Posts

চিন্তা

“এসএসসি পরীক্ষা ও আমাদের শিক্ষা: বর্তমান প্রজন্ম সত্যিই কিছু শিখছে?”

April 11, 2026

সুমন বৈদ্য

Original Author সুমন বৈদ্য

38
View
New Age | Govt changes SSC exam date again
এসএসসি পরীক্ষা

শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আনুগত্য গড়ে তোলা, তাদের জ্ঞান ও দক্ষতার বিকাশ নিশ্চিত করা এবং শিক্ষা জীবনের প্রতিটি ধাপে নিজেদের সক্ষমতা যাচাই করার উদ্দেশ্যেই এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার প্রচলন। একসময় এই পরীক্ষাগুলো ডিভিশন পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হলেও সময়ের পরিবর্তনে তা গ্রেডিং সিস্টেমে রূপ নিয়েছে। কিন্তু পদ্ধতির এই পরিবর্তনের চেয়েও বড় পরিবর্তন এসেছে শিক্ষার্থীদের মানসিকতা ও শিক্ষাব্যবস্থার বাস্তবতায়।নবম-দশম শ্রেণির শিক্ষা শেষে মূল্যায়নের শেষ ধাপ ও বলা হয় এসএসসি পরীক্ষাকে ।একটা সময় এসএসসি পরীক্ষা ছিল কঠোরতা, শৃঙ্খলা ও অধ্যবসায়ের প্রতীক। শিক্ষার্থীরা পড়াশোনার সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত থাকত, সিলেবাস সম্পন্ন করা ছিল তাদের দায়িত্ববোধের অংশ, আর পাঠ্যবইয়ের বাইরে জ্ঞানার্জনের প্রবণতাও ছিল চোখে পড়ার মতো। ফলাফল ছিল সেই পরিশ্রমের স্বাভাবিক প্রতিফলন- কেউ গোল্ডেন এ প্লাস, কেউ বা নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী এ বা এ মাইনাস অর্জন করত। তখন পরীক্ষা শুধু নম্বর পাওয়ার মাধ্যম ছিল না; বরং এটি ছিল আত্মপ্রস্তুতি, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং ভবিষ্যৎ জীবনের ভিত্তি গড়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।


কিন্তু বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসএসসি পরীক্ষা যেন অনেকটাই তার সেই গৌরব হারাতে বসেছে। একদিকে শিক্ষকদের একাংশের পাঠদানে অনাগ্রহ, অন্যদিকে মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থা- দুটিই শিক্ষার মানকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভিভাবকদের একমুখী মানসিকতা, যেখানে ‘গোল্ডেন এ প্লাস’ যেন একমাত্র লক্ষ্য। ফলে শিক্ষার্থীরা প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের চেয়ে ফলাফলের দৌড়ে বেশি মনোযোগী হয়ে পড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো- শিক্ষার্থীদের মধ্যেই পড়াশোনার প্রতি অনাগ্রহ ক্রমেই বেড়ে চলেছে। তারা নতুন কিছু শেখার আগ্রহ হারাচ্ছে, জ্ঞান অর্জনের আনন্দ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। পড়াশোনা অনেকের কাছে এখন আর আত্মউন্নয়নের পথ নয়, বরং একটি বাধ্যতামূলক দায়িত্ব মাত্র। এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে এসএসসি পরীক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্যই প্রশ্নের মুখে পড়বে।এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে শিক্ষার্থীদের ক্রমবর্ধমান অনাগ্রহ- তারা পড়াশোনাকে আর শেখার সুযোগ হিসেবে না দেখে বাধ্যতামূলক কাজ হিসেবে নিচ্ছে। নতুন কিছু জানার আগ্রহ কমে যাচ্ছে, বাড়ছে শর্টকাটের প্রতি নির্ভরতা। এই বাস্তবতায় এসএসসি পরীক্ষা ধীরে ধীরে তার প্রকৃত গুরুত্ব হারানোর ঝুঁকিতে পড়ছে, যা আগামী প্রজন্মের কাছে প্রশ্নবিদ্ধ। তাই নির্দ্বিধায় প্রশ্ন উঠেই আসে “এসএসসি পরীক্ষা ও আমাদের শিক্ষা: বর্তমান প্রজন্ম সত্যিই কিছু শিখছে?”বর্তমান সময়ে একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে-শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছে। বিশেষ করে নবম ও দশম শ্রেণিতে উঠার পর অনেকেই ধীরে ধীরে পড়ালেখা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছে। এর প্রভাব সরাসরি দেখা যাচ্ছে এসএসসি ও অন্যান্য বোর্ড পরীক্ষার ফলাফলে। প্রশ্ন জাগে- কেন এই অনাগ্রহ? কেন এত শিক্ষার্থী ব্যর্থ হচ্ছে?শিক্ষা ব্যবস্থায় বড় একটা ভূমিকা রাখছে স্মার্টফোন। চ্যাটজিপিটি, গুগল কিংবা অনলাইন ভিডিও ক্লাস (ইউটিউব, ফেইসবুকে প্রশ্ন সমাধান), প্রশ্নব্যাংক সলভ অ্যাপসের মাধ্যমে এখন মূহুর্তেই শিক্ষার্থীরা তাদের বিভিন্ন পড়াশোনা জাতীয় সমস্যা সমাধান করতে পারছে নিমিষেই কিন্তু আপামোর বেশিরভাগ শিক্ষার্থীরা জানে না নবম দশম শ্রেণীতে স্মার্টফোন কতটুকু কতো পরিমাণে ব্যবহার করতে হয়। প্রথমত, শিক্ষার্থীরা এখন আর নিজেদের মূল্যায়ন করে না, তারা মোবাইল ইন্টারনেটভিত্তিক একটি কৃত্রিম বাস্তবতার মধ্যে বাস করে। বর্তমান শিক্ষার্থীদের পড়ালেখার প্রতি অনাগ্রহ একটি বাস্তবতা। মোবাইল ফোন, সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউব ও গেমিং অ্যাপের আসক্তি দিনকে দিন তাদের মনোযোগ সরিয়ে নিচ্ছে পড়ালেখা থেকে একটি শ্রেণিকক্ষে এখন আর শুধু বই-খাতা নেই; আছে স্মার্টফোনও। এই ছোট ডিভাইসটি যেমন জ্ঞানের বিশাল ভাণ্ডার খুলে দিতে পারে, তেমনি ভুল ব্যবহারে সেটিই হয়ে উঠছে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার সবচেয়ে বড় বাধা। বিশেষ করে এসএসসি পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে বিষয়টি এখন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

