Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: হিজ এক্সিলেন্সি

April 7, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

205
View

[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]

সকাল গড়াতে গড়াতে দুপুর চলে আসলেও আকাশের মন খারাপ থামতেছে না কিছুতেই। কোনো এক তুমুল দুঃখ বোধে অঝোর ধারায় সে কেঁদেই যাইতেছে। মনে হইতেছে, এই কান্না বোধহয় আর কোনোদিন থামার চেষ্টাও করবে না। একটা আমৃত্যু শোকে ডুবে এভাবেই কাটিয়ে দেবে বাকিটা জীবন। কাঁদুক, ক্রন্দনরত আকাশে চোখ রেখে স্নেহার মনে হয়- কাঁদলে যদি আকাশের মন খারাপ কমে! থামতে বলার ও-ই বা কে! আসলেই কি কমে? ওরও কি এখন মন খারাপ হইতেছে- ব্যাপারটা ও বোঝার চেষ্টা করে।

বোঝার এই চেষ্টার সামনে কিছু একটা এসে বারবার ভাবনাগুলাকে আটকে দিতেছে। একটা ব্লার ইমেজ! সামনে কুয়াশা, না কি মেঘ? ঝড়ে অ্যান্টেনা নড়ে গিয়ে দূরদর্শনের স্ক্রিনের মতো কিছুটা ঝির ঝির, কিছুটা আবার হঠাৎ হঠাৎ শর্ট সার্কিটের মতো স্পার্ক শুরু করছে। কালো পর্দার মতো কিছু একটা সামান্য নেমে আসতেছে আকাশ থেকে। পুরাপুরি নামতেছে না, ঝুলে থাকতেছে। মাথাটা সোজা করে রাখা যাইতেছে না আর। কয়েকবার চেষ্টা করে স্নেহা। কিছু একটা এই চেষ্টার সামনে এসেও আটকে দিতে চাইতেছে।

কফি বানানোর পর সকাল থেকে ফ্লোরের যেখানটাতে বসেছিল, ওইখানেই খুব ধীরে ধীরে শুয়ে পড়লো। নাকি ওর শরীর নিজ থেকেই ঢলে পড়লো, পার্থক্য বোঝা গেল না। সমস্ত বুঝতে চাওয়ার মাথার উপর ঝুলতেছে ওই কালো পর্দাটা। এত তীব্র বাতাসেও পাহাড়ের মতো স্থির আর অবিচল হয়ে একই জায়গায় ঝুলে আছে। না নিচে নামার তাড়া আছে কোনো, না নিজেকে পুরাপুরি উপরে গুটিয়ে নেওয়ার! স্নেহাও তো এমনই, ওর মনে হয়- মাকড়শার জালের মতো ও নিজেও তো একটা সূক্ষ সুতার উপর ঝুলে আছে স্থির। একটু এদিক-সেদিকে হলেই গভীর খাঁদ ওকে গিলে ফেলতে প্রস্তুত হয়ে আছে দুই পাশ থেকে। এই ভারী কালো পর্দা কি কখনো নিচে নেমে আসবে পুরাপুরি?

কিছু একটা কানের কাছে শব্দ করতেছে অনেকক্ষণ ধরে। ঝির ঝির, ব্লার, শর্ট সার্কিট আর অল্প ঝুলে থাকা কালো পর্দার দৃশ্যকল্প এড়িয়ে শব্দটা শোনার চেষ্টা করে স্নেহা। স্পটিফাইতে কি আর “আমোন” প্লেলিস্টটা বাজতেছে না? কানে পৌঁছানো শব্দে কিছুই স্পষ্ট বোঝা গেল না। কোন গানটা যেন বাজতেছিল শেষে? সঙ্গে তো বৃষ্টির শব্দও ছিল। স্নেহা ভাবে, ভাবা প্র্যাক্টিস করার উপদেশ মানতে চায় ঋত্বিক ঘটকের। আবারও কান থেকে মনোযোগ সরে গিয়ে কিছু একটা স্পার্ক করে উঠে ওর চোখের সামনে। ঝির ঝির স্ক্রিনটা সরে গিয়ে চোখের সামনে ভাসে একটা ভাইটাল সাইন মনিটর। ছোট ছোট ঢেউয়ের মতো পালস রেট উঠা-নামা করে পার হয়ে চলে যাইতেছে, ফিরে আসতেছে আবারও। কোনো বিপ বিপ সাউন্ড শোনা যাইতেছে না কোথাও! আবারও কান দুইটাকে সজাগ করার প্রচেষ্টা চালায় ও। সবশেষে যেন কোন গানটা বাজতেছিল? ভাবে…ঋত্বিক ঘটক তো ভাবার প্র্যাক্টিসের কথাই বলে গেছিলেন। কিন্তু ওর জীবনটা কি মেঘে ঢাকা তারা? নীতার মতো স্নেহাও কি সত্যি সত্যিই বাঁচতে চেয়েও আজন্ম যন্ত্রণা ভোগ করে মরে যাইতেছে?

