লেখকের সব লেখা পড়তে,
https://fictionfactory.org/contributor/4237
ভুতের টাকা
মনোয়ারা বেগম পুরো বাড়ি দাপিয়ে ছুটছেন। কখনো পুকুর পারে দৌড়ে যাচ্ছেন তো কখনো কুয়ার পারে। তার পিছু পিছু যাচ্ছে তার দুই ননদ। সাথে কিছু শিশুর দল। মনোয়ারা বেগম হঠাৎ একেকটা জায়গায় দেখিয়ে দিয়ে বলেন, এই যে এই যে। তার পিছের মহিলাদের দল উৎসুক চোখ নিয়ে তাকায়। বলে, কই কই? মনোয়ারা বেগম বলেন, এই যে এই যে। বলে তিনি সেখানে স্থির থাকেন না। আরেক জায়গায় দৌঁড়ে যান। দৌঁড়ানোর মাঝে মাঝে হঠাৎ খুন খুন করে কাঁদতে থাকেন। কখনো বা হাসতেই থাকেন, মনে হয় হিস্টিরিয়ার রোগী। হাসি আর থামতে চায় না। পুরো পাড়ার লোক এসে ভিড় করে এই বাড়িতে, খোঁজ নিয়ে যায় যে যখন সুযোগ পায়।
মনোয়ারা বেগমের স্বামী বাতেন মিয়া উঠানের বেঞ্চিতে বসে আছেন। তার চোখে কৌতুহল খেলা করছে । দেখে মনে হবে, স্ত্রীর পাগলামিতে তিনি আনন্দ পাচ্ছেন। যদিও অন্য সময় স্ত্রীর কথায় কাজে পান থেকে চুন খসলেই মা বাপ তুলে গালাগালি করেন। কিন্তু এখন অবস্থা ভিন্ন। মনোয়ারার উপর জিন ভর করেছে। মনোয়ারা বাড়ির বিভিন্ন জায়গায় স্বর্নের পয়সা দেখতে পাচ্ছে। বেশি দেখতে পাচ্ছে কুয়ার পাড়ের বড়ই গাছের নিচে। সেখানে খুড়লেই পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। কিন্তু তার বউ মাঝে মাঝে যাচ্ছে পুকুর পারে। সেখানেও নাকি টাকা দেখতে পাচ্ছে। বাতেন মিয়া অপেক্ষায় আছেন। এত তাড়াহুড়োর কিছু নাই। কাজে নামতে হবে গভীর রাতে। পাড়ার লোককে বুঝতে দেয়া যাবে না। সব কিছু সবার জন্য না। সে হচ্ছে বিশেষ সৌভাগ্যবান। চখি পাড়ার নেজারুলের কথাই ধরা যাক। বিষোহরির জঙ্গলে ভুত তাকে ডেকে নিয়ে গেল। স্বর্নের টাকা ভরা ডেগ দেখালো। ভুত বলল, তোকে খুব পছন্দ হয়। তোরে এই ধন দিব। আরো দিব। নেজারুল কাঁপতে কাঁপতে বলল, দেন। এত বড় ডেগ একা নিতে পারব না। লোক নিয়ে আসি। ভুত বলল, আর কাউরে জানাবি তো জানে মাইরা ফেলব। শোন, স্বর্নের মোহর নিবি তো তোর ব্যাটা ছাওয়ালটাক নিয়ে আয়। আমার কাছে দিয়া দে। সব মোহর নিয়ে যা। নাহলে পাবি না। দেখ মোহর কেমন জ্বলজ্বল করে। দেখ, দেখ! নেজা মিয়া ছুটল বাড়িতে। তার চোখে মুখে ধক ধক করে জ্বলছে লোভ। বাড়িতে এসে দেখল তার ৩ মাসের ছেলে সন্তান খুব কাঁদছে। সে স্ত্রীকে সব খুলে বলল। আল্লাহ আরো ছেলে সন্তান দিবে। এত চিন্তার কি আছে? এইটারে ভুতের কাছে দিয়া দিতে হবে। ডেক ভরা স্বর্ণের মোহর নিয়ে প্রথমে বানানো হবে বিল্ডিং বাড়ি । এরপর জমি কিনবে ১০০ বিঘা। নেজারুলের বউ স্বামীর কথা শুনে বিকট চিৎকার দিয়ে উঠল। কোলের সন্তানকে জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। বলল, আমার