তবে এও সত্য, একই স্মার্টফোন শিক্ষার জন্য আশীর্বাদ হতে পারে। চ্যাটজিপিটি, গুগল, ইউটিউব ক্লাস, অনলাইন প্রশ্ন সমাধান- এসবের মাধ্যমে এখন জটিল বিষয়ও মুহূর্তেই বোঝা সম্ভব। আগে যেখানে একটি অঙ্ক বা ধারণা বুঝতে দীর্ঘ সময় লাগত, এখন সেটি কয়েক মিনিটেই পরিষ্কার হয়ে যায়। কিন্তু মূল সমস্যা হলো- ব্যবহার জানার অভাব। নবম-দশম শ্রেণির অধিকাংশ শিক্ষার্থীই জানে না, কতটুকু সময় এবং কীভাবে স্মার্টফোন ব্যবহার করলে তা উপকারী হবে।স্মার্টফোন ব্যবহার নিজে কোনো সমস্যার মূল নয়- সমস্যা হলো এর অনিয়ন্ত্রিত ও অকাল ব্যবহার। যে বয়সে একজন শিক্ষার্থীর মনোযোগ থাকা উচিত পাঠ্যবই, মৌলিক জ্ঞান ও চরিত্র গঠনের দিকে, সে সময়ে অনেকেই ডুবে যাচ্ছে টিকটক, অপ্রয়োজনীয় কনটেন্ট কিংবা অশালীন ভাষা ও আচরণের সংস্কৃতিতে। ফলে ধীরে ধীরে পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ কমে যাচ্ছে, আর তৈরি হচ্ছে এক ধরনের মনোযোগহীন প্রজন্ম।এই মূল্যবোধগুলো এখনকার ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে ক্রমেই দুর্লভ হয়ে উঠছে।  তারা দ্রুত সফলতা চায়, অথচ সে সফলতার পেছনের কাঠিন্য পছন্দ করে না। অনেকে বলে, তারা পড়তে চায় না কারণ পড়ালেখা "ইন্টারেস্টিং" নয়।এই পড়াশোনা ভবিষ্যতের কোনো সংযোগ নেই। কিন্তু এই অজুহাত কি গ্রহণযোগ্য?এই অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহারের ফল গিয়ে পড়ে সরাসরি এসএসসি পরীক্ষায়। আর এর প্রভাব গিয়ে পড়ে এসএসসি পরীক্ষায়। এরপরের গল্পকাহিনী কারোর অজানা নয়- প্রশ্ন কঠিন ছিল, কমন আসেনি, বোর্ড খাতা কড়া করে কেটেছে, কেউ কেউ খাতা পুনঃনিরীক্ষণের আবেদন ও করে। কথা যদিও সত্য যে খাতা অনেক বোর্ডে খুবই কড়া করে কাটে। কিন্তু এর যুক্তিযুক্ত কারণ রয়েছে‌। অনেকেই বাকিদের মতো গোল্ডেন এ প্লাস না পেলেই যার যোগ্যতা মাফিক রেজাল্ট নিয়ে পাস করে শিক্ষা জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা এবং তাদের দেখা যায় জীবনের পরবর্তী পরিকল্পনা করে সামনে কীভাবে আগাবে। কিন্তু এর মাঝেও কিছু শিক্ষার্থী নিজেদের দিকে আঙ্গুল তুলা ধুরে থাক, নিজেদের দূর্বলতা ঢাকতেই বিভিন্ন বিষয়ে অযথা সমালোচনা করে থাকে আর এতেই নিজেদের ভবিষ্যৎ নিজ হাতেই গোড়াপত্তন করে দেই।অথচ এসএসসি জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা, যেখানে শুধু ফল নয়- শৃঙ্খলা, দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ভিত্তি তৈরি হয়।

দ্বিতীয়ত, শিক্ষাব্যবস্থারও ভয়াবহ দুর্বলতা রয়েছে। যুগোপযোগী পাঠ্যবই না থাকা, মুখস্থনির্ভর প্রশ্ন ব্যবস্থা,শিক্ষকের যোগ্যতা ও প্যাশনের অভাব, পর্যাপ্ত ট্রেনিং এর অভাব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অসদুপায় ব্যক্তিদের হস্তক্ষেপ- সব মিলিয়ে শিক্ষাব্যবস্থা এক ধরনের ‘প্রশ্নপত্র নির্ভর প্রতিযোগিতা’র নামান্তর হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোচিং সেন্টার ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরতা একদিকে যেমন সৃজনশীল চিন্তার বিকাশকে ধ্বংস করছে, অন্যদিকে পরীক্ষার আগেই প্রশ্নফাঁসের গুজব শিক্ষার্থীদের অনৈতিক প্রবণতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পাশাপাশি করোনা-পরবর্তী শিক্ষাব্যবস্থা এখনো পুরোপুরি পুনরুদ্ধার হয়নি। শিক্ষার্থীরা শারীরিকভাবে উপস্থিত থাকলেও মানসিকভাবে তারা এখনো বিচ্ছিন্ন।তৃতীয়ত, পারিবারিক ও সামাজিক পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। অনেক পরিবারে শিক্ষার্থীদের উপর অতিরিক্ত চাপ দেওয়া হয়, আবার কোথাও পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনার অভাব থাকে। উঠতি বয়সে মানসিক পরিবর্তন, বন্ধুবান্ধবের প্রভাব, এবং কখনো কখনো ভুল পথে জড়িয়ে পড়া- এসবও তাদের পড়াশোনা থেকে বিচ্যুত করে। এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার্থীরা অনেকেই বলে, “পাশ করলেই হলো।” তারা জানে না, শিখছে না- শুধু ফলাফলের মোহে অন্ধ। এখানেই প্রশ্ন ওঠে: তারা কি একা দোষী? সমাজ কি তাদের শিখিয়েছে সত্যিকারের শিক্ষার গুরুত্ব? একটি শিক্ষানির্ভর সমাজ তৈরি না হলে ছাত্র-ছাত্রীদের কাছ থেকে শিক্ষার প্রতি ভালোবাসা আশা করা কি বাস্তবসম্মত?চতুর্থত, বর্তমান বোর্ড পরীক্ষার্থীদের মধ্যে দেখা যায় শুধুমাত্র নম্বর ভিত্তিক পড়াশোনা করার জন্য লেখাপড়া করে থাকে যার ফলে তারা প্রকৃত বিষয়গুলো তো শিখছেই না বরং তারা মুখস্থ পুঁথিগত বিদ্যা এবং মুখস্থ লেখাপড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকছে।লক্ষ্যহীনতা ও প্রেরণার অভাব একটি বড় সমস্যা। অনেক শিক্ষার্থী জানে না কেন তারা পড়ছে বা ভবিষ্যতে কী হতে চায়। ফলে পরীক্ষার গুরুত্ব তাদের কাছে স্পষ্ট হয় না।

তাই নতুন করে কিছু জানার এবং আগ্রহ এবং লেখার সক্ষমতাও তাদের থাকছে না। যার ফলে তারা সাময়িকভাবে বোর্ড পরীক্ষার মধ্যে ভালো জিপিএ তুললেও তারা উপরের শ্রেণীর দিকে যতো যেতে থাকে তখনই হঠাৎ হোঁচট খাওয়া শুরু করে।এর বড় একটি প্রমাণ ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষা। গত বছরের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা একটি অসুস্থ ভিত্তিক পড়াশোনার মধ্যে আবদ্ধ ছিলো সেই পড়াশোনার গোড়াপত্তন ঘটিয়েছে  এসএসসি রেজাল্ট।অদক্ষতা অসৃজনশীলতা এবং মুখস্থ বিদ্যার প্রতি নির্ভর হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে উৎশৃংখল মনোভাব ঢুকেছে। আমাদের পড়ালেখা এখনো মুখস্থনির্ভর পদ্ধতির, যদিও এর গালভরা নাম হলো ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’। অনেকে এটাকে ‘সৃজনশীল মুখস্থ পদ্ধতি’ বলে থাকেন।আবার এসব শিক্ষার্থীর মুখে যখন 'অন্যায় হয়েছে'-এমন দাবি আসে, তখন সেটি বাস্তবতার চেয়ে বেশি হয়ে যায় আবেগ ও অজুহাত নির্ভর।যদিও বোর্ড পরীক্ষা জীবনের চূড়ান্ত মানদণ্ড নয়, তবুও এটি একজন শিক্ষার্থীর নিয়মানুবর্তিতা, অধ্যবসায় এবং দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।বর্তমান সময়ে এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল শুধু প্রশ্নবিদ্ধই নয়, বরং এটি গোটা প্রজন্মের মানসিক গঠনেরও নিম্নগামী প্রতিফলন। অনেক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছে, আবার অনেকে অপ্রত্যাশিত ফল করেছে। অথচ তাদের দোষ কোথায়- জিজ্ঞেস করলেই দেখা যায়, তারা দায় চাপাচ্ছে শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর, শিক্ষক কিংবা প্রশ্নপত্রের ওপর। কিন্তু নিজেদের আত্মসমালোচনা, সঠিক প্রস্তুতির অভাব এবং নিয়মতান্ত্রিক অধ্যবসায়ের অভাবে তারা কতটা দায়ী, সে প্রশ্ন তারা নিজেদের করে না। আর এতে করে শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতার পাশাপাশি, পড়ালেখার প্রতি তরুণ প্রজন্মের অনাগ্রহতার দায় পরিলক্ষিত করা যায়।

