ব্যস্ত ঢাকার রাস্তাটা পার হচ্ছিলাম।মাথার উপরে মেট্রোরেলের একেকটা স্তম্ভ।একজন নারী আমার ডান হাতটা শক্ত করে চেপে ধরে আছে।রাস্তা পারাপারে স্বভাবসুলভ অপটু সে।সেই নারীকে আমি নাম দিয়েছি পাথরের বনলতা সেন। আসলে মূল নামটা ঠিক আমার দেয়া না। নামটা দিয়েছিল ফাহিম। আমার বাম পায়ের স্যান্ডেলটার অবস্থা কিছুটা নাজুক। বনলতা সেন আমার হাতের ওপরে যতখানি ভরসা করে আছে ঠিক ততখানি মিথ্যে ভরসা আমি আমার স্যান্ডেলটার ওপরে করে সোজা হাটা দিলাম। পাশ দিয়ে একটা গাড়ি ভস করে চলে গেলো। বনলতা সেন আমার হাতটা কিছুটা শক্ত করে ধরলো। আমি তার চোখের দিকে তাকালাম, ধূসর একজোড়া ভয়ার্ত চোখ। চশমার ফ্রেমে ঢাকা চোখদুটো দেখে আমার কেমন যেন একটা শূন্য ভাব হতে শুরু করল।
রাস্তাটা পার হয়ে আমরা সোজা হাটতে শুরু করলাম। কেউ একজন এসে আমার হাতে একটা লিফলেট ধরিয়ে দিয়ে গেল। সাধারণ এক হোমিওপ্যাথিক দোকানের লিফলেট। উল্টোপিঠে একজোড়া মায়াবী চোখের ছবির পাশে গোটা অক্ষরে লেখা 'যে জীবন ফড়িঙের দোয়েলের মানুষের সাথে তার হয়নাকো দেখা।' হঠাৎ করেই তীব্র কৌতুহল নিয়ে আমি পেছনের দিকে তাকালাম। লিফলেট বিলি করা লোকটা হেটে যাচ্ছে। সাদা একটা ধুতির ওপরে মলিন হয়ে যাওয়া ফতুয়া। আমি পাথরের বনলতা সেনের হাতটা ঢিলে করে সোজা সেই লোকটার কাছে ছুটে গেলাম। আবার একটা লিফলেট লোকটা আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন। লোকটার চোখে চশমা, চামড়ার ভাঁজে বয়সের ছাপ,কপালের বা'পাশে একটা কাটা দাগ। আমি মৃদুস্বরে ডাকলাম“ জীবনানন্দ”। লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে কেবল বলল “আশ্চর্য আপনি আমার নাম জানলেন কি করে?” আমি আবার বললাম “বনলতা সেনের চোখে আপনি কি দেখেছিলেন? আশ্রয় নাকি মৃত্যু? বনলতা সেন বলে আসলেই কেউ কি আছে নাকি সেটা আপনার নিজের কল্পনা কিংবা আপনি নিজেই? আচ্ছা ট্রাম আপনার পা টেনে নিয়েছিল নাকি আপনি ইচ্ছে করেই? সুরঞ্জনা কিংবা কাজোরীর সাথে একবার দেখা করাবেন আমার?” লোকটা আমার দিকে তাকিয়ে কেবল বলল “পাগল নাকি আপনি?” প্রত্যুত্তরে আমি বললাম “নতুন কোন কবিতাটা লিখছেন?” লোকটা আমার দিকে পান খাওয়া দাতে একটা তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলল “দেখুন ভাই আমি লিফলেট বিলি করে খাই, কবিতা লেখতে যাবো কোন সুখে?”
আমি আশাহত হয়ে ফিরে এলাম। পাথরের বনলতা সেন আমার দিকে তাকিয়ে তার সেই রহস্যময় চাহনি দিলো। আমি বললাম “বনলতা, কবিতা কি কখনো মানুষ সুখে লেখে? তবে তো পৃথিবীর সবচাইতে সুখী মানুষ ছিলেন জীবনানন্দ। আচ্ছা তোমার চোখে তাকিয়ে কবি কি দেখেছিল? আশ্রয় নাকি মৃত্যু?” বনলতা আমার দিকে কাটা চোখে তাকিয়ে বলল “মৃত্যুই তো আমাদের শেষ আশ্রয়, তাইনা?” বনলতার কথার যুক্তিতে আমি প্রসঙ্গ পাল্টালাম। “আচ্ছা জীবনানন্দ কি কোনদিন জানবেন তার অপেক্ষায় কত যুবক মাঝরাতে সড়কের পাশ দিয়ে হেঁটে বেড়ায়, বাতাবি লেবুর গন্ধের মতো হৃদপিন্ডে তিনি হাতুড়িপেটা করেন কত পথিকের? ” “হয়ত ” বলে বনলতা আমার দিকে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমরা দুজন বসে নীরবতা উপভোগ করতে লাগলাম।
সন্ধ্যার শেষ পাখিটাও ঘরে ফিরেছে ঘন্টাখানেক হলো। চারপাশে অন্ধকার, আমার মুখোমুখি বনলতা বসে আছে। আমি বনলতা চোখদুটোর দিকে তাকিয়ে প্রশ করলাম “আচ্ছা বনলতা, এই লিফলেট বিলি করা লোকটা যদি জীবনানন্দ হতেন, কী দারুণ হতো বলো?” বনলতা আমার একটু কাছাকাছি আসল, তার গা থেকে হাজার বছরের পুরনো কোন ডুবে যাওয়া পঞ্চমীর চাঁদের ভেজা গন্ধ। আমার কানের কাছে অলকনন্দার মতো ঠোঁটদুটো এনে বনলতা ফিসফিস করে বলল “এই পৃথিবী একবার পায় তারে,পায়নাকো আর।”