[ডিসক্লেইমার: এই গল্পে চিত্রিত প্রভাবশালী চরিত্র ও ক্ষমতার অলিগলি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। মানুষের মনের গহীনের অন্ধকার ও জটিল প্রবৃত্তিগুলো বাস্তব হলেও, এখানকার চরিত্র, তাদের কর্মকাণ্ড এবং প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বাস্তবের কোনো ব্যক্তি বা স্থানের মিল নেই।]
রক্ত-পানিতে স্যাঁতসেঁতে বাথরুমের ফ্লোরটায় ঠিক কত ঘণ্টা বসে আছে স্নেহা? ওর সময়ের কি এখন আর কোনো রুটিন বা টেবিল আছে? আজকে কী বার, কত তারিখ, এখন ঘড়িতে কয়টা বাজতেছে, কিছুই তো ওর আয়ত্তে নাই আর। অবশ্য এসবের তো ওর খুব একটা দরকারও পড়তেছে না। বরং কোনোদিনই যদি এগুলার খোঁজ-খবর না রাখতে হয়, ওর বরং তাতে আরামই বোধ হবে। বেশি জানা মানেই জীবনে বেশি প্যারা ডেকে আনা।
নাক বরাবর রক্তের সরু একটা স্রোত বয়ে আসার আগমন টের পেতেই নিজের মাথাটাকে আস্ত একটা চন্দ্রনাথ পাহাড় মনে হলো ওর! সমস্ত তিতা অনুভূতি যেন এক বিশাল জলপ্রপাত হয়ে আছড়ে পড়তেছে মগজের ওপর। তলোয়ারের মতো ওর খাড়া নাকটাকে মনে হইতেছে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা এক পিচ্ছিল গিরিপথ। বিষাদের নোনা পানি অবিরাম এই পথ দিয়ে নেমে যে কোথায় গিয়ে মিলতেছে, স্নেহা ভাবে! এই মোমেন্টে নিজের সবকিছু নিয়ে তামাশা করা ছাড়া আর কোনো পথ দেখতেছে না ও। এখান থেকে উঠে যে রুম পর্যন্ত যাবে, এরচেয়ে মনে হলো এভারেস্ট না হলেও ভ্যালি অফ সাইলেন্স পর্যন্ত যাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ কাজ হবে, শেরপাদের জন্য আর কী!
শেরপাদের কথা মনে পড়তেই “নিঃসঙ্গ শেরপা” বিশেষণটা মাথায় আসলো। ফাটা কপালেও কত কী মনে আসে! শামসুর রাহমানকে চমৎকার ওই বিশেষণটা দিছিলেন হুমায়ুন আজাদ। উনি মনে করতেন, রাহমান সাহেব প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে বাংলা কবিতাকে আধুনিক নাগরিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করছিলেন। ইভেন উনার দাবি ছিল- আধুনিক কবিতার ঝাণ্ডা নিয়ে শামসুর রাহমান একাই এভারেস্টের চূড়ায় উঠে বসছিলেন, আর বাকিরা সব নিচে দাঁড়িয়ে হাঁ করে দেখছেন। স্নেহার এখন নিজেকেও ওই রকম নিঃসঙ্গ শেরপা ফিল হলো। তফাৎ শুধু এই যে, ওর এভারেস্ট হচ্ছে চার কদম পার হলেই বাথরুমের বাইরের রুমটা। নাক থেকে এক আঙুল দিয়ে রক্তের সরু স্রোতটা নিচের দিকে টেনে এক টোকায় ফ্লোরের দিকে ছুঁড়ে মারতে গিয়ে ও এসবই ভাবতেছিল।
রক্তের ফ্লোটা কমলেও পুরাপুরি বন্ধ হয় নাই। একটু পর পর নাক আর চোখের পাপড়ি বেয়ে ঝর্ণার ধারা নেমে আসতেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় ওর পাথুরে নদীর জলে তো কোনো পাহাড়ি পুরুষ গোসলে নামে নাই, নামলে নাহয় শাফিন আহমেদের মতো ভেজা ওই তনু মন ধরতে না পারার আফসোসটা ও করতে পারতো! বাম চোখের পাপড়িতে এবার রক্তের ফোঁটা আসতেই চোখটা কুঁচকে ও বিরক্ত হলো। শালা, ভ্যান গগ তো মরার আগে “স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার” বলে গেছেন, ব্লিডিংও কি লাস্ট ফরএভার হবে? অবশ্য একই তো কথা, ও ভাবে। হৃদয়ের ব্লিডিংও তো ওর অনন্তকাল ধরে চলমান আছে! কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে এই স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্টের ছোট্ট বাথরুমটাতেই কি ও মরে পড়ে থাকবে নাকি? বিষয়টা ওর কাছে হালকা চিন্তাজনক লাগে। ওর মৃত্যুটা আরেকটু রাজকীয় হওয়া উচিত না? মউতের প্রতি ওর যে তীব্র প্রেম আর আকর্ষণ, এ রকম শ্রীহীন মরে গেলে তো ওই প্রেমের প্রতি ডিজঅনার করা হবে। চাহিদার সঙ্গে প্রাপ্তির একটা ভারসম্য থাকতে হবে না?
সুলতান আহমদ নামের একজন উর্দু কবি লিখছিলেন-"এ আশিককা জানাজা হ্যায়, যারা ধুমসে নিকলে"। জানাজা না হোক, ওর মৃত্যুটা তো অন্তত গ্ল্যামারাস হওয়া উচিত। কিন্তু চোখের কোনায় এসে জমা রক্তের ফোটা এক আঙুল দিয়ে টেনে ফ্লোরে ফেলতেই মনে হলো- যেই কপাল ওর! মৃত্যুটাও বেঁচে থাকার মতো লানতেরই হবে। যদিও এরজন্য ও পুরাপুরি রেডি আছে! একদম এক পায়ে খাঁড়া! ডাকিবার মাত্রই “প্রেজেন্ট প্লিজ” বলে দুনিয়াকে টাটা বাই বাই, আস-সালামু-আলাইকুম দেবে। ভ্যান গগকে মনে করে ঠোঁটের কোনায় একটু হাসি আসে ওর। লোকটা কিন্তু হেইভি পাগলাটে ছিল! আকরাম ভাই মনে হয় এইজন্যই একবার ওকে খুব সিরিয়াস ভঙ্গীতে বলছিলেন- আমি আমার হোল লাইফে চারজন মানুষকে নিজেদের জীবন নিয়েে ভয়ংকর রকম এক্সপেরিমেন্ট করতে দেখেছি। স্নেহা জিজ্ঞাসামূলক একটা চাহনি রাখে আকরাম ভাইয়ের দিকে। সে মিটিমিটি হেসে বলে- ভ্যান গগ, র্যাঁবো, সিলভিয়া প্লাথ...। এরপর একটা পজ দিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকেন।
স্নেহাও খুব সিরিয়াস হয়ে চতুর্থ নাম শোনার জন্য অপেক্ষা করে আর ভাবে কোন সে বিখ্যাত জন! আরেকজন কে? বলেন দেখি- আকরাম ভাই স্নেহার কাছে জানতে চাইলেন। আমি কেমনে জানবো? বলতেছেন তো আপনি। আপনার আর আমার অভিজ্ঞতা তো সেইম না, উত্তর দেয় ও। ওই একই মিটিমিটি হাসিটা নিয়েই উনি বলছিলেন, আরেহ পাগলী, আরেকজন হচ্ছে স্নেহা তাসনিয়া! চারজনই অত্যন্ত মেধাবী, কিন্তু চারটারই মাথায় একটু সমস্যা আছে! আকরাম ভাই যে লেগ পুল করতেছিলেন, ও খুব ভালো করেই বুঝতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের নারীবাদীদের মতো বিদ্রোহ করতে ইচ্ছা থেকে ও তখন উনাকে বলছিল- যদিও আমি পুরুষদের খুব ভালোবাসি, কিন্তু হঠাৎ একটু জাজমেন্টাল হতে ইচ্ছা করতেছে, ভাই। উনি তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে ডান হাতের তালু উপরের দিলে তুলে বললেন- ইরশাদ...। এটা উনার নাড়ির টান মনে হয়। আকরাম ভাইয়ের পূর্ব পুরুষ বিহার থেকে আসছিলেন। ওই হিসাবে তাকে বিহারী বলা দোষের কিছু না। উর্দু গজল আর কবিতার প্রতি তার দখলও ঈর্ষণীয়, এমন কী উনার উর্দু একসেন্টও! স্নেহার যেহেতু নিজেকে জাহির করতে হবে, নগদে ও একটা শায়েরি বানিয়ে বলা শুরু করলো- আর্জ হ্যায় কে…মর্দ কো পসন্দ হ্যায় কি কোই উনপে মরে, লেকিন য়ো জুনুন সে ডরতে হ্যায়, জুনুন কে বিনা জিসে ইশক কহেঁ, ওহ্ তো স্রেফ এক সমঝৌতা হ্যায়!
ওয়াহ ওয়াহ ওয়াহ! কেয়া বাত! কেয়া বাত- বলে উচ্ছ্বাস তো ঠিকই প্রকাশ করলেন উনি, কিন্তু তার মতো পণ্ডিত লোকের সঙ্গে টেক্কা দিতে যে প্রজ্ঞা আর বয়সের দিক থেকে স্নেহাকে আরেকটু বড় হতে হবে, ওইটা বোঝাতেই ফিরতি শায়েরিটাও উনি তখনই শোনালেন- হাম সাহিল পে ঘার বানানা চাহতে হ্যায়, তুফাঁ সে ইয়ারি হামেঁ আতি নেহি; তুম যিসে জুনুন কেহতি হো, হাম উসে তাবাহী সমাঝতে হ্যায়। আকরাম ভাইয়ের ওই শায়েরিটা মনে পড়তেই আবিরেকেও মনে পড়লো ওর। বেচারাকে শেষের দিকে খুব প্যারা দিছে ও। আবিরেরও মনে হয় এই জুনুন তাবাহীই লাগতেছিল। ওকে দেওয়া প্যারার মেমোরি মনে করলে স্নেহার খারাপ লাগে, মায়াও লাগে ওর জন্য। কিন্তু ও বুঝতে পারে না, যুগে যুগে এই রকম ইমোশনাল ইলিটারেটদের প্রতিই কি মানুষ জুনুন লেভেলের প্রেম বোধ করে নাকি! কী রকম ওয়েস্টেজ! এরপরই ওর মনে হয়, ও তো আসলে তেমন কোনো পাগলামীই করে নাই। গঁগ্যার চলে যাওয়ার কথা শুনে ভ্যান গগ তো নিজের কানই কেটে ফেলছিলেন! ইনসেন!!!
