
আকাশের মুখ ভার। বিকেলের রেশ কাটতে না কাটতেই মেঘের ঘনঘটায় চরাচর জুড়ে এক অকাল সন্ধ্যার নিবিড় ছায়া নেমে এসেছে। মেঘের দল যেন কোনো এক প্রাচীন অভিমান বুকে নিয়ে আকাশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে চলেছে; তাদের গায়ের রঙে কোথাও কালচে বেগুনি, কোথাও বা গাঢ় স্লেট পাথরের আভা। চাতক পাখির মতো তৃষ্ণার্ত প্রকৃতি যেন এই গম্ভীর সমারোহের মাঝে এক মহাপ্রলয়ের অপেক্ষা করছে।
বাতাসে হঠাতই একটা সোঁদা মাটির ঘ্রাণ মিশে গেল,যাকে বলা হয় বৃষ্টির পূর্বাভাস। কদম আর হাসনাহেনার গন্ধে ভারী হয়ে আসা সেই বাতাস জানলার পর্দাগুলোকে অস্থির করে তুলছে। দূরে কোথাও একটা একলা ডাহুক ডেকে উঠল, যেন বিরহের সুর তার কণ্ঠে দানা বেঁধেছে।
বাইরে তখন মেঘের ঘনঘটা, আর ঘরের ভেতর এক অদ্ভুত স্তব্ধতা। ঠিক সেই মুহূর্তে জানলার কপাট দুটো সজোরে আছড়ে পড়ল আর এক ঝলক পাগল করা দমকা হাওয়া হুড়মুড় করে ঘরে ঢুকে এল।
সেই অবাধ্য বাতাস যেন ঝড়ের বেগে ধেয়ে এসে সরাসরি অরার গায়ে আছড়ে পড়ল।বাতাসের তীব্র ঝাপটায় ওর অবিন্যস্ত একরাশ চুল চোখের ওপর এসে অবাধ্যতায় নাচতে শুরু করল। গায়ের ওড়নাটা প্রজাপতির ডানার মতো চঞ্চল হয়ে লুটিয়ে পড়তে চাইল কাঁধ থেকে। আকস্মিক সেই শীতল স্পর্শে অরার সারা শরীরে এক অদ্ভুত শিহরণ খেলে গেল; ও অজান্তেই দুহাতে নিজের বাহু জড়িয়ে ধরল।
পিছন থেকে আয়ান ধীর কদমে অরার সামনে এসে দাঁড়ালো।আয়ান এক হাত পকেটে রেখে অন্য হাত দিয়ে অরার অবিন্যস্ত একগুচ্ছ চুল কানের পিছে গুঁজে দিতে দিতে বলল,
‘’ভিতরে গিয়ে বস,আমি জানালা লাগিয়ে দিয়ে আসছি।‘’
প্রত্যুত্তরে অরা কিছু বলল না আর নাতো আয়ান তা শোনার জন্যে অপেক্ষা করলো।নিজের কাজ শেষ করে আয়ান জানালার দিকে এগিয়ে গেলো। আয়ানের প্রস্থানের পর অরাও গিয়ে বিছানার এক সাইডে বসলো।
‘’তোকে আজ আগের মতো লাগছিল অরা!" পাশ থেকে চেয়ার টেনে অরার মুখোমুখি বসতে বসতে কথাটি বলল আয়ান।
“চিন্তা করো না আয়ান ভাই, আমি আবার আগের মতো হয়ে যাবো। জানো আয়ান ভাই আমার বাবা একদম আমার মন খা রা প বা আমার চোখে পানি সহ্য করতে পারতো না। তুমি তো জানোই তুমি বা আম্মু আমাকে ব কলে আব্বু তোমাদের উপর কত রা গ করতো। আর এখন যদি আব্বু দেখে আমি সব সময় মন খা রা প করে থাকি তাহলে তো আব্বু কষ্ট পাবে তাইনা বলো? আর বড় আম্মু, বড় আব্বু আছে তো আমাকে ভালোবেসে আগলে রাখার জন্যে। তাই আমি ঠিক করেছি এখন থেকে সব সময় হাসি খুসি থাকবো আর আমার বাবা মায়ের সব স্বপ্ন পুড়ন করবো।‘’কথা গুলা শেষ করে ছোট্ট করে মিষ্টি একটা মন ভোলানো হাসি দিলো অরা।
"আর আমি?"—গলাটা খানিকটা ধরে এল আয়ানের। ধরা গলায় সে অরাকে প্রশ্নটা করল।
এই প্রশ্নের উত্তর অরার জানা নেই, কিংবা হয়তো উত্তরটা দিতে মন সায় দিচ্ছে না। তাই খানিকটা ইতস্তত বোধ করে এদিক-ওদিক তাকিয়ে চোখ সরাল সে। এলোমেলো নজর ঘুরিয়ে প্রসঙ্গ পাল্টাতে অরা জিজ্ঞেস করল, "আর কিছু বলবে আয়ান ভাই?"