অনেক চেষ্টাতেও মস্তিষ্কের সিগনাল পাওয়া গেল না। জায়গায় জায়গায় ভাবনারা বাধাপ্রাপ্ত হয়ে এলোমেলো আর অসম্পূর্ণ রাখতেছে শব্দ আর দৃশ্যগুলা। হ্যালো…হ্যালো…ওয়ান…টু…থ্রি…মাইক্রোফোন টেস্টিং বললে কি মস্তিষ্ক সজাগ হবে? কোথাও একটা তীব্র ভাইব্রেশন হইতেছে। শরীরের ভেতর না বাইরে? কনক্রিট কিছু একটা মনে করার ট্রাই করে ও- একটা পুরা বাক্য, একটা সম্পূর্ণ দৃশ্য অথবা একটা মিনিংফুল শব্দ। অস্পষ্ট, ভাসা ভাসা কিছু শুনতে পায় মনে হয়- এ---জ ই---উ লা--ই--ক ই---ট! আরেকবার শোনা যায়, কিছুটা স্পষ্ট এবার- এ-জ ই-উ লা-ই-ক ই-ট! ভেজা মাটির গন্ধ এসে নাকে লাগে সঙ্গে সঙ্গে। চোখে কিছুটা আলোও এসে পড়লো। কানে বৃষ্টির টিপ টিপ শব্দ স্পষ্ট। একটু আগে শোনা এজ ইউ লাইক ইট স্পষ্টভাবে মস্তিষ্কের সিগনাল ধরতেই স্নেহা পাখির মতো মুখস্ত বলতে থাকলো- “অল দ্য ওয়ার্ল্ড’স অ্যা স্টেজ, অ্যান্ড অল দ্য মেন অ্যান্ড উইমেন মেয়ারলি প্লেয়ার্স; দে হ্যাভ দেয়্যার এক্সিটস অ্যান্ড দেয়্যার এন্ট্রান্সেস…”। একটা আস্ত শেক্সপিয়র! মস্তিষ্ক সজাগ!

ও কি এতক্ষণ মরে যাওয়ার ভয় পাইতেছিল? চেতন ফিরতেই রসিকতা করলো নিজের সঙ্গে- উহুঁ! ও ভয় পাইতেছিল মস্তিষ্কের সৈয়দ মীর জাফর আলী খান হওয়ার আশঙ্কাকে। যদিও দিস লাইফ নাউ ফিলস লাইক অ্যা লিভিং মমি- নিজে নিজেই বলে। প্রচণ্ড ক্লান্ত শরীরটাকে এরপর টেনে বসিয়ে দেড় লিটার পানি শেষ করলো কয়েক মিনিটে। ফোনটা ভাইব্রেট করে উঠতেই আবরারের নাম দেখলো স্ক্রিনে। স্নেহা টের পেলো, ওর মস্তিষ্ক ইজ ব্যাক ইন অ্যাকশন! আবরারের নাম দেখেই তীব্র গতিতে একটা তীক্ষ্ম প্রশ্ন ছুটে আসতেছে ওর মাথার ভেতরে। কিন্তু এই প্রশ্ন বেচারা আবরারকে করে কী লাভ? সে তো উত্তর দেবেন ক্লিনিক্যালি। যতটুকু জ্ঞান তার পড়াশোনা আর অভিজ্ঞতা তাকে দিছেন, সেই আলোকে। এমন উত্তর তো নিজের সঙ্গে যুক্তি-তর্ক করে ও নিজেও বের করতে পারে। কিন্তু ওইগুলা কিছুই তো প্রকৃত উত্তর হবে না আসলে। প্রকৃত উত্তর তো কেবল দিতে পারবেন- হিজ এক্সিলেন্সি! দ্য গ্রেট বব মার্লের কথা মনে পড়ে গেল ওর- “দ্য বিগেস্ট কাওয়ার্ড ইজ আ ম্যান হু অ্যাওয়েইকেন্স অ্যা ওম্যান’স লাভ উইদাউট দ্য ইনটেনশন অব লাভিং হার।” হা হা হা! ওর সশব্দ হাসিতে পুরা ফ্ল্যাটটা গম গম করে উঠলো!

