রক্ত-পানিতে স্যাঁতসেঁতে বাথরুমের ফ্লোরটায় ঠিক কত ঘণ্টা বসে আছে স্নেহা? ওর সময়ের কি এখন আর কোনো রুটিন বা টেবিল আছে? আজকে কী বার, কত তারিখ, এখন ঘড়িতে কত বাজতেছে, কিছুই তো ওর আয়ত্তে নাই আর। অবশ্য এসবের তো ওর খুব একটা দরকারও পড়তেছে না। বরং কোনোদিনই যদি এগুলার খোঁজ-খবর না রাখতে হয়, স্নেহার বরং আরাম বোধ হবে। বেশি জানা মানেই জীবনে বেশি প্যারা ডেকে আনা।
নাক বরাবর রক্তের সরু একটা স্রোত বেয়ে পড়া টের পেতে নিজের মাথাটাকে এখন আস্ত এক চন্দ্রনাথ পাহাড় লাগা শুরু হলো ওর! সমস্ত তিতা অনুভূতি যেন এক বিশাল জলপ্রপাত হয়ে আছড়ে পড়তেছে মগজের ওপর। তলোয়ারের মতো খাড়া নাকটাকে মনে হইতেছে পাহাড়ের গায়ে খোদাই করা এক পিচ্ছিল গিরিপথ।
বিষাদের নোনা পানি অবিরাম এই পথ দিয়ে নেমে যে কোথায় গিয়ে মিলতেছে, স্নেহা ভাবে! এই মোমেন্টে নিজের সবকিছু নিয়ে তামাশা করা ছাড়া আর কোনো পথ দেখতেছে না ও। এখান থেকে ওঠে যে রুম পর্যন্ত যাবে, এরচেয়ে মনে হলো এভারেস্ট না হলেও ভ্যালি অফ সাইলেন্স পর্যন্ত যাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ, শেরপাদের জন্য আর কী!
শেরপাদের কথা মনে পড়তেই “নিঃসঙ্গ শেরপা” বিশেষণটা মাথায় আসলো। ফাটা কপালেও কত কী মনে আসে! শামসুর রাহমানকে চমৎকার ওই বিশেষণটা দিছিলেন হুমায়ুন আজাদ। সে মনে করতেন, শামসুর রাহমান প্রথাগত ধারার বাইরে গিয়ে বাংলা কবিতাকে আধুনিক নাগরিক জীবনের সঙ্গে যুক্ত করছিলেন।
উনি তো ইভেন বলেই দিছিলেন, রাহমান সাহেব একাই আধুনিক কবিতার ঝাণ্ডা নিয়ে এভারেস্টের চূড়ায় ওঠে বসছিলেন, আর বাকিরা সব নিচে দাঁড়িয়ে হাঁ করে দেখছে। স্নেহার এখন নিজেকেও ওই রকম নিঃসঙ্গ শেরপা ফিল হলো। তফাৎ শুধু এই যে, ওর এভারেস্ট হচ্ছে চার কদম পার হলেই বাথরুমের বাইরের রুমটা। নাক থেকে এক আঙুল দিয়ে রক্তের সরু স্রোতটা নিচের দিকে টেনে এক টোকায় ফ্লোরের দিকে ছুঁড়ে মারলো ও।
রক্তের ফ্লোটা কমলেও পুরাপুরি বন্ধ হয় নাই। একটু পর পর নাক আর চোখের পাপড়ি বেয়ে ঝর্ণার ধারা নেমে আসতেছে। কিন্তু দুঃখের বিষয় স্নেহার পাথুরে নদীর জলে তো কোনো পাহাড়ি মেয়ে বা ছেলে গোসলে নামে নাই, নামলে শাফিন আহমেদের মতো ভেজা ওই তনু মন ধরতে না পারার আফসোসটা স্নেহাও করতে পারতো!
এইবার বাম চোখের পাপড়িতে রক্তের ফোঁটা আসতেই স্নেহা চোখটা কুঁচকে ফেলে বিরক্ত হলো। শালা, ভ্যান গগ তো মরার আগে স্যাডনেস উইল লাস্ট ফরএভার বলে গেছেন, ব্লিডিংও কি লাস্ট ফরএভার হবে নাকি? অবশ্য একই তো কথা, স্নেহা ভাবে। হৃদয়ের ব্লিডিংও তো অনন্তকাল ধরে চলমান আছে! কিন্তু অতিরিক্ত রক্তক্ষরণে এই ছোট্ট অ্যাপার্টমেন্টের ছোট্ট বাথরুমটাতেই ও মরে পড়ে থাকবে নাকি? বিষয়টা ওর কাছে হালকা চিন্তার লাগে। ওর মৃত্যুটা আরেকটু রাজকীয় হওয়া উচিত না?
মৃত্যুর প্রতি স্নেহার যে তীব্র প্রেম আর আকর্ষণ, এ রকম শ্রীহীন মরে যাওয়ায় ওর এক্সপেকটেশনকে ডিজঅনার করা হবে। চাহিদার সঙ্গে প্রাপ্তির একটা ভারসম্য থাকতে হবে না? "এ আশিককা জানাজা হ্যায়, যারা ধুমসে নিকলে"- সুলতান আহমদ নামের একজন উর্দু কবি লিখছিলেন। জানাজা না হোক, ওর মৃত্যুটা তো অন্তত গ্ল্যামারাস হওয়া উচিত। কিন্তু চোখের কোনায় এসে জমা রক্তের ফোটা এক আঙুল দিয়ে নিয়ে ফ্লোরে ফেলতেই মনে হয়- যেই কপাল ওর! মৃত্যুটাও এই বেঁচে থাকার মতো লানতেরই হবে। যদিও স্নেহা এরজন্য পুরাপুরি রেডি আছে! একদম এক পায়ে খাঁড়া! ডাকিবার মাত্রই “প্রেজেন্ট প্লিজ” বলে দুনিয়াকে টাটা বাই বাই করবে।
ভ্যান গগকে মনে করে ঠোঁটের কোনায় একটু হাসি আসে। লোকটা কিন্তু হেইভি পাগলাটে ছিল! আকরাম ভাই মনে হয় এইজন্যই একবার স্নেহাকে খুব সিরিয়াস ভঙ্গীতে বলছিলেন- আমি আমার হোল লাইফে চারজন মানুষকে নিজেদের জীবন নিয়েে ভয়ংকর রকম এক্সপেরিমেন্ট করতে দেখেছি। স্নেহা জিজ্ঞাসামূলক একটা চাহনি রাখে আকরাম ভাইয়ের দিকে। সে মিটিমিটি হেসে বলে- ভ্যান গগ, র্যাঁবো, সিলভিয়া প্লাথ...। এরপর একটা পজ দিয়ে স্নেহার দিকে তাকিয়ে থাকেন।
স্নেহাও খুব সিরিয়াস হয়ে চতুর্থ নাম শোনার জন্য অপেক্ষা করে আর ভাবে কোন সে বিখ্যাত জন! আরেকজন কে? বলেন দেখি- আকরাম ভাই স্নেহার কাছে জানতে চাইলেন। আমি কেমনে জানবো? বলতেছেন তো আপনি। আপনার আর আমার অভিজ্ঞতা তো সেইম না, স্নেহা বলে। উনি ওই একই মিটি মিটি হাসিটা নিয়েই বলছিলেন, আরেহ পাগলী, আরেকজন হচ্ছে স্নেহা তাসনিয়া! চারজনই অত্যন্ত মেধাবী, কিন্তু চারটারই মাথায় একটু সমস্যা আছে!
আকরাম ভাই লেগ পুল করতেছিলেন, স্নেহা খুব ভালো করেই বুঝতে পারে, তবুও ওর তখন বাংলাদেশের নারীবাদীদের মতো বিদ্রোহ করতে ইচ্ছা করলো। যদিও আমি পুরুষদের খুব ভালোবাসি, কিন্তু হঠাৎ একটু জাজমেন্টাল হতে ইচ্ছা করতেছে, ভাই- স্নেহা বলে। আকরাম ভাই স্বভাবসুলভ ভঙ্গীতে বললেন, ইরশাদ...। এটা উনার নাড়ির টান মনে হয়। আকরাম ভাইয়ের পূর্ব পুরুষ বিহার থেকেই আসছিলেন। ওই হিসাবে তাকে বিহারী বলা দোষের কিছু না। উর্দু গজল আর কবিতার প্রতি তার দখলও ঈর্ষণীয়, এমন কী উনার উর্দু একসেন্টও!
স্নেহার যেহেতু নিজেকে জাহির করতে হবে, নগদে ও শায়েরি বানিয়ে বলে দিলো- আর্জ হ্যায় কে…মর্দ কো পসন্দ হ্যায় কি কোই উনপে মরে, লেকিন য়ো জুনুন সে ডরতে হ্যায়, জুনুন কে বিনা জিসে ইশক কহেঁ, ওহ্ তো স্রেফ এক সমঝৌতা হ্যায়! আকরাম ভাই সঙ্গে সঙ্গে বলেন- ওয়াহ ওয়াহ ওয়াহ! কেয়া বাত! কেয়া বাত! কিন্তু তার মতো পণ্ডিত লোকের সঙ্গে টেক্কা দিতে স্নেহার যে জ্ঞান আর বয়সে আরেকটু বড় হতে হবে, ওইটা বোঝাতেই আকরাম ভাই ফিরতি শায়েরি শোনালেন- হাম সাহিল পে ঘার বানানা চাহতে হ্যায়, তুফাঁ সে ইয়ারি হামেঁ আতি নেহি; তুম যিসে জুনুন কেহতি হো, হাম উসে তাবাহী সমাঝতে হ্যায়।
আকরাম ভাইয়ের ওই শায়েরি ভাবতে গিয়ে স্নেহার আবিরের কথা মনে পড়লো। বেচারাকে স্নেহা শেষের দিকে খুব প্যারা দিছে। ওরও মনে হয় এই জুনুন তাবাহীই লাগতেছিল। ওকে প্যারা দেওয়ার মেমোরি মনে করলে স্নেহার খারাপ লাগে। মায়াও লাগে ওর জন্য। কিন্তু স্নেহা বুঝতে পারলো না, যুগে যুগে এই রকম ইমোশনাল ইলিটারেটদের প্রতিই কি মানুষ জুনুন লেভেলের প্রেম বোধ করে নাকি! কী রকম ওয়েস্টেজ! এরপরই ওর মনে হয়, ও তো আসলে তেমন কোনো পাগলামীই করে নাই। গঁগ্যার চলে যাওয়ার কথা শুনে ভ্যান গগ তো নিজের কানই কেটে ফেলছিলেন!