জীবন থাকতে এ হবে না। নেজা মিয়া কথা বাড়ালো না। সে বুঝেছে তার বউ কথা শুনবে না। বউয়ের চোখে জিদের আগুন। নেজারুলে সেবার ভুতের টাকা না পাওয়ার দুঃখে বাড়ি ছেড়ে বের হয়ে গেল। দিনের পর দিন যায় তার খোঁজ নেই। সপ্তাহ খানেক পরে সে ফিরল উস্কখুস্ক চেহারা নিয়ে। বাতেন ভাবছে, নেজারুল বড়লোক হতে পারল না। যে বড়লোক হলে রসগোল্লা দিয়ে ঢিল ছুড়ে কুকুর তাড়ানো যায়। অবশ্য আশ্চর্য্য ব্যাপার হলো, নেজারুলের আর কোনো সন্তান হয় নি পরবর্তীতে। তার একমাত্র ছেলে এখন বাপের সাথে গরুর দালালির ব্যাবসা করে বেড়ায়। বাতেনের দুই বাড়ি পরের যে অশিদুল। সেই গন্ডমূর্খটার কথা ভাবলেই শরীর জ্বলে যায় আবার হাসিও পায় বাতেনের। অশিদুলের ঘরে ভুত এসে স্বর্ণের কলসি দিয়ে গেল। কলসি ভড়া মোহর। ভুত বলল সব তোর। যা ইচ্ছা খরচ কর, খা। খালি গরুর গোশত খাবি না। অশিদুল সপ্তাহখানেক গরুর গোশত না খেয়ে থাকতে পারল। শুক্রবার হাটে গিয়ে আর সামলাতে পারল না। গরুর মাংস কিনে ফেলল। সে ধনী হয়েছে আবার গরুর মাংস খাবে না কেমন কথা? গরুর মাংস-ভাত পেট ভরে খেয়ে ঘুম দিলে সে। এক ঘুমে রাত কাবার। সকালে উঠে দেখল, স্বর্নের কলস নেই, মোহরও নেই। অশিদুলের কোনো আফসোস দেখা গেল না। গরুর গোশত না খেয়ে থাকা তার পক্ষে সম্ভব না। ভাগ্য আসে সেই ভাগ্য সবাই রাখতে পারে না। বাতেন মিয়া ভাবছে, এবার ভাগ্যকে ধরতে হবে। তার স্ত্রী এখন বাড়ির বাইরে হম্বি তম্বি করছে। দেখে আসা যাক কি হচ্ছে সেখানে। বাতেন উঠে দাড়াল।
উঠানে পাড়ার লোকের জটলা। দক্ষিণ বাড়ির রমজানও এসেছে। লম্বা, খটখটে, বদরাগী একটা মানুষ। তাকে দেখলেই মনোয়ারার মেজাজ খারাপ হয়ে যায়। সম্পর্কে ভাসুর জন্য কিছু বলা যায় না কখনো। কিন্তু আজ মাফ নেই। রমজান মনোয়ারাকে বলছে, কই স্বর্নের মোহর কই ? খালি ঢঙ করিস এই দিনের বেলা? মনোয়ারার চোখ ধক করে জ্বলে উঠল। সে বাড়ির ভেতরে দৌড়ে গেল। সবাই ভাবল স্বর্ণের মোহর দেখাতে যাচ্ছে । কিন্তু মনোয়ারা চুলার পাড় থেকে মোটা দেখে একটা লাকড়ি তুলে নিল। তেড়ে গেল রমজানের দিকে। সাহসী রমজানের হঠাৎ কি হলো কে জানে। সে উল্টা ঘুরে কষে দৌড় দিল। মনোয়ারা লাকড়ি নিয়ে ছুটছে তার পেছনে। থামাথামির নাম নেই। তার চোখে আগুন। মুখে বলছে, খাড়া রমজান, তুই খাড়া। রমজান মিয়া কোনোমত দৌড়ে তার বাড়ি গিয়ে ঘরে ঢুকল। দরজা আটকিয়ে বসে থাকল। দিন গড়িয়ে বিকাল হলো। বাতেন মিয়ার বাড়িতে নানান কান্ড কারখানা ঘটতেই থাকল। সন্ধ্যা হলে জ্ঞান হারালো মনোয়ারা। চেহারায় পানি দিয়ে জ্ঞান ফেরানোর চেষ্টা বৃথা গেল। এবার মরিচ পুরে তার নাকের কাছে ধরা হলো। জ্ঞান না ফিরে উপায় আছে? জ্ঞান ফিরেই মনোয়ারা পানি চাইল। পানি খেয়েই সে ঘুমিয়ে পড়ল। সারারাত ঘুমালো মরার মত। বাতেন কয়েকবার জিজ্ঞেস করল, ভুতের টাকা কোন জায়গায়? মনোয়ারার কোনো জবাব নেই। ঘুমের মধ্যেই সে হাসে। কখনো কাঁদে।