কিন্তু পর মুহূর্তেই ওর মনে পড়ে যায়- ৭৫ মিনিটের ওই শেষ কদর্য কনভারসেশন! একটা আদ্যোপান্ত বোধ-বুদ্ধি সম্পন্ন; শিক্ষিত, বিচক্ষণ এবং দেশের সবচেয়ে স্বনামধন্য বাহিনীর অন্যতম একজন অফিসার নাকি প্রথম একটা বছর বোঝেনই নাই স্নেহা তাকে ভালোবাসে। ওইটা না বুঝেই উনি বারবার ওর সঙ্গে দেখা করতে আসছেন ওই সময়। অথচ স্নেহার মজার বিষয় মনে হয়- এইটা চিন্তা করে, ওই সময় উনাকে দেখা করতে বা কথা বলতে ও কখনোই বলে নাই। এমন কী নিজে থেকে তাকে কখনো ও টেক্সটও করে নাই। শেষ ওই কনভার্সেশনে উনি একবার বলছেন; স্নেহা ভালো ফিল করতো বলে উনি দেখা করতে আসতেন। এরপর আবার বলতেছিলেন, ওর সঙ্গে উনার গল্প করতে ভালো লাগতো বলে উনি বারবার দেখা করতে ডাকতেন। সবচেয়ে মজার বিষয়, হিজ এক্সিলেন্সি নাকি ভয়েও আসতেন! ভয়েই নাকি উনি সবকিছু করতেন! শেষ পর্যন্ত তো ‘ভয়’টাকেই উনি শুধু এস্ট্যাবলিশ করতে চাইছেন ওই কনভার্সেশনে। কিন্তু দুঃখের বিষয়- পারেন নাই। স্নেহা বুঝতেই পারে না এমন গোবর মার্কা ব্রেন নিয়ে উনি কীভাবে এই র‍্যাঙ্ক আর পজিশনে গেছেন!

উনি ‘ভয়ে’ দুই বছর যোগাযোগ রাখছিলেন- এই ফালতু আর লেইম ন্যারেটিভটা এক জায়গাতে উনাকে বাঁচানোর জন্য স্নেহাকেই বলতে হইছিল। অথচ ওই ন্যারেটিভ ক্যাশ করে উল্টা ওকেই শেষদিন বারবার উনি আউ-ফাউ কথা শুনিয়ে যাইতেছিলেন। ক্যায়া বাত! গত দুই বছর উনার ভয় পাওয়া সংক্রান্ত বিষয় নিয়ে বারবার, বহুবার, লাগাতার প্রশ্ন করে স্নেহা নিশ্চিত হতে চাইছে, উনাকেও নিশ্চয়তা দিতে চাইছে। কিন্তু হিজ এক্সিলেন্সি প্রতিবারই বলছেন- এক সময় উনি ভয় পেলেও সেসব কেটে গেছে বহু আগে। মাহমুদ ভাই কল করার পর কিছু সময়ের জন্য নাকি উনি ভয় পাইছিলেন, কিন্তু উনার ওই ভয়টা আস্তে আস্তে দূর হইছে। এসব নিয়ে প্রশ্ন করলে উল্টা উনি স্নেহার কাছে জানতে চাইতেন- ভয়ে কেউ বারবার দেখা করতে আসে? ভয়ে কেউ ঘণ্টার পর ঘণ্টা গল্প করে? ভয়ে কেউ একসঙ্গে ড্রিংক করা এনজয় করে? ভয় কেউ এটা করে? ভয়ে কেউ সেটা করে? আল্লাহ আর উনিই ভালো জানবেন- ভয়ে উনি কী কী করছেন, বা কী কী করতে পারেন আসলে!

উনার সঙ্গে দেখা হলে স্নেহা ভালো ফিল করে, এটা উনি বুঝছেন ঠিকই; কিন্তু কেন ভালো ফিল করতো, ওইটা উনার বুঝেই নাকি আসে নাই! না বুঝেই অবোধ শিশুর মতো হিজ এক্সিলেন্সি স্নেহাকে হাত ধরে বসে থাকতে দিছেন, মাঝে মাঝে ইন্টিমেট হতেও। উনি নাকি এতটাই নাইভ যে স্নেহার চোখ দেখে, ওর স্পর্শতে আর ওর পাঠানো দীর্ঘ রচনার পর রচনার সমান টেক্সট পড়েও কিছুই বুঝতে পারেন নাই! এমন কী উনাকে কোনো রকম ভীত-বিব্রত না করতে নিজের প্রেগনেন্সির পুরা বিষয়টা স্নেহা একা একা হ্যান্ডল করার পরও নাকি উনি কিছুই বুঝতে পারেন নাই! আহারে লোকটা- স্নেহার মুখ দিয়ে বের হয়! এসব না বুঝেই নাকি ও ইন্টিমেট হওয়ার জন্য একটু আহ্লাদ-জেদ দেখালেই উনি রাজি হয়ে যেতেন!

