রাতটা অদ্ভুতভাবে নিস্তব্ধ ছিল। যেন পুরো পৃথিবী শ্বাস বন্ধ করে আছে। আকাশে চাঁদ নেই, শুধু ঘন কালো মেঘ। বাতাসে একটা অচেনা গন্ধ—পুরনো, ভেজা, আর কিছুটা ভয়ংকর।
রাশেদ সেই রাতেই প্রথমবারের মতো গ্রামের পুরনো বাড়িটায় ফিরেছিল। এই বাড়িটা তার দাদার—অনেক বছর ধরে পরিত্যক্ত। ছোটবেলায় সে শুনেছিল, এই বাড়ির ভেতরে কিছু একটা আছে… যা মানুষ না।
কিন্তু রাশেদ এসব বিশ্বাস করত না। সে শহরে বড় হয়েছে, বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেছে। ভূত-প্রেত তার কাছে নিছক কুসংস্কার।
তবুও, সেদিন রাতে যখন সে বাড়ির সামনে দাঁড়াল, তার বুকের ভেতর হালকা একটা চাপ অনুভব করল।
“এটা শুধু পুরনো বাড়ি… আর কিছু না,” নিজেকে বোঝাল সে।
লোহার গেটটা ঠেলে খুলতেই কেঁচো কেঁচো শব্দ হলো। মনে হলো যেন অনেকদিন পর কেউ এই জায়গায় পা রাখছে।
বাড়িটার ভেতরে ঢুকতেই ধুলো আর মাকড়সার জাল তাকে স্বাগত জানাল। দেয়ালের রঙ উঠে গেছে, জানালাগুলো ভাঙা, আর মেঝেতে শুকনো পাতার স্তূপ।
রাশেদ একটা টর্চ জ্বালাল। আলোটা সামনে পড়তেই মনে হলো দেয়ালগুলো যেন ধীরে ধীরে নড়ছে। সে চোখ মুছে আবার তাকাল—সব স্বাভাবিক।
“ইমাজিনেশন…” সে ফিসফিস করল।
বাড়ির ভেতরে একটা বড় ঘর ছিল—ড্রয়িংরুম। সেখানে একটা পুরনো সোফা, একটা কাঠের টেবিল আর দেয়ালে ঝুলানো একটা বড় ছবি।
ছবিটা দেখে রাশেদের শরীর কেঁপে উঠল।
ছবিটা ছিল তার দাদার। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো—ছবির চোখ দুটো যেন সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে আছে।
রাশেদ একটু কাছে গেল। “এটা তো নরমাল,” সে নিজেকে বোঝাতে চেষ্টা করল। “পোর্ট্রেট এমনই হয়।”
ঠিক তখনই—
“ঠক… ঠক…”
একটা শব্দ হলো।
রাশেদ থমকে গেল।
শব্দটা এসেছে বাড়ির ভেতরের আরেকটা ঘর থেকে।
সে টর্চটা শক্ত করে ধরল। “কেউ আছে?” তার গলা কাঁপছিল।
কোনো উত্তর নেই।
আবার—
“ঠক… ঠক…”
এবার শব্দটা আরও জোরে।
রাশেদ ধীরে ধীরে সেই ঘরের দিকে এগোল। দরজাটা আধখোলা ছিল।
দরজা ঠেলে খুলতেই সে দেখল—
ঘরটা পুরো ফাঁকা। শুধু একটা পুরনো কাঠের আলমারি।
“শব্দটা তাহলে…?”
সে আলমারির দিকে তাকাল।
ঠিক তখনই আলমারির দরজাটা নিজে নিজেই একটু নড়ল।
রাশেদের বুক ধক করে উঠল।
“কেউ আছো?” সে আবার বলল।
নীরবতা।
সে সাহস করে আলমারির দরজা খুলল।
ভেতরে কিছুই নেই।
“আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি…” সে নিজেই নিজেকে বলল।
হঠাৎ পিছন থেকে একটা ঠান্ডা বাতাস এসে তাকে ছুঁয়ে গেল।
সে ঘুরে দাঁড়াল।
কেউ নেই।
কিন্তু ঘরের দরজাটা এখন পুরো বন্ধ।
“আমি তো এটা বন্ধ করিনি…”
রাশেদ দরজার দিকে এগোল। হাত বাড়িয়ে খুলতে যাবে—
ঠিক তখনই তার কানের কাছে ফিসফিস করে কেউ বলল—
“তুই ফিরেছিস…”
রাশেদ লাফিয়ে পিছিয়ে গেল।
“কে? কে সেখানে?!”
