Posts

গল্প

জিন ডাক্তার

May 1, 2026

ইহতেমাম ইলাহী

31
View

জিন ডাক্তার

আলী স্যার। ছিলেন আমাদের গণিতের শিক্ষক। তার বাড়ি ছিল গ্রামের একটা নির্জন জায়গায়। ধান ক্ষেতের ঠিক মাঝামাঝি। লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন বললে খুব একটা ভুল হবে না। আলী স্যার এবং তার কয়েক চাচার পরিবার মিলে একত্রে বসবাস। পাশে লম্বা লম্বা সুপারি গাছের বাগান। আমার স্পষ্ট মনে পড়ে। বহুদিন স্যারের বাসায় পড়তে গিয়েছি ছোট বয়সে। বাড়ির আশপাশ জুড়ে ছিল কাগজি লেবুগাছের ঝোপ। যে ঘরটায় স্যার আমাকে পড়াতেন তার পেছনের পুকুর পারে একটা সুবিশাল দারুচিনি গাছ। একটু দূরে বাঁশের ঝোপ। তাদের বাড়ির আবহ খুব একটা ভৌতিক বলা যায় না। তবে স্যারের এক চাচির ছিল ধবল রোগ। বৃদ্ধা মহিলা। যখন দেখতাম সাদা কালো ছোপ ছোপ শরীর, তখন চমকে যাওয়ার মত একটা অনুভুতি হত। স্যারের দাদি বেঁচে ছিলেন। অনেক বয়স হয়েছে। তার কী যেন রোগ হয়েছে। প্রায় এ নিয়ে কথা শুনতে পাই। তার নাকি মরমর অবস্থা। কিন্তু মরছেন না। আবার সুস্থ্যও হচ্ছেন না। অনেক ডাক্তার অষুধ করা হয়েছে কিন্তু তার অবস্থার উন্নতি নেই। বৃদ্ধ বয়সে কষ্ট পাচ্ছেন শুধু শুধু। সব চিকিৎসা যখন করা হয়ে গেল তখন বাদ রইল কেবল জিন চিকিৎসা। আমি প্রায় ২০ বছর আগের কথা বলছি। তখন গ্রামের কারো রোগ না সারলে আত্মীয়দের কেউ কেউ জিন চিকিৎসার পরামর্শ দেবে না তা কখনো হয় নি। স্যারের দাদিকেও জিন দিয়ে চিকিৎসা করানোর সিদ্ধান্ত হলো। তো জীন চিকিৎসা হবে কীভাবে? মানুষের মাঝে যেমন ডাক্তার থাকে। জিনদের মাঝেও তেমনই থাকার কথা। তবে চিকিৎসার ধরণ কেমন সে সম্পর্কে বলা মুশকিল। হয়ত গাছ গাছরার লতা-পাতা চিকিৎসা হতে পারে। সে যাই হোক, জিন ডাক্তার তো আর চেম্বার খুলে বসে থাকে না। যে তার চেম্বারে গেলেই তাকে পাওয়া যাবে। বরং তাকে আনতে হত ডেকে।  সবাই আবার তাদের ডাকতে পারে না। বিশেষ বিশেষ লোকই এই কাজ পারে। আমাদের এলাকায় এই বিশেষ শ্রেণির লোকদের বলা হত মাহান। শহরে এসে জানলাম তাদের কবিরাজ বলে। আমাদের এলাকায় বেশ কিছু কবিরাজ ছিল। এদের নাম—জহির মাহান, সাদেক মাহান, কাছুয়া মাহান ইত্যাদি। এখন ভাবি মাহান শব্দটা কি কোনোভাবে মহান শব্দ থেকে এসেছে কি না? এর উত্তর মনে হয় নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারবে না। মূল গল্পে যাই। 
আমার সন্দেহ ছিল যে, স্যারের বাড়িতে জিন ডাকার ব্যাপারটা আসলেই ঘটবে কি না। কারণ আমাদের আলী স্যার, গণিত ও বিজ্ঞানের শিক্ষক ছিলেন। চিন্তাভাবনায় কিছুটা প্রগতিশীল। তার বাড়িতে এসব হবে—এ নিয়ে সংশয় থাকাটাই স্বাভাবিক। তবে জিন ডাকার ঘটনা যে ঘটেছিল তা আমাকে জানালেন মেরাজ চাচা। ঘটনার পরদিন রাতে । বরাবরই ছোটদের কাছে এই  ব্যাপারগুলো গোপন রাখা হত। কিন্তু মেরাজ চাচা জিন ঘটিত ব্যাপার নিয়ে থাকেন অতি মাত্রায় উৎসাহী । সেই ঘটনা আবার ছোটদের কাছে বর্ণনা করে ভয় দেখান। তাও রাতের বেলা। মোটেও দিনের বেলা নয়। সেদিন ঘুটঘুটে অন্ধকার রাতে আমরা বসে আছি আম গাছের নিচে। বাড়ির উঠানেই আম গাছ। সেখানে বেঞ্চ পাতা। বারান্দায় একটা হারিকেন জ্বলছে। মেরাজ চাচা গল্প শুরু করলেন।

