Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: হিজ এক্সিলেন্সি

April 7, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

89
View

সকাল গড়াতে গড়াতে দুপুর চলে আসলেও আকাশের মন খারাপ থামতেছে না। কোনো এক তুমুল দুঃখ বোধে অঝোর ধারায় কেঁদেই যাইতেছে। মনে হইতেছে, এই কান্না বোধহয় আর কোনোদিন থামার চেষ্টাও করবে না। একটা আমৃত্যু শোকে ডুবে এভাবেই কাটিয়ে দেবে বাকিটা জীবন। কাঁদুক, ক্রন্দনরত আকাশে চোখ রেখে স্নেহার মনে হয়- কাঁদলে যদি আকাশের মন খারাপ কমে! থামতে বলার সে-ই বা কে! আসলেই কি কমে? তারও কি এখন মন খারাপ হইতেছে- স্নেহা বোঝার চেষ্টা করে।

বোঝার ওই চেষ্টার সামনে কিছু একটা এসে বারবার ভাবনাগুলাকে আটকে দিতেছে লাগে। একটা ব্লার ইমেজ, সামনে কুয়াশা, না কি মেঘ? ঝড়ে অ্যান্টেনা নড়ে গিয়ে দূরদর্শনের স্ক্রিনের মতো কিছুটা ঝির ঝির, কিছুটা আবার হঠাৎ হঠাৎ শর্ট সার্কিটের মতো স্পার্ক করতেছে। একটা কালো পর্দার মতো কিছু একটা সামান্য নেমে আসতেছে আকাশ থেকে। পুরাপুরি নামতেছে না, ঝুলে থাকতেছে। মাথাটা সোজা করে রাখা যাচ্ছে না আর। স্নেহা কয়েকবার চেষ্টা করে। কিছু একটা এই চেষ্টার সামনেও এসে আটকে দিতে চাইতেছে।

কফি বানানোর পর সকাল থেকে ফ্লোরের যেইখানটাতে বসেছিল, ওইখানেই স্নেহা খুব ধীরে ধীরে শুয়ে পড়লো, নাকি ওর শরীর নিজ থেকেই ঢলে পড়লো- পার্থক্য বোঝা গেল না। সমস্ত বুঝতে চাওয়ার মাথার উপর ঝুলতেছে ওই কালো পর্দাটা। এত তীব্র বাতাসেও পাহাড়ের মতো স্থির-অবিচল। না নিচে নামার তাড়া আছে কোনো, না নিজেকে পুরাপুরি উপরে গুটায়ে নেওয়ার! স্নেহাও তো এমনই, মাকড়শার জালের মতো একটা সূক্ষ সুতার উপর ঝুলে আছে স্থির। একটু এদিক-সেদিকে হলেই গভীর খাঁদ তাকে গিলে ফেলতে প্রস্তুত হয়ে আছে দুই পাশ থেকে। এই ভারী কালো পর্দা কি নিচে নেমে আসবে পুরাপুরি?

কিছু একটা কানের কাছে শব্দ করতেছে অনেকক্ষণ ধরে। ঝির ঝির, ব্লার, শর্ট সার্কিট আর অল্প ঝুলে থাকা কালো পর্দার দৃশ্যকল্প এড়ায়ে কান দুইটা সজাগ করে শোনার চেষ্টা করে। স্পটিফাইতে কি আর “আমোন” প্লেলিস্টটা বাজতেছে না? কানে পৌঁছানো শব্দে কিছুই স্পষ্ট বোঝা গেল না। কোন গানটা যেন বাজতেছিল শেষে? সঙ্গে তো বৃষ্টির শব্দও ছিল। স্নেহা ভাবে, ভাবা প্র্যাক্টিস করার উপদেশ মানতে চায় ঋত্বিক ঘটকের। আবারও কান থেকে মনোযোগ সরে গিয়ে কিছু একটা স্পার্ক করে ওঠে চোখের সামনে।