২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফল দেখে অভিভাবক, শিক্ষক এমনকি শিক্ষা প্রশাসনের ভ্রু কুঁচকে গেছে। পাশের হার কমে যাওয়া, জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যা হ্রাস, এবং শিক্ষার্থীদের লেখার মান ও বিশ্লেষণ ক্ষমতার ভাটার দিকে তাকালে প্রশ্ন ওঠে- এই অবনতির জন্য দায়ী কে? শিক্ষাব্যবস্থা, নাকি শিক্ষার্থীরাই?এই যেমন ২০২৪ সালের সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কার আন্দোলন এবং ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে কয়েক দফায় এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা স্থগিত হওয়ার পর পরীক্ষা আবার শুরু হয় তখন তারা পড়াশোনা করতে পারেনি তাদের মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে এইচএসসি পরীক্ষা বিক্ষোভ মিছিল করে বন্ধ করে দেয় এবং অর্ধেক যে পরীক্ষা দিয়েছে তার উপর ফলাফল তৈরি করার আবেদন জানায়।ঠিক এটিই যেতে না যেতেই ২০২৫ সালে করোনার প্রাদুর্ভাব যখন শুরু হয় যদিও সেটি মৌসুমীজনিত ভাইরাস রোগের প্রভাব একটু বেশি ধরা পড়েছিলো, যদিও সে সময় বিভিন্ন ধরনের স্বাস্থ্য জনিত সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়া গেলেও  শিক্ষার্থীরা বিক্ষোভ মিছিলের মতোন কর্মসূচিতে এগিয়ে যা পরীক্ষা পিছিয়ে দেওয়ার জন্য। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষাও বাতিল করার জন্য উঠে পড়ে লাগে কিছু শিক্ষার্থী। তাদের অভিযোগ, পবিত্র রমজান মাসে রোজা রেখে পরীক্ষার্থীর ভালোভাবে পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হয়নি। ঈদের পরপরই পরীক্ষা হওয়ায় পর্যাপ্ত প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। এতে ফল বিপর্যয় হতে পারে। তাই এক মাস সময় দিলে ভালোভাবে প্রস্তুতি নিতে পারবে তারা। সেইসাথে এও প্রস্তাব উপস্থাপন রাখে, এপ্রিল ও মে মাসে প্রচণ্ড গরম পড়ে। গরমে একটানা পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব নয়। গরমের মধ্যে টানা পরীক্ষা দিতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা অসুস্থ হয়ে পড়বে। এছাড়া বেশিরভাগ শিক্ষার্থীর পরীক্ষার কেন্দ্রও দূরে। তাই প্রত্যেক পরীক্ষায় তিন-চার দিন বন্ধ দিয়ে নতুন রুটিন করতে হবে।

এমনকি এবার যারা পরীক্ষায়  অকৃতকাজ হয়েছে তারা সেটিকে পজিটিভ ভাবে না নিয়ে, নিজেকে পরবর্তী পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি না করে তারা সেটি নেমেছে অন্যথায় আন্দোলনের নামে। তাদের বিশ্লেষিত কারণ গুলো হল বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের প্রশ্নপত্রের মান জটিলতা ও অসামঞ্জস্যতা ছিল তাই এমসিকিউ (বহুনির্বাচনি) এবং সিকিউ (সৃজনশীল) উভয় অংশ মিলিয়ে পাশের ব্যবস্থা করতে হবে। পৃথকভাবে পাশের বাধ্যবাধকতা তুলে দিয়ে সামগ্রিক মূল্যায়নে পাশ বিবেচনা করতে হবে। অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের অতিরিক্ত সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষা নিতে হবে। এবং অকৃতকার্য শিক্ষার্থীদের কলেজে ভর্তি নিশ্চিত করতে হবে। প্রাথমিকভাবে শিক্ষার্থীরা কলেজে ভর্তি না হতে পারলেও প্রতিশ্রুতি দিতে হবে সাপ্লিমেন্টারি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা পরে কলেজে অ্যাডমিশন নিতে পারবে।এইসব কর্মকান্ড যা সম্পূর্ণ একজন উন্নত দেশের শিক্ষার্থী হিসেবে অযৌক্তিক। শিক্ষার্থীদের একটি বড় প্রবণতা হচ্ছে- নিজেদের ব্যর্থতার দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া। ফল খারাপ হওয়ার পর তারা ভুল স্বীকার না করে বরং সচিবালয় ঘেরাওয়ের মতো কর্মসূচিতে নামে, যেনো জোর করে তাদের পাস করিয়ে দেওয়া হয়।জীবনে সাফল্য যেমন আছে, তেমনি ব্যর্থতাও আসবে- এটাই বাস্তবতা। কিন্তু নিজের ভুল চিহ্নিত না করে শুধুই শিক্ষকদের ওপর দোষ চাপানো কখনোই সঠিক মনোভাব নয়। আজকের অনেক শিক্ষার্থী মনে করে, শিক্ষকরা ইচ্ছাকৃতভাবে তাদের ফেল করিয়েছেন, অথচ নিজেদের প্রস্তুতির ঘাটতি বা দায়িত্বহীনতার কথা তারা একবারও ভেবে দেখে না।এইতো গেলো বর্তমান শিক্ষার্থীদের অবস্থা, এইবার চোখ বুলানো যাক শিক্ষা ব্যবস্থার অবনতির দিকে।২০২০ সাল থেকে শুরু করে গত বছর পর্যন্ত এসএসসি পাসের হার পর্যালোচনা করে দেখা যায় সব বছরেই পাসের হার ৮০ শতাংশের বেশি ছিল।যদি ২০২৪ সালের পাসের হারের দিকে তাকাই তাহলে এই হার ছিলো ৮৩ দশমিক ৭৭ শতাংশ। যা ২০২৫ সালের গিয়ে ঠেকেছে ৬৮ দশমিক শূন্য ৪ শতাংশে। এবং শতভাগ পাস করা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যাও কমেছে। ২০২৪ সালের এই সংখ্যা ছিল ২ হাজার ৯৬৮। ২০২৫ সালে এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ৯৮৪। অর্থাৎ শতভাগ পাস করা প্রতিষ্ঠান কমেছে ১ হাজার ৯৮৪টি। আর ১৩৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে একজন পরীক্ষার্থীও পাস করতে পারেনি। পাস না করতে পারা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বেড়েছে ৮৩টি।পাসের হার কমে যাওয়ায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে। আগের বছর জিপিএ-৫ পেয়েছিল ১ লাখ ৬৩ হাজার ৮৪৫ জন।২০২৫ সালে এই সংখ্যা ১ লাখ ২৫ হাজার ১৮ জন। মানে এখানেও সংখ্যা কমেছে ৩৮ হাজার ৮২৭। ২০২৪ সালের তুলনায় প্রায় এক-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থী সর্বোচ্চ জিপিএ পায়নি।এই অবনমন যেমন যুক্তিযুক্ত এবং আবার গ্রহণযোগ্যও নয়। একজন ছাত্র-ছাত্রীর পরীক্ষা খারাপ হতেই পারে কিন্তু পরীক্ষা কোন ভিত্তির উপর খারাপ হচ্ছে তা খতিয়ে দেখা অবশ্যই জরুরি।যদিও পরীক্ষকেরা কীভাবে খাতা দেখবেন এর ওপরেও পাস-ফেল নির্ভর করে। ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফল খারাপ হওয়ার পিছনে যথেষ্ট কারণ হলো মেধার সাথে খাতার যথেষ্ট মূল্যায়ন। যা অন্যান্য বছর খাতা ‘সহজ’ করে দেখার মাধ্যমে বরং গোল্ডেন এ প্লাস এবং গণহারে পাস বেড়েছে।  

