Posts

উপন্যাস

বার্নেড হার্ট-পর্ব ৭

May 2, 2026

Arora

44
View

আয়ানের কাজিনরা চলে যাওয়ার পর বাড়িটা হঠাৎ করেই বেশ শা'ন্ত হয়ে এল। অরা খানিকটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে নিজের রুমের দিকে গেল। গত কয়েকদিনের প্রচণ্ড ব্যস্ততা আর হৈ-চৈ এর পর সে চাচ্ছিল একটু একা থাকতে।অরা নিজের রুমে গিয়ে সবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়েছিল, ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল। ফিরে তাকিয়ে দেখল আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। আয়ানের হাতে সেই ব্যাগটা, যেটাতে ঐদিনের কেনা বইগুলো রয়েছে।ওইদিন বাড়ি ফেরার পর নিশাত এর অমন আদি'খ্যেতা দেখে অরা বই নেওয়ার কথা ভুলেয় গিয়েছিল।

বই নিয়ে আয়ানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অরা নরম স্বরে বলল,

‘’ভিতরে আসো।‘’

ভিতরে এসে আয়ান বই গুলা টেবিলে রাখতে রাখতে বলল,

‘’ তোর প'রীক্ষার আর কয় মাস বাকি যেন?‘’

‘’চার মাস , কেনো?‘’

আয়ান এবার অরার দিকে ঘুয়ে তাকিয়ে বলল,

‘’তাহলে এতো আগে থেকে কলেজ ফাঁ'কি দেওয়ার কি দরকার ?‘’

ফাঁ'কি কথাটা শুনে অরার মুখের ভাব বদলে গেলো।সে খানিকটা আয়ান এর দিকে এগিয়ে এসে আয়ান এর চোখে চোখ রেখে বলল,

‘’ফাঁ'কি! আমাকে দেখে কি তোমার ফাঁ'কিবাজ মনে হয় ?‘’

আয়ান টেবিলের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়ালো তারপর বলল,

‘’না মনে হওয়ারও তো কিছু দেখছি না।‘’

অরা এবার কোমরে হাত বেঁধে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো,

‘’তাই? তা কি দেখে মনে হোল শুনি?‘’

‘’ আসলাম আজ চার দিন হোল একদিনও তো বই নিয়ে বসতে দেখলাম না।‘’আয়ান নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে বলল।

অরা এবার খানিকটা নুয়িয়ে গেলো, হাতে ওরনার আগা নিয়ে আঙুলে পেঁচাতে পেঁচাতে বলল,

‘’সে-সেতো বাড়িতে মেহমান আসছিল তাই পড়তে পারিনি।‘’

‘’এত বাহানা দিতে হবে না,কাল থেকে যেন কলেজ যাইতে দেখি।‘’ তপ্ত কন্ঠে আয়ান কথাটা বলে রুম থেকে বের হতে নিয়ে আবার ঘুরে দাঁড়িয়ে বলে,

‘’ আর শুন, রাতে আমি আসবো তোর পড়াশুনার কি অবস্থা দেখতে। রেডি থাকিস।‘’ কথাগুলা বলেই আয়ান রুম থেকে বের হয়ে যাই আর পিছনে ফেলে যায় অসহায় মুখে তার দিকেই তাকিয়ে থাকা তার রাজরাণী কে।

আয়ান বেড়িয়ে যেতেই অরা ঠা'স করে দরোজা লাগিয়ে দেয়।বিছানায় বসে চরম বি'রক্তিতে গজ্গজ্ করতে করতে অরা বলে,

‘’বললেই হোল?‘’ উনি বললেই কি আমাকে যেতে হবে কলেজ?‘’

পরক্ষনেই অরা তার প্রানপ্রিয় বান্ধবী রুপাকে কল লাগাল।অরার আম্মুর মোবাইল বেসির ভাগ সময় অরার কাছেই থাকে।এখন ওটা দিয়েই কল করলো। রুপা কল ধরতেই অরা বলব,

‘’ কাল থেকে কলেজ যেতে হবে।‘’

‘’মানে?‘’

