( ফ্ল্যাশব্যাক )
দিনটি ছিল রবিবার। দুপুরের পর থেকেই আকাশের মুখ ভার, মেঘরাজের তা ণ্ড বে চারপাশটা যেন কিছুটা আগেভাগেই অ ন্ধকার হয়ে এসেছে। অরা আজ কলেজে যায়নি। সামনেই ওর এইচএসসি পরীক্ষা, তাই এখন সে বাসায় বসেই পড়াশোনায় মন দিচ্ছে।। কিন্তু জানালার ওপাশে মেঘের ঘনঘটা দেখে ওর মনটা আর বইয়ের পাতায় স্থির থাকল না।
অরাদের দোতলা ডুপ্লেক্স বাড়িটার সামনে এক টুকরো স্বর্গের মতো ফুলের বাগান। প্রধান ফটক থেকে বাড়ির মূল দরজা পর্যন্ত চলে গেছে সরু একটি পথ, যার একপাশে ফুটে আছে চন্দ্রমল্লিকা আর কামিনী আর অন্যপাশে সবুজ ঘাস, এই জায়গাটা বরাদ্দ করা হয়েছে বারবিকিউ পার্টি এবং বাড়ির ছোটো সদস্যদের খেলা করার জন্যে, সেই সাথে উঠান এর এইদিকটাই জায়গা করে নিয়েছে একটি দোলনা।
হালকা বৃষ্টি পড়তে শুরু হলেই অরা ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা সেইে দোলনার দিকটাই এসে দাঁড়াল।কিছুক্ষণের মধ্যেই আকাশ ভে ঙে ঝুম বৃষ্টি নামল।অরার সবচেয়ে প্রিয় এই বৃষ্টি। অরা দুহাত মেলে আকাশপানে মুখ তুলে দাঁড়াল। বৃষ্টির বড় বড় ফোঁটাগুলো যখন ওর মুখে আছড়ে পড়ছিল, তখন ও সব ভুলে আপনমনে নাচতে শুরু করল। ঘাস আর ফুলের ঝোপের মাঝে ও যখন এলোমেলো পায়ে ঘুরছিল, তখন ওর ভেজা চুলের ছাঁট আর হাসিতে এক অদ্ভুত স্নিগ্ধতা খেলে যাচ্ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই মেইন গেট খুলে ভেতরে প্রবেশ করল একটি কালো গাড়ি। অরা তখন বৃষ্টির শব্দে এতটাই মশগুল যে গাড়ির চাকার আওয়াজ ওর কান অবধি পৌঁছাল না। গাড়িটি বাগানের পথের একপাশে এসে থামলো। গাড়ির জানালা নামিয়ে একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখ আটকে গেলো বৃষ্টিতে মগ্ন এক মানবীর উপর।
আফ্রিদি শেখ আয়ান, শেখ পরিবারের বড় ছেলে। নয় বছর আগে যখন সে দেশ ছেড়েছিল, তখন বাড়ির সবার মনেই ছিল একরাশ প্রশ্ন আর না বলা বি ষাদ। এক অজানা অভিমানে কিংবা হয়তো নিজের কোনো গোপন জে দ মেটাতে সে পাড়ি জমিয়েছিল সুদূর কানাডায়। দীর্ঘ নয় বছর সে মাটির টান থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে রেখেছিল, কিন্তু আজ কাউকে কিছু না জানিয়ে আকস্মিক ভাবে ফিরে এসেছে সে।
আয়ানের অবয়বে এখন এক পরিপক্ব আভিজাত্যের ছাপ। ১৮ বছর বয়স এ দেশ ছেঁড়েছিল আয়ান আর এখন ২৭ বছর বয়সী তোগরা যুবক সে ।তার গায়ের রঙ উজ্জ্বল শ্যামলা। ছয় ফুট উচ্চতার এক দীর্ঘদেহী পুরুষ সে,নিয়মিত শরীরচর্চায় তার দেহটি হয়েছে সুঠাম ও সুগঠিত। তার চেহারার সবচেয়ে আকর্ষণীয় অংশ হলো তার হালকা চাপ দাড়ি, যা তার গম্ভীর ব্যক্তিত্বকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দেয়।
কিছুক্ষণ বৃষ্ট্রিতে এলোমেলো নাচে মগ্ন অরাকে পরোখ করে গাড়ির দরোজা খুলল আয়ান। গাড়ির দরজাটা খুলতেই বাতাসের ঝাপ টার সাথে বৃষ্টির কয়েক ফোঁটা জল আয়ানের মুখে এসে লাগল। সে যখন ধীরপায়ে গাড়ি থেকে বাইরে বের হয়ে সোজা হয়ে দাঁড়াল, মুহূর্তেই ঝমঝমে বৃষ্টি তাকে ভিজিয়ে দিতে শুরু করল। আয়ানের ছয় ফুট দীর্ঘ সুঠাম দেহটি বৃষ্টির তোড়ে যেন আরও বেশি ব্যক্তিত্বদীপ্ত হয়ে উঠল। কিন্তু আয়ান এর নজর শুধু মাত্র অরার দিকে।
