
অরা মুহূর্তের জন্য স্ত ব্ধ হয়ে গেল। এই কণ্ঠস্বর তার চেনা—অদ্ভুতভাবে চেনা। গলার স্বরটা শোনার সাথে সাথে ওর বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল, যেন কেউ আচমকা বরফশীতল পানি ঢেলে দিয়েছে।
প্রচণ্ড অবাক হয়েছে মেয়েটা । আসা করে নাই আয়ান ওর রুমে আসবে। অরা ভেবেছিল একবছরে দুরুত্বটা দুতরফাই হয়েছে।
পরের মুহূর্তেই সেই অবাক ভাবটা ধীরে ধীরে জায়গা করে নিল অদ্ভুত এক না র্ভাসনেসে। হাতের তালু ঘেমে উঠল, গলা শুকিয়ে এল। মনে হচ্ছিল, দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটার সামনে গেলেই সব এলোমেলো হয়ে যাবে
কিন্তু না… অরা নিজের ঠোঁট কা মড়ে শক্ত হলো।
নিজেকে দ্রুত সামলে নিল সে। চোখের ভেতরের নরম অনুভূতিটুকু এক ঝটকায় সরিয়ে রেখে মুখে টেনে আনল ক ঠোরতা।
ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে এগোল অরা। প্রতিটা পা যেন একটু বেশি ভারী লাগছিল, তবুও থামল না।
দরজার সামনে গিয়ে এক সেকেন্ড থামল। গভীর শ্বাস নিল। তারপর দরজাটা খুলে দিল।
দরজা খুলতেই সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আয়ানকে দেখে আবারও এক মুহূর্তের জন্য থ‘’মকে গেল সে… কিন্তু সেই থ‘’মকে যাওয়া খুব বেশি সময় টিকল না।
মুখটা শক্ত করে, চোখে একরাশ ঠান্ডা দৃষ্টি এনে অরা বলল,
“তুমি এখানে?”
আয়ান দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল। ঠোঁটের কোণে তার চিরচেনা সেই বাঁকা হাসি। সে কিছুটা ভেতরে এগিয়ে এসে নির্বিকার ভঙ্গিতে বলল,
“তুই তো নিচে আসলি না, তাই ভাবলাম আমিই উপরে চলে আসি!”
অরা হাত দিয়ে চুলগুলো কিছুটা গুছিয়ে নিয়ে বি‘’রক্তির সুরে বলল,
“আমি ঘুমাচ্ছিলাম… আর তাছাড়া তোমার আমার কাছে কী কাজ?”
আয়ানের চোখেমুখে এক ধরণের কৌতুক খেলে গেল। সে ভ্রু কুঁচকে পাল্টা প্রশ্ন করল,
“কোনো কাজ নেই বলছিস?”
“হুম, নেই-ই তো।”অরা বেশ দৃঢ়তার সাথেই জবাব দিল।
হালকা হাসি দিয়ে আয়ান ওর দিকে এক পা এগিয়ে এসে কিছুটা শা‘’সনের স্বরে, কিন্তু নরম গলায় বলল,
“মুখে মুখে তো ভালোই কথা বলা শিখেছিস!”
অরা দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে আয়ানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে সপাটে উত্তর দিল,
"শুধু কথা বলা কেন? আরও অনেক কিছুই শিখেছি।"
আয়ানের দৃষ্টি এবার তী‘’ক্ষ্ণ হলো। সে শান্ত স্বরে বলল
“দেখা!”
হঠাৎ এই কথার জন্য অরা প্রস্তুত ছিল না। সে কিছুটা থত‘’মত খেয়ে বলল,
“দেখা মানে? কী দেখাবো?”
আয়ান আর কথা বাড়াল না। রহস্যময় হাসিতে তার মুখ ভরে উঠল। সে নিচু স্বরে বলল,
“কিছু না… সময় হলে নিজেই দেখে নিব। এখন—হাতটা দে।”
কথাটা শেষ করেই আয়ান তার পেছনে লুকিয়ে রাখা একটা বেশ বড়সড় আকারের ব্যাগ অরার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল এটা তোর জন্যে। অরা অ‘’প্রস্তুতভাবে ব্যাগটা ধরল।
“কী আছে এতে?”
“নিজেই দেখে নে।”
কথা টা বলে আয়ান অরার একদম কাছে চলে এল। তারপর আচমকা তার ডান হাতের হাতের তর্জনী দিয়ে অরার নাকের ডগাই ছোট্ট একটা টো‘’কা দিয়ে অরাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই নিজের রুম এর দিকে চলে গেলো আয়ান।
অরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই আয়ান দ্রুত পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। অরা কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। হৃদস্পন্দনটা কেন যেন একটু বেড়ে গেছে। এরপর অরা আবার দরোজা লাগিয়ে দিয়ে খাটের ওপর ব্যাগটা রেখে সে গভীর নিঃশ্বাস নিল।
অরার কৌতূহলী হাত ব্যাগের চেইনটা খুলতেই ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো সিল্কি কাপড়ের মোলায়েম আভা।অরা সাবধানে প্রথম ড্রেসটি বের করল। একটি টকটকে মেরুন রঙের লং গাউন। কাপড়টা গর্জাস সাটিন-সিল্কের, যার ওপর সোনালি সুতোর খুব সূক্ষ্ম কাজ করা। রঙটা এতটাই গভীর যে ঘরের অল্প আলোতেও সেটা আভিজাত্য ছড়াচ্ছে। অরা ড্রেসটা গায়ের সাথে ধরতেই আয়নায় তার গায়ের রঙ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
সে মুগ্ধ হয়ে ভাবছিল আয়ান ভাইয়ের রুচির কথা, ঠিক তখনই ব্যাগের ভেতর আরও কিছু একটা অনুভব করল সে।
