Posts

উপন্যাস

Burned Heart

April 28, 2026

Arora

18
View

পর্ব ১

‘’আয়ান ভাই, বাড়িতে কখন যাব? আমার শরীরটা একদম ভালো লাগছে না,মনের ভেতর খুব অস্থির লাগছে। মনে হচ্ছে খুব খারাপ কিছু হতে চলেছে।”

কথাগুলো বলেই পাশের চেয়ারে বসে পড়ল অরা।

“কি বলিস! তোর কি শরীর বেশি খারাপ লাগছে? এখন তো বাড়িতে যাওয়া সম্ভব না, বিয়ে তো সবে শুরু হয়েছে। দাঁড়া, আমি তোকে ভেতরে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করছি। তুই এখানেই বস।”

কথাটা বলে ভেতরের দিকে চলে গেল আয়ান।

(পরিচয়)

আমাদের গল্পের নায়িকা অরুনিকা অরা। অরার বাবা মিস্টার আনোয়ার শেখ, মা মিসেস মায়া বেগম, আর অরার ছোট ভাইয়ের নাম আবির।

অরাদের একটি যৌথ পরিকবার। পরিবারে আছেন অরার দাদি আচিয়া খান। অরার বাবারা তিন ভাই।

বড় কাকার নাম মিস্টার মফিজ শেখ, তার স্ত্রী মিসেস জয়া বেগম। তাদের একমাত্র ছেলে আফ্রিদি শেখ (আয়ান)।

ছোট কাকার নাম মিস্টার শফিক শেখ, তার স্ত্রী মিসেস সুফিয়া বেগম। তাদের এক ছেলে সাইফ শেখ এবং এক মেয়ে আরশি শেখ।

অরাদের পারিবারিক ব্যবসা রয়েছে“Sheikh Group of Industries”, যা বর্তমানে বাংলাদেশের এক নম্বর কোম্পানি হিসেবে পরিচিত। দেশের ৮টি বিভাগের মধ্যে ৬টিতে তাদের শাখা রয়েছে।

ঢাকার গুলশানে তাদের একটি আধুনিক ও বিলাসবহুল ডুপ্লেক্স বাড়ি রয়েছে, যেখানে তারা সবাই একসাথে থাকেন।

আজ আয়ানের বন্ধু সাবিরের বিয়ে। সেখানে আয়ান ও অরা এসেছে। আয়ানের বাবা-মা গিয়েছেন তার নানার বাড়িতে, কারণ তার নানার শরীর ভালো না। তাই তারা আজ বিয়েতে আসতে পারেননি। আর অরার পরিবারের বাকি সদস্যরা বাড়িতেই আছে।

“চল অরা, ভেতরে গিয়ে একটু রেস্ট করবি। আর দুই ঘণ্টার মধ্যেই আমরা বেরিয়ে যাব।”

“ঠিক আছে।”

আয়ান অরার হাত ধরে তাকে ভেতরের দিকে নিয়ে যাচ্ছিল, ঠিক তখনই আয়ানের ফোনে একটি কল আসে। অরার হাত ধরা অবস্থাতেই অন্য হাত দিয়ে ফোনটি কানে নেয় আয়ান।

ওপারের ব্যক্তির কথা শুনে আয়ান কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে যায়। নিজেকে স্বাভাবিক করে আয়ান অরাকে বলল,

“বাড়িতে আ গু ন লে গে ছে, অরাএখনই বাসায় যেতে হবে, চল!”

কথাটা শোনা মাত্রই জ্ঞা ন হারিয়ে অরা পরে যেতে নিলে আয়ান দ্রুত অরাকে কোলে তুলে নিয়ে এসে গাড়িতে বসায়, আর নিজে ড্রাইভিং সিটে গিয়ে বসে। ওদের এভাবে যেতে দেখে বিয়ে বাড়ির সবাই অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে। বিয়ে সম্পূর্ণ হয়ে যাওয়াই ওদের পিছন পিছন সাবির ও গাড়ি নিয়ে বের হতে যাই।

গাড়ির মধ্যে অরার জ্ঞা ন ফিরে আসে। জ্ঞা ন ফেরার সাথে সাথেই অরা প্যানিক করতে শুরু করে। আয়ান নিজেকে শক্ত রাখার চেষ্টা করছিল এবং অরাকে সামলানোর চেষ্টা করছিল।

কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা বাড়ির সামনে পৌঁছে যায়। গাড়ি থেকে নেমে পুরো বাড়িটা আ গু নে পু রে যেতে দেখে অরা ছুটে বাড়ির মধ্যে ঢুকতে যাই কিন্তু আয়ান পিছন থেকে আটকে দেয়। চোখের সামনে সবকিছু এভাবে শেষ হতে দেখে অরা নিজেকে আয়ানের হাত থেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করে আর চিৎকার করে বলতে লাগে,

‘’ছাড়ো-ছাড়ো আমাকে আয়ান ভাই।ভি-ভিতরে সবাই আছে আয়ান ভাই।ভিতরে আমার ছটু,আ- আমার মা,বাবা ওদের-ওদের সবার খুব কষ্ট হচ্ছে আয়ান ভাই আমাকে যেতে হবে।‘’

বলতে বলতে অরা আবার জ্ঞা ন হারায়। আয়ান অরা কে কলে করে নিয়ে গাড়িতে বসিয়ে নিজে গাড়ির দরজার সামনে হাঁটু ভেঙে বসে পরে।এবার আর আয়ান নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। অরার হাত ধরে ওর কলে মাথা রেখে ডুক্‌রে কান্না শুরু করে।হ্যাঁ কান্না করছে ৬ ফুট লম্বা, শক্ত-সুঠাম দেহের অধিকারী, রাগী স্বভাবের, রগচটা একজন ব্যবসায়ী,যে জীবনে এক ফোঁটা চোখের পানি কখনো ফেলেনি, আজ সেই আফ্রিদি শেখ আয়ানের চোখে পানি,তার পরিবারের সদস্যদের হারানোর ভয়ে।

আয়ান এর পাশে সাবির এসে দাঁড়ালে আয়ান নিজেকে সামলে নেই।

কাঁপা কাঁপা গলায় আয়ান জিজ্ঞেস করে,

“আ-আমার পরিবারের সবাই?”

সাবির নিচু কন্ঠে জবাব দেয়,

“কাউকে বা চা তে পারেনাই ফায়ার সার্ভিস এর লোক। আ গু ন লাগাড় অনেক পরে নাকি ওনারা খবর পায়,ততক্ষনে সব হাতের বাইরে চলে গেছিলো।‘’

কথাটা শুনে আয়ানের পায়ের নিচ থেকে যেন মাটি সরে গেল। হাঁটু ভেঙে মাটিতে বসে পড়ল আয়ান। নিজের মনেই বলতে লাগল,

“কি করবো আমি এখন?কি জবাব দিবো আমি অরাকে?”

ঠিক তখনই আয়ানের পাশে এসে দাঁড়াল তার বাবা, আর আয়ানের মা মাটিতে বসে আয়ানকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে লাগলেন।

ধরণীতে নতুন সকাল হয়েছে, কিন্তু অরার জীবনে যেন আজীবনের জন্য অন্ধকার নেমে এসেছে। এক রাতের ব্যবধানে অরা সব হারিয়ে আজ অনাথ। অবশ্য অরার বড় আব্বু আর বড় আম্মু নিজেদের মেয়ে না থাকায় অরাকে নিজের মেয়ের মতোই দেখেন। কিন্তু তবুও নিজের পরিবার হারানোর দুঃখ অন্য কিছুর সাথে তুলনা হয় না।

অরারা সবাই গতরাতে সবকিছু মিটিয়ে তাদের দ্বিতীয় বাড়িতে উঠেছিল। গতরাত থেকেই অরার ধুম জ্বর। জ্বরের ঘোরে অরা শুধু “আম্মু, আব্বু” আর ছোট ভাইকে ডাকছিল।

অরার এই অবস্থা মিসেস জয়া বেশিক্ষণ সহ্য করতে না পেরে নিজের রুমে চলে যান। অরার পাশে সারারাত জেগে বসে ছিল আয়ান। অরাকে একা রাখার সাহস পাচ্ছিল না।

মেয়েটা যে খুব ছোটো, কোমল হৃদয়ের ।এত বড় একটা আঘাত সে কীভাবে সহ্য করবে, এই ভাবনায় অস্থির হয়ে উঠছিল আয়ান।

শেষ রাতে যখন অরার জ্বর কিছুটা কমে, তখন অরার হাত ধরে থাকা অবস্থায়ই সেই হাতের ওপর মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে আয়ান ঘুমিয়ে পড়ে।

সকালে অরার ঘুম ভাঙার পর, অরা প্রথমে তার হাতের দিকে তাকায়। তারপর একে একে গতরাতের সব কথা তার মনে পড়তে লাগে। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর হঠাৎ ফুপিয়ে কেঁদে ওঠে অরা।

অরার কান্নার শব্দে আয়ানের ঘুম ভেঙে যায়। আয়ান অরাকে বুকে টেনে নেয়। অরাকে শান্তনা দেওয়ার ভাষা নেই তার কাছে,তাই সে অরাকে কাঁদতে দেয়।

অরার চোখের পানি সহ্য করতে পারে না আয়ান,তবুও আজ কিছু বলে না।অরার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে আয়ান নিচু কন্ঠে বলে,

“আজ কাঁদার দিন, রাজরাণী, কিন্তু শুধু আজই!”