ঝির ঝির স্ক্রিনটা সরে গিয়ে চোখের সামনে ভাসলো একটা ভাইটাল সাইন মনিটর। ছোট ছোট ঢেউয়ের মতো পালস রেট উঠা-নামা করে পার হয়ে যাইতেছে, ফিরে আসতেছে আবার। কোনো বিপ বিপ সাউন্ড কোথাও তো শোনা যাচ্ছে না তবু! আবারও কান দুইটাকে সজাগ করার প্রচেষ্টা চালায় স্নেহা। সবশেষে যেন কোন গানটা বাজতেছিল? ভাবে…ঋত্বিক ঘটক তো ভাবার প্র্যাক্টিসের কথাই বলে গেছিলেন। কিন্তু স্নেহার জীবনটাও কি মেঘে ঢাকা তারা? সেও কি নীতার মতো সত্যি সত্যিই বাঁচতে চেয়েও যন্ত্রণা ভোগ করে মরে যাইতেছে?

অনেক চেষ্টাতেও মস্তিষ্কের সিগনাল পাওয়া যাচ্ছে না। জায়গায় জায়গায় ভাবনারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে এলোমেলো আর অসম্পূর্ণ রাখতেছে শব্দ-দৃশ্যগুলা। হ্যালো…হ্যালো…ওয়ান…টু…থ্রি…মাইক্রোফোন টেস্টিং বললে মস্তিষ্ক সজাগ হবে? কোথাও একটা তীব্র ভাইব্রেশন হইতেছে। শরীরের ভেতর না বাইরে? স্নেহা কনক্রিট কিছু মনে করার চেষ্টা করে- একটা পুরা বাক্য, একটা সম্পূর্ণ দৃশ্য অথবা একটা মিনিংফুল শব্দ। অস্পষ্ট, ভাসা ভাসা কিছু শুনতে পায় মনে হয়- এ---জ ই---উ লা--ই--ক ই---ট! আরেকবার শোনা যায়, কিছুটা স্পষ্ট এবার- এ-জ ই-উ লা-ই-ক ই-ট! 

ভেজা মাটির গন্ধ এসে নাকে লাগে সঙ্গে সঙ্গে। চোখে কিছুটা আলোও এসে পড়লো। কানে বৃষ্টির টিপ টিপ শব্দ স্পষ্ট। একটু আগে শোনা এজ ইউ লাইক ইট স্পষ্টভাবে মস্তিষ্কের সিগনাল ধরতেই স্নেহা পাখির মতো মুখস্ত বললো- “অল দ্য ওয়ার্ল্ড’স অ্যা স্টেজ, অ্যান্ড অল দ্য মেন অ্যান্ড উইমেন মেয়ারলি প্লেয়ার্স; দে হ্যাভ দেয়ার এক্সিটস অ্যান্ড দেয়ার এন্ট্রান্সেস…”। একটা পুরা শেক্সপিয়র! মস্তিষ্ক সজাগ! স্নেহা কি এতক্ষণ মরে যাওয়ার ভয় পাইতেছিল? চেতন ফিরতেই রসিকতা করলো নিজের সাথে- উহুঁ! সে ভয় পাইতেছিল মস্তিষ্কের সৈয়দ মীর জাফর আলী খান হওয়ার আশঙ্কাকে। যদিও দিস লাইফ নাউ ফিলস লাইক অ্যা লিভিং মমি!

প্রচণ্ড ক্লান্ত শরীরটাকে স্নেহা টেনে বসিয়ে দেড় লিটারের পানির বোতল শেষ করালো কয়েক মিনিটের মধ্যে। ফোনটা ভাইব্রেট করে ওঠতেই আবরারের নাম ভেসে আসলো স্ক্রিনে। স্নেহা টের পেলো, তার মস্তিষ্ক ইজ ব্যাক ইন অ্যাকশন! আবরারের নামটা দেখেই তীব্র গতিতে একটা তীক্ষ্ম প্রশ্ন ছুটে আসছে মাথার ভেতরে। কিন্তু এই প্রশ্ন বেচারা আবরারকে করে কোনো লাভ আছে?

