অতীতের রুলিং পার্টি আ.লীগ ও গৃহপালিত বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সংসদ অধিবেশনের তুলনায় বর্তমান সংসদ অধিবেশন অধিকতর প্রাণবন্ত ও বৈচিত্র্যময় দেখলাম। এই মুহূর্তে বিএনপির নবীন ও প্রবীণ সংসদ সদস্যরা মাত্র কয়েক গজ দূরে থাকা বিরোধীদলের সদস্যদের চোখে চোখ রেখে রাজাকার, আল বদর, আল শামস, বেঈমান, স্বাধীনতাবিরোধী বলতে পারছে। এটা ক্ষমতাচ্যুত আ.লীগও পারত না। আ.লীগের অঙ্গসংগঠন ছাত্রলীগ বরং শিবিরকে নিজেদের দলে ভিড়িয়ে গুপ্ত রাজনীতি করতে দিয়ে ওদের পাওয়ার বুস্ট আপ করে দিয়ে গেছে। যেই সক্ষমতা দিয়ে জামায়াত এখন সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা পেয়েছে।
আবার এই সংসদ অধিবেশনেই দেখলাম মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের সাজায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের শীর্ষ লিডারদের জন্য শোকপ্রস্তাবও নেয়া গেছে।
৩৪ দিনের প্রথম অধিবেশনে সবচেয়ে কম ব্যবহৃত শব্দ শেখ হাসিনা ও আ.লীগ। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দবন্ধ মুক্তিযুদ্ধ ও বাহাত্তরের সংবিধান।
একাত্তরের অতীতকে কিভাবে মাথার মুকুট করে রাখা যায় এবং নিকট অতীতের গণতন্ত্রহীনতার নায়কদের কিভাবে ইগনোর করে বাতিলের খাতায় রাখা যায় -এর উদাহরণ হলো শেষ হওয়া এই অধিবেশন।
৫৫ বছরের বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বেশি বাহাস হয়েছে মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা বিরোধিতা নিয়ে। শেষ পর্যন্ত জামুকা আইন ও সংবিধানের আলোকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমেদ এই আলাপের ইতি টেনেছেন এভাবে -লেজিসলেটিভলি বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী পাক হানাদার বাহিনীর দোসর ও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী। তবে অতীতের এই ইতিহাস আঁকড়ে থাকলে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করা যাবে না বলে শেষ ভাষণে জানিয়েছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান।
মুক্তিযুদ্ধ যে এখনো এইদেশে সবচেয়ে বেশি প্রাসঙ্গিক বিষয় -শেষ দিন বিরোধীদলের উপনেতা ডা. আবদুল্লাহ মোঃ তাহের নিজেকে শিশু মুক্তিযোদ্ধা দাবির মাধ্যমেই এর প্রমাণ মেলে। এর আগে বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানও নিজেকে মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান বলে দাবি করেন। সংসদে কিশোরগঞ্জের বিএনপির এমপি অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমান জামায়াতের স্বাধীনতা বিরোধী ভূমিকার কঠোর সমালোচনা করলে জামায়াতকে ডিফেন্ড করতে কথিত মুক্তিযোদ্ধা পরিষদের নামে ৭৭ জন জামায়াতি মুক্তিযোদ্ধা ফজলুর রহমানের বিরুদ্ধে বিবৃতি দেন। মুক্তিযুদ্ধে বিরোধী ভূমিকার জন্য আনুষ্ঠানিক অনুশোচনা কিংবা ক্ষমা প্রার্থনা না করা জামায়াতের আবার মুক্তিযোদ্ধা থাকে কিভাবে -এটি নিয়ে হাস্যরসও কম হয়নি।
এবং এসব সকল বাহাসকে এক পাশে রেখে স্থিতিশীল সংসদ ও সরকার নিশ্চিত করতে সরকারি দল-বিরোধী দলকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ১২ মার্চ শুরু হওয়া ত্রয়োদশ সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনা ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর বক্তব্য ও অধিবেশনের সমাপনী ভাষণ একসঙ্গে দিতে গিয়ে সংসদ নেতা তারেক রহমান বলেন, এই সংসদকে ব্যর্থ হতে দেয়া যাবে না।
প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে বিভাজনের তুলনায় ঐক্য, প্রতিহিংসার পরিববর্তে সহনশীলতা, ঘৃণার পরিবর্তে ভালোবাসার সুর বেজেছে। তিনি কাজকে প্রাধান্য দিতে চেয়েছেন বেশি।
জুলাই সনদ নিয়ে সরকারি দলের খুব বেশি তড়িঘড়ি নেই। অনুমান করা যায় তারা এ ব্যাপারে আরও সময় নেবে। গতকাল শেষ অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাউদ্দিন আহমদ স্পষ্টভাবে বলেছেন, 'সংস্কারের বাহানায় যদি নির্বাচন হতে না দেয়, সে জন্য আপস করে জুলাই সনদে সই করেছি'।
এবারের সংসদে সবচেয়ে আইনসঙ্গত ও হিউমারাস কথা বলেছেন হোম মিনিস্টার সালাউদ্দিন আহমেদ। তাঁকে যুৎসই সঙ্গ দিয়েছেন আন্দালিব রহমান পার্থ। দুইজনই পড়ুয়া মানুষ সেই সাক্ষর তাঁরা রেখেছেন। বিরোধী দলে কোনো বক্তাই ডা. শফিকুর রহমানকে ছাপিয়ে যেতে পারেননি। ভবিষ্যতে উঠে আসবার মতো তরুণ কোনো বক্তা জামায়াতে দেখিনি।
এনসিপির নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আব্দুল্লাহ্'র পারফরম্যান্স আশাব্যঞ্জক। বিশেষকরে মিস্টার আব্দুল্লাহ্ বিতার্কিক হিসেবে তাঁর নামের প্রতি সুবিচার করেছেন। রাজনীতিটা তাঁর হবে। তিনি ধারাবাহিকতা রক্ষা করে জনগণের পক্ষে কথা বলবেন এই প্রত্যাশা রাখি।
ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার চেয়ে আলোকোজ্জ্বল ভূমিকায় অন্য কোনো স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য দেখা গেল না।
সব মিলিয়ে অন্তত দশক পরে আম পাবলিক সংসদের আলাপ জমিয়ে উপভোগ করেছে। ব্যক্তিগতভাবে আমি নিজেও শেষ দিন জাতীয় সংসদে উপস্থিত থেকে আইনপ্রণেতাদের বাতচিত শুনেছি। গণমাধ্যমের সমস্ত শাখা-প্রশাখা সদস্যদের নানামুখী বক্তব্য কোট করে নিউজ, কন্টেন্ট, রিলস, শর্টস, মিম, ডিজিটাল কার্ড বানিয়ে পরিবেশন করেছে।
আমরা চাই বহুদলীয় গণতন্ত্র চর্চার মাধ্যমে জাতীয় সংসদ হয়ে উঠুক রাজনীতির মূল কেন্দ্রবিন্দু। সরকারি ও বিরোধীদলে তুমুল তর্ক হোক -সেটা যেন অতীতের মতো কোনোমতেই মুখ না দেখাদেখির পর্যায়ে না পৌঁছে।
ফারদিন ফেরদৌস
১ মে ২০২৬