স্নেহা যেই এক্সট্রিম রিয়্যাক্টগুলা করছে, এর ম্যাক্সিমামই তো আবিরের কর্মকাণ্ডের বিপরীতে জমতে থাকা অভিমান, রাগ, ক্ষোভ, জেদের বিস্ফোরিত রিয়্যাকশন। ওইটাকে বলে “অ্যাকটিং আউট”। এই টার্ম সম্পর্কে আবরার বলছে ওকে। মানুষ প্রচণ্ড যন্ত্রণা আর মনের ভেতরে চলতে থাকা হাহাকারগুলাকে শব্দ দিয়ে প্রকাশ করতে না পারলে না কী শরীর এবং আচরণ বিদ্রোহ শুরু করে। ওইভাবে ওর রাস্তায় চিৎকার করা, রাগে আজে-বাজে টেক্সট পাঠানো অথবা আবিরের সঙ্গে রাজশাহীর ফ্লাইটে উঠে যাওয়া- সবই না কী ছিল যন্ত্রণা প্রকাশের অব্যক্ত ভাষা। যদিও মাঝেমাঝে আসলেই ওই রিয়্যাক্টগুলা অনেক এক্সট্রিম হয়ে যেত। যে কারোর জন্যই ওইসব এক্সট্রিম রিয়্যাক্ট টলারেট কিংবা ডিল করা বেশ কঠিন কাজই। আবিরকে ওর জন্য এমন অনেক সিচ্যুয়েশন ফেস করতে হইছে বলে আবারও ওর মনটা খারাপ লাগে। যাই হোক, এই প্রসঙ্গটা এখন ও এড়াতে চাইতেছে। এসব মনে পড়লে ভালো লাগে না। ভেতরটা অস্থির হয়ে উঠে।
ব্লু টুথ স্পিকারটা এতক্ষণ কীভাবে নন-স্টপ সার্ভিস দিতেছে, আজব! ও কি চার্জে লাগিয়ে স্পিকারে গান ছেড়ে রাখছিল নাকি? মনে পড়তেছে না ওর। সার্ভিস দিতেছে, এটাই তো বড় কথা, যেভাবেই দেক- ঠোঁট উল্টিয়ে ও ভাবে! এত ভাবার তো কিছু নাই! এরমধ্যেই কোহেন গেয়ে উঠেন, "ইফ ইউ আর দ্য ডিলার, আই'ম আউট অব দ্য গেম..."। আরে জোশ! মিউজিক আর কোহেনের ভয়েজে ওর শরীরে একটা রিদম চলে আসে। মনে হয়, মার্লবোরো সিগারেটটা সত্যি সত্যিই ওর ঠোঁটের কোনায় আছে। লম্বা একটা টান দিতে গিয়ে বাম চোখটা যেন কুঁচকে ছোট হয়ে আসলো ওর। নিজেকে ওর লিওনার্দ কোহেন মনে হইতেছে! এই ভাবনায় হাসতে গিয়ে ও কাশে। বুকের খাঁচাটা ভেঙে চুরমার হয়ে আসে কাশির দমকে।
ইন্টারেস্টিংলি, কোহেনের সিগারেট নিয়ে একটা গল্প আছে। আশিক ভাই বলছিলেন মনে হয় ওকে। ৬৯ বছর বয়সে চেইন স্মোকার কোহেন কোনো এক কারণে ডাক্তার দেখাতে গেছিলেন। ওই ডাক্তার তাকে কী ভয়ভীতি দেখালো কে জানে, উনি ওইখান থেকে আসার পর সিগারেটই ছেড়ে দিলেন। কিন্তু পুরানো প্রেমের স্মৃতি কে ভুলতে পারে! যেখানেই কনসার্টে যেতেন, গান গাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে পুরানা প্রেম স্মরণ করে বলতেন- আশি বছর বয়সে আবার সিগারেট ধরবেন। ওই বয়সে ফুসফুস নিয়ে এত ভাবাভাবির কিছু থাকে না বলে যুক্তি ছিল তার। করছেনও না কী তাই। নিজের ৮০ তম জন্মদিনে একটা সিগারেট উনি সত্যিই জ্বালাইছিলেন। কিন্তু আনফরচুনেটলি উনার ওই টেস্ট ভালো লাগে নাই। বহু বছর অপেক্ষার পর সিগারেট টানার ওই এক্সপেরিয়েন্স জানিয়ে এক ইন্টারভিউয়ে উনি বলছিলেন- “ইট ওয়াজ়ন্ট অ্যাজ ডিলিশাস অ্যাজ আই ইম্যাজিন্ড!” আহারে বেচারা! ওই গল্প মনে করে সত্যি সত্যিই এখন সিগারেট খুব মিস করতেছে স্নেহা।
আরো মজার ব্যাপার, ওর স্পোটিফাইতে এখন কোহেনের লাস্ট অ্যালবামের গান বাজতেছে। এটার কাভারে থাকা ছবিতে মাথায় ব্ল্যাক হ্যাট, চোখে সানগ্লাস পরা কোহেনের দুই আঙ্গুলের ফাঁকে একটা সিগারেটও জ্বলতেছিল। ওই অ্যালবাম মারা যাওয়ার মাস খানিক আগে রিলিজ হয়। ৮২ বছর বাঁচছেন লোকটা! একটা সিগারেট খাওয়ার জন্য কি এখন স্নেহারও আশি বছর পর্যন্ত বাঁচতে হবে? নো! নেভার- এক প্রকার চিৎকার করে উঠে ও এই ভাবনায়। এই চিন্তা হরর মুভির চেয়েও ভয়ংকর! আশি বছর ধরে একটা যন্ত্রণাদায়ক জীবন বয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো পাগল না কি ও! সিলভিয়া প্লাথ কি আর খামাখাই লিখছিলেন-
ও গড, আই অ্যাম নট লাইক ইউ
ইন ইয়োর ভ্যাকুয়াস ব্ল্যাক,
স্টার্স স্টাক অল ওভার, ব্রাইট স্টুপিড কনফেত্তি
ইটারনিটি বোরস মি,
আই নেভার ওয়ান্টেড ইট
স্নেহার মনে হলো- মানুষ যদি সত্যিই অমরত্ব পেত, তবে এই দুনিয়াটা একটা বিশাল 'স্বেচ্ছামৃত্যুর কারখানা' হয়ে উঠতো। প্রতিদিন, প্রতি মুহূর্ত দলে দলে মানুষ লাইনে গিয়ে দাঁড়াতো বিনাশের আশায়। মৃত্যু মনে হয় তখন আল্লাহর তরফ থেকে মেট্রিক-ইন্টারের ঐচ্ছিক সাবজেক্টের মতো থাকতো। আল্টিমেট ডেসটেনি হতো না। ও কপাল থেকে বেয়ে আসা আরেক ফোঁটা রক্ত আঙুলের টোকায় ফ্লোরে ফেলতে ফেলতে চিন্তা করে- মানুষ মনে হয় তখন জন্মদিনের কেক কাটতো না, মৃত্যুর অ্যাপোয়েন্টমেন্ট পেলে সেলিব্রেশন করতো। লম্বা সময় বেঁচে থাকাকে ওর আসলেই ওভাররেটেড লাগে। মানে, একটা মানুষ রোগে-শোকে আক্রান্ত হয়ে খেতে পারবে না, চলতে পারবে না, অন্যের ওপর ডিপেন্ডেন্ট হয়ে থাকতে হবে, তবু তাকে আরেকটু বাঁচতেই হবে কেন! বাঁচলে বাঁচুক, যার যার নিজস্ব ব্যাপার। পঞ্চমীর চাঁদ ও জীবনেও ডুবতে খেয়াল করে নাই যদিও, তবুও ওর মরিবার সাধ আছে, যত দ্রুত সম্ভব! কী আর করার? এটা মনে হয় ওর জন্য গড গিফটেড ডিজায়ার!
আচ্ছা…বেঁচে থাকতে মানুষ মুক্তি পায় কীভাবে? আবিরের কাছ থেকে ওর জানা উচিত ছিল মনে হয় শেষদিন। আবির কি এখন মুক্ত বিহঙ্গের মতো পাখা মেলে আকাশে বাক বাকুম বাক বাকুম করে উড়তেছে? দৃশ্যটা কল্পনা করে ও ফিক করে হাসে! ওর নাম আজকে থেকে “পাঙ্খা আবির”! যতবার ওকে মনে পড়বে, এই নামেই এখন থেকে ডাকার সিন্ধান্ত নিলো স্নেহা! বোকা লোকটা শেষ দিনও ভাবছে, এই সম্পর্কের ক্লোজারটা মনে হয় সে-ই টানছে! হা হা হা! স্নেহা যে ফোন নিয়ে বাথরুমে আসছিল, মনেই ছিল না ওর। বেসিনের উপর ভাইব্রেট হওয়ায় খেয়াল করে। আবরার ফোন দিতেছে। দেক। ও কোহেনের ইউ ওয়ান্ট ইট ডার্কার আবার রিপিট দেয় স্পটিফাইতে।
১৭ মার্চ আবিরের ঘোষণা দিয়ে আনুষ্ঠানিক ক্লোজারের দিন, ওর বাকওয়াজগুলার শেষেরদিকে আবির আবরারকে বলতেছিল- উনি যদি আমাকে ভালোই বাসেন, তাহলে ছেড়ে দেন না কেন? আমাকে যেতে দেন না কেন? লে হালুয়া- এগজেক্টলি এটাই স্নেহার তখন মনে আসতেছিল! মুখে যদিও ও কোনো শব্দ করে নাই। করার প্রয়োজন হয় নাই। হলেও হয়তো করতো না। আবরারই উত্তর দিয়ে বলছেন- আবির ভাই, আপা তো আপনাকে ছেড়েই দিছেন। আবরার দুইবার রিপিট করে একই কথা। আবির তখন চুপ হয়ে যায়। ওই রাতের সেশন শেষ করে সারা রাত স্নেহা একটা জায়গাতেই স্থির বসে ছিল। ভোরবেলা জানালার পাশে বসে লিখছিল ‘নাজাত’ নামের দীর্ঘ এক কবিতা-
কদর্য অনুভূতি দিয়ে
শেষ পর্যন্ত টানা হলো
বহু কাঙ্ক্ষিত সমাপ্তির রাত;
বিজয়ীকে জানাই- মোবারকবাদ!
বিজয় উল্লাস ক্ষণে
দ্বিধাকে বিদায় দিয়েন এবার
নতুবা নির্জন দুঃস্বপ্নের রাতে,
তিক্ত আলাপ ঘটে যেতে পারে- নিজের সমস্ত দ্বিচারিতার সাথে।
বন্ধ দরজা- এ সুবিশাল বন্দিশালায়;
ছোট ছোট আরো অসংখ্য বন্দিত্বে
আটকে যেতে পারে বিমূর্ত সময়
তারে ভুলে যেতে, সকল শক্তি দিয়ে
ঘষে ঘষে মুছে দিতে পারেন-
চোখ, মুখ, নাক আর চিবুক জুড়ে
থাকা অজস্র স্মৃতিচিহ্নের দাগ!
