Posts

গল্প

সাইকোপ্যাথ

April 14, 2026

কু হ ক

Original Author কুহক

25
View

পুরো বাসার সমস্ত লাইট অফ করে দেওয়া। অনির্বাণ বসে আছে তার বেডরুমে। সব দরজা জানালা বন্ধ করে রাখা। শুধুমাত্র বারান্দার দিকের দরজাটা বেশখানিকটা ভেজিয়ে রাখা আছে। সেই দরজার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো উপচে এসে পড়েছে রুমে। অনির্বাণের পাশে থাকা রুপার মুখ চাঁদের আলোয় ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছে। এদিকে অনির্বাণ অনবরত সিগারেট টানছে আর এক নাগাড়ে জীবনানন্দ দাশের কবিতা আওড়াচ্ছে —

​"শোনা গেল লাশকাটা ঘরে নিয়ে গেছে তারে;
কাল রাতে - ফাল্গুনের রাতের আঁধারে
যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ;
মরিবার হলো তার সাধ!!"

​এইটা বলার পর পরেই বিকট শব্দে হেসে উঠছে। আর পাশে থাকা রুপার কাটা মাথার দিকে তাকাচ্ছে ভীষণ অসহায়ত্বের সাথে। অনির্বাণ ১ ঘণ্টা আগে তাকে খুন করেছে। খুন করার পর রুপার পুরো শরীর কেটে টুকরো টুকরো করেছে। আর সেই টুকরো মাংস গুলো অনির্বাণ তার অতি যত্নে পালিত ৩টি কুকুরকে খাইয়ে দিয়েছে।
​অনির্বাণ এই কুকুরগুলোকে প্রতিদিন মৃত মানুষের মাংস খাইয়ে হিংস্র আর রাক্ষুসে করে তুলেছে। কারণ একটাই, রুপাকে হত্যা করার পর যেন অতি সহজেই তার শরীরের মাংস খেয়ে নিতে পারে কুকুরগুলো! আর এসবে সাহায্য করতো অনির্বাণের ছোটবেলার বন্ধু রুপম। রুপম প্রতিদিন অনির্বাণকে মৃত মানুষের মাংস জোগাড় করে এনে দিত।

​আজ অনির্বাণ আর রুপার ২য় বিবাহ বার্ষিকী ছিল। এক বছরের প্রেম ছিল, দুই বছরের বিবাহিত জীবন তাদের। দুই বছর আগে তারা কাজীকে টাকা খাইয়ে, তাদের দুজন বন্ধুকে সাক্ষী রেখে বিয়ে করেছিল। এই বিয়ের সাক্ষী হিসেবে রুপমও ছিল। তিন বছরের ভালোবাসাময় জীবন নিমিষেই শেষ করে দিল আজ অনির্বাণ। অবশ্য এই খুন করার চিন্তা-ভাবনা গত এক বছর বুকে পালন করে এসেছে সে।
​অনির্বাণ আইটি ফার্মে বেশ ভালো পজিশনে চাকরি করতো। কিন্তু এক বছর আগে চাকরি ছেড়ে দিয়ে সারাদিন বাসায় থাকত। বিকেল হলেই বাইরে বেড়িয়ে যেত রুপমের সাথে দেখা করতে। আর বাসায় ফিরতো বেশ রাত করে। রুপা প্রথম প্রথম অবাক হলেও পরে সে বিষয়টাকে আর তেমন গুরুত্ব দেয় নি। অথচ সেই মুহূর্তগুলোতে অনির্বাণ কী ভয়ানক ঘটনার জন্য প্রস্তুত হচ্ছিলো রুপা এক বিন্দুও টের পায়নি। টের পায়নি তার জীবনের জন্য কী নির্মম দিন অপেক্ষা করছে !