স্নেহা যেই এক্সট্রিম রিয়্যাক্টগুলা করছে, এর ম্যাক্সিমামই তো আবিরের কর্মকাণ্ডের বিপরীতে জমতে থাকা অভিমান, রাগ, ক্ষোভের বিস্ফোরিত রিয়্যাকশন। ওইটাকে বলে অ্যাকটিং আউট। এই টার্ম সম্পর্কে আবরার বলছে স্নেহাকে। মানুষ প্রচণ্ড যন্ত্রণা আর ভেতরে চলতে থাকা হাহাকারগুলাকে শব্দ দিয়ে প্রকাশ করতে না পারলে না কী শরীর এবং আচরণ বিদ্রোহ শুরু করে।
স্নেহার রাস্তায় চিৎকার করা, রাগে আজে-বাজে টেক্সট পাঠানো অথবা আবিরের সঙ্গে রাজশাহীর ফ্লাইটে ওঠে যাওয়া, সবই না কী ছিল যন্ত্রণা প্রকাশের অব্যক্ত ভাষা। যদিও মাঝেমাঝে আসলেই ওইগুলা বেশি এক্সট্রিম লেভেলের হয়ে যেত। স্নেহার আবার মনটা খারাপ লাগে আবিরকে ওইসব সিচ্যুয়েশন ফেস করতে হইছে বলে। যাই হোক, এই প্রসঙ্গটা এখন ও এড়াতে চাইতেছে। এসব মনে পড়লে ভালো লাগে না ওর। ভেতরে একটা অস্থিরতা কাজ করে।
ব্লু টুথটা স্পিকারটা এতক্ষণ কীভাবে নন-স্টপ সার্ভিস দিতেছে, আজব! ও কি চার্জে লাগিয়ে স্পিকারে গান ছেড়ে রাখছিল নাকি? মনে পড়তেছে না ওর। সার্ভিস দিতেছে, এটাই তো বড় কথা, যেভাবেই দেক! স্নেহা ঠোঁট উল্টায়! এত ভাবার তো কিছু নাই! এরমধ্যেই কোহেন গেয়ে ওঠেন, "ইফ ইউ আর দ্য ডিলার, আই'ম আউট অব দ্য গেম..."। আরে জোশ!
মিউজিক আর কোহেনের ভয়েজে স্নেহার শরীরে একটা রিদম চলে আসে। মনে হয় মার্লবোরো সিগারেটটা সত্যি সত্যিই ঠোঁটের কোনায় আছে। লম্বা একটা টান দিতে গিয়ে বাম চোখটা কুঁচকে ছোট হয়ে আসলো যেন। নিজেকে ওর লিওনার্দ কোহেন মনে হইতেছে। স্নেহা হাসতে গিয়ে কেশে দেয়। বুকের খাঁচাটা ভেঙে চুরমার হয়ে আসে কাশির দমকে।
ইন্টারেস্টিংলি, কোহেনের সিগারেট নিয়ে একটা গল্প আছে। আশিক ভাই বলছিলেন মনে হয় স্নেহাকে। ৬৯ বছর বয়সে চেইন স্মোকার কোহেন না কী এক সমস্যায় ডাক্তার দেখাতে গেছিলেন। ডাক্তার তাকে কী ভয়ভীতি দেখালো কে জানে, কোহেন সিগারেট ছেড়ে দিলেন। কিন্তু সিগারেটের প্রতি তার তীব্র প্রেম উনি কনসার্টে গান গাইতে গিয়ে দেখাতেন। গান গাওয়ার ফাঁকে মজা করে বলতেন, আশি বছর বয়সে উনি আবার সিগারেট ধরবেন। তার যুক্তি ছিল, ওই বয়সে ফুসফুস নিয়ে এত ভাবাভাবির আর কিছু নাই!
করছেনও না কী তাই। নিজের ৮০ তম জন্মদিনে একটা সিগারেট নাকি সত্যিই জ্বালাইছিলেন। কিন্তু তার নাকি তখন ওই টেস্টটা অতটা ভালো লাগে নাই। কোথায় জানি আবার এইটা উনি কনফেসও করছিলেন। এত বছর অপেক্ষার পর প্রথম সিগারেটটা ধরাইয়া নাকি তার মনে হইছে- “ইট ওয়াজ়ন্ট অ্যাজ ডিলিশাস অ্যাজ আই ইম্যাজিন্ড!” আহারে বেচারা! ওই গল্প মনে করে স্নেহা সত্যি সত্যিই এখন সিগারেট খুব মিস করতেছে।
আরো মজার ব্যাপার, এই গানটা কোহেনের লাস্ট অ্যালবামের। অ্যালবামের কাভারে মাথায় ব্ল্যাক হ্যাট, চোখে সানগ্লাস পরা কোহেনের হাতে সিগারেট। মারা যাওয়ার মাস খানিক আগে রিলিজ হইছিল অ্যালবামটা। ৮২ বছর বাঁচছেন! একটা সিগারেট খাওয়ার জন্য কি স্নেহার এখন আশি বছর বাঁচতে হবে? নো! নেভার- এক প্রকার চিৎকার করে ওঠে ও এই ভাবনায়। এই চিন্তা ওর কাছে কোনো হরর মুভির চেয়েও ভয়ংকর। আশি বছর ধরে একটা যন্ত্রণাদায়ক জীবন বয়ে নিয়ে যাওয়ার মতো পাগল না কি সে! সিলভিয়া প্লাথ কি আর খামাখাই লিখছিলেন-
ও গড, আই অ্যাম নট লাইক ইউ
ইন ইয়োর ভ্যাকুয়াস ব্ল্যাক,
স্টার্স স্টাক অল ওভার, ব্রাইট স্টুপিড কনফেত্তি
ইটারনিটি বোরস মি,
আই নেভার ওয়ান্টেড ইট
স্নেহার মনে হয়, মানুষ যদি সত্যিই অমরত্ব পেত, তবে এই দুনিয়াটা একটা বিশাল 'স্বেচ্ছামৃত্যুর কারখানা' হয়ে ওঠতো। মানুষ তখন দলে দলে গিয়ে লাইনে দাঁড়াতো বিনাশের আশায়। মৃত্যু মনে হয় তখন আল্লাহর তরফ থেকে মেট্রিক-ইন্টারের ঐচ্ছিক সাবজেক্টের মতো থাকতো। আল্টিমেট ডেসটেনি হতো না। স্নেহা কপাল থেকে বেয়ে আসা আরেক ফোঁটা রক্ত আঙুলের টোকায় ফ্লোরে ফেলতে ফেলতে চিন্তা করে, মানুষ মনে হয় তখন জন্মদিনের কেক কাটতো না, মৃত্যুদিনের অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে সেলিব্রেশন করতো।
লম্বা সময় বেঁচে থাকাকে স্নেহার আসলেই ওভাররেটেড লাগে। মানে, একটা মানুষ রোগে-শোকে আক্রান্ত হয়ে খেতে পারবে না, চলতে পারবে না, অন্যের ওপর ডিপেন্ডেন্ট হয়ে থাকতে হবে, তবু তাকে আরেকটু বাঁচতেই হবে! বাঁচলে বাঁচুক, যার যার নিজস্ব ব্যাপার। পঞ্চমীর চাঁদ ও জীবনেও ডুবতে খেয়াল করে নাই, তবুও ওর মরিবার সাধ আছে, যত দ্রুত সম্ভব! কী আর করার? এটা মনে হয় ওর জন্য গড গিফটেড!
আচ্ছা, বেঁচে থাকতে মানুষ মুক্তি পায় কীভাবে, আবিরের কাছ থেকে ওর জানা উচিত ছিল মনে হয় শেষদিন। আবির কি মুক্ত বিহঙ্গের মতো পাখা মেলে আকাশে ওড়তেছে এখন- দৃশ্যটা কল্পনা করে স্নেহা ফিক করে হেসে দেয়! ওর নাম আজকে থেকে “পাঙ্খা আবির”। যতবার ওকে মনে পড়বে, এই নামেই ডাকা উচিত!
বোকা লোকটা শেষ দিনও ভাবছে, ক্লোজারটা মনে হয় সে টানছে এই সম্পর্কে। হা হা হা! স্নেহা যে ফোন নিয়ে বাথরুমে আসছিল, মনেই ছিল না ওর। বেসিনের ওপর ভাইব্রেট হওয়ায় খেয়াল করলো। আবরার ফোন দিতেছে। দেক। স্নেহা কোহেনের ইউ ওয়ান্ট ইট ডার্কার আবার রিপিট দেয় স্পটিফাইতে।
১৭ মার্চ আবিরের ঘোষণা দিয়ে আনুষ্ঠানিক ক্লোজারের দিন বাকওয়াজগুলার শেষেরদিকে আবির আবরারকে বলতেছিল, উনি যদি আমাকে ভালোই বাসেন, তাহলে ছেড়ে দেন না কেন? আমাকে যেতে দেন না কেন? লে হালুয়া! এগজেক্টলি এই শব্দটাই স্নেহার তখন মনে আসছে, মুখে যদিও ও কোনো শব্দ করে নাই। করার প্রয়োজন হয় নাই। হলেও হয়তো করতো না।
আবরারই উত্তর দিয়ে বলছেন- আবির ভাই, আপা তো আপনাকে ছেড়েই দিছেন। আবরার সেকেন্ড টাইম আবারও রিপিট করে এই কথাটা। আবির তখন চুপ হয়ে যায়। ওই রাতের সেশন শেষ করে সারা রাত স্নেহা জেগে ছিল। ভোরবেলা জানালার পাশে বসে লিখছিল ‘নাজাত’ নামের দীর্ঘ এক কবিতা-
কদর্য অনুভূতি দিয়ে
শেষ পর্যন্ত টানা হলো
বহু কাঙ্ক্ষিত সমাপ্তির রাত;
বিজয়ীকে জানাই- মোবারকবাদ!