অরা হঠাৎ অনুভব করল কেউ একজন তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। বৃষ্টির শব্দের মাঝেও একটি শক্তিশালী উপস্থিতির অস্তিত্ব সে টের পাওয়ায় ধীর পায়ে ঘুরল। কয়েক কদম দূরেই বৃষ্টির তোড়ে ভিজে একাকার হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা দীর্ঘদেহী পুরুষটিকে দেখে অরার নাচের তাল থমকে গেল।
এতোগুলা বছর পর আয়ান কে এভাবে সামনে দেখে যেন অরা বিস্ময়ে হতবাক।অরার মনে হলো সময় যেন থমকে দাঁড়িয়েছে। বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা এখন তার কানে ড্রামের মতো বাজছে।
অরাকে এভাবে স্থির ভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আয়ান ধীরে ধীরে এগোতে লাগলো। আয়ানকে এগোতে দেখে অরা নিজের অজান্তেই কয়েক কদম পিছিয়ে গেলে,পেছোত পেছোতেে অরার পিঠ গিয়ে ঠেকল দোলনার স্ট্যান্ড এর সাথে।
সামনের দিকে তাকাতেই দেখল আয়ান একদম ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে।আয়ানের সুঠাম দেহের ছায়ায় অরা যেন পুরোপুরি ঢাকা পড়ে গেছে। বৃষ্টির তীব্রতা যেন আরও বেড়ে গেল। ঝমঝম শব্দে চারপাশটা এক মায়াবী অন্ধকারে ঢেকে গেছে, যার মাঝে শুধু আয়ানের ওই তীক্ষ্ণ চোখের দৃষ্টিটা প্রখর হয়ে ধরা দিচ্ছে।
আয়ান এর শরীর থেকে আসা পারফিউম এর ঝাঁঝালো ঘ্রাণ অরার নাসারন্ধ্রে প্রবেস করতে লাগল।
পারফিউম এর ঘ্রাণ নাকে যেতে অরার ধ্যান ভাঙলো। সঙ্গে সঙ্গে অরা মাথা নিচু করে ফেললো। অরা মাথা নিচু করতেই, নাটকীয় ভঙ্গিতে আয়ান তার গ্রীবা নামিয়ে অরার মুখোমুখি হয়ে হাস্কি স্বরে বলল,
‘’পুড়ানো অভ্যাস তাহলে বদলেনি?‘’
অরা এবার আয়ানের চোখের দিকে তাকাল আর বলল,
‘’মানে?‘’
‘’মানে! আমার ক্ষেত্রেও নিশ্চয় অভ্যাস গুলা একই থাকবে?‘’
আয়ানের এবারের কথা ও অরার বোধগোম্ম হোল না।অরা ফের কিছু বলতে নিল কিন্তু তা আর সম্ভব হল না।তার আগেই মিসেস জয়া বেগম এর ডাক শোনা গেলো।মায়ের ডাক শুনতেই আয়ান অরা থেকে কিছুটা দূরত্ব বাড়িয়ে দাঁড়ালো।
আয়ান দূরে সড়তেই অরা ছুটে বাড়ির ভিতর চলে গেলো।
পথের মধ্যে অরাকে এভাবে ছুটে আসতে দেখে মিসেস জয়া হকচকিয়ে গিয়ে সামনের দিকে তাকালেন।
সামনে তাকাতেই,দৃশ্যটা যেন মুহূর্তেই থমকে গেল। এতগুলো বছর পর নিজের ছেলেকে সামনে দেখে তিনি নিথর হয়ে গেলেন, চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠল।
"আয়ান? বাবা... তুই?" বলেই তিনি আর নিজেকে সামলাতে পারলেন না, ছেলের কাছে ছুটে যাওয়ার জন্য উদ্গ্রীব হয়ে উঠলেন। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই আয়ান হাত বাড়িয়ে তাঁকে থামিয়ে দিল।
“না মা… বৃষ্টির মধ্যে বের হয়ো না,আমি আসছি।আয়ান নরম, তবুও দৃঢ় স্বরে বলল।
আয়ান এগিয়ে এসে বাড়ির চৌকাঠে দাঁড়াতেই মিসেস জয়া বেগম ভেজা অবস্থাতেই তাকে জড়িয়ে ধরলেন। আয়ানও নিঃশব্দে মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিল। মিসেস জয়া বেগম আয়ানের হাত শক্ত করে ধরে ঘরের ভেতরে ঢুকতে ঢুকতে উচ্ছ্বাসে ডাকতে লাগলেন, ‘’ আম্মা...আম্মা,ও মেজো! ও ছোট! কই তোরা? তাড়াতাড়ি নিচে আয়!”
