কুষ্টিয়ার ফিলিপনগরে শাহ সুফি বাবা শামীম আল জাহাঙ্গীর-এর দরবারে আজ তৌ'হিদি জনতা হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেছে। এবং ওই ন্যাক্কারজনক হামলায় সুফি ঘরাণার ওই সাধক প্রাণ হারিয়েছেন। সহজিয়া ঘরাণার এমন মানুষদের শত্রু থাকতে পারে -যা অভাবনীয়।
বিএনপি সরকারের আমলে এই প্রথম মব ভায়োলেন্স হলো -যেটার ফুটপ্রিন্ট তৈরি করে দিয়ে গেছে ইন্টেরিম গভমেন্ট। তাদের আস্কারায় মব ভায়োলেন্টরা নিজেদেরকে দুঃসাহসী করে তুলেছে।
সাধক এই মানুষটি নিজস্ব পদ্ধতি ও নিয়মে ঈশ্বরের আরাধনা করতেন। ধর্মসাধনা করতেন। কারো ধর্মের এতটুকু ক্ষতি করবার সামর্থ্য বা ইচ্ছা তার ছিল এমনটা আমরা মনে করি না। ধর্মের মতো এত বড় প্রাতিষ্ঠানিক ও প্রতিষ্ঠিত শক্তিকে ক্ষুদ্রতম কোনো মানুষ অবমাননা বা হেয় করতে পারে -এই ভাবনাটাই অর্বাচীনতা ও বালখিল্যতা। যুক্তির চেয়ে অন্ধত্বকে যেখানে বড় করে রাখা হয় -সেখানে ধর্ম বিরাজ করে না। মানুষের আসল স্বধর্ম হলো তার প্রজ্ঞা, জ্ঞান ও বিবেচনাবোধ। এবং সবার আগে জীবন। জীবন না থাকলে ঐশী ধর্মের ধারক বলে তো কিছুই থাকবে না।
মানুষের প্রতি এতটা রাগ পুষে রেখে ঘুমায় কেমনে এই ভায়োলেন্ট জনতা বুঝি না? এর আগেও আমরা বিগত সরকারের সময় দেখলাম রাজবাড়ির গোয়ালন্দে পীর নূরাল পাগলার মরদেহ কবর থেকে তুলে নিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছিল ওই একই ধাচের ভায়োলেন্টরা। সারাদেশে কয়েকশত মাজার ভাঙছে, জোরজবরদস্তিতে আবুল সরকারের মতো বাউল ফকিরদের গ্রেফতার করতে আইনশৃঙ্খলাবাহিনীকে বাধ্য করছে এরাই।
অথচ তাদের নিজেদের মধ্যেই ভাগ বিভাজনের সীমা পরিসীমা নাই। হেফাজত মানে না জামায়াতকে। জামায়াত মানে না চরমোনাই পীরকে। আবার এনায়েতুল্লাহ আব্বাসীর দৃষ্টিতে তিনি ছাড়া বাকি সবাই কাফের। সালাফিদের শত্রু শিয়ারা। সুন্নিরা দুইচক্ষে দেখতে পারে না আহলে হাদিসদের। নিজেদের মধ্যে বেদ বিধির শাস্ত্রকানা অবস্থা নিয়ে এই তারাই কিনা বিচার করতে বসেছে সুফি সাধকদের! কী হাস্যকর ব্যাপার!
কথা বলাটাও বিপদ। আমি আপনি যে কেউ যখন তখন এই মবের শিকার হয়ে যেতে পারি। তাই কারো নিন্দা করব না। রাগও দেখাবো না। শুধু বলব সরকার যেন নিরীহ একজন মানুষের এমন দিনেদুপুরে বর্বরোচিত হ'ত্যাকাণ্ডের ঘটনাটিকে আমলে নেয় এবং যথাযথ আইন প্রয়োগ করে। অপরাধীর শাস্তি নিশ্চিত না করা গেলে আইনের শাসন যেমন প্রতিষ্ঠিত হবে না তেমনি ভয়ঙ্কর মবোক্রিসির রাশও টেনে ধরা যাবে না।
কারো বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় আইনবিরোধী কাজের অভিযোগ আনা হলে সেটি দেখভাল, তদন্ত ও বিহিতব্যবস্থা গ্রহণের দায় ও দায়িত্ব রাষ্ট্রের আইন-শৃঙ্খলা সংস্থা ও বিচারালয়ের। যেকোনো পরিস্থিতি ও বিবেচনাতেই আইন হাতে তুলে নেয়া সভ্যতা ও মানবতাবিরোধী কাজ। কারো উস্কানিতে পড়ে যেসব কোমলমতি শিশুরা মব করতে গেছে -তাদের না আছে ধর্মবোধ, না আছে শিক্ষা।
যেকোনো সুষ্ঠু স্বাভাবিক সভ্য সমাজে ধর্ম পালনের স্বাধীনতা যেমন থাকতে হবে, তেমনি ধর্ম না পালনের স্বাধীনতাও দিতে হবে। খেয়াল রাখতে হবে কেউ কারো শত্রু যেন বনে না যায়। সহনশীল সমাজ কায়েম করা না গেলে বহুত্ববাদী সংস্কৃতি যেমন বাঁচবে না, তেমনি বহুমতের মানুষের সুন্দর সহাবস্থানও নিশ্চিত করা যাবে না।
মানুষ একজন আরেকজনকে নিখাদ মানুষ পরিচয়ে ভালোবাসবে, মমতা করবে এবং বিপদে-আপদে পাশে থাকবে। কোনো অবস্থাতেই নির্দিষ্ট একটি ধর্ম দিয়ে মানুষের গুণ বিচার করা সমীচিন হবে না।
লেখক: সাংবাদিক
১১ এপ্রিল ২০২৬