২০২৫ সালের যারা এসএসসি পরীক্ষার্থী ছিলো, তারা মূলত ছিলো করোনাকালীন ব্যাচ।আরো সহজ ভাষায় বললে করোনা মহামারির সময়ে তারা ষষ্ঠ ও সপ্তম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত অবস্থায় ছিলো।মূলত এই শ্রেণি দুটিতেই বীজগণিতের অঙ্ক পরিচিত করানো হয়। নতুন ধরনের অঙ্ক বুঝে ওঠার জন্য শিক্ষকের সহায়তা বিশেষভাবে দরকার। কিন্তু সে সময় স্কুল বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা ক্লাস-পরীক্ষা দিতে পারেনি। ফলে শিখনঘাটতি নিয়েই তারা সরাসরি অষ্টম শ্রেণিতে উঠে যায়।শিক্ষার্থীদের অবনতির এই দুরবস্থা নিয়ে তৎকালীন সময়ে শিক্ষা-বিশেষজ্ঞ থেকে শুরু করে নানাবিধ এনজিও ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কীভাবে শিক্ষাথীদেরকে এই করোনা সময়ে সঠিক প্রশিক্ষণ থেকে শুরু করে কঠিন বিষয়গুলোতে কীভাবে দুরবস্থা দূর করা যায়, এমন সুপারিশ প্রদান করলেও তৎকালীন সময়ে দাঁড়িয়ে শিক্ষকগণ সেগুলো আমলে নেয়নি। কিছু নামমাত্র অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে দায় সারা হয়েছে। যা শিক্ষার্থীরা অ্যাসাইনমেন্টের উত্তর সরাসরি অনলাইন ও ইউটিউব দেখে লিখে জমা দিয়েছে। যা থেকে ছিলো না কোনো শিক্ষনীয় বিষয়বস্তু এবং শেখানোর মতো না আগ্রহও ছিলো শিক্ষকদের। যার ফলে শিক্ষার্থীদের বড় একটি অংশ এখানেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।তাছাড়াও দীর্ঘদিন ধরে বর্তমান পরীক্ষা ও প্রশ্নপদ্ধতি ছিলো গটবাধা।আমাদের পড়ালেখা এখনো মুখস্থনির্ভর পদ্ধতির, যদিও এর গালভরা নাম হলো ‘সৃজনশীল পদ্ধতি’। অনেকে এটাকে ‘সৃজনশীল মুখস্থ পদ্ধতি’ বলে থাকেন। মুখস্থ নির্ভর পড়াশোনা ছিলো পরীক্ষার্থীদের একমাত্র মূল ভরসা। এতে করে সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক পড়াশোনা থেকে শিক্ষক- শিক্ষার্থীরা ছিলো যোজন যোজন দূরে। যার ফলে গতানুগতিক ধারার প্রশ্নে শিক্ষার্থীদের প্রকৃত মেধা যাচাই করা সম্ভব হয় না।আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতিতে তথ্যমূলক প্রশ্নের গুরুত্ব কমেছে। যেসব তথ্য অনলাইনে অনুসন্ধান করে মুহূর্তেই জেনে নেওয়া যায়, শিক্ষার্থীরা সেইসব বিষয় হুবহু মুখস্থ করে লিখেছে বরং সেইসব বিষয় নিজের মতো করে লেখার সামর্থ্য নিজের মধ্যে সঞ্চয় করেই নি শিক্ষার্থীরা। তাই এইবার সেই ধারা থেকে বের হয়ে প্রশ্নের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীদের বোধগম্যতা, বিশ্লেষণ-ক্ষমতা ও মৌলিকত্ব বের করার অন্বেষণই রেজাল্টে বড় ধস নেমেছে ‌। অন্যদিকে বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা হয়ে গিয়েছে নোট আর টিউশননির্ভর। শিক্ষকের দেওয়া নোট কিংবা গাইডের প্রশ্ন বুঝে না-বুঝে মুখস্থ করেই জিপিএ-৫ পাওয়া যায়। জিপিএ-৫ যে সংখ্যা ছাড়া আর কিছু নয়, সেটা বোঝা যায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের সেমিস্টার মিড-ফাইনাল পরীক্ষায়। সেইসব পরীক্ষাগুলোতে সর্বোচ্চ জিপিএধারী লাখ লাখ শিক্ষার্থীও ফেল করে থাকে।

বর্তমান সংকটময় শিক্ষাব্যবস্থা থেকে কার্যকর উত্তরণের জন্য সময়ভিত্তিক পরিকল্পনা গ্রহণ করা অপরিহার্য। এ প্রেক্ষাপটে তাৎক্ষণিক কিছু পদক্ষেপ যেমন বাস্তবায়নযোগ্য কৌশল ও নির্দেশনার মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি ফল পাওয়া যেতে পারে, তেমনি টেকসই উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত পরিবর্তন আবশ্যক। প্রতিটি পাঠ্য বিষয় ও অধ্যায় শিক্ষার্থীদের জ্ঞান, দক্ষতা ও মনোভঙ্গির নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের মাধ্যমে সাজানো হয়ে থাকে। তাই পাঠ্যসূচির প্রতিটি ধাপেই শিক্ষার্থীর কাঙ্ক্ষিত শিক্ষণফল অর্জিত হয়েছে কিনা, তা যাচাই-বাছাই করে পরবর্তী ধাপে অগ্রসর হওয়া উচিত। সহজ ভাষায় বলতে গেলে শুধুমাত্র তখনই পরবর্তী অধ্যায়ে যেতে হবে, যখন নিশ্চিত হওয়া যাবে যে শিক্ষার্থী ওই অধ্যায় বা পরিচ্ছেদ থেকে যে শিক্ষাগত দক্ষতা বা জ্ঞান অর্জন করার কথা ছিল তা হয়েছে কিনা। অন্যথায় শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য অপূর্ণ থেকে যাবে এবং শিক্ষার্থীর বিকাশ হবে খণ্ডিত।

নতুন কোন অধ্যায় বা আলোচনা শুরু করার আগে তাকে সেই বিষয়ে কোন আইডিয়া আছে কিনা কিংবা যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে সে বিষয় সম্পর্কে আগে জেনেছে কিনা, সেই বিষয়টি থেকে কি কি হতে পারে এবং সে বিষয়টি কেনো কাজে লাগবে শিক্ষার্থীদের সাথে সে বিষয়টি নিয়ে বন্ধুত্বপূর্ণ খোলামেলা আলোচনা করতে হবে।শুধুমাত্র পাশ করার জন্য কিংবা পড়ানোর জন্য বই খুলে পড়ালে শুরু করে দিলে হবে না, এতে করে সে যতই উপরের ক্লাসের দিকে যাবে ততই পড়াশোনার মধ্যে ব্যাঘাত করতে তাই প্রত্যেকটি পড়ার সাথে সাধারণ জ্ঞানভিত্তিক (Out knowledge) পড়াশুনা জুড়িয়ে পড়াতে হবে।যেমন: শিক্ষার্থীকে সর্বনাম (pronoun) সম্পর্কে শেখাতে চাওয়া হচ্ছে। তার আগে যাচাই করে নিতে হবে সে বিশেষ্য (noun) সম্পর্কে সঠিকভাবে জানে কি না। কারণ, সর্বনাম বোঝাতে হলে আগে তাকে জানতে হবে "নাম" কাকে বলে, এবং কোন জায়গায় সেটির পরিবর্তে সর্বনাম ব্যবহার করা হয়।