বিষয়টা কিছুটা সময়সাপেক্ষ;
কিছু মুছে গেলেও
কিছু কিছু শুধু বাড়াবেই ক্ষত।
তারচেয়ে কিছুটা বিরতি দিয়েন
ক্রোধ আর ঘৃণার মাঝ বরাবর,
দাঁড়ির আগে ছোট ছোট কমায়
বাক্যের ভেতর যেমন শব্দ থামায়।
এরই ফাঁকে, দেখা মেলে যদি
আত্ম-কলবের, ভুলক্রমে!
নিজের কাছে দিতে হয় যদি
নিজেরই দ্বিচারিতার স্বীকারোক্তি?
পরাজিতের অন্তঃস্থল হতে জানাই-
আগাম সিম্প্যাথি!
জানি, এত সামান্য সওয়াল-জবাবে
কিছুই ভাঙে না অর্ধ মিথ্যার অভ্যস্ততার
তারচেয়ে বিরতি ভেঙে, তিক্ত স্মৃতি স্মরণে
বাড়াতে পারেন তিক্ততা আবার।
ক্ষোভে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলে কানায় কানায়
এবার পোড়ানোর প্রস্তুতি চলুক
হৃদয় নিংড়ানো একেকটা দীর্ঘ আলাপ।
কিছুটা বিপত্তি ঘটতে পারে,
এসকল শব্দমালার তীব্রতার ভারে।
বুমেরাং হয়ে ফিরে যেতে পারে সমস্ত বুলেট;
পোড়ালেই যেহেতু সকলেই হয় না ছাই,
বরং কিছু কিছু আরো খাঁটি হয়ে
সত্য-মিথ্যার তফাৎ টেনে জানায়- আত্মপরিচয়!
আবারও হোঁচট খেতে পারেন;
যতবার মুছে ফেলার তাগাদায়
ঘষে ঘষে পরীক্ষা হবে অবশিষ্ট ধ্বংসাবশেষ
তারই ফাঁকে, আস্ত একটা দ্বিধা আর অর্ধ মিথ্যার জগত
বেসামাল হয়ে ওঠতে পারে শরাব ছাড়াই।
এমন বিপর্যয়ে, পরাজিতের অন্তঃস্থল হতে জানাই-
আগাম সিম্প্যাথি!
কদর্য অনুভূতি দিয়েই
যেহেতু শেষ পর্যন্ত টানা হলো
বহু কাঙ্ক্ষিত সমাপ্তির রাত,
বিজয়ীকে আরও একবার জানাই- প্রাণঢালা মোবারকবাদ!
এমন মুক্তির উল্লাসে; দেখেন, যদি পারেন-
দ্বিধাকে বিদায় দিতে চিরতরে।
নতুবা হঠাৎ, বহুকাল বাদ
মনের জমিন কাঁপিয়ে তুলতে পারে- লা'নাতুন নাফস!
যেহেতু খোদার দরবারে
হেফাজতে থাকে সমস্ত আমলনামা:
নিশ্চয় তিনি সর্বোত্তম বিচারক,
পরমকরুণাময়- ইন্নাল হামদা লিল্লাহি।
ও কবে আবিরকে আটকাইছে, স্নেহা মনে করার চেষ্টা করে। এর আগেও যখন একবার বউ-বাচ্চার কাছে যাবে বলে মুক্তি চাইছিল, ও তো তখনও ওকে হেসেই চলে যেতে দিছিল। চট করে মেজাজটা খারাপ হলো। এমনভাবে আবির “মুক্তি” “মুক্তি” করছে ওইদিন, মনে হয় স্নেহা ওকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখছিল! আজব! চলে যাওয়ার পর তো আবিরই আবার যোগাযোগ শুরু করে। দেখা করাও। রাজশাহীতে পোস্টিং হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরা এক বছর তো প্রতি মাসে আবিরই ওর সঙ্গে এসে দেখা করছে নিজে থেকে। ওই সময় স্নেহা ওকে কখনোই দেখা করার কথা বলে নাই। নিজে থেকে কখনো টেক্সটও করে নাই। আবিরই টেক্সট করতো। ঢাকায় আসলে দেখাও আবিরই করতে চাইতো!
একবার-দুইবার না। যখনই আবির ঢাকায় আসছে, দেখা করছে। একটা সময় ওদের সম্পর্ক আবার নরমাল হইছে। ইন্টিমেট সম্পর্কটাও আবার ডেভেলপ করছে। পুরা এক বছর এক মাস পর স্নেহা যখন আবিরকে ওর ভালোবাসা এক্সপ্রেস করে ভালোবাসতে দিতে অনুমতি চাইছিল, আবির খুব দুঃখ নিয়ে ড্রাঙ্ক অবস্থায় ওকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল- তোমাকে সব দিতে পারবো, শুধু নিজেকেই দিতে পারবো না।
স্নেহা কোনোদিনই ওকে ও চাইবে না নিশ্চিত করে শুধু ভালোবাসতে দিতে অনুরোধ জানায় উত্তরে। চায়ও নাই কোনোদিন। অল্পটুকু কথা, অল্পটুকু দেখা নিয়েই তো ও সন্তুষ্ট থাকতো। আবির তবুও প্রতিবার যাওয়ার আগে সিচ্যুয়েশন এমন ঘোলাটে করতো, নিজের গিল্ট ফিলিং ওর উপর চাপিয়ে দিয়ে যেত। আবির যে ওকে ভালোবাসার অনুমতি দিছিল, ওইটাও ভয়ে? স্নেহা ভাবে- হায় কপাল! নাকি মহৎ হওয়ার জন্য? উফ!!! কী বীভৎস ওই উদারতা! আবিরের কাছে মেবি ওইটা ছিল একটা 'এক্সাইটিং' ব্রেক, আর স্নেহার কাছে- সারা জীবনের সঞ্চয়।
দুই বছর স্নেহাও কি খুব শান্তিতে ছিল? আবির না চাইলে ও কি কোনোদিন ওর সঙ্গে দেখা করতে পারতো? জোর করতে পারতো? জোর করে এগুলা হয়? আবিরেরও ভালো লাগা ছিল বলেই ও আসতো। ওর মুখের নোনতা ভাবতা চলে গিয়ে একটা তিতা ভাব আসে। জিভ দিয়ে ঠোঁটটা ভিজিয়ে ও ওই ৪৬ ঘণ্টার ৪২ মিনিটের মোমেন্টগুলার কথা মনে করে। ওইবার এত ভয়ংকর সুন্দর ইন্টেন্স মোমেন্ট ওরা কাটাইছে পুরা সময়টা! পুরা সময়টাই ঘোর লাগার মতো ছিল। আবিরের বুকের উপর মাথা রেখে ও জানতে চাইছিল- তুমি কি আমার প্রেমে পড়ছিলা? আবির উত্তরে বলে, এগুলা জিজ্ঞেস কইরো না। স্নেহা ওকে খোঁচায়- আরেহ বলো না। না-ই পড়তে পারো। পড়লেও তো সমস্যা নাই। আবির উত্তর দেয়- বোঝো না কেন বারবার আসি? স্নেহা জানতে চায়- ওইটা মুখে বলতে সমস্যা কী? কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবির একটা দীর্ঘশ্বাসের সঙ্গে জবাব দেয়- লাভ কী? এর কোনো ভবিষ্যত তো নাই। স্নেহা হাসতে হাসতেই বলছিল, ভবিষ্যত কে চাইলো? এত ভেবো না তো!
