডরে ভিড় করেছে। কারো মুখে কোন কথা নাই। মামা হু-হু করে কাঁদতে কাঁদতে ফ্লোরে শুয়ে পড়লেন। সান্ত্বনা দিতে কেউ যে আগাবে, সে সাহস কারো ছিল না।
পরে জেনেছি, দূর থেকে দেখলেও ডাক্তাররা আন্দাজ করতে পারেন, রোগীর আর কতটা সময় বাকি আছে …
প্রফেসর আবদুল্লাহ মুখে মাস্ক লাগিয়ে রোগী দেখতে ঢুকলেন। আমার নানীর জবান প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। তার খুব একটা হুশও ছিল না। কখনো কথা বলতে পারেন, প্রায় সময়ই পারেন না। তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হচ্ছে, যাতে শরীরের কষ্ট কমে।
প্রফেসর আবদুল্লাহ তার কপালে হাত রেখে বললেন, ‘খালাম্মা আমরা আছি। আপনি ঠিক হয়ে যাবেন …’
ডাক্তারদের সান্ত্বনা দিতে হয়। এটা অমন এক সান্ত্বনাই ছিল।
অক্সিজেন মাস্ক খুলে নানু অল্প করে তার দিকে তাকালেন। ভাবলেশহীন চোখে বললেন, ‘ আমারে ছেড়ে দাও বাবা। আমার সময় শেষ …’
প্রফেসর আব্দুল্লাহ চুপ করে দাড়িয়ে থাকেন। দুনিয়াতে আর কোন চিকিৎসা নাই এই রোগীকে দেয়া যায়। তিনি হাতের ঘড়ি দেখলেন। সময় না আমার নানীর আয়ু – কে জানে !
খুব দুর্বল হাতে নানী তার হাত ধরার চেষ্টা করলেন।
- আমার ভাই কই?
- সবাই বাহিরে আছে খালাম্মা
- গোসল কইরলে ওয় গা মুছে না। জ্বর হয়। তোমরা তারে দেইখো। তার কেউ নাই …
প্রফেসর আবদুল্লাহ খুব অবাক হন। এটাই আমার নানীর বলা শেষ কথা ছিল। ২৫ মিনিট পরে তাকে ভেন্টিলেটরে নেয়া হয়। তিনি আর সেখান থেকে ফিরে আসেন নি।
প্রফেসর আবদুল্লাহ নিয়মিত সে নাতীর খোজ খবর রাখেন।
নানীর বলা শেষ কথাটা জীবনে ফলেছে। যার কেউ নেই, তার ফেরার কোন ঘরও হয় না। মানুষের সমুদ্রে ঢেউ গোনা নাতীটার, তাই শেষ ট্রেনে ফেরার কোন তাড়া থাকে না। ধুলা জমা গায়ে, আমি এখন স্নান করি জোছনায় – আমার তাই জ্বরও আর আসে না …
- রাকীবামানিবাস
৪ঠা এপ্রিল, ২০২৬