​অনির্বাণ রুপার দিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রুপার ভয়ঙ্কর বিশ্রী মুখ দেখতে দেখতে অনির্বাণের মাথা ঝিম ধরে এসেছে। সে অস্পষ্ট স্বরে কবিতাটা আওড়াতে আওড়াতে চোখ বন্ধ করলো। চোখ বন্ধ করে অনির্বাণ তাঁর অতীতের দিনগুলো স্মরণ করতে লাগলো —

​"তিন বছর আগের আজকের এই দিনে তাদের ভালোবাসার বিনিময় হয়। দিনটিকে স্মরণে রাখতে এই তারিখেই বিয়ে করে তাঁরা। রুপাকে প্রথম দেখেছিল পহেলা ফাল্গুনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুষ্ঠানে। সেই অনুষ্ঠানে রুপা গান গেয়েছিল। পরনে ছিল বাসন্তী রঙের শাড়ি। যেন পুরো বসন্তের ছাপ ফুটে উঠেছিল রুপার চেহারায়! তাঁর চেহারা, তার কণ্ঠ যে কাউকে বাধ্য করবে তাঁর প্রেমে পড়তে! অনির্বাণও ভুল করেনি সেদিন রুপার প্রেমে পড়তে! এক অদ্ভূত অনুভূতির আলোড়ন খেলে গেছিলো তার হৃদয়ে।

​অনির্বাণ ভীষণ চাপা স্বভাবের হলেও সেদিন যেন নিজেকে রুপার থেকে দূরে রাখতে পারেনি। রুপা যখন স্টেজ থেকে নেমে ড্রেসিং রুমের দিকে যাচ্ছিলো, অনির্বাণ দৌড়ে গিয়ে তাঁর পেছন নেওয়া শুরু করে। রুপা প্রথমে খেয়াল না করলেও পরবর্তীতে বুঝতে পারে কেউ একজন তাঁর পেছন পেছন যাচ্ছে। পেছন ফিরে তাকাতেই অনির্বাণের চোখে চোখ পড়ে।

​রুপা তাঁর কপাল ভাঁজ করে জিজ্ঞেস করে,

— "আপনি কি কিছু বলবেন?"

​অনির্বাণ থতমত খেয়ে যায় ঠিক কী বলবে তার মাথায় আসছে না। সে মাথা চুলকাতে শুরু করে, আর ভয়ে তোতলামো শুরু করে দেয়। রুপা অনির্বাণের এমন বেহাল দশা দেখে হাসি পেলেও কোনরকম সামলিয়ে বলে,

— "আমি খুব সুন্দর গান গাই এই কমপ্লিমেন্ট দিতে এসেছেন তাই তো?"

​অনির্বাণ কোনরকম কাঁপা কাঁপা গলায় বলে যে,

— "জি..জি মানে না মানে হ্যাঁ মানে..."

​রুপা এবার হেসে দিয়ে বলে যে,

— "আচ্ছা বুঝতে পেরেছি। আর কিছু বলতে হবে না। আপনার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে আপনার এই মুহূর্তে পানি খাওয়া দরকার। আমার সাথে আসুন!"

​অনির্বাণ চুপচাপ রুপার পেছন পেছন গেলো ড্রেসিং রুমে। সেখানে তখন আরও ৩-৪ জন ছিল তাদের পারফরম্যান্স এর জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। রুপা গ্লাসে পানি ঢেলে অনির্বাণকে দিল। এক নিঃশ্বাসে অনির্বাণ সব পানি খেয়ে নিল। এরপর একটা জোরে শ্বাস নিল।

​রুপা জিজ্ঞেস করলো,

— "এখন ঠিক লাগছে আপনার?"

— "হ্যাঁ ঠিক লাগছে!" (অনির্বাণ)

— "তাহলে এবার বিস্তারিত বলুন আমাকে কি কিছু বলবেন?" (রুপা)

​অনির্বাণ একটু চুপ থেকে বুকে সাহস জমিয়ে এক শ্বাসে বলতে শুরু করলো,

— "আপনার ফোন নম্বরটা পাওয়া যাবে? আপনার কণ্ঠ ভীষণ সুন্দর, ইচ্ছে করে শুনতেই থাকি। আপনি যদি কিছু মনে না করেন। তবে আমি প্রতিদিন আপনাকে একবার কল দিয়ে আপনার কণ্ঠে গান শুনতে চাই! প্লিজ ফিরিয়ে দিবেন না!"