খুব সকালবেলা ঘুম থেকে উঠল মনোয়ারা। রান্নাঘরে গিয়ে এক গামলা পান্তা ভাত খেল। সরিষার তেল, লবন, পেঁয়াজ, কাঁচা মরিচ। ধীর পায়ে হেঁটে পুকুর পারে গিয়ে সে বসল। তার চোখে উদাস ভাব প্রবল। তার ইচ্ছে হচ্ছে, কোথাও একদিকে বেরিয়ে যায়। তার যাবার জায়গা নেই। বাবা বেঁচে নেই। ভাই বিশাল সংসার টেনেটুনে কোনোমতে চালায়। স্বামীর বাড়িতে সে উদ্বাস্তুর মত হয়ে পড়েছে। সে তাকালো তার হাতের দিকে। তার গায়ের রং ঘন কালো। বিয়ের পরে এই বাড়িতে যখন প্রথম এল। দেখল তার স্বামী খুব রাগারাগি করছে। কারণ বাতেন মিয়াকে মেয়ে না দেখিয়েই বিয়ে দিয়েছে তার পরিবার। যৌতুকের লোভে। বিয়ের পর মেয়ে দেখে একদম পছন্দ করল না বাতেন। বৌয়ের সাথে দেখা করে না, কথাও বলে না। মনোয়ারা যে এই দুঃখে কাঁদবে সেই সাহসও পায় নি। ভয়ে সে কুঁকড়ে থাকত, স্বামীর পরিবারের অন্যদের রাগও কম না। একের পর এক কাজ করতে বলে। উঠতে বসতে খোঁটা । তার সন্তান যখন হলো তার বাবা পানাতুল্লাহ দেখতে এলেন। ব্যাগে কিছু পান সুপারি নিয়ে। গ্রামে আনন্দের সময় মানুষ পান সুপারি খেতে পছন্দ করত। পান চিবাবে আর হাসি মুখে গল্প করবে। সেই পান সুপারির ব্যাগ বাতেনের পছন্দ হলো না। সবার সামনেই সে ব্যাগ পুকুরে ছুড়ে মারল। মনোয়ারার বাবা পানাতুল্লাহ মেয়ে-জামাইর বাড়ি থেকে মাথা নিচু করে বের হয়ে গেলেন। মনোয়ারা অসুস্থ্য শরীর নিয়ে গেল বাবার পিছু পিছু । সামনের মোড়ে বাস আসে কতক্ষণ পর পর। সেখান থেকে ১ টাকা ভাড়া। বাস না আসা পর্যন্ত অপেক্ষায় থাকল বাপ মেয়ে। বাস এল। পানাতুল্লাহ উঠে গেলেন বাসে। বাবাকে অশ্রু চোখে বিদায় দিয়ে মনোয়ারা ধীরে ধীরে হেঁটে বাড়ি ফিরল । এই তো সেদিনের কথা। এরপরে তার বাবা আর বেশিদিন বাঁচে নি। বাবার কথা মনে পড়তেই কাঁদতে শুরু করল মনোয়ারা। মাথা ঝুলিয়ে সে কাঁদছে।
বাতেন মিয়া ঘুম থেকে উঠে স্ত্রীকে পেল না। সে মনোয়ারাকে খুঁজতে খুঁজতে এল পুকুর পারে। দেখল মনোয়ারা মাথা ঝুলিয়ে কাঁদছে। বাতেন মনোয়ারার পেছনে দাঁড়িয়ে বলল, কই টাকা কোন জাগাত? ক দেখি।
মনোয়ারা চুপ করে আছে। সে কান্নার বেগ সামলানোর চেষ্টা করছে।
‘কি? ভুতে কিছু কয় নাই?’
‘কইছে।‘
‘কী কইছে?”
“আমারে স্বর্ণের মোহর দিবে, সিন্দুক ভরা মোহর।‘
“সিন্দুক দেখা যায়?’”
‘হ্যাঁ, সোনার পয়সা জ্বল জ্বল করে।‘
“ধরা যায় না?”
“ধরিবার গেলে নাই।“
“আর কি কইছে ভুতে।“
“কইছে, স্বপ্নে আমারে জায়গা চিনাইবে।“
“কিছু করতে কইছে? সিন্দুক পাওয়ার জন্য?”