হাত বাড়িয়ে দ্বিতীয় ড্রেসটি বের করতেই অরার নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল। কুচকুচে কালো রঙের একটি ভেলভেট গাউন। এর কারুকাজ সম্পূর্ণ আলাদা—সিলভার স্টোন আর সিকোয়েন্সের কাজগুলো যেন অন্ধকারের মাঝে মিটিমিটি তারার মতো জ্বলছে। কালো রঙটা সবসময়ই অরার ভীষণ প্রিয়, আর এই গাউনটি যেন একদম তার মনের মতো করে তৈরি করা হয়েছে।
দুই হাতে দুটো গাউন নিয়ে অরা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইল বিছানায়। একটা মেরুন—যা আভিজাত্য আর আবেগের প্রতীক, আর অন্যটি কালো—যা রহস্য আর গাম্ভীর্যে ঘেরা।অরা যখন খুসি মনে ড্রেস দুটো নিয়ে নাড়াচাড়া করছিল তখনই চোখ পড়লো নিচে পরে থাকা
একটা চিরকুট এর উপর। আয়ানের সেই চিরচেনা হাতের লেখা:
‘’ আমার রাজরাণীকে সবসময় রাণীর মতো পোশাকেই দেখতে চাই, আজ থেকে তোর জন্যে সাধারণ পোশাক পরা নিষিদ্ধ।‘’
চিরকুটটা হাতে নিয়ে অরা একদম স্থির হয়ে বসে রইল। চারপাশের সব শব্দ যেন হঠাৎ থেমে গেছে, শুধু ওর কানের ভেতরে একটা শব্দই বারবার প্রতিধ্বনি হচ্ছে— ‘রাজরাণী’।
আজ দীর্ঘ নয়টা বছর পর এই ডাকটা আবার শুনল সে। নয় বছর! সময়টা কম নয়। এই নয় বছরে কত কিছু বদলে গেছে, কত অভি‘’মান জমা হয়েছে পাহাড়ের মতো। অথচ আয়ানের লেখা এই একটা শব্দ যেন জমানো সব বরফ এক নিমেষে গলিয়ে দিতে চাইছে। অরা বুঝতে পারছে না ওর ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া দেওয়া উচিত।
অরা চিরকুটটা বুকের সাথে চেপে ধরে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। নয় বছর আগের স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে এলেও এই একটা ডাক— 'রাজরাণী'—সবকিছুকে আবার জীবন্ত করে তুলেছে। ওর ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বি‘’ষণ্ণ কিন্তু তৃপ্তির হাসি ফুটে উঠল।
সে নিজেকেই নিজে বিড়বিড় করে বলতে লাগল, "এই নয় বছরে তাহলে তুমি শুধু বাইরে থেকেই বদলেছ আয়ান ভাই? ভেতরে তুমি এখনো আমার সেই আগের আয়ান ভাই-ই আছো! আর আমি... আমি এখনো তোমার সেই রাজরাণীই রয়ে গেছি।"
অরার মনে পড়ে গেল, তখন সে কত ছোট ছিল! আয়ান ভাই এলেই ওর দু‘’ষ্টুমি যেন কয়েক গুণ বেড়ে যেত। কোনো বায়না ধরলেই হলো, আয়ান ভাইকে সেটা পূরণ করতেই হতো।
সবচেয়ে বেশি মনে পড়ল আয়ানের কাঁধে চড়ে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ানোর কথা। অরা তখন জেদ ধরত, সে নিজে হাঁটবে না। আয়ান ভাইও হাসিমুখে তাকে নিজের ঘাড়ে তুলে নিত। সেই উঁচু থেকে পুরো বাড়িটাকে কেমন অন্যরকম মনে হতো অরার কাছে।
আয়ানের চুলগুলো টেনে ধরা, আর আয়ানের "আরে লাগছে তো, থামবি এবার!" বলে মিছেমিছি ধ'মক দেওয়া—সবই যেন আজ কানের কাছে বাজছে।
অরা একা একাই শব্দ করে হেসে ফেলল। চোখে জল এলেও মুখে তার হাসির রেখা। সাথে একটু লজ্জাও পেলো বুঝি অরা। সে ভাবল, "এতটা বছর কেটে গেল, আমরা বড় হয়ে গেলাম, মাঝখানে নয়টা বছর —অথচ সেই স্মৃতিগুলো এখনো কত সতেজ!"
পরক্ষনেই অরা আবার গম্ভীর হয়ে গেলো যখনি ওর মনে পরল নয় বছর আগের ওকে ছেঁ‘’ড়ে যাওয়ার কথা, অরা মনে মনে বলব,"তুমি কি ভেবেছ আয়ান ভাই? গিফট দিলেই অরা গোলে যাবে? তাহলে তুমি ভুল ভেবেছ।"
দুপুরের সেই নি‘’স্তব্ধতা কাটিয়ে রাত বাড়ার সাথে সাথে শেখ বাড়ির প্রাণচাঞ্চল্য যেন বহুগুণ বেড়ে গেল।বড় ডাইনিং টেবিলটা আজ উপচে পড়ছে খাবারে আর মানুষে। সাদা ধোঁয়া ওঠা পোলাও, মায়ের হাতের খাসির মাং‘’সের সেই চেনা রেজালা আর দাদির হাতের স্পেশাল ফিরনি-সব মিলিয়ে ম ম করছে চারপাশ। দাদি আছিয়া খান আজ সবার আগে এসে টেবিলের প্রধান আসনে বসেছেন। তাঁর বাঁ পাশেই বসেছে আয়ান। দাদি বারবার আয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছেন, যেন বিশ্বাসই করতে পারছেন না নাতিটা সত্যি ফিরেছে।
আছিয়া খান এর বিপরিতে বসেছেন মফিজ শেখ। তার বা পাসে বসেছেন আনোয়ার শেখ আর ডান পাসে বসেছেন শফিক শেখ। আয়ান এর পাসেই বসেছে আবির আর আবির এর পাসে সাইফ।
অন্যদিকে আয়ান এর বিপরিতে বসেছে অরা আর অরার পাসে আরশি। অরা আজ নিচে খেতে আসতে চাইছিল না কিন্তু আরশির জড়া‘’জড়িতে একপ্রকার বাধ্য হয়েই এসেছে। বাড়ির তিন বউ আজ একসাথে তদারকি করছেন যাতে কারও পাতে কোনো কিছুর কমতি না থাকে।
খাবার খাওার এক পর্যায়ে আনোআর শেখ আয়ান কে উদ্দেশ্য করে বললেন,"তা আয়ান, নয় বছর তো বাইরে ছিলি, পড়াশোনাও শেষ হলো। এখন তোর পরবর্তী ইচ্ছে কী? সামনে কী করার চিন্তা করছিস?"