এমন কি জানুয়ারিতে লাস্ট যখন ও আসলো, ২৪ জানুয়ারি রাতেও বারে বসে ও কাঁদতে কাঁদতে বলছে- তোমাকে ভালোবাসলেও আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। এই সোসাইটি, রিলিজন, এথিক্স- কোনোটাই আমাকে এটা বলতে পারমিট করবে না। স্নেহা শেষদিনও এইসব কনভার্সেশন মনে ওকে করাতে যায় নাই। শেষদিনের কথা ভাবতে গিয়ে ওর মুখ দিয়ে আচমকাই বের হয়ে যায়- ছোটলোক! আবির দুষ্টুমি করে ওকে মাঝেমাঝে বলতো- ছোটলোকের মতো বিহেভ কইরো না। কিন্তু এখন স্নেহা দুষ্টুমি করে মোটেও “ছোটলোক” শব্দটা মুখ দিয়ে বের করে নাই। খুব স্পনটেইনিয়াসলিই একদম মিন করেই শব্দটা ওর মুখ থেকে বের হইছে।
লাস্ট সেপ্টেম্বরে যখন ওর বাবা স্ট্রোক করে ঢাকার সিএমএইচে ভর্তি, ৫ দিন শুধু হাসপাতালে থাকার সময়টুকু ছাড়া বাকি পুরাটা সময়ই আবির স্নেহার সঙ্গে ছিল। চলে যাওয়ার জাস্ট একদিন আগে প্রচণ্ড ড্রাঙ্ক অবস্থায় আমারির রুফটপে বসে হঠাৎ ও স্নেহাকে মুভ অন করতে বলে। স্নেহা বেটার লাইফ ডিজার্ভ করে যা ও ওকে দিতে পারতেছে না জানিয়ে ও বলে, এই না দিতে পারাটা ওকে কষ্ট দেয়। ও চায় স্নেহা ভালো থাকুক। এর সঙ্গে আরো বলে, স্নেহা যদি জানতে চায় আবির ওকে ভালোবাসে কি না, এর উত্তর হবে নেগেটিভ। তবে ও যেন এটা জানতে না চায়- আবির ওকে কখনো ভালোবাসছিল কি না! প্রায় দুই বছর পর ওর এটা মনে হইছে যে ২ বছর খুব বেশি সময় না মুভ অন করার জন্য! ও চাইলেই মুভ অন করতে পারে। স্নেহার তখন ইচ্ছা করতেছিল ওকে কষিয়ে একটা থাপ্পড় দিতে। আবিরের বাবা হাসপাতালে ছিলেন বলে ব্যাপারটা ও ইগনোর করে গেছে, অলমোস্ট হাসিমুখেই।
হাসতে হাসতেই ও শুধু বলছিল- তুমি ভালোবাসো কি বাসো না, কখনো বাসছিলা কি না- ওইটা তুমি নিজে ঠিকঠাক জেনে নিও। আমাকে জানানোর দরকার নাই। আমার ধারণা তুমি নিজেই জানো না। এর আগের চারটা দিন ওদের এত সুন্দর কাটছিল, স্নেহা চাইতেছিল না ওই মোমেন্টটা নষ্ট করতে। এইসব কথা বলার পরও ওই রাতে কিন্তু আবির ওর সঙ্গেই থাকে। ইন ফ্যাক্ট ওর ওয়াইফ-বাচ্চা ওইদিন ওমরাহ থেকে ফিরে ঢাকায় থাকার পরও। স্নেহা ওইদিন ওকে থাকতেও বলে নাই! ইন ফ্যাক্ট ওর ফ্যামিলির কাছেই যেতে বলছিল।
পরদিন রাজশাহী ব্যাক করার আগে আবির আবারও একই কাজ করে। ইচ্ছামতো হুইস্কি গিলে আবোল-তাবোল কথা শুরু করে স্বভাব অনুযায়ী। ওর মতো লোক বসে পরকীয়া করতেছে, আরো কী কী হাবিজাবি যখন বলা শুরু করলো, স্নেহা ওকে ড্রিংক করা বন্ধ করতে বলে। এর ঘণ্টাখানিক পরই বউ-বাচ্চা-শ্বশুরসহ ও রাজশাহী ফিরবে। মাত্র তিন মাসে আগেই ও এক্সিডেন্ট করছিল ড্রাঙ্ক হয়ে, আর ওর বিরুদ্ধে নালিশটাও ওর ওয়াইফই করছিলেন জিওসিকে। আবার ও এই ড্রাঙ্ক অবস্থাতেই তাদের সঙ্গে রাজশাহী যাবে! কথা শোনে না ও। বিকালে এতটাই ড্রাঙ্ক হলো যে স্নেহা ওকে বিয়াম ফাউন্ডেশনের রাস্তা পর্যন্ত ড্রপ করে দিতে গেল। রাস্তাতেও অনেক আবোল-তাবোল কথা বলতে থাকে ও। স্নেহা তখনের জন্য দাঁতে দাঁত চেপে রাগটা সামলে নিছিল। আরেকজনের আমানতকে সহী সালামত জায়গামতো পৌঁছে দেওয়া ও কতর্ব্য মনে করতেছিল তখনের জন্য। এখন অবশ্য ও আবিরের কাছে একটা ইভিল ক্যারেক্টার। ডাইনী, শকুনী, কালনাগিনী, পিশাচিনী, সাইকো, মনস্টার, কুচক্রিনী, ইবলিশ, জানোয়ার, ভ্রষ্টা…আর এরকম কী কী বিশেষণে আবির ওকে এখন মনে করতে পারে, ও একবার ভাবে! এরপর মনে হয়- করুক। যেভাবে মন চায় মনে করুক, কিংবা কোনোদিনই না মনে করুক! কারো ভাবনা তো পরিবর্তন করা সম্ভব না আসলে।
ওইবার আবির চলে যাওয়ার পর আমারিতে বলা ওর কথাগুলা মনে করে যন্ত্রণায় স্নেহা ঘুমাতেই পারতেছিল না। ও তো জানতে চায় নাই আবির ওকে ভালোবাসে কি বাসে না। না বাসলে না বাসে! ও আসতোই বা কী করতে? এই কথা বললেই আবির এখন রেফারেন্স টানে মাত্র দুই থেকে তিন মাসের! এর আগের এক বছর এক মাস ওর নিজে থেকে দেখা করতে আসার সময়টা ভূতে খেয়ে ফেলে! প্রতিবারই যাওয়ার সময় এইসব পেইনগুলা দিয়ে গেছে ও। ওইবারেরটা স্নেহার প্রচণ্ড গায়ে লাগে। দুই রাত টানা এসব ভাবনায় ঘুম হয় না ওর। অস্থির, পাগল পাগল লাগে। দুইটা বছর একটা লোক জানে ও তাকে ভালোবাসে, স্নেহা তো ক্লিয়ারলি প্রথম থেকেই বলে আসছে- ও আর কিছু চায় না, এভাবেই থাকতে চায়, সারা জীবন ও এভাবেই থাকবে। এ কথা বহুবারই ও বলছে। সেটাতে ইন ফ্যাক্ট সমস্যাও হইতেছিল না আবিরের। সমস্যাটা শুরু হয় স্নেহার কাছে ওর ফ্যামিলির কিছু ইনফরমেশন আসা শুরু করলে। ওইটা ওর প্রাইভেসি হ্যাম্পার করতেছে বলে মনে হয় ওর।
২০২৫ এর জুলাই-আগস্টের পরের ঘটনা এটা। স্নেহা যে খুব ইচ্ছাকৃত খোঁজ-খবর লাগিয়ে এইসব ইনফরমেশন পাইছিল, এমনও না। সেপ্টেম্বরে আবিরের ওয়াইফ-বাচ্চা ওমরাহতে গেল, আবির ওকে এই বিষয়ে কিছু জানায় নাই। ওর এক ভাগ্নী একই ক্যান্টনমেন্টে সিএমএইচের ডাক্তার। আবিরের ওয়াইফও একই জায়গায় কাজ করেন। স্নেহার আম্মা ওইবার ওমরাহতে যাইতেছিলেন। ওই প্রসঙ্গে কথা বলার সময় ওর ওই ভাগ্নী ওদের ইনচার্জও একই মাসে ওমরাহতে যাইতেছেন, র্যান্ডমলিই এটা জানাইছে। আবিরের ওয়াইফ ওইখানে কী পোস্টে কাজ করেন, স্নেহা তা জানতো! ওইখান থেকেই ও ওর বউ-বাচ্চার ওমরাহতে যাওয়ার ঘটনা জানে। জাস্ট ওইটুকুই ছিল ঘটনা।
ওর ওয়াইফ কোথায় গেলেন না গেলেন, এসব জানার আগ্রহ ওর কখনোই ছিল না। কিন্তু আবির সারাদিন ওর সঙ্গে টেক্সটে এত কথা বলে; মেয়ের কত কথা জানায়, অথচ মেয়েটা ওমরাহতে যাইতেছে, এই খবরটা ও একবারও বললো না! এই না বলার কারণে স্নেহার মনে হলো, আবির হয়তো ভাবছে- এই খবর জানলে ও যদি দেখা করতে যেতে চায়? এই ভাবনা এজিউম করে ওর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। উনারা ওমরাহতে যাইতেছেন, প্রায় এক মাস আগে থেকে জানলেও স্নেহা আবিরকে কিছুই বলে নাই এই বিষয়ে। উনারা যেদিন সৌদিতে রওনা হলেন, ওইদিন ভোররাতে ও আবিরকে রাগ দেখিয়ে টেক্সট করে। কিছুটা ড্রাঙ্ক থাকায় হয়তো প্রয়োজনের চেয়ে বেশি আজে-বাজে কথাই লিখে ফেলছিল টেক্সটে।
অনেকদিন দেখা না হওয়ার একটা অস্থিরতা তো ছিলই। কিন্তু ওর মনে হইছে, আবির যদি ওকে সুন্দর করে সিচ্যুয়েশন বুঝিয়ে বলে, ও কবে ওর কথা না বুঝতে চাইছে বা না শুনছে? ওমরাহতে যাওয়ার ব্যাপারে তাহলে জানালে কী এমন ক্ষতিটা হতো? ওইদিকে আবির হয়তো ভাবতেছিল, স্নেহা ওর প্রাইভেসি ভায়োলেট করতেছে। ওর ফ্যামিলির বিষয়ে কেন ও খোঁজ-খবর করলো! ওই ঘটনা সেপ্টেম্বর, ২০২৫ এর। এর কয়দিন পরই তো ঢাকায় এসে ৫ দিনের মধ্যে ৪ রাতই ও স্নেহার সঙ্গে থেকে গেছে! ভয়ে একটা মানুষ ইন্টিমেট হয় কী করে, ও ভেবে পায় না! ওইবারই আমারিতে বসে ওই ফালতু আলাপগুলো আবির করে। স্নেহাকে ও বিয়েও করে ফেলতে বলে ভালো কাউকে পেলে! আবার নিজেই বলে- আমার সঙ্গে ডেট করার পর অবশ্য তোমার আর কাউকে ভালো লাগবে না! স্নেহা মাথার কাটা জায়গায় হাত দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়ে বলে উঠে- অদ্ভুত লোক!
ওর ওই কথাগুলার যন্ত্রনায় টানা দুই রাত জেগে থাকার পর তৃতীয় রাতে স্নেহা আর পারে না। ঘরে যতগুলা রিভোট্রিল আর ফিলফ্রেশ ছিল, সবগুলা খাওয়া শুরু করে একে একে। প্রায় ৫৫টা ওষুধ খাওয়ার পর দুইদিন কোনো হুঁশ ছিল না ওর। আইসিইউর ভেন্টিলেশনেও থাকতে হইছিল। বেঁচে আসাটা ছিল ওর জন্য কাইন্ড অফ মির্যাকলই। খবরটা আবিরের কানে যায়। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই ওর কল স্নেহার অনিচ্ছাতেই কানের কাছে ধরতে হয় অন্য একজনের অনুরোধে। আবির কাঁদতে কাঁদতে বলছিল- তুমি ফিরে আসো, স্নেহা। তুমি সুস্থ হয়ে ফিরে আসো। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি তো। আমি আছি না? কোথাও যাই নাই তো আমি। সব ঠিক করে দেবো। আর এমন করবো না। কচু ঠিক হইছে- স্নেহার মুখ দিয়ে আবার বের হয়ে যায় স্পনটেইনিয়াসলি!