“কইছে, সে আমারে খুব ভালো পায়। আমারে অনেক কিছু দিবে।“
“আচ্ছা।“
বাতেন মিয়া বেশ খুশি মনে বাড়ির দিকে ফিরে গেল। তার অস্থির বোধ হচ্ছে। সে শুনেছে ভুতের নাকি শোল মাছ খুব পছন্দ। সে ভাবল পুকুরে নামবে, শোল মাছ ধরার চেষ্টা করবে। মাছ পাওয়া গেলে সেই মাছ দুপুরে রান্না করে মনোয়ারাকে খেতে দিবে। দেখা যাক কি হয়। সে কুয়াপাড়ে গেল দাঁত মাজতে।
সকাল গড়িয়ে যাচ্ছে। মনোয়ারা পুকুর পার থেকে উঠছে না। বাতেন সবাইকে বলে দিয়েছে, মনোয়ারাকে যেন বিরক্ত করা না হয়। পারার লোকেরা চুপচাপ আসছে যাচ্ছে। মনোয়ারা তেমন একটা কথা বলছে না। দুপুর হতে না হতেই তার শ্বাশুরী তাকে ডেকে নিল রান্নাঘরে। শোল মাছ দিয়ে ভাত খেতে দিল। মনোয়ারা কোনো কথা না বলে খাওয়া শুরু করল। তার পাশে ৪ বছর বয়সী মেহনাজ। মনোয়ারার কন্যা। সে মায়ের দিকে তাকিয়ে আছে ভয় ভয় চোখে। মনোয়ারা মেয়ের দিক থেকে চোখ ফিরিয়ে শ্বাশুরীর দিকে তাকিয়ে একটা বিদঘুটে হাসি দিল। শ্বাশুরী ভয় পেয়ে পিছিয়ে গেল। বলল, আমারে কিছু করবা না কইলাম। মনোয়ারা বলল, করব না কিছু।
“তোমার ভুত কি গেছে?”
“চাইরপাশে খালি ঘুরে, আমারে ত্যাক্ত করে।“
“শুনো, আমার পুতে তোমারে তালাক দিবার চায়, এই কথা সত্য না। মরদ লোক মেজাজের চোটে এইটা সেইটা কয়, সেইসব গায়ে মাখান যায় না।‘
“শোল মাছের মাথাটা দেন খাই।‘
“খাও, মানা করছে কেডা।“
মনোয়ারার দিকে তাকিয়ে আছে তার শ্বাশুরী। মনোয়ারাও চোখ তুলে তাকালো শ্বাশুরীর দিকে। বুড়ির চোখে খেলা করছে ধকধকে লোভ। সিন্দুক ভরা স্বর্নের মোহরের লোভ। মনোয়ারা ভাত খাচ্ছে গপ গপ করে। শোল মাছটার যা স্বাদ হয়েছে। যদি সে সব মাছ খেতে চায়, আজ দেয়া হবে। সে ভাবছে, খেয়েদেয়ে একটা লম্বা ঘুম দিবে। কারণ বিকাল থেকে আবার শুরু করতে হবে নাটক। যেই নাটকের বুদ্ধি দিয়েছেন রসুনি বেগম। তার বৃদ্ধা মা। বুদ্ধিটা মোটেও খারাপ মনে হচ্ছে না মনোয়ারার। তার মায়ের নানান অভিনয়ও সে ছোটবেলা থেকে দেখেছে। সে সেই মায়ের মেয়ে। আর তার বাবা পানাতুল্লাহ বশর। যাকে এক জোছনা রাতে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল মানুষের বেশ ধরা জিন। মাছ ধরার লোভ দেখিয়ে। মাছ ধরার যথেষ্ঠ লোভ পানাতুল্লাহ বশরের ছিল। জঙ্গলের পাশে জলা জায়গায় সেই রাতে পাওয়া যাচ্ছিল বড় বড় মাগুর আর কই মাছ। পানাতুল্লাহ হঠাৎ দেখল তার সাথীজনের পা লম্বা লম্বা। উল্টা দিকে ঘুরা। পানাতুল্লাহ এক সেকেন্ড অপেক্ষা না করে জলা থেকে উঠে দেয় এক দৌড়। জিনটা ডাক পেড়ে বলে, আইজ বাঁচলি রে পানাতুল্লাহ, বাঁচলি। না হয় পানিতে চুবায়া মারতাম তোকে। পানাতুল্লাহ বেঁচেছিলেন সেদিন। তার মেয়ে মনোয়ারাকেও বাঁচতে হবে। ভুতে ধরা আর ভুতের টাকা পাওয়ার অভিনয় করে হলেও বাঁচতে হবে।
লেখকের সব লেখা পড়তে,