
২০ দিন পর…
কিছুটা হলেও নিজেকে সামলে নিয়েছে অরা । তাই আজ সে ভার্সিটি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে আগের সেই চঞ্চল, হাসিখুশি আরাকে আর খুঁজে পাওয়া যায় না,অস্বাভাবিকভাবে শান্ত হয়ে গেছে সে। এই ক’দিনে তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু রুপা কয়েকবার ওকে দেখতে এসেছিল। আজ অনেক দিন পর অরা ভার্সিটি যাবে বলে রুপাই তাকে নিতে এসেছে। দু’জন একসাথে ভার্সিটি যায়, ক্লাস করে। কিন্তু প্রয়োজন ছাড়া অরার মুখ থেকে একটা শব্দও বের হয় না। তার এই নীরবতা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না রুপা।ন্ধুদের মধ্যে অরাই ছিল সবচেয়ে প্রাণবন্ত… যেন পুরো গ্রুপের প্রাণ। আর সেই মেয়েটার এমন চুপ হয়ে যাওয়া,এটা রুপার কাছে একদমই সহ্য হচ্ছে না। পরিবেশটা একটু হালকা করার জন্য রুপা নিজেই কথা শুরু করে,
"কিরে তুই কি ক্যান্টিনে শুধু হাওয়া খেতে এসেছিস নাকি কিছু খাবার ও অর্ডার দিবি?"
অরা ধীরে, ক্লান্ত গলায় বলে, "আমার খুদা নেই,তুই যা খাবি অর্ডার দে।"
‘’বল্লেই হল খুদা নেই? তোর পেটে যে ছুঁচা দৌড়াচ্ছে তার আওয়াজ কিন্তু ঠিকই আমি পাচ্ছি।"
‘’শুরু হয়ে গেলো তোর আজগবি কথা?‘’
‘’ হ্যাঁ হ্যাঁ আমার কথা তো আজগবি লাগবেই! যখন আমি থাকবো না তখন বুঝবা কি ছিলাম আমি হুহ।‘’
কথাটা শুনে অরার চোখে পানি চলে আসে।
‘’এ মা তুই কাঁদছিস কেনো অরা?‘’ অরা কাঁদতে কাঁদতে অস্পষ্ট গলায় উত্তর দেয়, ‘’তুই চলে যাবি আমকে ছেড়ে? আম্মু,বাবা, ছটু সবাই আমকে ছেড়ে গেছে, আর এখন তুইও যাওয়ার কথা বলসিস?"
রুপা অরাকে জড়িয়ে ধরে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে,
‘’ধুর পা গলী আমি তো মজা করে বলেছি,আর এই কথা তো আমি সব সময়ই বলি।‘’
অরা রুপাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আর বলে, ‘’বলবি না আর ,আমি সহ্য করতে পারবো না আর হারানোর কষ্ট।‘’
‘’ ঠিক আছে বলব না। কিন্তু তোর তো এভাবে দুর্বল হয়ে পড়লে চলবে না।‘’
অরা শান্ত গলায় বলে, ‘’ আমি তো চাই সবটা মেনে নিতে কিন্তু কিন্তু এখনো রাতে আমার কানে বাজে , রাজরাণী আপু রাজরাণী আপু আমাকে গল্প শুনিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেওনা‘’ আমার ছটু-আমার ছটু তো অনেক ছোটো ছিল ওরে কেনো নিয়ে গেলো আল্লাহ্ এতো তাড়াতাড়ি বলনা রুপা বলনা?‘’
কথা গুলা বলেই অরা জোড়ে জোড়ে কান্না শুরু করে,অরার কান্নার শব্দে ক্যান্টিনের সবাই ঘুরে ঘুরে ওদের দেখতে লাগে।
‘’ অরা প্লিজ শান্ত হ। এভাবে কান্না করলে তো ওরা ফিরে আসবে না। তোকে এখন শক্ত হতে হবে।সবাই দেখছে অরা। ‘’
ভার্সিটি শেষ হলে আজ আয়ান অরাকে নিতে আসে।রুপাকে বিদায় জানিয়ে গাড়িতে উঠে বসল অরা। পাশে আয়ান শক্ত হাতে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরাচ্ছিল আর আড়চোখে বারবার অরার দিকে তাকাচ্ছিল, কিন্তু অরার নজর ছিল বাইরের দিকে।
“আইসক্রিম খাবো”হঠাৎ বলেই অরা আয়ানের দিকে ফিরে তাকাল, তারপর আবার বলল, “গাড়ি থামাও আয়ান ভাই, আইসক্রিম খাবো,গাড়ি থামাও!”