রুপা কিছুটা অবাকই হোল অরার কথাই।কারন অরার বুদ্ধিতেই ওরা কলেজ যাওয়া বন্ধ করেছিল।এমন কি রুপার মা-বাবাকেও আবোল তাবোল বুঝিয়ে মানিয়েছিল অরা।এখন সেই মেয়ে আবার নিজে থেকে কলেজ যেতে চাইছে বিষয়টা অবাক করারই।

‘’মানে রাজামশাই হুকুম দিয়েছেন‘’

‘’কি সব আবোল তাবোল বলছিস? কে রাজা আর কিসেরই বা হুকুম দিয়েছে?বুঝিয়ে বল।‘’ রুপা খানিকটা বি'রক্ত হয়েই বলল।

‘’ আয়ান ভাই ফিরে এসেছে।‘’

‘’কিহ ! আর ইউ সেরিওউস অরা?‘’

‘’ তো কি তোর সাথে এখন মজা করছি আমি?‘’

‘’এত চে'তে যাচ্ছিস কেন? কখন আসলো?‘’

‘’ এসেছে তো ৪ দিন আগেই।‘’

‘’ কিহ আয়ান ভাইয়া ৪ দিন আগে এসেছে আর তুই আমাকে আজ বলছিস? ‘’

‘এসেছে, এসেছে। এতে আবার ঘটা করে বলার কি আছে।‘’

‘’ শুনো মেয়ের কথা! এতো বছর পর তোর ভালবাসার মানুষ আসলো আর তুই আমাকে বললি না?‘’

অরা এবার খানিকটা বি'রক্ত হোল।বি'রক্ত গলায় বলল, ‘’উনি আবার আমার ভালোবাসা হোল কবে থেকে?‘’

‘’ভালবাসা যদি নাই হয় তাইলে আয়ান ভাই , আয়ান ভাই করে আমার মাথা খা'ইতি কেন?‘’

অরা এবার কিছুটা ভাবুক ভঙ্গিতে উত্তর দিলো,

‘’সে-কথাই যদি বলিস তাহলে আমি বলব,Yes,i love him but as a brother or as a friend. Nothing else."

‘’ভালবাসারও এতো প্রকারভেদ?‘’

‘’ হ্যাঁ, অবশ্যই। ব্যক্তিভেদে ভালোবাসা ভিন্ন হয়।‘’

‘’থাক বাবা আমি এখন আর ভালবাসার কথা শুনতে চাইনা। আসল কাহিনীটা বল কিসের হুকুম?‘’

‘’ আসল কাহিনী এটাই যে আয়ান ভাই বলেছে কাল থেকে কলেজ যেতে। সো কাল থেকে আমরা কলেজ যাচ্ছি বুঝলি।‘’

‘’ ওরে আমার বাধ্য বোনরে।নিজে তো ফাঁ'সলি ফাঁ'সলিই সাথে আমারেও ফাঁ'সায়লি।‘’

রুপার মুখে বোন কথাটা শুনে অরার কেমন যেন একটা লাগলো। ভালো লাগলো না বোধহয় কিন্তু পাত্তা দিলো না। ‘’এখন রাখ‘’ বলে ঝা'রি দিয়ে কল কেটে দিলো অরা।


জানালার গ্রাস চুইয়ে আসা নরম রোদটা অরার ব'ন্ধ চোখের পাতায় এসে পড়তেই ওর ঘুমটা পাতলা হয়ে এল। ভোরের সেই কাঁচা সোনার মতো আলোটা যেন ওর সারা মুখে আলতো করে আদর বুলিয়ে দিচ্ছিল। অরা আড়মোড়া ভেঙে উঠে বসল। খোলা জানালার ওপাশে তখন এক মায়াবী সকালের আয়োজন।বাতাসে তখনো রাতের হিম লেগে আছে, যা অরার পাতলা সুতির ওড়নাটাকে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছিল বারবার। ও জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বাগানের শিউলি তলায় সাদা ফুলের একটা চাদর বিছানো, যার মিষ্টি ঘ্রাণটা জানালার পর্দা ভেদ করে ঘরে ঢুকে পড়ছে। অরা এক লম্বা শ্বাস নিল,সকালের এই বুনো আর সতেজ ঘ্রাণটা ওর বড় প্রিয়।

