Posts

গল্প

শিরোনাম: অন্ধকার বাড়ির শেষ আলো

April 29, 2026

Moonlight

45
View


গ্রামের একদম শেষ প্রান্তে, বাঁশঝাড় আর পুরোনো আমগাছের ছায়ায় ঢেকে থাকা একটা ভাঙা বাড়ি ছিল। লোকজন সেটাকে বলত “অন্ধকার বাড়ি”। দিনের বেলাতেও বাড়িটার ভেতর যেন অদ্ভুত এক ছায়া লেগে থাকত। কেউ সেখানে যেত না—কারণ বহু বছর আগে ওই বাড়িতে এক ভয়ংকর ঘটনা ঘটেছিল।
রাহাত শহর থেকে তার মামার বাড়িতে বেড়াতে এসেছিল। নতুন জায়গা, নতুন অভিজ্ঞতা—সবকিছুই তার কাছে রোমাঞ্চকর লাগছিল। কিন্তু যখন সে গ্রামের ছেলেদের কাছ থেকে অন্ধকার বাড়ির গল্প শুনল, তার মনে কৌতূহল জেগে উঠল।
“ওই বাড়িতে রাতে আলো জ্বলে,” একজন বলল।
“কিন্তু সেখানে তো কেউ থাকে না!” আরেকজন যোগ করল।
রাহাত হাসল। “এগুলো শুধু গাঁয়ের গুজব। আমি গিয়ে দেখে আসব।”
সবাই তাকে থামাতে চাইল, কিন্তু রাহাতের জেদ চেপে গেল। সেদিন রাতেই সে সিদ্ধান্ত নিল, সত্যিটা নিজেই খুঁজে বের করবে।
রাত প্রায় বারোটা। চারদিকে নিস্তব্ধতা। দূরে শেয়ালের ডাক শোনা যাচ্ছে। হাতে একটা টর্চ নিয়ে রাহাত চুপচাপ বের হয়ে পড়ল। ধীরে ধীরে সে এগিয়ে গেল অন্ধকার বাড়ির দিকে।
বাড়িটার সামনে দাঁড়াতেই তার বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠল। ভাঙা দরজা, ছেঁড়া জানালা, আর চারপাশে শুকনো পাতা—সবকিছু মিলিয়ে একটা অদ্ভুত ভয়ের পরিবেশ তৈরি করেছে।
“ভয় পাওয়ার কিছু নেই,” নিজেকে বোঝাল রাহাত।
সে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। ভেতরে ঢুকতেই এক ধরনের ঠাণ্ডা হাওয়া তার শরীর ছুঁয়ে গেল। যেন হঠাৎ করে তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি কমে গেছে।
টর্চের আলোয় সে চারপাশে তাকাল। পুরোনো আসবাবপত্র, ধুলো জমে থাকা দেয়াল, আর ছাদের কোণে ঝুলে থাকা মাকড়সার জাল—সবকিছুই অনেকদিনের পরিত্যক্ত।
হঠাৎ করে উপরের ঘর থেকে একটা শব্দ এল।
ঠক… ঠক… ঠক…
রাহাত থেমে গেল। তার গলা শুকিয়ে গেল। “কেউ আছে?” সে ডাকল।
কোনো উত্তর নেই।
সে ধীরে ধীরে সিঁড়ির দিকে এগোল। প্রতিটা ধাপ যেন কেঁপে উঠছিল। উপরে উঠতেই শব্দটা আবার শোনা গেল—এবার একটু জোরে।
ঠক… ঠক… ঠক…
সে একটা ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল। দরজাটা আধখোলা। ভেতর থেকে যেন হালকা আলো বের হচ্ছে।
“এই তো!” রাহাত ফিসফিস করে বলল।
সে দরজাটা ধীরে ধীরে ঠেলে খুলল।
ঘরের ভেতর যা দেখল, তাতে তার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
একটা পুরোনো টেবিলের ওপর একটা কেরোসিন বাতি জ্বলছে। কিন্তু আশেপাশে কেউ নেই।
“এটা কীভাবে সম্ভব?” সে ভাবল।
হঠাৎ করে বাতিটা দপ করে নিভে গেল।
পুরো ঘর অন্ধকারে ঢেকে গেল।
ঠিক তখনই তার কানে একটা মৃদু কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“তুমি… কেন এসেছো…?”
রাহাতের হাত থেকে টর্চ পড়ে গেল। সে কাঁপতে কাঁপতে বলল, “কে… কে তুমি?”
একটু নীরবতার পর আবার সেই কণ্ঠস্বর—
“এখানে কেউ আসে না… তুমি কেন এলে…?”
