Posts

উপন্যাস

চেজিং দ্য ড্রাগন: সিন ক্রিয়েট

April 10, 2026

Shifat Binte Wahid

Original Author সিফাত বিনতে ওয়াহিদ

99
View

দ্য ট্রুথ ইজ আই অ্যাম অ্যা টয় দ্যাট পিপল এনজয়
টিল অল অফ দ্য ট্রিকস ডোন্ট ওয়ার্ক এনিমোর
অ্যান্ড দেন দে আর বোরড অফ মি
আই নো দ্যাট ইট’স এক্সাইটিং, রানিং থ্রু দ্য নাইট
বাট এভ্রি পারফেক্ট সামার’স ইটিং মি অ্যালাইভ আনটিল ইউ’র গন
বেটার অন মাই য়ৌন…

তুমুল বৃষ্টির পর ভেজা পাখির মতো পাখ ঝাড়া দিয়ে পিয়ানোর সুর আর লর্ডের কণ্ঠে আকাশটা নিমগ্ন হয়ে আছে। কার্নিশে জমে থাকা বৃষ্টির পানি ফোঁটায় ফোঁটায় টপ…টপ…টপ…রিদমে পড়তেছে বারান্দার ফ্লোরে। থোকায় থোকায় ফুটে থাকা লাল-বেগুনী-গোলাপী রঙের অধৈর্য্য ফুলের উপর বিন্দু বিন্দু পানি চুপ করে স্থির বসে আছে। এক ঝাঁক শুভ্র নয়নতারা মৃদু হেলেদুলে ঝেড়ে ফেলতেছে জমে থাকা পানির ছিটেফোঁটা। পাশেই ফুলবিহীন কাঁঠালিচাঁপার সরু পাতা চুয়ে পানি নামতে চেয়েও থেমে থাকতেছে গোলাকার বিন্দু হয়ে।

দুই পাশে কাঁচা হলুদ রঙের বর্ডার আর মাঝের সাদা অংশ জুড়ে থাকা নীল রঙের প্রিন্ট করা ফুলের পর্দা জোড়া ঘরের মস্ত জানালা গলে আসা তুমুল বাতাসে প্রকাণ্ড ঢেউয়ের মতো ওড়ে ওড়ে একে অপরের গায়ে হেলে পড়লো বেশ কয়েকবার। বাতাসের গতি কমলো কি না, ঠিক বোঝা গেল না। তবে মুহূর্তের জন্য থেমে গেল পর্দা যুগলের ওড়াওড়ি। কিছুটা নড়েচড়ে ফের ওড়বার প্রস্তুতি নিতে গিয়েও হঠাৎ মাঝখানে এক হাত দূরত্ব রেখে অভিমানরত যুগলের মতো দুইজন চুপ করে দুই পাশে সরে বসলো। বাতাসের গতি-প্রকৃতির মতো তাদের দূরত্বের কারণটাও দুর্বোধ্য।

দুই রুমের ছোট্ট স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের বারান্দা ঘেঁষা টিপটপ ছোট্ট বেড কাম স্ট্যাডিরুমে কোনো বেড না থাকলেও একটা বেডসাইড টেবিল আছে, এর উপর ছোট্ট একটা স্ট্যাডি ল্যাম্প। এর ঠিক পাশেই ৫/৭ ফুটের মোটা জাজিম-তোশকের উপর টান টান করে বিছানো সোনালী হলুদ রঙের ভেতর বিশালাকৃতির নীল-সাদা ফুলের বেডশীট। 

এর আরেক পাশে ল্যাপটপের ছোট ফোল্ডিং টেবিল। ঘরে ঢুকেই ডান পাশে একটা উড কালার চার ড্রয়ার বিশিষ্ট ওয়ারড্রব আর ঠিক উল্টা পাশে রাখা একই রঙের পাঁচ তাক বিশিষ্ট একটা বুকশেলফই এই ঘরের মূল আসবাবপত্র। জানালার ঠিক উপরে অবশ্য মিডিয়ার দেড় টনের একটা নন ইনভার্টার এসিও আছে। 

মাস খানিক আগে অধিকাংশ সময় ফাঁকা থাকা এই ফ্ল্যাটের ছোট্ট রুমটার ওয়ালে ৩২' ভিশন এলইডি স্মার্ট গুগল টিভি লাগানো হইছিল অকারণেই। এর ঠিক ডান পাশের দেয়ালটা এক রিল অটাম লিভস ডিজাইনের ওয়ালপেপার দিয়ে মোড়ানো। এর মাঝ বরাবর ছোট ছোট ছবির ফ্রেমগুলার প্রথমেই দুই পায়ের ভাঁজে রাখা বই পড়ায় মগ্ন হয়ে আছে সিলভিয়া প্লাথ, পাশেই সাত রঙের ছোঁয়ায় দ্য লিজার্ড কিং জিম মরিসনের প্রতিকৃতি।

এর নিচে বাঁম পাশের ফ্রেমটায় পদ্মার পাড়ে অন্ধকার রাতে বসে থাকা দুইজন মানুষের হাতের ছবি বন্দি হয়ে আছে। ওইটাই ওই দুইজনের একমাত্র ফ্রেমে বন্দি স্মৃতি। ডান পাশে পৃথিবীর জটিলতা থেকে তখনও যোজন যোজন দূরে থাকা নয় বছর বয়সী ছোট্ট বালিকার কাঁধে হাত রেখে জগতের সবচেয়ে সুদর্শন বাবা দাঁড়িয়ে আছেন সাদা পোলো টি-শার্ট আর নীল জিন্স প্যান্টে।

বেড সাইড টেবিলের পাশের ফাঁকা ফ্লোরটায় সকাল থেকে খালি পড়ে আছে কফির মগটা। তলানিতে অল্প কফি জমে কালচে দাগ হয়ে আছে। এর পাশেই দশ টাকা দামের ভাঙা মাথার দুইটা লাইটার বেওয়ারিশ পড়ে আছে। একটায় সামান্য গ্যাস বাকি, অন্যটা ফুল লোডেড। ছোট্ট নোট প্যাডের ওপর ভদ্রভাবে সহাবস্থান করতেছে সাদা স্কচ টেপ পেঁচানো নতুন একশ টাকার পাইপ আর পাঁচ টাকার কয়েন। সঙ্গে সুঁই বসানো বিশ টাকা দামের নীল রঙা লাইটারটাও কিছুটা জায়গা দখল করে আছে।

এর পাশ ঘেঁষেই উপুড় হয়ে আছে- দ্য প্লেজার্স অফ দ্য ড্যামড। ১৯৫১-১৯৯৩ সাল পর্যন্ত চার্লস বুকোস্কির সিলেক্টেড পোয়েম। ২১৫ তে এসে উল্টিয়ে রাখা পেজটা খুললেই বের হয়ে আসবে- মাই ফেইলিয়র। একটা সিগার ঠোঁটে চেপে ধরে বুকোস্কি নিজেই যেন ওইখান থেকে পড়া শুরু করে হাস্কি ভয়েজে-