​রুপা এরকম অনেক মুহূর্তই ফেইস করেছে তবে সবাইকে সরাসরি না বলে দিয়েছে। কিন্তু আজকে অনির্বাণের কথাতে একটু চিন্তায় পড়ে গেলো। না বলতে ইচ্ছে করছে না তাকে। রুপা বললো,

— "আপনার নামটা তো জানা হলো না!"

— "আমার নাম অনির্বাণ!"

— "বাহ বেশ সুন্দর নাম তো আপনার! আপনাকে এই সুযোগ দিতে পারি, তবে এক শর্তে।"

​এই কথা শুনে অনির্বাণের হৃদয়ে ঢেউ খেলে গেলো। সে বলে উঠলো,

— "আপনি যা শর্ত দিবেন আমি তাই মেনে নেবো।"

— "ঠিক আছে। আপনি প্রতিদিন একবার কল দিবেন রাত ১০ টার পর যেকোনো মুহূর্তে। তবে একবার কল দিবেন শুধু! কথা বলার সময়কাল ১০ মিনিট! আর আমি যদি রিসিভ করতে না পারি সেদিন তাহলে আর কথা হবে না। রাজি তো আপনি?" (রুপা)

— "হ্যাঁ আমি রাজি। আপনাকে একবার কল দিব এর বেশি দিব না!" (অনির্বাণ)

​এরপর তাদের ফোন নম্বর আদান-প্রদান হলো। অনির্বাণ প্রতিদিন একবার করে কল দিত। প্রথম প্রথম সত্যি ১০ মিনিট কথা বললেও এরপর তাদের সময়কাল দীর্ঘায়িত হলো। কোন কারণে রুপা কল রিসিভ করতে না পারলে সে নিজে থেকেই কল দিত। রাত ১০ টা থেকে শুরু করে কখনো কখনো ভোর হয়ে যেত কথা বলতে, আবার কখনো কলে থেকেই দুজন ঘুমিয়ে যেত। এভাবে এক মাস চলতে থাকলো। অনির্বাণের রুপার প্রতি যত্ন, ভালোবাসা সবকিছুই রুপা বুঝতে পারতো। সে-ও অনুভব করতে পারে অনির্বাণের প্রতি তাঁর দূর্বলতা। তবে সাহসের অভাবে কেউ কাউকে বলতে পারছিলো না।

​আজকের এই দিনে তিন বছর আগে ভোরবেলা অনির্বাণ দুহাত ভর্তি করে শিউলি ফুল নিয়ে রুপার বাসার সামনে হাজির হয়। শিউলি ফুল রুপার ভীষণ পছন্দের! অনির্বাণ সেদিন রুপার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে রুপাকে ভালোবাসার কথা জানিয়ে দেয়। রুপাও এই মুহূর্তটার জন্য অপেক্ষা করেছিল। সেদিন থেকে তাদের প্রেমময় ভালোবাসার জার্নি।

​অনির্বাণ রুপা সম্পর্কে, রুপার পরিবার সম্পর্কে সবকিছু জানলেও। রুপা অনির্বাণের পরিবার সম্পর্কে কিছুই জানতো না। যতবার অনির্বাণকে তাঁর পরিবার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করেছে, অনির্বাণ ততবার রুপাকে এড়িয়ে গেছে! অনির্বাণ ভালোবাসা, যত্নে অভাব না রাখলেও তাঁর সবসময় চুপ থাকা রুপাকে মাঝেমধ্যে চিন্তায় ফেলে দেয়! সে বহুবার অনির্বাণকে এমন চুপচাপ থাকার কারণ জিজ্ঞেস করেছিল। তাঁর মনে এমন কোনো কষ্ট লুকিয়ে আছে কীনা তা জানার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু রুপা কখনো জানতে পারেনি। এ নিয়ে মাঝেমধ্যে রুপার ভীষণ অভিমান হতো। তবে অনির্বাণের ভালোবাসা তাঁকে অভিমান করে থাকতে দিত না।