রাহাত সাহস জোগাড় করে বলল, “আমি… আমি শুধু দেখতে এসেছি…”
হঠাৎ করে ঘরের এক কোণে একটা ছায়া নড়ল।
ধীরে ধীরে সেই ছায়া একটা মানুষের আকার নিল।
একটা মেয়ে।
তার চুলগুলো এলোমেলো, মুখ ফ্যাকাশে, চোখ দুটো অদ্ভুতভাবে জ্বলছে।
“তুমি আমাকে দেখতে পাচ্ছো?” মেয়েটি বলল।
রাহাত কোনোভাবে মাথা নাড়ল।
মেয়েটি হালকা হাসল। “অনেকদিন পর কেউ আমাকে দেখল…”
“তুমি কে?” রাহাত জিজ্ঞেস করল।
মেয়েটি ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। “আমি এই বাড়ির মেয়ে ছিলাম… অনেক বছর আগে…”
সে থেমে গেল, তারপর ফিসফিস করে বলল, “আমাকে এখানে মেরে ফেলা হয়েছিল…”
রাহাতের বুক কেঁপে উঠল। “কে?”
মেয়েটির চোখ হঠাৎ লাল হয়ে উঠল। “যাদের আমি সবচেয়ে বেশি বিশ্বাস করতাম…”
ঘরের বাতাস ভারী হয়ে উঠল। হঠাৎ করে দরজাটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
ধড়াম!
রাহাত চমকে উঠল। সে দরজার দিকে ছুটে গেল, কিন্তু দরজাটা যেন লক হয়ে গেছে।
“তুমি বের হতে পারবে না…” মেয়েটি ধীরে ধীরে বলল।
“কেন?” রাহাত প্রায় কেঁদে ফেলল।
“কারণ তুমি এখন আমার গল্প জানো…” মেয়েটি বলল।
হঠাৎ করে ঘরের চারপাশে অদ্ভুত শব্দ শুরু হলো। দেয়ালে আঁচড়ের শব্দ, কারও কাঁদার আওয়াজ, আর ভারী পায়ের শব্দ।
“ওরা আবার এসেছে…” মেয়েটি ফিসফিস করল।
“কারা?” রাহাত কাঁপতে কাঁপতে জিজ্ঞেস করল।
মেয়েটি কিছু বলল না। শুধু তার পেছনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ করে অন্ধকার থেকে কয়েকটা ছায়া বেরিয়ে এল।
তাদের কোনো স্পষ্ট মুখ নেই, শুধু কালো অবয়ব।
“ওরা আমাকে মারার সময় হাসছিল…” মেয়েটি বলল, তার গলায় রাগ আর কষ্ট মিশে আছে।
ছায়াগুলো ধীরে ধীরে রাহাতের দিকে এগোতে লাগল।
“না… না…” রাহাত পিছিয়ে গেল।
মেয়েটি হঠাৎ তার দিকে তাকাল। “তুমি কি আমাকে সাহায্য করবে?”
“কীভাবে?” রাহাত অসহায়ের মতো বলল।
“ওদের থামাও…” মেয়েটি বলল।
“আমি পারব না!” রাহাত চিৎকার করে উঠল।
ছায়াগুলো আরও কাছে চলে এল। ঠাণ্ডা বাতাসে তার নিঃশ্বাস জমে যাচ্ছে।
ঠিক তখনই মেয়েটি তার হাত ধরল।
তার হাত বরফের মতো ঠাণ্ডা।
“ভয় পেও না…” সে বলল।
হঠাৎ করে সবকিছু থেমে গেল।
নীরবতা।
তারপর একটা তীব্র আলো ঘর ভরিয়ে দিল।
রাহাত চোখ বন্ধ করে ফেলল।
কিছুক্ষণ পর সে যখন চোখ খুলল, তখন দেখল সে বাড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
ভোর হয়ে গেছে।
পাখিরা ডাকছে।
সবকিছু যেন স্বাভাবিক।
“আমি… বেঁচে আছি?” সে অবাক হয়ে বলল।
সে পিছনে তাকাল।
অন্ধকার বাড়িটা আগের মতোই নিস্তব্ধ।
কিন্তু এবার জানালার ভেতর থেকে একটা হালকা আলো দেখা গেল।
আর সেই আলোয়, এক মুহূর্তের জন্য, সে মেয়েটির মুখ দেখতে পেল।
সে হাসছিল।
কিন্তু সেই হাসির মধ্যে একটা অদ্ভুত দুঃখ লুকিয়ে ছিল।
রাহাত আর কখনো সেই বাড়ির কাছে যায়নি।
কিন্তু মাঝে মাঝে রাতে, সে এখনো শুনতে পায়—
ঠক… ঠক… ঠক…
আর একটা মৃদু কণ্ঠস্বর—
“তুমি… আবার আসবে…?”

Comments

    Please login to post comment. Login