ওর অগোছালো চুলে অ'বাধ্য কিছু লট মুখের ওপর এসে পড়ছিল। ও হাত দিয়ে সেগুলো কানের পেছনে গুঁজে দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো। রাস্তার ধারের নিম গাছটায় পাখিদের যে কিচিরমিচির শুরু হয়েছে, তা যেন কোনো এক অচেনা সুরের মূর্ছনা তৈরি করছে। অরা’র মনে হলো, আজকের সকালটা গতানুগতিক অন্য দিনগুলোর মতো নয়। আজ বাতাসে একটা অদ্ভুত চঞ্চলতা আছে, যেন প্রকৃতি তাকে কোনো এক নতুন গল্পের ইশারা দিচ্ছে।

অরা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। মুখে কলেজে যাওয়ার প্রস্তুতি নিতে হবে একটু পরেই, কিন্তু এই মুহূর্তের স্নিগ্ধতাটুকু ও মনের মণিকোঠায় জমিয়ে রাখতে চায়। আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে ও একটু হাসল। ওই হাসিতে ভোরের আলোর মতোই একটা পবিত্রতা ছিল। ঠিক যেন এক শান্ত পুকুরের জলে ভোরের প্রথম সূর্যচ্ছটা। আজ তাকে কলেজে যেতে হবে,আয়ানের সেই আদেশ মনে পড়তেই অরার মুখ ভা'র হয়ে উঠল। আয়নার দিকে তাকিয়ে একটা মুখ ঝা'মটিও দিলো।তারপর লক্ষী মেয়ের মতো ওাশ্রুম গেলো তৈরী হতে।



অন্যদিকে,

ভোরের আলোটা যখন শহরের কাঁ'চঘেরা বহুতল ভবনগুলোর গায়ে ঠিকরে পড়ছে, আয়ান তখন তার আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাইটা নিখুঁতভাবে বাঁ'ধছে আজ তার নতুন কর্মদিবসের শুরু।নিজেদের পারিবারিক ফ্যাশন হাউসের 'মার্চেন্ডাইজিং ম্যানেজার' হিসেবে তার প্রথম দিন।

আয়ানের সকালটা বেশ হিসেবি। টেবিলের ওপর রাখা ব্ল্যাক কফি থেকে ধোঁয়া উঠছে; সেই কফির তেতো ঘ্রাণ ওর স্নায়ুগুলোকে সজাগ করে দিচ্ছে। আজ থেকে এই বিশাল ব্যবসার একটা বড় অংশের দায়িত্ব ওর কাঁধে। পরনে চারকোল গ্রে রঙের ফিটেড ব্লেজার আর সাদা শার্ট; লুকে যেমন আভিজাত্য আছে, তেমনি আছে গা'ম্ভীর্য।

সকালের নাস্তার টেবিলে তখন বেশ ব্য'স্ততা। রান্নার ঘর থেকে গরম পরোটা আর ভাজির একটা পরিচিত সুগন্ধ ডাইনিং পর্যন্ত ভেসে আসছে। বাড়ির কর্তারা একে একে টেবিলে এসে বসছেন। গিন্নিরা তদারকি করছেন কার পাতে কোনটা দেওয়া হলো, সবার নাস্তা ঠিকমতো হচ্ছে কি না।

কর্তাদের সাথে আয়ানও এসে নিজের চেয়ারটা টেনে বসল। অফিসের জন্য তৈরি হয়ে আসা অয়নের চোখেমুখে এক ধরণের গা'ম্ভীর্য। গিন্নিরা ওর পাতে গরম নাস্তা বাড়িয়ে দিচ্ছেন। আয়ান চুপচাপ খাওয়া শুরু করল, তার পুরো মনোযোগ যেন নিজের চিন্তায়।সবার শেষে হন্ত'দন্ত হয়ে টেবিলে এসে হাজির হলো অরা। কলেজের দেরি হয়ে যাচ্ছে বলে ওর চেহারায় অ'স্থিরতা। অরা যখন ধপ করে চেয়ারটা টেনে বসল, তখন পুরো টেবিলের সেই গ'ম্ভীর আবহটা এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল।কিন্তু ওকে কলেজ ড্রেস এ দেখে বাড়ির সবাই অবাক।কারন এই মেয়ে হচ্ছে জম্মের ফাঁ'কিবাজ।স্কুল বা কলেজ না যাওয়ার জন্যে তার হাজার বাহানা রেডি থাকে সবসময় ।নেহাতি পড়াশুনাই ভালো তাই বাড়ির লোকেও কিছু বলে না।

