Posts

উপন্যাস

বার্নেড হার্ট-৬

May 2, 2026

Arora

48
View

গাছের নিচে বসে থাকা সেই ক্লান্ত বিকেলটা যেন ধীরে ধীরে অন্য এক আবহে ঢুকে যাচ্ছিল। চারপাশে পার্কের কোলাহল থাকলেও, ওদের ছোট্ট বৃত্তটার ভেতরে যেন অন্যরকম নীরবতা নেমে এসেছে।অরা চুপচাপ বসে নিজের চুলের বেণীটা আঙুলে পেঁচাচ্ছিল। মাঝে মাঝে আড়চোখে আয়ানের দিকে তাকাচ্ছিল, আবার দ্রুত চোখ সরিয়ে নিচ্ছিল। অথচ আয়ানের চোখ;সেটা যেন আজ সারাক্ষণ শুধু ওর দিকেই আটকে আছে।নীরব একটু দূরে বসে আছে, কিন্তু তার চোখেও সেই একই দৃষ্টি-অরার দিকে।

এই অদ্ভুত ত্রিভুজ পরিস্থিতিটা আরশি আর সারা বেশ ভালোই ধরতে পেরেছে।

আরশি হালকা গলায় সারা'র কানে কানে বলল,

"দেখছিস? এখানে কিন্তু সিনেমার থেকেও বেশি ড্রামা চলছে!"

সারা মুচকি হেসে উত্তর দিল,

"হ্যাঁ, আর হিরোটা তো একেবারে ফুল পজেসিভ মোডে আছে!"

ওদের কথা অরা শুনতে পেলেও কিছু বলল না। শুধু ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।

হঠাৎ সাইফ উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

"চলো না, এবার ফটো সেশন করা যাক! এত সুন্দর জায়গা, ছবি না তুললে চলে?"

এই প্রস্তাবে সবাই যেন আবার চাঙা হয়ে উঠল।

অরা একটু নড়েচড়ে বসল। ওর চোখে হালকা উচ্ছ্বাস ফুটে উঠল—

পিন্টারেস্ট স্টাইল ছবি তোলার সুযোগ!

আয়ান সেটা লক্ষ্য করল। তার ঠোঁটে আবার সেই চেনা বাঁকা হাসি।

সে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,

"ঠিক আছে, সবাই দাঁড়াও। আমি ছবি তুলে দিচ্ছি।"

নিশাত সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল,

"না না, আয়ান ভাইয়া! আপনি থাকবেন না কেন? সবাই মিলে একটা গ্রুপ ছবি হবে।"

আয়ান চোখ ঘুরিয়ে শান্তভাবে বলল,

"আগে তোদেরটা তুলি, তারপর দেখা যাবে।"

ছবি তোলার সময় অদ্ভুত একটা ব্যাপার ঘটল।

নীরব কৌশলে অরার পাশে গিয়ে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল।

ঠিক তখনই আয়ান ক্যামেরা নামিয়ে বলল,

"এইভাবে দাঁড়ালে ফ্রেমটা ভালো আসবে না। অরা, তুই একটু এদিকে আয়।"

কথাটা বলেই সে নিজে এসে অরার পাশে দাঁড়িয়ে পড়ল।

ফলে,নীরব দাঁড়িয়ে গেল একেবারে সাইডে।

সাইফ হেসে ফিসফিস করে আবিরকে বলল,

"বুঝলি? এটা বলে—সাইলেন্ট ও'য়ার!"

কিন্তু আবির কিছু না বুঝেও অবুঝ হাসল।

ছবি তোলার সময় আয়ান একটু ঝুঁকে অরার কানে ফিসফিস করে বলল,

"আজ খুব সুন্দর লাগছে তোকে।"

অরা থমকে গেল।

ওর বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন যেন কেঁপে উঠল।

কিন্তু মুখে সে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল,

"সবাইকেই তো সুন্দরই লাগছে।"

আয়ান মুচকি হেসে উত্তর দিল,

"আমি সবার কথা বলিনি।"

অরা এবার সত্যিই চুপ হয়ে গেল।

ছবি শেষ হওয়ার পর সবাই আবার একটু হাঁটাহাঁটি করতে বের হলো।


পার্কের একপাশে একটা ছোট লেক ছিল। চারপাশে ঝুলন্ত বাতি, হালকা বাতাস;একদম শান্ত পরিবেশ।অরা ধীরে ধীরে সেখানে গিয়ে দাঁড়াল।জলের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ওর মনে হঠাৎ একটা অদ্ভুত অনুভূতি এলো।এইসব মুহূর্ত কি সত্যিই থাকবে? নাকি একদিন সব বদলে যাবে?

ঠিক তখনই পেছন থেকে একটা কণ্ঠ ভেসে এলো—

"তুই এত চুপ হয়ে গেছিস কেন?"

অরা ঘুরে তাকাল।

আয়ান দাঁড়িয়ে আছে, খুব কাছে।

কিছুক্ষণ দুজনেই চুপ।

শুধু বাতাস আর পানির শব্দ।

আয়ান ধীরে ধীরে বলল,

"আজকে খুব মজা পাচ্ছিস?"