“বুঝলা ইহতেমাম? মাহান আসছিল তিনজন। কালো কুটকুটা রাইত। আর ভ্যাপসা গরম। সবাই ঘামছে দরদর করে। তোমার আলী স্যারের বাড়ির আঙিনায় আমরা দাঁড়ায় আছি। মাহান তিনজন এসে বেঞ্চে বসল। হায় হায় হায়। বেঞ্চে বসা মাত্রই বলল, বাড়ির সব বাতি নিভায়া দেও!

মাহান তিনজন মন্তর (মন্ত্র) পড়া শুরু করল। শুধু কানেই শুনি। চোখে কিছু দেখি না। আমাবস্যার রাইতের মতন কালো রাইত। বাতি তো সব নেভানো।  কি যে জবরযং জবরজং পড়ল কিছুক্ষণ কে জানে।”

আমি বললাম, চাচা এরপর? চাচা বললেন, এরপর বলতেছি। কিন্তু আমাকে এভাবে জড়ায় ধরছ কেন? ছাড়ো। গরমে শরীর ঘেমে গেছে। আমি চাচাকে ছেড়ে দিলাম। তবে তার হাত ধরে থাকলাম শক্ত করে। চাচা আবার শুরু করলেন। 
“তিনজন মাহানই মন্ত্র পড়তেছে। খুব স্পিড। কি পড়ছে বোঝা যায় না। পড়েই যাচ্ছে। পড়েই যাচ্ছে। এক নিঃশ্বাসে। মনে হচ্ছে দম  বন্ধ হয়ে যাবে, তবু মন্ত্র ছাড়বে না। হঠাৎ করে একজন মাহান মন্ত্র পড়া বন্ধ করল। অন্যরা চালিয়ে যাচ্ছে। বুঝলাম সাদেক মাহান পড়া বন্ধ করেছে। সে করল কী। হঠাৎ বিকট একটা চিৎকার দিয়ে উঠল!   কেমন লাগে? আমরাও ভয়ে চিৎকার দেয়ার অবস্থা।  বাড়ির মহিলারাও আর্তনাদ করে উঠল। সাদিক মাহান বলল, থামেন সবাই থামেন। সবাই শান্ত হলো। এরপরেই সাদেক মাহানের কন্ঠে গান শোনা গেল, 
আয়রে বহর আয়। দোহাই লাগে তোর, আয়। আয়রে বহর আয়।

গানের অদ্ভুত সুর। সাথে অন্য দুইজন জন মাহান উন্মাদের মত মন্ত্র পড়ছে। সাদেক মাহান গান গাচ্ছে,

আয়রে বহর আয়
এই ডাক ফেলতে পারবি না রে, আয়
আয়রে বহর আয়।
আয় আয় আসি পড়, আয়
ওরে বহর আয়।
দোহাই লাগে আয়।” 
(সতর্কতাঃ আসলে কুফরী মন্ত্র পড়ে জিনকে ডাকা হত। এ ব্যাপারে তখন আমার ধারণা ছিল না। ছোটবেলার ঘটনা, কিছু স্মৃতি থেকে আর কিছু বানিয়ে লিখছি।)

