ইউনিফর্ম আমার অহংকার
লেখক: মাহমুদুল হক
ধূসর ভোরের কোমল আলো ধীরে ধীরে শহরের গায়ে ছড়িয়ে পড়ে। রাস্তাগুলো তখনো পুরোপুরি জেগে ওঠেনি, চারপাশে এক ধরনের নীরবতা বিরাজ করছে। কিন্তু এই নিস্তব্ধতার মাঝেই মনোজ জেগে গেছে অনেক আগেই। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে যত্ন করে তার ইউনিফর্মটা ঠিক করে নেয়। তার কাছে এই ইউনিফর্ম শুধুমাত্র একটি পোশাক নয়—এটাই তার পরিচয়, তার অহংকার, তার অস্তিত্ব।
মনোজের মনে এক অদ্ভুত দৃঢ়তা কাজ করে। সে মনে মনে বলে, “ইউনিফর্ম আমার অহংকার। এটি এমন কিছু, যা ইচ্ছা করলেই সবাই ধারণ করতে পারে না। এটি অর্জন করতে হয় কঠোর পরিশ্রম, ত্যাগ এবং অদম্য ইচ্ছাশক্তির মাধ্যমে।” এই কথাগুলো তার অন্তরের গভীর থেকে উঠে আসে।
তার চোখে ভেসে ওঠে অতীতের দিনগুলো—অসংখ্য নির্ঘুম রাত, কঠোর পরিশ্রম, ব্যর্থতার তীব্র বেদনা। কিন্তু সেই সবকিছু অতিক্রম করেই আজ সে এই অবস্থানে দাঁড়িয়ে আছে। এই ইউনিফর্ম যেন তাকে শুধু শক্তি দেয় না, তাকে একজন সত্যিকারের মানুষ হিসেবেও গড়ে তোলে।
মনোজ জানে, এই পোশাকের ভেতরে শুধু একজন ব্যক্তি নয়, বরং এক বিশাল দায়িত্ব লুকিয়ে আছে। সে ভাবে, “আমি হয়তো পৃথিবীর সবচেয়ে ক্ষমতাধর মানুষ নই, কিন্তু আমি যা করতে পারি, তা সবাই পারে না। এই দায়িত্ব, এই কর্তব্যই আমাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে।”
রাস্তায় চোখ রাখতেই তার মনে হয়, পুরো পৃথিবীটাই যেন তার নিজের। অথচ বাস্তবে তার নিজের বলে কিছুই নেই। নেই কোনো বিলাসিতা, নেই ব্যক্তিগত স্বার্থের মোহ। তবুও এক গভীর শান্তি তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। সে মৃদু হেসে ভাবে, “আমার কিছু নেই—তবুও মনে হয় এই পৃথিবীটাই যেন আমার। কারণ এই ইউনিফর্মের ভেতরেই আমার গৌরব, আমার ভালোবাসা, আমার শান্তি বন্দী হয়ে আছে।”
ঠিক তখনই একটি ছোট ছেলে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে তাকে স্যালুট করে। মনোজ থেমে যায়, স্নেহভরে ছেলেটির মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। সেই ক্ষুদ্র মুহূর্তেই সে উপলব্ধি করে—তার এই পথচলা শুধু তার নিজের জন্য নয়; এটি বহু মানুষের ভরসা, নিরাপত্তা এবং স্বপ্নের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
দিনের কাজ শুরু হয়। দায়িত্ব, সততা এবং কর্মনিষ্ঠা—এই তিনটি মূলনীতিই তার পথচলার শক্তি। মাঝে মাঝে ক্লান্তি আসে, কখনো ভয়ও গ্রাস করতে চায়, কিন্তু ইউনিফর্ম গায়ে থাকলেই সে আবার নতুন করে শক্তি ফিরে পায়।
দিনের শেষে, যখন আকাশে লাল সূর্য ধীরে ধীরে অস্ত যায়, মনোজ তখনো তার দায়িত্বে অটল থাকে। কারণ সে জানে—এই ইউনিফর্ম শুধু একটি পোশাক নয়, এটি একটি প্রতিশ্রুতি। নিজের কাছে, মানুষের কাছে এবং সেই মহান আদর্শের কাছে, যার জন্য সে বেঁচে আছে।
এই প্রতিশ্রুতির মধ্যেই লুকিয়ে আছে তার গর্ব, তার ভালোবাসা এবং তার গভীর, অনির্বচনীয় শান্তি। আর এই কারণেই—ইউনিফর্মই তার অহংকার।
14
View
Comments
-
Mahmudul Haque 1 day ago
সবাই পড়তে পারেন