​হুটহাট অনির্বাণ মধ্যরাতে রুপার জন্য আইসক্রিম কিনে নিয়ে রুপার বাসার সামনে গিয়ে হাজির হতো। রুপা কখনো বায়না করতো তাকে নিয়ে পুরো শহর ঘুরতে হবে। অনির্বাণ সাথে সাথেই রুপাকে নিয়ে শহর দেখতে বেড়িয়ে পড়তো। প্রেম চলাকালীন অনির্বাণ রুপার হাত ছাড়া আর কিচ্ছু স্পর্শ করেনি কখনো। ভালোবাসাকে পরিপূর্ণ করতে তাঁরা বিয়ে করে নেয়! রুপার প্রতি অনির্বাণের এমন ভালোবাসা দেখে রুপা প্রায়ই মনে মনে বলতো — "এত বেশি ভালোবাসা না পেলেও চলতো আমার। এই ভালোবাসার এক ভাগ পেলেই আমি খুশিতে বাকি জীবন কাটিয়ে দিতে পারতাম।"

​অনির্বাণ চোখ মেললো। তার ভীষণ পানির তেষ্টা পেয়েছে। সে উঠে দাঁড়ালো। ডাইনিং রুমে এসে লাইট অন করে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলো রাত আড়াইটা বাজে। জগ থেকে এক গ্লাস পানি ঢেলে নিয়ে খাওয়ার পর তার অনুভব হলো আজকে রাতের খাবার খাওয়া হয়নি। বিবাহ বার্ষিকী উপলক্ষে অনেক খাবার সে নিজ হাতেই রান্না করেছিল। রুপাকে খাইয়ে দিয়েছে কিন্তু সে নিজে খায়নি! শরীর দূর্বল লাগছে অনির্বাণের! দাঁড়িয়ে থাকতে না পেরে চেয়ারে বসে পড়লো। তার মনে হচ্ছে একটু ঘুমানো দরকার। টেবিলের উপর মাথা রেখে চোখ বন্ধ করলো। সে ঘুমানোর চেষ্টা করলে তার চোখের সামনে কয়েক ঘন্টা আগে ঘটে যাওয়া মুহূর্তগুলো ভেসে উঠলো —

​" রাত তখন ৯ টা বাজে। অনির্বাণ রুপাকে কল দিয়ে বাসায় আসতে বললে রুপা জানায় সে তাঁর এক কলিগ এর সাথে জরুরী কাজে আছে। রাত ১০ টা বেজে যাবে আসতে। রুপার অফিস ছুটি হয় রাত ৮ টায়। প্রায় প্রতিদিন তাঁর সেই কলিগের সাথে জরুরী কাজ থাকে! ঠিক কি জরুরী কাজ অনির্বাণ জানতে চায়নি কখনো। রাত ১০ টা পেরিয়ে ১১ টা বাজে তবুও রুপার খোঁজ নেই। বাসায় সে ঢুকলো ১১ টা ১৫ তে।
​রুপা বাসায় ঢুকেই কান ধরে অনির্বাণের কাছে ক্ষমা চাইছিল আর কখনো এমন হবে না। অনির্বাণ একটা মুচকি হেসে রুপাকে ফ্রেশ হয়ে নিতে বললো। রুপার এমন ভুল করার সুযোগ সে সত্যি আর কখনো পাবে না!