একজন ব্রিলিয়ান্ট এক্স ক্যাডেট, সেনাবাহিনীর একজন চৌকস অফিসার নাকি এতটাই ব্রেনলেস যে স্নেহা উনাকে নিজের ভালোবাসার কথা এক্সপ্রেস করার পর উনি সেটার অনুমতিও দিয়ে দিলেন সরল মনে! ভয়েও দিতে পারেন! যেহেতু উনি সবই নাকি ভয়ে করছেন- একটা বেদনাদায়ক ব্যঙ্গাত্মক হাসি ফুটে উঠে ওর মুখে। শুধু তাই-ই না, উনাকে ভালোবাসার কথা জানানোর মাস খানিক পর ওরা একসঙ্গে টানা আড়াই দিন উন্মাদের মতো উথাল-পাতাল ইন্টেন্স রাত থেকে দিন, দিন থেকে রাত কাটালো, ওইটাও উনার কাছে অস্বাভাবিক লাগে নাই তখন। ওইবার রাজশাহী যাওয়ার আগে মদ্যপ অবস্থায় বারবার স্নেহাকে আই লাভ ইউ বলাটাও তার কাছে স্বাভাবিক নরমালই মনে হইছে! যদিও উনি অনেককিছুই পরে অস্বীকার করতে পারেন, এসবে উনার সমস্যা হয় না। অথবা মদের দোহাই দিয়ে সর‍্যি বলেই মামলা খালাস করে দিতে পারেন।

৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের ওই স্মৃতিটুকু বাদে অনেক ইনসিডেন্টই হিজ এক্সিলেন্সি মনে রাখতে পারতেন, মনে রেখে দিতেনও। শুধু ওই কয়দিনের সমস্ত মুহূর্তই উনি ভুলে যেতেন। ওই সময়ের আগ পর্যন্ত স্নেহা তাকে দেখা কখনো করতে বা ওর সঙ্গে থাকতে জোর করে নাই, তাই হয়তো উনার মেমোরিতে এর পরের ঘটনাগুলাই কেবল প্রিজার্ভড আছে। যেহেতু রাজশাহী পোস্টিংয়ের পর উনার আর ঢাকায় আসার প্রয়োজন হবে না; উনার হয়তো তাই মনে হইছিল, ওইবার ঢাকা থেকে যাওয়ার পর স্নেহা তাকে আস্তে আস্তে ভুলে যাবে। এই শহরে উনি কখনোই স্নেহার জন্য আসেন নাই, আসবেনও না। হিজ এক্সিলেন্সি বিকেম দ্যাট মাচ ব্রেনলেস ওয়ান্ডার অর হু নৌউজ হি ওয়াজ জাস্ট বাই বর্ন দ্যাট ওয়ে যে উনি বোঝেনই নাই স্নেহার জন্য ওই ৪৬ ঘণ্টা ৪২ মিনিটের মিনিং আর ইম্পোর্টেন্স কী ছিল!

আরো মজার ব্যাপারও আছে, স্নেহার মনে পড়ে। উনার ফ্যামিলি রাজশাহী মুভ করতেছে বলার সময় হিজ এক্সিলেন্সি নিজের মেয়ের সাইকিয়াট্রিস্টের উদ্ভট গল্পটা যে কেন অহেতুক বানিয়ে শোনাইছিলেন, তা না জানলেও, উনি যে পুরাপুরি সত্য বলতেছেন না, উনার চোখ দেখে তখনই ও বুঝতে পারছিল। জাস্ট সত্যটা সম্পর্কে কনফার্ম হইছে পরে। উনি সবসময়ই প্রিটেন্ড করে গেছেন যে উনার কনজুগাল লাইফ নরমাল না। এইসব বানোয়াট গল্প কেন ওকে তার শোনাতে হইছিল, তা উনি আর উনার মাস্টারমাইন্ড ব্রেনই ভালো জানবে। উনি হয়তো রাজশাহী চলে যাওয়ার পর ভাবছিলেন, যেহেতু বহু ক্রোশ দূরে চলে গেছেন, একটু ইগনোর করলেই আপদ বিদায় করতে পারবেন! মানসিকভাবে স্নেহার কন্ডিশন কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে, তা নিয়ে উনার মাথাব্যথা ছিল না হয়তো! স্নেহা তো আসলে উনার জীবনে এগজিস্ট করছে একটা ‘কিছুই না’ হিসাবে!