বিজয় উল্লাস ক্ষণে
দ্বিধাকে বিদায় দিয়েন এবার
নতুবা নির্জন দুঃস্বপ্নের রাতে,
তিক্ত আলাপ ঘটে যেতে পারে- নিজের সমস্ত দ্বিচারিতার সাথে।
বন্ধ দরজা- এ সুবিশাল বন্দিশালায়;
ছোট ছোট আরো অসংখ্য বন্দিত্বে
আটকে যেতে পারে বিমূর্ত সময়
তারে ভুলে যেতে, সকল শক্তি দিয়ে
ঘষে ঘষে মুছে দিতে পারেন-
চোখ, মুখ, নাক আর চিবুক জুড়ে
থাকা অজস্র স্মৃতিচিহ্নের দাগ!
বিষয়টা কিছুটা সময়সাপেক্ষ;
কিছু মুছে গেলেও
কিছু কিছু শুধু বাড়াবেই ক্ষত।
তারচেয়ে কিছুটা বিরতি দিয়েন
ক্রোধ আর ঘৃণার মাঝ বরাবর,
দাঁড়ির আগে ছোট ছোট কমায়
বাক্যের ভেতর যেমন শব্দ থামায়।
এরই ফাঁকে, দেখা মেলে যদি
আত্ম-কলবের, ভুলক্রমে!
নিজের কাছে দিতে হয় যদি
নিজেরই দ্বিচারিতার স্বীকারোক্তি?
পরাজিতের অন্তঃস্থল হতে জানাই-
আগাম সিম্প্যাথি!
জানি, এত সামান্য সওয়াল-জবাবে
কিছুই ভাঙে না অর্ধ মিথ্যার অভ্যস্ততার
তারচেয়ে বিরতি ভেঙে, তিক্ত স্মৃতি স্মরণে
বাড়াতে পারেন তিক্ততা আবার।
ক্ষোভে পরিপূর্ণ হয়ে উঠলে কানায় কানায়
এবার পোড়ানোর প্রস্তুতি চলুক
হৃদয় নিংড়ানো একেকটা দীর্ঘ আলাপ।
কিছুটা বিপত্তি ঘটতে পারে,
এসকল শব্দমালার তীব্রতার ভারে।
বুমেরাং হয়ে ফিরে যেতে পারে সমস্ত বুলেট;
পোড়ালেই যেহেতু সকলেই হয় না ছাই,
বরং কিছু কিছু আরো খাঁটি হয়ে
সত্য-মিথ্যার তফাৎ টেনে জানায়- আত্মপরিচয়!
আবারও হোঁচট খেতে পারেন;
যতবার মুছে ফেলার তাগাদায়
ঘষে ঘষে পরীক্ষা হবে অবশিষ্ট ধ্বংসাবশেষ
তারই ফাঁকে, আস্ত একটা দ্বিধা আর অর্ধ মিথ্যার জগত
বেসামাল হয়ে ওঠতে পারে শরাব ছাড়াই।
এমন বিপর্যয়ে, পরাজিতের অন্তঃস্থল হতে জানাই-
আগাম সিম্প্যাথি!
কদর্য অনুভূতি দিয়েই
যেহেতু শেষ পর্যন্ত টানা হলো
বহু কাঙ্ক্ষিত সমাপ্তির রাত,
বিজয়ীকে আরও একবার জানাই- প্রাণঢালা মোবারকবাদ!
এমন মুক্তির উল্লাসে; দেখেন, যদি পারেন-
দ্বিধাকে বিদায় দিতে চিরতরে।
নতুবা হঠাৎ, বহুকাল বাদ
মনের জমিন কাঁপিয়ে তুলতে পারে- লা'নাতুন নাফস!
যেহেতু খোদার দরবারে
হেফাজতে থাকে সমস্ত আমলনামা:
নিশ্চয় তিনি সর্বোত্তম বিচারক,
পরমকরুণাময়- ইন্নাল হামদা লিল্লাহি।
স্নেহা ভাবে, ও কবে আবিরকে আটকাইছে? এর আগেও যখন একবার বউ-বাচ্চার কাছে যাবে বলে মুক্তি চাইছিল, স্নেহা তো ওকে হেসেই চলে যেতে দিছিল। চট করে মেজাজটা খারাপ হলো ওর। এমনভাবে আবির “মুক্তি” “মুক্তি” করছে ওইদিন, মনে হয় স্নেহা ওকে শেকল দিয়ে বেঁধে রাখছিল! আজব!
ওইবারও তো আবিরই আবার যোগাযোগ শুরু করে। দেখা করাও। রাজশাহীতে পোস্টিং হওয়ার আগ পর্যন্ত পুরা এক বছর তো প্রতি মাসে আবিরই স্নেহার সঙ্গে এসে দেখা করছে নিজে থেকে। স্নেহা ওই সময় ওকে কখনো দেখা করার কথা বলে নাই। নিজে থেকে ও টেক্সটই তো করতো না। আবিরই টেক্সট করতো। ঢাকায় আসলে দেখাও আবিরই করতে চাইতো!
একবার-দুইবার না। যখনই ও ঢাকায় আসছে, দেখা করছে। একটা সময় ওদের সম্পর্ক আবার নরমাল হইছে। ইন্টিমেট সম্পর্কটাও আবার ডেভেলপ করছে। পুরা এক বছর এক মাস পর স্নেহা আবিরকে নিজের ভালোবাসার কথা জানাইছিল, অনুমতিও চাইছিল যেন নিজের ভালোবাসা ও দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছাড়াই প্রকাশ করতে পারে আবিরের কাছে। আবির খুব দুঃখ নিয়ে ড্রাঙ্ক হয়ে স্নেহাকে জড়াইয়া ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলছিল, তোমাকে সব দিতে পারবো, শুধু নিজেকেই দিতে পারবো না।
স্নেহা ওকে বলছিল ও কোনোদিনই ওকে চাইবে না, শুধু ভালোবাসতে দিতে। চায়ও নাই কোনোদিন। অল্পটুকু কথা, অল্পটুকু দেখা নিয়েই তো সন্তুষ্ট থাকতো। আবির তবুও প্রতিবার যাওয়ার আগে সিচ্যুয়েশন ঘোলাটে করতো, নিজের গিল্ট ফিলিং স্নেহার উপর চাপিয়ে দিতো। আবির যে ওকে ভালোবাসার অনুমতি দিছিল, ওইটাও ভয়ে? স্নেহা ভাবে! হায় কপাল! নাকি মহৎ হওয়ার জন্য? উফ!!! কী বীভৎস ওই উদারতা! আবিরের কাছে মেবি ওইটা ছিল একটা 'এক্সাইটিং' ব্রেক, আর স্নেহার কাছে ছিল সারা জীবনের সঞ্চয়।
দুই বছর স্নেহা কি খুব শান্তিতে ছিল? আবির না চাইলে স্নেহা কি কোনোদিন ওর সঙ্গে দেখা করতে পারতো? জোর করতে পারতো? জোর করে এগুলা হয়? আবিরেরও ভালো লাগা ছিল বলেই ও আসতো। স্নেহার মুখের নোনতা ভাবতা চলে গিয়ে একটা তিতা ভাব আসে। জিভ দিয়ে ঠোঁটটা ভিজিয়ে ও ওই ৪৬ ঘণ্টার ৪২ মিনিটের মোমেন্টগুলার কথা মনে করে। ওইবার এত ভয়ংকর সুন্দর ইন্টেন্স মোমেন্ট ওরা কাটাইছে পুরা সময়টা! পুরাটা সময়ই ঘোর লাগার মতো ছিল।
আবিরের বুকের ওপর মাথা রেখে ও জানতে চাইছিল- তুমি কি আমার প্রেমে পড়ছিলা? আবির বলে, এগুলা জিজ্ঞেস কইরো না। স্নেহা আবার বলে, আরেহ বলো না। না-ই পড়তে পারো। পড়লেও তো সমস্যা নাই। আবির বলে, বোঝো না কেন বারবার আসি? স্নেহা বলে, ওইটা মুখে বলতে সমস্যা কী? আবির কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে, লাভ কী? এর কোনো ভবিষ্যত তো নাই। স্নেহা হেসে বলে, ভবিষ্যত কে চাইলো? এত ভেবো না তো!
এমন কি জানুয়ারিতে লাস্ট যখন ও আসলো, ২৪ জানুয়ারি রাতেও বারে বসে ও কাঁদতে কাঁদতে বলছে, তোমাকে ভালোবাসলেও আমার পক্ষে বলা সম্ভব না। এই সোসাইটি, রিলিজন, এথিক্স- কোনোটাই আমাকে এটা বলতে পারমিট করবে না। আবিরকে স্নেহা শেষদিনও এইসব কনভার্সেশন মনে করাতে যায় নাই।
শেষদিনের কথা ভাবতে গিয়ে স্নেহার মুখ দিয়ে আচমকাই বের হয়ে যায়- ছোটলোক! এটা আবির দুষ্টুমি করে স্নেহাকে মাঝেমাঝে বলতো- ছোটলোকের মতো বিহেভ কইরো না। কিন্তু এখন স্নেহা এটা দুষ্টুমি করে মোটেও মুখে দিয়ে বের করে নাই। খুব স্পনটেইনিয়াসলিই ওর মুখ দিয়ে একদম মিন করেই আবিরের উদ্দেশ্যে শব্দটা বের হইছে।
লাস্ট সেপ্টেম্বরে যখন ওর বাবা স্ট্রোক করে ঢাকার সিএমএইচে ভর্তি, ওই ৫দিনও আবির শুধু হাসপাতালে থাকার সময়টুকু ছাড়া বাকি পুরাটা সময়ই স্নেহার সঙ্গে ছিল। চলে যাওয়ার জাস্ট একদিন আগে প্রচণ্ড ড্রাঙ্ক অবস্থায় আমারির রুফটপে বসে হঠাৎ ও স্নেহাকে মুভ অন করতে বললো। ও বলতেছিল, স্নেহা বেটার লাইফ ডিজার্ভ করে। ও সেটা ওকে দিতে পারতেছে না। এটা ওকে কষ্ট দেয়। ও চায় স্নেহা ভালো থাকুক।
এর সঙ্গে আরো বলে, স্নেহা যদি জানতে চায় আবির ওকে ভালোবাসে কি না, এর উত্তর হবে নেগেটিভ। তবে স্নেহা যেন এটা জানতে না চায় যে আবির ওকে কখনো ভালোবাসছিল কি না! প্রায় দুই বছর পর ওর এটা মনে হইছে যে ২ বছর খুব বেশি সময় না চলে যাওয়ার জন্য! স্নেহা চাইলেই মুভ অন করতে পারে। স্নেহার ইচ্ছা করতেছিল তখনই ওকে কষিয়ে একটা থাপ্পড় দিতে। আবিরের বাবা হাসপাতালে ছিলেন বলে ব্যাপারটা ও ইগনোর করে গেছে তখন, অলমোস্ট হাসিমুখেই।
হাসতে হাসতে স্নেহা শুধু বলছিল- তুমি ভালোবাসো কি বাসো না, কখনো বাসছিলা কি না- ওইটা তুমি নিজে ঠিকঠাক জেনে নিও। আমাকে জানানোর দরকার নাই। আমার ধারণা তুমি নিজেই জানো না। এর আগের চারটা দিন ওদের এত সুন্দর কাটছিল, স্নেহা চাইতেছিল না ওই মোমেন্টটা নষ্ট করতে। এইসব কথা বলার পর ওই রাতেও কিন্তু আবির স্নেহার সঙ্গেই ছিল। ইন ফ্যাক্ট ওর ওয়াইফ-বাচ্চা ওইদিন ওমরাহ থেকে ফিরে ঢাকাতে থাকার পরও। স্নেহা ওইদিন আবিরকে থাকতেও বলে নাই! ইনফ্যাক্ট ওর ফ্যামিলির কাছেই যেতে বলছিল।
পরদিন যাওয়ার আগে আবির আবারও একই কাজ করে। ইচ্ছামতো হুইস্কি খেয়ে আবোল-তাবোল বকতেছিল। ওর মতো লোক বসে পরকীয়া করতেছে, আরো কী কী হাবিজাবি যখন বলা শুরু করলো, স্নেহা ওকে ড্রিংক করা বন্ধ করতে বলে। এর ঘণ্টাখানিক পরই বউ-বাচ্চা-শ্বশুরসহ সে রাজশাহী ফিরবে।
মাত্র তিন মাসে আগেই ও এক্সিডেন্ট করছিল ড্রাঙ্ক হয়ে, আর ওর বিরুদ্ধে নালিশটাও ওর ওয়াইফই করছিলেন ওর জিওসিকে। ও আবার এই ড্রাঙ্ক অবস্থাতেই তাদের সঙ্গে রাজশাহী যাবে!