সে তো উত্তর দেবে ক্লিনিক্যালি, যতটুকু জ্ঞান তার পড়াশোনা আর অভিজ্ঞতা দিছে, সেই আলোকে। এমন উত্তর তো নিজের সঙ্গে যুক্তি-তর্ক করে স্নেহা নিজেও বের করতে পারে। কিন্তু ওইগুলা কিছুই তো আসল উত্তর হবে না। আসল উত্তরটা তো কেবল দিতে পারবেন- হিজ এক্সিলেন্সি! দ্য গ্রেট বব মার্লের কথা মনে পড়ে গেল স্নেহার- “দ্য বিগেস্ট কাওয়ার্ড ইজ আ ম্যান হু অ্যাওয়েইকেন্স অ্যা ওম্যান’স লাভ উইদাউট দ্য ইনটেনশন অফ লাভিং হার।” হা হা হা!

কিন্তু এরপর পরই মনে পড়লো ৭৫ মিনিটের সেই শেষ কদর্য কথোপকথন! একটা আদ্যোপান্ত বোধ-বুদ্ধি সম্পন্ন, শিক্ষিত, বিচক্ষণ এবং দেশের সবচেয়ে স্বনামধন্য বাহিনীর অন্যতম একজন অফিসার নাকি প্রথম একটা বছর বোঝেনই নাই স্নেহা তাকে ভালোবাসে। ওইটা না বুঝেই সে বারবার দেখা করতে আসছেন ওই সময়। মজার বিষয় স্নেহা ওই সময় তাকে দেখা করতে বা কথা বলতে বলেই নাই কখনো, নিজে থেকে কোনো সময় টেক্সটও করে নাই। 

উনি একবার বলেন, স্নেহা ভালো ফিল করতো বলে তখন উনি দেখা করতে আসতেন। এরপর আবার বলেন, তার স্নেহার সঙ্গে গল্প করতে ভালো লাগতে বলে আসতেন। সবচেয়ে মজার বিষয়- হিজ এক্সিলেন্সি নাকি ভয়ে আসতেন, ভয়েই সবকিছু করতেন! শেষ পর্যন্ত তো শুধু ওইটাই উনি এস্ট্যাবলিশ করতে চাইছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পারেন নাই। স্নেহা বুঝতেই পারে না এমন গোবর মার্কা ব্রেইন নিয়ে উনি কীভাবে এই পজিশনে গেছেন!

উনি ‘ভয়ে হয়তো সব করছেন’- এই ফালতু যুক্তিটা তো স্নেহা তাকে বাঁচাতে আরেক জায়গায় দিছিল। সেটাকে উনি ক্যাশ করে স্নেহাকেই শেষদিন শুনাইছে। ক্যায়া বাত! অথচ স্নেহা বারবার, বহুবার, লাগাতার তার কাছে এই ভয় সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে প্রশ্ন করছে। হিজ এক্সিলেন্সি প্রতিবারই বলছেন- এক সময় উনি ভয় পেতেন। মাহমুদ ভাই কল করার পরের কিছু সময়। এখন ভয় নাই আর। উনি তাকে আর ভয় পান না। উল্টা উনি প্রশ্ন করতেন, ভয়ে কেউ এটা করে? ভয়ে কেউ সেটা করে? উনিই জানবেন ভয়ে উনি কী কী করতে পারেন আসলে! 

অবাক করার মতো বিষয় হলো- উনি দেখা করলে স্নেহা ভালো ফিল করতো, এইটুকু উনি বুঝছেন! কেন ভালো ফিল করতো, ওইটা উনার বুঝেই আসে নাই! ওইটা না বুঝেই হিজ এক্সিলেন্সি স্নেহাকে তখন হাত ধরে বসে থাকতে দিতেন। মাঝে মাঝে ইন্টিমেট হতেও। হিজ এক্সিলেন্সি এতটাই নাইভ যে স্নেহার চোখ দেখে, স্পর্শতে আর দীর্ঘ রচনার পর রচনা পড়েও কিছুই বুঝতে পারেন নাই!