আয়ান খাবারের প্লেট থেকে মুখ তুলে সবার দিকে একবার তাকাল। দাদি থেকে শুরু করে ছোট ছোট ভাইবোনরা পর্যন্ত যেন এই উত্তরটার অপেক্ষায় ছিল। আয়ান খুব শান্ত স্বরে অথচ দৃঢ়তার সাথে বলল, "মেজো আব্বু ,আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমাদের ফ্যামিলি বিজনেসটাতেই জয়েন করব।আমি জানি আপনারা অনেক কষ্ট করে সবটা সামলেছেন। কিন্তু দেশের বাইরে থেকে আমি একটা জিনিস বুঝেছি—আমাদের ব্যবসার পরিধি আরও বাড়ানোর অনেক সুযোগ আছে। আধুনিক প্রযুক্তি আর নতুন কিছু আইডিয়া কাজে লাগিয়ে আমি এটাকে আরও বড় পরিসরে নিয়ে যেতে চাই। আমি চাই না আবার কোথাও চাকরি নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ি। তার চেয়ে আমাদের যা আছে, সেটাকেই নতুন করে সাজাতে চাই।"
আয়ানের কথা শুনে আনোয়ার শেখ শেখ সহ অন্য দুভাই বেশ খুশি হলেন। তিনি হেসে বললেন, "চমৎকার সিদ্ধান্ত! আমরাও মনে মনে এটাই চাচ্ছিলাম। তোর মতো তরুণ র‘’ক্ত আর নতুন চিন্তা যখন বিজনেসে যোগ হবে, তখন আর আমাদের ভ‘’য় কী?"
জয়া বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন। মা হিসেবে তাঁর কাছে ব্যবসার উন্নতির চেয়ে বড় পাওনা হলো ছেলে আর দূরে কোথাও চলে যাবে না।
অরা এতক্ষণ মাথা নিচু করে খাচ্ছিল, কিন্তু আয়ানের মুখে ব্যবসার কথা শুনে সে আড়চোখে একবার তাকাল। আয়ান ভাই এই বাড়িতেই থাকবে, প্রতিদিন এই ডাইনিং টেবিলে তাকে দেখা যাবে, তার গলার আওয়াজ শোনা যাবে—ভাবতেই অরার বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু কেঁ‘’পে উঠল। নয় বছর আগের সেই কিশোরী অরা আর নেই, কিন্তু আয়ানের সামনে এলেই কেন যেন সে আজও নিজেকে ঠিক সামলাতে পারে না।
তবে অরা জে‘’দি। সে চট করে নিজের আবেগ কাউকে বুঝতে দিতে রাজি নয়। আয়ান যখন ব্যবসার পরিকল্পনা নিয়ে বেশ গম্ভীরভাবে কথা বলছিল, অরা আড়চোখে একবার তার দিকে তাকিয়েই আবার দৃষ্টি সরিয়ে নিল। মনে মনে ভাবল, ‘হুহ, বড় সাহেব এসেছেন ব্যবসা উদ্ধার করতে!
আয়ান ঠিক ওই মুহূর্তেই অরার দিকে তাকিয়েছিল। অরা সেটা টের পেতেই চট করে একটা কিউট অথচ তাচ্ছিল্যভরা মুখ ভেং চি কাটল। যেন সে বোঝাতে চাইল—আয়ানের এই বড় বড় কথায় সে বিন্দুমাত্র প্রভাবিত নয়।
আয়ান এই ছোট ইশারাটা দেখেও না দেখার ভান করে আলতো করে হাসল। সে জানে, এই সাত বছরে অনেক কিছু বদলালেও অরার এই চঞ্চলতা আর তার ওপর রা‘’গ করার ধরনটা একদম আগের মতোই আছে।
অরা আবার নিজের প্লেটের দিকে মনোযোগ দিল। গরুর মাং‘’সের ঝোল দিয়ে ভাত মাখাতে মাখাতে সে মনে মনে নিজেকে শাসন করল, ‘’একদম পাত্তা দিবি না। আসুক না, থাকুক না এই বাড়িতে... তাতে আমার কী?‘’
কিন্তু মনের এক কোণে যে চিনচিনে সুখের অনুভূতিটা উঁকি দিচ্ছে, সেটাকে সে কিছুতেই চাপা দিতে পারল না।
পুরো টেবিলে যখন হাসাহাসি আর ব্যবসার গল্প চলছে, অরা তখন নিজের নীরবতায় এক অন্যরকম যু‘’দ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। পরিবারের সবাই যখন আয়ানের প্রত্যাবর্তনে মগ্ন, অরা তখন ব্যস্ত আয়ানকে তার পৃথিবী থেকে ব্রা‘’ত্য প্রমাণ করতে—যদিও তার প্রতিটি ছোট ছোট অঙ্গভঙ্গিই বলে দিচ্ছিল, এই প্রত্যাবর্তনে সে-ই হয়তো সবচেয়ে বেশি আলোড়িত হয়েছে।
খাওার শেষ পর্যায়ে অরা তার বাবার উদ্দেশ্য বলল,
‘’ আব্বু আমার কিছু বই লাগবে,তুমি কি আমাকে আগামীকাল লাইব্রেরিতে নিয়ে যেতে পারবে?‘’
আনোয়ার শেখ গ্লাসে পানি ঢালতে ঢালতে একটু চিন্তিত মুখে অরার দিকে তাকালেন। তিনি মাথা নেড়ে বললেন, "কাল তো খুব মুশকিল রে মা। সকালে আমাদের এক বড় ক্লায়েন্টের সাথে খুব ইম্পর্ট্যান্ট একটা মিটিং আছে। আর আয়ানের নানি বাড়ি থেকে কাল অনেক মেহমান আসবে, আমাকেও বাড়িতে থাকতে হবে।"
অরার মুখটা মুহূর্তেই ছোট হয়ে গেল। তার এই বইগুলোর খুব দরকার ছিল, কিন্তু বাবার ব্যস্ততা দেখে সে আর জো‘’র করতে পারল না। দাদি আছিয়া খান পাশ থেকে বলে উঠলেন, "আহারে নাতনিটার বুঝি খুব দরকার ছিল? একদিন পরে গেলে হয় না দাদু?"
