Posts

গল্প

সময়ের সেতু

April 19, 2026

Abiyan Khan

20
View

শিরোনাম: সময়ের সেতু    রাত তখন প্রায় বারোটা। শহরের কোলাহল অনেক আগেই থেমে গেছে, কিন্তু আরিফের ঘরে এখনো আলো জ্বলছে। টেবিল ভর্তি বই, নোট, আর এক কাপ ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চা। সে জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিল—দূরের ফাঁকা রাস্তা আর হালকা কুয়াশা যেন তাকে ডাকছে।

আরিফ একজন ইতিহাসের ছাত্র। কিন্তু তার কাছে ইতিহাস শুধু পড়ার বিষয় না—এটা যেন এক জীবন্ত জগৎ, যেখানে প্রতিটি ঘটনা, প্রতিটি মানুষ তার কাছে বাস্তব। ছোটবেলা থেকেই তার এক অদ্ভুত অভ্যাস ছিল—পুরনো জিনিসের প্রতি আকর্ষণ। পুরনো বাড়ি, পুরনো ছবি, এমনকি ভাঙা ঘড়িও তার কাছে রহস্যময় মনে হতো।

সেদিন বিকেলে সে পুরনো বইয়ের দোকান থেকে একটা অদ্ভুত ডায়েরি কিনেছিল। দোকানদার বলেছিল, “এই ডায়েরিটার ইতিহাস কেউ জানে না। অনেকেই কিনতে চেয়েছে, কিন্তু আবার ফেরত দিয়ে গেছে।”

আরিফ হেসে বলেছিল, “আমি তো ফেরত দেব না।”

এখন সে সেই ডায়েরিটা খুলে বসে আছে। প্রথম কয়েকটা পাতা ফাঁকা। তারপর হঠাৎ করে একটা তারিখ—১৯৭১।

তার বুক ধক করে উঠল।

পাতায় লেখা—
“যদি কেউ এই ডায়েরি পড়ে, তাহলে জানবে—সময় শুধু সামনে যায় না, কখনো কখনো পিছনেও ফিরে আসে।”

আরিফ একটু থমকে গেল। “এটা আবার কেমন কথা?” সে নিজেই নিজেকে বলল।

হঠাৎ করেই ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। জানালার পর্দা অদ্ভুতভাবে নড়তে লাগল, যদিও বাইরে কোনো বাতাস নেই। ডায়েরির পাতাগুলো নিজে থেকেই উল্টাতে শুরু করল।

তার চোখ ঝাপসা হয়ে এলো।

পরের মুহূর্তেই সবকিছু বদলে গেল।

সে যখন চোখ খুলল, তখন সে নিজের ঘরে নেই।

চারদিকে ধোঁয়া, চিৎকার, আর ভাঙা বাড়ির শব্দ। রাস্তার পাশে আগুন জ্বলছে। মানুষ দৌড়াচ্ছে, কেউ কাঁদছে, কেউ চিৎকার করছে।

আরিফ হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

“এটা কোথায়?” তার গলা কাঁপছিল।

হঠাৎ এক ছেলে তার হাত ধরে বলল, “এখানে দাঁড়িয়ে থাকবেন না! ওরা চলে আসবে!”

আরিফ কিছু বুঝে ওঠার আগেই ছেলেটা তাকে টেনে নিয়ে গেল একটা গলির ভেতরে।

“তুমি কে?” আরিফ জিজ্ঞেস করল।

ছেলেটা বলল, “আমি রাশেদ। আপনি নতুন নাকি?”

আরিফ কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তারপর ধীরে ধীরে বলল, “এটা… কোন সাল?”

রাশেদ অবাক হয়ে তার দিকে তাকাল। “আপনি মজা করছেন? ১৯৭১!”

আরিফের মাথা ঘুরে গেল।

সে সত্যিই অতীতে চলে এসেছে!

দিনগুলো দ্রুত কেটে যেতে লাগল। আরিফ বুঝতে পারল, সে এখন মুক্তিযুদ্ধের সময়ে আছে। চারদিকে অনিশ্চয়তা, ভয়, কিন্তু তার মাঝেও মানুষের সাহস আর একে অপরের প্রতি ভালোবাসা তাকে গভীরভাবে নাড়া দিল।

রাশেদের সঙ্গে তার বন্ধুত্ব হয়ে গেল। রাশেদ তাকে আশ্রয় দিল, খাবার ভাগ করে নিল, আর ধীরে ধীরে তাকে সবকিছু বুঝিয়ে দিল।

একদিন রাতে রাশেদ বলল, “আমরা কাল একটা মিশনে যাব।”

আরিফ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “মিশন?”

“হ্যাঁ,” রাশেদ বলল, “আমাদের কিছু তথ্য পৌঁছে দিতে হবে।”

আরিফের বুক কেঁপে উঠল। সে কি পারবে?

কিন্তু সে জানত—এটা শুধু একটা অভিজ্ঞতা না, এটা একটা দায়িত্ব।

পরের দিন তারা রওনা দিল। পথটা সহজ ছিল না। মাঝেমধ্যে গুলি, মাঝে মাঝে লুকিয়ে থাকা, আর প্রতিটি মুহূর্তে ধরা পড়ার ভয়।

একটা সময় তারা নদীর ধারে পৌঁছাল। হঠাৎ করেই গুলির শব্দ শুরু হলো।

রাশেদ চিৎকার করে বলল, “নিচে শুয়ে পড়ুন!”

আরিফ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তার হৃদস্পন্দন এত দ্রুত হচ্ছিল যে মনে হচ্ছিল, এখনই থেমে যাবে।

কিছুক্ষণ পর সব শান্ত হয়ে গেল।

কিন্তু রাশেদ উঠে দাঁড়াল না।

“রাশেদ!” আরিফ চিৎকার করল।

সে দৌড়ে গিয়ে দেখে—রাশেদ মাটিতে পড়ে আছে, তার শরীর নিস্তেজ।

আরিফের চোখে পানি চলে এলো।

সে বুঝতে পারল—ইতিহাস শুধু গল্প না, এটা মানুষের ত্যাগের কাহিনি।

হঠাৎ করেই আবার সেই অদ্ভুত অনুভূতি।

সবকিছু ঘুরতে লাগল।

আরিফ আবার চোখ বন্ধ করল।

যখন সে আবার চোখ খুলল, তখন সে নিজের ঘরেই বসে আছে। টেবিলের উপর সেই ডায়েরি।

সবকিছু যেন স্বাভাবিক।

কিন্তু তার ভেতরে কিছু একটা বদলে গেছে।

সে ডায়েরির শেষ পাতায় তাকাল।

সেখানে লেখা—
“তুমি যা দেখেছ, তা শুধু অতীত না—এটা তোমার দায়িত্ব।”

আরিফ ধীরে ধীরে ডায়েরিটা বন্ধ করল।

তার চোখে আর আগের মতো কৌতূহল নেই, আছে এক ধরনের দৃঢ়তা।

সে জানে—সে এই গল্প বলবে। মানুষের কাছে পৌঁছে দেবে সেই ত্যাগের কথা।

কারণ কিছু গল্প শুধু পড়ার জন্য না, মনে রাখার জন্য।

রাত আবার গভীর হলো। কিন্তু এবার আরিফ জানালার বাইরে তাকিয়ে শুধু রাস্তা দেখছে না—সে যেন ইতিহাসকেই দেখতে পাচ্ছে।

আর তার ভেতরে একটাই কথা প্রতিধ্বনিত হচ্ছে—
“সময় বদলায়, কিন্তু সাহস আর ত্যাগ কখনো হারায় না।”

Comments

    Please login to post comment. Login