এমন কী স্নেহা উনাকে কোনো রকম বিব্রত না করে নিজের প্রেগনেন্সির পুরা বিষয়টা একা একাই হ্যান্ডল করছে, এটা উনি অন্য মারফত জানার পরও বোঝেন নাই। আহারে লোকটা! এসব না বুঝেই সে স্নেহার ইন্টিমেট হওয়ার আগ্রহে প্রথমে অরাজি, এরপর কিছুটা নিমরাজি হয়ে প্রতিবারই শেষমেশ রাজি হয়ে গেছেন! 

একজন ব্রিলিয়ান্ট এক্স ক্যাডেট আর একটা বাহিনীর চৌকস অফিসার এতটাই ব্রেইনলেস যে তাকে যখন স্নেহা নিজের ভালোবাসার কথা এক্সপ্রেস করলো, উনি ওইটার অনুমতিও দিয়ে দিলেন সরল বিশ্বাসে! ভয়েও দিতে পারেন। উনি তো সবই নাকি ভয়ে করছেন, স্নেহা ভাবে!

শুধু তাই-ই না, স্নেহা তাকে ভালোবাসার কথা জানানোর মাস খানিক পর টানা আড়াই দিন উন্মাদের মতো উথাল-পাতাল ইন্টেন্স রাত থেকে দিন, দিন থেকে রাত একসঙ্গে কাটিয়ে যাওয়াটা তার কাছে তখন পর্যন্ত স্বাভাবিকই লাগতেছিল। ওইবার রাজশাহী যাওয়ার আগে মদ্যপ অবস্থায় বারবার স্নেহাকে আই লাভ ইউ বলাটাকেও। যদিও উনি অনেককিছুই পরে অস্বীকার করতে পারেন, উনার এসবে সমস্যা হয় না। অথবা সর‍্যি বলে মামলা খালাস করতে পারেন মদের দোহাই দিয়ে!

হিজ এক্সিলেন্সি আবার ওই ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের স্মৃতি ছাড়া অনেক ইনসিডেন্ট মনে রাখতে পারেন। শুধু ওইটাই বেমালুম ভুলে যান, কারণ স্নেহা তাকে ওই সময় পর্যন্ত দেখা করতে বা থাকতে কখনোই জোর করে নাই। হিজ এক্সিলেন্সির মনে হইছিল, স্নেহা এরপর তাকে আস্তে আস্তে ভুলে যাবে, যেহেতু উনি আর ঢাকায় ঘন ঘন যাতায়াত করবেন না। হিজ এক্সিলেন্সি বিকেম দ্যাট মাচ ব্রেইনলেস ওয়ান্ডার অর হু নৌউজ হি ওয়াজ জাস্ট বাই বর্ন দ্যাট ওয়ে যে উনি বোঝেনই নাই স্নেহার জন্য ওই ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের মিনিং আর ইম্পোর্টেন্স কী ছিল!

ওহ, আরো মজার ব্যাপারও আছে তো, স্নেহার মনে পড়ে। হিজ এক্সিলেন্সি তার ফ্যামিলি রাজশাহী মুভ করতেছে বলার সময় নিজের মেয়ের সাইকিয়াট্রিস্টের উদ্ভট গল্পটা কেন অহেতুক বানিয়ে বলছিলেন, তা না জানলেও উনার চোখ দেখে তখনই তো স্নেহা বুঝতে পারছিল, জাস্ট সত্যটা জানছে পরে। উনি সবসময়ই স্নেহার সামনে এটাও প্রিটেন্ড করে গেছেন- ওয়াইফের সঙ্গে উনার সম্পর্ক স্বাভাবিক না। এইসব বানোয়াট গল্প কেন তার স্নেহাকে শোনাতে হইছিল, উনি আর উনার মাস্টারমাইন্ড ব্রেইনই ভালো জানে।