আবির এতটাই ড্রাঙ্ক ছিল যে স্নেহা ওকে বিয়াম ফাউন্ডেশনের রাস্তা পর্যন্ত ড্রপ করে দিয়ে আসে। রাস্তাতেও অনেক আবোল-তাবোল কথা বলতে থাকে আবির। স্নেহা দাঁতে দাঁত চেপে তখনের জন্য রাগটা সামলায়। ও আরেকজনের আমানত, ওই ভাবনায় স্নেহা ওকে সহী সালামত জায়গামতো পৌঁছাইয়া দেওয়া কতর্ব্য মনে করে।
এখন অবশ্য স্নেহা আবিরের কাছে ইভিল ক্যারেক্টার। ডাইনী, শকুনী, কালনাগিনী, পিশাচিনী, সাইকো, মনস্টার, কুচক্রিনী, ইবলিশ, জানোয়ার, ভ্রষ্টা…আর এরকম কী কী বিশেষণে আবির স্নেহাকে এখন মনে করতে পারে, ও একবার ভাবে! এরপর মনে হয়- করুক। যা মন চায় করুক! কারো ভাবনা তো পরিবর্তন করা সম্ভব না আসলে।
ওইবার আবির যাওয়ার পর স্নেহা আমারিতে বলা আবিরের কথাগুলা মনে করে ঘুমাতেই পারতেছিল না যন্ত্রণায়। স্নেহা তো জানতে চায় নাই আবির ওকে ভালোবাসে কি বাসে না। না বাসলে না বাসে! ও আসতোই বা কী করতে? এই কথা বললেই আবির এখন রেফারেন্স টানে মাত্র দুই থেকে তিন মাসের! এর আগের এক বছর এক মাস ওর নিজে থেকে দেখা করতে আসার সময়টা ভূতে খেয়ে ফেলে!
আবির প্রতিবারই যাওয়ার সময় এইসব পেইনগুলা দেবেই। ওইবারেরটা স্নেহার প্রচণ্ড গায়ে লাগে। দুই রাত টানা এসব ভাবনায় ঘুম হয় না ওর। অস্থির, পাগল পাগল লাগে। দুইটা বছর একটা লোক জানে স্নেহা ওকে ভালোবাসে, স্নেহা ক্লিয়ারলি প্রথম থেকেই বলে আসছে আবিরকে যে ও এভাবেই থাকতে চায়।
সারা জীবন স্নেহা এভাবেই থাকবে, এ কথা বহুবারই ও বলছে। সেটাতে ইন ফ্যাক্ট সমস্যাও হইতেছিল না আবিরের। সমস্যাটা শুরু হয় স্নেহার কাছে আবিরের ফ্যামিলির কিছু ইনফরমেশন আসার সময় থেকে। ওইটা ওর প্রাইভেসি ভঙ্গ হওয়া মনে হলো। ২০২৫ এর জুলাই-আগস্টের পরের ঘটনা এইটা। স্নেহা যে খুব ইচ্ছাকৃত খোঁজ-খবর লাগিয়ে এইসব ইনফরমেশন পাইছিল, এমনও না।
সেপ্টেম্বরেই আবিরের ওয়াইফ-বাচ্চা ওমরাহতে গেছে, এটা আবির স্নেহাকে বলে নাই। স্নেহার এক ভাগ্নী একই ক্যান্টনমেন্টের সিএমএইচের ডাক্তার। আবিরের ওয়াইফও একই জায়গায় কাজ করেন। স্নেহার আম্মাও ওইবার ওমরাহতে যাচ্ছিলে।। ওই প্রসঙ্গে কথা বলার সময় স্নেহার ওই ভাগ্নী ওর বসও ওমরাহতে যাচ্ছেন বলে জানায়। আবিরের ওয়াইফ ওইখানে কী পোস্টে কাজ করেন, সেটা তো স্নেহা জানতোই! ওইখান থেকেই ও খোঁজটা পায়। জাস্ট ওইটুকুই ছিল ঘটনা।
উনি কোথায় গেলেন না গেলেন, এসব জানার আগ্রহ স্নেহার কখনোই ছিল না। আবির সারাদিন টেক্সটে এত কথা বলে; মেয়ের কত কথা জানায়, অথচ মেয়েটা ওমরাহতে যাচ্ছে, এই খবরটা ও একবারও বললো না! এটাতে স্নেহার মনে হলো আবির হয়তো ভাবছে- এই খবর জানলে ও যদি দেখা করতে যেতে চায়? ওর মেজাজ খারাপ হয়ে গেল আবিরের এই ভাবনা এজিউম করে। এই খবর প্রায় এক মাস আগে থেকে জানলেও যেদিন তারা সৌদিতে রওনা হন, ওইদিনই স্নেহা আবিরকে একটু রাগ দেখিয়ে একটা টেক্সট করে। কিছুটা ড্রাঙ্ক থাকায় হয়তো স্নেহা প্রয়োজনের চেয়ে বেশিই লিখে ফেলছিল।
অনেকদিন দেখা না হওয়ার একটা অস্থিরতা তো ওর অবশ্যই ছিল। কিন্তু ওর মনে হইছে, আবির যদি ওকে সুন্দর করে সিচ্যুয়েশন বুঝিয়ে বলে, ও কবে ওর কথা না শুনছে? ওমরাহতে যাওয়ার ব্যাপারে তাহলে জানালে ওর কী এমন ক্ষতিটা হতো? ওইদিকে আবির হয়তো ভাবতেছিল, স্নেহা ওর প্রাইভেসি ভায়োলেট করতেছে। ওর ফ্যামিলির বিষয়ে কেন স্নেহা খোঁজ-খবর করলো!
ওই ঘটনা সেপ্টেম্বর, ২০২৫ এর। এর কয়দিন পরই তো ঢাকায় এসে ৫ দিনের মধ্যে ৪ রাত ও স্নেহার সঙ্গেই থেকে গেছে! ভয়ে একটা মানুষ ইন্টিমেট হয় কী করে, স্নেহা ভেবে পায় না! ওইবারই আমারিতে বসে ওই ফালতু আলাপগুলো আবির করে। স্নেহাকে ও বিয়েও করে ফেলতে বলে ভালো কাউকে পেলে!
ওই কথাগুলার যন্ত্রনায় টানা দুই রাত জেগে থাকার পর তৃতীয় রাতে স্নেহা ঘরে যতগুলা রিভোট্রিল আর ফিলফ্রেশ ছিল, সবগুলা খাওয়া শুরু করে। প্রায় ৫৫টা ওষুধ খাওয়ার পর দুইদিন কোনো হুঁশ ছিল না ওর। আইসিইউতে ভেন্টিলেশনে থাকতে হইছিল। বেঁচে আসাটা ওর জন্য কাইন্ড অফ মির্যাকল ছিল।
খবরটা আবিরের কানে যায়। হাসপাতালের বিছানায় শুয়েই আবিরের কল কানের কাছে অনিচ্ছাতেও ধরতে হয় অন্য একজনের অনুরোধে। আবির কাঁদতে কাঁদতে বলছিল- তুমি ফিরে আসো, স্নেহা। তুমি সুস্থ হয়ে ফিরে আসো। সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি আছি তো। আমি আছি না? কোথাও যাই নাই তো আমি। সব ঠিক করে দেবো। আর এমন করবো না। কচু ঠিক হইছে- স্নেহার মুখ দিয়ে আবার বের হয়ে যায় স্পনটেইনিয়াসলি!
