লেখায়: রাদিয়া
সেদিন রাতটা অদ্ভুত ছিল।ঝুম বৃষ্টি পড়ছিল। টিনের ছাদে এমন শব্দ হচ্ছিল, যেন কেউ বারবার দরজায় কড়া নাড়ছে।পুরনো, ভাঙাচোরা সেই বাড়িটা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল নিঃশব্দ, কিন্তু অস্বস্তিকর।মীরা তখন একা।
মাত্র সাত দিন হলো সে এই বাড়িতে উঠেছে।
একটা ভয়ংকর সড়ক দুর্ঘটনায় তার বাবা-মা মারা যাওয়ার পর এই বাড়িটাই ছিল তার শেষ আশ্রয়।পাড়ার লোকজন অনেকবার বলেছিল_
"ওই বাড়িতে থাকিস না… ওখানে কিছু আছে।"
কিন্তু "কিছু" বলতে কী? কেউ পরিষ্কার করে বলেনি।
মীরা এসব কুসংস্কার ভেবে উড়িয়ে দিয়েছিল।
প্রথম তিন দিন সব স্বাভাবিক ছিল।চতুর্থ দিনের রাতে,সবকিছু বদলে যায়।গভীর রাতে সে হঠাৎ ঘুম ভেঙে শুনতে পায়_ঘরের ভেতর কারও হাঁটার শব্দ।
টুপ… টুপ… টুপ…
প্রথমে সে ভাবে_ভুল শুনছে।কিন্তু শব্দটা থামে না।সে ধীরে ধীরে উঠে বসে।
ঘরের একমাত্র বাল্বটা আধা নষ্ট, ঝাপসা আলোয় সবকিছু অস্পষ্ট দেখাচ্ছিল।
কাঁপা গলায় সে বলে_
"কে?"
কোনো উত্তর আসে না।কিন্তু আয়নার সামনে একটা অস্পষ্ট ছায়া দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
সে তাড়াতাড়ি লাইট জ্বালায়।কেউ নেই।সব ফাঁকা।
কিন্তু আবার আয়নায় তাকাতেই_তার পেছনে আরেকটা মুখ ভেসে ওঠে।
একটা মেয়ে।চোখ দুটো ফাঁকা, প্রাণহীন।মুখে শুকনো রক্তের দাগ।
মীরা দ্রুত ঘুরে দাঁড়ায়_কেউ নেই।
আবার আয়নায় তাকায়_এইবার মেয়েটা তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে।
সেই রাতটা সে দরজা বন্ধ করে কাঁদতে কাঁদতে কাটায়।পরদিন সকালে সে পাশের বাড়ির এক বৃদ্ধার কাছে যায়।সব শুনে বৃদ্ধা কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে, তারপর বলে_
"এই বাড়ির আগের মালিকের একটা মেয়ে ছিল… নাম রিমি।"
"সে হঠাৎ মারা যায়। কিন্তু মারা যাওয়ার আগে কয়েকদিন ধরে বলত_ঘরের ভেতর আরেকটা মানুষ থাকে।"
মীরা এসব মানতে চায় না।সে নিজেকে বোঝায় সবই মানসিক চাপ।কিন্তু সেই রাতেই আবার শুরু হয়।
এইবার শুধু হাঁটার শব্দ না_
কেউ তাকে নাম ধরে ডাকছে।
মীরা…মীরা......মী…রা…
ফিসফিসে, কিন্তু খুব কাছে থেকে।
সে চিৎকার করে ওঠে—
"কে তুমি?"
এইবার উত্তর আসে।
"আমি… তুই…
"মীরা থমকে যায়।"মানে কী?"
অন্ধকার কোণা থেকে শব্দ ভেসে আসে—
"আমি… তোর আগেরটা…!
সে দরজার দিকে দৌড়ায়_
দেখে দরজা বাইরে থেকে বন্ধ।জানালাও খুলছে না।ঘরটা হঠাৎ অস্বাভাবিক ঠান্ডা হয়ে যায়।
ধীরে ধীরে তার মনে হয়_
যে আছে, সে বাইরে থেকে আসেনি।
সে… এখানেই ছিল।সবসময়।
মীরা সাহস করে আয়নার সামনে দাঁড়ায়।এইবার সে সত্যিটা দেখতে চায়।আয়নায় তাকাতেই সে জমে যায়।কারণ আয়নায় যে মুখটা দেখা যাচ্ছে ওটা তার নিজের না।অন্য এক মেয়ের মুখ।
চোখ ফাঁকা, ঠোঁট কাঁপছে।
মেয়েটা ধীরে ধীরে বলে_
'তুই এখন আমার জায়গায় থাকবি…"
হঠাৎ মীরার মাথা ঘুরে যায়।সে মাটিতে পড়ে অজ্ঞান হয়ে যায়।
পরদিন সকালে লোকজন দরজা ভেঙে ঢোকে। মীরা আয়নার সামনে বসে আছে।
চোখ স্থির।
তারা ডাকে—
"মীরা" মীরা...
