বর্ষার শেষ রাত। আকাশে চাঁদ নেই, শুধু কালো মেঘের ভেলা আর মাঝে মাঝে বিদ্যুতের ঝলকানি। শহর থেকে একটু দূরে, পাহাড়ঘেরা এক গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে বহুদিনের পরিত্যক্ত একটি বাড়ি—লোকজন যেটাকে বলে “শেষ দরজা”। কেউ সেখানে যায় না, কেউ গেলে আর ফিরে আসে না—এমনটাই গল্প।
রিয়াদ, শহরের এক সাহসী ছেলে, এসব গল্পে বিশ্বাস করত না। সে সবসময় প্রমাণ করতে চাইত—ভূত বলে কিছু নেই। তাই একদিন সে সিদ্ধান্ত নিল, সেই বাড়িতে গিয়ে রাত কাটাবে।
গ্রামের লোকেরা তাকে অনেকবার সতর্ক করেছিল। বৃদ্ধ করিম চাচা বলেছিল,
“বাবা, ওই বাড়ির শেষ দরজাটা খুলিস না… ওই দরজার ওপাশেই অন্ধকার।”
রিয়াদ হেসে বলেছিল,
“চাচা, এগুলো শুধু কুসংস্কার।”
রাতে, একা ব্যাগ নিয়ে সে চলে গেল সেই বাড়ির দিকে।
বাড়িটা দূর থেকে দেখলেই শরীর কাঁপে। ভাঙা জানালা, ঝুলে পড়া দরজা, আর চারপাশে গাছের ছায়া যেন হাত বাড়িয়ে ডাকছে। বাতাসে একটা অদ্ভুত গন্ধ—পুরনো আর পচা।
রিয়াদ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল।
কড়কড় শব্দে দরজাটা খুলতেই ঠান্ডা বাতাস যেন তাকে ঘিরে ধরল।
ভেতরে ঢুকে সে টর্চ জ্বালাল। দেয়ালে পুরনো ছবি, মেঝেতে ধুলোর স্তর। মনে হচ্ছিল বহু বছর কেউ এখানে আসেনি।
হঠাৎ—
“ঠক… ঠক… ঠক…”
উপরে কোথাও শব্দ হলো।
রিয়াদ থেমে গেল।
“কে আছে?”—সে জোরে বলল।
কোনো উত্তর নেই।
সে ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগল। প্রতিটা ধাপ যেন কেঁপে উঠছিল।
উপরে গিয়ে সে দেখল, লম্বা একটা করিডোর। করিডোরের শেষে একটা দরজা—কালো, অদ্ভুত। দরজার ওপর লেখা আছে—
“শেষ দরজা খুলবে না।”
রিয়াদের মনে পড়ল করিম চাচার কথা।
কিন্তু সে তো ভয় পায় না।
সে এগিয়ে গেল।
হঠাৎ তার পেছনে দরজা নিজে নিজে বন্ধ হয়ে গেল—
“ধড়াম!”
রিয়াদ চমকে উঠল।
পেছনে তাকিয়ে দেখল, যেদিক দিয়ে সে এসেছিল, সেই পথ নেই।
এখন সামনে শুধু ওই একটাই দরজা।
তার বুক ধুকপুক করতে লাগল।
তবুও সে দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
দরজাটা ঠান্ডা… অস্বাভাবিক ঠান্ডা।
সে হাত বাড়িয়ে ধরল।
হঠাৎ তার কানে ফিসফিস করে কেউ বলল—
“খুলো না…”
রিয়াদ হাত সরিয়ে নিল। চারপাশে তাকাল—কেউ নেই।
কিন্তু এবার দরজাটা নিজে নিজেই একটু খুলে গেল।
ভেতর থেকে কালো অন্ধকার বেরিয়ে আসছে যেন।
তার মনে হলো, কেউ তাকে ভেতরে ডাকছে।
সে নিজের অজান্তেই দরজাটা পুরো খুলে ফেলল।
ভেতরে কিছুই নেই… শুধু একদম কালো অন্ধকার।
রিয়াদ টর্চ জ্বালিয়ে ভেতরে ঢুকল।
হঠাৎ—
টর্চ বন্ধ!
চারপাশে নিস্তব্ধতা।
তার শ্বাস দ্রুত হয়ে গেল।
“কেউ আছো?”—সে কাঁপা গলায় বলল।
তখনই…
একটা কণ্ঠস্বর ভেসে এলো—
“তুমি কেন এলে…?”
রিয়াদ জমে গেল।
“কে তুমি?”—সে জিজ্ঞেস করল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে ধীরে ধীরে একটা ছায়া বেরিয়ে এলো।
ছায়াটা মানুষের মতো, কিন্তু মুখ নেই।
চোখের জায়গায় শুধু ফাঁকা গর্ত।
“আমি… এই বাড়ির শেষ বাসিন্দা…”—কণ্ঠস্বরটা ঠান্ডা।
“তুমি… এখানে আটকে আছো?”—রিয়াদ জিজ্ঞেস করল।
ছায়াটা ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
“না… আমি কাউকে যেতে দিই না…”
হঠাৎ রিয়াদের পেছনে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
সে দৌড়াতে চাইল, কিন্তু তার পা নড়ছে না।
ছায়াটা তার খুব কাছে এসে দাঁড়াল।
“তুমি জানো… এই দরজা একবার খুললে… আর ফেরা যায় না…”
রিয়াদের শরীর ঠান্ডা হয়ে গেল।
“তুমি কি চাও?”—সে কষ্ট করে বলল।
ছায়াটা হাসল—একটা ভয়ংকর শব্দে।
“আমি শুধু চাই… তুমি থাকো এখানে… আমার সঙ্গে…”
হঠাৎ চারপাশে আরও অনেক কণ্ঠস্বর—
“থাকো… থাকো… থাকো…”
রিয়াদ চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু গলা দিয়ে শব্দ বের হলো না।
তার সামনে হঠাৎ অনেকগুলো মুখ ভেসে উঠল—
যারা আগে এই বাড়িতে এসেছিল।
সবাই একই রকম—চোখ নেই, মুখ বিকৃত।
তারা ধীরে ধীরে তাকে ঘিরে ধরল।
রিয়াদ বুঝতে পারল—সে ফেঁসে গেছে।
তার চোখে পানি চলে এলো।
“আমি ভুল করেছি…”—সে ফিসফিস করে বলল।
ছায়াটা বলল,
“এখন আর দেরি হয়ে গেছে…”
হঠাৎ সবকিছু অন্ধকার হয়ে গেল।
পরদিন সকালে গ্রামের লোকেরা দেখল, বাড়ির দরজা একটু খোলা।
কেউ ভেতরে যেতে সাহস করল না।
শুধু করিম চাচা দূর থেকে তাকিয়ে বলল,
“আরেকজন গেল…”
রাত নামলে, সেই বাড়ির ভেতর থেকে মাঝে মাঝে শোনা যায়—
একটা নতুন কণ্ঠস্বর চিৎকার করছে—
“আমাকে বের হতে দাও…!”
কিন্তু কেউ তাকে শুনতে পায় না।
কারণ,
“শেষ দরজা” একবার খুললে…
সেটা আর কখনো বন্ধ হয় না—
আর যারা ঢোকে, তারা আর কখনো ফিরে আসে না।
36
View