আবির এই ঘটনাকেও ক্যাশ করছে শুধু নিজেকে ডিফেন্ড করার ক্ষেত্রে। কিন্তু কী অসহ্য যন্ত্রণায় পৌঁছানোর পর স্নেহা ওই কাজ করছিল, সেটা ভাবা ওর জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় নাই। ওই রাতের কথা ভাবতে গিয়ে বাথরুমের দেয়ালটায় হেলান দেওয়ার চেষ্টা করে ও। মাথা সোজা করে রাখতে কষ্ট হইতেছে। গ্রে কালার শার্টটার দিকে তাকিয়ে ভাবলো, এটা সাদা রঙ হলেই জাপানের মানচিত্র পরা হয়ে যেত। বুকের মাঝখানটায় লাল বড় একটা দাগ হয়ে আছে, হালকা গোলাকারও।
আবিরের “আমি আছি তো” কথাটা কানে বাজলো হঠাৎ! ভালো লাগতেছে না ওর। কিছুই ভালো লাগতেছে না। চোখটা বন্ধ করে বেশ লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। আবির হয়তো ওর প্রেমে পড়ছিল, ওর এই রকম মনে হইছে বহুবার। মানুষের চোখ এত ভুল পড়ার কারণ নাই কোনো। মানুষের শব্দ বিভ্রান্তিকর হতে পারে, কিন্তু স্পর্শরা ভাষাহীন হয়েও অনেককিছু বলে। আবির নিজেও তো বলছে, হি ওয়াজ কানেক্টেড টু হার উইদ অল হিজ হার্ট! এটা শুধু মুখ দিয়েই ও বলে নাই, চোখ দিয়েও বলছে, স্পর্শেও। এমন কী স্নেহা সামনে গেলে ওর মাথা ঠিক থাকে না, এমনটাও তো বলছে ইন্টিমেট মোমেন্টে। ওইগুলা ও ভুলেও পরে কখনো আবিরের সামনে উচ্চারণ করে নাই। ওইসবের রেফারেন্স টেনে ওকে বিব্রত করতেও চায় নাই।
ওর সমস্যা স্নেহা কোনোদিনই বোঝে নাই, বিষয়গুলা পুরাপুরি হয়তো এমন না। আবির নিজের বিহেভের জন্যই স্নেহার পাল্টা এগ্রেসিভ রিয়্যাকশনগুলা ক্রিয়েট করছে অধিকাংশ সময়। এইগুলাই পরে ওকে বদার করছে। অন্যদিকে স্নেহা কষ্ট পাইতেছিল- নিজের, আবিরের, দুইজনের বিহেভেই! ও বোঝে, নিজের তিলে তিলে গড়া রেপ্যুটেড ক্যারিয়ার, র্যাঙ্ক, পজিশন, সোসাইটি, কমিউনিটি, প্রেমের বিয়ে, আদরের সন্তান, নীতি-নৈতিকতা- এই সবকিছু হয়তো আবিরের এই কিছু মুহূর্তের প্রেম আর ভালোলাগার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। যতদিন কনভেনিয়েন্ট ছিল, ওর ভালো লাগাও ছিল। যখন স্নেহা ডিমান্ড করা শুরু করলো; সেটা অল্প দেখা বা কথা বলাই হোক, আবিরের কমফোর্টও তখন থেকে নষ্ট হওয়া শুরু করলো।
ইচ্ছা করেই ও অধিকাংশ সময় স্নেহার সঙ্গে ইনডিফারেন্ট আচরণ করতো। এটা আবার ড্রাঙ্ক হয়ে স্বীকারও করছে বহুবার। ও ভাবতো, এমন করলে স্নেহা হয়তো মুভ অন করে অন্য কাউকে খুঁজে নিয়ে ভালো থাকবে। ওর কাছ থেকে দূরে চলে যাবে। কাছে আসলে, ইন পারসন আবির স্নেহার আমোন হয়েই থাকতো। দূরে গেলে আবার সেই অচেনা মানুষ হওয়ার চেষ্টা। ওর এই দ্বৈত আচরণ স্নেহার মানসিক অবস্থাকে ভয়ংকর ভঙ্গুর করে তোলে। এই দ্বন্দ্বই ওদের সম্পর্কটাকে শেষ পর্যন্ত টক্সিক বানায়, যাকে আবির 'ট্রমা বন্ডিং' ট্যাগ দিয়ে মুক্ত হতে চাইছে শেষ সময়।
অক্টোবরে আবিরের পোস্টিং হয় সিলেটে। ড্রাঙ্ক অ্যান্ড ড্রাইভের ঘটনায় ওকে কমান্ডিং পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। নিঃসন্দেহে একজন অফিসারের জন্য এটা খুবই বেদনাদায়ক ব্যাপার, লজ্জারও। স্নেহার অস্থিরতাও একই সময়ই বাড়তে থাকে। আবিরের অস্পষ্ট থাকা এর অন্যতম কারণ। নভেম্বর-ডিসেম্বর-জানুয়ারি অন অ্যান্ড অফ ওদের তর্কাতর্কি, স্নেহার অস্থিরতা আর নানা বিষয় নিয়েই রিয়্যাক্ট করা চলতেই থাকে। শান্ত থাকতে চেয়েও পারে না। জানুয়ারিতে ইন ফ্যাক্ট দুইজন মিচ্যুয়ালি যোগাযোগ বন্ধ করতে এক্ব্কদিন ব্লকও করে একে অপরকে। ওই রাতেই আবার স্নেহার আগের থেরাপিস্টকে কন্টাক্ট করে আবিরই স্নেহাকে আনব্লকের অনুরোধ করায়। এরপর রাতে ভিডিও কল করে দেড় ঘণ্টা ওকে কত কী বোঝায়! ওদের থেরাপিস্ট লাগবে না, ওরাই ওদের প্রব্লেম সলভ করতে পারবে, ও ঢাকায় আসার ট্রাই করতেছে, এসে ইন পারসন কথা বলে নিজেদের জন্য একটা ওয়ে বের করবে। ও না কী ওদের নিয়ে অনেক দূরের কথা চিন্তা করতেছে। এইগুলা যে আসলে কথার কথা ছাড়া কিছুই না, স্নেহা তখনই বোঝে।
ওই মাসে আবির ঢাকা আসে ঠিকই, তবে স্নেহার জন্য না। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ওকে বিজিবিতে সাময়িক দায়িত্ব দেওয়া হইছিল, বিজিবির হেডকোয়ার্টারে জয়েন করতেই আসে ও। ও ঢাকায় আসে ২০ জানুয়ারি। ওই রাতে একসঙ্গে থাকার পর সকালে ওর যাওয়ার কথা ময়মনসিংহে শ্বশুর বাড়ি। অথচ পরদিন বার খুলতে না খুলতেই ও গিয়ে ওইখানে হাজির হয়ে যায়। স্নেহাকেও অফিসের কাজ শেষে চলে আসতে বলে। বিকাল পর্যন্ত এক জায়গাতে বসেই ও ড্রিংক করতে থাকে। স্নেহা এক প্রকার জোর করেই সন্ধ্যার ঠিক আগে ওকে ওইখান থেকে বের করে। আবির প্রচণ্ড ড্রাঙ্ক থাকায় মহাখালি বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত স্নেহাও ওর সঙ্গে যায়। ওইখানে গিয়ে ওর মনে হয়, এইভাবে আবিরকে একা যেতে দিলে পুরাটা সময় ওর টেনশন কাজ করবে। ও খুব বেকুব আছে, এখন ওর মনে হয়। যেই লোক রাজশাহীতে ওকে রাতে-বিরাতে নির্জন রাস্তায় জোর করে নামিয়ে দিয়ে চলে যায়, তার জন্য ওই রাতে ও ময়মনসিংহ পর্যন্ত গিয়ে আবার রাত দুইটাই একা ঢাকায় ফেরে!
নিজেকে মহৎ দেখানোর উদ্দেশ্য ওর ছিল না, বরং আবিরকে ড্রাঙ্ক দেখলে ওর এক্সিডেন্টের ওই ইনসিডেন্টটা স্নেহার মাথায় ঘুরতে থাকতো- ওই গিলট ফিলিং, টেনশন, কেয়ার, ভালোবাসা…সবকিছু থেকেই ও ময়মনসিংহ পর্যন্ত গেছিল। স্নেহা কোনোদিন ফেক কিছু করতে বা দেখাতে পারে নাই; প্রেমটাও না, রাগটাও না। আবিরের মতো অনেক ক্যালকুলেশন করে প্রতিটা অ্যাক্ট করতেও পারলে তো নিজের রিয়্যাকশনগুলাও ও কন্ট্রোল করতে পারতো। দুই বছর পর সমস্ত কিছু অস্বীকার করে নিজেকে ডিফেন্ডও করতে পারতো। এইগুলার কিছুই ও পারে নাই। ও শুধু শুনে গেছে শেষদিন- উফফফ! এত যন্ত্রণা হয় মাথার ভেতরে ওই কথাগুলা ভাবতে গেলে!
সিলেটে বসে আবির কথা দিলো ইন পারসন দেখা করে নিজেদের সব সর্ট আউট করবে। অথচ ২০ তারিখ ঢাকায় এসে ও বললো, ময়মনসিংহ থেকে ফিরে কথা হবে। স্নেহা চুপ থাকে। দুইদিন পর ময়মনসিংহ থেকে ফিরে আবার বারে গিয়ে বসে ও। একসঙ্গে রাতেও থাকে। কিন্তু ওদের কথা বলার প্রসঙ্গ আবারও এড়ায়। নিজে থেকেই বলে, ইলেকশনের ডিউটিতে জয়েন করার আগে আরো কিছুদিন যেহেতু ঢাকায় থাকবে, ঠান্ডা মাথায় কথা বলবে। একদিকে ও প্রতিদিন এভাবে ড্রিংক করার ফাঁকে ফাঁকে উল্টাপাল্টা কথা বলে যাইতেছিল, অন্যদিকে নিজেদের ইস্যুগুলার বিষয়ে কথা বলতে স্নেহা অপেক্ষায় ছটফট করা সত্ত্বেও প্রতিদিনই কোনো না কোনো বাহানায় ওইটা ও পিছিয়ে যাইতেছিল। এসব কিছুই স্নেহাকে ভেতরে ভেতরে বিক্ষিপ্ত করে তুলতেছিল।
২৫ তারিখ ও বিজিবি হেডকোয়ার্টারে গিয়ে জয়েন করে। এর আগের রাতেও ওরা একসঙ্গেই ছিল। সকালে স্নেহা বাসায় ফেরার ঘণ্টা খানিক পরই আবির ওকে আবার ডেকে নিয়ে যায় বারে। স্নেহার তখন টাকা পয়সার ভীষণ ক্রাইসিস চলতেছিল। ওইদিন বের হলে ও বাসায় ফিরবে কীভাবে, এটাও ঠিক ছিল না। কিন্তু আবির যেহেতু ডাকছে, যেতে তো ওর হবেই। ওদের ইস্যু নিয়ে কথা বলবে জানিয়েই ওকে ডাকছিল ওইদিন। স্নেহাও দৌড়াতে দৌড়াতে- হয়তো ওরা কথা বলে নিজেদের ইস্যু সর্ট আউট করে ফেলবে, ওই বিশ্বাসে চলে যায়। কিন্তু যাওয়ার পর কিছুক্ষণ অহেতুক আলাপ করে আবির ওকে বলে- আমরা আর ইন্টিমেট হবো না। এটাই ওর ইম্পোর্টেন্ট কথা। ওর নাকি পাপবোধ হয়! মনে হয়, ও স্নেহাকে এক্সপ্লয়েট করতেছে। দ্য সেইম লুপ! রাগে-জেদে স্নেহার নিজেকেই খুন করতে ইচ্ছা করে তখন।
ওর ওইসব কথা শোনার পর স্নেহা যা কোনোদিন কল্পনাতেও ভাবে নাই বা ওর আগ্রহই হয় নাই, ওইটাই আবিরকে বলে বসে। ভেতরে রাগে ফেটে গেলেও প্রচণ্ড শান্ত স্বরে ও আবিরকে বলে- বিয়ে করো তাহলে আমাকে। তোমার বউ-বাচ্চা কিচ্ছু ছাড়তে হবে না। আমাকে কোনো স্বীকৃতিও দিতে হবে না। জীবনে আমি কোনো দাবি নিয়েও যাবো না। রেজিস্ট্রিও করা লাগবে না। কাজী ডেকে কবুল পড়লেই হবে। চলো, পাপবোধ থেকে বের করি তোমাকে। আবির মজাই ভাবতেছিল প্রথমে। স্নেহা যখন আবার প্রচণ্ড সিরিয়াস হয়ে শান্ত স্বরে ওই একই কথাই বলে, তখন বোধহয় ও সত্যিই ভয় পেয়ে যায়। কিছুটা ভয়ে ভয়েই বলে- দ্যাট ওয়াজ নট আওয়ার ডিল! যেটা আমি পারবো না, ওইটা কেন তুমি চাইতেছো! এজ ইফ ডিল কী ছিল, তা ও খুব ক্লিয়ার করছে বা যা ও দিতে পারতো, তার এক আনাও দিছে!