আবার, সর্বনামের ব্যবহার শেখানোর আগে যদি সে পদ (parts of speech) সম্পর্কেই ঠিকমতো না বোঝে, তাহলে পুরো বিষয়টাই তার কাছে গোলমেলে হয়ে যাবে।শ্রেণিতে দুর্বল শিক্ষার্থীর সংখ্যা কম হলে সবল শিক্ষার্থীরাও তাদের সহায়তা করতে পারে।আমাদের দেশের শিক্ষকেরা শিক্ষাক্রম সম্পর্কে সাধারণত ধারণা রাখেন না। তাঁরা অনেক সময়ে বুঝতে পারেন না ওই অধ্যায়ের লক্ষ্য কী। তাই বইয়ের প্রতিটি অধ্যায় বা পরিচ্ছেদের শেষে শিক্ষার্থীর যোগ্যতা যাচাইয়ের একটি ছক রাখা যায়। সেখানে লেখা থাকবে, শিক্ষার্থী কোন কোন বিষয় বা কাজের সক্ষমতা অর্জন করলে পরবর্তী অধ্যায়ে বা পরিচ্ছেদে যেতে পারবে। এটা শিক্ষককেও নিশ্চিত করবে তিনি নির্ধারিত লক্ষ্যগুলো পূরণ করতে পেরেছেন কি না।'এসএসসি পরীক্ষার প্রয়োজন কতটুকু আছে?’ বর্তমান প্রেক্ষাপটে এসএসসি সনদের কার্যকারিতা কমেছে, এ বিষয়ে দ্বিমত করার কোনো কারণ নেই। বর্তমানে শিক্ষাথীদের যে অবস্থা ধীরে ধীরে এসএসসি পরীক্ষা নিছকই একটি উপহাস পাত্রে পরিণত হয়েছে।পরীক্ষামাত্রই মানসিক চাপ থাকবে। পরীক্ষামাত্রই কিছু তথ্য মনে রাখার ঝামেলা থাকবে। পাস-ফেল থাকবে। এই চাপ এসএসসি পরীক্ষায় যেমন, তার আগে-পরে সব পরীক্ষায়ও তেমন। কাজেই শিক্ষার্থীদের ওপর মানসিক চাপের অজুহাতে কোনো পরীক্ষা বাতিলের দাবি করলে শুধু এসএসসি কেন, দুনিয়ার সব পরীক্ষা বাতিলের দাবি করতে হবে। সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার সংস্কার না করে যে পদ্ধতিতেই এই মূল্যায়ন করা হোক না কেন, পরিস্থিতির উন্নতি হবে না। তাই প্রথমেই গণিত আর ইংরেজি বিষয়ের পাঠদানের ঘাটতি চিহ্নিত করে সংশোধনের ব্যবস্থা নিতে হবে।


সত্যিকার অর্থেই, ২০২৫ সালের এসএসসি পরীক্ষা প্রকৃতপক্ষেই একটি ভালো পরীক্ষা হয়েছে। পরীক্ষাকেন্দ্রগুলোতে অসদুপায় অবলম্বনকে যথাসম্ভব নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। নম্বর বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য পরীক্ষকদের ওপর কোনো অনৈতিক চাপ ছিল না। ফলে এবার এসএসসি পরীক্ষায় পাসের হার কমেছে। জিপিএ-৫ এর সংখ্যা কমেছে। প্রতি ১০ জনে ৩ জন ফেল করেছে। এদের একটি বড় অংশই ফেল করেছে গণিত ও ইংরেজিতে। এটি বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা।দেশের সব শিক্ষা বোর্ডে এসএসসি পরীক্ষায় ব্যাপক ফল বিপর্যয় হলেও একই সময়ে কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের অধীন অনুষ্ঠিত সমমানের এসএসসি (ভোক) পরীক্ষায় কিন্তু ফল বিপর্যয় ঘটেনি। এ বছর ১ লাখ ১২ হাজার ১০০ জন পরীক্ষা দিয়ে ৮৫.৬ শতাংশ পাস করেছে। ৯ হাজার ৫০০ জন জিপিএ ৫ পেয়েছে।খোঁজ নিয়ে দেখলাম, কারিগরি বোর্ডে উচ্চতর পাসের হারের পেছনে অন্যতম কারণ হলো ভিন্নতর পরীক্ষাপদ্ধতি। কারিগরি বোর্ডের সিলেবাস অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের সিলেবাসের মতো একই। তবে ওদের নবম ও দশম শ্রেণিতে আলাদা পরীক্ষা হওয়ায় প্রতি পরীক্ষায় সিলেবাস অর্ধেক হয়ে যায়।

উপরন্তু ধারাবাহিক মূল্যায়নে নম্বর ৪০ শতাংশ আর চূড়ান্ত পরীক্ষায় নম্বর ৬০ শতাংশ। ফলে চূড়ান্ত পরীক্ষার ওপর চাপ অনেকাংশে কম। মজার ব্যাপার হলো এসএসসি (ভোক) পরীক্ষা অন্যান্য শিক্ষা বোর্ডের অধীন অনুষ্ঠিত এসএসসি পরীক্ষার সমমান হিসেবে পরিগণিত হয়। কাজেই নিঃসন্দেহে বলা যায়, এ বছর সাধারণ শিক্ষা বোর্ডগুলোর এসএসসি পরীক্ষার্থীরা বৈষম্যের শিকার হয়েছে।বিরক্ত বা ভীত হয়ে অনেকেই ইংরেজি মাধ্যম স্কুলের দিকে ঝুঁকেছে। ইংরেজি মাধ্যমে এসএসসি সমমানের পরীক্ষাটি হলো ‘ও লেভেল’। পরীক্ষাটি বছরে তিনবার- জানুয়ারি, মে ও নভেম্বরে অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। দুই বছর সময়ের ভেতরে মূল কয়েকটি বিষয়সহ কমপক্ষে ছয়টি বিষয় পাস করলেই ‘ও লেভেল’ পাস হয়ে যায়। তবে অনেকেই নিজ নিজ পছন্দ ও সুবিধামতো এক বা একাধিক সময়ে ৮ থেকে ১১-১২টি বিষয়ে পরীক্ষা দিয়ে থাকে।এ ব্যবস্থার সুবিধা হলো, একবারে না দিয়ে একাধিক ধাপে পরীক্ষা দেওয়া যায়। কোনো একটি বিষয়ে পরীক্ষা খারাপ হলে চার মাস পরেই আবার পরীক্ষা দিয়ে গ্রেড পরিবর্তন করার সুযোগ থাকে। চাইলে দুই বছরের আগেই ‘ও লেভেল’ শেষ করা যায়।ইংরেজি মাধ্যমে এইচএসসি সমমানের পরীক্ষাটি হলো এ লেভেল। ও লেভেল পরীক্ষার মতো এ লেভেল পরীক্ষাও বছরে তিনবার অনুষ্ঠিত হয়। দুই বছর সময়ের মধ্যে কমপক্ষে তিনটি বিষয় সম্পন্ন করলেই এ লেভেল পাস হয়ে যায়। তবে কেউ কেউ তিনটির বেশি বিষয়ও নিয়ে থাকে। এতে পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সময় বেশি অপশন খোলা থাকে।