মিসেস জয়ার এমন ডাকে চিন্তিত মুখে রুম থেকে বের হয়ে এলেন দুই জা। সবার চোখেই তখন অজানা এক উৎকণ্ঠা।
সেই সাথে ধীরে ধীরে এগিয়ে এলেন মিসেস আছিয়া, আয়ানের দাদি।বয়সের ভারে একটু ধীর হলেও তাঁর চোখে ছিল তীক্ষ্ণ কৌতূহল আর অভিজ্ঞতার শান্ত দৃষ্টি।
সবাই একসাথে নিচে এসে দাঁড়াতেই তাদের দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল এক জায়গায়,চৌকাঠের কাছে ভেজা অবস্থায় দাঁড়িয়ে থাকা আয়ানের দিকে।
বাড়িতে এখন এ কজন ব্যতিত আর কেউ নেই।সাইফ আর আরসি গেছে স্কুলে আর বাড়ির তিন কর্তা গেছেন অফিস।
মুহূর্তেই সকলের উৎকণ্ঠা রূপ নিল খুশির আমেজে। আয়ান বসার ঘরে এসে তার দাদি মিসেস আছিয়া বেগমসহ মেজো আম্মু ও ছোটো আম্মুকে সালাম করল। সালামের পর্ব শেষ হতেই মিসেস মায়া বেগম ও মিসেস সুফিয়া বেগম একসাথে এগিয়ে এসে আয়ানকে জড়িয়ে ধরলেন। মিসেস মায়া বেগম চোখে হাসি আর অভিমানের মিশ্র স্বরে বললেন,
“এতদিন পর মনে হলো বাড়ি আসার কথা?”
মিসেস সুফিয়া বেগম একটু কপাল কুঁচকে বললেন,
“কিন্তু এভাবে হুট করে চলে এলি যে? কাউকে কিছু না বলে?”
আর পাশে দাঁড়িয়ে মিসেস জয়া বেগম হালকা অভিমান মেশানো হাসিতে যোগ করলেন,
“আমাদের আগে জানাতে তো পারতি… তোর পছন্দের সব রান্না করতে পারতাম!”
সবার কৌতূহল মেটাতে আয়ান এবার মুখ খুলল। “আরে বাবা, একেক করে প্রশ্ন করবে তো! আসলে আমি তোমাদের সারপ্রাইজ দিতে চেয়েছিলাম, তাই কিছু বলিনি।”
আয়ানের কথা শেষ হতেই মিসেস আছিয়া বেগম গম্ভীর স্বরে বললেন,
“বউমারা, বলো তো তোমাদের কি বোধবুদ্ধি সব লোপ পেয়েছে? দেখছ না ছেলেটা ভিজে গায়ে দাঁড়িয়ে আছে!”