অরা নিস্পৃহ স্বরে বলল, "আচ্ছা ঠিক আছে আব্বু, সমস্যা নেই। অন্য একদিন যাব।"
ঠিক এই সময়েই আয়ান তার গ্লাসটা টেবিলে রেখে বেশ ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে বলল, "মেজো আবু , কোনো সমস্যা নেই তো। আপনি আপনার মিটিং আর মেহমানদের সময় দেন, অরার বই দরকার হলে আমিই কাল ওকে লাইব্রেরিতে নিয়ে যাব। আমার তো কাল তেমন কোনো কাজ নেই।"
আয়ানের এই স্বতঃস্ফূর্ত প্রস্তাবে টেবিলের সবাই বেশ খুশি হলো। আনোয়ার শেখ স্বস্তির হাসি হেসে বললেন, "আরে হ্যাঁ! এটা তো ভালো হয়। আয়ানও একটু শহরটা ঘুরে দেখল আর অরার কাজটাও হয়ে গেল।"
অরা যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে তো আয়ানকে এড়িয়ে চলার সুযোগ খুঁজছে, আর এখন কিনা তার সাথেই লাইব্রেরিতে যেতে হবে? সে একবার প্রতিবাদ করতে চাইল, কিন্তু দেখল সবার মুখে সম্মতির হাসি। আয়ান তখন এক পলক অরার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসল, যেন সে মনে মনে খুব ভালো করেই জানে যে অরা এখন ভেতরে ভেতরে কতটা বি‘’রক্ত হচ্ছে।
অরা কিছু না বলে স্রেফ জোরে একটা শ্বাস ফেলল। তার মনে হলো, নয় বছর পর আয়ান ভাইয়া ফিরে এসে তার শান্ত পৃথিবীতে ঝ‘’ড়ের মতো সব এলোমেলো করে দিচ্ছে। কিন্তু পরিবারের সবার সামনে ‘না’ বলারও কোনো উপায় তার রইল না।
পরদিন সকালটা শেখ বাড়িতে শুরু হলো এক এলাহি কারবার দিয়ে। ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই রান্নাঘর থেকে মশলার সুঘ্রাণ আর হাঁড়ি-পাতিলের শব্দ ভেসে আসতে লাগল। আজ বাড়িতে যেমন প্রচুর সদস্যের নাস্তার আয়োজন, তেমনি দুপুরে আয়ানের নানাবাড়ি থেকে আসা মেহমানদের জন্য বিশাল রাজকীয় ভোজের প্রস্তুতি চলছে। মায়া বেগম,জয়া বেগম আর সুফিয়া বেগম রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছেন; একদিকে রুটি বেলা হচ্ছে, অন্যদিকে মাংসের বড় ডেকচি উঠেছে চু‘’লায়।
সবার এই কর্মব্যস্ততার মাঝেই ডাইনিং টেবিলে দ্রুত নাস্তা সেরে নিল আয়ান, অরা আর আরশি। অরা চেয়েছিল সবার সাথে কাজে হাত বাড়াতে, কিন্তু মিসেস মায়া বেগম এক ধ‘’মক দিয়ে বললেন, "তোরা যা তো! এখানে ভিড় করিস না, আমাদের এমনিতেই দেরি হয়ে যাচ্ছে। আয়ান যখন নিয়ে যেতে চাচ্ছে, যা বইগুলো নিয়ে আয়।"
অরা অনিচ্ছাসত্ত্বেও রেডি হতে গেল। আয়ান সাদা একটা ক্যাজুয়াল শার্ট পরে ড্রয়িংরুমে অপেক্ষা করছিল। অরা যখন হালকা নীল রঙের একটা সালোয়ার কামিজ পরে ঘর থেকে বের হলো, আয়ান এক মুহূর্তের জন্য ওর দিকে তাকিয়ে আবার চোখ সরিয়ে নিল।
ঠিক তখনই ছোট কাকার মেয়ে আরশি লাফাতে লাফাতে চলে এল। "আয়ান ভাইয়া, আমিও তোমাদের সাথে যাচ্ছি কিন্তু! অনেকদিন হলো বাইরে ঘুরি না।"
আয়ান হাসিমুখে বলল, "অবশ্যই চল। তুই থাকলে তো আরও ভালো, অন্তত অরা বোর হবে না।"
আয়ান আরশির সাথে কথা বললেও আড়চোখে দেখল অরা এখনো গ‘’ম্ভীব। তার চোখেমুখে একটা 'অনিচ্ছার ছাপ' স্পষ্ট। কিন্তু আরশির চঞ্চলতা আর বাড়ির লোকজনের হুল্লোড় সব মিলিয়ে পরিবেশটা এমন ছিল যে অরার আর আলাদা করে আপত্তি জানানোর সুযোগ থাকল না।
নাস্তা শেষ করে যখন তারা তিনজন সদর দরজা দিয়ে বের হতে যাবে, তখন পেছন থেকে দাদি চেঁ‘’চিয়ে বললেন, "মেহমান আসার আগেই ফিরিস কিন্তু! আয়ান, সাবধানে গাড়ি চালাবি।"
বাইরে তখন রোদের মিষ্টি আভা ছড়িয়ে পড়েছে। আয়ান গাড়ির চাবিটা হাতে নিয়ে আড়মোড়া ভেঙে বলল,
"চলো তাহলে, আমাদের লাইব্রেরি মিশন শুরু করা যাক।"
অরা সবসময় গাড়ির সামনের সিটে বসতে পছন্দ করে কিন্তু আজ অরা কোনো কথা না বলে আরশিকে নিয়ে পেছনের সিটে বসার চেষ্টা করতেই আরশি তাকে ধা‘’ক্কা দিয়ে সামনের সিটে বসিয়ে দিল।
"তুমি সামনে বসো অরাপু, আমি পেছনে রাজকীয়ভাবে একাই বসব!"