অরার আকস্মিক আবদারে আয়ান অবাক হয়ে গেল, তবে তার কথামতো রাস্তার পাশে গাড়ি ব্রেক করল।
“আইসক্রিম খাবি? ঠিক আছে, একটু ওয়েট কর, নিয়ে যাচ্চি রেস্টুরেন্ট।”
“না, আমি এখান থেকেই খাবো।”
“এখানে আইসক্রিম কোথায়?”
অরা হাতের আঙুল দিয়ে ইশারা করে বলল, “ওই তো, ওইখান থেকে!”
আয়ান অরার দেখানো দিকে তাকিয়ে দেখল একটা ছোট আইসক্রিমের দোকান। অন্য সময় হলে আয়ান কখনোই অরাকে এমন লোকাল জায়গা থেকে আইসক্রিম খেতে দিত না। কিন্তু আজ ২০ দিন পর অরা কিছু চাইলো,তা কি সে না করতে পারে? অগত্যা রাজি হয়ে গেল।
‘’ঠিক আছে, তুই গাড়িতেই বস, আমি নিয়ে আসছি।”
“ঠিক আছে।”
কিছুক্ষণ পর আয়ান দুইটা আইসক্রিম নিয়ে ফিরে এলো।
“নে, তোর আইসক্রিম।”
“দুটো কেন?”
“তোর তো চকলেট আর স্ট্রবেরি এই দুইটাই ফেভারিট, তাই দুটোই নিয়ে আসলাম।” “থ্যাংক ইউ সো মাচ আয়ান ভাইইই!” খুশি মনে বলল অরা।
বিনিময়ে আয়ান কিছু বলল না,গাড়ি স্টার্ট দিল,উদ্দেশ্য বাড়ি।কিছুক্ষণ পর অরা আবার বলল,
“আয়ান ভাই, একটা কথা বলবো?”
“হুম, বল।”
অরা একটু কাঁচুমাচু মুখ করে বলল, “আয়ান ভাই… আমি ফুচকা খাবো।”
কথাটা শুনে আয়ান একবার আড়চোখে অরার দিকে তাকালো, তারপর সামনে তাকিয়ে উত্তর দিল,
“না।”
“প্লিজ আয়ান ভাই, একটু খাবো… বেশি না… প্লিজ প্লিজ! রাজি হয়ে যাও না…” মুখটা একদম বাচ্চাদের মতো করে আবদার করতে লাগল অরা।
যদিও রাস্তার পাশের খাবার আয়ানের একদম পছন্দ না, আর তার সাথে বের হলে অরার এসব খাওয়ার ভাগ্য কখনোই হয়নি,তবুও আজ সে না করতে পারল না। মুখে কিছু না বলে গাড়ি নিয়ে ফুচকার দোকানের সামনে ব্রেক করল।
“নাম।”
হঠাৎ কথাটা শুনে অরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ফুচকার দোকান দেখে তাড়াহুড়া করে সিটবেল্ট খুলতে লাগল।ওর এমন তাড়াহুড়া দেখে আয়ান বলল, “আস্তে নামবি তো!”