অরার মা মায়া বেগম প্লেটে পরোটা দিতে দিতে একদম থ'মকে গেলেন। অবাক হয়ে বললেন, "একি অরা! তুই কলেজে যাবি নাকি?‘’

অরা মায়ের পানে তাকিয়ে সাধারণ ভঙ্গিতেই বলব, ‘’কিছু লোকের আমার শান্তি সহ্য হচ্ছে না মা তাই যেতে হচ্ছে।‘’

মেয়ের এমন ঘোরানো-প্যাঁ'চানো কথা মায়া বেগমের ঠিক বোধগম্য হলো না। তিনি খুব একটা পাত্তাও দিলেন না তাতে। বরং মেয়ের পাতে নাস্তা দিতে দিতে আফসোসের সুরে বললেন, "তা তুই আমাকে আগে বলতে তো পারতিস! জানলে তোর জন্য ভালো করে টিফিন বানিয়ে দিতাম।"

অরা আড়চোখে একবার আয়ানের দেখে নিল।আয়ান তখনও নির্বিকার ভঙ্গিতে কফিতে চুমুক দিচ্ছে, যেন এই আলোচনার সাথে তার কোনো সম্পর্কই নেই। অরা মায়ের দিকে ফিরে হাসিমুখে বলল,

"সমস্যা নেই মা, একদিন না হয় কলেজের ক্যান্টিনেই খেয়ে নেব।"


অরার মুখে ক্যান্টিনের খাবারের কথা শুনে আয়ানের ভ্রু সামান্য কুঁচকে গেল। সে জানে অরা বাইরে ফুচকা-টুচকা উল্টো'পাল্টা খেতে পছন্দ করলেও, কলেজের ক্যান্টিনের ওই বাসি তেলে ভাজা খাবার ওর একদম সহ্য হয় না। গতবার শুনেছিলো ওই খাবার খেয়েই ওর বেশ শরীর খা'রাপ করেছিল। আয়ান মনে মনে ভাবল, হুট করে অরাকে কলেজে যাওয়ার কথা না বলে বাড়িতে আগে জানানো উচিত ছিল, তাহলে মেজো আম্মু অন্তত ওর জন্য ভালো কোনো টিফিন গুছিয়ে দিতেন। কিন্তু আয়ান কোনো মনোভাব প্রকাশ করল না।

ঠিক তখনই অরার বাবা চশমাটা ঠিক করতে করতে বললেন, "তা মা, তুমি কি একাই যাবে নাকি রূপাও যাবে?"

অরা উত্তর দিল, "না বাবা, রূপাও যাবে। ও একটু পরেই এখানে চলে আসবে, তারপর আমরা একসাথেই বের হবো।"

আয়ান তখন কফির কাপটা নামিয়ে রেখে গ'ম্ভীর গলায় সরাসরি অরার দিকে তাকিয়ে বলল, "আগে খাওয়া শেষ কর। আর রূপাকে বল ও যেন এখনই চলে আসে। আমি যাওয়ার পথে তোদের কলেজে নামিয়ে দিয়ে যাব।"


অরা কিছুটা অবাক হয়ে তাকালো।আয়ান নিজের ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে আবার নির্বিকার হয়ে গেল। অরা প্রথমে হয়তো কিছু বলতে চেয়েছিল, কিন্তু আয়ান মুখের ভঙ্গি দেখে আর কথা বাড়াল না। এমনিতেই অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে, বাড়ির গাড়িটাও তো আজ সার্ভিসিং-এ। এখন রিকশা খুঁজতে গেলে নি'র্ঘাত গেট আ'টকে দেবে। তাই ও আর তর্কে না গিয়ে দ্রুত হাত চালাতে শুরু করল। খাওয়ার ফাঁকেই ও মায়া বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল, "মা, রূপাকে একটু জলদি কল দিয়ে আসতে বলো তো, দেরি হয়ে যাচ্ছে।‘’