উনার ফ্যামিলির রাজশাহীতে মুভ করার সময় ঘনিয়ে আসছিল; তাই একজন পাওয়ারফুল অফিসার, লাভিং হাজব্যান্ড আর লাভিং ফাদার হয়ে উনি রূপকথার হ্যাপি এন্ডিংয়ের মতো “অতঃপর তাহারা সুখে-শান্তিতে বসবাস করিতে লাগলো”র মতো উনার সাজানো-গোছানো দুনিয়ায় শান্তিতে বসবাসের প্রস্তুতি নিতেছিলেন। উনার হয়তো প্ল্যান ছিল, এর ফাঁকফোকরে যদি ঢাকায় কোনো কাজেকর্মে কখনো আসতে পারেন, তখন সুযোগ-সুবিধামতো স্নেহাকে দেখা দিয়ে ধন্য আর কৃতার্থ করে যাবেন। কিংবা কে জানে! উনি তো মানুষ না, স্নেহা যেহেতু তাকে পূজা করতো, উনি তো ভগবানই! মানুষের কর্মকাণ্ড না হয় অনুমান করা যায়, ভগবানেরটা কে অনুমান করতে যাবে!

ইমোশনালি একটা মানুষকে চরম ভার্নারেবল করে যাওয়ার পর হিজ এক্সিলেন্সির একটা সময় স্নেহার অস্থিরতা বিরক্ত লাগা শুরু হলো! ওর দেখা বা কথা বলতে চাওয়ার ইচ্ছাগুলায় উনার সাফোকেশন হতো, ফোর্স করা হইতেছে বলেও মনে হতো। এসব ইচ্ছা জানালে তাই উনি চুপ থাকতেন কিংবা এড়িয়ে যেতেন। এক বছর ৪ মাস পর উনার মনে হয়, উনি যে ম্যারিড এটা স্নেহাকে স্মরণ করাতে হবে এবং স্নেহা হ্যাজ টু আন্ডারস্ট্যান্ড হিজ ইস্যুজ! ইট ফিলস লাইক সো ওয়াও! উনার ফ্যামিলি রাজশাহী মুভ করার আগ পর্যন্ত এসব স্মরণ করানোর দরকার পড়ে নাই।

উনার চরম ইনডিফারেন্ট এবং একেক সময় একেক রকম আচরণের মাধ্যমে আঘাতের পর আঘাত দিয়ে স্নেহাকে সুইসাইডাল করে তোলার পরও নিজের কোনো ভুলই হিজ এক্সিলেন্সি খুঁজে পান নাই। যেহেতু স্নেহা বিপিডিতে আক্রান্ত, এবং এইটা তিনি জানেনও সিন্স স্নেহা এই তথ্য তার কাছ থেকে লুকায় নাই, যেকোনো ইন্সিডেন্টে বা যেকোনো কিছুর প্রেক্ষিতেই তাই চাইলে ওকে পাগল তকমা দিয়ে দেওয়া যায়। চাইলেই ওর আচরণকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়। কিন্তু ওর ওই ইনসেন আচরণগুলার পেছনে নিজের কোনো ভূমিকাই উনি খুঁজে পান নাই কখনো!

স্নেহার সমস্ত শরীর থরথর করে কাঁপতেছে অপমানে! এত বাজে ফিলিং! এত বিশ্রী অনুভূতি! দুইবার মৃত্যুর দরজা থেকে অলৌকিকভাবে ওর ফিরে আসাটাকে উনি টুলস হিসেবে ব্যবহার করছেন। নিজে থেকে ইন্টিমেট হওয়ার এপ্রোচ করাও উনি অত্যন্ত সচেতনভাবে এড়াতেন যেন এটাকেও টুলস হিসেবে ইউজ করে বলতে পারেন- আমি তো চাই নাই কখনো! শেষদিন উনি ঠিকই উইপেনের মতো এটা ইউজও করছেন। করবেন যে, এটা অবশ্য স্নেহা আগে থেকেই জানতো। কিন্তু ও যখন ইন্টিমেট হওয়ার এপ্রোচ করতো, না…না…করেও তো উনি এড়াতে পারতেন না। ওই না এড়ানোটাকেও যেন স্নেহা কোনোদিন প্রশ্নবিদ্ধ করতে না পারে, তাই প্রতিবারই যাওয়ার আগে একটা পাপ বোধের ফিলিং ওর উপর সাকসেসফুল্লি চাপিয়ে দিয়ে আরো মানসিকভাবে বিধ্বস্ত করে রেখে যেতেন। ক্ল্যাপ ক্ল্যাপ ক্ল্যাপ! স্নেহা সত্যি সত্যিই হিজ এক্সেলেন্সির চমৎকার ওইসব স্ট্র্যাটেজির কথা মনে করে হাত তালি দিয়ে উঠে।