এইচএসসিতে প্রতিটি বিষয় দুটি মডিউলে ভাগ করা থাকে- প্রথম পত্র ও দ্বিতীয় পত্র এবং দ্বাদশ শ্রেণি শেষ করে দুই সিটিংয়ে দুটি মডিউলের পরীক্ষা দিতে হয়। অন্যদিকে ‘এ লেভেল’-এ প্রতিটি বিষয় ছয়টি মডিউলে ভাগ করা হয় এবং ছয় সিটিংয়ে ছয়টি মডিউলের পরীক্ষা দিতে হয়। শিক্ষার্থীরা সাধারণত একাদশ শ্রেণি শেষে যেকোনো বিষয়ের তিনটি মডিউল এবং দ্বাদশ শ্রেণি শেষে বাকি তিনটি মডিউলের পরীক্ষা দেয়। তবে কেউ চাইলে সব কটি মডিউল একসঙ্গে নিতেও বাধা নেই। কোনো মডিউলের পরীক্ষা খারাপ হলে চার মাসের মধ্যেই আবার পরীক্ষা দিয়ে গ্রেড ভালো করার সুযোগ আছে। পরীক্ষার্থীদের মানসিক চাপে ফেলা আর ফেল করানো কোনো পরীক্ষার উদ্দেশ্য হতে পারে না। তাই শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের অভিজ্ঞতাসমৃদ্ধ মতামতের ভিত্তিতে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ও লেভেল এবং এ লেভেল পরীক্ষাগুলো ডিজাইন করা হয়েছে। সিলেবাস অধিকসংখ্যক মডিউলে ভাগ করে এবং চার মাস পরপর পরীক্ষার ব্যবস্থা করে পরীক্ষার্থীদের ওপর চাপ কমিয়ে আনা হয়েছে।


আমাদের এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষাপদ্ধতি সেকেলে। টানা দুই বছর পড়াশোনা করে ঢাউস সিলেবাস মুখস্থ করে পরীক্ষার হলে যেতে হয়। কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের উচ্চতর পাসের হার থেকে বোঝা উচিত আমাদের এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষাপদ্ধতির আশু সংস্কার প্রয়োজন। যেই পদ্ধতিতে ৩০ শতাংশের ওপরে ফেল করে এবং সেই ফল শোধরানোর জন্য একটি বছর বসে থাকতে হয়, সেই পদ্ধতি গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

কাজেই এসএসসি পরীক্ষা নতুন করে ঢেলে সাজাতে হবে বোর্ডের পরীক্ষাগুলো বছরে দুবার নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে; ২. এসএসসি সিলেবাসকে নবম ও দশম শ্রেণি দুই ভাগে ভাগ করতে হবে এবং আলাদাভাবে পরীক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে।  ‘কোর বিষয়’ এবং ঐচ্ছিক বিষয়গুলো চিহ্নিত করতে হবে; ৪. নবম ও দশম শ্রেণির ফলাফলের সমন্বয়ে এসএসসির ফলাফল নির্ধারিত হবে। ৫. ‘কোর বিষয়ে’ ফেল করলে ছয় মাস পর আবার পরীক্ষার সুযোগ দিতে হবে; ৬. বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো কলেজেও সেমিস্টার-পদ্ধতি চালু করতে হবে এবং ছয় মাস পরপর ভর্তির সুযোগ দিতে হবে; ৭. এইচএসসির সিলেবাস চারটি মডিউলে ভাগ করতে হবে; ৮. ছয় মাস পরপর পরীক্ষার মাধ্যমে দেড় থেকে দুই বছরের মধ্যে চারটি মডিউল শেষ করার সুযোগ দিতে হবে।প্রস্তাবিত সংস্কার বাস্তবায়িত হলে আমাদের বোর্ডের পরীক্ষাগুলোর সঙ্গে আন্তর্জাতিকভাবে গ্রহণযোগ্য ইংরেজি মাধ্যমের পরীক্ষাপদ্ধতির ভিন্নতা কমে আসবে। ছাত্রদের ওপর মুখস্থ করার চাপ অনেকাংশে কমবে। ছয় মাস পরপর পরীক্ষার সুযোগ থাকায় ফেল করার ভয় কেটে যাবে।

অন্যদিকে প্রতিটি শ্রেণির কাঙ্ক্ষিত যোগ্যতা অর্জন না করার কারণে শিক্ষার্থীরা পেছাতে থাকে। কোনো শিক্ষার্থী অষ্টম শ্রেণির নির্ধারিত যোগ্যতা অর্জন করে যদি নবম শ্রেণিতে ওঠে, আর নবম শ্রেণির যোগ্যতা অর্জন করে দশম শ্রেণিতে ওঠে, তবে এসএসসির ফলাফলে মারাত্মক বিপর্যয় ঘটার কারণ নেই।সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে গেলে পরিবর্তনের বিকল্প নেই।তবে নতুন কিছু করার জন্য তাড়াহুড়া করা যাবে না। যৌক্তিক সময় দিয়ে এবং কার্যকারিতা যাচাই করেই পরিবর্তনের কাজগুলো করতে হবে। তাই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার জন্য শিক্ষাসংশ্লিষ্ট দক্ষ ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের আলোচনা করতে হবে।অন্যদিকে গণমাধ্যমকে এগিয়ে আসতে হবে শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য তুলে ধরতে। শিক্ষা মানে কেবল পাস করা নয়, বরং চিন্তা করতে শেখা, প্রশ্ন করতে শেখা, এবং নতুন কিছু আবিষ্কার করার সাহস অর্জন- এই বার্তা গণমাধ্যমে তুলে ধরা উচিত। শিক্ষার সৃজনশীলতা, উদ্ভাবন এবং সামাজিক দায়বদ্ধতার দিকগুলো নিয়ে বেশি বেশি অনুষ্ঠান, প্রতিবেদন ও আলোচনা প্রচার করতে হবে।শিশু বা কিশোরদের মানসিক গঠনে পরিবারই প্রথম শিক্ষালয়। তাই অভিভাবকদের ভূমিকা এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কেবল সন্তানের ভালো ফলাফলের প্রত্যাশায় চাপ সৃষ্টি না করে, পড়াশোনায় তার আগ্রহ জাগাতে হবে সহানুভূতির সঙ্গে।প্রথমত, অভিভাবকদের উচিত সন্তানের সঙ্গে নিয়মিত শিক্ষাবিষয়ক আলাপ করা। শুধু “আজ কতক্ষণ পড়লে” বা “কত পেয়েছো” জিজ্ঞেস করলেই চলবে না; বরং কী শিখছে, কোন বিষয়ে আগ্রহী, কোন জায়গায় সমস্যা হচ্ছে- এসব নিয়ে বন্ধুর মতো কথা বলতে হবে। এতে শিশুর মধ্যে জবাবদিহিতার পাশাপাশি আগ্রহও তৈরি হবে।দ্বিতীয়ত, সৃজনশীল কার্যক্রমে সন্তানদের উৎসাহ দেওয়া অত্যন্ত জরুরি। বই পড়া, আর্ট, বিজ্ঞান প্রকল্প, নাটক, বিতর্ক কিংবা সংগীত- যে কোনো ইতিবাচক কাজে সন্তানকে সম্পৃক্ত করতে পারলে সে পড়াশোনাকেও আরেকভাবে উপলব্ধি করতে শেখে। তৃতীয়ত, সন্তানের ব্যর্থতাকে ছোট করে না দেখে, তাকে বোঝাতে হবে- ব্যর্থতা কোনো লজ্জার নয় বরং শিখতে শেখার একটি সুযোগ। অনেক অভিভাবক সন্তান ভালো ফল না করলে অপমান করে বা তুলনা করে। এটি তার আত্মবিশ্বাস নষ্ট করে এবং পড়াশোনা থেকে তাকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়।চতুর্থত, পরিবারে পড়াশোনাবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। টিভি, মোবাইল বা অন্যান্য বিকর্ষণ থেকে দূরে রেখে, নির্দিষ্ট সময়ে নিরিবিলি পরিবেশে পড়ার সুযোগ করে দিতে হবে।সবশেষে, অভিভাবকদের নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। সন্তান কত পেয়েছে, সেই প্রশ্নের চেয়ে সে কী শিখেছে, তার চিন্তা বা মনোভাব কেমন- এই দিকগুলোতেও নজর দিতে হবে। শিক্ষকদের ভূমিকা হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষক কেবল পাঠদানকারী নন, বরং একজন দিকনির্দেশক, একজন অনুপ্রেরণা। পাঠ্যবইয়ের বাইরেও শিক্ষার্থীদের চিন্তা করার সুযোগ করে দেওয়া, তাদের প্রশ্ন করতে উৎসাহ দেওয়া এবং পাঠ্য বিষয়ের সাথে জীবনের যোগসূত্র খুঁজে বের করতে সহায়তা করাই হবে একজন আদর্শ শিক্ষকের দায়িত্ব। সেইসাথে অভিভাবক থেকে শুরু করে শিক্ষকদের দরকার শিক্ষাথীদের তাদের উৎসাহ উদ্দীপনা কাজে সঙ্গ দেওয়া, যেটাতে তারা স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে।