মায়া বেগমও আয়ান এই সিদ্ধান্তে খুশি হলেন। তিনি দ্রুত ফোন তুলতে তুলতে অরাকে তাড়া দিলেন, "হ্যাঁ, তুই তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। আয়ান যখন বলছে ও নামিয়ে দিয়ে আসবে, তাহলে আর চিন্তা নেই।"


অরারা বের হয়ে দেখল রূপা গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। আয়ান দেখেই রূপা একটু থত'মত খায়। আয়ান আলতো করে মাথা নেড়ে রূপাকে গ্রিট করল, তারপর গ'ম্ভীর পায়ে গ্যারেজের দিকে এগিয়ে গেল গাড়ি বের করতে।

অরা দ্রুত পায়ে হেঁটে রূপার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। অরাকে কাছে পেতেই রূপা ওর হাতটা শ'ক্ত করে চে'পে ধরল। উত্তেজনায় ফিসফিস করে বলল, "উফ অরা! বান্ধবি, তোর ভাই তো কী হ্যান্ডসাম হয়েছে রে! নয় বছরে পুরাই চেঞ্জ। একদম সিনেমার হিরোদের মতো লাগছে! অবশ্য আগে কেমন দেখতে ছিল তা আমি ভুলে গেছি।‘’

রূপার মুখে আয়ান এমন প্রশংসা শুনে অরার পিত্তি কেনো যানি জ্ব'লে গেল। ও ভ্রু কুঁচকে কড়া গলায় বলল, "খবরদার রূপা! তোর ওই কু'নজর একদম আমার আয়ান ভাই এর ওপর দিবি না বলে দিলাম।"

রূপা সাথে সাথে গালে হাত দিয়ে জিভ কা'টল। "এমা! ছি' ছি', কী যে বলিস না তুই! আমি তো উনাকে বড় ভাইয়ের চোখেই দেখি। তোর ভাই মানে তো আমারও ভাই।"

রূপার কথা থামিয়ে দিয়ে অরা ব্যা'ঙ্গ সুরে বলল, "থাক, আর বলতে হবে না। তোর ন'জর সম্পর্কে আমার খুব ভালো করেই জানা আছে!"

অরা আর রূপার এই কথা কা'টাকা'টির মাঝখানেই আয়ান গাড়ি নিয়ে ওদের সামনে এসে থামল। রূপা একটু থত'মত খেয়ে চুপ হয়ে গেল। আয়ান জানালার কাঁচ নামিয়ে সংক্ষিপ্ত নির্দেশে বলল,

"উঠ।"


রূপা পেছনের সিটের দিকে এগোতে চাইল, কিন্তু অরা তখন আয়ানকে একটু রা'গানোর সুযোগ খুঁজছে। ও গাড়ির সামনের জানালার গ্লাসে দুবার টোকা দিল। আয়ান ভ্রু কুঁচকে গ্লাসটা নামাতেই অরা জানালার দিকে ঝুঁ'কে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব আয়েশ করে বলল,

"আজ যে তোমার সাথে যেতে রাজি হয়েছি, সেটা কেন জানো আয়ান ভাই?"

আয়ান স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে শান্ত গলায় প্রশ্ন করল, "কেন?"

অরা রূপার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে আয়ানকে বলল,

"তোমাকে একটু 'ড্রাইভার' রূপে দেখার জন্য!"

বলেই ও আর উত্তরের অপেক্ষা করল না। রূপার হাত ধরে একপ্রকার টে'নেই পেছনের সিটে গিয়ে বসল। রূপা তো অরার এমন কথা শুনে ভয়ে আর হাসিতে অ'স্থির! ওড়না দিয়ে মুখ চেপে ও হাসি থামানোর চেষ্টা করছে।

গাড়ির স্টিয়ারিং হাতে আয়ান স্ত'ব্ধ হয়ে বসে রইল কয়েক সেকেন্ড। তারপর আয়নায় অরার দিকে একবার তাকিয়ে গ'ম্ভীর কিন্তু প্রশ্রয়ের গলায় বলল, "বেশি কথা না বলে চুপচাপ বসে থাক। তুই যে আমাকে ড্রাইভার বানালি না, এর শোধ আমি পরে নেব।"

অরা জানালার বাইরে তাকিয়ে বিজয়ের হাসি হাসল। আয়ান গাড়ি স্টার্ট দিয়ে মনে মনে বলল, "ড্রাইভারই সই, শুধু তোর জন্যে!"