প্রচণ্ড অপমানে, প্রচণ্ড বিশ্রী ফিলিংয়ে শেষদিন এইসব বাকওয়াজ যুক্তি শুনে পাল্টা কিছু বলতেও রুচিতে কুলাচ্ছিল না ওর। প্রথমে একবার কথা বলতে গিয়েও পরে চুপ হয়ে যায় ও। পুরাটা সময় হিজ এক্সিলেন্সির নাইভ আলাপগুলা শুনে ওর মনে হইতেছিল- হোয়্যাট অ্যা ওয়েস্ট অফ স্পেস! একটা মানুষ এতটা নিবোর্ধ হতে পারে? আবরার ওই সময় অনেকবার চেষ্টা করেও স্নেহাকে কথা বলাতে পারেন নাই। বারবারই সে রিকোয়েস্ট করেন স্নেহা যেন হিজ এক্সিলেন্সির বাকওয়াজের জবাবে প্রশ্ন করে, পাল্টা জবাব দেয়। হিজ এক্সেলেন্সির কথার মাঝখানে কয়েকবারই আবরার স্নেহাকে বলেন- আপা, আপনি কিছু বলবেন না? কিছু বলেন। প্রাইভেটলিও টেক্সট করে কথা বলতে রিকোয়েস্ট করেন কয়েকবার। কিন্তু স্নেহা কিছুই বলে না।

শেষ পর্যন্ত আবরারই হিজ এক্সিলেন্সিকে বলতে বাধ্য হন- আবির ভাই, আপনি একজন ম্যারিড মানুষ, একজন নারীর লাভ ল্যাঙ্গুয়েজ আপনি বোঝেন নাই? টেরই পান নাই? এটা কীভাবে সম্ভব! হিজ এক্সিলেন্সি উত্তর দিছিলেন, উনি নাকি অনেক পরে বুঝতে পারছেন! স্নেহা তখন জোরে হেসে দিয়ে আবরারকে থামাতে বলছিল- ভাই বাদ দেন তো। আপনি কী বলতেছেন, এটা বোঝার মতো ক্ষমতাই উনার নাই। স্নেহা ওইদিন আসলে ঠিক বলে নাই। হিজ এক্সিলেন্সি বুঝেও অনেককিছু না বোঝার ভান করে যাইতেছিলেন আর কথা ঘুরিয়ে উনি যা বলতে চাইছেন, ওইগুলাই বলতেছিলেন বারবার। উনি যে বুঝতেছেন, কিন্তু জবাব দিতে পারতেছেন না বা উনার কাছে কোনো জবাব ছিল না- এটা অন্যরা বুঝে গেলে তো সমস্যা! তা-ই তা-ই উনি বলছেন, যা যা বলে ক্লোজার টানতে তৈরি হয়ে আসছিলেন। নিজের প্ল্যান মাফিক স্টেটমেন্টেই অটল থাকছেন, বারবার তাই একই জিনিসই রিপিট করে গেছেন।

মাহমুদ ভাইয়ের কথা মনে পড়লো স্নেহার। উনি আগে মাঝে মাঝেই ফোন দিয়ে জানতে চাইতেন, ওদের এখনো যোগাযোগ আছে কি না। স্নেহা  উত্তরে ‘না’ বললেও উনি বলতে থাকতেন-ক্যাডেটের মাল তুমি চিনো না! এদের সেয়ানাগীরি সম্পর্কে কোনো ধারণাই নাই তোমার। আই’ম ওয়ার্নিং ইউ, যদি কন্টাক্ট এখনো থেকে থাকে, জাস্ট কাট অফ! ওর যখন সময় আসবে- হি উইল ডাম্প ইউ এগেইন। কী অবস্থা হইছিল তোমার, ডোন্ট ইউ রিমেম্বার? কথা এড়ানোর জন্য স্নেহা কোনো না কোনো উছিলায় তখন ফোন রেখে দিতো। এরপর তো দীর্ঘ সময় উনার ফোনই ধরে নাই আর।

গত বছর এপ্রিল থেকে এই বছরের জানুয়ারি, আবিরের সঙ্গে নানা সময় নানা কারণে স্নেহা প্রচণ্ড বাজে ব্যবহার করছে। মাঝে মাঝে সেগুলা মাত্রাতিরিক্তও হয়ে যেত। চিৎকার-চেঁচামেচি, আজেবাজে কথা বলা, অস্থির হয়ে ইনসেন আচরণ করা- এর কোনোটার দায়ই ও এড়ায় নাই, কোনোদিন এড়াবেও না। নিজের প্রতিটা আচরণের জন্য যেমন তখনও ও লজ্জিত ছিল, এখনও ঠিক সমানভাবে লজ্জিত। আবিরের প্রতি অনেক কারণেই ও কৃতজ্ঞ, ওই বোধটাও আজীবন এমনই থাকবে বলে মনে করে ও।