হিজ এক্সিলেন্সি রাজশাহী চলে যাওয়ার পর হয়তো ভাবছিলেন, যেহেতু বহু ক্রোশ দূরে চলে গেছেন, একটু ইগনোর করলেই আপদ বিদায় করতে পারবেন! এতে মানসিকভাবে স্নেহার কন্ডিশন কী হবে, তা নিয়ে উনার ভাবার কী দরকার! উনার ফ্যামিলিও কয়েক মাসের ভেতর ওইখানে মুভ করবে, সো উনি একজন পাওয়ারফুল অফিসার এবং লাভিং হাজব্যান্ড আর লাভিং ফাদার হয়ে সুন্দর সাজানো জীবন যাপন করে যাবেন পরবর্তী দুই বছর। এর ফাঁকফোকরে ঢাকায় যদি কোনো কাজেকর্মে আসেন, স্নেহাকে দেখা দিয়ে ধন্য আর কৃতার্থ করে যাবেন, কারণ উনি তো মানুষ না, ফেরেশতা রূপে স্নেহার জীবনে আসছিলেন। স্নেহা তাকে পূজাই তো করতো।

ইমোশনালি একটা মানুষকে চরম ভার্নারেবল করে যাওয়ার পর হিজ এক্সিলেন্সির এরপর স্নেহার এইসব অস্থিরতা আর ভালো লাগে নাই। দেখা করতে চাওয়া, কথা বলতে চাওয়া তার কাছে সাফোকেটেড লাগছে। ফোর্স করা মনে হইছে। সে তখন কথা এড়ান, চুপ থাকেন। এরপর তার মনে পড়ে, ঠিক কোন সময় স্নেহাকে স্মরণ করাতে হবে- হি ইজ ম্যারিড ম্যান! স্নেহা হ্যাজ টু আন্ডারস্ট্যান্ড হিজ ইস্যুজ! ইট ফিলস লাইক সো ওয়াও! কারণ পরের মাসেই তার ফ্যামিলি তার কাছে যাবে।

চরম ইনডিফারেন্ট আচরণে আঘাতের পর আঘাত দিয়ে স্নেহাকে সুইসাইডাল করে তোলার পরও নিজের কোনো ত্রুটিই হিজ এক্সিলেন্সি সেখানে বের করতে পারেন নাই। কারণ স্নেহা বিপিডিতে আক্রান্ত, চাইলেই তাকে পাগল বলে ফেলা যায়। চাইলেই তার আচরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। কিন্তু স্নেহার ওই ইনসেন আচরণগুলার পেছনে নিজের কোনো ভূমিকাই খুঁজে পান নাই উনি! স্নেহা টের পায় তার সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপতেছে অপমানে! এত বাজে ফিলিং! এত বিশ্রী অনুভূতি!

দুইবার মরার দরজা থেকে অলৌকিকভাবে স্নেহার ফিরে আসাটাকে হিজ এক্সিলেন্সি টুলস হিসেবে ব্যবহার করতে পারছেন। ইন্টিমেট হওয়ার এপ্রোচটাও অত্যন্ত সচেতনভাবে উনি করতেন না যেন এটাকেও টুলস হিসেবে ইউজ করে বলতে পারেন- আমি তো চাই নাই কখনো! শেষদিন উনি এই টুলস ইউজ করছেনও। করবেন, এটা স্নেহা জানতো।

কিন্তু স্নেহা যখন ইন্টিমেট হওয়ার এপ্রোচ করতো, উনি তা না…না…বলেও তো এড়াইতে পারতেন না। ওই না এড়ানোটাকেও যেন স্নেহা কোনোদিন প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে, তাই প্রতিবারই যাওয়ার আগে একটা পাপ বোধের ফিলিং সে স্নেহার উপর সাকসেসফুল্লি চাপিয়ে দিয়ে আরো মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে রেখে যেতেন। ক্ল্যাপ ক্ল্যাপ ক্ল্যাপ! স্নেহা সত্যি সত্যিই তালি বাজিয়ে ওঠে হিজ এক্সিলেন্সির চমৎকার সব যুক্তি মনে করে।

প্রচণ্ড অপমানে আর প্রচণ্ড বিশ্রী ফিলিংয়ে শেষদিন এইসব বাকওয়াজ যুক্তি শুনে পাল্টা কিছু বলতেও রুচিতে কুলাচ্ছিল না স্নেহার। প্রথমে একবার বলতে গিয়েও পরে চুপ হয়ে যায়। পুরাটা সময় হিজ এক্সিলেন্সির নাইভ আলাপগুলা শুনে স্নেহার মনে হইতেছিল হোয়্যাট অ্যা ওয়েস্ট অফ স্পেস!

