Posts

চিন্তা

তিথিরা কেন পারছেন না? ব্রেকিং পয়েন্ট ও কর্পোরেট জীবনের গল্প।

April 6, 2026

Samshed Ali

16
View
তিথি

১৯৮৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে এক প্রতিভাবান প্রভাষক যোগ দিলেন। সামাজিক মর্যাদা, আর্থিক নিশ্চয়তা আর উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ সবই ছিল হাতের মুঠোয় — কিন্তু কয়েক বছর পর তিনি এমন এক পথে হাঁটা শুরু করলেন, যার সাথে রসায়নের কোনো সম্পর্কই নেই। কেন তিনি সেই নিশ্চিত জীবনের মায়া ছাড়লেন?


কারণ, সেই প্রতিভাবানের মাথায় তখন অন্য এক ভাবনা কাজ করছিল। ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে তিনি নোটবুক বের করে শব্দ টুকতেন। দিনভর ভিড় করা বিচিত্র সব চরিত্রদের নির্জন রাতের টেবিলে জীবন্ত করে তুলতেন। জীবনের এক পর্যায়ে সেই প্রভাষক থেকে অধ্যাপক, রসায়ন ছেড়ে পুরোদস্তুর সাহিত্যে মনোনিবেশ করলেন এবং হয়ে উঠলেন সবার প্রিয় হুমায়ূন আহমেদ।


তিথির ধূসর বর্তমান
কিন্তু ধানমন্ডির আটপৌরে তিথি ইসলামের চিত্রটা একদম ভিন্ন। ২৮ বছর বয়সী বিবাহিতা এই তরুণী গুলশানের একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেন। দিনশেষে অন্তহীন ট্রাফিক জ্যাম, শব্দদূষণ, ভ্যাপসা গরম, ধুলোবালি পেরিয়ে যখন বাসায় ফেরেন, তখন ক্লান্ত দেহ-মনে অনেক রাত — আর তার মাথায় বিশ্রামের বদলে ঘুরতে থাকে রাতের মেন্যু কিংবা পরেরদিনের বাজারের ফর্দ।


ঘর এবং বাহির — এই দুই ফ্রন্টে সমানতালে লড়তে গিয়ে তিথি আসলে এক অন্তহীন ক্লান্তির আবর্তে আটকে পড়েছেন, যেখানে ক্যারিয়ারের স্বপ্নগুলো ফিকে হয়ে আসে পারিবারিক দায়বদ্ধতার ভিড়ে।
দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির বাজারে প্রায়ই তার মন বিদ্রোহ করে বসে। তিথি ইসলাম ভাবতে থাকেন — 'এই চক্র থেকে মুক্তির উপায় কী? তিনি কি ব্রেক নিয়ে চাকরি ছেড়ে দেবেন?'


ব্র্যাকের চিফ পিপল অ্যান্ড কালচার অফিসার মৌটুসী কবীর বলেন, 'আমরা স্কুল ড্রপআউটের কথা বলি, কিন্তু ক্যারিয়ার ড্রপআউটও হয়। এটি মূলত নারীদেরই বেশি প্রভাবিত করে।' তিনি আরো বলেন, 'প্রতিষ্ঠানকে অবশ্যই কর্মীর শারীরিক স্বাস্থ্যের মতোই মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।'


তিথির মতো গুলশান, মতিঝিল বা উত্তরার কর্পোরেট অফিস থেকে শুরু করে দেশের আনাচে-কানাচে মাঠ পর্যায়ে ছড়িয়ে থাকা বিক্রয় প্রতিনিধি — সবার মনেই চাকরি সংক্রান্ত এই নিত্য দ্বন্দ্বের সুর একইভাবে বাজতে থাকে, কোনো সুরাহা ছাড়াই।


ADB-র সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশে অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মসংস্থানের হার প্রায় ৮৯%। ডেইলি স্টারের প্রতিবেদন বলছে, মাত্র এক-পঞ্চমাংশ কর্মী আনুষ্ঠানিক মজুরি কর্মসংস্থানে আছেন এবং তাদের মধ্যে ৪০ শতাংশেরও কম লিখিত চুক্তিতে কাজ করেন — নেই পেনশন, নেই মানসিক স্বাস্থ্যসেবা। চাকরি ছাড়া বা বদলানোর পেছনে এই অনিশ্চয়তাগুলোও বড় রকমের ভূমিকা পালন করে থাকে।


'ব্রেকিং পয়েন্ট' ও বাঁচার লড়াই
চাকরি করতে গিয়ে তিথির মতো কোনো ব্যক্তির ভেতরের ক্লান্তি যখন বাইরের সব কারণকে ছাড়িয়ে যায়, তখন মানুষ ব্রেকিং পয়েন্টে পৌঁছায়। মনোবিজ্ঞানীরা এই অবস্থাকেই বলেন 'ব্রেকিং পয়েন্ট'।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মেহতাব খানম বলেন: "মানুষ যখন অনুভব করে তার কাজের কোনো অর্থ নেই, কেউ তার মূল্য দিচ্ছে না, তখন শুধু বেতনের জন্য টিকে থাকাটা এক ধরনের মানসিক নির্যাতনে পরিণত হয়। তখন চাকরি বদলানো আর পলায়ন নয় — এটা আসলে বাঁচার চেষ্টা।"