এরপর তিনি আয়ানের দিকে তাকিয়ে কোমল স্বরে বললেন,
“যাও দাদুভাই, রুমে গিয়ে পোশাক বদলে নাও। বেশিক্ষণ ভেজা কাপড়ে থাকলে ঠান্ডা লেগে যাবে।”
মিসেস জয়া : ‘’সত্যিই তো একদম মাথা থেকে বের হয়ে গেছে আম্মা। আয়ান বাবা, বলছিলাম কি-তুই আজ একটু কষ্ট করে আমার ওয়াশরুমটা ইউজ কর। পাঁচ দিন হলো তোর রুমটা পরিষ্কার করা হয়নি। আমি ততক্ষণে পরিষ্কার করে দিচ্ছি।”
আয়ান শান্ত কন্ঠে বলল,
"ঠিক আছে মা, এত ব্যস্ত হতে হবে না। আমার কোনো সমস্যা নেই।"
কথাটা বলেই আয়ান মায়ের রুমের দিকে গেল। মিসেস জয়া তাঁর দুই জা-সহ ছেলের খাবারের ব্যবস্থা করতে গেলেন আর মিসেস আছিয়া বেগম বসার ঘরের সোফাতে বসলেন।
রুমের দরজাটা আটকে অরা হাঁপাতে শুরু করল। ওর হৃৎস্পন্দন যেন স্বাভাবিকের চেয়ে তিন গুণ বেড়ে গেছে। কিছুক্ষণ আগে সে কাকে দেখল, কী ঘটে গেল-এই মুহূর্তের ঘোরটা ওর ছোট্ট মস্তিষ্ক কিছুতেই যেন ধরতে পারছে না। অরা নিজেকেই নিজে শান্ত করার চেষ্টা করল,
"শান্ত হ অরা, শান্ত হ। কিছুই হয়নি। শুধু আয়ান ভাইয়া ফিরে এসেছে। তুই যে কতটা অবাক হয়েছিস তা আমি বুঝতে পারছি,বাট ইট'স ওকে।‘’
নিজের অ বাধ্য মনকে শাসন করার চেষ্টা করল অরা। কিন্তু বুক ধড় ফড়ানি যেন কিছুতেই থামছে না, বরং অস্থি রতা আরও বেড়ে চলেছে। সে এক হাত বুকের ওপর রেখে নিজেকেই শা'সাল-"উফ! আয়ান ভাইয়া ফিরেছে তো তাতে আমার এত অস্থির হওয়ার কী আছে? বরং আমার তো এখন আরও কঠিন হওয়া উচিত। আমি না ওনার ওপর প্রচণ্ড রেগে আছি? হুহ, এত সহজে গলে গেলে চলবে না!"
অরার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই ৯বছর আগের বিভী'ষিকাময় দিনগুলো। হুট করে একদিন আয়ান কাউকে কিছু না জানিয়ে কানাডা পাড়ি জমিয়েছিল। অরা তখন মাত্র নয় বছরের ছোট্ট এক বালিকা। আয়ান ভাইয়ার সাথে ওর সম্পর্কটা ছিল ভীষণ গভীর, আয়ান ভাইয়া ছাড়া অরা যেন কিছুই বুঝত না। সেই প্রিয় মানুষটা কোনো কথা না বলে, কোনো বিদায় না জানিয়ে এমনভাবে হারিয়ে যাবে, এটা অরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেনি। অভিমান আর শোকে খাওয়া-দাওয়া ছেড়ে দিয়ে একসময় অরা অ'সুস্থ হয়ে পড়েছিল, এমনকি তাকে হাসপাতালেও ভর্তি করতে হয়েছিল।
অতীতের সেই খামখেয়ালি আর পা'গলামির কথা ভেবে অরার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিষণ্ণ হাসি ফুটে উঠল। কিন্তু পরমুহূর্তেই তার মুখটা পাথরের মতো শক্ত হয়ে গেল। শূন্য দৃষ্টিতে জানালার দিকে তাকিয়ে সে গুমরে ওঠা গলায় বলল, "তুমি তো সব জানতে আয়ান ভাইয়া। তুমি জানত আমাকে খাওয়াতে বসলে তোমার পাশে থাকা লাগত, তুমি না থাকলে আমার ঘুম আসত না। সব জেনেও তুমি আমাকে এভাবে ফেলে চলে গেলে? একবারও মনে হলো না তোমার এই ছোট্ট বোনটা তোমাকে ছাড়া কীভাবে থাকবে? যাওয়ার আগে আমাকে একটা কথা বলার প্রয়োজনও মনে করলে না! শুধু বড় আম্মুকেই সব জানিয়ে গেলে... কেন? আমি কি তোমার জীবনে এতটাই মূল্যহীন ছিলাম?"