একটা মানুষ এতটা নিবোর্ধ হতে পারে? আবরার ওই সময় অনেকবার চেষ্টা করেন স্নেহাকে কথা বলাতে; স্নেহা যেন হিজ এক্সিলেন্সির বাকওয়াজের জবাবে প্রশ্ন করে, পাল্টা জবাব দেয়, এরজন্য কয়েকবার সে বলেন- আপা, আপনি কিছু বলবেন? প্রাইভেটলিও স্নেহাকে সে টেক্সট করেন কথা বলার জন্য। একবার তো বলেই ফেলেন- আপা, আপনার কিছুই বলার নাই? স্নেহা কিছুই বলে না।

শেষ পর্যন্ত আবরারই হিজ এক্সিলেন্সিকে বলতে বাধ্য হন- ভাই, আপনি একজন ম্যারিড মানুষ, একজন নারীর লাভ ল্যাঙ্গুয়েজ আপনি বোঝেন নাই? টেরই পান নাই? হিজ এক্সিলেন্সির উত্তর ছিল- অনেক পরে বুঝতে পারছেন! স্নেহা জোরে হেসে আবরারকে থামিয়ে বলে, ভাই বাদ দেন তো। আপনি কী বলতেছেন, এটা বোঝার মতো ক্ষমতাই উনার নাই।

স্নেহা ওইদিন ঠিক বলে নাই। হিজ এক্সিলেন্সি বুঝেও বারবার অনেককিছু না বোঝার ভান করে গেছেন। উনি যে বুঝতেছেন এবং জবাব দিতে পারতেছেন না, এটা অন্যরা বুঝে গেলে তো সমস্যা! উনি তাই তাই বলছেন, যা যা বলে উনি ক্লোজার টানতে তৈরি হয়ে আসছিলেন। নিজের প্ল্যান মাফিক স্টেটমেন্টেই উনি অটল থাকছেন, বারবার ওইসবই রিপিট করে গেছেন।

মাহমুদ ভাইয়ের কথা মনে পড়ে যায় স্নেহার। মাহমুদ ভাই মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে জানতে চাইতেন এখনো স্নেহার সঙ্গে আবিরের যোগাযোগ আছে কি না। স্নেহা ‘না’ বললেও মাহমুদ ভাই বলেই যেতেন- ক্যাডেটের মাল তুমি চিনো না! এদের সেয়ানাগীরি সম্পর্কে ধারণাই নাই তোমার। আই'ম ওয়ার্নিং ইউ, যদি কন্টাক্ট এখনো থেকে থাকে, জাস্ট কাট অফ! ওর যখন সময় আসবে- হি উইল ডাম্প ইউ এগেইন। কী অবস্থা হইছিল তোমার, ডোন্ট ইউ রিমেম্বার? স্নেহা কথা এড়ানোর জন্য কোনো না কোনো উছিলায় ফোন রেখে দিতো। এরপর তো দীর্ঘ সময় ফোনই ধরে নাই তার।

গত বছর এপ্রিল থেকে এই বছরের জানুয়ারি, আবিরের সঙ্গে স্নেহা প্রচণ্ড বাজে ব্যবহার করছে নানা সময়। মাঝে মাঝে তা মাত্রাতিরিক্তও হয়ে যেত। চিৎকার-চেঁচামেচি, আজেবাজে কথা বলা, অস্থির হয়ে ইনসেন আচরণ করা- এর কোনোটার দায়ই স্নেহা এড়ায় নাই, কোনোদিন এড়াবেও না। নিজের প্রতিটা আচরণের জন্য ও যেমন তখনও লজ্জিত ছিল, এখনও ঠিক সমানভাবে লজ্জিত। আবিরের প্রতি অনেক কারণেই স্নেহা কৃতজ্ঞ, ওই বোধটাও আজীবন ওর থাকবে বলেই মনে করে স্নেহা।