অরা হালকা হাসল,

"হুম… খারাপ না।"

"আর নীরব?"

আয়ানের গলায় হালকা কড়া সুর।

অরা ভ্রু কুঁচকে বলল,

"মানে?"

আয়ান একটু এগিয়ে এসে নিচু স্বরে বলল,

"ওর সাথে এত কথা বলার দরকারটা কী?"

অরা এবার সত্যিই অবাক হলো।

"আমি কি কারও সাথে কথা বলতেও পারব না?"

আয়ানের চোখে আবার সেই জে'দি আ'গুন জ্ব'লে উঠল।

"পারবি। কিন্তু সীমা থাকা উচিত।"

অরা ঠোঁট কামড়ে একটু হাসল,

"আপনি ঠিক করবেন আমার সীমা?"

এই কথাটায় আয়ান থেমে গেল।

কিছুক্ষণ চুপ থেকে ধীরে বলল,

"যদি পারতাম… তাহলে হয়তো অনেক কিছুই ঠিক করে দিতাম।"

অরার বুকের ভেতরটা আবার কেঁ'পে উঠল।

ঠিক তখনই দূর থেকে নিশাতের ডাক,

"অরা! কোথায় তুমি? আমরা আইসক্রিম নিতে যাচ্ছি!"


অরা এক ঝটকায় বাস্তবে ফিরে এলো।সে আয়ানের পাশ কাটিয়ে হাঁটতে শুরু করল।কিন্তু যাওয়ার আগে খুব আস্তে করে বলল,

"সবকিছু ঠিক করার দায়িত্ব আপনার না… আয়ান ভাই।"

অরা চলে গেল।

আয়ান দাঁড়িয়ে রইল একই জায়গায়।তার চোখে তখন অদ্ভুত এক মিশ্র অনুভূতি—

রাগ, ভালোবাসা, অধিকার… আর ভয়।

সে ধীরে ধীরে ফিসফিস করে বলল—

"কিন্তু তুই আমার হিসাবের বাইরে না, অরা… কখনোই না।"

দূরে, আলো ঝলমলে পার্কের ভিড়ের মাঝে,

একটা নতুন ঝ‘’ড় আস্তে আস্তে জমতে শুরু করল।


দিনের বেলায় প্রচণ্ড ঘোরাঘুরির ধকল শেষে সবাই এতটাই ক্লান্ত ছিল যে, রাতে ফেরার পর আর কারো কথা বলার শক্তি ছিল না। সবাই দ্রুত ঘুমিয়ে পড়ল। পরদিন সকালে আয়ানের কাজিনরা চলে যাওয়ার জন্য তৈরি। কিন্তু নিশাতের একদমই ইচ্ছা নেই যাওয়ার। সে মনে মনে কোনো একটা যুতসই বাহানা খুঁজছিল যাতে আরও কয়েকটা দিন থেকে যাওয়া যায়।

নিশাত যখন একটু ছলচাতুরির আশ্রয় নিয়ে থাকার জন্য অনুনয়-বিনয় করার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই অরা বেশ শান্ত গলায় কিন্তু তীক্ষ্ণভাবে বলে উঠল—

"নিশাত, তুমি আরও কিছুদিন থাকলে সত্যি আমাদের খুব ভালো লাগত। কিন্তু তোমারও তো সামনে পরীক্ষা! ,তাই তোমাকে আর আটকাচ্ছি না,আমাদের বিদায় নিতেই হচ্ছে।"


অরা যখন এই কথাগুলো বলে নিশাতকে একপ্রকার দেয়ালের পিঠ ঠেকিয়ে দিল, তখন আয়ান পাশে দাঁড়িয়ে মনে মনে বেশ মজা পাচ্ছিল। সে বুঝে গেল অরা খুব সুন্দর করে নিশাতকে জ'ব্দ করে দিয়েছে।

নিশাত আর কোনো কথা খুঁজে পেল না। অরা এমনভাবে কথাটি বলল যে, চাইলেও নিশাত আর সেখানে থাকার আবদার করতে পারল না। অরাকে কোনো পাল্টা জবাব দিতে না পেরে নিশাত মুখ কালো করে গু'মসো হয়ে চলে যেতে বাধ্য হলো।


এর কিছুক্ষণ পর, নীরব যখন পরিবারের সবার কাছ থেকে বিদায় নিল, তখন সে আলাদা করে অরাদের থেকেও বিদায় নিতে এল। নীরবের এই আলাদা করে আদিখ্যেতা করে বিদায় নেওয়াটা আয়ান একদমই সহ্য করতে পারল না। তার ভেতরে একটা চাপা অস্থিরতা আর বিরক্তি দানা বেঁধে উঠল, কিন্তু অরা বা নীরবের সামনে সে তা প্রকাশ করতে পারল না।

নীরব চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই আয়ান তাকে কিছুটা আড়ালে ডেকে নিল।আয়ান কাঁধে হাত রেখে একটু হাসার চেষ্টা করে বলল,

"কি নীরব, আজকাল দেখি সব জায়গাতেই তোর মনোযোগ একটু বেশিই ছড়ানো। বিশেষ করে যেখানে যাওয়ার কথা না, সেখানেও তোর বিচরণ দেখা যাচ্ছে।"

নীরব একটু অপ্রস্তুত হয়ে হাসল, "কেন ভাই? কী বলতে চাইছ?"