অরার কণ্ঠস্বরেই যেন সংবিৎ ফিরল আয়ানের। এতক্ষণ ধরে একধ্যানে অরার কথাগুলোই শুনছিল সে। কেনোনা দেশের বাইরে থেকে আসার পর এই প্রথমবার অরা তার সঙ্গে এতগুলো কথা মন খুলে বলেছে।
"কী হলো ভাই? বলবে?" অরার কণ্ঠে এবার কিছুটা তাড়া।
আয়ান নিজেকে সামলে নিল।
"উমম... হ্যাঁ, বলব। তুই কাল সন্ধ্যায় রেডি থাকিস, আমি তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাব। কথাটা আজই বলে রাখছি কারণ আমাকে এখনই অফিসের একটা কাজে বের হতে হবে। আজ আর বাসায় ফিরব না, কাল সোজা তোকে নিতে আসব।"
অরার চোখে কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলো,
"কোথায় নিয়ে যাবে আয়ান ভাই?"
"সেটা কাল গেলেই দেখতে পাবি। এখন যা, খেয়ে নিয়ে বিশ্রাম কর।"
মনের গহীন কোণে এক অস্পষ্ট কৌতূহল নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল অরা। আর আয়ান অপলক দৃষ্টিতে অরার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল।
( অরাকে ভার্সিটি থেকে আনতে যাওয়ার আগের ঘটনা )
নিভৃত দুপুরে মিসেস জয়া ঘরে বসে পারিবারিক ছবির অ্যালবাম দেখছিলেন। পাতায় পাতায় হাত বুলিয়ে তিনি যেন ফিরে যাচ্ছিলেন সেই সুখের মুহূর্তগুলোতে। পরিবারের রঙিন স্মৃতিচারণে তিনি যখন মগ্ন, ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
"মা, আসব?"
মিসেস জয়া মুখ তুলে চাইলেন,
"আয়ান! হ্যাঁ বাবা, আয় ভেতরে আয়।"
আয়ান ঘরে ঢুকে ধীর পায়ে মায়ের কাছে এগিয়ে এল।
"মা, তোমাকে একটা কথা বলার ছিল।"
ছেলের দিকে স্নেহভরা চোখে তাকিয়ে মা বললেন,
"শুনব বাবা। তার আগে মায়ের পাশে এসে একটু বস তো দেখি।"
আয়ান মায়ের পাশে গিয়ে বসল। মিসেস জয়া ওর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
"তোর কথা তো শুনবই, তবে আমারও তোকে একটা কথা বলার ছিল।"
"আচ্ছা মা, তাহলে তুমিই আগে বলো।"
মিসেস জয়া একটু ইতস্তত করে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
"দেখ বাবা, কথাটা তুই কীভাবে নিবি জানি না। কিন্তু আমি আর তোর বাবা চাই তুই অরাকে বিয়ে কর। মেয়েটার জন্য আমার বড্ড ক ষ্ট হয় রে। অকালে সব হা রি য়ে বড় একা হয়ে গেল ও।"
মায়ের প্রস্তাব শুনে আয়ান ঠোঁটের কোণে একটা রহস্যময় বাঁকা হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু সে কিছু বলল না। অয়নকে চুপ থাকতে দেখে মা কিছুটা চিন্তিত হয়ে পড়লেন।
"কীরে, চুপ করে আছিস কেন? তোর যদি অন্য কাউকে পছন্দ থাকে তবে বল, আমরা তোকে জোর করব না।"
আয়ান এবার মুখ খুলল। শান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বলল, "না মা, আমার অন্য কাউকে পছন্দ না। আমার শুধু রাজরাণীকেই পছন্দ। সামনের শুক্রবার বিয়ের তারিখ রাখো, তোমরা ব্যবস্থা শুরু করো।"
মায়ের চোখ যেন বিস্ময়ে ছানাবড়া হয়ে গেল। "তার মানে? তুই ওকে আগে থেকেই পছন্দ করিস?"
মুহূর্তকাল স্তব্ধ হয়ে রইল আয়ান। তার গম্ভীর মুখে কোনো দ্বিধা বা সংকোচ ফুটে উঠল না, বরং এক ধরনের শান্ত তৃপ্তি ছড়িয়ে বলল, "শুধু পছন্দ করি না মা, ও আমার ভালোবাসা। ১৫ বছরের ভালোবাসা রাজরাণী আমার!"
মিসেস জয়া যেন নিজের কানকেও বিশ্বাস করতে পারছিলেন না।
"বলিস কী! এই কথা তুই আমাকে আগে কেন বলিসনি?"