আবির এই ঘটনাকেও ক্যাশ করতে পারছে শুধু নিজেকে ডিফেন্ড করার ক্ষেত্রে। কিন্তু ওই সময় কী অসহ্য যন্ত্রণায় পৌঁছানোর পর স্নেহা ওই কাজ করছিল, সেটা ভাবা ওর জন্য আর গুরুত্বপূর্ণ লাগলো না। ওই রাতের কথা ভাবতে গিয়ে বাথরুমের দেয়ালটায় হেলান দেওয়ার চেষ্টা করে ও। মাথা সোজা করে রাখতে কষ্ট হইতেছে। ও গ্রে কালার শার্টটার দিকে তাকিয়ে ভাবলো, এটা সাদা রঙ হলেই জাপানের মানচিত্র পরা হয়ে যেত। বুকের মাঝখানটায় লাল বড় একটা দাগ হয়ে আছে, হালকা গোলাকারও।
আবিরের “আমি আছি তো” কথাটা কানে বাজলো হঠাৎ! ভালো লাগতেছে না স্নেহার। কিছুই ভালো লাগতেছে না। ও চোখটা বন্ধ করে বেশ লম্বা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। আবির হয়তো ওর প্রেমে পড়ছিল, স্নেহার এই রকম মনে হইছে বহুবার। মানুষের চোখ এত ভুল পড়ার কারণ নাই কোনো। মানুষের শব্দ বিভ্রান্তিকর হতে পারে, কিন্তু স্পর্শরা ভাষাহীন হয়েও অনেককিছু বলে।
আবির নিজেও তো বলছে, হি ওয়াজ কানেক্টেড টু স্নেহা উইথ অল হিজ হার্ট! এটা শুধু মুখ দিয়ে বলে নাই, চোখ দিয়ে বলছে, স্পর্শেও। এমন কী স্নেহা সামনে গেলে ওর মাথা ঠিক থাকে না, এমনটাও তো বলছে ইন্টিমেট মোমেন্টে। ওইগুলা স্নেহা ভুলেও কখনো ওর সামনে উচ্চারণ করে নাই পরে। ওইসবের রেফারেন্স টেনে ওকে বিব্রত করতে চায় নাই।
ওর সমস্যা স্নেহা কোনোদিনই বোঝে নাই, বিষয়গুলা পুরাপুরি হয়তো এমন না। আবির নিজের বিহেভের জন্যই স্নেহার পাল্টা এগ্রেসিভ রিয়্যাকশনগুলা ক্রিয়েট করছে অধিকাংশ সময়। এইগুলাই পরে ওকে বদার করছে। অন্যদিকে স্নেহা কষ্ট পাইতেছিল- নিজের, আবিরের, দুইজনের বিহেভেই! স্নেহা বোঝে, নিজের তিলে তিলে গড়া রেপ্যুটেড ক্যারিয়ার, নিজের পজিশন, সোসাইটি, প্রেমের বিয়ে, আদরের সন্তান, নৈতিকতা- সবকিছু হয়তো ওর এই ভালোলাগা, কিছু মুহূর্তের প্রেমের চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান।
যতদিন কনভেনিয়েন্ট ছিল, আবিরের ভালো লাগাও ছিল। যখন স্নেহা চাওয়া শুরু করলো, সেটা হোক অল্প দেখা বা কথা বলা, আবির আনকমফোর্ট ফিল করা শুরু করে। ইচ্ছা করেই ও ইনডিফারেন্ট আচরণ করতো, এটা আবার ড্রাঙ্ক হয়ে স্বীকারও করছে। ও ভাবতো, এমন করলে স্নেহা হয়তো মুভ অন করে অন্য কাউকে খুঁজে নিয়ে ভালো থাকবে।
কাছে আসলে, ইন পারসন আবির কিন্তু স্নেহার আমোনই থাকতো। দূরে চলে গেলে আবার সেই অচেনা মানুষ হওয়ার চেষ্টা দেখা যেত। এই দ্বৈত আচরণ স্নেহার মানসিক অবস্থাকে অস্থির করে তোলে। এই দ্বন্দ্বই সম্পর্কটাকে শেষ পর্যন্ত টক্সিক বানায় যেটাকে আবির 'ট্রমা বন্ডিং' ট্যাগ দিয়ে মুক্ত হতে চাইছে।
অক্টোবরে আবিরের পোস্টিং হয় সিলেটে। ড্রাঙ্ক অ্যান্ড ড্রাইভের ঘটনায় ওকে কমান্ডিং পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। নিঃসন্দেহে একজন অফিসারের জন্য এটা খুবই বেদনাদায়ক ব্যাপার, লজ্জারও। স্নেহার অস্থিরতাও একই সময়ই বাড়তে থাকে। আবিরের অস্পষ্ট থাকা এর অন্যতম কারণ। নভেম্বর-ডিসেম্বর-জানুয়ারি অন অ্যান্ড অফ ওদের তর্কাতর্কি, স্নেহার অস্থিরতা আর কথা শোনানো চলতেই থাকে। স্নেহা চায় শান্ত থাকতে, কিন্তু পারে না।
জানুয়ারিতে ইন ফ্যাক্ট দুইজন মিচ্যুয়ালি একদিন যোগাযোগ বন্ধ করতে ব্লকও করে একে অপরকে। ওই রাতেই আবার স্নেহার আগের থেরাপিস্টকে অনুরোধ করে আবির স্নেহাকে দিয়ে আনব্লক করায়। রাতে দেড় ঘণ্টা ভিডিও কল করে স্নেহাকে কত কী বোঝায়! ওদের থেরাপিস্ট লাগবে না, ওরাই ওদের প্রব্লেম সলভ করতে পারবে, ও ঢাকায় আসার ট্রাই করবে, এসে ইন পারসন একটা ওয়ে বের করবে। ও না কী অনেক দূরের কথা চিন্তা করতেছে। এইগুলা যে আসলে কথার কথা ছাড়া কিছুই না, স্নেহা তখনই বোঝে।
ওই মাসে আবির ঢাকা আসে ঠিকই, স্নেহার জন্য না। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে ওকে বিজিবিতে সাময়িক দায়িত্ব দেওয়া হইছিল, বিজিবির হেডকোয়ার্টারে জয়েন করতেই ও আসে। ও ঢাকায় আসে ২০ জানুয়ারি। ওই রাতে একসঙ্গে থেকে সকালে ওর যাওয়ার কথা ময়মনসিংহে শ্বশুর বাড়ি। অথচ পরদিন বার খুলতে না খুলতেই সে গিয়ে ওইখানে হাজির হয়ে যায়। স্নেহাকেও অফিসের কাজ শেষে চলে আসতে বলে।
বিকাল পর্যন্ত আবির এক জায়গাতেই বসে ড্রিংক করতে থাকে। স্নেহা এক প্রকার জোর করেই সন্ধ্যার ঠিক আগে ওকে ওখান থেকে বের করে। আবির প্রচণ্ড ড্রাঙ্ক ছিল। মহাখালি বাসস্ট্যান্ড পর্যন্ত স্নেহা ওর সঙ্গে যায়। ওইখানে গিয়ে স্নেহার মনে হয়, এইভাবে আবিরকে একা যেতে দিলে পুরাটা সময় ওর টেনশন কাজ করবে। স্নেহা খুব বেকুব আছে, ওর এখন মনে হয়। যেই লোক রাজশাহীতে ওকে রাত সাড়ে এগারোটায় একটা নির্জন রাস্তায় জোর করে নামিয়ে দিয়ে চলে যায়, তার জন্য ও ওই রাতে ময়মনসিংহ পর্যন্ত চলে যায়!
নিজেকে মহৎ দেখানোর উদ্দেশ্য ওর ছিল না, বরং আবিরকে ড্রাঙ্ক দেখলে ওর এক্সিডেন্টের ইনসিডেন্টটা স্নেহার মাথায় ঘুরতে থাকতো- ওই গিলট ফিলিং, টেনশন, কেয়ার, ভালোবাসা…সবকিছুই ছিল ওইখানে। স্নেহা তো কোনোদিন ফেক কিছু করতে বা দেখাতে পারে নাই; প্রেমটাও না, রাগটাও না।
আবিরের মতো এত সুন্দর অ্যাক্টিং ও শিখলে তো মেপে মেপে রিয়্যাক্ট করতে পারতো। দুই বছর পর এসে সমস্ত কিছু অস্বীকার করে নিজেকে ডিফেন্ডও করতে পারতো। স্নেহা কিছুই পারে নাই। ও শুধু শুনে গেছে শেষদিন- উফফফ! এত যন্ত্রণা হয় মাথার ভেতরে ওই কথাগুলা ভাবলে।
সিলেটে বসে আবির কথা দিলো ইন পারসন দেখা করে নিজেদের মধ্যে সব ঠিক করে ফেলার, অথচ ২০ তারিখ ঢাকায় এসে বলে, ময়মনসিংহ থেকে ফিরে কথা বলবে। স্নেহা চুপ থাকে। দুইদিন পর ময়মনসিংহ থেকে ফিরে আবার বারে গিয়ে বসে, একসঙ্গে রাতেও থাকে, কিন্তু ওই কথা বলার প্রসঙ্গ আবারও এড়ায়। নিজেই বলে, ইলেকশনের ডিউটিতে জয়েন করার আগে আরো কিছুদিন ও ঢাকায় থাকবে, ঠাণ্ডা মাথায় কথা বলবে।
একদিকে প্রতিদিন আবির প্রতিদিন এভাবে ড্রিংক করার ফাঁকে ফাঁকে উল্টাপাল্টা কথা বলে যাচ্ছিল, অন্যদিকে নিজেদের ইস্যুগুলার বিষয়ে কথা বলতে স্নেহা অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করা সত্ত্বেও প্রতিদিনই কোনো না কোনো বাহানায় আবির ওইটা পেছাচ্ছিল। এসব স্নেহাকে ভেতরে ভেতরে বিক্ষিপ্ত করে তোলে।
২৫ তারিখ আবির বিজিবি হেডকোয়ার্টারে গিয়ে জয়েন করবে। এর আগের রাতেও ওরা একসঙ্গেই ছিল। সকালে স্নেহা বাসায় ফেরে। ঘণ্টা খানিক পরই আবির ওকে আবার ডেকে নিয়ে যায় বারে। স্নেহার তখন টাকা পয়সার ভীষণ ক্রাইসিস চলতেছে। ওইদিন বের হলে ও বাসায় ফিরবে কীভাবে, এটাও ঠিক ছিল না। কিন্তু যেহেতু আবির ডাকছে, ওর তো যেতেই হবে।
আবির কথা বলবে বলেই ডেকে নিয়ে যায়। স্নেহাও দৌড়ে চলে যায় এই ভেবে যে হয়তো ওরা ওইদিন কথা বলে নিজেদের সমস্যাগুলা ঠিক করতে পারবে। যাওয়ার পর কিছুক্ষণ অহেতুক আলাপ করার পর আবির ওর অনেক ইম্পোর্টেন্ট কথাটা বলে যে ওরা আর ইন্টিমেট হবে না। ওর পাপবোধ হয়! মনে হয় ও স্নেহাকে এক্সপ্লয়েট করতেছে। দ্য সেইম লুপ! রাগে-জেদে স্নেহার নিজেকেই খুন করতে ইচ্ছা করে ওই সময়।
স্নেহা যা কোনোদিন কল্পনাতেও ভাবে নাই বা ওর আগ্রহই হয় নাই, ওইটাই আবিরকে বলে বসে তখন। ভেতরে রাগে ফেটে গেলেও প্রচণ্ড শান্ত স্বরে ও আবিরকে বলে, বিয়ে করো তাহলে আমাকে। তোমার বউ-বাচ্চা কিচ্ছু ছাড়তে হবে না। আমাকে কোনো স্বীকৃতিও দিতে হবে না। জীবনে আমি কোনো দাবি নিয়েও যাবো না। রেজিস্ট্রিও করা লাগবে না। কাজী ডেকে কবুল পড়লেই হবে। চলো, পাপবোধ থেকে বের করি তোমাকে।
আবির মজাই ভাবতেছিল প্রথমে। স্নেহা যখন আবার প্রচণ্ড সিরিয়াস হয়ে শান্ত স্বরে ওই একই কথাই বলে, আবির তখন বোধহয় সত্যিই ভয় পেয়ে যায়। ও বলে, দ্যাট ওয়াজ নট আওয়ার ডিল! যেটা আমি পারবো না, ওইটা কেন তুমি চাইতেছো! এজ ইফ ডিল কী ছিল, তা ও খুব ক্লিয়ার করছে বা যা ও দিতে পারতো, তার এক আনাও দিছে!