বৃষ্টির গতি ধীর হয়ে আসছে। মেঘগুলাও সরে যাইতেছে দূরে দূরে। হালকা নীল-সাদা আকাশের দিকে চোখ রেখে স্নেহা ভাবে- ১৭ মার্চ আসছেই ১৪ ফেব্রুয়ারির কারণে। ১৪ ফেব্রুয়ারি আসছে ২ ফেব্রুয়ারি আসছিল বলেই। ২ ফেব্রুয়ারিও আসছে ২৮ জানুয়ারির কারণে। আর ২৮ জানুয়ারি আসছে গত দুই বছরে অসংখ্যবার “আমরা ঠান্ডা মাথায় পরে কথা বলি?”- আবিরের ওই সময়টা কখনোই না আসার কারণে। গলা শুকায়ে আসছে। পানি খেয়ে লম্বা একটা দম নেয় স্নেহা।

২-১৪ ফেব্রুয়ারি রাত বারোটা পর্যন্ত সময় প্রতিটা মুহূর্ত স্নেহা মরার আগেও ভুলবে বলে মনে হয় না ওর। অনেককিছুই ভুলতে পারলে হয়তো ও কোনো মতে এই একটা জীবন কষ্ট নিয়েও হলেও বেঁচে থাকতে পারতো। স্নেহার মনে পড়ে, আবিরকে ও একদিন বলছিল- তোমার কারণেই আমাকে মরতে হবে।

নাহ, কেউ কারো জীবনে না থাকলে মানুষ মরে যায় না। মানুষ কীসে মরে, ওইটা অবশ্য আবিরদের মতো হাইয়ার স্ট্যাটাসের মানুষরা কৌশলে এড়াইয়া যাওয়ার ট্রেনিং কমপ্লিট করছেন বলেই নিজেদের খুব সহজেই ‘শ্যালো’ বলে দায় এড়াতে পারেন। স্নেহা, হিজ এক্সিলেন্সিকে ওইদিন যা বলছিল, না বুঝে বলে নাই। আজকে, এই মুহূর্তে, কথাটা স্নেহার আবারও সত্যই মনে হলো।

মুখটা হঠাৎ তিতা লাগা শুরু হইছে স্নেহার। ১৭ মার্চের পুরা কনভার্সেশনের আনাচ-কানাচ জুড়ে এত কদর্য স্মৃতি যে ওইদিন আবির ফোন কাটার পর আবরার স্নেহার কাছে সর‍্যি হয়। ওই কনভার্সেশনের জন্য স্নেহা রাজিই ছিল না। আবরার স্নেহাকে রাজি করায়। কিন্তু স্নেহা যা যা শোনে, তাতে আবরার নিজেই বিব্রত হয়, লজ্জিতও।

প্রফেশনালিজমের গণ্ডি থেকে বের হয়ে উনি স্নেহাকে বলেন- আপা, উনার জন্য আপনি কষ্ট পাওয়া ডিজার্ভ করেন না। উনি আসলে কী বলছেন, বুঝে বলছেন কি না, আমি জানি না। বুঝতেই পারছি না। যদি বুঝে বলেন, সর‍্যি টু সে, উনি খুবই ননসেন্স টাইপের একটা মানুষ।

স্নেহার ওই সময় সবকিছুতেই হাসি পাচ্ছিল। নিজের উপর, পুরা দুনিয়ার উপরই। অ্যান্ড হিজ এক্সিলেন্সি প্রথম থেকে উনার মাস্টারপ্ল্যান নিয়ে যেভাবে পুরা বিষয়টা হ্যান্ডেল করতে চাইছিলেন, ঠিক ওইভাবেই সাকসেসফুল্লি অ্যাক্ট করে বিদায় নিতে পারছেন। স্নেহার আবার হাসি পায়। কিন্তু স্নেহা যে উনাকে উনার প্ল্যান মতো বিদায় নিতে দিছেন বলেই উনি ওইদিন ওই বিদায়টা এত স্মুথলি নিতে পারছেন, এটা বোঝার মতো জ্ঞান তার আছে বলে এখন আর স্নেহার মনে হয় না।