সে নিজের মনেই প্রতিজ্ঞা করল, "না, এবার আর আগের মতো হবে না। তুমি এসেছ বলেই আমি সব ভুলে তোমার পেছনে ছুটব, সেই দিন শেষ। আমি তোমার সাথে একটা কথাও বলব না আয়ান ভাইয়া। তুমি যেভাবে আমাকে গুরুত্বহীন মনে করে চলে গিয়েছিলে, আমিও তোমাকে বুঝিয়ে দেব তুমি এখন আমার কাছে কতটা পর। হুহ!‘’ বলেই ছোট্ট করে একটা মুখ ভেংচি দিয়ে অরা বাথ্রুমে ঢুকল ভেজা পোশাক বদলাতে।
কিছুক্ষণ পর বাথরুম থেকে বেরিয়ে ভেজা চুলগুলো বিছানায় ছড়িয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল অরা। চুলে টাওয়াল পেঁচিয়ে রাখার ধৈর্যটুকুও যেন আজ তার নেই। সিলিং ফ্যানের দিকে তাকিয়ে থাকার চেষ্টা করলেও তার অবাধ্য মনটা বারবার সেই একজনের কাছেই ফিরে যাচ্ছে।
অরা বালিশে মুখ গুঁজে নিজের ভাবনার জট খোলার চেষ্টা করল। কিন্তু চোখ বুজলেই ভেসে উঠছে আয়ানের সেই নতুন রূপ। সাত বছরের ব্যবধান অনেকটাই বদলেছে তার আয়ান ভাইয়া? আয়ান ভাইয়া এখন অনেক লম্বা, গায়ের রঙে রোদের পোড়া ভাব, কণ্ঠস্বরে গভীরতা-সব মিলিয়ে এক অচেনা আকর্ষণ।
অরা তড়িঘড়ি করে সোজা হয়ে বসল। নিজের গালে হাত দিয়ে অনুভব করল হালকা উত্তাপ। সে জোরে একটা ঝাঁকুনি দিল নিজের মাথায়।
"ছিঃ অরা! তুই কী ভাবছিস এসব? উনি তোর ভাইয়া, আর তুই কীসব আজেবাজে চিন্তা করছিস? নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছিস কেন?"
সে নিজের মনেই ধমক দিল নিজেকে। আয়ানের সেই গম্ভীর ব্যক্তিত্ব, নিজের এতটা কাছে আসা,তার কণ্ঠের পরিবর্তন—সবকিছুই কেন যেন অরার মনে এক অদ্ভুত শিহরণ জাগিয়ে দিচ্ছে, যা তাকে ভীষণ অপরাধবোধে ফেলেছে।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বিড়বিড় করল, "উনি শুধু একজন মানুষ, যে আমাকে ছেড়ে চলে গিয়েছিল। এর চেয়ে বেশি কিছু না। আর কোনোদিন ওনার দিকে তাকাব না, একদম না!"
অরার মনের ভেতরে চলতে থাকা সেই অস্থিরতা আর হাজারো এলোমেলো ভাবনার ভিড় কখন যে তাকে ক্লান্ত করে দিয়েছিল, সে নিজেও টের পায়নি। আয়ানকে নিয়ে করা সব অভিযোগ, পুরনো স্মৃতি আর অভিমানে ভরা একরাশ আকাশ-পাতাল কল্পনা করতে করতেই একসময় তার দুই চোখের পাতা ভারী হয়ে এল।
মাথার ওপর ফ্যানটা একঘেয়ে শব্দে ঘুরে চলেছে। বাইরের ড্রয়িংরুমের সেই চেনা কণ্ঠস্বরগুলোও এখন অস্পষ্ট লাগছে অরার কাছে। ভেজা চুলগুলো বিছানায় এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে। সে নিজের অজান্তেই বালিশটা আরও জোরে জাপটে ধরল, যেন অবচেতন মনে সে কোনো এক ভরসা খুঁজছে।
বিকেলের নরম আলোটা যখন জানালার পর্দা চিরে ঘরের মেঝেতে এসে পড়েছে, ঠিক তখনই দরজায় করো শক্ত হাতের কড়া নাড়ার শব্দে অরার ঘুমটা ভেঙে গেল। তড়াক করে বিছানায় উঠে বসল সে। ঘুমের ঘোরে প্রথমে বুঝতে পারল না কোথায় আছে, কিন্তু দরজার শব্দটা থামল না।
চোখ কচলাতে কচলাতে অরা কিছুটা বিরক্ত হয়েই কর্কশ গলায় জিজ্ঞেস করল,
"কে?"
সাথে সাথেই ওপাশ থেকে ভেসে এল সেই অতি পরিচিত গম্ভীর একটা কণ্ঠ।
"দরজা খোল!"