আয়ান এবার গলার স্বর কিছুটা নিচু করে, রহস্যময় ভঙ্গিতে বলল,

"বলছি যে, সব বাগানের ফুল সবার জন্য থাকে না। কিছু ফুল শুধু দূর থেকে দেখাই ভালো, ছিঁ'ড়তে গেলে আবার কাঁ'টার আ''ঘাত সইতে হতে পারে। তুই তো বুদ্ধিমান ছেলে, আশা করি ইশারাতেই বুঝে নিবি কোনটা তোর সীমানা আর কোনটা অন্যের।"

কথাটা বলে আয়ান এমনভাবে হাসল যেন সে খুব সাধারণ একটা রসিকতা করেছে। কিন্তু তার চোখের চাউনি আর কথার গভীরতা নীরবকে একটু ভাবিয়ে তুলল। নীরব বুঝতে পারল আয়ান হয়তো সরাসরি কিছু বলছে না, কিন্তু সে স্পষ্ট একটা সীমা এঁকে দিচ্ছে যা অতিক্রম করাটা নিরাপদ হবে না।


আয়ানের ওই রহ'স্যময় কথা আর সাবধানবাণী শুনে নীরব এক মুহূর্তের জন্য থ'মকে দাঁড়াল। সে বেশ বুঝতে পারল আয়ান পরোক্ষভাবে তাকে অরা থেকে দূরে থাকতে বলছে। কিন্তু নীরবও তো হার মানার পাত্র নয়! সে বড় বড় চোখে আয়ানের দিকে তাকিয়ে ধূর্ত একটা হাসি দিল।

নীরব হাসিমুখে বলল, "কথা তো ঠিকই বলেছ ভাই। তবে কী জানো? কিছু ফুল সহজে হাতে আসে না বলেই তো ওগুলোর প্রতি মানুষের টান বেশি থাকে। আর কাঁ'টার ভয় করলে তো আর সুন্দর জিনিসের মায়া ছাড়া যায় না। দেখা যাক, শেষ পর্যন্ত বাগানের মালিক কে হয় আর ফুলের ভাগ্যেই বা কী আছে!"

নীরবের গলায় স্পষ্ট চ্যা'লেঞ্জ ছিল। সে বুঝিয়ে দিল আয়ানের হুঁশিয়ারিতে সে মোটেও ঘাবড়ে যায়নি। আয়ান দেখল নীরবের চোখের দৃষ্টি পাল্টে গেছে। নীরব আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে অরার দিকে একবার তাকিয়ে একটা মুচকি হাসি দিয়ে বাড়ির বাইরে পা বাড়াল।

আয়ান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে নীরবের যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল। তার ভেতরে একটা অজানা আ'শঙ্কার পাশাপাশি জে'দ দানা বাঁধতে শুরু করল।


শেখ বাড়ি থেকে বেরিয়ে কিছুটা পথ এগিয়েই নীরব থামল। চারপাশে কেউ নেই নিশ্চিত হয়ে সে পকেট থেকে ফোনটা বের করল। তার চোখেমুখে এখন আর সেই চঞ্চলতা নেই, বরং সেখানে খেলা করছে এক গভীর ধূ'র্ততা। সে দ্রুত একটা নাম্বারে ডায়াল করল।

ওপাশ থেকে কল রিসিভ হতেই নীরব একটা বাঁকা হাসি দিল। ফোনের ওপাশের মানুষটির উদ্দেশ্যে সে বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে নিচু স্বরে বলল:

"I think she's not in love with Afridi Sheikh Ayan yet."

কথাটা বলে সে কিছুক্ষণ নীরব থাকল, যেন ওপাশের কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনছে। তারপর আবার বলল,

"Ayan thinks he has everything under control, but he hasn't yet got the key to Aura's mind. And this is our biggest opportunity(আয়ান ভাবছে ও সব নি'য়ন্ত্রণ করছে, কিন্তু অরার মনের চাবিকাঠি এখনো ওর হাতে আসেনি। আর এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বড় সুযোগ)."

কথা শেষ করে নীরব ফোনটা কেটে পকেটে রাখল। তার চোখে এখন এক অদ্ভুত জয়ের নেশা। সে জানে, যতক্ষণ পর্যন্ত অরা আয়ানকে ভালো না বাসছে, ততক্ষণ এই খেলায় যেকোনো কিছু ঘটা সম্ভব। নীরব ধীর পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে চলল, যেন এক বড় কোনো ঘুঁটি চালার প্রস্তুতি নিচ্ছে সে।

Comments

    Please login to post comment. Login