​অনির্বাণ সুন্দর করে তাদের বেডরুম সাজিয়েছে। পুরো বিছানার উপর গোলাপের পাপড়ি আর বিছানার পাশে শিউলি ফুল রেখেছে। বেডরুমের সাথে যে বিশাল বারান্দা সেইটাও সুন্দর করে সাজিয়েছে। বারান্দায় টেবিলের উপর কেক রাখা সাথে মোমবাতি। তার নিজ হাতে রান্না করা খাবারও সেখানে সাজিয়ে রেখেছে! রুপাকে এখনো এই রুমে ঢুকতে দেয়নি।
​রুপা ফ্রেশ হয়ে আসলে অনির্বাণ নিজ হাতে তাকে সুন্দর করে সাজিয়ে দিয়েছে। একেবারেই নতুন বউয়ের মতো করে সাজিয়ে দিয়েছে। অনির্বাণের সাজানোর হাত এত নিঁখুত ছিল রুপা বেশ আশ্চর্য হয়ে গেছিলো। এতদিন একসাথে থেকেও অনির্বাণের এই গুণ জানতে পারেনি!

​অনির্বাণ রুপার চোখ বেঁধে বেডরুমে নিয়ে এসে চোখের বাঁধন খুলে দেয়। চোখ বন্ধ থাকলেও রুমে ঢোকার সাথে সাথেই রুপা বুঝতে পেরেছিলো শিউলি ফুল নিয়ে আসা হয়েছে রুমে। পুরো রুম দেখে মনে হচ্ছে যেন ফুলের বাগান। রুপা এসব দেখে এতবেশি খুশি হয়েছিল যে আচমকা অনির্বাণকে জড়িয়ে ধরে। সে তার আবেগকে সংযম করতে না পেরে অনির্বাণের ঠোঁটে ঠোঁট ডুবিয়ে দেয়! অনির্বাণও রেসপন্স করলেও আজ তার যেন দম বন্ধ বন্ধ লাগছে রুপার চুমুতে। সে রুপাকে ছাড়িয়ে নিয়ে বারান্দায় চলে আসে। এখানেও এসে রুপা আরেকবার সারপ্রাইজড হয়ে ওঠে! রুপার যত পছন্দের খাবার সবগুলো রান্না করা হয়েছে!

​প্রথমে কেক কেটে এরপর খেতে বসে রুপা। অনির্বাণ শুধু ওয়াইন খেয়েছে আর কিচ্ছু মুখে তোলে নি! রুপা বারবার খেতে বলছিলো — কিন্তু অনির্বাণ মিথ্যে বলে যে সে আগেই খেয়ে নিয়েছে! রুপার বিশ্বাস না হলেও আর সে কিছু বলেনি! রুপার খাওয়া শেষে অনির্বাণ তাঁকে বারান্দার এক কোণায় নিয়ে আসে। অনির্বাণ রুপাকে পেছন থেকে জড়িয়ে ধরে বসে পড়ে। দুজনেই একদৃষ্টিতে চাঁদ দেখছিলো। অনির্বাণ রুপাকে গান গাইতে বলে। রুপা পরপর দুইটা গান গায়।
​রুপার গান শুনে অনির্বাণের চোখে পানি চলে আসে। সাথে সাথেই সে নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে মনে মনে বলে — "ভীষণ শক্ত থাকতে হবে। আজ মুক্তি না পেলে আর কখনোই পাওয়া হবে না!"
​অনির্বাণ রুপাকে কোলে তুলে নিয়ে রুমে চলে আসে। রুপাকে বিছানায় বসিয়ে দেয়! রুপা যেন আজ একের পর এক সারপ্রাইজড হচ্ছে। অনির্বাণ কখনোই নিজে থেকে রুপার কাছাকাছি আসতো না। আজ অনির্বাণের চোখ কেমন যেন উত্তপ্ত দেখাচ্ছে রুপার কাছে। অনির্বাণ ধীরে ধীরে রুপার দিকে এগিয়ে আসে। রুপার দু ঠোঁট নিজের দখলে নিয়ে ফেলে। অনির্বাণের এই স্পর্শে রুপার যেন মনে হচ্ছে — এই প্রথমবার বোধহয় তাঁরা কাছে এসেছে।
​অনির্বাণ চুমু খেতে খেতে রুপার বুক থেকে শাড়ি নামিয়ে দেয়। এরপর ধীরে ধীরে রুপার গালে, কানে ছোট ছোট চুমু খেয়ে গলা পর্যন্ত চলে আসে। আজ অনির্বাণের প্রতিটা চুমু যেন রুপার হৃদয়ের গভীরে গিয়ে স্পর্শ করছে। অনির্বাণের প্রতিটি আদর রুপাকে পাগল করে তুলছে। ভরা পূর্ণিমা যেমন বাঁধছাড়া আলো ছড়াচ্ছে। অনির্বাণের ভালোবাসাও যেন আজ রুপার শরীরে উপচে উপচে পড়ছে!
​কিন্তু কিছুক্ষণ পর রুপা অনুভব করতে লাগলো — তাঁর পুরো শরীর কেমন যেন অসাড় হয়ে আসছে। হাত-পা নড়াতে পারছে না। নিস্তেজ হয়ে আসছে তাঁর শরীর।

