Posts

গল্প

আমি কোনদিন পতিতালয়ে যাইনি

April 16, 2026

অনিরুদ্ধ রনি

10
View

আমি কোনোদিন পতিতালয়ে যাইনি—এই কথাটা বললে অনেকেই ভুরু কুঁচকে তাকায়। যেন একটা অভিজ্ঞতা মিস করেছি। অথচ আমার জীবনের এক অদ্ভুত অধ্যায় আছে, যেটা শুনলে অনেকে আরও বেশি অবাক হয়—আমি এক সময় এক বেশ্যার প্রেমিক ছিলাম।

ঘটনাটা তখনকার, যখন আমি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ি এবং প্রতারিত, বঞ্চিত, নিঃসঙ্গ।

কয়েকজন নারীর ওপর জেদ করে কোনো বেশ্যার শরীরে নিজেকে নষ্ট করার জেদ চেপেছিল। এক বন্ধুকে এই মনোবাসনার কথা বললে সে আমাকে নিয়ে যায় শহরের একটু পুরনো অংশে। সে আমাকে একটা গলির দিকে ইঙ্গিত করে বলেছিল, “এই কানাগলির মধ্যে ঢুকলে তুই যা চাস, তা পাবি! সাহস করে ঢুকে পড়!"

আমার ২৪ বছর ধরে পুষে রাখা লজ্জা, সংযম--এইসবের সাথে আমার তুমুল যুদ্ধ শুরু হয় তখন।

সেখানেই প্রথম তাকে দেখি।

সে অন্যদের মতো ছিল না। চটকদার সাজ, আহ্বানময় চোখ, সবকিছুই ছিল, কিন্তু তার দৃষ্টিতে একটা অদ্ভুত ক্লান্তি ছিল। যেন প্রতিদিন একই অভিনয় করতে করতে সে নিজেই ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। আমি তাকিয়ে ছিলাম, আর সে হঠাৎ বলল,
—“ভিতরে যাবেন না?”

আমি হেসে বলেছিলাম,
—“না, আমি শুধু দাঁড়িয়ে থাকব।”

আমি বুঝলাম, আমাকে দিয়ে এসব হবে না।

সে একটু অবাক হয়েছিল। তারপর হালকা হেসে বলল,
—“এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে মানুষ কিন্তু আপনাকে ভুল বুঝবে!"

সেদিন আমি চলে এসেছিলাম। কিন্তু অদ্ভুতভাবে, তার চোখটা মাথা থেকে সরছিল না।

কয়েকদিন পর আবার গেলাম। এবার আর গলির বাইরে দাঁড়াইনি—সরাসরি তার কাছে গিয়েছিলাম। কথা বলতে। সে প্রথমে ভেবেছিল আমি কাস্টমার। কিন্তু যখন বুঝল আমি শুধু কথা বলতে চাই, তখন তার মুখে এমন এক অভিব্যক্তি ফুটে উঠল—যেটা আমি আগে কখনও দেখিনি। অবিশ্বাস, কৌতূহল, আর একটু হাসি।

আমাদের কথাবার্তা শুরু হলো। নাম বলেছিল—যেটা আসল কিনা জানি না। আমি জিজ্ঞেস করিনি। ও আমার সম্পর্কে খুব বেশি কিছু জানতে চায়নি। যেন দুজনেই বুঝে নিয়েছিলাম—এই সম্পর্কটা বাস্তবিক নয়, তবু পুরোপুরি মিথ্যাও না।

আমি নিয়মিত যেতে শুরু করলাম। কিন্তু কখনোই “সেই” কারণে নয়। আমরা বসে গল্প করতাম—তার গ্রামের কথা, আমি বলতাম আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের মেয়েদের গল্প, তার ছোটবেলার স্বপ্ন, আমার ভবিষ্যতের পরিকল্পনা। মাঝে মাঝে সে হেসে বলত,
—“তুমি ভুল জায়গায় এসেছো।”

আমি বলতাম,
—“হয়তো ঠিক জায়গাতেই এসেছি।”

একদিন সে আর দূরত্ব রাখতে চাইল না। সে দরজা বন্ধ করে আমার দিকে তাকাল--যে দৃষ্টিতে ছিল অভ্যস্ত আহ্বান আর কৌতূহল।

-- "আপনি অন্যদের মতো না।"

আমি হেসে বললাম,

-+ "তুমি-ও না!"

সেদিন আমরা খুব কাছাকাছি বসেছিলাম।
কথা বলতে বলতে কখন যে তার হাত আমার হাতে এসে পড়েছিল, বুঝতেই পারিনি। হাতটা গরম ছিল, নরম ছিল--কিন্তু তার চেয়েও বেশি ছিল একধরনের অনিশ্চয়তা।

সে হাত সরায়নি।

আমি ধীরে ধীরে তার আঙুলগুলো ছুঁয়ে বলেছিলাম,
-- "তুমি কি কখনো কাউকে নিজের মতো করে ছুঁয়েছো?"