অরা একটা বি‘’রক্তিসূচক নিঃশ্বাস ফেলে সামনের সিটেই বসল। আয়ান মনে মনে একটু হাসল, তারপর গাড়ি স্টার্ট দিল। শেখ বাড়ির হইচই পেছনে ফেলে তাদের তিনজনের যাত্রা শুরু হলো ।
কাল থেকে মেজাজটা যেমনই থাকুক না কেন, এই সকালের স্নিগ্ধতা আর আয়ানের পাশের সিটে বসে থাকা—সব মিলিয়ে অরার মনের কোথাও একটা অদ্ভুত অ‘’স্থিরতা কাজ করতে শুরু করল।
নয় বছর পর এই প্রথম তারা একসাথে শহরের পরিচিত রাস্তাগুলোতে নামল।
শহরের পরিচিত রাস্তাগুলো দিয়ে গাড়ি এগিয়ে চলেছে। নয় বছর আগে এই রাস্তাগুলোর মোড়ে মোড়ে যে জটলা ছিল, আজ সেখানে বড় বড় ফ্লাইওভার আর নিয়ন সাইন। আয়ান খুব সাবধানে গাড়ি চালাচ্ছে, আর আরশি পেছনের সিটে বসে অনবরত বকবক করে যাচ্ছে। তার কথার তুবড়ি যেন থামছেই না—স্কুলের গল্প, বন্ধুদের কথা, আর আয়ান ভাইয়া তার জন্য বিদেশ থেকে কী কী এনেছে সেই হিসাব।
গাড়ির ভেতরে আরশির গলার আওয়াজ থাকলেও সামনের সিটে বসে থাকা আয়ান আর অরার মাঝে এক অদ্ভুত নীরবতা। অরা জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, যেন বাইরের চলমান জগতটা তার কাছে খুব রহস্যময়। আয়ান মাঝেমধ্যে আড়চোখে অরাকে দেখছে। রোদে অরার ফর্সা মুখটা একটু লালচে হয়ে উঠেছে, বাতাসের ঝাপটায় অবাধ্য কয়েকটা চুল বারবার ওর চোখেমুখে এসে পড়ছে।
হঠাৎ আয়ান নিরবতা ভেঙে বলল, "লাইব্রেরিটা কি এখনো সেই মোড়েই আছে? নাকি জায়গা বদলেছে?"
অরা নির্লিপ্ত গলায় জবাব দিল, "জায়গা বদলায়নি, তবে আগের চেয়ে অনেক বড় হয়েছে।"
আয়ান একটু হাসল। "বড় হওয়াই তো স্বাভাবিক। নয় বছরে কত কিছু বদলে গেল, আর একটা লাইব্রেরি বদলাবে না?"
কথাটা যেন শুধু লাইব্রেরিকে নিয়ে নয়, বরং অরার উদ্দেশ্যেই বলা। অরা সেটা বুঝতে পেরেও কোনো উত্তর দিল না। সে নিজেকে খুব শ‘’ক্ত করে রাখার চেষ্টা করছে, কিন্তু আয়ানের পারফিউমের হালকা ঘ্রাণ আর তার পাশের এই নিবিড় উপস্থিতি ওকে অ‘’স্থির করে তুলছে।
গাড়ি যখন লাইব্রেরির সামনে এসে থামল, আরশি সবার আগে লাফিয়ে নামল। "উফ! কতদিন পর এখানে আসলাম! আয়ান ভাইয়া, আমার কিন্তু অনেকগুলো গল্পের বই লাগবে।"
আয়ান হাসিমুখে বলল, "যত খুশি নিস, আজ সব আমার পক্ষ থেকে গিফট।"
লাইব্রেরির ভেতরে সারি সারি বইয়ের তাক। একদিকে ঝকঝকে নতুন মলাটের গল্পের বই, অন্যদিকে গম্ভীর সব পাঠ্যবই আর গাইড। অরা সরাসরি চলে গেল 'একাডেমিক' সেকশনে। সামনেই তার এইচএসসি পরীক্ষা, তাই পড়ালেখা নিয়ে সে এখন বেশ সিরিয়াস। কিছু স্পেশাল টেস্ট পেপার আর সায়েন্সের কয়েকটা রেফারেন্স বই তার খুব দরকার ছিল।
আয়ান দেখল, অরা খুব মন দিয়ে বইয়ের সূচিপত্রগুলো দেখছে। নয় বছর আগে যাকে সে পুতুলের মতো দেখে গিয়েছিল, সেই ছোট অরা এখন বড় একটা পাবলিক পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে—ভেবেই আয়ানের কেমন যেন অন্যরকম লাগল। সে কাছে গিয়ে নিচু গলায় বলল, " প্রিপারেশন কেমন?"