আবার বিশ্রী কাশিটা শুরু হয় স্নেহার। গত দুইদিন বন্ধ ছিল, এর আগে টানা দুই সপ্তাহ কাশতে কাশতে গলার ভেতর সমস্ত রগ ছিঁড়ে যাইতেছিল বলে মনে হচ্ছিল ওর। আজকেও শুরুর ধরন দেখে মনে হইতেছে…পুরা ভাবনা শেষ করে কিছু বুঝার আগেই কণ্ঠনালী থেকে ছুটে আসা তাজা রক্তে গ্রে কালারের টি-শার্টটা লাল হয়ে উঠলো। আহহা! শার্টটার জন্য খারাপ লাগতেছে। এই দাগ উঠবে না। একটু প্রস্তুতি নিতে দেবে না? এরপরই তার মনে হয়, সবকিছুর জন্য তো আর আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা সম্ভব না দুনিয়ায়। কাশিটা ক্রমেই বাড়তে থাকবে এখন, গ্রে শার্টটা আর রক্তাক্ত করতে ইচ্ছা করলো না তার।

স্নেহা এতগুলা দিন শেষের ওই কনভার্সেশনটা বারবার ভুলে থাকার চেষ্টা করছে নানাভাবে। বিচ্ছিন্নভাবে নানা কথা মনে আসলেও ইগনোর করতে চাইছে- কখনো গান শুনে, কখনো ভালো স্মৃতিগুলা মনে করে, কখনো বা নিজের হাজারটা দোষ খুঁজে আর দিন-রাত ধোঁয়ার মধ্যে ডুবে থেকে।

টানা ৩ রাত জেগে থাকা স্নেহার বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্ক সম্ভবত আর এই লোড নিতে পারতেছিল না। নাহ! কাশি থামতেছে না। অনেক কষ্টে নিজের শরীরটাকে উঠিয়ে ওয়াশরুমে নেওয়ার ট্রাই করে স্নেহা। রক্ত দেখতে বরাবরই বিশ্রী লাগে ওর। মাথা থেকে রক্তের এই ভাবনা বের করতে স্পটিফাই প্লে করে বেসিনের দিকে আগালো। গলার রগ ছেঁড়ার উপক্রম এবারও! স্নেহার হঠাৎই মনে পড়ে গেল কবি রাজীব আশরাফের এক বিখ্যাত কবিতা-

জন্ম থেকে এই যে এতোটা বছর
আমাকে শুধু কাঁদিয়েছে ঈশ্বর।
আমাকে শুধু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই
শত্রু যা করে, ঈশ্বরও করে গেলো তাই।

হায় ঈশ্বর
তোমার কাঁধেও শয়তান করে ভর?

কাশিটা এখন আর কষ্টদায়ক মনে হইতেছে না। বেসিনের কলটাও ফুল ফোর্সে ছেড়ে রাখছে লাল রঙের অস্তিত্ব যেন বেশিক্ষণ দেখতে না হয় আবার। ব্লু টুথ স্পিকারটায় এরমধ্যেই বেজে উঠলো জনি ক্যাশ! আহ্‌ বহু বহু দিন পর! গিটারের ছন্দে কাশি, রগ, রক্ত- তুচ্ছ লাগে সমস্ত কিছু। স্নেহা মাথা দোলাতে দোলাতে কাশে আর বেসিনে ঝুঁকে রক্ত ফেলতে ফেলতেই গাওয়ার চেষ্টা করে- "আই ওয়্যার দিস ক্রাউন অফ থর্নস/অ্যাপন মাই লায়ার’স চেয়ার/ফুল অব ব্রোকেন থটস/আই ক্যাননট রিপেয়ার…"। কাশি শুরু হয় আরো দ্বিগুণ ফোর্সে। হাল ছেড়ে দিয়ে সে শোনে, জনি ক্যাশ একলাই বাকিটুকু গেয়ে যান-

বিনিদ দ্য স্টেইনস অফ টাইম
দ্য ফিলিংস ডিজঅ্যাপিয়ার
ইউ আর সামওয়ান এলস
আই অ্যাম স্টিল রাইট হেয়ার…

চলবে…

Comments

    Please login to post comment. Login