বৃষ্টির গতি ধীর হয়ে আসছে। মেঘগুলাও সরে যাইতেছে দূরে দূরে। হালকা নীল-সাদা আকাশের দিকে চোখ রেখে স্নেহা ভাবে- ১৭ মার্চ আসছেই ১৪ ফেব্রুয়ারির কারণে। ১৪ ফেব্রুয়ারি আসছে ২ ফেব্রুয়ারি আসছিল বলে। ২ ফেব্রুয়ারিও আসছে ২৮ জানুয়ারির কারণে, আর ২৮ জানুয়ারি আসছে-আমরা ঠান্ডা মাথায় পরে কথা বলি বলে বলে দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এবং বছর পার করে দিয়েও আবিরের ঠান্ডা মাথায় কথা বলার ওই মুহূর্তটা কোনোদিনও না আসায়। গলা শুকিয়ে আসছে ওর। পানি খেয়ে লম্বা একটা দম নিয়ে ওর মনে হয়- ২-১৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬ এর রাত বারোটা পর্যন্ত প্রতিটা ক্ষণের কথা মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্তেও সম্ভবত ও ভুলতে পারবে না। অনেককিছু ভুলতে পারলে হয়তো কোনো মতে এই একটা জীবন কষ্ট করে হলেও পার করে দিতে পারতো!

আবিরকে ও একদিন বলছিল- তোমার জন্য অথবা তোমার কারণেই আমাকে মরতে হবে। নাহ, কেউ কারো জীবনে না থাকলে মানুষ মরে যায় না। মানুষ কীসে মরে, এইটা বোঝার চেষ্টা অবশ্য আবিরদের মতো হাইয়ার স্ট্যাটাসের মানুষরা কৌশলে এড়িয়ে যাওয়ার ট্রেনিং কমপ্লিট করছেন বলেই নিজেদের খুব সহজেই ‘শ্যালো’ বলে দায়সারা হতে পারেন। স্নেহা, উনাকে ওইদিন যা বলছিল, না বুঝে বলে নাই। আজকে, এই মুহূর্তে, আবারও ওই কথাটা ওর সত্যি মনে হলো। স্নেহার মৃত্যু হবে, অথবা স্নেহাকে মরতে হবে, কিংবা স্নেহা মরবে- ওই ভদ্রলোকের কারণেই!

মুখটা হঠাৎ তিতা লাগা শুরু হলো ওর। ১৭ মার্চের পুরা কনভার্সেশনের আনাচ-কানাচ জুড়ে এত বেশি কদর্য স্মৃতি! ওইদিন আবির কনফারেন্স কল থেকে লিভ নেওয়ার পর স্নেহার কাছে আবরার বারবার সর‍্যি হইতেছিলেন। ওই কনভার্সেশনের জন্য স্নেহা রাজিই ছিল না। আবরার ওকে রাজি করাইছিলেন। কিন্তু এর ফলে স্নেহাকে যা যা শুনতে হইছিল, তাতে আবরার বিব্রত হয়, লজ্জিতও। প্রফেশনালিজমের গণ্ডি থেকে বের হয়ে তাই হয়তো উনি স্নেহাকে বলছিলেন- আপা, উনার জন্য আপনি কষ্ট পাওয়া ডিজার্ভ করেন না। উনি আসলে কী বলছেন, বুঝে বলছেন কি না, আমি জানি না। বুঝতেই পারছি না। যদি বুঝে বলেন, সর‍্যি টু সে- খুবই ননসেন্স টাইপের একজন মানুষ উনি।

স্নেহার ওই সময় সবকিছুতেই হাসি পাইতেছিল। নিজের উপর তো বটেই, পুরা দুনিয়ার উপরই। স্নেহার মনে হইতেছে, হিজ এক্সিলেন্সি প্রথম থেকে উনার মাস্টার প্ল্যান মোতাবেক যেভাবে পুরা বিষয়টা হ্যান্ডেল করতে চাইছিলেন, ঠিক ওইভাবেই সাকসেসফুল্লি অ্যাক্ট করে বিদায় নিতে পারছেন। ওর আবারও হাসি পায়। কিন্তু ও যে নিজেই উনাকে উনার প্ল্যান মাফিক বিদায় নিতে দিছেন বলেই উনি ওই বিদায়টা ওইদিন এত স্মুথলি নিতে পারছেন- এটা বোঝার মতো জ্ঞান উনার আছে বলে এখন আর স্নেহার মনে হয় না।