আয়ান অর্ডার দিল দুই প্লেট ঝাল ছাড়া ফুচকা। অরা একদম ঝাল খেতে পারে না, আর একবারে দুই প্লেট না হলে তার চলে না।
“ঝাল যে আমি খেতে পারি না তা তুমি জানো, মানলাম, কিন্তু দুই প্লেট খাই কেমনে জানলা, হুহ?‘’ দুভ্রু কুঁচ্কে কোমরে দুহাত দিয়ে জিজ্ঞেস করলো আর।
“তোর বিষয়ে এমন কোনো কথা নেই যা আমার অজানা, রাজরানী।”বলতে বলতে হাতের আঙুল দিয়ে অরার নাকের ডগায় ছোট্ট করে টোকা দিলো।
এভাবে মামার জন্যে একটু রাগ হলে পরক্ষনে অরা “রাজরানী” শব্দটা শুনে লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল। যদিও ছোটবেলা থেকেই আয়ান তাকে এই নামে ডাকে, কিন্তু এখন কেন যেন এই নামটা শুনলেই অন্যরকম একটা অনুভূতি হয়,একটা নামহীন অনুভূতি।
বিকাল ৫টার দিকে আয়ান আর অরা একসাথে বাড়ি ফিরল। বসার ঘরে ঢুকেই অরা দৌড়ে গিয়ে মিসেস জয়াকে জড়িয়ে ধরল। অরার এমন আচরণে মিসেস জয়া হতবাক হয়ে গেলেন। কারণ গত ২০ দিন ধরে যে মেয়ে দরকার ছাড়া একটা কথাও বলেনি, সেই মেয়েই আজ হঠাৎ এমন করছে!
“কী ব্যাপার? আজ মনে হচ্ছে আমার মায়ের মন ভালো আছে?”
“হ্যাঁ বড় আম্মু! আজ আমি একটা অসাধ্য সাধন করেছি!”
“ওমা তাই নাকি? কী এমন করেছো শুনি?”
“আজ আয়ান ভাই আমাকে ফুচকা খাইয়েছে, বড় আম্মু!”
এ কথা শুনে মিসেস জয়া আয়ানের দিকে আড়চোখে তাকালেন। কারণ তিনি যানেন তার ছেলে এসব খাবার একদম পছন্দ করে না।মাকে এভাবে তাকাতে দেখে আয়ান ঘাড় চুলকাতে চুলকাতে বলল,
“এভাবে দেখার কী আছে? ও এমন বাচ্চাদের মতো করছিল, না দিয়ে পারিনি।”
এই বলে আয়ান সিঁড়ি দিয়ে উপরে যেতে যেতে বলল,
“আমার রুমে কফি দিয়ে যেও।”
আয়ানকে এভাবে পালিয়ে যেতে দেখে মিসেস জয়া আর অরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে ফেলল।
“ছাড় এসব, এখন কী খাবি?”
“হুমম… আমি যা চাইবো তাই খাওয়াবা?”
“তা নয়তো কী? আমার মা এতদিন পর কিছু চেয়েছে আর আমি দেবো না?”
“ঠিক আছে, তাহলে তোমার স্পেশাল চিকেন পাস্তা করে দাও।”
“আচ্ছা। তুই আয়ানের কফিটা ওর রুমে দিয়ে এসে রেস্ট কর। আমি এক্ষুনি বানিয়ে দিচ্ছি।”
আয়ানের রুমে কফি দেওয়ার কথা শুনে মনে মনে খুশি হয়ে গেল অরা।
“আচ্ছা বড় আম্মু।”
আয়ানের রুমের সামনে এসে একটু থেমে গেল অরা। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধুকপুক করছে। কেন করছে,সে নিজেও ঠিক বুঝতে পারছে না। দরজায় হালকা নক করতেই ভেতর থেকে আয়ানের গলা শোনা গেল,
“Come in.”
রজা খুলে ভেতরে ঢুকল অরা। আয়ান ল্যাপটপে কিছু একটা কাজ করছিল, তবে অরাকে ঢুকতে দেখে চোখ তুলে তাকাল।
“কফিটা রাখ।”
অরা ধীরে ধীরে টেবিলের ওপর কফির কাপটা রেখে ফিরে যেতে নিল। ঠিক তখনই পিছন থেকে আয়ান বলল,
“এই যে, রাজরানী।”