উই হ্যাভ হ্যাড অ্যা ভেরি ব্যাড আর্গুমেন্ট
অ্যান্ড আই সিট ইন হেয়ার
স্মোকিং সিগারেটস ফ্রম ইন্ডিয়া
অ্যাজ অন দ্য রেডিও
অ্যান অপেরা সিঙ্গার’স প্রেয়ারস আর নট ইন মাই ল্যাঙ্গুয়েজ।

আউটসাইড, দ্য উইন্ডো টু মাই লেফট রিভিলস
দ্য নাইট লাইটস অফ দ্য সিটি
অ্যান্ড আই অনলি উইশ
আই হ্যাড দ্য কারেজ টু ব্রেক থ্রু দিস সিম্পল হরর 
অ্যান্ড মেক থিংস ওয়েল অ্যাগেইন 
বাট মাই পেটি অ্যাঙ্গার প্রিভেন্টস মি।

রিয়ালাইজ হেল ইজ অনলি হোয়াট উই ক্রিয়েট, 
স্মোকিং দিজ সিগারেটস,
ওয়েটিং হেয়ার…

জানালার পর্দা দুইটায় একটা আস্ত দুপুরের বিষণ্নতা ভর করলো বোধহয়। কার্নিশ চুয়ে অনেকটা সময় নিয়ে নিচে এসে পড়লো জমে থাকা শেষ পানির বিন্দু। সমস্ত শহর যেন ভাত-ঘুমে অচেতন হয়ে আছে লম্বা সময় ধরে। কেবল এই ছোট্ট ঘরের ব্লু টুথ স্পিকার থেকে ভেসে আসা পিয়ানোর সুরের সঙ্গে নির্জন এই দুপুরটাও যেন কোরাসে গেয়ে ওঠতেছে-

দে সে, "ইউ’র অ্যা লিটল মাচ ফর মি
ইউ’র অ্যা লায়াবিলিটি
ইউ’র অ্যা লিটল মাচ ফর মি"

সো দে পুল ব্যাক, মেক আদার প্ল্যানস
আই আন্ডারস্ট্যান্ড, আই অ্যাম অ্যা লায়াবিলিটি

গেট ইউ ওয়াইল্ড, মেক ইউ লিভ
আই অ্যাম অ্যা লিটল মাচ ফর
ই-আ-না-না-না, এভ্রিওয়ান

দে’র গনা ওয়াচ মি ডিজঅ্যাপিয়ার ইনটু দ্য সান
ইউ’র অল গনা ওয়াচ মি ডিজঅ্যাপিয়ার ইনটু দ্য সান...

লর্ডের ভয়েজ বেড কাম স্ট্যাডিরুম থেকে ভেসে এসে বাড়ি খাইতেছে ওয়াশরুমের সাদা টাইলসের ওয়ালে। নিচেই ফ্লোরে জমাট বাঁধা রক্তের মধ্যে পড়ে আছে স্নেহা। বেসিনের কর্নার বেয়ে ফোঁটা ফোঁটা রক্ত পড়তেছে ওর মাথার উপরে। মাথার ফেটে অথবা কেটে যাওয়া অংশ থেকে ব্লিডিং বন্ধ হয় নাই এখনো।

কাটা জায়গা থেকে রক্তের স্রোত চোখ-মুখ-নাক বেয়ে বুকের উপর গ্রে টি-শার্টটায় লেপ্টে আছে। স্নেহা শুনতে পারতেছে, ব্লু টুথ স্পিকার থেকে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত এক কণ্ঠ যেন অস্ফুট স্বরে শেষবারের মতো বললো- “ইউ’র অল গনা ওয়াচ মি ডিজঅ্যাপিয়ার ইনটু দ্য সান…”।

মাথা ঘুরিয়ে বেসিনের কর্নারে বাড়ি খেয়ে ফ্লোরে পড়ার কয়েক সেকেন্ড আগেই বেসিনের পানির ট্যাপটা বন্ধ করছিল স্নেহা। তুমুল কাশির সঙ্গে বের হওয়া তাজা রক্তের প্রবাহ যুদ্ধ বিরতি ঘোষণা করলে স্নেহা হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে যাওয়ার জন্য কেবল পা বাড়াতে যাবে, তখনই হঠাৎ মাথাটা ৩৬০ ডিগ্রি এঙ্গেলে একটা ঘুরান দিলো।

মুহূর্তেই ব্যালেন্স হারিয়ে মাথাটা ধড়াম করে বেসিনের কর্নারে বাড়ি খেতেই সমস্ত দুনিয়া অন্ধকার হয়ে গেল। শরীরটাও সঙ্গে সঙ্গে ঢলে পড়ে গেল ফ্লোরে। কপাল ফাটলো না মাথা, বোঝা গেল না। শুধু ফিনকি দিয়ে রক্তের স্রোত টের পাওয়া গেল। কণ্ঠনালী থেকে আসা রক্তের অল্প দাগ থেকে যে গ্রে টি-শার্টটা বাঁচাতে ঘণ্টাখানিক আগে ও ওয়াশরুমে আসছিল, এখন এর পুরাটাই রক্তে ভিজে সয়লাব হয়ে আছে।

মাথাটা বেসিনে বাড়ি খাওয়ার পর কিছু বোঝার মতো অবস্থায় ছিল না স্নেহা। ঠিক কতক্ষণ এভাবে বেসিনের নিচটায় পড়ে আছে, এখান থেকে বের না হলে বুঝতেও পারবে না। মাথা আর কপাল প্রচণ্ড যন্ত্রণায় টনটন করতেছে। রক্ত জমাট বেঁধে চোখের ভ্রু আর পাপড়িতে শক্ত হয়ে আছে। ঝাপসা চোখেই একবার আব্বার মুখটা দেখলো ও। ঠোঁটের কোনায় একই রকম মায়াভরা হাসি লেগে আছে। আম্মাকেও দেখা যাইতেছে। গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। রাগ না ঠিক, বিরক্তিও না, কী যেন একটা গভীর চিন্তার ছাপ আম্মার সমস্ত চোখে-মুখে।

চোখটা পুরাপুরি খোলার চেষ্টা করেও পারা যাচ্ছে না। মুখের ভেতর নোনতা স্বাদ ফিল করলো। গলা শুকিয়ে কাঠ। কাশিটা আবারও শরীরের ভেতর থেকে পুরা ফোর্সে বের হতে গিয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে। সামান্য শব্দে শরীরটা হালকা কাঁপিয়ে বের হতেই মাথাটা আবার তীব্র ব্যথায় টনটন করে ওঠলো। রক্তে লেপ্টে থাকা শরীরটাকে টেনে দেয়ালে হেলান দিয়ে বসার চেষ্টা করলো পর পর তিনবার। পারলো না।

