Posts

উপন্যাস

বার্নেড হার্ট-পর্ব ৮

May 2, 2026

Arora

53
View

বর্তমান

অরার ভাবনার জগৎটা ছিল এক বিশাল বি'ষণ্ণ সমুদ্রের মতো। কল্পনায় সে ফিরে গিয়েছিল সেই অ'ভিশপ্ত রাতের ঠিক আগের দিনগুলোতে। তার চোখের সামনে একে একে ভেসে উঠছিল তাদের সেই হাসিখুশি ভরা সংসারটা। আব্বু-আম্মুর সেই স্নেহমাখা শা'সন, সাইফের সাথে কারণে-অকারণে খু'নসুটি, আর ছোট বোন আরশির সেই মিষ্টি আবদার—সবই যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছিল বারান্দার ওই অন্ধকারে। ছোট আব্বু আর ছোটআম্মু তো ছিলেন এই বাড়ির প্রাণ, তাদের হাসিতে পুরো বাড়ি মুখরিত থাকত। দাদি মাঝখানে বসে সবার বি'চার করতেন, আর অরা ছিল সবার নয়নমণি। সেই সাজানোবাগানটা কীভাবে এক নিমেষে ছা'ই হয়ে গেল, সেই বি'য়োগান্তক স্মৃতিই ওকে আচ্ছন্ন করে রেখেছিল।


হঠাৎ করেই মিসেস জয়া বেগমের স্পর্শে অরার কল্পনার সেই রঙিন কিন্তু য'ন্ত্রণাদায়ক জগতটা ভে'ঙে চুরমার হয়ে গেল।

"অরা! কতক্ষণ ধরে ডাকছি তোকে? এই অ'ন্ধকারে একা একা বারান্দায় ভিজে কী করছিস মা?"

জয়া বেগমের কণ্ঠস্বরে অরা একটু কেঁ'পে উঠল। ঘোর কাটতেই ও বুঝতে পারল ও বর্তমানে দাঁড়িয়ে আছে। ওর চোখ দুটো ভিজে একাকার, কিন্তু বৃষ্টির ঝাপটায় সেটা আলাদা করে বোঝার উপায় নেই। মোমবাতির টিমটিমে আলোয় জয়া বেগমকে দেখে অরা নিজেকে সামলে নেওয়ার আপ্রাণ চেষ্টা করল।

"বড় আম্মু... আমি আসছি,"

অরাখুব অস্পষ্ট গলায় বলল।

"সারা শরীর তো বরফ হয়ে গেছে তোর! চল নিচে চল,খাবার একদম ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।"

অরা উঠে দাঁড়াল। ওর পায়ের নিচে মেঝের শীতলতা যেন মনে করিয়ে দিল যে ও এখন বড় একা। যে পরিবারকে সে একটু আগে কল্পনায় দেখছিল, তারা কেউ নেই। শুধু আছে এই বড় বাড়িটা আর বড় আব্বু-বড় আম্মুর আশ্রয়।

আলমারি থেকে একটা শুকনো ওড়না টেনে নিয়ে মাথায় জড়াতে জড়াতে অরা বিড়বিড় করে বলল,

“অতীত তো অতীতই, কিন্তু বর্তমানটা যে বড্ড ক'ঠিন!”


তারপর সে পা বাড়াল বারান্দার দরজার দিকে। ঝিরঝিরে বৃষ্টির ছাঁট আসছিল ভেতরটায়। দরজাটা টেনে লাগিয়ে দেবে ভাবতেই কাঁ'চের ওপাশে তার চোখ আটকে গেল। বাইরের আবছা অন্ধকারে তাদের বাড়ির সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে কেউ একজন দাঁড়িয়ে আছে। অস্পষ্ট একটা ছায়া, যেন পা'থরের মতো স্থির। অরার বুকটা একবার ধক করে উঠল। এত রাতে ওখানে কে? সে কি ঠিক দেখছে? মনের দ্বিধা কাটাতে সে দ্রুত বারান্দার দরজা খুলে বাইরে পা রাখল। বৃষ্টির হিমেল হাওয়ায় ওর ওড়নাটা উড়তে শুরু করল। সে গ্রিল ধরে নিচু হয়ে দেয়ালের পাশের অন্ধকার জায়গাটাতে ভালো করে দেখার চেষ্টা করল। কিন্তু এক মুহূর্তের ব্যবধান! সেখানে এখন আর কেউ নেই। শুধু বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর ভেজা মাটির ঘ্রাণ। সেই অস্পষ্ট অ'বয়বটা যেন মুহূর্তেই অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে।