অরা বইয়ের পাতা উল্টাতে উল্টাতেই গম্ভীর মুখে বলল, "ভালো।"
"শুধু 'ভালো' বললে তো হবে না। এইচএসসি কিন্তু জীবনের বড় একটা ধাপ। কোনো সাবজেক্টে প্রবলেম থাকলে আমাকে বলতে পারিস, আমি তো আছিই এখন।"
অরা একবার আড়চোখে আয়ানকে দেখে নিয়ে মনে মনে ভাবল, ‘বিদেশ থেকে ফিরে এসেই টিচারগিরি শুরু করেছেন!’ সে মুখে বলল, "না লাগবে না, আমি একাই সামলাতে পারি।"
আয়ান হাসল। সে জানে অরা তাকে একটু খোঁচা দেওয়ার সুযোগ খুঁজছে। সে আর কথা না বাড়িয়ে অরার পছন্দের বইগুলো হাতে নিয়ে ওগুলোকে ক্যারি করতে সাহায্য করল।
এদিকে আরশি ততক্ষণে তার পছন্দের কিছু গল্পের বই নিয়ে হাজির। আয়ান যখন কাউন্টারে বিল মেটাতে যাবে, অরা বাধা দিয়ে বলল, "বইয়ের টাকা আব্বু দিয়েছে, আমি দিচ্ছি।"
আয়ান কোনো কথা বলল না। সে খুব শান্ত আর স্থির দৃষ্টিতে অরার দিকে তাকাল। সেই দৃষ্টিতে শা‘’সন ছিল না, ছিল এক গভীর অধিকারবোধ । অরা যখন আবার টাকাটা দিতে উদ্যত হলো, তখন আয়ান আলতো করে অরার হাতটা ধরল। হাতের স্পর্শে অরার শরীরের ভেতর দিয়ে যেন একটা মৃদু বি‘’দ্যুৎ খেলে গেল।
আয়ান খুব কোমলভাবে অরার হাতটা নামিয়ে দিয়ে তাকে আলতো টানে নিজের একদম পাশে এনে দাঁড় করাল। অরার মনে হলো, এই মানুষটার এই শান্ত চাহনি আর হাতের স্পর্শে এমন কোনো এক জাদু আছে যা তার সব জেদকে এক মুহূর্তে জল করে দিতে পারে। সে মুখ তুলে আয়ানের দিকে তাকাল, কিন্তু আয়ানের ওই গভীর চোখের দিকে তাকিয়ে আর একটি শব্দও উচ্চারণ করতে পারল না। তার সমস্ত প্রতিবাদ যেন বুকের ভেতরই দলা পাকিয়ে গেল।
আয়ান পকেট থেকে ওয়ালেট বের করে বিলটা মিটিয়ে দিল। কাউন্টারে থাকা ছেলেটি অবাক হয়ে এই দৃশ্যটা দেখছিল। অরা তখন কাঠের পুতুলের মতো আয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে রইল। তার কান দুটো অদ্ভুতভাবে গরম হয়ে উঠেছে, আর বুকের ধুকপুকানি যেন লাইব্রেরির এই নিস্তব্ধতায় সে নিজেই শুনতে পাচ্ছিল, আর তার ওই শান্ত অথচ তীব্র ব্যক্তিত্বের সামনে অরা যেন পুরোপুরি হার মেনে নিল।
টাকা মেটানো শেষে আয়ান বইয়ের ব্যাগটা এক হাতে নিয়ে অরার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল, "আব্বু টাকা দিয়েছে সেটা তোর কাছেই থাক। ওটা দিয়ে তুই অন্য কিছু কিনে নিস।"
অরা আর কিছু বলল না,স্রেফ মাথা নিচু করে রইল।
বই কেনা শেষে ক্যাশ কাউন্টার থেকে বেরিয়ে আসার সময় আরশি আবদার ধরল আইসক্রিমের। অরা ঘড়ির দিকে তাকিয়ে একটু চি‘’ন্তিত গলায় বলল, "বাড়ি ফিরতে দেরি হলে আম্মা কিন্তু বকা দিবে। মেহমানরা চলে আসার সময় হয়ে গেছে।"
আয়ান আশ্বাস দিয়ে বলল, "১০ মিনিট লাগবে। গাড়ি তো আছেই, ঠিক সময়ে পৌঁছে যাব।"
লাইব্রেরির ঠিক পাশের ক্যাফেতে বসে তারা আইসক্রিম হাতে নিল। অরা তার চকোলেট আইসক্রিমটা ছোট ছোট করে মুখে দিতে দিতে দেখল, আয়ান খুব মনোযোগ দিয়ে ওর দিকেই তাকিয়ে আছে। আয়ানের সেই দৃষ্টিতে কোনো তাচ্ছিল্য নেই, বরং এক ধরনের গভীর মায়া মিশে আছে।
অরা দ্রুত চোখ সরিয়ে নিয়ে আরশিকে বলল, "তাড়াতাড়ি খা আরশি, আমাদের দেরি হয়ে যাচ্ছে।"
আইসক্রিম খাওয়া শেষ করে যখন তারা গাড়িতে ফিরল, তখন অরার বুকের ভেতর এক অদ্ভুত অস্বস্তি কাজ করছিল। আয়ান ভাইয়ার এই অযাচিত আদর আর সাহায্যগুলো সে কেন যেন সহজভাবে নিতে পারছে না।
অরা জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল। রোদ ঝলমলে শহরটাকে আজ তার কাছে কেন যেন একটু বেশিই চেনা অথচ অজানা মনে হচ্ছে। সে জানে, এই দূরত্বটা বইয়ের পাতার মতো এত সহজে উল্টানো যাবে না, কিন্তু আয়ানের উপস্থিতি বারবার তাকে সেই পুরনো দিনগুলোর কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে।
গাড়ি যখন আবার শেখ বাড়ির গেটে এসে থামল, তখন দেখা গেল বাড়ির সামনে অনেকগুলো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। মেহমানরা চলে এসেছে। বাড়ির ভেতর থেকে হাসাহাসি আর হু‘’ল্লোড়ের শব্দ ভেসে আসছে। গাড়ি থেকে নেমেই অরার মুখে মিষ্টি হাসি দেখা গেলো যা আয়ানের চোখ এড়াল না।
অরা আর আরশি দ্রুতপায়ে বাড়ির সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেল। আয়ান বই এর ব্যাগ নিয়ে ওদের পিছনে আসছিলো।
অরা যখন সদর দরজার ঠিক সামনে পৌঁছাল, আরশি তার হাত ধরে টানছে ভেতরে ঢোকার জন্য। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে বসার ঘরের ভেতর থেকে একটা চঞ্চল পায়ের শব্দ পাওয়া গেল। কেউ একজন বেশ দ্রুত গতিতে দরজার দিকে দৌড়ে আসছে। অরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দেখল, উজ্জ্বল রঙের কামিজ পরা এক তরুণী ঝড়ের বেগে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছে।
তরুণীটি আর কেউ নয়—আয়ানের মামাতো বোন, নিশাত।
নিশাতকে দেখে অরা থমকে দাঁড়িয়ে গেল। কিন্তু নিশাত অরার দিকে ফিরেও তাকাল না। তার লক্ষ্য তখন অরার কয়েক হাত পেছনে থাকা আয়ান। নিশাত "আয়ান ভাইয়া!" বলে এক আকাশ উচ্ছ্বাস নিয়ে দৌড়ে গিয়ে আয়ানকে জ‘’ড়িয়ে ধরল।
আয়ান অ‘’প্রস্তুত হয়ে দুহাতে বইয়ের ব্যাগটা সামলাতে সামলাতে থমকে দাঁড়াল।
অরা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার প্রয়োজন বোধ করল না।সে পায়ের তলায় জোর দিয়ে, গটগট করে শব্দ তুলে বাড়ির ভেতর চলে গেল। তার হাঁটার ভঙ্গিতেই স্পষ্ট যে সে প্রচণ্ড বি‘’রক্ত।
পেছন থেকে নিশাতের খিলখিল হাসি আর আয়ানের সাথে তার খুনসুটি তখনো কানে আসছিল, কিন্তু অরা সেসবকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে চাইল। বসার ঘরে মেহমানদের ভিড় এড়িয়ে সে সরাসরি নিজের ঘরের দিকে পা বাড়াল। পথে মায়া বেগমের সাথে দেখা হতেই তিনি জিজ্ঞেস করলেন,
"কিরে অরা, বই নিয়ে আসলি? আয়ান কোথায়?"