চতুর্থবার চোখ বন্ধ করে বললো-  আমি তো এরচেয়ে বেশি লানতের মউতের জন্য প্রস্তুত হয়ে আছি। শরীরের ভেতর থেকে এবার কে যেন একটা সজোরে ধাক্কায় দেয়ালে হেলান দিয়ে বসার শক্তি জুগিয়ে দিলো স্নেহাকে। কোনো রকম দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসেই ও বিড় বিড় করলো- আল্লাহুম্মা লাকাল-হামদু শুকরান, ওয়ালাকাল-মান্নু ফাদলান।

চোখ বন্ধ থাকা অবস্থাতেই হাতাতে হাতাতে পাশের ট্যাপটা খুঁজে বের করলো। বার কয়েক মোচড় দিতেই পানির ছিটা এসে গায়ে লাগলো। মাথাটা খুব সাবধানে ট্যাপের নিচে নিতেই ব্যথার জায়গাটা তেতে জ্বলে ওঠলো। সরলো না, ওইভাবেই থাকলো।

মাথা বেয়ে আসা পানির কিছুটা গলা পর্যন্ত যেতে দিলো। কিছু একটা মনে করার চেষ্টা করতেই কানের কাছে শুনলো আবরার প্রশ্ন করতেছে- ভাই, মানুষের তো মানুষের জন্য নানা কারণে ভালোবাসা ফিল হতে পারে। মানুষ হিসাবেই মানুষের প্রতি ভালোবাসার কথা বলছি। আপনি কি আপার জন্য ওইটাও ফিল করেন নাই?

এরপর আবিরের কণ্ঠ শোনে স্নেহা। খুব অপ্রত্যাশিত প্রশ্নের অপ্রস্তুত উত্তর দিতে গেলে মানুষের কণ্ঠে শেকি ভাব থাকে, ওই রকম ভাবে সে বলতেছিল- আমি…আমি কোনোদিন উনাকে ভালোবাসার কথা বলি নাই। আমি কোনোদিন বলি নাই উনাকে আমি ভালোবাসি। নিজের হাসির শব্দও শুনতে পায় সঙ্গে সঙ্গে। হাসতে হাসতে সে বলে, আপনি বলছেন। একবার না, একাধিকবার। এখন চাইলে অস্বীকার করতে পারেন।

আবির পাল্টা জানতে চায়, কবে বলছি,বলেন? স্নেহা আবার হেসে বলে, বাদ দেন। আপনি যা বলবেন, তা-ই ঠিক। আমি দিনক্ষণ মনে করাতে আজকের সেশনে বসি নাই। সম্ভবত ওই পুরা সেশনে ওই একবারই স্নেহা কথা বলছিল। এরপর আর ইচ্ছা হয় নাই, রুচিও না। স্নেহা খেয়াল করলো, মাথার জ্বলতে থাকা অনুভূতিটা এখন সহনশীল লাগতেছে। চোখ বন্ধ রেখেই হেসে ও ভাবে, কলিজা পোড়া যন্ত্রণার কাছে এইসব ইনজুরি বোধহয় খুব মামুলি!

মাথার আঘাতে ব্রেইন ঠিকঠাক আছে কি না চেক করতে স্নেহা আরেকটু পেছনে যাওয়ার চেষ্টা করলো। ২৪ জুন, ২০২৫। রাজশাহীতে ওই গাড়ি এক্সিডেন্টের নয়দিন পর সকালে হঠাৎ আবির স্নেহাকে জানায় ও ঢাকাতে। হাতে সময় কম, দেখা করতে চাইলে তখনই কিংফিশারে যেতে। এক্সিডেন্টের পর আবিরের সঙ্গে দেখা হওয়ার আশা অনেকটাই ছেড়েই দিছিল স্নেহা।

ওর মন বলতেছিল হয়তো বহুদিন ওদের দেখা হবে না। ওই ঘটনার পর দেখা করার কথা ও আর বলবেই বা কীভাবে, ওইটাই তখন ওর বারবার ভেবে মন খারাপ হইতেছিল। তাই আচমকা ওই দেখা হওয়ার সুযোগটা ওর জন্য অনেক বড় প্রাপ্তি ছিল। কিন্তু শেষটা তো হতে হবে কদর্য- এমনটাই ভাগ্যের লেখনে বরাদ্দ। খোদা না চাইলে কে আর তা খণ্ডাতে পারে?

কিংফিশারে ঘণ্টা খানিক বসার পর আবির ক্যান্টনমেন্ট হয়ে এয়ারপোর্টে যাবে। সন্ধ্যার ফ্লাইটেই ওকে রাজশাহী ফিরতে হবে। বিদায় নেওয়ার আগে আবির বললো, আবার কবে দেখা হবে, ঠিক নাই কোনো। স্নেহার খুব ইচ্ছা করে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আবিরের সঙ্গে যেতে। আবিরকে নিজের কোনো ইচ্ছার কথা বলতে বরাবরই স্নেহা ইতস্তত বোধ করে। হাজারবার চিন্তা করে বলবে কী বলবে না, বললেও কীভাবে বলবে। কীভাবে বললে ও প্রেশার ফিল করবে না, বিরক্তও হবে না।

অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্ব নিয়ে শেষ পর্যন্ত বলেই ফেলে, আমি তোমার সঙ্গে এয়ারপোর্ট পর্যন্ত গেলে কি খুব সমস্যা হবে? আবির সঙ্গে সঙ্গে মাথা নাড়িয়ে মানা করে দিয়ে বলে ও এক্সিডেন্টের ঘটনার পর সারভেইল্যান্সের ভেতর আছে। ওর সঙ্গে এয়ারপোর্ট যাওয়া সম্ভবই না।

স্নেহার শুধু মনে হইতেছিল, এবার চলে গেলে যদি আর কোনোদিন দেখা না হয়! কিছুক্ষণ চুপ থেকে ও আবার বলে, তাহলে তুমি আলাদা গাড়িতে যাও, আমি আলাদা গাড়িতে যাবো। এয়ারপোর্টের গেটে দাঁড়িয়ে দূর থেকে শুধু একবার তোমাকে দেখেই চলে আসবো।

আবির ওইটাও মানা করে। স্নেহা বুঝতে পারে না ও এয়ারপোর্টে দূর থেকে দাঁড়িয়ে ওকে দেখাতে কী সমস্যা হবে! ও তো সামনে যাবে না। কথাও বলবে না। আবির রাজি হয় না। আবার কবে দেখা হবে, এর কোনো নিশ্চয়তা নাই। এক্সিডেন্টের এই ঘটনা কতদূর গড়ায়, সেটাও বোঝা যাচ্ছে না।