"সঠিক সময়ের অপেক্ষা করছিলাম মা। এখন আমি রাজরাণীকে আনতে যাচ্ছি, তবে তুমি ওকে আগেভাগে কিছু জানিও না। আমি নিজেই ওকে সব জানাব।"
কথা গুলা বলেই আয়ান চলে যেতে নিলে মিসেস জয়া বললেন,
‘’কিন্তু তুই যেন কি বলতে এসেছিলি বলবি না?‘’
‘’না মা কথাটা বলার প্রয়োজন ফুরিয়েছে।
একটু সময় নিয়ে আয়ান আবার বলল, একটা কথা শুনে রাখো মা,আজ থেকে এবাড়িতে যেন রাজরাণীর মা,বাবা বা ভাইকে নিয়ে কোনো কথা না হয় ইনফ্যান্ট আমাদের ছেঁড়ে যাওয়া কোনো বাক্তিকে নিয়ে যেন কোনো কথা না হয়।এসব কথা শুনলে আমার রাজরাণী কষ্ট পাবে আর ওর কষ্ট আমার সহ্য হয় না, মা।‘’
কথা গুলা বলেই আয়ান বেড়িয়ে যাই।
মিসেস জয়া ছেলের যাওয়ার পানে তাকিয়ে থাকেন অবাক দৃৃষ্টিতে , আজ যেন তিনি এক অন্য আয়ান কে দেখলেন। যে আয়ান কখনো নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতো না হোক সেটা কোনো ব্য থা বা সুখের আজ সে নির্বিঘ্নে নিজের ভালবাসার কথা জানিয়ে দিলো।তবে মিসেস জয়া এতে খুশিই হলেন।
বর্তমান
সন্ধ্যার পর একা একা বারান্দায় দাঁড়াতে একসময় বুক কাঁপত অরার। গাঢ় অন্ধকার তার কাছে ছিল য মের মতো; সেই নিকষ কালো আঁধারে সে যেন অ শুভ কিছু দেখতে পেত। কিন্তু জীবন আজ তাকে এমন এক মোহনায় দাঁড় করিয়েছে, যেখানে সেই পুরনো ভ য়গুলো সব ফিকে হয়ে গেছে। আজ প্রিয়জনদের হা রিয়ে এই নিস্তব্ধ অন্ধকারই যেন তার সবচেয়ে কাছের বন্ধু, সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
আকাশে মেঘ জমেছে। ইলশেগুঁড়ি বৃষ্টিতে ভিজে উঠছে চরাচর। বারান্দার ইজিচেয়ারে হেলান দিয়ে বসে অরা আজ স্মৃতি রোমন্থন করছে। আজ বড্ড বেশি মনে পড়ছে সাইফ আর আরশির কথা। তার চেয়ে দুই বছরের ছোট ছিল সাইফ, আর আরশি ছিল চার বছরের ছোট। চঞ্চলতা আর প্রাণশক্তিতে ওরা ছিল শেখ বাড়ির প্রাণভোমরা। সারা বাড়ি মাথায় করে রাখত তিন ভাইবোন। হাসি, আড্ডা আর খুনসুটিতে দিনের চাকা কখন ঘুরে যেত, কেউ টেরও পেত না।
সেই সাজানো বাগানটা একটা আ গুনের ঝ ড়ে মুহূর্তেই ছার খার হয়ে গেল। সুখের সেই রঙিন দিনগুলো এখন কেবল ধোঁয়াটে দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু আশ্চর্য বিষয় হলো, আজ অরার মন খা রাপ হলো না। বিষণ্ণতা তাকে গ্রাস করলেও চোখের কোণে জল জমল না। কান্নার চেয়ে বড় কোনো এক হাহাকার আজ তাকে পাথর করে দিয়েছে।
বৃষ্টির ঝাপটা এসে লাগছে অরার গায়ে, কিন্তু সে নড়ল না। ভেজা বাতাসের ঝাপটায় সে যেন ফিরে যেতে চাইছে সেই পুরনো দিনে। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটার শব্দের মাঝে সে যেন শুনতে পাচ্ছে সাইফের অট্টহাসি আর আরশির মিষ্টি সেই ডাক। পুরনো স্মৃতির অতল গহ্বরে ডুব দিয়ে অরা আজ নিজেকে নতুন করে খুঁজে ফিরছে। বাইরের অন্ধকার আর মনের ভেতরের শূন্যতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে, আর সেই একাকীত্বেই অরা আজ খুঁজে পেয়েছে এক অদ্ভুত শান্তি।
অরা নিজেকে ছেড়ে দিল স্মৃতির স্রোতে।অতীতের সেই আনন্দ আর বি ষাদের গল্পগুলো একে একে তার ভাবনায় দানা বাঁধতে শুরু করল।