​অনির্বাণ তখন রুপার কানের কাছে মুখ এনে বলে,

— "ভীষণ ভালোবাসি তোমায়! এত ভালোবাসি যে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে। তাই আজ আমি আমাকে মুক্ত করলাম তোমাকে মেরে!"

​রুপা কিছু বলতে যাবে কিন্তু কোন কথা বের হচ্ছে না তাঁর মুখ থেকে। সে ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করে ফেলে। আর কোন নড়াচড়া নেই, হৃদয়ের শব্দ নেই সব থেমে গেছে! কী শান্ত-শীতল স্নিগ্ধ মৃত্যু!

​অনির্বাণ রুপার কপালে একটা চুমু দিয়ে বললো,

— "কতদিন পর মুক্তি হলো আমার। আজ যেন প্রাণভরে শ্বাস নিতে পারছি রুপা!"

এইটা বলে বিকট শব্দে সে হেসে ওঠে! এরপর রুপার শরীরটাকে পরম যত্নে কেটে কেটে টুকরো করে ফেলে। কিন্তু রুপার মায়াবী মুখটাকে সে টুকরো করতে পারেনি। শরীর থেকে মাথাটা আলাদা করে নিজের কাছেই রেখে দিয়েছে।

​হঠাৎ অনির্বাণ তাঁর ঘাড়ে বরফের মতো ঠান্ডা স্পর্শ পেয়ে চমকে ওঠে! তার ধ্যান ভেঙে যায়। সে টেবিল থেকে মাথা উঠিয়ে নিল। মনে হয় কেউ যেন তার ঘাড়ে হাত দিয়েছে। সে পেছন ফিরে তাকাতেই ভীষণ ভাবে চমকে উঠে দূরে সরে যায়! সে বুঝতে পারছে না এইটা স্বপ্ন দেখছে নাকি সত্যি।

​অনির্বাণের সামনে রুপা দাঁড়িয়ে আছে। পুরো শরীর কেমন কাটা কাটা দাগ। শরীরে কোন কাপড় নেই। কী বিশ্রী দেখাচ্ছে! অনির্বাণ নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। সে ভাবছে — তাঁর মস্তিষ্ক এখন ঠিক নেই, তাই হয়তো হেলুসিনেশন হচ্ছে। বেশি ভয় পেলে মস্তিষ্ক কাজ করে না। তখন যা কখনোই হবার নয় তাই ঘটতে থাকে। অনির্বাণ কয়েক সেকেন্ডের জন্য চোখ বন্ধ করে নিলো। হয়তো চোখ বন্ধ করে খুলে দেখবে কেউ নেই তার সামনে। কিন্তু অনির্বাণের এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। এখনো রুপা অনির্বাণের সামনে রক্তবর্ণ চোখে কেমন জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে!
​অনির্বাণের মনে হলো তার মাথা ভীষণ রকমের খারাপ হয়েছে ভয় পেয়ে। যা ঘটছে তা বাস্তবিক নয় তার অবচেতন মন তাকে অবাস্তব ঘটনার মুখোমুখি করেছে! এসবে ভয় পাওয়া যাবে না। কড়া লিকারে এক মগ চা খাওয়া দরকার। তাহলে হয়তো কিছুটা ভালো লাগবে। অনির্বাণ রুপাকে উপেক্ষা করে রান্নাঘরে চলে আসলো। এক মগ চা নিয়ে অনির্বাণ এসে বসলো সোফায়।
​এক চুমুক চা মুখে নিতেই তার পাশ থেকে গরগর করে একটা শব্দ আসলো। সে তাকাতেই দেখে রুপা তার দিকে তাকিয়ে বসে আছে। অনির্বাণ যথাসম্ভব চেষ্টা করছে তার মনের ভুল ভেবে নিজেকে শান্ত রাখতে। পাশে আর না তাকিয়ে সে চায়ের সাথে একটা সিগারেট ধরিয়ে নিল। অস্পষ্ট স্বরে একটা প্রশ্ন সে শুনতে পেলো। কণ্ঠটা ঠিক রুপার কন্ঠের মতো — কেন সে রুপাকে খুন করলো? পরপর তিনবার এই প্রশ্ন অস্পষ্ট স্বরে ভেসে আসলো! অনির্বাণ তখন নিজেই নিজেকে জিজ্ঞেস করে বসলো সত্যি তো কেন খুন করলো সে?