আবারও বিশ্রী কাশিটা শুরু হইছে। গত দুইদিন বন্ধ ছিল। এর আগে টানা দুই সপ্তাহ কাশতে কাশতে গলার ভেতর সমস্ত রগ ছিঁড়ে যাইতেছে বলে মনে হইতেছিল। আজকেও শুরুর ধরন দেখে একই জিনিস মনে হলো…কিছু বোঝার আগেই কণ্ঠনালী থেকে ছুটে আসা তাজা রক্তে ওর গ্রে কালারের টি-শার্টটা লাল হয়ে উঠলো হঠাৎ। আহহা! শার্টটার জন্য খারাপ লাগতেছে। এই দাগ উঠবে না। আসার আগে একটু প্রস্তুতি নিতে দিয়ে আসবে না? কিন্তু দ্যান এগেইন, সবকিছুর জন্য তো আর আগাম প্রস্তুতি নিয়ে রাখা সম্ভব না দুনিয়ায়! কাশিটা ক্রমেই বাড়তে থাকবে এখন। গ্রে শার্টটা এর বেশি রক্তাক্ত হতে দিতে ইচ্ছা হলো না ওর।

শেষ দিনের ওই কনভার্সেশন এই কয় মাস যাবত বারবার ও ভুলে থাকার চেষ্টা করছে নানাভাবে। বিচ্ছিন্ন নানা কথা মনে এলেও ইগনোর করতে চাইছে- কখনো গান শুনে, কখনো ভালো স্মৃতিগুলার কথা ভেবে, কখনো বা নিজের হাজারটা দোষ খুঁজে আর দিন-রাত ধোঁয়ার মধ্যে ডুবে থেকে। টানা ৩ রাত জেগে থাকায় ওর বিক্ষিপ্ত মস্তিষ্ক সম্ভবত আর লোড নিতে পারতেছে না। নাহ! কাশিটা থামতেছেই না কোনোভাবে। অনেক কষ্টে শরীরটাকে উঠিয়ে ওয়াশরুমে নেওয়ার ট্রাই করলো ও। রক্ত দেখতে বরাবরই বিশ্রী লাগে। মাথা থেকে রক্তের ভাবনা বের করতে স্পটিফাই প্লে করলো। বাথরুমের বেসিনের সামনে গিয়ে দাঁড়াতেই কাশির দমকে গলার রগ ছেঁড়ার উপক্রম হলো! কাশতে কাশতেই কবি রাজীব আশরাফের কয়েক লাইনের একটা ছোট্ট কবিতা মনে পড়লো ওর-

জন্ম থেকে এই যে এতোটা বছর
আমাকে শুধু কাঁদিয়েছে ঈশ্বর।
আমাকে শুধু জ্বালিয়ে পুড়িয়ে ছাই
শত্রু যা করে, ঈশ্বরও করে গেলো তাই।

হায় ঈশ্বর
তোমার কাঁধেও শয়তান করে ভর?

কাশিটা এখন আর ততটা কষ্টদায়ক লাগতেছে না ওর। চোখের সামনে থেকে রক্তারক্তির দৃশ্য এড়াতে বেসিনের কল ছেড়ে রাখছে ফুল ফোর্সে। ব্লু স্পিকারে এরমধ্যেই বেজে উঠছে জনি ক্যাশ! আহ্‌ বহু বহু দিন পর! গিটারের ছন্দ কানে যেতেই কাশি, রক্ত, রগ- সমস্ত কিছু ওর তুচ্ছ লাগতেছে। মিউজিকের তালে তালে মাথা দোলাতে দোলাতেই ও কেশে যাইতেছে ক্রমাগত। দলা দলা রক্ত মিশ্রিত থুথু বেসিনে ফেলতে গিয়ে একবার গাইতে চেষ্টা করলো গুন গুন করে- “আই ওয়্যার দিস ক্রাউন অফ থর্নস…অ্যাপন মাই লায়ার’স চেয়ার…ফুল অফ ব্রোকেন থটস…আই ক্যাননট রিপেয়ার…।”  খুব বেশি আগাতে পারলো না যদিও, কাশি বাড়লো আরো দ্বিগুণ ফোর্সে। নাহ! যার যা কাজ, তাকে করতে দিতেই ছেড়ে দেওয়া লাগে স্থান- ওর মনে হলো। নিজের গাওয়ার খায়েশে তাই ফুল স্টপ দিয়ে বাকিটুকু জনি ক্যাশকে একা গাইতেই ফ্লোর ছেড়ে দিলো-

বিনিদ দ্য স্টেইনস অফ টাইম
দ্য ফিলিংস ডিজঅ্যাপিয়ার
ইউ আর সামওয়ান এলস
আই অ্যাম স্টিল রাইট হেয়্যার…

চেজিং দ্য ড্রাগন: সিন ক্রিয়েট

Comments

    Please login to post comment. Login