Posts

পোস্ট

মব সন্ত্রাস

April 18, 2026

জেসী খন্দকার / Jasy Khandaker

19
View

 বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে “মব জাস্টিস” বা গণপিটুনি-নির্ভর সহিংসতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা শুধু আইনের শাসনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছে না, বরং নিরপরাধ মানুষের জীবনকেও ঝুঁকির মুখে ফেলছে। বিভিন্ন গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা ও গবেষণা প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—গুজব, সামাজিক অবিশ্বাস, বিচারহীনতার ধারণা এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ভুল তথ্যের দ্রুত বিস্তার—এসবই এই সহিংসতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

মব সহিংসতার সাম্প্রতিক চিত্র

বাংলাদেশে গত এক দশকে একাধিক আলোচিত গণপিটুনির ঘটনা ঘটেছে। ২০১৯ সালে রাজধানী ঢাকায় “ছেলেধরা” গুজবের জেরে একাধিক নিরীহ মানুষ গণপিটুনির শিকার হন। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ঘটনা হলো বাড্ডা গণপিটুনি, যেখানে তাসলিমা বেগম রেনুকে শিশু চোর সন্দেহে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। পরে প্রমাণিত হয়, তিনি নির্দোষ ছিলেন।

এ ধরনের ঘটনা শুধু ঢাকাতেই নয়; গ্রামাঞ্চল ও মফস্বলেও প্রায়ই ঘটে। চুরি, ডাকাতি, ধর্ম অবমাননা বা শিশু অপহরণের গুজব ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয় জনগণ উত্তেজিত হয়ে ওঠে এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পৌঁছানোর আগেই “বিচার” সম্পন্ন হয়ে যায়।

 

কারণ বিশ্লেষণ

১. গুজব ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম
ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম যেমন Facebook-এ যাচাই-বাছাইহীন তথ্য দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। একটি পোস্ট বা ভিডিও মুহূর্তেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে গিয়ে আতঙ্ক ও ক্ষোভ তৈরি করে।

২. বিচার ব্যবস্থার প্রতি অনাস্থা
অনেকেই মনে করেন অপরাধীরা দ্রুত শাস্তি পায় না। এই ধারণা থেকেই কিছু মানুষ “তাৎক্ষণিক বিচার” করতে চায়।

৩. জনমনে নিরাপত্তাহীনতা
অপরাধের ভয়, বিশেষ করে শিশু অপহরণ বা চুরির আশঙ্কা, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করে। এই ভয় কখনো কখনো যুক্তিবোধকে ছাপিয়ে যায়।

৪. জনমনস্তত্ত্ব (Mob Psychology)
সমষ্টিগত আচরণে ব্যক্তি নিজের দায়বদ্ধতা কম অনুভব করে। মনোবিজ্ঞানে এটিকে “deindividuation” বলা হয়—যেখানে ভিড়ের মধ্যে ব্যক্তি নিজের পরিচয় ও দায়বোধ হারিয়ে ফেলে।

প্রভাব

  • মানবাধিকার লঙ্ঘন: নিরপরাধ মানুষ নিহত বা আহত হন
  • আইনের শাসনের অবক্ষয়: বিচার ব্যবস্থার প্রতি আস্থা কমে যায়
  • সামাজিক অস্থিরতা: গুজব-নির্ভর সহিংসতা সমাজে ভয় ও বিভক্তি তৈরি করে
  • আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। 

 

প্রতিকার ও করণীয়

১. ডিজিটাল সচেতনতা বৃদ্ধি
গুজব শনাক্ত করা, তথ্য যাচাই করা—এসব বিষয়ে গণসচেতনতা জরুরি।

২. দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা
মব সহিংসতার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনলে প্রতিরোধমূলক প্রভাব তৈরি হবে।

৩. কমিউনিটি পুলিশিং জোরদার
স্থানীয় পর্যায়ে জনগণ ও পুলিশের সমন্বয় বাড়াতে হবে।

৪. শিক্ষা ও সামাজিক প্রচার
স্কুল-কলেজ ও গণমাধ্যমে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার বিপদ সম্পর্কে প্রচার চালাতে হবে।

৫. প্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মের দায়বদ্ধতা
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া তথ্য ছড়ানো রোধে কার্যকর মনিটরিং প্রয়োজন।

 

মব সহিংসতা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি সামাজিক ও কাঠামোগত সংকটের প্রতিফলন। আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা, জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার—এই তিনটি ক্ষেত্রেই সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এ সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। বাংলাদেশ যদি একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে চায়, তবে “মব জাস্টিস” সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।

Comments

    Please login to post comment. Login