​— রুপাকে খুন করার চিন্তা তার মাথায় আসে প্রথম বিবাহ বার্ষিকীর দিন। সেদিনও সে ভীষণ সুন্দর করে রুপার জন্য অনেক কিছু করেছিল। অনির্বাণের ইচ্ছে ছিল রুপাকে নিয়ে ওইদিন রাতে নৌকায় কাটাবে! কিন্তু রুপা সেদিন বাসাতেই ফিরলো না। রুপা সেদিন তাঁর কলিগের বাসায় গিয়েছিল। তাঁর কলিগের নাম ছিল রাহী। রাহী নাকি সেদিন অনেক অসুস্থ হয়ে পড়ে অফিসে। রুপা তাকে নিয়ে তাঁর বাসায় যায়। রাহী বাসায় একা থাকায় রুপা সেদিন রাহীর কাছেই থেকে যায়!

​অনির্বাণ এইটা কোনভাবেই সহ্য করে নিতে পারেনি। সারারাত সে সিগারেট টেনেছিলো। কিন্তু রুপাকে এক বিন্দুও বুঝতে দেয়নি তার মনে কি চলছিলো। রুপার প্রতি ভালোবাসা বিন্দু মাত্র কমতি ছিল না অনির্বাণের। তবে রুপা মাঝেমাঝেই রাহীর সাথে বেশ সময় কাটাতো। তাঁরা একসাথে ঘুরতে যেত, অফিসের সমস্ত প্রোজেক্ট একসাথেই করতো। বাইরে একসাথে খাওয়া-দাওয়া। প্রায়ই সময়ই অনির্বাণের কাছে রাহীর গল্প শোনাত, তাঁরা কোথায় কখন কী করছে সব জানাতো! এ সব কিছুই অনির্বাণকে তীব্রভাবে আঘাত করতো! কিন্তু কখনোই রুপাকে বুঝতে দেয়নি সে! ভেতরে ভেতরে যেন সে একটা অন্ধকার ঘরে আটকা পড়েছিল! আর তখন তার মনে হতো এর মুক্তি মিলবে রুপাকে মেরে ফেললে। তখন থেকেই সে পরিকল্পণা শুরু করে! ভেতরের অনির্বাণ আর বাইরের অনির্বাণকে কখনোই রুপা আলাদা করে দেখতে পারেনি।