গাড়িটা যখন মেইন রোডের দিকে মোড় নিল, তখন অদূরে দাঁড়িয়ে থাকা এক ব্যক্তি পকেট থেকে দ্রুত ফোন বের করল। তার নজর তী'ক্ষ্ণভাবে অয়নের গাড়ির দিকে নি'বদ্ধ। ফোনটা কানে চেপে ধরে সে নিচু স্বরে ইংরেজিতে বলল:

"Hello, they've just left for college. Ayan is with them too(হ্যালো, ওরা মাত্রই কলেজের উদ্দেশ্যে বের হয়েছে। অয়নও তাদের সাথে আছে)."

ওপাশ থেকে কী উত্তর এল বা অপর প্রান্তের ব্যক্তিটি আসলে কে, তা লোকটির নির্বিকার ভঙ্গি দেখে বোঝার উপায় নেই। কথা শেষ করেই সে দ্রুত ফোনটা পকেটে পুরে নিল এবং প্রস্থান করলো।


 

*************
গুলশান মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ব্যস্ত গেট থেকে খানিকটা দূরে, রাস্তার একপাশে দাঁড়িয়ে আছে একটা কয়লা-কালো অভিজাত গাড়ি। সেই গাড়ির বডিতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা যুবকটিকে দেখলে মনে হয় কোনো নিপুণ শিল্পীর আঁকা জীবন্ত কোনো প্রতিকৃতি। তার গায়ের রঙ দুধে-আলতা ফর্সা, যা সকালের রোদে এক ধরণের তামাটে আভা ছড়াচ্ছে। কপাল অবধি নেমে আসা সিল্কি চুলগুলো বারবার অ'বাধ্যভাবে চোখের ওপর আ'ছড়ে পড়ছে, আর সে আনমনে দীর্ঘ আঙুলের ছোঁয়ায় সেগুলো সরিয়ে দিচ্ছে।তবে সবচেয়ে মায়াবী তার চোখ দুটি,তীব্র গাঢ় বাদামি মণি, যা রোদের আলোয় ঠিকরে বেরোচ্ছে। সেই চোখের চাউনিতে যেমন আভিজাত্য আছে, তেমনি আছে এক ধরণের অদ্ভুত শূন্যতা। তী'ক্ষ্ণ নাক আর নিখুঁতভাবে কামানো সুগঠিত চোয়াল তাকে এক ধরণের রু'ক্ষ অথচ সুন্দর পুরুষালি সৌন্দর্য দিয়েছে। পরনে তার নেভি ব্লু রঙের একটা ফিটেড শার্ট, যার হাতা কবজি পর্যন্ত গুটানো। কবজিতে বাঁধা দামী ঘড়িটার কাঁটা যেন তার ধৈর্যের পরীক্ষা নিচ্ছে।

তার ঠিক হাত দুই দূরে পা'থরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে কালো পোশাক পরা দুইজন দীর্ঘদেহী বডিগার্ড। যুবকটি নির্বিকারভাবে কলেজের ফটকের দিকে তাকিয়ে আছে, যেন এই কো'লাহলপূর্ণ রাজপথের মাঝেও সে নিজের এক অন্য জগতে বাস করছে। তার এই গ'ম্ভীর উপস্থিতি আর চারপাশের ক'ড়া নিরাপত্তা দেখে পথচারীরাও একবার থ'মকে তাকিয়ে দেখছে এই র'হস্যময় রাজপুত্রকে।


**********
আয়ান গাড়িটা মেইন রোডের একপাশে থামাল। কলেজের গেটটা এখান থেকে সামান্য দূরে। অয়ন ওর কবজির ঘড়ির দিকে একবার তাকিয়ে গ'ম্ভীর গলায় বলল,

"অফিসের জন্যে আমার অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে, তোরা এখানেই নেমে যা।"

অরা আর রূপা গাড়ি থেকে নামতেই আয়ান জানালার কাঁ'চটা নামিয়ে অরার চোখের দিকে তাকিয়ে কড়া গলায় শাসন করল,

"সাবধানে যাবি। আর শোন, ছুটির পর আমি গাড়ি পাঠিয়ে দেব, ওটাতেই ব্যাক করবি। খবরদার, মাতব্বরি করে আবার নিজে নিজে আসতে যাস না যেন!"