তখন কেন, আবিরকে কখনোই ও বিয়ের কথা ভাবে নাই। কাউকেই ও কখনো বিয়ে করার কথা ভাবে নাই। রাগেই বলছিল তখন। ওইদিনও স্নেহাকে ওইখানে একা রেখে আবির সিএনজিতে উঠে চলে যায়। স্নেহা কীভাবে বাসায় ফিরবে, তা ভাবার ওর প্রয়োজন হয় না। নাকের উপর থেকে রক্ত মুছতে মুছতে হাসতে থাকে স্নেহা। মাথা ব্যথায় ছিঁড়ে পড়তেছে ওর, কিন্তু হাসি থামে না।২৫-২৬-২৭-২৮ পর্যন্ত প্রতিদিন আবির বিজিবি হেডকোয়ার্টার থেকে সন্ধ্যাবেলা ওকে ডেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটার পর একটা বাকওয়াজ কথা বলতেই থাকে। ২৬ তারিখ প্রচণ্ড ড্রাঙ্ক অবস্থায় বিজিবি হেডকোয়ার্টারে যাওয়ার রাস্তা হারিয়ে ফেলে। ও পৌঁছাতে পারছে কি না, এই নিয়ে রাত দেড়টা পর্যন্ত স্নেহা ফোনের পর ফোন, টেক্সটের পর টেক্সট দিতে থাকে ভয়ে আর টেনশনে। এই ড্রিংক ইস্যুর জন্য ও শাস্তি পাইছে জাস্ট কয়েক মাস আগে। এত বড় পদ থেকে ওকে সরিয়ে দেওয়া হইছে, অথচ ও ওই একই জিনিসই প্রতিদিন করে যাইতেছিল, স্নেহা মানা করা সত্ত্বেও।
শেষদিন স্নেহা খুব বিরক্তি নিয়েই ওর ড্রিংকিং হেবিট আর আনকন্ট্রোল্ড বিহেভিয়র নিয়ে কথা বলে। এমন কী ও বারে যেতেই চাইতেছিল না। এর আগের রাতে আবির বারবার রাস্তায় পড়ে যাইতেছিল, স্নেহাকেও যা ইচ্ছা তাই বলতেছিল রাস্তায় বসে। ড্রাঙ্ক হলে মানুষ মাঝেমাঝে এইরকম ইমপালসিভ বিহেভ করতেই পারে। দ্যাটস ওকে। কিন্তু ঠিক একই আবিরই পরদিন স্নেহার রাস্তায় পড়ে যাওয়া, চিৎকার করা বা মোবাইল ভেঙে ফেলা অথবা রাত দেড়টায় রাস্তায় ওকে একা ফেলে রেখে আবিরের চলে যাওয়াতে যখন কল দিয়ে গালিগালাজ করে- এসব সহ্য করতে পারে না। ট্রমাটাইজ হয়ে যায়।
মাথা থেকে এখনো রক্ত পড়তেছে কিনা খেয়াল করার চেষ্টা করতে গিয়ে স্নেহা ভাবে- মানুষ নিজের করা অনেক আচরণই অন্যকে করতে দেখলে সহ্য করতে পারে না। অথবা মানুষ অন্যের যা কিছু খারাপ, মেমোরিতে ঠিকই ফেসবুকের পিনড পোস্টের মতো উপরের দিকে রেখে দেয় মনে রাখার জন্য। প্রয়োজন হলেই যেন বলতে পারে- দেখ, তুই এই এই করছিলি আমার সঙ্গে! সেলুকাস! স্নেহাও তাই। ও নিজেও তো এই মনুষ্যকূলের একজন নিকৃষ্ট প্রতিনিধি।
ট্রমাতে চলে যাওয়া আবির বিনা নোটিশে ২ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় স্নেহাকে সব জায়গা থেকে আচমকাই ব্লক করে। যেই লোক স্নেহা কয়েক ঘণ্টা ব্লক তাকে করে রাখলে অস্থির হয়ে অ্যাংজাইটির চোটে আনব্লক করার সঙ্গে সঙ্গে টেক্সটের পর টেক্সট পাঠাতে থাকে, সে কী না দুইদিন স্নেহার আকুতি-মিনতি জানানো টেক্সটের পর মাত্র ১ মিনিটের জন্য ওকে আনব্লক করে খুব কোল্ড ভয়েজে জানালো- স্নেহার বিহেভে ও এতটাই ট্রমাটাইজ যে ওর কাউন্সেলিংয়ের সেশন নিতে হইতেছে। ওর থেরাপিস্ট ওকে স্ট্রিক্টলি বলে দিছেন- ইলেকশন পর্যন্ত নো কট্রাক্ট! স্নেহা বারবার সর্যি বলে। বারবার বলে ও আর বিরক্ত করবে না, টেক্সটও করবে না, তবুও ব্লক না করতে। কিন্তু এসব কথায় আবিরের মন গলে না। স্নেহার কাকুতি-মিনতি ওকে বিন্দুমাত্র টলাতে পারে না। স্নেহা বারবার শেষ একটা সুযোগ চায় সব ঠিক করার। ইলেকশনের পর এই ব্যাপারে কথা বলবে জানিয়ে আবির কলটা কেটে সঙ্গে সঙ্গেই আবার ব্লক করে দেয়।
স্নেহা আবারও অপেক্ষায় থাকে। ওর বোকা মন মনে করে, ১২ তারিখের ইলেকশনের পর হয়তো সত্যিই আবির কথা বলবে। কিন্তু ওর গাট ফিলিং বলে, এবারও বলবে না। আবির কয়েক ঘণ্টা কথা না বললে যে অস্থির হয়ে যেত, ২-১৩ তারিখ পর্যন্ত প্রতিটা দিন সকাল থেকে রাত সে যে কীভাবে পার করতেছিল! কতক্ষণ টেলিগ্রামের নতুন নতুন একাউন্ট খুলে আবিরকে একটু কথা বলার কাকুতি-মিনতি জানাইতেছিল, কখনো বিলাপ পেড়ে কাঁদতেছিল। দিন থেকে রাত প্রতিটা মুহূর্ত ও ঘরে বসে ছটফট করতে থাকে। আবিরকে পেইন দিছে চিন্তা করে পাগলের মতো কেঁদে নিজেকে দোষারোপ করতে থাকে বারবার। একটাবার ও সুযোগ চাইতেছিল সব ঠিক করার। অস্থিরতায় যতবার ও নতুন একাউন্ট খুলে আবিরকে একটু কথা বলার রিকোয়েস্ট জানাইছে, ততবারই আবির কোনো রিপ্লাই না দিয়ে প্রতিটা একাউন্ট ব্লক করে দিছে।
২৮ জানুয়ারি বনানীর রাস্তায় করা সিন ক্রিয়েটের আগে আবির ড্রাংক হয়ে উদ্ভট আচরণ করে রাস্তায় পড়ে যায়। হাত ছিলে ফেলে। বারে বসেও অনেক উল্টাপাল্টা আচরণ করে। এর মাঝখানেই কোনো এক সময় আবিরের শালার কল আসে ওর ফোনে। কীভাবে ওই ফোন রিসিভ হয়, সেটা আল্লাহই ভালো বলতে পারবেন। ওই কলে উনি স্নেহার ভয়েজ শুনতে পান। একটু পরে আবিরকে যখন কল করে জানতে চান ওর সঙ্গে মেয়েটা কে? ব্যাস! আবিরের নেশা-টেশা সব কেটে যায়। ও ধরেই নেয় স্নেহা ইচ্ছা করে ওর ফোন থেকে কল রিসিভ করছে। অথচ ওর কাছে আবিরের ফোন ছিলই না!
ওই কল পাওয়ার পর রাত দেড়টায় বিজিবি হেডকোয়ার্টারে যেতে আবির সিএনজিতে উঠে। ওর শালা এই ঘটনা ওর ওয়াইফকে জানাবে, এই চিন্তা মাথায় আসতেই ও আর কোনোদিকেই খেয়াল করে না। সিএনজি নেওয়ার সময়, নেওয়ার পর অথবা উঠে চলে যাওয়ার সময়ও একটাবারের জন্য ও স্নেহা কোথায়, কীভাবে বাসায় ফিরবে দেখার জন্য ফিরেও তাকালো নাই। যেমন ও তাকাতো না রাজশাহীতে ফেলে রেখে যাওয়ার সময়ও। অথচ তখন রাত সোয়া একটা বাজে। ওর ওই আচরণ স্নেহাকে ট্রিগার করে খুব বাজে ভাবে। এর পরপরই ও ভয়ংকর রিয়্যাক্ট করে। নিজেকে ওর রাস্তার একটা কুকুরের চেয়েও সস্তা মনে হইতেছিল। এই বোধে ওর মাথা ঠিক থাকে না। নিজের দুইটা ফোনই ও রাস্তায় আছাড় মেরে ফেলে। একটা পুরাই ভেঙে যায়, আরেকটার অর্ধেক স্ক্রিন ভাঙে। হাঁটতে হাঁটতে বনানীর রাস্তার ফুটপাতে বসে ও আবিরের ডিরেক্ট লাইনে কল দিয়ে এভাবে একা রাস্তায় ফেলে রেখে যাওয়ায় চিৎকার দিয়ে গালিগালাজ করে। ওর জাস্ট তখন মরে যেতে ইচ্ছা করতেছিল!