মেরাজ চাচা এ পর্যন্ত গল্প বলে থামলেন। তিনি খেয়াল করলেন আবার আমি তাকে জড়িয়ে ধরেছি। আমাকে হুমকি দিলেন, গরমের দিনে এভাবে জড়ায় ধরলে আর গল্প বলব না। আমি চাচাকে ছেড়ে দিলাম। তিনি বললেন, “শোনো মাহান শা*রা কুফরি কালাম পড়তেছে দেখে মনটা চাচ্ছিল পিছন থেকে লাথি মেরে ফেলে দেই।  কিন্তু সেই সাহস তখন আমার নাই। মন্ত্র আর  গান চলতেই আছে। থামাথামি নাই। ভাবতেছিলাম জিন কীভাবে আসবে? কে একজন বলছিল যে, জিন নাকি সাদা ঘোড়ার পিঠে চড়ে আসে। কই জিন তো আসে না। আর মাহানরা মন্ত্র পড়েই যাচ্ছে। গান গেয়েই যাচ্ছে। আমার বিরক্তি লাগতেছিল। মনে মনে তাওবা করতেছি, আল্লাহ আর এগুলাতে আসব না। এমন সময় শুনি পাশের বাঁশ ঝাড়ে শো শো শো শো বাতাসের আওয়াজ! 
ঘটনা কী? ভয়ংকর আওয়াজ। কালবৈশাখী ঝড় যেমন। বাঁশের আগা পাগলের মত একটার সাথে আরেকটা বারি খাচ্ছে। মনে হচ্ছে কোনো মাতাল দৈত্য মাতলামি করতেছে। আসলেই কি জিন সে বাঁশঝাড়েই এলো? ভয়ে আমার শরীর তখন ঝিম মেরে গেছে। মুর্তির মত দাঁড়িয়ে আছি। বাঁশঝাড়ে ঝড়ের শব্দ বেড়েই চলছে। হচ্ছে টা কী? 
মাহানরা হঠাৎ মন্ত্র পড়া থামিয়ে দিল। সাদেক মাহান চিৎকার দিয়ে দিয়ে বলতে লাগল, থামরে বহর থাম। থাম। দোহাই তোর থাম। 
বহর সম্ভবত জিনটার নাম। সেই বাঁশঝাড়ে এসে মাতলামি করছে। জিনেদের ডাক্তার যে এত মাতাল হয় জানা ছিল না। সাদেক মাহানের কথায় বহর মাতলামি কমালো না, থামলও না। কেবল জায়গা বদল করল।  কারণ খেয়াল করলাম বাঁশঝাড়ের উন্মাদ বাতাস আর দুলুনি এসে ভর করেছে আমাদের পাশের আমগাছটায়। বলো কেমন লাগে? আমি আর তোমার স্যার আতঙ্কে প্রায় লাফ দিয়ে উঠলাম। আম গাছটা এমন দুলছে যে মনে হয় ভেঙে পড়বে আমাদের উপর। সাদেক মাহান চিৎকার দিয়ে বলল, থামরে থাম। অন্য দুজন আবার মন্ত্র পড়া শুরু করল। আর ততক্ষণে আমি ভাবছি, আম গাছটা দৈত্যের মাতলামি সহ্য করতে পারবে নাকি ভেঙ্গে পড়বে মাথার উপর?
এরপর মিনিট ২-৩ হবে। উন্মাদনা বন্ধ হতে শুরু করল। খেয়াল করলাম ধীরে ধীরে আম গাছের দুলুনি কমে যাচ্ছে।  
আম গাছ শান্ত হলো। সাদেক মাহান কথা বলা শুরু করল বহরের সাথে। 
আমার শরীর, শার্ট, লুঙ্গি ততক্ষণে ভিজে ঘাম দিয়ে গোসল করার অবস্থা। তোমার স্যার পাথরের মত সোজা হয়ে দাঁড়ায় আছে। হয়ত ভাবতেছে, এই জিন ভুত আর জীবনে ডাকতে দিবে না।”