তাছাড়াও পরিবারকে সচেতন হতে হবে- সন্তানের হাতে স্মার্টফোন তুলে দিলেই দায়িত্ব শেষ নয়, বরং সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাই মূল দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, শিক্ষকদের প্রযুক্তিকে প্রতিপক্ষ নয়, বরং সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করতে হবে। আর সবচেয়ে বড় কথা, শিক্ষার্থীদের নিজেদের মধ্যেই তৈরি করতে হবে আত্মনিয়ন্ত্রণ ও লক্ষ্যবোধ।শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা খুবই সহজ- স্মার্টফোন কি শিক্ষার্থীদের নিয়ন্ত্রণ করবে, নাকি শিক্ষার্থীরাই স্মার্টফোনকে কাজে লাগাবে? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে তাদের এসএসসি ফলাফলই নয়, বরং পুরো ভবিষ্যৎ জীবনযাত্রার দিকনির্দেশনা।আগের চেয়ে কঠোর হচ্ছে এসএসসি ও এইচএসসির মতো পাবলিক পরীক্ষা।পাবলিক পরীক্ষায় নকল ও প্রশ্ন ফাঁস রোধে এসব ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বললেন নতুন সরকারের শিক্ষামন্ত্রী। তিনি এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, পরীক্ষার স্বচ্ছতা বজায় রাখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি কার্যকর হবে অর্থাৎ পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ এবং শিক্ষার্থীদের পরীক্ষার সাথে সম্পৃক্ততা রাখতেই নকল ও প্রশ্ন ফাঁস রোধে থাকবে বিশেষ অভিযান।নজরদারির জন্য পর্যায়ক্রমে সব পরীক্ষাকেন্দ্রে বসবে সিসি ক্যামেরা। তাৎক্ষণিকভাবে পরিদর্শন করা হবে দেশের যেকোনো কেন্দ্র।আপাতত ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে বসানো হবে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা। এই কেন্দ্রগুলো বিশেষভাবে তদারক করা হবে। পর্যায়ক্রমে সব কেন্দ্রে বাধ্যতামূলকভাবে সিসি ক্যামেরা বসানোর পরিকল্পনা রয়েছে।পরীক্ষার্থীরা যা লিখবে, এর ভিত্তিতেই নম্বর পাবে। কোনো ধরনের অতিরঞ্জিত নম্বর দেওয়া হবে না। চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষা থেকে দেশের সব বোর্ডে অভিন্ন প্রশ্নপত্রে পরীক্ষা গ্রহণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়েছে। এতে সব মিলিয়ে আগের চেয়ে কঠোর হচ্ছে পাবলিক পরীক্ষা।

‘আসন্ন এসএসসি পরীক্ষা হবে সম্পূর্ণ নকলমুক্ত এবং প্রশ্ন ফাঁসমুক্ত। যদি কোনো কেন্দ্রে অনিয়ম প্রমাণিত হয়, তবে কেবল পরীক্ষার্থীর বিরুদ্ধে নয়, কেন্দ্রে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও আমরা বিভাগীয় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এবার থেকে খাতায় কোনো ধরনের ‘গ্রেস মার্ক’ বা অনুকম্পার সুযোগ থাকবে না। ছাত্রছাত্রীরা যা লিখবে, তার ভিত্তিতেই নম্বর পাবে তারা। আমরা চাই মেধার প্রকৃত লড়াই হোক। কোনো ধরনের দয়া-দাক্ষিণ্য দেখিয়ে অযোগ্যদের পার করে দেওয়ার সংস্কৃতি আমরা বন্ধ করতে চাই। আমরা আর কোনো মুখস্থবিদ্যার পাশ চাই না।’ বিশেষ করে দুর্গম এলাকা, চরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা এবং পাহাড়ঘেরা কেন্দ্রগুলোতে বিশেষ নজর থাকবে। খাতা মূল্যায়নে কোনো ধরনের অলিখিত দয়া-দাক্ষিণ্য দেখিয়ে অযোগ্যদের পার করে দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। ২০২৬ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীদের পরীক্ষা ২১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখ থেকে শুরু হবে এবং এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলবে। তাই এখনই প্রস্তুতির শেষ সময়। প্রত্যেক পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় ভালো ফলাফল আশা করে। কিন্তু পরীক্ষায় প্রত্যাশিত ফলাফলের জন্য একজন পরীক্ষার্থীকে তার সামর্থ্য অনুযায়ী লক্ষ্য নির্ধারণ করতে হবে এবং কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের জন্য সর্বোত্তম প্রস্তুতি নিতে হবে। এই সময় অনেকেই ভালো ফলাফল, বিশেষ করে সর্বোচ্চ নম্বর বা এ প্লাস পাওয়ার জন্য অতিরিক্ত চাপ অনুভব করে এবং শরীর ও মনের ওপর চাপ সৃষ্টি করে কঠোর পড়াশোনা করে। কিন্তু মনে রাখতে হবে, শুধু সর্বোচ্চ নম্বর পাওয়াই জীবনের একমাত্র লক্ষ্য নয়। নিজের দক্ষতা, পরিশ্রম এবং আত্মবিশ্বাসই একজন শিক্ষার্থীর আসল শক্তি।