স্নেহা চাইলেও আর রাজশাহী যেতে পারবে না। আবিরকে কি আর কোনোদিন ও দেখা করতে আসতে বলতে পারছে! তাছাড়া ঢাকায় কখনোই আবির ওর সঙ্গে দেখা করতে আসে নাই। কাজের ফাঁকে দেখা করছে, সেটা নিজের ইচ্ছাতেই করছে। এই দেখা করার জন্য ওকে কেউ জোরজবরদস্তি অথবা ভয়ভীতি প্রদর্শন কোনোদিন করে নাই।

ও দীর্ঘদিন ঢাকায় আসতে পারতেছিল না তাই স্নেহা কয়েক মাস রাজশাহী গিয়ে দেখা করতে চাইছে। এই এতটুকুই স্নেহার চাওয়া ছিল পুরা দুই বছরে। স্নেহা আরেকবার আবিরকে বলে, যাই না? কী হবে? দূর থেকে দেখবো। কাছে যাবো না। তোমার আমার দিকে তাকাতেও হবে না। টার্মিনালে ঢোকার আগ পর্যন্ত দাঁড়াবো, তুমি ভেতরে ঢুকে গেলেই চলে আসবো।

আবির এর উত্তরে ওর পুরানো ডায়লগটা দেয়- ইউ নেভার আন্ডারস্ট্যান্ড মাই ইস্যুজ। হয়তো সত্যিই তাই, স্নেহার তখনও মনে হতো, এখনো মনে হয়। কিন্তু আবিরও ঠিকঠাক বুঝতে পারছিল সব? বিপিডি অথবা ট্রমা বন্ডিং-এর মতো টার্মসগুলার বাইরে গিয়ে? ভয়! শব্দটা মাথায় খট করে টোকা দিতেই স্নেহা নিজের রক্তমাখা অবয়ব নিয়েই কিছুটা জোরে হাসতে চেয়ে ব্যর্থ হয়। মাথায় টান লাগে হাসতে গেলে।

যদি ভয়ই সত্য হয়, স্নেহা ধরেই নিলো কিছু মুহূর্তের জন্য সত্য; নিজের ভয়ের কারণে কেউ আরেকজনের জীবনকে এইভাবে বিপন্ন করে তুলতে পারে? ভয়ের জন্য কাউকে ইমোশনালি ডেস্ট্রয় করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিতে পারে চাইলেই? নিজেও এসব কারণে যেচে অশান্তি ডেকে আনে নিজের জীবনে? অদ্ভুত! মাথায় টান খেয়েও স্নেহা এবার সত্যি সত্যিই জোরে হেসে উঠলো। বেশিক্ষণ হাসা গেল না, দীর্ঘক্ষণ এই টপিকে হাসতে না পেরে স্নেহার একটু কষ্টই লাগলো।

এরচেয়ে বরং ওইদিনের মেমোরি রি-কল করাই ভালো। স্নেহার মনে পড়ে, ও বেশ ভালোই ড্রাঙ্ক ছিল। এরমধ্যে আবির নিজেই বলছে আবার কবে দেখা হবে, ঠিক নাই। হয়তো অনেকদিন দেখা নাও হতে পারে। স্নেহার অস্থির মন তাই এয়ারপোর্টে আবিরের বিদায়ের সময়টাতে দূর থেকে দাঁড়িয়ে ওকে আরেকবার দেখতে চাইতেছিল। এর বিপরীতে আবিরের চিরাচরিত ডায়লগ শুনে মনটা যেমন খারাপ হয়, কিছুটা রেগেও যায় ও। 

কিংফিশার থেকে বিদায় নিয়ে ক্যান্টনমেন্টে চলে যায় আবির। স্নেহা একটা উবার কল করে যায় এয়ারপোর্টের দিকে। ডোমেস্টিক টার্মিনালের ওঠার রাস্তার মুখটায় উবার থেকে নামে ও। কতক্ষণ ওইখানে, কতক্ষণ এর উল্টা পাশে দাঁড়িয়ে গাড়ির আসা-যাওয়া দেখতে থাকে। 

ওইদিন দুপুর থেকেই গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি পড়তেছিল। বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই আবিরকে টেক্সট করে জানিয়ে রাখলো ও এয়ারপোর্টে আসছে; টার্মিনালে ঢোকার আগের রাস্তাটায় দাঁড়িয়ে আছে, আবিরকে একটু দেখেই চলে যাবে। আবিরের গাড়ি গেট দিয়ে ঢোকার আগে যেন ও জানায়।

ঘণ্টা খানিক এভাবে বৃষ্টিতে ভিজে গাড়ির আসা-যাওয়া দেখতে গিয়ে কয়েকবার শরীরের ব্যালেন্স হারিয়ে ফেলতেছিল স্নেহা। দুই একবার এইদিক ওইদিক হেলে পড়তে নিয়ে সামলালো। এয়ারপোর্টে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা আনসার বাহিনীর একজন দূর থেকে অনেকক্ষণ স্নেহাকে দেখতেছিল সম্ভবত। কাছে এসে স্নেহা কোন ফ্লাইটে যাবে জানতে চাইলো। ও অসুস্থ কি না, ওইটাও জিজ্ঞেস করলো।

স্নেহা কিছু না ভেবেই উত্তর দিলো, ৬টার ফ্লাইটে রাজশাহী যাবে। উনি আবার জানতে চায় স্নেহা অসুস্থ কি না, কয়েকবার স্নেহাকে পড়ে যাইতেছে বলে মনে হইছে তার। স্নেহা বলে, ও অসুস্থ না। ঠিক আছে। লোকটা ওকে বৃষ্টিতে না দাঁড়িয়ে ভেতরে গিয়ে বসতে বললে স্নেহা তাকে একজনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছে বলে। কয়েক মিনিট স্নেহার দিকে তাকিয়ে থেকে লোকটা চলে গেল।

প্রায় এক ঘণ্টা পর আবির স্নেহার টেক্সটের রিপ্লাই দিয়ে জানায়, ও অলরেডি টার্মিনালের ভেতরে ঢুকে গেছে। একটু পর বোর্ডিং ক্রস করবে। ওই মুহূর্তে নিজের রাগ আর কন্ট্রোল করতে পারলো না স্নেহা। এক ঘণ্টা যাবত ও বৃষ্টিতে দাঁড়িয়ে ভিজতেছে দূর থেকে আবিরকে একবার দেখার আশায়।