গল্পের এই পর্যায়ে মেরাজ চাচা একটু থামলেন। বললাম, এরপরে কী হলো ? কিন্তু কী হলো তা চাচার আর বলার সুযোগ হলো না। আমি বিকট চিৎকার দিয়ে লাফ মেরে উঠলাম। কারণ সম্ভবত ভুতে আমার পা কামড়ে ধরেছে! চিৎকার যখন থামালাম শুনতে পেলাম, হা হা হা বিকট হাসির শব্দ আসছে। আমার ছোট চাচা। তিনি হেসে হেসে গড়িয়ে পড়ছেন মেরাজ চাচার উপর। আমি নিশ্চিত হলাম, তাহলে ভুত নয় ছোট চাচা আমার পায়ে খামচি দিয়েছেন। চিৎকার আর হাসির শব্দে ততক্ষণে বাড়ির বড়রা ঘর থেকে বের হয়ে এসেছে। আমাদের বকা ঝকা দেয়া শুরু করেছে। এরপর কি আর গল্প জমে? আমি মন খারাপ করে বসে আছি। মা আমাকে ঘরে যেতে ডাকলেন। আমি মেরাজ চাচাকে দ্রুত গল্প শেষ করার তাগাদা দিলাম, কী হলো তারপর?

“এরপর নানান অষুধ পাতি দিল। কি তাবিয কবয করতে বলল। বহর জিনকে প্রথম যেমন উন্মাদ দৈত্য মনে হয়েছিল। কথা শুনে তেমন মনে হলো না। তার কন্ঠ কেমন স্যাঁতস্যাতে। কিন্তু উগ্র। দেমাগী। আলীর দাদীর ব্যাপারে অনেক কথা হলো। কথাবার্তা শেষ হলে সাদেক মাহান আমাকে ডাক দিল, ওয় (ওহে) মেরাজ, বহরক (বহরকে) কিছু পুছিবার (জিজ্ঞেস করার) থাকিলে পুছ। বুঝতে পারলাম না। আমি আবার কি জিজ্ঞাসা করব?
গলা কোনোমত পরিস্কার করে বললাম, আপনে জিন না কি তা বুঝি কেমনে? আসলেই জিন হয়া থাকলে আমাকে তার নমুনা দেবেন। 
বহরের কন্ঠ শোনা গেল। স্যাঁতস্যাঁতে কন্ঠ। যা, নমুনা পাবি।
রাইত তখন ৩ টা। ভাবলাম আর না। বাড়ি চলে যাই। আমি বাড়ি চলে আসলাম দোয়া দরুদ পড়তে পড়তে। বাড়ি এসে দেখি নারিকেল গাছটার একটা কাঁচা ঢোনা (ডাল) ভেঙ্গে পড়ে আছে। আমের গাছের ডাল ভেঙ্গে পড়ে আছে। অথচ কোথাও কোনো ঝড় বাতাস নাই। এত রাতে কেউ গাছেও উঠবে না। বুঝলাম, জিন নমুনা দিয়া গেছে। ইহতেমাম, কাল সকালে তোমাকে গাছের ভাঙ্গা ডাল দেখাবো। ”
মেরাজ চাচা আমাকে পরদিন সকালে নারিকেল গাছের ভাঙা ঢোনা আর আম গাছের ডাল দেখালেন। আমি দেখে খুবই আশ্চর্য্য হলাম। যখন একটু বড় হয়েছি। হাই স্কুলে পড়ি। বাড়ির সবাই বলত, ইহতেমাম ভালো করে পড়াশোনা করো। তোমাকে ডাক্তার হতে হবে। কিন্তু সমস্যা হয়ে গেল কি। ডাক্তারের হওয়ার কথা বললেই আমার মতে পড়ে যেত সেই জিন ডাক্তারের কথা। উন্মাদ জিন ডাক্তার। যার নাম ছিল বহর।

Comments

    Please login to post comment. Login