পরীক্ষার আগে বাকি সময়টুকু সঠিকভাবে কাজে লাগানো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নতুন কিছু শেখার চেয়ে এখন আগের পড়াগুলো ভালোভাবে পুনরাবৃত্তি করা বেশি দরকার। প্রতিদিন একটু একটু করে পড়লে এবং পরিকল্পনা মেনে পড়াশোনা করলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে। যদি তোমরা তোমাদের সময় এবং সক্ষমতাকে সঠিকভাবে কাজে না লাগাও, তাহলে পরে কষ্ট পেতে হবে। কারণ, যখন নিজের প্রকৃত সক্ষমতা বুঝতে পারবে, তখন হয়তো ফলাফল ঠিক করার মতো সময় আর থাকবে না।শিক্ষার্থীদের মনে রাখতে হবে যে জীবন শুধু একটি পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে না। জীবনে আরও অনেক পরীক্ষা আসবে এবং প্রতিটি ধাপেই নতুন সুযোগ থাকবে। তাই এসএসসি পরীক্ষাকে জীবনের শেষ বা সবচেয়ে বড় পরীক্ষা ভাবার কোনো কারণ নেই। ফলাফল যা–ই হোক না কেন, শিক্ষকেরা, বাবা-মা এবং বড়রা সব সময় তাদের পাশে আছেন। তাঁরা সন্তানের চেষ্টা, পরিশ্রম এবং সততাকেই বেশি গুরুত্ব দেন।তবে বাস্তবতা হলো, অনেক সময় অভিভাবকেরাই সন্তানের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করেন। অনেকেই মনে করেন যে জিপিএ–৫ না পেলে যেন জীবনের কোনো মূল্যই নেই বা সমাজে তাদের মর্যাদা কমে যাবে। এই ধরনের চিন্তা শিক্ষার্থীর মনে অযথা ভয় ও উদ্বেগ তৈরি করে। তাই অভিভাবকদের উচিত সন্তানদের স্বপ্নকে সম্মান করা এবং তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখা। একজন শিক্ষার্থী যেন আনন্দের সঙ্গে পড়াশোনা করতে পারে, সে পরিবেশ তৈরি করাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। একজন অভিভাবক হিসেবে আমাদের উচিত সন্তানদের স্বপ্ন অনুসরণ করতে দেওয়া এবং তাদের সর্বোচ্চভাবে সমর্থন করা।


এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন ফেসবুকসহ বিভিন্ন জায়গায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিজ্ঞাপন দেখা যায়। অনেকেই পরীক্ষার আগে এসব প্রলোভনে পড়ে যায়। শিক্ষার্থীদের অবশ্যই মনে রাখতে হবে, এ ধরনের অবৈধ পথ তাদের ভবিষ্যতের জন্য ক্ষতিকর। কখনোই প্রশ্নপত্র ফাঁস বা অন্য কোনো অসৎ উপায়ের দিকে ঝুঁকে পড়া উচিত নয়। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, অভিভাবকেরাও সন্তানের ভালো ফলাফলের জন্য এমন অনৈতিক পথে উৎসাহ দেন। কিন্তু এভাবে পাওয়া ফলাফল কখনোই সত্যিকারের সাফল্য নয়; বরং এটি ভবিষ্যতে বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। আবার, পরীক্ষার হলে নকল করা বা অন্য পরীক্ষার্থীর কাছ থেকে নকল করা দুটিই একই ধরনের অসৎ কাজ। তাই পরীক্ষার হলে যেকোনো ধরনের নকল থেকে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।পরীক্ষায় ভালো করার জন্য কৌশল বা সঠিক পরিকল্পনা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। প্রশ্নের উত্তর লেখার সময় কৌশলী হতে হবে। সঠিক পরিকল্পনা এবং পর্যাপ্ত বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান একজন শিক্ষার্থীকে প্রত্যাশিত সাফল্যের দিকে নিয়ে যেতে পারে। সময় ব্যবস্থাপনা একজন শিক্ষার্থীর জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরীক্ষা প্রস্তুতির সময়, পরীক্ষার দিন হলের উদ্দেশে বের হওয়ার সময় এবং পরীক্ষার খাতায় উত্তর লেখার সময়- সব ক্ষেত্রেই সময়ের সঠিক ব্যবহার করতে হবে।

এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষার ফলাফল হয়তো সরাসরি একটি শিক্ষার্থীর ক্যারিয়ার নির্ধারণ করে না, কিংবা জীবনে বড় কোনো সাফল্যের একমাত্র চাবিকাঠিও নয়। তবে এই বোর্ড পরীক্ষাগুলোর রয়েছে এক বিশাল শিক্ষণীয় গুরুত্ব, যা জীবনের প্রতিটি ধাপে কাজে লাগে।সবশেষে মনে রাখতে হবে, তোমাদের মা-বাবা সব সময় তোমাদের সুখে-দুঃখে পাশে আছেন। তাই অযথা ভয় বা আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই। শিক্ষকদের উপদেশ, বাবা-মায়ের ভালোবাসা এবং বড়দের আশীর্বাদকে শক্তি হিসেবে নিয়ে আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করো।এসএসসি কিংবা এইচএসসি- উভয় পরীক্ষাই একজন শিক্ষার্থীকে শেখায় কীভাবে ধৈর্য ধরে, অধ্যবসায়ের সঙ্গে এবং সময়ানুবর্তিতা বজায় রেখে একটি লক্ষ্য পূরণের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। প্রশ্নপত্রের নম্বরের চেয়েও বড় হয়ে ওঠে প্রস্তুতির প্রক্রিয়া, নিয়মিত পড়াশোনা, পরিকল্পনা অনুযায়ী চলা এবং মনোসংযোগ ধরে রাখার মানসিক শক্তি গড়ে তোলা। ঠিক যেমন জীবনের বড় পরীক্ষাগুলোতে কেবল মেধা নয়, এই গুণগুলোরও প্রয়োজন হয়।শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ও দায়িত্ববোধ ফিরিয়ে আনতে নতুন সরকারের শিক্ষামন্ত্রীর নেওয়া পদক্ষেপগুলো স্পষ্টতই একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করছে। এতে বোঝা যাচ্ছে, এ বছরের ফলাফল আর আগের মতো গৎবাঁধা ধারা অনুসরণ করবে না; বরং মেধার প্রকৃত মূল্যায়নের দিকে অগ্রসর হওয়ার একটি প্রয়াস দেখা যাচ্ছে। এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে শিক্ষার্থীরা কীভাবে নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে, তা সময়ই নির্ধারণ করবে। একই সঙ্গে আসন্ন ফলাফলই হয়তো বলে দেবে—শিক্ষার্থীরা সত্যিই নতুন কিছু শেখার প্রতি আগ্রহী কি না, তারা নিজেদের মেধার যথাযথ প্রয়োগ করতে পেরেছে কি না, এবং প্রকৃত জ্ঞান অর্জনের প্রতি তাদের আকাঙ্ক্ষা কতটা গভীর।এই বোর্ড পরীক্ষা শুধু একজন শিক্ষার্থীর শৃঙ্খলা, সময় ব্যবস্থাপনা ও আত্মনিয়ন্ত্রণ শেখায় না, বরং তাকে আত্মসমালোচনার সুযোগও করে দেয়। পরীক্ষার মাধ্যমে একজন শিক্ষার্থী বুঝতে পারে সে কতটুকু শিখেছে, কোন বিষয়ে দুর্বলতা রয়েছে, কোথায় উন্নতি করতে হবে। ফলে এসব পরীক্ষা হয়ে ওঠে একজন শিক্ষার্থীর জীবনে আত্মমূল্যায়নের অন্যতম মাধ্যম। আর এইভাবে যদি শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে গোটা সমাজ ব্যবস্থা সঠিক পদক্ষেপ অনুযায়ী এগোতে থাকে তাহলে একদিকে যেমন শিক্ষার্থীদের পড়ালেখায় আগ্রহ তৈরি হবে এবং  শিক্ষাব্যবস্থার ব্যর্থতাও দূর হবে।

লেখক: আমি সুমন বৈদ্য বর্তমানে ঢাকার স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম বিভাগ থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জনের জন্য অধ্যয়ন করছি।পাশাপাশি একজন ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক ও লেখক হিসেবে কর্মরত অবস্থায় রয়েছি।

Comments

    Please login to post comment. Login