এক ঘণ্টা আগে পাঠানো টেক্সট আবির নিশ্চয় ওই মাত্র দেখে নাই! ইচ্ছা করেই এয়ারপোর্টে ঢুকে যাওয়ার পর উত্তর দিছে। রাগে, অপমানে, জেদে, অভিমানে স্নেহার চোখ দিয়ে অনবরত পানি পড়তে থাকলো। ওর মনে হলো, আবিরের কাছে ও কখনোই কিছু চায় না। খুব সামান্য কিছু যদি কখনো চায়ও, আবির সেটাও দিতে পারে না বা দেওয়ার চেষ্টাটাও জোর দিয়ে করে না।

একদিকে স্নেহা ড্রাঙ্ক। আরেকদিকে ওই মুহূর্তে একটা অ্যাব্যান্ডন ফিলিং ওকে প্রচণ্ড ট্রিগার করে। বারবার ওর মনে হতে থাকে, ইচ্ছা করলেই আবির এয়ারপোর্টের টার্মিনালে ঢোকার আগে দূর থেকে একবার স্নেহাকে দেখতে দিতে পারতোই তো চাইলে। ইচ্ছা করেই ও দেখতে দেয় নাই। প্রচণ্ড রাগে যা মনে আসে আবিরকে টেক্সট করতে থাকে। অনেক আজে-বাজে কথাই আসলে ও ওই সময় আবিরকে টেক্সট করে। স্নেহার মনে হইতেছিল, আবিরের কাছে ও একটা কিছুই না। ওর ইচ্ছা-অনিচ্ছারাও জাস্ট ওরই মতোই- কিছুই না।

ভয়ংকর জেদ চাপে স্নেহার। টেক্সটে আবিরকে জানায়, ও টার্মিনালের ভেতরে যাচ্ছে, দেখা করতেই হবে। রাগে ওর মাথা কাজ করতেছিল না। বারবার শুধু মনে হইতেছিল, আবিরের সঙ্গে বোধহয় আর কোনোদিন ওর দেখা হবে না। ও অস্থির হয়ে একটার পর একটা টেক্সট করতে থাকে। আবির ওকে শান্ত হয়ে বাসায় ফিরতে বলে।

রাগ আর জেদে কাঁদতে কাঁদতে স্নেহা টেক্সটে করে বলে, আবির ইচ্ছা করে ওকে পেইন দিছে, সবসময় দেয়। ও একটা চিপ হোর যে তবুও আবিরের এসবে কষ্ট পায়। এরপর পরই আবার টেক্সট করে, আবির যদি এখন দেখা না করে, স্নেহা ওর ওয়াইফকে কল করবে। ওইবারই প্রথম স্নেহা ওই কথাটা বলে। কেন বলে, নিজেও জানে না। প্রচণ্ড রাগ আর জেদে ওর মাথা তখন ঠিক ছিল না। আবির স্নেহার টেক্সটের উত্তরে লেখে- ইউ হ্যাভ অলরেডি ডেসট্রয়েড মাই এভ্রিথিং!

যদিও পরবর্তী সময় বহুবার আবির সর‍্যি হয়ে স্নেহাকে বলছে রাগের মাথায়, ড্রাঙ্ক অবস্থায় আর স্নেহা পাগলামী করতেছিল বলে ওই টেক্সট পাঠাইছিল। ও নাকি ওইটা মিন করে লেখে নাই। কিন্তু শেষদিন আবরারকে আবার ঠিকই ও স্টেটমেন্ট দেয়, লাস্ট দুই বছরে নাকি ও সব হারাইছে। যদিও এর জন্য ও কাউকে ব্লেইম করতেছে না- এমন একটা লাইন সঙ্গে সঙ্গেই আবার আগের বাক্যের সঙ্গে লেজ লাগিয়ে বলার ট্রাই করছে।

স্নেহার ব্রেইন তো আর গোবরে ভরা না, আবির যে ওকে ইন্ডিকেট করেই ওই কথা বলছে, এটা বুঝতে ওর আবিরের বাক্যকে দ্বিতীয়বার ব্যবচ্ছেদ করার প্রয়োজন পড়ে নাই। প্রকারান্তরে তো আবির গত দুই বছরে ওর সঙ্গে ঘটা সব খারাপ কিছুর জন্য স্নেহাকেই দায়ী করছে আসলে। ওর ড্রাঙ্ক হয়ে এক্সিডেন্টের জন্যও, মোর‍্যাল টারপিটিউডের লেটার পাওয়ার জন্যও, কমান্ডিং অফিসার পদ হারানোর জন্যও, ফ্যামিলিকে ছেড়ে আবার অন্য জায়গায় পোস্টিং হওয়ার জন্যও এবং শেষমেশ ওর সংসারে অশান্তির জন্যও।

শেষটার দায় স্নেহা কিছুটা নিতে রাজি আছে, তবে স্নেহার চেয়ে বেশি দায় ওইখানে আবিরের নিজেরই বোধহয়। আবিরের কথাটা আবার কানে বাজে- গত দুই বছরে আমি সব হারাইছি। স্নেহার খুব ইচ্ছা করতেছে, আবিরকে স্নেহার এই মুহূর্তের কন্ডিশনটা স্বচক্ষে দেখিয়ে বলতে- সি…দ্যাটস হোয়াট ইউ মেড মি! সঙ্গে এই প্রশ্নটাও করতে- এক জীবনে এরচেয়ে বেশি মানুষ কী হারাতে পারে? হা হা হা!

আবিরের সবকিছু ও ডেস্ট্রয় করে ফেলছে লেখা টেক্সটটা এয়ারপোর্টের বাইরে বৃষ্টির মধ্যে দাঁড়িয়ে পাওয়ার পর প্রচণ্ড ধাক্কা খায় স্নেহা, কষ্টও পায়। বুকে সঙ্গে সঙ্গেই ও একটা চাপ ফিল করতেছিল। পর মুহূর্তেই ওর মাথায় রক্ত চাপে। ও কোনোকিছু আর না ভেবেই টিকেট কাউন্টারে গিয়ে রাজশাহী যাওয়ার নেক্সট ফ্লাইটের টিকেট কেটে ফেলে। 

আবির কোন ফ্লাইটে যাচ্ছে বা ওর ফ্লাইট কয়টায়, স্নেহা এর কিছুই জানতো না। কেনই বা ও রাজশাহীর ফ্লাইটের টিকেট কাটলো, তাও ও জানে না। ওর তখন টার্মিনালের ভেতরে ঢুকতে হবে, এইটুকুই শুধু ও জানতো।

সিকিউরিটি চেকিং পার হতেই স্নেহা শুনতে পেলো আবির ডাকতেছে- স্নে…হা! ও আবিরের দিকে না তাকিয়েই বললো, কী হইছে? এখন ডাকতেছো কেন? কতবার বলছিলাম, রিকোয়েস্ট করছিলাম, একটাবার যাওয়ার সময় তোমাকে দেখতে দিও দূর থেকে। কথা শুনছিলা? তুমি এখন তোমার পথে যাও। আমিও রাজশাহী যাবো। আবির ওর পেছন পেছন এসে স্নেহাকে বললো, হোয়াই ইউ আর ডুয়িং দিস?