অরা রা'গে মুখ ফু'লিয়ে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু তার আগেই আয়ান কোনো উত্তরের অপেক্ষা না করে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে অফিসের দিকে রওনা দিল। অরা কিছুক্ষণ আয়ানের চলে যাওয়া গাড়ির দিকে তাকিয়ে থেকে রূপাকে বলল,

"দেখলি? সারাক্ষণ শুধু হু'কুম আর হু'কুম! অফিস যাচ্ছে যাক না, আমাকে জ্ঞান দেওয়ার কী আছে?"

ওরা কলেজের গেটের দিকে হাঁটতে শুরু করল। কিছুদূর এগোতেই রাস্তার পাশে একটা আইসক্রিমের স্টল চোখে পড়ল অরার। রোদ আর বি'রক্তির মাঝে রঙিন আইসক্রিমগুলো দেখে অরার মনটা চনমন করে উঠল। ও রূপার হাত ধরে টেনে বলল,

"রূপা, চল একটা আইসক্রিম খাই!"

রূপা ঘড়ি দেখে আঁ'তকে উঠে বলল,

"অরা, হাতে একদম সময় নেই! দেরি হয়ে যাবে তো!"

কিন্তু অরা কার কথা শোনে? আয়ান চলে যাওয়ায় ও এখন মুক্ত। ও একপ্রকার জো'র করেই রূপাকে নিয়ে আইসক্রিম কিনল। কিন্তু আইসক্রিমের মজা নিতে নিতে ওরা খেয়ালই করল না কখন অনেকটা সময় পার হয়ে গেছে। হ'ঠাৎ রূপার চি'ৎকার,

"অরা! দশ মিনিট পার হয়ে গেছে, জলদি চল!"


অরা এবার ভ'য় পেল। হাতে আইসক্রিম নিয়েই ও কলেজের গেটের দিকে একরকম দৌড় শুরু করল। ঠিক তখনই সেই কালো গাড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ফর্সা যুবকটি আলসেমি ভে'ঙে সোজা হয়ে দাঁড়াল। সে হয়তো কেবল পা বাড়িয়ে সামনের দিকে এগোতে যাবে, ঠিক সেই মুহূর্তেই অরার সাথে তার প্রচণ্ড জো'রে ধা'ক্কা লাগল।ধা'ক্কার চোটে অরা ছিটকে পড়তে যাচ্ছিল, কিন্তু যুবকটি ক্ষি'প্রতার সাথে ওর হাত টে'নে ধরে ওকে প'তন থেকে রক্ষা করল। তবে অরার হাতের আইসক্রিমটা যুবকটির দামী নেভি ব্লু শার্টের ঠিক মাঝখানে লেপ্টে গেল।অরা ভ'য়ার্ত চোখে মুখ তুলে তাকাতেই সরাসরি সেই গাঢ় বাদামি চোখের মণির মুখোমুখি হলো। মাস্কের কারণে যুবকটির পুরো মুখ দেখা না গেলেও, তার বাদামি চোখের গভীর দৃষ্টি যেন অরার হৃ'দস্পন্দন থামিয়ে দিল।অরার ঘামভেজা ফর্সা মুখটা এখন যুবকের চোখের একদম সামনে। যুবকটি কিছু সময়ের জন্য যেন পা'থরের মতো স্থির হয়ে গেল।


বডিগার্ড দুজন সতর্ক হয়ে এগিয়ে আসতেই যুবকটি হাত উঁচিয়ে তাদের দূরে থাকার ইঙ্গিত দিল। মাস্ক পরা অবস্থাতেই সে নির্বিকারভাবে নিজের শার্টের আইসক্রিমের দিকে একবার তাকিয়ে, ফের অরার টল'টলে চোখ দুটির দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল, যেন সে কোনো র'হস্য এই চোখের মণিগুলোতে খুঁজে ফিরছে।


অরা ভ'য়ার্ত চোখে সেই রহ'স্যময় বাদামি চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। যুবকটির শক্তিশালী হাতের বাঁধনে ও এখন স্থির, কিন্তু অরার হৃদপিণ্ড যেন পাঁজরের ভেতর ঢোল পে'টাচ্ছে।