সে তাকায়… এবং হাসে।
কিন্তু সেই হাসিটা তার নিজের না।এরপর থেকে তার আচরণ বদলে যায়।সে একা একা কথা বলে।ঘন্টার পর ঘন্টা আয়নার সামনে বসে থাকে।মাঝে মাঝে ফিসফিস করে বলে_
"তুই বের হতে চাস? ভেতরে খুব কষ্ট লাগে, না?"
একদিন বৃদ্ধা সাহস করে জিজ্ঞেস করে—
"মীরা, তুই ঠিক আছিস তো?"
সে ধীরে ধীরে বলে_
"আমি মীরা না…"বৃদ্ধা ভয় পেয়ে যায়।
"তাহলে কে?"
সে মৃদু হাসে_
আমি রিমি… মীরা এখন ভেতরে আছে…
সেই রাতেই ঘটনা ঘটে।পুরো বাড়ি হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে যায়।
তারপর_
আয়নাটা নিজে নিজে কাঁপতে শুরু করে।
হঠাৎ—
ঠাস!
আয়নাটা ভেঙে মেঝেতে পড়ে যায়।
লোকজন দৌড়ে আসে।
দেখে_
মীরা মেঝেতে বসে কাঁদছে।
অনেকদিন পর।
সে কাঁদতে কাঁদতে বলে_
আমি… আমি মীরা…
সবাই ভাবে সব ঠিক হয়ে গেছে।
কিন্তু সত্যিটা অন্য ছিল।
আয়নাটা ভাঙার সাথে সাথে একটা জিনিস বদলে যায়—
ভেতর” আর "বাইরের" সীমা।
মীরা পুরোপুরি হারায়নি।রিমিও পুরোপুরি বের হতে পারেনি।
তারা…
একই শরীরে আটকে গেছে।
দিনে মীরা থাকে।স্বাভাবিক, চুপচাপ, মানুষের মতো।
কিন্তু রাতে_
তার চোখ খুলে যায়।আর তখন তার গলা দিয়ে অন্য কেউ কথা বলে।
দিন যেতে থাকে।
মীরা একটা ডায়েরি লেখা শুরু করে।
প্রথমে লিখে_
আজ ৩ ঘন্টা কোথায় ছিলাম মনে নেই…
পরদিন_
আজ ৫ ঘন্টা…
তারপর—
আজ পুরো দিনটাই মনে নেই…
শেষ পাতায় লেখা থাকে_
আমি ধীরে ধীরে মুছে যাচ্ছি…
একদিন সকালে লোকজন দেখে—
মীরা বসে আছে আগের মতোই।
শান্ত।
কিন্তু তার চোখে কোনো পরিচয় নেই।
বৃদ্ধা জিজ্ঞেস করে—
তোর নাম কী?
সে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলে_
…মনে পড়ছে না।
তারপর আস্তে করে বলে
কিন্তু একটা নাম বারবার মাথায় আসছে…
সে ভাঙা আয়নার টুকরোর দিকে তাকায়।
তার ঠোঁট কাঁপে_
রিমি…
কিন্তু আসল ভয় তখনও বাকি ছিল।
ভাঙা কাঁচের প্রতিটা টুকরোয় আলাদা আলাদা মুখ দেখা যাচ্ছিল।শুধু মীরা না।শুধু রিমি না।
অনেকগুলো মুখ।
অচেনা।চুপচাপ তাকিয়ে আছে।
মানে—
এই বাড়িতে কেউ একা থাকে না।যারা "ভেতরে" যায়_তারা কেউ পুরোপুরি হারায় না।
ওরা সবাই রয়ে যায়।অপেক্ষা করে।দেয়ালে শেষবারের মতো একটা লেখা দেখা যায়—
এখানে কেউ মরে না…
"শুধু জায়গা বদলায়"
(সমাপ্ত)
46
View
Comments
-
Priti Chowdhury Priti 1 month ago
Very horror