ওইদিন কাকতালীয়ভাবে একই ফ্লাইটেরই টিকেট কাটে স্নেহা। আবির আগেই বোর্ডিং ক্রস করে চলে যায়। স্নেহা একটু পর এয়ারলাইন্সের শাটল বাসে ওঠতে গিয়ে দেখে আবির বসে আছে। ওকে দেখে আবির ডেকে পাশে বসায়। স্নেহা তখনও গজ গজ করতে করতে পাশে গিয়ে বসে। ফ্লাইটে ওঠার পর আবির ওর পাশের সিটের ভদ্রলোককে রিকোয়েস্ট করে স্নেহার সিটটায় বসতে বলে ওকে আবিরের পাশে বসায়।

পুরা ৫০ মিনিট স্নেহাকে নানা কথা বলার চেষ্টা করে আবির। স্নেহার রাগ তবু কিছুতেই কমতেছিল না। ওর বারবারই মনে হইতেছিল, টার্মিনালের বাইরে একটাবার দূর থেকে দেখতে দিলেই ওই কাণ্ড তখন ঘটে না। আবির কথা বলতে নিলেই ওই রাগে স্নেহা যা মুখে আসতেছিল, বলে যাইতেছিল। আবির কী করবে বুঝতে পারতেছিল না। কয়েকবার ওর হাতটা ধরতে চাইলেও স্নেহা বারবারই ঝাড়া দিয়ে সরিয়ে ফেলতেছিল।

আবির মাঝে মাঝে বলতো স্নেহা এত সেন্সেটিভ যে ওকে ডিল করা যায় না। স্নেহা সেন্সেটিভ, এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নাই। আবিরের ক্ষেত্রে ও সুপার সেন্সেটিভ ছিল। কিছু হলেই ওর মনে হতো, সবাই যা খুশি বলুক বা করুক, আবির কেন ওর সঙ্গে এটা করবে! অথবা দুনিয়ার আর কেউ এটা-ওটা না করলেও কিছু যায় আসে না, আবির কেন করলো না।

আবির কেন এটা বললো, আবির কেন ওইটা বললো না। আবির কেন এভাবে না বলে ওইভাবে বললো! আহারে! অভিমানে একটা ছোট্ট বাচ্চার মতো গাল ফুলিয়ে কত অভিযোগ ছিল আবিরের প্রতি স্নেহার। আবির ছিল একটা গোটা পৃথিবী। ওই পৃথিবীকে কেন্দ্র করেই স্নেহা বেঁচে থাকার রসদ জোগাড় করতো।

আবিরের মতো মানুষদের এসব বোঝার মতো হৃদয় কিংবা বোধ-অনুভূতি নাই মনে হয়। ওরা বোধহয় ‘ট্রমা বন্ডিং’ এর মতো কোনো একটা ক্লিনিক্যাল টার্মে ব্যাপারটাকে ফেলতে পারলে মুক্ত হওয়ার পথ খুঁজে নিতে পারে সহজে; তাও আবার সাক্ষী-সবুদ রেখে- এমন ভাবনা স্নেহার মনে আসে মাঝেমাঝে।

রাজশাহীতে পৌঁছানোর পর ফ্লাইট থেকে নামার আগে আবির স্নেহাকে বলে, আই হ্যাভ টু গো। মাই কার ইজ ওয়েটিং। স্নেহার রাগ তখনও কমে নাই। ও জোরে জোরেই বলে, আপনাকে কেউ আটকে রাখে নাই। যান। জাস্ট গো! আবির নেমে কয়েক মিনিট দাঁড়ায়। স্নেহা ওর পাশ দিয়ে হেঁটেই এয়ারপোর্টের গেটের উল্টা পাশের টিকেট কাউন্টারে যায়।

ঢাকায় ফেরার নেক্সট ফ্লাইটের টিকেট কেটে পাঁচ মিনিটের মধ্যেই ফিরে এসে আবিরকে কোথাও আর দেখলো না। এয়ারপোর্টে ৪০ মিনিট বসে থাকার পুরাটা সময়ই ওর চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। ফ্লাইটে ওঠে ঢাকায় ফেরার ৫০ মিনিট, ঢাকায় নেমে এয়ারপোর্ট থেকে বাসায় ফেরার আগ পর্যন্ত- ওইদিনের পুরা ঘটনাটাতে রাগে আর কষ্টে কান্না থামাতেই পারতেছিল না ও।

ওই সিন ক্রিয়েটটা আবির শেষদিন পর্যন্ত শুধু মনেই রাখে নাই, নিজের যুক্তির পক্ষে টুলস হিসাবে ইউজ করতে মেনশনও করছে। এই রকম আরো কিছু ইনসিডেন্ট ঘটছিল যেগুলা আবির মনে রাখছে। একবার স্নেহা আবিরের মেয়ের জন্য সামান্য কিছু শপিং করতে গিয়ে বিল দেওয়ার সময় আবির ওর ক্রেডিট কার্ড নিয়ে টানাটানি শুরু করলো।

বিল দিতে দেবে না। অথচ ওইখানে যাওয়ার আগে স্নেহা বারবার আবিরকে বলে গেছে এমন কিছু করতে না যেটাতে ও রেগে যায়। বিল দেওয়া প্রসঙ্গেও সমঝোতা হইছিল যাওয়ার আগেই। অনেক বড় কিছু হয়তো দেওয়ার সামর্থ্য স্নেহার ছিল না, স্নেহা চাইতেছিল মেয়েটার জন্য নিজের পছন্দে সামান্য কিছু হলেও দিতে।

ওইদিন ২৬ এপ্রিল, মেয়েটার জন্মদিন। আবির এর কিছুক্ষণ আগেই স্নেহাকে জন্মদিনের কথা জানাইছে। এরপরই স্নেহা আবিরকে রিকোয়েস্ট করে ও মেয়েটার জন্য সামান্য কিছু দিতে চায়, আবির যেন ও কিনেছে বলে মেয়েকে দেয়। নিজে পছন্দ করে বেছে বেছে কিছু কাপড় নিয়ে ক্যাশ কাউন্টারে বিল দিতে গেল আবির তাল-বাহানা শুরু করে।

স্নেহার মেজাজ খারাপ হলেও প্রথমে খুব ঠাণ্ডা মাথায় আবিরকে ওই রকম করতে না করে কয়েকবার। পরদিন আবিরের ফ্যামিলি রাজশাহী মুভ করবে। একদিকে স্নেহার মন খারাপ ও কিছুক্ষণ পরই ঢাকায় ব্যাক করবে। আরেকদিকে অনিশ্চয়তা যে আবার কবে দেখা হবে।

