Posts

চিন্তা

মুক্তিযোদ্ধা বনাম রাজাকার, মুক্তিযুদ্ধ বনাম স্বাধীনতা বিরোধিতা!

April 28, 2026

ফারদিন ফেরদৌস

46
View

ফজলুর রহমান নামের একজন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে ফজা পাগলা বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করছেন। হিউমিলিয়েট করতে মুখে যা আসছে তাই ফেরি করে বেড়াচ্ছেন। আর ওই বীর মহান জাতীয় সংসদে গলা উঁচিয়ে বুক ফুলিয়ে বলতে পারছেন, ওই রাজাকার আলবদরের বাচ্চারা -এইদেশে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছে এটাই সত্য!

একজন মানুষকে আপনি পাগল-মাথা খারাপ বলে উড়িয়ে দিচ্ছেন, কিন্তু তার তরফ থেকে রাজাকার-আলবদর সম্বোধনটা যুক্তি দিয়ে বাতিল করে দিতে পারছেন না। এরচেয়ে বড় পরাজয় ও গ্লানি আর আছে নাকি? আপনারা যদি একাত্তরের ঘৃণ্য ভূমিকার জন্য জাতির কাছে করজোড়ে ক্ষমাও চাইতেন তবু ওই গ্লানির নিদান হতো না। কোনমুখে এখনো দাম্ভিকতা দেখান কে জানে?

পৃথিবীর তাবৎ ইতিহাসে লেখা আছে যে, একাত্তরে হানাদার পাকিস্তানি আর্মির সাথে কোলাবোরেটর হিসেবে রাজাকার-আলবদর-আল শামসরা এই দেশে কী ম্যাচাকারটাই না করেছে। সবচেয়ে বড় কথা রাজাকার নিজেই তো নিজেদের পাপাচারের ইতিহাস ভালো জানে। তাদের মুখপত্র দৈনিক সংগ্রামের একাত্তরের নিউজ কাটিংগুলো দেখে নিলেই পারে। নিজেদের ব্যর্থতা ও পাপের কথা মনে পড়লে মাথা গরম হয়ে যায় বুঝি? মুখ দিয়ে আবোলতাবোল কথা বের হয়? তাহলে আসল সাইকো কে বা কারা?

বীর মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমান আজ সংসদে একেবারে দাবানল ছড়িয়ে দিয়েছেন। ভাষণে তিনি বলেছেন, 'এই বাংলায় শুধু বেলি-চামেলি আর জুঁই ফুল ফোটে না, এ দেশে শুধু কোকিল ডাকেনা। এ দেশের জঙ্গলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারও থাকে। যতদিন রয়েল বেঙ্গল টাইগার থাকবে, মুক্তিযোদ্ধা জিতবে, রাজাকার কোনোদিন এই দেশে জয়লাভ করতে পারবে না।'

তিনি আরও বলেন, 'কয়েকদিন আগে জামায়াতের আমির বলছিল, তার পরিবারেও মুক্তিযোদ্ধা আছে, তিনিও শহীদ পরিবারের মানুষ। তার নাম উল্লেখ করে চোখে চোখ রেখে ফজলুর রহমান অনর্গল বলে গেলেন, 'মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের লোক কেউ জামায়াত করতে পারে না, শহীদ পরিবারের লোক জামায়াত করলে ডাবল অপরাধ।'

এরপর পয়েন্ট অব অর্ডারে দাঁড়িয়ে জামায়াতের আমির মিস্টার শফিকুর রহমান তার মতো করে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বক্তব্যকে ডিফেন্ড করেছেন। মাথা গরম বলে তাচ্ছিল্য করেছেন। কিন্তু তারা যে রাজাকার-আলবদর না -এটা বলবার যুক্তিবুদ্ধি খুঁজে পান নাই। এমনকি তিনি মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান -সেটির সপক্ষেও কোনো প্রমাণ হাজির করতে পারেননি।

যাহোক জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে স্বাধীনতাবিরোধীদেরকে ইতোপূর্বে আর কেউ এমন হোয়াইটওয়াশ করতে পারেননি। যা আজ দেখালেন জনাব ফজলুর রহমান। এটি নিজ চোখে দেখাটাও হৃদয়ের প্রশান্তি। ৬৮ জন জামায়াতের এমপির জন্য এমন একজন মুক্তিযোদ্ধাই যথেষ্ট।

এবারের সংসদ একেবারে যাকে বলে জাঁকজমকপূর্ণ ও জমজমাট হয়ে উঠেছে। এখানে ক্লিয়ারলি দুটি পক্ষ। মহান মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি এবং স্পষ্টভাবে স্বাধীনতাবিরোধী পক্ষ। আ. লীগের একপাক্ষিক সংসদে কোনো বিতর্ক বলে কিছু ছিল না। শুধু সংসদের বাইরে যারা থাকতেন তাদের নামে বিষোদগার হতো। আর হতো ব্যক্তিবন্দনাজাত কিছু উদ্ভট গানাবাজানা। কিন্তু এবারের সংসদে আমরা তুমুল তর্ক ও বিতর্ক দেখতে পাচ্ছি। সফল গণতান্ত্রিক রাজনীতির জন্য এটা অতি অবশ্যই জরুরি।

আজকের সংসদ বিতর্কে দুটি বিষয় খুব ভালো লেগেছে। ডা. শফিকুর রহমান যখন মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানকে আন্ডারমাইন করছিলেন -তখন তার পেছনে বসা এনসিপির তরুণ এমপি হাসনাত আব্দুল্লাহ টেবিল চাপড়ানো দূরের কথা একেবারে ভাবলেশহীন ছিলেন। তিনি জামায়াতের স্ট্যান্ডকে সমর্থন জানান নাই।

আজকে মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বড় পাওয়া সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও ট্রেজারি বেঞ্চের সংসদ সদস্যরা টেবিল চাপড়ে তাঁকে সমর্থন জানিয়েছেন। এবং ফাইনালি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) তাঁর বক্তব্যকে ওউন করে নিজেদের 'বিএনপি মিডিয়া সেল' পেজে প্রকাশ করেছে।

মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের পথ ধরে সংসদ সদস্য আন্দালিব রহমান পার্থও আজ জামায়াতকে এক হাত নিয়েছেন। লেখক ও যুক্তরাজ্যের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিলের একটা ঘটনা উল্লেখ করে বলেছেন, কেউ একজন তারে ড্রাংক বলছে পার্লামেন্টে, সেদিন সে ড্রাংক ছিলও। চার্চিল তারে উত্তর দিছেন -আমি কালকে সোবার হয়ে যাব, কিন্তু তুমি তো আগলি, তুমি সারা জীবনই আগলি থাকবা। 

পার্থ পরে বলছেন, আমরা এখন খারাপ, ভালো হয়ে যাইতে পারব। কিন্তু আপনারা (জামায়াত) সারাজীবন ওই কলংক বয়েই বেড়াবেন!

নারী-পুরুষ জাতি, ধর্ম, গোত্র ও বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের স্বাধীনতা ও ন্যায্য অধিকারে বিশ্বাসী মানবতাবাদী মানুষের অকুন্ঠ সমর্থন পাচ্ছেন মিস্টার ফজলুর রহমান -এটাই একজন বীরের সবচেয়ে বড় পাওনা। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযোদ্ধার প্রতি আমাদের প্রাণান্ত সমর্থন ও সংহতি।

লেখক: সাংবাদিক 
২৯ এপ্রিল ২০২৬

Comments

    Please login to post comment. Login