আবিরকে তখন কেন, কখনোই স্নেহা বিয়ের কথা ভাবে নাই। কাউকেই ও বিয়ে করার কথা ভাবে না। রাগেই ওইটা বলছিল তখন। ওইদিনও স্নেহাকে ওইখানে একা রেখে আবির সিএনজিতে উঠে চলে যায়। স্নেহা কীভাবে বাসায় ফিরবে, ওর ওইটা ভাবার প্রয়োজন হয় না। নাকের উপর থেকে রক্ত মুছতে মুছতে হাসতে থাকে স্নেহা। মাথা ব্যথায় ছিঁড়ে পড়তেছে ওর, কিন্তু হাসি থামে না।
২৫-২৬-২৭-২৮ পর্যন্ত প্রতিদিন আবির বিজিবি হেডকোয়ার্টার থেকে সন্ধ্যাবেলা স্নেহাকে ডেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে একটার পর একটা বাকওয়াজ কথা বলতেই থাকে। ২৬ তারিখ প্রচণ্ড ড্রাঙ্ক আবির রাতে ঠিকমতো বিজিবি হেডকোয়ার্টারে পৌঁছাতে পারবে কি না, এই নিয়ে রাত দেড়টা পর্যন্ত স্নেহা টেনশনে ছিল। বারবার ফোনে ওর খবর নিতে হচ্ছিল। এই ড্রিংক ইস্যুর জন্য আবির শাস্তি পাইছে জাস্ট কয়েক মাস আগে। এত বড় পদ থেকে ওকে সরিয়ে দেওয়া হইছে, অথচ ও ওই জিনিসই প্রতিদিন করতেছে, স্নেহা মানা করা সত্ত্বেও।
শেষদিন স্নেহা খুব বিরক্তি নিয়েই ওর ড্রিংকিং হেবিট আর আনকন্ট্রোল্ড বিহেভ নিয়ে কথা বলে। এমন কী ও বারে যেতেও চাচ্ছিল না। এর আগের রাতে আবির রাস্তায় পড়ে যাচ্ছিল, স্নেহাকে যা ইচ্ছা তাই বলতেছিল রাস্তায় বসে। ড্রাঙ্ক হলে মানুষ মাঝেমাঝে এইরকম করতেই পারে। দ্যাটস ওকে। কিন্তু ঠিক একই আবিরই পরদিন স্নেহার রাস্তায় পড়ে যাওয়া, চিৎকার করা বা মোবাইল ভেঙে ফেলা অথবা রাত দেড়টায় রাস্তায় একা ফেলে চলে যাওয়াতে যখন স্নেহা ওকে কল করে গালিগালাজ করে- এসব সহ্য করতে পারে না। ট্রমাটাইজ হয়ে যায়।
মাথা থেকে এখনো রক্ত পড়তেছে কিনা খেয়াল করার চেষ্টা করতে গিয়ে স্নেহা ভাবে, মানুষ নিজের করা অনেক আচরণই অন্যকে করতে দেখলে সহ্য করতে পার না। অথবা মানুষ অন্যের যা কিছু খারাপ, মেমোরিতে ঠিকই ফেসবুকের পিনড পোস্টের মতো উপরের দিকে রাখে, প্রয়োজন হলেই বলতে পারে- দেখ তুই এই এই করছিলি আমার সাথে! সেলুকাস! স্নেহাও তাই। ও নিজেও তো এই মনুষ্যকূলের একজন নিকৃষ্ট প্রতিনিধি।
ট্রমাতে চলে যাওয়া আবির স্নেহাকে বিনা নোটিশে ২ ফেব্রুয়ারি সব জায়গা থেকে আচমকাই ব্লক করে। যেই লোক স্নেহা কয়েক ঘণ্টা ব্লক করে রাখলে অস্থির হয়ে অ্যাংজাইটির চোটে আনব্লক করার সঙ্গে সঙ্গে টেক্সটের পর টেক্সট পাঠাতে থাকে, সে কী না দুইদিন স্নেহার অনেক রিকোয়েস্ট করার পর ১ মিনিটের জন্য আনব্লক করে।
খুব কোল্ড ভয়েজে আবির স্নেহাকে কল করে জানায়- স্নেহার বিহেভে ও এতটাই ট্রনাটাইজ যে ওর কাউন্সেলিংয়ের সেশন নিতে হচ্ছে। ওর থেরাপিস্ট নাকি স্ট্রিক্টলি বলে দিছেন- ইলেকশন পর্যন্ত নো কট্রাক্ট! স্নেহা বারবার সর্যি বলে।
ও বারবার বলে- বিরক্ত করবে না, টেক্সটও করবে না, তবুও ব্লক না করতে। কিন্তু এসব কথায় আবিরের মনে গলে না। স্নেহার আকুতি বিন্দুমাত্র ওকে টলাতে পারে না। স্নেহা বারবার লাস্ট একটা সুযোগ চায় সব ঠিক করার। আবির ইলেকশনের পর কথা বলবে বলে কলটা কেটেই সঙ্গে সঙ্গেই ব্লক করে দেয়।
স্নেহা আবারও অপেক্ষায় থাকে ১২ তারিখের ইলেকশনের পর হয়তো আবির সত্যিই কথা বলবে। কিন্তু ওর গাট ফিলিং বলে, এবারও বলবে না। আবির কয়েক ঘণ্টা কথা না বললে যে অস্থির হয়ে যেত, সে ২-১৩ তারিখ প্রতিটা দিন আর রাত পার করতেছিল কতক্ষণ আবিরকে টেলিগ্রামের নতুন একাউন্ট খুলে একটু কথা বলার কাকুতি-মিনতি করে, কখনো চিৎকার করে কেঁদে।
ঘরে বসে ও ছটফট করতে থাকে। আবিরকে পেইন দিছে চিন্তা করে পাগলের মতো কেঁদে নিজেকে দোষারোপ করতে থাকে বারবার। ও একটাবার সুযোগ চাচ্ছিল সব ঠিক করার। অস্থিরতায় যতবার স্নেহা নতুন একাউন্ট খুলে আবিরকে একটু কথা বলার রিকোয়েস্ট করছে, ততবারই ও প্রতিটা একাউন্ট ব্লক করে দিছে।
২৮ জানুয়ারি বনানীর রাস্তায় করা সিন ক্রিয়েটের আগে আবির ড্রাংক হয়ে উদ্ভট আচরণ করে, রাস্তায় পড়ে যায়, হাত ছিলে ফেলে। বারে বসেও অনেক উল্টাপাল্টা আচরণ করে। এর মাঝখানেই কোনো এক সময় আবিরের শালার কল আসে ওর ফোনে। কীভাবে ফোন রিসিভ হয়, সেটা আল্লাহই ভালো বলতে পারবেন।
স্নেহার ভয়েজ উনি শুনতে পান। একটু পরে আবিরকে যখন কল করে উনি জানতে চান ওর সঙ্গে মেয়েটা কে? ব্যাস! আবিরের নেশা-টেশা সব কেটে যায়। ও ধরেই নেয় স্নেহা ইচ্ছা করে ওর ফোন থেকে কল রিসি৷ করছে। অথচ স্নেহার কাছে আবিরের ফোন ছিলই না!
ওই কল পাওয়ার পর রাত দেড়টায় আবির একটা সিএনজিতে ওঠে রওনা হয়ে যায় বিজিবি হেডকোয়ার্টারের দিকে। ওর শালা এই ঘটনা ওর ওয়াইফকে জানাবে, এই চিন্তা মাথায় আসতেই ও আর কোনোদিকেই খেয়াল করলো না। যাওয়ার আগে স্নেহার দিকে ফিরেও তাকালো না একবার। যেমন তাকাতো না রাজশাহীতে ফেলে রেখে যাওয়ার সময়ও। স্নেহাকে ওইটা ট্রিগার করে খুব বাজে ভাবে
এর পরপরই স্নেহা ভয়ংকর রিয়্যাক্ট করে। ওর নিজেকে একটা রাস্তার কুকুর মনে হচ্ছি। এই বোধ হওয়ার পর ওর মাথা ঠিক থাকে না। নিজের দুইটা ফোনই রাস্তায় আছাড় মারে স্নেহা। একটা পুরাই ভেঙে ফেলে, আরেকটার অর্ধেক স্ক্রিন ফেটে যায়।
ওই রাতে হাঁটতে হাঁটতে বনানীর রাস্তার ফুটপাতে বসে ও আবিরের ডিরেক্ট লাইনে কল দিয়ে এভাবে একা রাস্তায় একা ফেলে রেখে যাওয়ার জন্য চিৎকার-চেঁচামেচি করে, গালিগালাজও। ওর জাস্ট তখন মরে যেতে ইচ্ছা করতেছিল! স্নেহা মেমোরিতে একটু পজ দেয়। এত কদর্য আর ক্লান্ত লাগে সব! ও চুপ করে লুপে বাজতে থাকা কোহেন কী বলেন, শোনে-
ইফ ইউ আর দ্য ডিলার
লে মি আউট অব দ্য গেম
ইফ ইউ আর দ্য হিলার
আই’ম ব্রোকেন অ্যান্ড লেম
ইফ থাইন ইজ দ্য গ্লোরি
মাইন মাস্ট বি দ্য শেম
ইউ ওয়ান্ট ইট ডার্কার
হিনেনি, হিনেনি…
গান বন্ধ হয় ফোনের ভাইব্রেশনে। আম্মা কল করতেছেন। শিট! সকালে যাওয়ার কথা ছিল আম্মার বাসায়। ফোনটা ধরতে হবে। প্রায়োরিটি লিস্টে উনি এখন উপরের দিকে আছেন, ইগনোর করা যাবে না। গলাটা খুব স্বাভাবিক রেখে স্নেহা কলটা রিসিভ করে।
হ্যালো না বলতেই আম্মা শুরু করেন- কই তুই? তোর ফোনে কী হইছে? সকালে তোর আসার কথা। সকাল গড়াইয়া আরেক সকাল হতে যাইতেছে। মানুষ তো ফোনটা ধরে! মানুষ মরে গেলেও তো তুই খোঁজ পাবি না। কী শুরু করলি তুই?