অরা কয়েক সেকেন্ড স্ত'ব্ধ হয়েদাঁড়িয়ে রইল। তারপর একটা লম্বা দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেকেই সান্ত্বনা দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“ধুর! মনের ভুল। এই অন্ধকারে বৃষ্টির শব্দে এখন আবছায়া দেখেও মানুষ বলে ভ্রম হচ্ছে। বেশি দুশ্চিন্তা করলে এমনই হয়।”


নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করলেও, ভেতরে ভেতরে এক অজানা অস্বস্তি নিয়ে সে ধীর পায়ে ঘরের ভেতর ঢুকে দরজাটা আটকে দিল। ডাইনিং রুমের দরজায় পৌঁছাতেই অরার বুকটা ধক করে উঠল। টেবিলের চারপাশে সবাই বসে আছে, কিন্তু সেই পরিচিত মানুষগুলোর ভিড়ে কয়েকটি চেয়ারের শূন্যতা ওকে যেন বিঁধতে লাগল। বড় আব্বু মফিজ শেখ গম্ভীর মুখে বসে ছিলেন, কিন্তু অরার ওপর নজর পড়তেই তাঁর কঠিন মুখটা মুহূর্তেই শিথিল হয়ে এল। চোখে একরাশ মায়া মেখে তিনি হাত বাড়িয়ে ডাকলেন।

“অরা মা, আয়। অনেকক্ষণ ধরে তোর জন্য অপেক্ষা করছি। এই চেয়ারটায়

এসে আমার পাশে বোস তো।”

অরা ধীর পায়ে গিয়ে বড় আব্বুর পাশের চেয়ারটায় বসল। মফিজ শেখ অরার দিকে ভালো করে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ওর ফ্যাকাশে মুখ আর বসা চোখ দুটো দেখে তাঁর মনে এক অদ্ভুত যন্ত্রণা হলো। তিনি অরার মাথায় হাত বুলিয়ে ব্যথিত স্বরে বললেন,

“এ কী হাল করেছিস নিজের? শুকিয়ে তো অর্ধেক হয়ে গেছিস মা! নিজের যত্ন কি একদমই নিবি না?”

অরা কিছুবলল না, শুধু মাথা নিচু করে রইল। ঠিক তখনই জয়া বেগম ভাতের বাটি নিয়েটেবিলের কাছে এলেন। তিনি স্নেহের সুরে বললেন, “থাক, ওকে আর বকাঝকা করো না।আয় মা, আজ আমি তোকে নিজের হাতে খাইয়ে দেব। তুই তো একা বসলে কিছুই মুখেতুলিস না।”

জয়া বেগম অরার প্লেটে ভাত মেখে পরম মমতায় এক এক করে লোকমা তুলে দিতে লাগলেন। অরা যান্ত্রিকভাবে খেয়ে যাচ্ছিল, ওর মনটা তখনো সেই বারান্দার অন্ধকারে পড়ে আছে।


কিছুক্ষণ খাওয়ানোর পর জয়া বেগম হঠাৎ মফিজ শেখের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,

“আচ্ছা, রাত-বিরাতে ছেলেটাকে এভাবে কাজের জন্য বাইরে পাঠাও কেন?

