মাঝনদীতে যখন চারপাশ ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায় আর লঞ্চের ইঞ্জিন পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়, তখন কেমন লাগে? চারপাশের নিকষ কালো অন্ধকারে যদি আপনার কেবিনের জানালায় বাইরে থেকে কেউ টোকা দেয়? বাইরে তো অথৈ নদী, তাহলে দোতলার জানালার কাঁচের ওপাশে কে দাঁড়িয়ে আছে? দশ টাকার এই গল্পটি পড়ার পর হয়তো আপনি আর কখনোই রাতের বেলা নদীর ধারে যাওয়ার বা লঞ্চে ভ্রমণ করার সাহস পাবেন না। আপনার শিরদাঁড়া দিয়ে ঠান্ডা স্রোত বইয়ে দেওয়ার জন্য এই একটি গল্পই যথেষ্ট। যদি দুর্বল চিত্তের মানুষ হয়ে থাকেন, তবে এখানেই পড়া থামিয়ে দিন।
মূল গল্প:
শীতের রাত। কনকনে ঠান্ডার সাথে পাল্লা দিয়ে জেঁকে বসছে ঘন কুয়াশা। জরুরি একটা কাজে আমাকে ঢাকা থেকে দক্ষিণাঞ্চলের একটা জেলায় যেতে হচ্ছিল। বাসের টিকিট না পেয়ে বাধ্য হয়ে সদরঘাট থেকে একটা পুরোনো দোতলা লঞ্চে উঠি। ছুটির দিন না থাকায় লঞ্চে যাত্রী ছিল খুবই কম। আমি একটু নিরিবিলি পছন্দ করি বলে দোতলার একেবারে পেছনের দিকের একটা কেবিন ভাড়া নিই। কেবিন নম্বর ছিল ১৩।
লঞ্চ ছাড়ার কয়েক ঘণ্টা পর থেকেই কুয়াশা এমনভাবে নামতে শুরু করল যে সামনের দশ হাত দূরেও কিছু দেখা যাচ্ছিল না। রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে কুয়াশার কারণে মাস্টার লঞ্চের ইঞ্জিন বন্ধ করে নদীর ঠিক মাঝখানে নোঙর ফেলেন। চারপাশটা মুহূর্তের মধ্যে একটা অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় ডুবে গেল। শুধু নদীর জলের ছলছল শব্দ আর লঞ্চের লোহার কাঠামোর মৃদু ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই শোনা যাচ্ছিল না।
আমি কেবিনের দরজা ভেতর থেকে শক্ত করে আটকে দিয়ে বিছানায় শুয়ে বই পড়ছিলাম। হঠাৎ আমার কেবিনের জানালার কাঁচে একটা শব্দ হলো। ঠক ঠক ঠক। শব্দটা খুব আস্তে, কিন্তু একদম স্পষ্ট। আমার কেবিনের এই জানালাটা সোজা নদীর দিকে। দোতলার এই উচ্চতায় নদীর দিক থেকে জানালায় টোকা দেওয়া কোনো স্বাভাবিক মানুষের পক্ষে একেবারেই অসম্ভব। আমি প্রথমে ভাবলাম হয়তো কোনো পাখি বা বাদুড় হবে। কিন্তু একটু পরেই শব্দটা আবার হলো। এবার আরও জোরে এবং টানা। ঠক... ঠক... ঠক... ঠক।
আমি সাহস করে বিছানা থেকে উঠলাম। জানালার পর্দাটা সামান্য সরাতেই আমার গায়ের রক্ত হিম হয়ে গেল। কাঁচের ওপাশে একটা মুখ লেপ্টে আছে। মুখটা পানিতে ফুলে ঢোল হয়ে আছে, চামড়াগুলো ফ্যাকাশে সাদা এবং জায়গায় জায়গায় খসে পড়ছে। চোখ দুটো পুরোপুরি কোটরাগত, আর সেই গর্ত থেকে নদীর ঘোলা পানি চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে। সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে বিকটভাবে হাসছিল। সেই হাসিতে কোনো শব্দ ছিল না, কিন্তু তার দাঁতগুলো ছিল শ্যাওলা ধরা আর অস্বাভাবিক তীক্ষ্ণ।