স্নেহা বুঝতেছে না! কালকে রাতে না আম্মাকে বললো আজকে সকালে যাবে? এখন কয়টাই বা বাজে? বিকাল হইছে বড় জোর। আম্মা এক নাগাড়ে বলেই যাইতেছেন কী কী। ও মোবাইলটা কান থেকে সরিয়ে টাইম দেখে রাত সাড়ে দশটা বাজে! একদিন যাবত ও কি ঘুমাইছিল এখানে? স্নেহা কিছু মনে করতে পারে না।
আম্মার পেট স্ক্যান আর সিটি স্ক্যানের রিপোর্ট দেওয়ার কথা ছিল বিকালে। স্নেহার মাথা কাজ করে না। ও ডাকে, আম্মা…আম্মার এক নাগাড়ে কথা বলা বন্ধ হয়ে যায় ওই ডাকে। আম্মা খুব উৎকণ্ঠা নিয়ে বলে, কী হইছে তোর? তুই দুই-তিন দিন ধরে কোনো খাবার-টাবার খাইছোস? কোথায় আছোস? ফোন কেন ধরোস নাই?
ও আবার ডাকে, আম্মাআআ…আম্মা চুপ থাকেন। তোমার রিপোর্ট দিছে, আম্মা? স্নেহা জানতে চায়। আম্মা বলেন, থাক। রিপোর্টের কথা জেনে লাভ নাই। তোমার আম্মাকে বাঁচাইতে পারবা না। লাং পর্যন্ত ছড়াইয়া গেছে। ওইটা বাদ দাও। তুমি বলো তোমার কী হইছে? স্নেহা জানতে চায়, ডাক্তার কী বলছে?
আম্মা জানান, ডাক্তার আজকে বসেন নাই। রিপোর্ট নিয়ে এসে সে নিজে নিজেই গুগল ঘেটে দেখছে। ডাক্তারি কোন মেডিকেল কলেজ থেকে পাশ করছো? স্নেহা মজা করার ট্রাই করে আম্মার সঙ্গে। আম্মা বলেন, রিপোর্ট তোর হোয়াটসঅ্যাপে পাঠাইছি। দেইখা নিস। তুই কি তোর বাসায়?
খুব ক্লান্ত লাগে ওর। আম্মার কাছে যেতে ইচ্ছা করে তখনই। কিন্তু ও তো বাথরুম থেকে উঠে রুম পর্যন্তই যেতে পারতেছে না। আম্মা হঠাৎ জিজ্ঞেস করে, তুই কি এভাবে নিজেকে ধুকে ধুকে মারার সিদ্ধান্ত নিছিস? স্নেহা দুষ্টুমি করতে হুম বললেও বিষয়টা যে আর দুষ্টুমিতে নাই আম্মার সাইলেন্সে বোঝা গেল। আমি মরার পর না হয় মরিস, আম্মা বললো। স্নেহার কান্না পায় খুব। কিন্তু এখন তো কাঁদা যাবে না মোটেও।
ও হাসতে হাসতে বলে, তোমার হায়াত মাশআল্লাহ অনেকদিন রাখছেন আল্লাহ। এতদিন বেঁচে থাকা আমার জন্য খুব বোরিং বিষয় হয়ে যাবে। আম্মা উত্তর দিলেন, এইজন্যই মনে হয় আল্লাহ ক্যান্সারটা দ্রুতই ছড়িয়ে দিতেছে, তোর মনের আশা পূরণ করতে। স্নেহা কলটা কাটতে চায়। ওর কিছু ভালো লাগে না। আম্মা হয়তো বোঝেন। সকালে বাসায় আসিস বলে কল কেটে দেয়। স্নেহার ফ্রেডির মতো গাইতে ইচ্ছা করে-
মামা, ওহ, ডিডেন্ট মিন টু মেক ইউ ক্রাই
ইফ আই’ম নট ব্যাক এগেইন দিস টাইম টুমোরো
ক্যারি অন, ক্যারি অন অ্যাজ ইফ নাথিং রিয়েলি ম্যাটারস...
কান্নার বদলে চোখের পাশে টের পায় রক্তের আঠালো ভাব। কাঁদবে কেন? স্নেহা কি আর মানুষ আছে? ওর মনে হয়। ও তো ধ্বংসস্তূপ, কিছুটা ধ্বংসাত্মক দানবও! নাকি পুরাটাই? স্নেহা সমস্ত শক্তি দিয়ে চিৎকার করে ওঠে- ডায়িং ইজ অ্যান আর্ট লাইক এভ্রিথিং এলস! ডায়িং ইজ অ্যান আর্ট লাইক এভ্রিথিং এলস! ডাআআআআআয়িং ইজ অ্যান আআআআআর্ট লাআআআইক এভ্রিইইইথিং এএএএলস, আই ডু ইট এক্সপশনালি ওয়েল…
কাউকে অনবরত দানব, ধ্বংসাত্মক মনে করার ফিল দিলে সে বোধহয় সত্যিই তাই হয়ে ওঠে। এটাকে কী যেন বলে? কোনো একটা টার্ম আছে! আবির ট্রমা বন্ডিং খুঁজে খুঁজে বের করার পর স্নেহার অভ্যাস হয়ে গেছে সমস্ত কিছুকে টার্মের মধ্যে ফেলার। নিজেকে আর স্নেহা সত্যিই চিনতে পারে না। মনে পড়ছে- লেবেলিং থিওরি।
এই থিওরি বলে, যখন কোনো নিস্পাপ মানুষকে দিনের পর দিন ‘খুনি’ বলে আখ্যয়িত করা হয়, সে এক সময় বাধ্য হয়েই ছুরিটা হাতে তুলে নেয়। স্নেহা নিজেকে নিষ্পাপ মনে করে না, কিন্তু ও খুনিও তো ছিল না। ও তো এই রকম ধ্বংসাত্মক ছিল না কখনো। কেন হলো তাহলে? আবির কি এপ্রিল ২০২৫ এর আগে স্নেহাকে এই রকম ধ্বংসাত্মক দেখছে কখনো?
২-১২ ফেব্রুয়ারি কতভাবে, কত জায়গা থেকে যে স্নেহা ২৮ জানুয়ারির রাতের ওই ঘটনার জন্য আবিরের কাছে মাফ চায়। একটাবার ওকে শেষ সুযোগ দিতে বলে। বারবার ভিক্ষা চাইতে থাকে একটাবার শুধু কথা বলার। আবির কোনো টেক্সটেরই রেসপন্স না করে ব্লক করতে থাকে একটার পর একটা একাউন্ট।
ওই ছটফট করা বিভীষিকাময় রাতগুলাতে স্নেহা আল্লাহর কাছে বারবার নিজের মৃত্যু কামনা করতে থাকে। কোনোভাবেই আর ওই যন্ত্রণা ও সহ্য করতে করতে পারতেছিল না। না পারতেছিল নিজেকেও মেরে ফেলতে। কী যে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফটাচ্ছিল প্রতিটা মুহূর্ত! ১২ তারিখ পার হয়ে ১৩ তারিখ মধ্যরাত। আবির কথা রাখে না।
ইলেকশন শেষ হলেও আবির ব্লক করেই রাখে স্নেহাকে। ভয়ংকর যন্ত্রণায় স্নেহা পাগল হয়ে যাচ্ছিল চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে। প্রতিটা দিন, রাত, প্রতিটা মুহূর্ত কী বিভৎস যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে স্নেহা গেছে! ওই যন্ত্রণা শব্দে প্রকাশ করার মতো জাদুকর ও না। আগের বছর যেই ১৪ ফেব্রুয়ারি ছিল ওর জীবনের সবচেয়ে সুন্দর দিন, এক বছর পার না হতেই ওই একই তারিখেই সব শেষ হলো।
স্নেহা জানতো, ওই মুহূর্তে একটা সেন্ড বাটন চাপলেই আবিরকে ওর হারাতে হবে সারা জীবনের জন্য। আবির…যাকে স্নেহা ওর বাবার পর পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসছিল! এটা জেনেও ও কেন ১৩ ফেব্রুয়ারি রাত বারোটার পর অর্থাৎ ১৪ ফেব্রুয়ারিতে স্নেহা ওই টেক্সটটা করার সিদ্ধান্ত নিলো? প্রতিশোধ নিতে?
চোখ-নাক বেয়ে কি আবার রক্ত পড়তেছে, না পানি? স্নেহার ইচ্ছা করে না জানতে। যা ইচ্ছা পড়ুক। প্রতিশোধ নিতে কেউ নিজেকে তিলে তিলে এইভাবে মেরে ফেলতে পারে? আরেকজনের উপর প্রতিশোধ নিতে নিজেকে মেরে ফেলার কোনো টার্ম আছে কি কোনো অভিধানে? আছে হয়তো, খুঁজে বের করতে হবে!