এদিকে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রূপা এই পুরো দৃশ্য দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। ও নিজের ডান হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরে বড় বড় চোখ করে অরা আর সেই বডিগার্ডবেষ্টিত যুবকটির দিকে তাকিয়ে আছে। রূপার মাথায় তখন হাজারটা চিন্তা-অরা কার সাথে ধা'ক্কা খেল? এই লোকগুলোর ভাবভঙ্গি তো স্বাভাবিক না! আর আইসক্রিম দিয়ে লোকটার দামী শার্টের যে অবস্থা হয়েছে, তাতে কোনো বি'পদ হবে না তো?


অরা নিজেকে সামলে নিয়ে দ্রুত ছিটকে সরে এসে সোজা হয়ে দাঁড়াল। ঠিক সেই মুহূর্তেই ওর নজর গেল যুবকটির শার্টের দিকে। দামী নেভি ব্লু শার্টের ঠিক মাঝখানে লেপ্টে থাকা আইসক্রিমটা দেখে অরার চোখ দুটো গোল গোল হয়ে বড় হয়ে গেল।ও দাঁত দিয়ে জিভ কে'টে এক চ'রম ল'জ্জিত ভঙ্গি করল। মাথা নিচু করে ভাঙা গলায় বারবার বলতে শুরু করল, "সরি, সরি! আই অ্যাম সো সরি!"


ভ'য়ে আর তাড়াহুড়োয় কী করবে বুঝতে না পেরে অরা নিজের খালি হাত দিয়েই যুবকটির শার্ট থেকে আইসক্রিমটা পরিষ্কার করতে গেল। কিন্তু হাত দিয়ে ঘষা দিতেই আইসক্রিমটা শার্টের আরও বেশি জায়গায় ছড়িয়ে গিয়ে দাগটা আরও বি'শ্রী হয়ে গেল।

অরা যখন আবারও হাত দিয়ে ওটা মুছতে যাবে, ঠিক তখনই যুবকটি শ'ক্ত করে অরার হাতটা চে'পে ধ'রল। তার হাতের ছোঁয়ায় অরা যেন এক মুহূর্তে জ'মে গেল। যুবকটি মাস্ক পরা অবস্থাতেই অরার চোখের দিকে তাকিয়ে খুব নিচু অথচ গ'ম্ভীর স্বরে বলল,

"Go on, you're getting late for college."


অরা অবাক হয়ে ওর চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। যুবকটি শার্ট ন'ষ্ট হওয়া নিয়ে কোনো রা'গই করল না। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা রূপা এবার সুযোগ বুঝে অরার হাত ধরে একরকম টে'নে হিঁ'চড়ে গেটের দিকে দৌড় দিল। অরা দৌড়াতে দৌড়াতেও একবার পেছন ফিরে দেখল, সেই মাস্ক পরা যুবকটি স্থির দাঁড়িয়ে এখনো ওর চলে যাওয়ার দিকেই তাকিয়ে আছে।

অরা আর রূপা যখন ঊ'র্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে কলেজের গেটের ভেতর ঢুকে যাচ্ছে, যুবকটি তখনো সেই জায়গাতেই স্থির দাঁড়িয়ে। তার দামি শার্টে আইসক্রিমের সাদাটে দাগটা রোদে শুকিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সেদিকে তার বিন্দুমাত্র ভ্রুক্ষেপ নেই।


বডিগার্ডদের একজন শার্টটা পরিষ্কার করার জন্য টিস্যু নিয়ে এগিয়ে আসতেই যুবকটি হাত উঁচিয়ে তাকে থামিয়ে দিল। তার গভীর বাদামি চোখ দুটো মাস্কের ওপর দিয়ে তখনো গেটের সেই ভিড়টা অনুসরণ করছে, যেখানে অরার অবয়বটা মাত্রই মিলিয়ে গেল।অরা গেটের ভেতর অ'দৃশ্য হয়ে যেতেই যুবকটির ঠোঁটের কোণে মাস্কের আড়ালে একটা সূক্ষ্ম হাসির রেখা ফুটে উঠল। সে খুব নিচু স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে নিজের মনেই বলে উঠল,

"S'uch a s'illy flower!"

Comments

    Please login to post comment. Login