অরা না থেমেই গটগট করে হাঁটতে হাঁটতে জবাব দিল, "আপনার গুণধর ভাতিজা বাইরে তার প্রিয় বোনদের সাথে আড্ডা দিচ্ছে, ওকেই গিয়ে জিজ্ঞেস করেন!"
মেয়ের গলার এমন ঝাঁ‘’ঝালো সুর শুনে মায়া বেগম একটু অবাক হলেন, কিন্তু মেহমানদের সামলানোর চাপে আর বেশি কিছু জিজ্ঞেস করতে পারলেন না।
অরা নিজের ঘরে ঢুকে সজোরে দরজাটা টেনে দিল। খাটের ওপর বসে সে গজ‘’গজ করতে লাগল—"বড় সাহেব এসেছেন সবাইকে উদ্ধার করতে! একেকজন তো এমন করছে যেন আকাশ থেকে দেবদূত নেমেছে। আর ওই নিশাত... আহ্লাদ দেখানর জায়গা পায় না!"
সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। সে ঠিক করল, আজ সারা দিন সে ঘর থেকে বের হবে না। মেহমানদের সামনে সে যাবেই না। কে কার সাথে জ‘’ড়িয়ে ধরছে আর কে কার সাথে হাসছে, তাতে তার কিচ্ছু যায় আসে না—অন্তত সে নিজেকে এটাই বিশ্বাস করানোর আপ্রাণ চেষ্টা করতে লাগল।
কিন্তু মনের এক কোণে যেন একটা ছোট কাঁটা বিঁ‘’ধেই রইল। অরা পড়ার টেবিলের চেয়ারটা টেনে সজোরে বসে পড়ল আর একটা বই টেনে নিয়ে সজোরে পাতা উল্টাতে শুরু করল, যদিও তার মন পড়ে রইল দরজার ওপাশে—যেখানে আয়ান এখন হয়তো সবার মধ্যমণি হয়ে বসে আছে।
তার মনে পড়ে গেল ছোটবেলার দিনগুলোর কথা, যখন আয়ান ভাইয়া ছুটিতে তার মামা বাড়ি যেত তখন অরাও সবসময় আয়ান এর সাথে যেতো আর কাজিনদের মধ্যে কার আগে কে গিয়ে আয়ানের পাশে বসবে, তা নিয়ে রীতিমতো যু‘’দ্ধ চলত। নিশাত বরাবরই একটু বেশি অধিকার দেখাত, আর আজও তার কোনো পরিবর্তন হয়নি। তবে আয়ান এর পাসের জায়গা সবসময় অরার জন্যেই বরাদ্দ থাকতো আর তাদেখে নিশাত কেমন মুখ কালো করে ফেলত।
নিশাত এর মুখ মনে আসাতেই অরা সশব্দে হেসে উঠল। সেই সাথেই অরার মনে মনে পরে গেলো একটা ঘটনা,যখন অরার বয়স ছিল ৬ আর আয়ান এর ১৫ তখন গরমের ছুটিতে গেছিলো আয়ান এর মামা বাড়ি। নিশাত এর বয়সও তখন ছিল ৬।
অরার কাছে তখন একটা লাল রঙের ছোট্ট খেলনা গাড়ি ছিল, যেটা সে কলিজার মতো আগলে রাখত। কিন্তু নিশাত জেদ করে সেই গাড়িটা নিয়ে খেলতে গিয়ে এক সময় চাকা ভে ঙে চুরমার করে দিল। অরা যখন দেখল তার প্রিয় গাড়িটা আর আগের মতো নেই, সে কী বুকফাঁটা কা‘’ন্না! পুরো বাড়ি মাথায় তুলে ফেলেছিল সে।
আয়ান তখন বারান্দায় বসে বই পড়ছিল। অরার সেই কান্না দেখে সে বই ফেলে এক দৌড়ে নিচে নেমে এল। অরাকে কাঁ‘’দতে দেখে আয়ানের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে নিশাতের হাত থেকে ভা‘’ঙা গাড়িটা নিয়ে ছুড়ে ফে‘’লে দিয়ে বেরিয়ে গেল। আধঘণ্টা পর যখন ফিরল, ওর হাতে ছিল একটা নয়, বরং পাঁচটা ঝকঝকে নতুন খেলনা গাড়ি!
আয়ান সেগুলো অরার কোলের ওপর রেখে পরম মমতায় ওর চোখের জল মুছে দিয়ে বলেছিল,
"তোর ওই একটা গাড়ি ভে‘’ঙেছে তো কী হয়েছে? এই দেখ, তোর জন্য পাঁচটা নতুন গাড়ি এনেছি। এখন কা‘’ন্না থামাবি তো?"
ততক্ষণে নিশাত পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। তার মুখটা বাংলা পাঁচের মতো হয়ে গেল। সে হিং‘’সেভরা চোখে আয়ানকে জিজ্ঞেস করল, "ভাইয়া, তুমি অরার জন্য পাঁচটা আনলে আর আমার জন্য একটাও গাড়ি আনলে না কেন? আমি তোমার বোন না?"