মেমোরিতে একটু পজ দেয় ও। এত কদর্য আর ক্লান্ত লাগে সব! চুপ করে ও লুপে বাজতে থাকা কোহেন কী বলেন, শোনে-
ইফ ইউ আর দ্য ডিলার
লে মি আউট অফ দ্য গেম
ইফ ইউ আর দ্য হিলার
আই’ম ব্রোকেন অ্যান্ড লেম
ইফ থাইন ইজ দ্য গ্লোরি
মাইন মাস্ট বি দ্য শেম
ইউ ওয়ান্ট ইট ডার্কার
হিনেনি, হিনেনি…
গান বন্ধ হয় ফোনের ভাইব্রেশনে। আম্মা কল করতেছেন। শিট! সকালে বাসায় যাওয়ার কথা ছিল ওর। ফোনটা ধরতে হবে। প্রায়োরিটি লিস্টে উনি এখন উপরের দিকে আছেন, ইগনোর করার কোনো অপশন নাই এখানে। কণ্ঠ খুব স্বাভাবিক রেখে কলটা রিসিভ করে ও। হ্যালো না বলতেই আম্মা বলা শুরু করেন- কই তুই? তোর ফোনে কী হইছে? সকালে আসবি বললি, সকাল গড়াইয়া আরেক সকাল হয়ে যাইতেছে। মানুষ তো ফোনটা ধরে! কেউ মরে গেলেও তো তুই খোঁজ পাবি না। কী শুরু করলি তুই?
স্নেহা বুঝতেছে না! কালকে রাতে না ও আম্মাকে বললো আজকে সকালে যাবে? এখন কয়টাই বা বাজে? বিকাল হইছে বড় জোর। আম্মা এক নাগাড়ে বলেই যাইতেছেন কী কী। ও মোবাইলটা কান থেকে সরিয়ে টাইম দেখে রাত সাড়ে দশটা বাজে! একদিন যাবত ও কি ঘুমাইছিল এখানে? কিছুই মনে করতে পারে না। আম্মার পেট সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট দেওয়ার কথা ছিল বিকালে। ওর মাথা কাজ করতেছে না। ও ডাকে, আম্মা…। এক নাগাড়ে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় এই ডাকে। খুব উৎকণ্ঠা নিয়েই উনি বলেন, কী হইছে তোর? তুই দুই-তিন দিন ধরে কোনো খাবার-টাবার খাইছোস? কোথায় আছোস? ফোন কেন ধরোস নাই?
ও আবার ডাকে, আম্মাআআ…আম্মা চুপ থাকেন। তোমার রিপোর্ট দিছে? স্নেহা জানতে চায়। থাক। রিপোর্টের কথা জেনে লাভ নাই। তোমার আম্মাকে বাঁচাইতে পারবা না। লাং পর্যন্ত ছড়াইয়া গেছে। ওইটা বাদ দাও। তুমি বলো তোমার কী হইছে? স্নেহা জানতে চায়, ডাক্তার কী বলছে? ডাক্তার চেম্বারে যান নাই ওইদিন। রিপোর্ট নিয়ে এসে আম্মা নিজে নিজেই গুগল ঘেটে রিপোর্টের কন্ডিশন দেখছেন জানালে, ডাক্তারি কোন মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করছো- জানতে চায় স্নেহা। আম্মা সব রিপোর্টে ওর হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাইছে জানিয়ে দেখতে বলেন।
খুব ক্লান্ত লাগে ওর। আম্মার কাছে যেতে ইচ্ছা করে তখনই। কিন্তু ও তো বাথরুম থেকে উঠে রুম পর্যন্তই যেতে পারতেছে না। তুই কি এভাবেই নিজেকে ধুকে ধুকে মারার সিদ্ধান্ত নিছিস? আম্মার প্রশ্নে স্নেহা দুষ্টুমি করতেই হুম বলে। কিন্তু বিষয়টা যে আর দুষ্টুমিতে নাই, উনার সাইলেন্সে বোঝা গেল। আমি মরার পর না হয় মরিস- আম্মার এই কথায় ওর কান্না পায় খুব। কিন্তু এখন তো কাঁদা যাবে না মোটেও। ও হাসতে হাসতে বলে- তোমার হায়াত মাশআল্লাহ অনেকদিন রাখছেন আল্লাহ। এতদিন বেঁচে থাকা আমার জন্য খুব বোরিং বিষয় হয়ে যাবে। এইজন্যই মনে হয় আল্লাহ ক্যান্সারটা দ্রুতই ছড়িয়ে দিতেছে শরীরে, তোর মনের আশা পূরণ করতে। ওর আর কথা বলতে ইচ্ছা করে না এটা শোনার পর, কলটা কাটতে চায়। কিছুই ভালো লাগে না ওর। আম্মা হয়তো বোঝেন। সকালে বাসায় আসিস বলে নিজেই কলটা কেটে দেন। ফ্রেডির মতো ওর গাইতে ইচ্ছা করে-
মামা, ওহ, ডিডেন্ট মিন টু মেক ইউ ক্রাই
ইফ আই’ম নট ব্যাক এগেইন দিস টাইম টুমোরো
ক্যারি অন, ক্যারি অন অ্যাজ ইফ নাথিং রিয়েলি ম্যাটারস...
কান্নার বদলে চোখের পাশে টের পায় রক্তের আঠালো ভাব। ও কাঁদবে কেন, ভাবে! ও কি আর মানুষ আছে? ও তো ধ্বংসস্তূপ, কিছুটা ধ্বংসাত্মক দানবও! নাকি পুরাটাই? ও সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে উঠে- ডায়িং ইজ অ্যান আর্ট লাইক এভ্রিথিং এলস! ডায়িং ইজ অ্যান আর্ট লাইক এভ্রিথিং এলস! ডাআআআআআয়িং ইজ অ্যান আআআআআর্ট লাআআআইক এভ্রিইইইথিং এএএএলস, আই ডু ইট এক্সপশনালি ওয়েল…
কাউকে অনবরত দানব, ধ্বংসাত্মক মনে করার ফিল দিলে সে বোধহয় সত্যিই তাই হয়ে উঠে। এটাকে কী যেন বলে? কোনো একটা টার্ম আছে! আবির ট্রমা বন্ডিং খুঁজে খুঁজে বের করার পর স্নেহারও অভ্যাস হয়ে গেছে সমস্ত কিছুকে টার্মের মধ্যে ফেলার। নিজেকে ও সত্যিই আর চিনতে পারে না। মনে পড়ছে- লেবেলিং থিওরি। এই থিওরি বলে, যখন কোনো নিস্পাপ মানুষকে দিনের পর দিন ‘খুনি’ বলে আখ্যয়িত করা হয়, সে এক সময় বাধ্য হয়েই ছুরিটা হাতে তুলে নেয়। ও নিজেকে নিষ্পাপ মনে করে না, কিন্তু ও খুনিও তো ছিল না। এই রকম ধ্বংসাত্মকও তো ছিল না কখনো। কেন হলো তাহলে? আবির কি এপ্রিল ২০২৫ এর আগে ওকে এই রকম ধ্বংসাত্মক দেখছে?
২-১২ ফেব্রুয়ারি কতভাবে, কত জায়গা থেকে যে ও আবিরের কাছে মাফ চাইছে। একটাবার ওকে শেষ সুযোগ দিতে বলছে। বারবার ভিক্ষা চাইছে, একটাবার শুধু কথা বলার জন্য। আবির কোনো টেক্সটেরই রেসপন্স করে নাই। শুধু একটা পর একটা একাউন্ট ও ব্লক করতে থাকে। ওই ছটফট করা বিভীষিকাময় রাতগুলাতে স্নেহা আল্লাহর কাছে বারবার নিজের মৃত্যু কামনা করে। কোনোভাবেই আর ওই যন্ত্রণা ও সহ্য করতে পারতেছিল না। না পারতেছিল ও নিজেকে মেরে ফেলতে, না পারতেছিল স্বস্তিতে বাঁচতে। কী যে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করতেছিল প্রতিটা মুহূর্ত! ১২ তারিখ পার হয়ে ১৩ তারিখ মধ্যরাত। আবির কথা রাখে না। ইলেকশন শেষ হলেও ও ব্লক করেই রাখে স্নেহাকে।
ভয়ংকর যন্ত্রণায় স্নেহা পাগল হয়ে যাইতেছিল চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে। প্রতিটা দিন, রাত, প্রতিটা মুহূর্ত কী বিভৎস যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে ও গেছে! ওই যন্ত্রণা শব্দে প্রকাশ করার মতো জাদুকর ও না। আগের বছর যেই ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল ওর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন, এক বছর পার না হতেই ওই একই তারিখেই সব শেষ হলো ওদের। স্নেহা জানতো, ওই মুহূর্তে একটা সেন্ড বাটন চাপলেই আবিরকে ওর হারাতে হবে সারা জীবনের জন্য। আবির…যাকে ও ওর বাবার পর পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসছিল! এটা জেনেও কেন ও ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত বারোটার পর অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারিতে ওই টেক্সটটা পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলো? প্রতিশোধ নিতে?
চোখ-নাক বেয়ে কি আবার রক্ত পড়তেছে, না পানি? স্নেহার ইচ্ছা করে না জানতে। যা ইচ্ছা পড়ুক। ওর ভাবনায় তখন আসে- প্রতিশোধ নিতে কি কেউ নিজেকে তিলে তিলে এইভাবে মেরে ফেলতে পারে? আরেকজনের উপর প্রতিশোধ নিতে নিজেকে মেরে ফেলার কোনো টার্ম আছে কি কোনো অভিধানে? আছে হয়তো, খুঁজে বের করতে হবে! ঘাড় থেকে মাথায় প্রচণ্ড পেইন শুরু হয় ওর। কাটা জায়গাটা দিয়ে আগুনের মতো তাপ বের হইতেছে। এভাবে আর বসে থাকতে পারে না। বাথরুমের ফ্লোরটাতে আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ে। শরীর কাঁপতেছে। ঠান্ডাও লাগতেছে খুব। ভেজা কাপড়ে কত ঘন্টা ধরে ও এখানে বসে আছে, কিছুই হিসাব করতে শক্তি পায় না আর। রক্ত আর পানিতে সয়লাব ফ্লোরের মধ্যে শুয়ে পড়ে, ফোন আর ব্লু টুথ স্পিকারে এতক্ষণ কীভাবে চার্জ থাকতেছে- আরেকবার ও ভাবনায় পড়ে। ফোনটা হাতে নিয়ে টেলিগ্রাম অ্যাপ খুলে একবার দেখে-
আমোন
লাস্ট সিন রিসেন্টলি
প্রতিদিনই একবার দেখে। যেহেতু টেলিগ্রামে এখনো লাস্ট সিন রিসেন্টলি দেখাইতেছে, আবির বেঁচে আছে। এই দুনিয়াতেই আছে। এই দেশেই আছে। হয়তো এখন এই শহরে বা অন্য কোনো শহরে। থাকুক, তবুও থাকুক। যেখানেই থাকুক, আবির থাকুক। কোনোদিনই আর দেখা না হোক, তবু থাকুক। কোনোদিন আর ওর মাথায় হাত না রাখুক, কোনোদিন না বলুক- মাথায় হাত রাখছি, ঘুমাও, স্লিপ লাইক অ্যা বেবি। তাও থাকুক! যেখানেই আছে ও, যেভাবে থাকতে চায়, সেভাবেই থাকুক। ওর জীবনের সমস্ত মেঘ কেটে যাক, ওর ভালো হোক- স্নেহা বিড় বিড় করে বলতে থাকে। এই টেলিগ্রাম একাউন্টের খোঁজ আবির জানে না। জানলেই কী হবে! না জানুক। ব্লক করে দেয় যদি!