মফিজ শেখ গ্লাসে পানি নিতে নিতে শান্ত অথচ নিস্পৃহ গলায় উত্তর দিলেন, “আমি পাঠাইনি জয়া, তোমার ছেলে নিজের ইচ্ছেতেই গেছে। ওকে তো চেনো, নিজের ব্যক্তিগত কাজ বা ব্যবসার কোনো বিষয়ে ও যখন একবার সিদ্ধান্ত নেয়, তখন আমার বারণ করারও কোনো জো থাকে না। নিজেই বলল খুব জরুরি একটা কাজ আছে, তাই আজ রাতে আর ফিরবে না।”

জয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে অরার মুখে আরেকটা লোকমা তুলে দিলেন। তাঁর চোখেমুখে চাপা দুশ্চিন্তা। তিনি বিড়বিড় করে বললেন,

“কাজ আর কাজ! ছেলেটার বয়স হলো, একটু থিতু হবে তা না, সারাক্ষণ কী এতো কাজ করে কে জানে!”


অরা মাথা নিচু করে খাচ্ছিল, কিন্তু আয়ান এর কথা উঠতেই একটু নড়ে চরে বসলো।জয়া বেগমের দুশ্চিন্তা মাখা মুখটার দিকে তাকিয়ে অরা শান্ত গলায় বলল,

“বড় আম্মু, আয়ান ভাইয়া যাওয়ার সময় আমাকে বলে গেছে ওর একটা পার্সোনাল কাজ আছে। কাজ শেষ করে ও একেবারে কাল সন্ধ্যায় ফিরবে। আর ফিরেই আমাকে নিয়ে কোথাও একটা যাওয়ার কথা বলেছে।”

জয়া বেগম অবাক হয়ে অরার দিকে তাকালেন। “তোকে নিয়ে যাবে? কোথায়?”

অরা একটু ইতস্তত করে বলল, “সেটা তো ভেঙে বলল না। শুধু বলল তৈরি থাকতে। আমি যখনওকে কফি দিতে গেলাম, তখনই কথাগুলো বলছিল।”


অরার কথা শুনে জয়া বেগম মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন। তাঁর চোখের সামনে ভেসে উঠল আজ দুপুরে তাঁর ঘরে ঘটে যাওয়া সেই দৃশ্যটি। সেই স্মৃতি মনে পড়তেই জয়া বেগমের চোখে জল চিকচিক করে উঠল। তিনি মনে মনে বলতে লাগলেন, “এর মানে আয়ান সিদ্ধান্ত

নিয়ে নিয়েছে! কাল সন্ধ্যায় ও নিশ্চয়ই অরাকে বিয়ের প্রস্তাব দেবে।ছেলেটা আমার অরাকে ভালোবেসে আগে থেকেই আগলে রেখেছে, আর আমি শুধু শুধুই

চিন্তা করছিলাম।''


মুখে অবশ্য তিনি কিছুই প্রকাশ করলেন না। অরা যেন কিছু বুঝতে না পারে, তাই দীর্ঘশ্বাস ফেলার ভান করে বললেন,

“আচ্ছা মা, ও যখন বলেছে তখন নিশ্চয়ই ভালো কোনো জায়গাতেই নিয়ে যাবে। তুই খেয়ে ঘুমাতে যা।অনেক রাত হলো।”

পরদিন সকাল ভোরের আলো ফুটলেও অরার চোখ মেলতে কষ্ট হচ্ছিল।



কালকের সেই ভেজা ভাবটা আজ ধুম জ্বরে রূপ নিয়েছে। মাথাটা প্রচণ্ড ভারি হয়ে আছে, আর সারা শরীরের হাড়ের জোড়ায় জোড়ায় ব্যথা। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় নিজের প্রতিচ্ছবি দেখার শক্তিটুকুও যেন ওর নেই। সকালে নাস্তা করতে নিচে নামার কথা থাকলেও অরা বিছানা ছেড়ে উঠতে পারল না।