আমি ভয়ে পিছিয়ে আসতে চাইলাম, কিন্তু আমার শরীর যেন জমে পাথর হয়ে গেছে। গলা দিয়ে কোনো স্বর বের হচ্ছিল না। ঠিক তখনই আমি স্পষ্ট শুনতে পেলাম, কাঁচের ওপাশ থেকে একটা ঘড়ঘড়ে গলায় কেউ বলছে, "দরজাটা খোল, আমার খুব শীত করছে। আমাকে ভেতরে আসতে দে।"
এর পরের ঘটনা আরও বীভৎস। আমি দেখলাম, জানালার কাঁচটা আস্তে আস্তে ফাটতে শুরু করেছে। মাকড়সার জালের মতো ফাটল ধরছে কাঁচে। আর একই সাথে কেবিনের বন্ধ দরজার হাতলটা ধীরে ধীরে ঘুরছে। কেউ একজন বাইরে থেকে দরজাটা খোলার চেষ্টা করছে। অথচ আমি নিজে ভেতর থেকে ছিটকিনি লাগিয়ে দিয়েছিলাম। এক অদ্ভুত পচা মাছ আর অনেকদিন পানিতে ডুবে থাকা মরা মানুষের উৎকট গন্ধে কেবিনটা ভরে গেল। আমার বমি আসার জোগাড় হলো।
দরজার হাতল ঘোরার শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল। আমি ভাবলাম হয়তো বিপদ কেটে গেছে। কিন্তু পরমুহূর্তেই দরজার ওপরের দিকের ফাঁকা ঘুলঘুলি দিয়ে একটা লম্বা, ফ্যাকাশে হাত ভেতরের দিকে ঢুকে এল। হাতটার আঙুলগুলো অস্বাভাবিক লম্বা আর নখগুলো কালচে এবং ধারালো। হাতটা সাপের মতো এঁকেবেঁকে নিচের ছিটকিনির দিকে এগোচ্ছিল। সে ভেতর থেকে দরজাটা খুলে ফেলতে চাইছে।
আমি আর এক সেকেন্ডও স্থির থাকতে পারলাম না। আমার বাঁচার শেষ তাগিদে আমি গলা ফাটিয়ে একটা অমানুষিক চিৎকার দিলাম। এরপর আমার আর কিছুই মনে নেই। আমি জ্ঞান হারিয়ে মেঝের ওপর লুটিয়ে পড়ি।
সকালে লঞ্চের স্টাফদের জোরালো ডাকাডাকিতে আমার জ্ঞান ফেরে। তারা অনেকক্ষণ ধাক্কাধাক্কির পর মাস্টার চাবি দিয়ে দরজা খুলে আমাকে উদ্ধার করে। আমি যখন রাতের ঘটনাটা তাদের বলি, তারা কেউ বিশ্বাস করতে চায়নি। তাদের দাবি, বাইরে থেকে কেউ দরজা খোলার চেষ্টাই করেনি, আর জানালায় কোনো ফাটলও নেই। আমি হয়তো দুঃস্বপ্ন দেখেছি।
কিন্তু লঞ্চ থেকে নামার সময় লঞ্চের একজন বয়স্ক খালাসি আমাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে যান। তিনি ফিসফিস করে আমাকে বলেন, আজ থেকে ঠিক পাঁচ বছর আগে শীতের এই রকমই এক রাতে এই ১৩ নম্বর কেবিন থেকে এক যাত্রী নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। তার লাশটা শত খোঁজাখুঁজির পরও আর কখনো পাওয়া যায়নি। এরপর থেকে এই কেবিনে যারা একা থাকে, তাদের অনেকেই রাতের বেলা জানালার ওপাশে সেই ফ্যাকাশে মুখটা দেখতে পায়।
আজও যখন শীতের রাতে কুয়াশা পড়ে, আমি আমার ঘরের দরজা জানালা শক্ত করে বন্ধ রাখি। কারণ মাঝে মাঝেই মাঝরাতে আমার ঘুম ভেঙে যায়, আর আমার মনে হয়, সেই ফ্যাকাশে মুখটা হয়তো আজও আমার জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। আর ঘড়ঘড়ে গলায় বলছে, "দরজাটা খোল, আমার খুব শীত করছে।"