আয়ান তখন নিশাতের দিকে ফিরেও তাকায়নি। খুব গম্ভীর আর শান্ত স্বরে বলেছিল, "তুমি আমার রাজরাণীকে কাঁ‘’দিয়েছ। আর যে আমার রাজরাণীকে কাঁ‘’দায়, তাকে আমি একদম পছন্দ করি না। আমার সবটুকু শুধু আমার রাজরাণীর জন্য।"
নিশাত তখন মোটে ছয় বছরের এক শিশু। সে হয়তো আয়ানের ওই শব্দের গূঢ় অর্থ বা তার ভেতরে লুকিয়ে থাকা গভীর পক্ষ‘’পাতটুকু বোঝার মতো বয়সে ছিল না। সে শুধু বুঝেছিল যে তার প্রিয় আয়ান ভাইয়া তার ওপর ভীষণ রেগে আছে এবং তাকে একটা খেলনা গাড়িও কিনে দেয়নি।
নিশাত তখন অভিমানে গাল ফুলিয়ে, পা দাপিয়ে কা‘’ন্না শুরু করেছিল। বাড়ির বড়রা এসে তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছিল, কিন্তু আয়ান ছিল একদম অবিচল। সাধারণ কোনো ভাই হলে হয়তো তার বোনকে কাঁ‘’দতে দেখে মন গলে যেত কিংবা হাত বাড়িয়ে আদর করে শান্ত করত। কিন্তু আয়ান সেদিন নিশাতের কা‘’ন্নার দিকে ফিরেও তাকায়নি। তার পুরো পৃথিবীটা যেন তখন আবর্তিত হচ্ছিল শুধু ছোট্ট অরার চোখের পানি মোছানো আর তাকে ওই পাঁচটি গাড়ি নিয়ে ব্যস্ত রাখার মধ্যে।
আয়ানের সেই নির্লিপ্ততা দেখে সেদিনই বোঝা গিয়েছিল—আয়ান শেখের জীবনে যার জায়গা একবার নির্দিষ্ট হয়ে যায়, তাকে ছাড়া সে আর কাউকে নিয়ে মাথা ঘামায় না।
নিশাত যতই রা‘’গ করুক বা কাঁ‘’দুক, আয়ানের তাতে কিচ্ছু যায়-আসে না। তার কাছে তখন গুরুত্ব ছিল শুধু একটাই—তার রাজরাণী অরা কেন কেঁ‘’দেছে এবং কে তাকে কাঁ‘’দিয়েছে।
পুরোনো কথা মনে পড়তেই অরা একটা তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। সে নিজেকে বোঝানোর চেষ্টা করল, "আমার তাতে কী? আমার তো এসব পাত্তা দেওয়ার সময়ই নেই। সামনে পরীক্ষা, এই সব ফালতু জিনিস নিয়ে মাথা ঘামানোর চেয়ে বইপত্র নিয়ে বসা ভালো।"
কিন্তু কথাগুলো বললেও অরা অনুভব করল তার ভেতরে এক অন্যরকম জ্বা‘’লা। সেই জ্বা‘’লাটা কি নিছকই শৈশবের স্মৃতি, নাকি বড় হয়ে যাওয়ার পর প্রিয় কোনো মানুষের ওপর অন্য কারও ভাগ বসানোর ভ‘’য়?
বাইরে থেকে তখনো মেহমানদের হইচই আর নিশাতের চড়া গলার হাসি শোনা যাচ্ছে। অরা একটা গভীর শ্বাস নিয়ে বইয়ের পাতায় মন দেওয়ার চেষ্টা করল, কিন্তু তার অবাধ্য মনটা বারবার সদর দরজার সেই দৃশ্যটার কাছেই ফিরে যাচ্ছিল। সে বুঝতে পারছে, আয়ান ভাইয়ার এই ফিরে আসাটা তার শান্ত জীবনে বড় কোনো ঝ‘’ড় নিয়ে আসার পূর্বাভাস।
অন্যদিকে,
নিশাত যখন আচমকা দৌড়ে এসে আয়ানকে জ‘’ড়িয়ে ধরল, আয়ান মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো জমে গেল। তার দুই হাতে তখন অরার কেনা বইয়ের ভারী ব্যাগ আর আরশির শপিং ব্যাগ। আকস্মিক এই ঘটনায় সে এতটাই অ‘’প্রস্তুত হয়ে পড়েছিল যে, ব্যাগগুলো হাত থেকে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হলো।
আয়ানের চেহারায় কোনো উচ্ছ্বাস ফুটল না, বরং এক ধরনের সূক্ষ্ম অ‘’স্বস্তি আর বি‘’রক্তি খেলা করে গেল। সে দ্রুত নিজেকে সামলে নিয়ে একটু পিছিয়ে এল, যাতে নিশাতের বাঁধন আলগা হয়। নয় বছর বিদেশে থাকার কারণে সে হয়তো পশ্চিমা সংস্কৃতির সাথে পরিচিত, কিন্তু নিজের পরিবারের ক্ষেত্রে সে বরাবরই একটু রক্ষণশীল আর গ‘’ম্ভীর। বিশেষ করে নিশাতের এই অতিরিক্ত চপলতা তার একদমই পছন্দ হলো না।
আয়ান তখন খুব যান্ত্রিকভাবে বলল, "নিশাত, ছাড়ো। অনেক মেহমান এসেছে, ভেতরে গিয়ে সবার সাথে বসো। আর এভাবে গায়ে পরা স্বভাব আমার একদম পছন্দ না।"
তার গলার স্বরে সেই ছোটবেলার মতোই এক ধরনের শীতলতা ছিল। নিশাত হয়তো সেটা খেয়াল করেনি, কিন্তু আয়ানের মন তখন পড়ে আছে ভেতরে চলে যাওয়া ওই অভি‘’মানী মেয়েটার কাছে। সে জানে, অরাকে শান্ত করা কতটা কঠিন।
আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে বইয়ের ব্যাগটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার মনে মনে হলো, সে তো ফিরেছে তার 'রাজরাণী'র কাছে, কিন্তু শুরুতেই তো রাজ্যটা রণ ক্ষেত্রে পরিণত হলো। সে গটগট করে বাড়ির ভেতর ঢুকল ঠিকই, কিন্তু তার চোখ বারবার উপরের দিকে চলে যাচ্ছিল। নিশাত পাশে থেকে কথা বলে যাচ্ছিল, কিন্তু আয়ান যেন এক বর্ণও শুনছে না। তার মাথায় তখন একটাই চিন্তা—অরা।