কোনো উত্তর নেই।
তার নিশ্বাস দ্রুত হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারছিল—এটা স্বাভাবিক কিছু না।
হঠাৎ টর্চের আলোটা নিভে গেল।
পুরো ঘর অন্ধকার।
“না… না…” সে টর্চটা ঝাঁকাল। কিন্তু কাজ হলো না।
অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সে শুধু নিজের হৃদস্পন্দন শুনতে পাচ্ছিল।
ঠিক তখনই—
কেউ যেন তার হাত চেপে ধরল।
বরফের মতো ঠান্ডা।
রাশেদ চিৎকার করে উঠল।
সে হাতটা ঝাঁকিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করল, কিন্তু সেটা আরও শক্ত হয়ে গেল।
“তুই কেন এসেছিস…” আবার সেই ফিসফিস শব্দ।
রাশেদ মরিয়া হয়ে বলল, “ছাড়ো! আমাকে ছাড়ো!”
হঠাৎ হাতটা ছেড়ে দিল।
রাশেদ দরজার দিকে দৌড় দিল। দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে এল।
ড্রয়িংরুমে এসে সে হাঁপাতে লাগল।
কিন্তু এখানেও কিছু যেন বদলে গেছে।
দেয়ালের ছবিটা—তার দাদার ছবি—এখন আর আগের মতো নেই।
ছবির মুখটা বিকৃত।
চোখগুলো লাল।
আর ঠোঁটে একটা ভয়ংকর হাসি।
“এটা… এটা সম্ভব না…”
ঠিক তখনই ছবির ভেতর থেকে একটা শব্দ এল—
“তুই পালাতে পারবি না…”
রাশেদ পিছিয়ে গেল।
তার পা হঠাৎ কিছুতে আটকালো, আর সে পড়ে গেল।
মেঝেতে পড়ে থাকতে থাকতে সে দেখল—
ঘরের সব দরজা-জানালা নিজে নিজেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
“না… না… আমাকে বের হতে হবে…”
সে উঠে দাঁড়াল, কিন্তু দরজাগুলো শক্তভাবে বন্ধ।
হঠাৎ চারপাশে ফিসফিস শব্দ ভেসে আসতে লাগল।
“তুই ফিরেছিস…”
“তুই এখানেই থাকবি…”
“তোর পালানোর পথ নেই…”
রাশেদ কান চেপে ধরল। “চুপ করো! প্লিজ চুপ করো!”
কিন্তু শব্দগুলো আরও জোরে হতে লাগল।
হঠাৎ সবকিছু থেমে গেল।
পুরো বাড়ি নিস্তব্ধ।
একটা গভীর, ভয়ংকর নীরবতা।
ঠিক তখনই তার সামনে একটা ছায়া তৈরি হলো।
ধীরে ধীরে সেই ছায়াটা মানুষের আকার নিল।
রাশেদ তাকিয়ে রইল।
এটা তার দাদা।
কিন্তু মানুষ না।
চোখ দুটো কালো, মুখ বিকৃত, শরীরটা অস্বাভাবিকভাবে বাঁকা।
“তুই এসেছিস…” সেই ভয়ংকর কণ্ঠ।
রাশেদ কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আপনি… আপনি কে?”