এমনিতেই সকালে হোটেলের নিচে এসেই আবির ইচ্ছামতো হুইস্কি খেয়ে অল্প সময়েই টাল হইছে এবং যথারীতি নানা আজাইরা কথা বলে স্নেহার মেজাজ তখন হালকা খারাপ করে দিছিল। এরমধ্যে ক্যাশ কাউন্টারে গিয়ে আবির স্নেহার হাত শক্ত করে চেপে ধরে বিল দিতে দিচ্ছিল না। 

ক্রেডিট কার্ড এক হাত দিয়ে ধরে রাখছে, স্নেহার হাত আরেক হাত দিয়ে। শান্ত স্বরে স্নেহা কয়েকবার বলছে- ছাড়ো, ব্যথা লাগতেছে। চড়-থাপ্পড় মারার সময় অথবা জোরপূর্বক হাত ধরার সময় আবিরের ওর নিজের ব্যাকগ্রাউন্ড আর সামনের মানুষের ক্যাপাবিলিটি সম্পর্কে হুঁশ থাকে না।

ওইটা কয়েকবার আবিরের ঢাই কিলোর হাত স্নেহার গাল পর্যন্ত আসার পর ও টের পাইছে। ওই সময় স্নেহার ছোটবেলায় শোনা সানি দেউলের একটা সংলাপ আবিরের জন্য যথাযোগ্য বলে মনে হইছে। দামিনী নামের এক সিনেমায় সানি দেউল ওর হাতের কব্জি দেখাইয়া বলে, “ইয়ে ঢাই কিলো কা হাত, জব উঠতা হ্যায় না, তো আদমি উঠতা নহি, উঠ যাতা হ্যায়।”

হিজ এক্সিলেন্সির ঢাই কিলো হাত গায়ে ওঠার পর স্নেহা উপরে না ওঠলেও মিনিমাম দুই সপ্তাহ ওর চোয়াল নাড়াতে পারে নাই। আবিরের ঢাই কিলো হাত ওর গাল পর্যন্ত আসা নিয়ে স্নেহার কোনো রাগ-খেদ-ক্ষোভ কিচ্ছু নাই। না থাকার যৌক্তিক কারণ আছে। কিন্তু শুধুমাত্র ২৮ জানুয়ারি মধ্যরাতে বনানীর রাস্তায় যেটা দেওয়া হইছে, ওইটা নিয়ে স্নেহার সামান্য কথা ছিল, রাগ, জেদ, অভিমানও। এখন কোনোকিছু থাকা না থাকা এক সমান যদিও। হিজ এক্সিলেন্সি তো এখন এইসবের ঊর্ধ্বে চলে গেছেন।

ওইদিন ক্যাশ কাউন্টারে এই রকম অনেকক্ষণ ধস্তাধস্তির একটা পর্যায়ে স্নেহার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। ও সব ক্রেডিট কার্ড ছুঁড়ে ফেলে ওইখান থেকে বের হয়ে সোজা হাঁটা শুরু করে। দুপুর দেড়টার সময় প্রখর রোদ শরীরের যেখানেই পড়তেছিল, জ্বলে যাইতেছিল। ওইটা ইগনোর করেই স্নেহা হাঁঁটতে থাকে। আবির বের হয়ে ওকে না পেয়ে কল দিতে থাকে ক্রমাগত।

স্নেহা তখন এতটাই বিরক্ত, রাগে ও আধা ঘণ্টা আবিরের ফোনও ধরে নাই, টেক্সটের রিপ্লাইও দেয় নাই। হাঁটতে হাঁটতে ঘেমে ক্লান্ত হয়ে পরে রাস্তার মধ্যেই ও একটা জায়গায় বসে পড়ে। বেচারা আবিরও ওইদিন রোদে পুরা লাল হয়ে গেছিল, স্নেহা ফিরে গিয়ে দেখে। যদিও পরে একসঙ্গে সন্ধ্যা পর্যন্ত ছিল। ওইবার সম্ভবত আবির স্নেহাকে প্রথমবার এয়ারপোর্টেও নামিয়ে দিয়ে আসে। এয়ারপোর্টের বাইরে গাড়িতে বসে দুইজন কাঁদছিলও।

আরেকবার রাজশাহীর এক রাস্তার মোড়ে বসে আবিরের সঙ্গে ও চিৎকার করতেছিল। তাতে কিছু মানুষ ওইখানে জড়ো হয়ে যায়। মানুষ বিনা পয়সায় সিনেমা দেখার সুযোগ পেলে মিস করবে না, এটাই খুব স্বাভাবিক। রাগ যার ওঠে, সেও মডারেট করে তা সবসময় সব জায়গায় দেখাতে পারার ক্ষমতা রাখে না, বিশেষ করে রাগটা যদি কেউ বোকাচোদার মতো কাজের কারণে ওঠায় এবং ক্রমাগত ওই একই কাজই রিপিট করতে থাকে!

ওই ইনসিডেন্টগুলার একটাও আবির ভুলে নাই, মনে রেখে দিছে। কিন্তু ওই ইনসিডেন্টগুলায় স্নেহার রিয়্যাকশনের আগে আবির ঠিক কী কী করছিল, সেটা ডেলিব্যারেটলি ও ভুলে গেছে অথবা ভুলে যেতে চাইছে। তেমনই ও ড্রাঙ্ক থাকলে কখন কী করছে বা বলছে, কয়বার রাত নাই দুপুর নাই ড্রাঙ্ক হয়ে স্নেহাকে অচেনা শহরের রাস্তার মাঝখানে হুট করে নামিয়ে দিয়ে ও চলে গেছে। ফিরেও তাকায় নাই স্নেহা কীভাবে যাবে বা গেল কি না ঠিকমতো দেখতে। অথবা ইন্টিমেট মোমেন্টে বলা ওর কথাগুলাও তো স্নেহা কখনো আবিরকে পরে মনে করায় নাই ও বিব্রত হবে ভেবে। এমন কী শেষদিনও না। 

নিজের ইনসেন আচরণগুলাকে স্নেহা জাস্টিফাই করার চেষ্টা করছে বা ওইসব নিয়ে খুব প্রাউড ফিল করছে, এমন তো না। মাথা ঠাণ্ডা হওয়ার পর সবসময়ই ওইসবের জন্য লজ্জাই পাইছে ও। অনুশোচনাতেও ভুগছে। প্রতিবারই সর‍্যি হইছে। আবিরের মতো উঠতে-বসতে সর‍্যি হওয়ার মতো না। মদের নেশা কাটলে ওর সর‍্যির বন্যায় ভাসতে হতো প্রতিবারই। লাভ তাতে কিছুই হতো না, আবারও একই আচরণই ও রিপিট করতো।