সে একটু থেমে বলেছিল,
-- "এখানে ছোঁয়া হয়... কিন্তু নিজের মতো করে না।"

তারপর এক অদ্ভুত নীরবতা নেমে এসেছিল।
সে আমার বুকে মাথা রেখেছিল, খুব স্বাভাবিকভাবে, যেন আমি তার জীবনে প্রথম পুরুষ, প্রথম প্রেম।

সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম, শরীরের কাছাকাছি আসা আর শরীর ব্যবহার করা--দুটো এক জিনিস না।

আমি তার কপালে চুমু দিয়েছিলাম, চুলে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলাম। সে চোখ বন্ধ করে আমার বুকে মুখ ঘষছিল।

ধীরে ধীরে তার দ্রুত ও ঘন নিঃশ্বাস আমার গায়ে লাগছিল, উত্তপ্ত, ছন্দহীন।

হঠাৎই সে সম্বিৎ ফিরে পায়। চোখে অশ্রু নিয়ে অপরাধীর মতো চোখে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলে,

-- "এখানে থাকলে সমস্যা হবে আর আমি আপনাকে নষ্ট করতে পারব না।"

-- "কীসের সমস্যা?"

-- "আমি ভুলে যাব, আমি কে!"

আমি উত্তর দিইনি।

তারপর সে আমার দিকে মুখ তুলে তাকাল, খুব কাছ থেকে।

আমাদের মাঝখানে তখন আর কোনো দূরত্ব ছিল না, শুধু ছিল একটুখানি দ্বিধা।

আমি ধীরে ধীরে তার ঠোঁটে ঠোঁট ছুঁয়েছিলাম।
সে চোখ বুজে ছিল।

তারপর...
সে নিজেই এগিয়ে এলো।

আমাদের মাঝের সব দূরত্ব মিলিয়ে গেল। কিন্তু তাতে কোনো তাড়াহুড়ো ছিল না, কোনো আর্থিক লেনদেনের ব্যাপার ছিল না। ছিল শুধু একধরনের আকুলতা--যেন দুজন মানুষ, যাদের জীবন আলাদা পথে ছুটছে, একটু সময়ের জন্য একই জায়গায় থেমে গেছে।

সেদিন আমরা খুব বেশিকিছু করিনি, কিন্তু যতটুকু হয়েছিল, তা চিরন্তন সত্যি।

তার মাথা আমার বুকে, আমার হাত তার পিঠে, এই সামান্য কাছাকাছিতেই যেন একটা পুরো পৃথিবী তৈরি হয়েছিল।

পরে সে আপনি থেকে 'তুমি'- তে নেমে আসে। লাজুক হেসে কপট শাসনের সুরে বলে,
-- "তুমি খুব বিপজ্জনক, খুব খারাপ!"

--"কেন?"

-- "তুমি আমাকে কিনতে চাওনি! দখল করে নিয়েছো, আমার মনের ভেতরে ঢুকে পড়েছো!"

আমি কিছু বলিনি। কারণ আমি তখন সত্যিই তার ভেতরে ঢুকে পড়েছিলাম--শুধু শরীর না, তার ক্লান্তি, তার একাকিত্ব, তার অদেখা দুঃখের ভেতরেও।

ধীরে ধীরে বুঝতে পারলাম, আমি তাকে ভালোবেসে ফেলেছি। অদ্ভুত, অসম্ভব, তবু সত্যি। আর একদিন সে নিজেই বলল,
—“আমার সাথে এমন করে জড়িও না। এখানে যারা আসে, তারা কিছু নিয়ে যায়, কিছু রেখে যায় না।”

আমি চুপ করে ছিলাম। কারণ আমি জানতাম—আমি ইতিমধ্যেই অনেককিছুই হারিয় ফেলেছি ওই নিষিদ্ধপল্লীর অন্ধকার ঘরে।

তারপর একদিন সে চলে গেল।

কোনো বিদায় না, কোনো চিঠি না।
শুধু একটা খালি ঘর রেখে।

আমি এখনো মনে করতে পারি--সেই ঘরের গন্ধ, সেই নরম হাত, আমার বুকে তার মাথা রাখার নিঃশর্ত ভরসা।

আমি কোনোদিন পতিতালয়ে যাইনি।
তবু আমার শরীর আর মন--দুটোই একবার এক বেশ্যার কাছে আটকে গিয়েছিল।

আর অদ্ভুত ব্যাপার হলো...
আজও মনে হয়...
আমিই তার জীবনে প্রথম পুরুষ, তার প্রথম প্রেম...
সে-ও আমার জীবনে প্রথম নারী, প্রথম নারী শরীর...
আমি তাকে সত্যিই ভালোবেসে ফেলেছিলাম...

অনিরুদ্ধ রনি 

Comments

    Please login to post comment. Login