অরার কান্নার শব্দে পাশের রুম থেকে দৌড়ে আসেন মিসেস জয়া। মিস্টার মফিজ বাজারে গিয়েছেন। জয়া বেগম এসে অরার পাশে বসেন, তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন। নিজেও মুখ চেপে কাদ্দতে লাগেন।

কাঁদতে কাঁদতে আবারও জ্ঞা ন হা রা য় অরা।

“মা, তুমি অরার পাশে বসো… আমি ডক্টর আঙ্কেলকে কল দিচ্ছি”

কথাটা বলে আয়ান অরাকে বেডে শুইয়ে দিয়ে রুম থেকে বের হয়ে যায়।

কিছুক্ষণের মধ্যেই অরাদের পারিবারিক ডাক্তার এসে অরাকে দেখেন। অরাকে চেক করে ডাক্তার জানান,

“তীব্র মানসিক আঘাতের কারণে অরা এখন শক ও ট্রমার মধ্যে আছে। আমি ওকে স্যালাইন দিয়ে যাচ্ছি,আপনারা ওকে একটু সময় দিন, পাশে থাকুন। আশা করি এই ট্রমা থেকে ও বের হয়ে আসতে পারবে।”

ডাক্তার এর কথা শুনে অরা কে জড়িয়ে ধরে কান্না শুরু করেন মিসেস জয়া। আয়ান মায়ের কাঁধে ভরসার হাত রাখে।

ডাক্তারকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে তার সাথে যান মিস্টার মফিজ।

আয়ান মিসেস জয়া কে তার রুমে দিয়ে এসে নিজে অরার পাশে বসে, তার হাত ধরে আয়ান ধীরে ধীরে বলে,

“তুই চিন্তা করিস না রাজরাণী আমি আছি, আমরা আছি তোর পাশে,সব ঠিক হয়ে যাবে।”

একটু পর অরার জ্ঞা ন আসে। না, এখন আর কান্না করছে না অরা ,খুব নিস্তব্ধ হয়ে গেছে।

যখন কোনো চঞ্চল, হাসিখুশি, দুষ্টু মেয়ে হঠাৎ চুপ হয়ে যায়, তখন সেটা যেন আরও বেশি করে চোখে পড়ে।অরার ক্ষেত্রেও ঠিক তাই হয়েছে।

একটু পর অরার জন্য স্যুপ নিয়ে আসে তার বড় আম্মু। তখনও অরার পাশে বসে ছিল আয়ান।

মিসেস জয়া যখন অরার মুখের সামনে স্যুপের চামচ ধরলে, অরা অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে নেয়।

‘’গতরাত থেকে তুই কিছু খাসনি মা,এমন করে না খেয়ে থাকলে যে তুই আরো অসুস্থ হয়ে পড়বি।‘’ কথাগুলা শেষ করে মিসেস জয়া মুখ চেপে কান্না শুরু করে।তা দেখে আয়ান নিজের হাতে স্যুপের বাটি তুলে নেয় এবং তার মাকে উদ্দেশ্য করে বলে,

“চিন্তা করো না মা, আমি ওকে খাইয়ে দিচ্ছি। আমাকে কখনো না করতে পারে না অরা।”

আয়ানের কথা শুনে তার দিকে ঘুরে তাকায় অরা।

হ্যাঁ, ঠিকই বলেছে আয়ান,এই একজন মানুষের কথা কখনো ফেলতে পারে না অরা।

এটা মূলত রাগী আয়ানের ভয় আর তার প্রতি শ্রদ্ধা থেকে, কিন্তু এটাও অস্বীকার করা যাইনা যে অরা তার আয়ান ভাইকে ভাইয়ার চোখে দেখে না আয়ান বিদেশ থেকে আসার পর থেকে , একটু আলাদা একটা অনুভূতি কাজ করে অরার মনে আয়ানের জন্য,তবে সেটা এখনো ভালোবাসায় রূপ নেয়নি।

আর কোনো কথা না বলে চুপচাপ খেয়ে নেয় অরা।

২০ দিন পর,

Comments

    Please login to post comment. Login