স্নেহা তো ওকে বিরক্ত করতেছে না, করবেও না। শুধু একবার করে লাস্ট সিন রিসেন্টলি দেখেই চলে আসে। কোনোদিনই ও বিরক্ত করবেও না আর। শুধু একবার এইভাবে দেখবে। ব্লক করে দিলে ওর দমবন্ধ লাগে ও না জানুক এই একাউন্টের কথা। স্নেহা কিচ্ছু লিখবে না ওকে কখনো। জাস্ট এভাবে একবার লাস্ট সিন রিসেন্টলিটা দেখবে প্রতিদিন। ওর মনে হবে, কোথাও না কোথাও আবির আছ। ওর কখনোই- আমি আছি তো বলা লাগবে না, কিচ্ছু বলা লাগবে না, থাকুক, তবুও থাকুক। এইভাবে হলেও থাকুক। যতদিন ও নিঃশ্বাস নিতে পারবে, এভাবেই একবার করে নাহয় আবিরকে দেখবে। যতদিন দেখা যায়। ক্ষতি তো করতেছে না এভাবে। না কি করতেছে? স্নেহা ভাবে- ও তো আর ভালো কিছু করে না। ও তো ধ্বংসাত্মক! ও ভয়ংকর! আবির তো তাই বলছিল শেষে। শেষটা এত বিশ্রী কেন হতে হলো? শেষদিনের ওই কনভার্সেশনটা না হলে?
ও ভাবতে চায় অনেককিছু, মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হয়। প্রচণ্ড যন্ত্রণা…উফফ!!! কত ঘণ্টা যাবত একই কোহেনই বাজতেছে এখানে? আই'ম রেডি মাই লর্ড- স্নেহাও তো আল্লাহকে একই কথা বলতেছে কতবার! আল্লাহ কি তার সিলেক্টিভ বান্দাদের কথাই শুধু শোনেন? এত গ্লুমি লাগতেছে কোহেনের ভয়েজ! মাত্রই তো ও শুনতেছিল-
ম্যাগনিফাইড, স্যাঙ্কটিফাইড, বি দাই হোলি নেইম
ভিলিফাইড, ক্রুসিফাইড, ইন দ্য হিউম্যান ফ্রেম
অ্যা মিলিয়ন ক্যান্ডেলস বার্নিং ফর দ্য লাভ দ্যাট নেভার কেইম
ইউ ওয়ান্ট ইট ডার্কার, হিনেনি, হিনেনি
আই’ম রেডি, মাই লর্ড...
গান চেঞ্জ হইছে। কোহেনই গাইতেছেন। ও শুনতে চায়, কিন্তু পারতেছে না। খুব কষ্ট হইতেছে ওর। অনেক বেশি কষ্ট। বুকে, মাথায়, সমস্ত শরীরে, অনেক কষ্ট। আবির…আবির ব্লক করে রাখলেও হয়তো কয়দিন পর আবার যোগাযোগ করতো। এই লুপ থেকে বের হওয়া দরকার ছিল। কিন্তু ব্ল্যাকহোলে একবার কেউ পড়ে গেলে তো আর উঠতে পারে না কখনো। আব্বা চলে গেলেন। ওকে একলা রেখে আব্বা একেবারেই চলে গেলেন। আর তো কেউ ছিল না ওকে একটু ভালোবাসার। প্রায় কাছাকাছি, আরেকটা পৃথিবী ও কখন যে তৈরি করে ফেললো নিজেকে বাঁচাতে! আব্বা সাদৃশ্য। পুরাই একটা আব্বার মতো। ভালোবাসতে তো বলে নাই ও। ও শুধু থাকতে বলছিল, যেভাবেই ছিল। ওকে আরেকবার এতিম বানিয়ে আবিরও চলে গেল। আর তো কেউ থাকলো না ওর! উফফ! এসব ভাবনায় মাথার ভেতরটা ব্যথায় ছিঁড়ে পড়তেছে। ওই ব্যথাই দ্বিগুণ তীব্রতায় বুকের বাম পাশে সংক্রমিত হইতেছে ধীরে ধীরে। সব এত খালি হয়ে গেছে! এত খালি সমস্ত কিছু! একটা জীবন কেন এত শূন্য হয়ে উঠে, খোদা! স্নেহা জোরে চিৎকার করতে চায়, অনেক জোরে। ভেতরের সমস্ত ব্যথা বের করতে চায় তীব্র বিকট চিৎকারে। কিন্তু কোনো শব্দই বের হয় না ওর কণ্ঠনালি দিয়ে। ও শুনতে পারতেছে এখন…হ্যাঁ, কোহেনই গাইতেছেন; কিন্তু ঠিক কোথায়, বোঝা যায় না। ডান হাতটা তুলে বুকের বাঁ দিকে রাখে। তীব্র একটা ব্যথা কোথায় যে হইতেছে; কোথায় এর শুরু, বুঝতে পারে না। গানটা শোনার ট্রাই করে-
আই ডোন্ট নিড অ্যা রিজন
ফর হোয়াট আই বিকেম
আই’ভ গট দিজ এক্সকিউজেস
দেয়্যার টায়ার্ড অ্যান্ড লেম
আই ডোন্ট নিড অ্যা পারডন, নো নো, নো নো, নো
দেয়্যার’স নো ওয়ান লেফট টু ব্লেম
আই’ম লিভিং দ্য টেবল
আই’ম আউট অফ দ্য গেম…
আহহহ! অসহ্য যন্ত্রণা! সব! সমস্ত কিছু! এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবকিছু যন্ত্রণার! সব ভয়! সব ভয়! সমস্ত কিছু ভয়! ও ভীষণ ভয়াবহ ক্ষতিকর! বিড় বিড় করে এসব বলতে বলতে ওর মনে হয়- আল্লাহ বোধহয় ওর না, আল্লাহ বোধহয় কখনোই ওর ছিল না। ওর সব অন্ধকার লাগে! সব ভয়! ওই রাতে আবিরের ওই ‘ভয়’ নামক দেয়ালটাকেই স্নেহা সত্যি বানিয়ে দিলো যাতে আর ওর ফেরার কোনো পথই খোলা না থাকে। আবির ওকে সারাজীবন হয়তো এরপর শুধু ঘৃণাই করবে, ওকে ‘বীভৎস’ ভাববে। ওর “ইউ হ্যাভ ডেস্ট্রয়েড মাই এভরিথিং”- ন্যারেটিভও পূর্ণতা পেয়ে যাবে, এসব কিছু জেনেও ১৪ ফেব্রুয়ারি রাত বারোটা ৩৭ মিনিটে পদ্মার পাড়ে তোলা ওদের দুইজনের হাত ধরে থাকা ছবিটায় একবার আদর করে প্রচণ্ড এক চিৎকারে আবিরকে ডেকে উঠে স্নেহা। সমস্ত দুনিয়া হারিয়ে ফেলার শোকে কাঁদতে কাঁদতে শেষ পর্যন্ত ও চাপ দিয়ে দেয় ফোনের কী-বোর্ডের সেন্ড বাটনটা-
আই বিলিভ ইউ ডিজার্ভ টু নো দ্য ট্রুথ। ফর দ্য পাস্ট টু ইয়ার্স, আই ওয়াজ ইন অ্যা রিলেশনশিপ উইদ ইউর হাজব্যান্ড, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবির রহমান। দো হি টোল্ড মি হি ওয়াজ ম্যারেড অ্যান্ড হিজ ওয়াইফ ওয়াজ লিভিং অ্যাব্রড। হি অলসো টোল্ড দ্যাট হিজ ম্যারেজ ওয়াজ নট ইন অ্যা গুড প্লেস অ্যান্ড হি অ্যান্ড হিজ ওয়াইফ ওয়্যার লিভিং সেপারেটলি। দেয়ার ওয়্যার মেনি মোমেন্টস হোয়েন আই বিলিভড হিজ ওয়ার্ডস অ্যান্ড ট্রাস্টেড হিজ ইনটেনশন্স। ইভেনচুয়ালি, হাউএভার, আই রিয়ালাইজড দ্যাট মাচ অফ হোয়াট হি হ্যাড টোল্ড মি ওয়াজ নট ট্রু। হি লেফট মি ইন অ্যা স্টেট হোয়্যার আই ওয়াজ কমপ্লিটলি মেন্টালি শ্যাটারড। হি লাভস ইউ। আই মে হ্যাভ বিন অনলি অ্যা পাসিং প্রেজেন্স ইন হিজ লাইফ, পারহ্যাপস সিম্পলি সামওয়ান হু কেপ্ট হিম কোম্পানি হোয়াইল ড্রিংক। ইট’স অলসো পসিবল দ্যাট হি ওয়াজ এফ্রেইড অফ দিস বিকামিং নৌন, হুইচ ইজ হোয়াই হি কন্টিনিউড দিজ কন্টাক্ট ফর সো লং। আই বিলিভ দ্যাট ক্যারিড মেন্টাল প্রেশার ফর হিম অ্যাজ ওয়েল, অ্যান্ড আই ওয়ান্ট টু রিলিজ হিম ফ্রম দ্যাট বার্ডেন। ইফ আই হ্যাড নট টোল্ড ইউ দিজ টুডে, দিজ কন্টাক্ট উড লাইকলি নেভার হ্যাভ এন্ডেড। হি উড হ্যাভ কন্টিনিউড কামিং টু মি, অর আই উড হ্যাভ কন্টিনিউড গোয়িং টু হিম। আই হ্যাভ টু হাম্বল রিকোয়েস্টস টু মেক। প্লিজ ডোন্ট মেক এনি ডিসিশন বিকজ অব দিজ ইনসিডেন্ট দ্যাট কুড ড্যামেজ হিজ ক্যারিয়ার, অ্যান্ড প্লিজ ডোন্ট লিভ হিম বিকজ অব দিজ মিস্টেক অ্যালোন। হি ইজ নট ব্যাড, হি ওয়াজ জাস্ট লোনলি। ইফ ইউ আর এবল, প্লিজ ফরগিভ হিম, ফরগিভ মি অ্যাজ ওয়েল। টেক কেয়ার।