বড় গেট পেরিয়ে কালো গাড়িটি ভিতরে প্রবেশ করল। দু তলার রঙ চটা বাড়ি। বাড়ির চারপাশে ছোট ছোট ফুল গাছ। বাড়ির সামনে কিছুটা জায়গা যেখানে ঘাস উঠে আছে। ঢাকার মতো কোলাহল সম্পূর্ণ জায়গায় এরকম বাড়ি ভাবা যায় না।
সারার কারো ডাকে ঘুম ভেঙে যায়। এপাশ-ওপাশ থাকে নিজেকে ধাতস্থ করল। নিজের পাশে বসে আছে এক কালো শার্ট পরিহিত যুবক। দেখতে মারাত্মক! উজ্জল শ্যাম বর্ণের গায়ের রং, গাল ভর্তি খোঁচা খোঁচা দাড়ি, চোখ দুটো যেন ভাসমান সমুদ্রের ঢেউ। লোকটাকে খুব সূক্ষ্মভাবে দেখলে বোঝা যায় বা পাশের চোখের খানিক নিচে সূক্ষ্ম কাটা দাগের চিহ্ন। সারা হাবাগোবার মত তাকিয়ে আছে লোকটির দিকে। লোকটি খানিক বিব্রত হয়ে শুধালো, “ এই যে আপনি ঠিক আছেন? "
সারা সাথে সাথে দৃষ্টির সরিয়ে নিল। মাথা নেড়ে ঠিক আছে বুঝালো। সারা বেশ বিব্রত অনুভব করছে। পাশের লোকদের গলা খাকড়ি দিয়ে বলল:
“ আপনি বিয়ে থেকে কেন পালিয়েছেন? "
সারা চুপ করে রইল। অপরিচিত কাউকে নিজে সম্বন্ধে বলতে চাই না। এ লোকের সাথে বিয়ে হলেও সারা তাকে চেনে না। তবে কেন এসব বলবে?
“ এটা কোন জায়গা?”
“ ঢাকা, খিলগাঁও!”
“ সিরিয়াসলি এটা খিলগাঁও? ”
সারার খুশিতে চোখ দুটো চকচক করে ওঠে। সে তো এখানেই আসছিল। ভালোই হলো সহজে এসে গেল।
“ তবে আমি আসি,আসসালামু আলাইকুম।”
সারাকে থামিয়ে দিয়ে লোকটি বলল :
“ হোয়াট আসি, আপনি কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তর দেননি। আপনি কি আপনার বয়ফ্রেন্ডের জন্য পালিয়েছেন? আমাকে বলতে পারেন কারণ যেভাবেই হোক আমাদের বিয়েটা হয়েছে। এবং ইসলামিক নিয়ম মেনে হয়েছে!"
সারা হঠাৎ বিয়ে শুনে অবাক হল। এ লোক এই অযাচিত বিয়ে মানবে নাকি? সারা তো রাত থেকে লোকের ব্যবহার দেখে ভেবেছিল লোকটা গন্তব্যে পৌঁছালে কিছু কড়া কথা শুনিয়ে বিদেয় করে দেবে।সারা শান্ত কণ্ঠে বললো :
“ আমি কোন ছেলে সংক্রান্ত কারণে বাসা থেকে পালাইনি। জীবনের সম্মান রক্ষা করার জন্য পালিয়েছে। কিছু সম্পর্ক নোংরা না হওয়ার জন্য পালিয়েছে। ”
“ তবে বাসার ভিতরে গিয়ে আমি যা বলব আপনি তাই বলবেন। আপনার কোথাও যাওয়া হচ্ছে না। আমি কখনো দায়িত্ব ভুলিনা। আর আপনি এখন আমার দায়িত্ব। আপনার কোন সমস্যা আছে আমার সাথে যেতে। বিশ্বাস করতে পারেন ঠকবেন না!”
সারা হা হয়ে যায় লোকটির কথায়। কিছু ঘন্টার পরিচয় মানুষ এভাবে কথা বলতে পারে? সারার মনে হল লোকটার গলায় যেন তীব্র অধিকার খেলা করছে। সারা কি বলবে বুঝতে পারেনা। নিজের ছোট ব্যাগ থেকে মোবাইল ফোন বের করল। তোহানের দেওয়া সিমটা সেট করে ব্যাগ থেকে একটা ছোট কাগজ বের করল। কাগজটায় নাম্বার লেখা। নাম্বারটা মোবাইলে তুলে কল লাগলো। বিরক্তিকর গলায় এক নারী বলছে কল যাচ্ছে না। সারা বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগেও নিজের আগের নাম্বার দিয়ে এই নাম্বারে অনেকগুলো ফোন করেছে তবে প্রত্যেকবারই একই কথা। সারা এই নাম্বারের ভরসা করে বেরিয়েছে বাড়ি থেকে। কি করবেন ভেবে লোকটির দিকে আবার তাকালো। লোকটিকে ভরসারযোগ্য বলে মনে হচ্ছে। তবে মনে হলে তো চলবে না! সারা নিচু স্বরে তার সাথে যেতে রাজি হল। এছাড়া কোন উপায় নেই। লোকটি আবারো বলল :
“ ভেতরে আমি যা বলব সেটাতেই আপনি হ্যা তে হ্যা এবং না তে না বলবেন। বেশি কিছু বলবেন না। "
সারা জবাব দিল। চুপটি করে নিজের ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি নিবে।
কলিং বেল বাজাবে দরজা খুলা হলো। একটা মেয়ে দরজা খুলে আনন্দিত কন্ঠে বলল:
“ তোমার তো ভুরে আসার কথা ছিল, আসফি ভাই? এতো দের…”
মেয়েটার কথা সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই তার দৃষ্টি গেল আসফির পেছনে দাঁড়িয়ে থাকা লাল বেনারসি পরিহিত সারার দিকে। হঠাৎই মেয়েটার কথা বন্ধ হয়ে মুখটা ফেকাসে হয়ে গেল।
“কিরে মাহু এভাবে দাড়িয়ে আছিস কেন? আসফি আসেনি?”
ভেতর থেকে মহিলার গলা ভেসে এলো। মাহুর কোন হেলদোল না দেখে মহিলাটি দরজার সামনে এগিয়ে এল। আসতেই তিনিও থমকে গেলেন। কি ভেবে যেন চেচিয়ে “আপা”বলে ডাকলেন।
এবাড়ির কর্তা আনাস আহমেদ আরো আগে মৃত্যুবরণ করেছে। উনার স্ত্রী সৈয়দা বেগম। তিনিও যায় যায় অবস্থা প্রায়। হাঁটাচলা করতে পারেন না, মুখে দাঁত পড়ে গেছে। তাদের দুই ছেলে। বড় ছেলে আহাদ আহমেদ তার স্ত্রী আসমা বেগম। তাদের তিন ছেলে মেয়ে। বড় ছেলে আসফিয়া আহমেদ আসফি, মেজো ছেলে ইসফিয়ার আহমেদ ইসফি, ছোট মেয়ে তাসফিয়া আহমে মিহি।
আর ছোট ছেলে আলম আহমেদ তার স্ত্রী শায়লা বেগম। তাদের একমাত্র মেয়ে আলিয়া আহমেদ মাহু।