​কিছুদিন আগে রুপার কলিগের অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছিল যা অনির্বাণ রুপমকে দিয়ে করিয়েছিল। কিন্তু ভাগ্যক্রমে বেঁচে যায় সে! অনির্বাণ তাঁর পাশে বসে থাকা রুপাকে জানিয়ে দিল সব। কেন সে খুন করেছে!
​অনির্বাণের যখন ১৩ বছর বয়স তখন সে তার মাকেও খুন করে। সর্বপ্রথম সে সবথেকে বেশি ভালোবেসেছিলো তার মা কে। অনির্বাণের জন্মের পর পরই তার বাবা মারা যায়। অনির্বাণ দুই ভাই ছিল। অনির্বাণ ছিল ছোট আর তার ভাই ছিল ১ বছরের বড়! অনির্বাণের মা অনির্বাণের থেকে তার ভাইকে একটু বেশি ভালোবাসতো। যা অনির্বাণ সহ্য করতে পারতো না কখনোই। সেই বিষয় নিয়ে কখনোই কারো সাথে খারাপ আচরণ করেনি। তবে চুপচাপ সে তার মা আর ভাইকে খুন করে ঘুমের ওষুধ খাইয়ে! সেই বডি কোথায় গুম করেছে কেউ খুঁজে পায়নি! আর ডেডবডি খুঁজে না পেলে আইনী কোন ঝামেলা হয় না! সবাই খোঁজা বন্ধ করে দিয়েছিল পরে! এজন্যই অনির্বাণ রুপার উত্তর না দিয়ে সবসময় পালিয়ে বেড়াতো এই প্রশ্ন থেকে!

​পুরো ঘটনা বলার পর অনির্বাণ এবার কাঁদতে শুরু করলো। অনির্বাণ তার মাকে খুন করার আগে অনেক কেঁদেছিল। যেদিন খুন করলো তারপর থেকে কখনোই কান্না করেনি! তার মনে এইটা নিয়ে কখনোই অপরাধ বোধ জাগেনি। বরং মনে হয়েছে ঘুটঘুটে অন্ধকার থেকে সে বের হতে পেরেছে। অতিরিক্ত ভালোবাসা তার হৃদয়ে অতিরিক্ত যন্ত্রণা বয়ে আনতো। তার মায়ের পর রুপাকে প্রথম ভালোবেসেছে! কিন্তু সেই রুপাও তাকে যন্ত্রণা দিত ভীষণ। তাকেও মেরে ফেলতে হলো।
​অনির্বাণ আর নিজেকে থামাতে পারছে না। তার ইচ্ছে করছে চিৎকার করে কাঁদতে। অনির্বাণ কাঁদতে কাঁদতে টের পেলো তার গায়ে একটা ঠান্ডা হাত স্পর্শ করছে।

​আর জিজ্ঞেস করছে,

— "কেন কাঁদছো অনির্বাণ? কেন কাঁদছো?"

​বলতে বলতে সব মিশে গেলো যেন কোথায়! পাশে আর রুপাও নেই। এবার অনির্বাণের ভেতর শূন্যতা কাজ করতে শুরু করলো। প্রচণ্ড অপরাধবোধ তাকে ঘিরে ধরেছে। উন্মাদের মতো আচরণ করছে। এই অপরাধবোধ থেকে বাঁচতে হলে সবাইকে জানিয়ে দিতে হবে সে খুন করেছে। অনির্বাণ আর দেরি না করে তার ফোন হাতে নিল। ফোনের সুইচ অন করে রুপমকে কল দিল।
​অনির্বাণ রুপমকে জানিয়ে দিল — পুলিশকে যেন সাথে নিয়ে আসে! রুপম অনেক বোঝানোর চেষ্টা করলো অনির্বাণকে, কিন্তু অনির্বাণের আর পথ নেই নিজেকে বাঁচানোর। হয় নিজেকে মেরে ফেলে অপরাধবোধ থেকে বাঁচতে হবে। নয়তো পুলিশের কাছে নিজেকে তুলে দিয়ে বাঁচতে হবে!

​কিছুক্ষণ পর অনির্বাণের বাসার কলিংবেল বাজছে। অনেকক্ষণ ধরে বাজছে কিন্তু ভেতর থেকে কোন সাড়াশব্দ নেই। সবকিছু যেন থমথমে নীরব হয়ে আছে..

​—সমাপ্ত—

Comments

    Please login to post comment. Login