ঘাড় থেকে মাথায় প্রচণ্ড পেইন শুরু হয় স্নেহার। কাটা জায়গাটা দিয়ে আগুনের মতো তাপ বের হইতেছে ওর। এভাবে আর বসে থাকতে পারে না। বাথরুমের ফ্লোরটাতেই আস্তে আস্তে শুয়ে পড়ে। শরীর কাঁপতেছে। ঠাণ্ডাও লাগতেছে ওর।
ভেজা কাপড়ে কত ঘন্টা ধরে এখানে বসে আছে, কিছুই হিসাব করতে শক্তি পায় না আর। ওখানেই শুয়ে ও ভাবে, ফোন আর ব্লু টুথ স্পিকারে এতক্ষণ কীভাবে চার্জ থাকতেছে? ফোনটা হাতে নিয়ে টেলিগ্রাম অ্যাপটা খুলে একবার দেখে-
আমোন
লাস্ট সিন রিসেন্টলি
প্রতিদিনই একবার দেখে। যেহেতু টেলিগ্রামে এখনো লাস্ট সিন রিসেন্টলি দেখাইতেছে, আবির বেঁচেই আছে। এই দুনিয়াতেই আছে। এই দেশেই আছে, হয়তো এখন এই শহরে বা অন্য কোনো শহরে। থাকুক, তবুও থাকুক। যেখানেই থাকুক, আবির থাকুক। কোনোদিনই আর দেখা না হোক, তবু থাকুক। কোনোদিন আর স্নেহার মাথায় হাত না রাখুক, কোনোদিন না বলুক- মাথায় হাত রাখছি, ঘুমাও, স্লিপ লাইক অ্যা বেবি, তাও থাকুক!
যেখানেই আছে ও, যেভাবে থাকতে চায়, সেভাবেই থাকুক। ওর জীবনের সমস্ত মেঘ কেটে যাক, ওর ভালো হোক- স্নেহা বিড় বিড় করে বলতে থাকে। এই টেলিগ্রাম একাউন্টের খোঁজ আবির জানেও না। জানলেই কী হবে! না জানুক। ব্লক করে দেয় যদি!
স্নেহা তো বিরক্ত করে না, শুধু একবার করে লাস্ট সিন রিসেন্টলি দেখেই চলে আসে। কোনোদিন ও বিরক্ত করবেও না। শুধু একবার এইভাবে দেখবে। “আমি আছি তো” বলা লাগবে না ওর, কিচ্ছু বলা লাগবে না, থাকুক তবুও। এইভাবে হলেও থাকুক।
যতদিন স্নেহা নিঃশ্বাস নিতে পারবে, এভাবেই একবার করে নাহয় দেখবে। যতদিন দেখা যায়। ক্ষতি তো করতেছে না এভাবে। না কি করতেছে? স্নেহা তো ভালো কিছু আর করে না। ও তো ধ্বংসাত্মক! ও ভয়ংকর! আবির তো তাই বলছিল শেষে। শেষটা এত বিশ্রী কেন হতে হলো? শেষদিনের ওই কনভার্সেশনটা না হলে?
স্নেহা ভাবতে চায় অনেককিছু, মাথায় প্রচণ্ড যন্ত্রণা শুরু হয়। প্রচণ্ড যন্ত্রণা…উফফ!!! কত ঘণ্টা যাবত একই কোহেনই বাজতেছে এখানে? আই'ম রেডি মাই লর্ড- স্নেহাও তো বলতেছে কতবার! আল্লাহ কি তার সিলেক্টিভ বান্দাদের কথাই শুধু শোনেন? এত গ্লুমি লাগতেছে কোহেনের ভয়েজ! মাত্রই তো ও শুনতেছিল-
ম্যাগনিফাইড, স্যাঙ্কটিফাইড, বি দাই হোলি নেইম
ভিলিফাইড, ক্রুসিফাইড, ইন দ্য হিউম্যান ফ্রেম
অ্যা মিলিয়ন ক্যান্ডেলস বার্নিং ফর দ্য লাভ দ্যাট নেভার কেইম
ইউ ওয়ান্ট ইট ডার্কার, হিনেনি, হিনেনি
আই’ম রেডি, মাই লর্ড...
গান চেঞ্জ হইছে। কোহেনই গাইতেছেন। স্নেহা শুনতে চায়, পারে না। খুব কষ্ট হইতেছে ওর। অনেক বেশি কষ্ট। বুকে, মাথায়, সমস্ত শরীরে, অনেক কষ্ট…আবির…আবির ব্লক করে রাখলেও হয়তো কয়দিন পর আবার যোগাযোগ করতো। এই লুপ থেকে বের হওয়াটা দরকার ছিল। কিন্তু ব্ল্যাকহোলে একবার পড়ে গেলে তো কেউ উঠতে পারে না কখনো।
আব্বা চলে গেল। স্নেহাকে একলা রেখে আব্বা একেবারেই চলে গেল। আর তো কেউ ছিল না স্নেহাকে একটু ভালোবাসবে। প্রায় কাছাকাছি, আরেকটা পৃথিবী স্নেহা কখন যে তৈরি করে ফেললো নিজেকে বাঁচাতে! আব্বা সাদৃশ্য। পুরাই একটা আব্বার মতো। ভালোবাসতে তো বলে নাই স্নেহা। শুধু থাকতে বলছিল, যেভাবেই ছিল…
উফফ! মাথাটা ব্যথায় ছিঁড়ে পড়তেছে। মাথার ব্যথাটা দ্বিগুণ তীব্রতায় বুকের বাম পাশটায় সংক্রমিত হইতেছে। সব এত খালি হয়ে গেছে! এত খালি সমস্ত কিছু! একটা জীবন কেন এত শূন্য হয়ে ওঠে, খোদা!!! স্নেহা জোরে চিৎকার করতে চায়, অনেক জোরে। ভেতরের সমস্ত ব্যথা বের করতে চায় বিকট চিৎকারে। কিন্তু কোনো শব্দই বের হয় না ওর কণ্ঠনালি দিয়ে
ও শুনতে পারতেছে এখন, হ্যাঁ, কোহেনই গাইতেছেন, কিন্তু ঠিক কোথায়, বোঝা যায় না। ডান হাতটা বুকের বাঁ দিকে রাখে ও। তীব্র একটা ব্যথা কোথায় যে হইতেছে, কোথায় এর শুরু, বুঝতে পারে না। গানটা শোনার ট্রাই করে-
আই ডোন্ট নিড অ্যা রিজন
ফর হোয়াট আই বিকেম
আই’ভ গট দিজ এক্সকিউজেস
দেয়্যার টায়ার্ড অ্যান্ড লেম
আই ডোন্ট নিড অ্যা পারডন, নো নো, নো নো, নো
দেয়্যার’স নো ওয়ান লেফট টু ব্লেম
আই’ম লিভিং দ্য টেবল
আই’ম আউট অফ দ্য গেম…
আহহহ! অসহ্য যন্ত্রণা! সব! সমস্ত কিছু! এই পৃথিবীতে যা কিছু আছে, সবকিছু যন্ত্রণার! সব ভয়! সব ভয়! সমস্ত কিছু ভয়! স্নেহা ভীষণ ভয়াবহ ক্ষতিকর! আল্লাহ বোধহয় স্নেহার না, আল্লাহ বোধহয় কখনোই স্নেহার ছিল না। সব অন্ধকার! সব ভয়! ওই রাতে আবিরের ওই ‘ভয়’ নামক দেয়ালটাকেই স্নেহা সত্যি বানিয়ে দিলো যাতে স্নেহার ফেরার আর কোনো পথই খোলা না থাকে।
আবির ওকে সারাজীবন হয়তো এখন ঘৃণাই করবে, ‘বীভৎস’ ভাববে। ওর“ইউ হ্যাভ ডেস্ট্রয়েড মাই এভরিথিং”- ন্যারেটিভও পূর্ণতা পেয়ে যাবে জেনেও স্নেহা ১৪ ফেব্রুয়ারি রাত বারোটা ৩৭ মিনিটে পদ্মার পাড়ে তোলা দুইজনের হাত ধরে থাকা ছবিটায় একবার আদর করে। প্রচণ্ড একটা চিৎকার করে আবিরকে ডেকে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতেই শেষ পর্যন্ত টেক্সটা সেন্ড করে দেয় স্নেহা-
আই বিলিভ ইউ ডিজার্ভ টু নো দ্য ট্রুথ। ফর দ্য পাস্ট টু ইয়ার্স, আই ওয়াজ ইন অ্যা রিলেশনশিপ উইথ ইউর হাজব্যান্ড, লেফটেন্যান্ট কর্নেল আবির। দো হি টোল্ড মি হি ওয়াজ ম্যারেড অ্যান্ড হিজ ওয়াইফ ওয়াজ লিভিং অ্যাব্রড। হি অলসো টোল্ড দ্যাট হিজ ম্যারেজ ওয়াজ নট ইন অ্যা গুড প্লেস অ্যান্ড হি অ্যান্ড হিজ ওয়াইফ ওয়্যার লিভিং সেপারেটলি। দেয়ার ওয়্যার মেনি মোমেন্টস হোয়েন আই বিলিভড হিজ ওয়ার্ডস অ্যান্ড ট্রাস্টেড হিজ ইনটেনশন্স। ইভেনচুয়ালি, হাউএভার, আই রিয়ালাইজড দ্যাট মাচ অফ হোয়াট হি হ্যাড টোল্ড মি ওয়াজ নট ট্রু। হি লেফট মি ইন অ্যা স্টেট হোয়্যার আই ওয়াজ কমপ্লিটলি মেন্টালি শ্যাটারড। হি লাভস ইউ। আই মে হ্যাভ বিন অনলি অ্যা পাসিং প্রেজেন্স ইন হিজ লাইফ, পারহ্যাপস সিম্পলি সামওয়ান হু কেপ্ট হিম কোম্পানি হোয়াইল ড্রিংক। ইট’স অলসো পসিবল দ্যাট হি ওয়াজ আফ্রেইড অফ দিস বিকামিং নোন, হুইচ ইজ হোয়াই হি কন্টিনিউড দিস কন্টাক্ট ফর সো লং। আই বিলিভ দ্যাট ক্যারিড মেন্টাল প্রেশার ফর হিম অ্যাজ ওয়েল, অ্যান্ড আই ওয়ান্ট টু রিলিজ হিম ফ্রম দ্যাট বার্ডেন। ইফ আই হ্যাড নট টোল্ড ইউ দিস টুডে, দিস কন্টাক্ট উড লাইকলি নেভার হ্যাভ এন্ডেড। হি উড হ্যাভ কন্টিনিউড কামিং টু মি, অর আই উড হ্যাভ কন্টিনিউড গোয়িং টু হিম। হি ইজ নট ব্যাড, হি ওয়াজ জাস্ট লোনলি। ইফ ইউ আর এবল, প্লিজ ফরগিভ হিম, অ্যান্ড ফরগিভ মি অ্যাজ ওয়েল। টেক কেয়ার।