“আমি এই বাড়ির অভিশাপ…”
ধীরে ধীরে সেই ছায়া তার দিকে এগোতে লাগল।
রাশেদ পিছিয়ে যেতে লাগল, কিন্তু দেয়ালে আটকে গেল।
“তুই এখান থেকে যেতে পারবি না…” ছায়াটা বলল।
হঠাৎ রাশেদের মাথায় একটা কথা এল—ছোটবেলায় তার মা বলেছিল, এই বাড়ির নিচে একটা গোপন কক্ষ আছে।
যেখানে দাদা কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছিল।
“যদি আমি ওটা খুঁজে পাই…”
সে হঠাৎ ছায়াটাকে পাশ কাটিয়ে দৌড় দিল।
ছায়াটা চিৎকার করে উঠল—“থাম!”
রাশেদ দৌড়াতে দৌড়াতে বাড়ির পেছনের দিকে গেল।
মেঝেতে একটা পুরনো দরজা ছিল—যেটা নিচে নামার পথ।
সে দরজাটা খুলে নিচে নেমে গেল।
নিচে অন্ধকার, কিন্তু একটা মৃদু আলো দেখা যাচ্ছে।
সে এগিয়ে গেল।
একটা ছোট ঘর।
ঘরের মাঝখানে একটা বাক্স।
বাক্সটা থেকে অদ্ভুত আলো বের হচ্ছে।
রাশেদ ধীরে ধীরে বাক্সটার কাছে গেল।
হঠাৎ পিছন থেকে সেই কণ্ঠ—
“ওটা খোলবি না…”
রাশেদ ঘুরে দেখল—ছায়াটা এসে গেছে।
“ওটা খুললেই তুই শেষ…”
রাশেদ দ্বিধায় পড়ল।
কিন্তু তার মনে হলো—এটাই একমাত্র উপায়।
সে বাক্সটা খুলে ফেলল।
হঠাৎ পুরো ঘর আলোতে ভরে গেল।
ছায়াটা চিৎকার করে উঠল।
“নাaaaaaaaa!”
বাক্সের ভেতরে একটা পুরনো ডায়েরি ছিল।
ডায়েরির পাতাগুলো উল্টাতে উল্টাতে রাশেদ বুঝতে পারল—
তার দাদা একটা ভয়ংকর শক্তির সঙ্গে চুক্তি করেছিল।
আর সেই শক্তিই এখন এই বাড়িতে বন্দী।
ডায়েরির শেষ পাতায় লেখা—
“যদি কেউ এই অভিশাপ ভাঙতে চায়, তবে তাকে এই ডায়েরি পুড়িয়ে ফেলতে হবে।”
রাশেদ চারদিকে তাকাল।
একটা লাইটার পড়ে আছে।
সে লাইটারটা তুলে নিল।
ছায়াটা তার দিকে এগিয়ে আসছে।
“তুই এটা করলে তুইও মরবি…”
রাশেদ চোখ বন্ধ করে ডায়েরিতে আগুন ধরিয়ে দিল।
আগুন ছড়িয়ে পড়তেই ছায়াটা ভয়ংকর চিৎকার করতে লাগল।
পুরো বাড়ি কাঁপতে লাগল।
দেয়াল ভেঙে পড়ছে, ছাদ ধসে পড়ছে।
রাশেদ দৌড় দিল উপরের দিকে।
কষ্ট করে বাইরে বেরিয়ে এল।
ঠিক তখনই পুরো বাড়িটা ধসে পড়ল।
সবকিছু শেষ।
রাশেদ হাঁপাতে হাঁপাতে মাটিতে বসে পড়ল।
ধীরে ধীরে ভোরের আলো ফুটছে।
সবকিছু শান্ত।
“শেষ হলো…” সে ফিসফিস করল।
কিন্তু—
হঠাৎ তার পেছনে একটা ফিসফিস শব্দ—
“সব শেষ হয়নি…”
রাশেদ ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল।
তার ছায়া…
মাটিতে থাকা তার নিজের ছায়াটা…
হাসছে।
তার চোখে ভয় জমে গেল।
“না…”
আর সেই মুহূর্তেই সে বুঝল—
অভিশাপটা শুধু বাড়িতে ছিল না।
এটা এখন তার সাথেই আছে।
শেষ… নাকি শুরু?
41
View