স্নেহাও নিজের ইনসেন আচরণ বারবার কন্ট্রোল করতে চেয়েও আরো কয়েকবার কন্ট্রোল হারাইছে। ট্রিগারড হওয়ার ওই মুহুর্তগুলাতে নিজের রাগ কন্ট্রোল করা মুশকিল হয়ে যেত। ওই আচরণগুলার শুরু এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহ থেকে। জাস্টিফিকেশনের জন্য চাইলে কিছু হিসাব স্নেহা ক্যালকুলেট করে এর প্রত্যেকটার পেছনের কারণ দেখাতে পারতো, অন্তত শেষদিন যখন আবির আবোল-তাবোল বকে যাইতেছিল, ওই সময়টাতেই না হয়।

তাতে কী-ই বা হতো? স্নেহা ভাবে! আবিরের বাকওয়াজগুলা বরং আরেকটু দীর্ঘায়িত হয়ে স্নেহাকে আরেকটু কুৎসিতভাবে অপমান করতো। ওইদিন তো আবির কিছু শুনতে বা মানতে কাপল সেশনের বায়না করে নাই। ও প্ল্যান করেই কথা বলতে আসছিল। নিজেকে ডিফেন্ড করার জন্য যা যা বলা দরকার, সমস্ত কিছু তোতা পাখির মতো মুখস্ত করে এসে বলছেও। স্নেহা ওকে ওই সুযোগটা দিতে চাইছে।

ওই বাকওয়াজগুলা না করলেও ওর কাঙ্ক্ষিত ক্লোজারটা আবির ওইদিন এমনিতেই টানতে পারতো। ওই ব্যবস্থা ওকে স্নেহাই করে দিছে। তাতে ওর সাময়িক কিছুদিন খারাপ থাকা হলেও লং টার্মের জন্য উপকার যে হবে, এটা ও একটা সময় বুঝলেও বুঝতে পারে। অবশ্য ওর বোঝাতেই স্নেহার এখন কী যায়-আসে!

আলতু-ফালতু কথা বলে আবির হয়তো ওইদিন প্রতিশোধ নেওয়ার তৃপ্তি ফিল করছে। তাও ভালো, পানির ট্যাপটা বন্ধ করতে গিয়ে স্নেহা ভাবে। ও তো আবিরকে তৃপ্ত দেখতেই চাইছে সবখানে, সবসময়, সমস্ত সিচ্যুয়েশনেই। যতক্ষণ সময় আবির ওর পাশে ছিল, ওইভাবেই তো ওকে স্নেহা রাখার চেষ্টা করছিল।

কাশিটা আবার শুরু হইছে। এবার কিছুটা শক্তি সঞ্চার করেই বুকের মধ্যে ধাক্কা দিয়ে সজোরে বের হইতেছে। একবার…দুইবার…কিছুটা দীর্ঘ সময় নেবে বোধহয় এবার। কাশির দমকে আসা থুথুর দলা ফেলতে গিয়ে টাটকা রক্তের দলা দেখলো। চোখটাও সহনশীল হয়ে ওঠতেছে রক্তের এইসব কারবারে! মাথারটা মুখে আসলো, না বুকেরটা? স্নেহা কনফিউজড হয়ে হাসার চেষ্টা করে।

লর্ডের লায়াবিলিটি শেষ হওয়ার পর অনেকক্ষণ ব্লু টুথ স্পিকারের গানে মনোযোগ ছিল না ওর। কানটা ওইদিকে দিতে গিয়ে মনে পড়লো, প্রায় আড়াই বছর হয় সিগারেট ছাড়ছে। আবিরের ইনফ্লুয়েন্সেই সিগারেটটা ছাড়তে পারছিল। সিগারেটের স্মেলও এখন আর ও সহ্য করতে পারে না। এই রক্তারক্তি অবস্থায় বাথরুমের ফ্লোরে হেলান দিয়ে বসে একটা সিগারেট ঠোঁটে ঝুলিয়ে রাখতে ইচ্ছা করলো খুব। যদিও এর কোনো উপায় বা সুযোগ এখন নাই।

পারফেক্ট! জাজ-ব্লুজের মিউজিক ভেসে আসতেছে ব্লু টুথ স্পিকারে। স্নেহা শুনতে পাইতেছে। দৃশ্যত এই পুরা ফ্ল্যাটের কোনো আনাচে-কানাচে সিগারেটের অস্তিত্ব না থাকলেও ইমাজিন করতে দোষ নাই তো কোনো। রক্ত আর পানিতে লেপ্টে থাকা শার্ট গায়ে নিয়ে ভেজা শরীরে চোখ বন্ধই রাখে ও। ঠোঁটের কোনায় মার্লবোরো গোল্ডের ফিল নিতে নিতে খুব আয়েশে বিলি হলিডের গান কান পেতে শোনে-

গ্লুমি ইজ সানডে
উইথ শ্যাডোস আই স্পেন্ড ইট অল
মাই হার্ট অ্যান্ড আই
হ্যাভ ডিসাইডেড টু এন্ড ইট অল

সুন দেয়ার উইল বি ক্যান্ডেলস
অ্যান্ড প্রেয়ারস দ্যাট আর সেড আই নো
লেট দেম নট উইপ
লেট দেম নো দ্যাট আই’ম গ্ল্যাড টু গো

ডেথ ইজ নো ড্রিম
ফর ইন ডেথ আই’ম কারেসিন ইউ
উইথ দ্য লাস্ট ব্রিথ অফ মাই সৌল
আই উইল বি ব্লেজিং ইউ…

শরীরে হালকা কাঁপুনি শুরু হইছে। বাথরুম থেকে আর ঠিক কতক্ষণ পর বের হতে পারবে, এর একটা আগাম ভবিষ্যত বাণী পেলে সুবিধা হতো বলে মনে হইতেছে স্নেহার। কিন্তু সেটা যেহেতু হইতেছে না, আপাতত বিলির সঙ্গে চিৎকার করে গানটা তো গাওয়া যেতে পারতো। কিন্তু এইখানেও প্রতিবন্ধকতা! বুকের খাঁচা আপাতত ওইটা পারমিট করতেছে না। কী আর করার! অদৃশ্য সিগারেটে একটা লম্বা টান দিয়ে বিলির সঙ্গে গুন গুন করেই সুর মেলাতে থাকলো-

ড্রিমিং, আই ওয়াজ অনলি ড্রিমিং
আই ওয়েক অ্যান্ড আই ফাইন্ড ইউ অ্যাস্লিপ
ইন দ্য ডিপ অফ মাই হার্ট হেয়ার
ডার্লিং, আই হোপ
দ্যাট মাই ড্রিম নেভার হন্টেড ইউ
মাই হার্ট ইজ টেলিং ইউ
হাউ মাচ আই ওয়ান্টেড ইউ…


চলবে…

Comments

    Please login to post comment. Login