পালানো বনাম ছুটে চলা
হুমায়ূন আহমেদের ব্রেকিং পয়েন্টটা এসেছিল ধীরে ধীরে। আমেরিকা থেকে পিএইচডি করে ফিরে তিনি বোর্ডে রসায়নের সমীকরণ লিখতেন ঠিকই, কিন্তু তাঁর মাথায় ঘুরঘুর করতে থাকা হিমু, মিসির আলিরা তাঁকে ভিন্ন জগতে নিয়ে যেতেন। তিনি শুধু চাকরি থেকে পালাননি, বরং তাঁর স্বপ্নের দিকে ছুটেছিলেন — যে পথ ইতোমধ্যে তিনি সমান্তরালভাবে রচনা করেছিলেন। এখানেই হুমায়ূনের সাথে তিথিদের মৌলিক পার্থক্য।
ড. মেহতাব খানম এ জায়গায় সবাইকে সতর্ক করে দেন — "নিজেকে প্রশ্ন করতে হবে, আমি কি চাকরি বদলাচ্ছি নাকি নিজেকে? অনেকে এক খাঁচা থেকে অন্য খাঁচায় যায়। ঠিকানা বদলায়, কিন্তু সমস্যা একই থাকে।"


হুমায়ূনের পায়ের নিচে জমানো মাটি ছিল; তাঁর পাঠক ছিল তৈরি। কিন্তু তিথিরা সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগেন কারণ তাদের পথ জানা নেই। জানেন না কোনো বিকল্প। তারা প্রতি মাসে বিডিজবস চেক করেন, দু-একটা আবেদন করেন, আবার সেই পুরনো ডেস্কেই ফিরে যান। যদিও বা দৈবাৎ ঠিকানা বদলায়, সমস্যা বদলায় না।


নিজেকে খোঁজার মানচিত্র
জাপানিরা এই সমস্যার উত্তর খুঁজেছে দুটো ধারণায় — ইকিগাই আর কাইজেন। ইকিগাই মানে 'বেঁচে থাকার কারণ'। জাপানিরা বিশ্বাস করেন, প্রতিটি মানুষের ভেতরে চারটে জিনিসের এক মোহনা থাকে — তুমি কী ভালোবাসো, তুমি কীসে ভালো, পৃথিবীর কী দরকার, আর কোন কাজে তুমি বাঁচতে পারবে। এই চারটের সংযোগস্থলেই লুকিয়ে আছে তোমার ইকিগাই। হুমায়ূন আহমেদ সচেতনভাবে না হলেও সেই মোহনাটা খুঁজে পেয়েছিলেন। তিথিরা এখনো পথ হাতড়াচ্ছেন।


আর কাইজেন হলো ক্ষুদ্র, অবিরাম উন্নতির দর্শন। বড় লাফ না দিয়ে প্রতিদিন একটু একটু করে এগোনো। হুমায়ূন এক রাতে রসায়নের অধ্যাপক থেকে ঔপন্যাসিক হননি। বছরের পর বছর, নোটবুকের পাতায় পাতায়, শব্দের পর শব্দ সাজিয়ে তিনি নিজের পৃথিবী তৈরি করেছিলেন। তিথিদের জন্য বার্তাটা এখানেই — চাকরি ছেড়ে দেওয়ার আগে নিজের ভেতরে একটু উঁকি দাও। বিকল্প পথটা আগে তৈরি করো, তারপর পুরনো পথ ছাড়ো।


একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন
হুমায়ূন একটি প্রজন্মের কল্পনার জগত গড়েছেন। আর তিথি? তিনি আজও ফিরতি পথে নিজেকে প্রশ্ন করেন — 'আমি কি আসলে এই কাজের জন্যই জন্মেছিলাম?'
উত্তরটা সহজ নয়। কিন্তু এই প্রশ্নটা না করলে জীবন কেবল একটা রুটিনে পরিণত হয়। সকালে ওঠা, অফিস যাওয়া এবং ঘুমানো। বছর ঘুরে বছর যায়, জীবন বদলায় না।


চাকরি পাল্টানো পরাজয় নয়। কিন্তু নিজেকে না চিনে কেবল কর্মস্থল বদলানো মানে হলো কেবল ঠিকানা পরিবর্তন — জীবন নয়। হুমায়ূন রসায়নের ক্লাসে বসেও জানতেন তিনি আসলে কে। তিথিকেও সেই উত্তরটা খুঁজতে হবে — অফিসের বাইরে, ট্রাফিক জ্যামের শোরগোলের বাইরে, নিজের সবচেয়ে নিরিবিলি মুহূর্তে।


আপনি কি আপনাকে খুঁজে পেয়েছেন — নাকি শুধু ঠিকানা বদলেছেন?

Comments

    Please login to post comment. Login