জয়া বেগম রান্নাঘর থেকে কয়েকবার ডাক দিয়েও সাড়া না পেয়ে অরার ঘরে ঢুকলেন। অরার লাল হয়ে থাকা মুখ আর জ্বরে তপ্ত শরীর দেখে তিনি আঁতকে উঠলেন।

“এ কি! গা তো পুড়েযাচ্ছে তোর! তোকে না বললাম কাল অতক্ষণ বৃষ্টিতে ভিজিস না?” জয়া বেগম দ্রুতকপালে হাত দিয়ে আঁতকে উঠলেন।

অরা খুব কষ্টে চোখ মেলে বলল, “বড় আম্মু...খুব শীত করছে।”

মফিজ শেখ অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিলেন, খবর শুনে তিনিও ঘরে

এলেন। তিনি চিন্তিত মুখে বললেন, “ডাক্তারকে ফোন দিচ্ছি। আর আয়ানকে কি খবর দেব?”

জয়া বেগম মাথায় জলপট্টি দিতে দিতে বললেন, “না, ও তো ওর জরুরি কাজে গেছে। আজ সন্ধ্যা পর্যন্ত ফিরবে না বলেছে। এখন ফোন দিলে বেচারা দুশ্চিন্তায় সব কাজ ফেলে ছুটে আসবে। আমি বরং ওকে ওষুধ দিয়ে দেখছি, দুপুরে ডাক্তার ডাকা যাবে।”


মফিজ শেখ অরাকে দেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলে অফিসের জন্য বেরিয়ে গেলেন।জয়া বেগমও কিছুক্ষণ সেবা করে নিচে গেলেন অরার জন্যে খাবার আনতে। অরা জ্বরের ঘোরে একা পড়ে রইল। ওর আচ্ছন্ন মস্তিষ্কে বারবার আয়ানের সেই কালকের গম্ভীর মুখটা ভেসে উঠছে। অরা বুঝতে পারছে না, আজ সন্ধ্যায় আয়ান যখন ফিরবে, তখন ও তৈরি হতে পারবে কি না। এই জ্বরের ঘোরেই ও বিড়বিড় করে বলতে লাগল,

“আয়ান ভাই...তুমি কখন আসবে?”


ঠিক বেলা ১০টার দিকে কলিং বেল বেজে উঠল। কাজের মেয়েটা দরজা খুলতেই দেখল রূপা দাঁড়িয়ে আছে। অরার জ্বরের খবর পেয়ে সে আর এক মুহূর্তও ঘরে থাকতে পারেনি। রূপা দ্রুত পায়ে অরার ঘরে ঢুকে দেখল জয়া বেগম করুণ মুখে বসে জলপট্টি দিচ্ছেন। রূপাকে দেখে তিনি যেন একটু স্বস্তি পেলেন।

“আয় রূপা, দেখ তো মেয়েটার কী অবস্থা! গা একদম পুড়ে যাচ্ছে।”

রূপা ওর ব্যাগটা একপাশে রেখে দ্রুত এগিয়ে গিয়ে অরার কপালে হাত রাখল। তপ্ত স্পর্শে সে নিজেও চমকে উঠল।তারপর জয়া বেগম এর উদ্দেশ্য বলল,

“চাচিআম্মা, আপনি একটু বিশ্রাম নিন, আমি দেখছি। আপনি তো সকাল থেকে নাস্তাও করেননি ঠিকমতো।”

জয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “না রে মা, অরাকে এই অবস্থায় রেখে কোথাও যাওয়ার কথা ভাবতেও পারছি না।‘’

রূপা অরার কপালে ভেজা রুমালটা চেপে ধরে নিচু গলায় ডাকল, “অরা? এই অরা... দেখ আমি এসেছি।”

অরা জ্বরের ঘোরে খুব অস্পষ্ট গলায় বিড়বিড় করছিল, “আম্মু... আব্বু... কই তোমরা? আ-আমার খুব ভ-ভয় লাগছে!”

অরার এই আর্তনাদ শুনে জয়া বেগমের হাতটা মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। বুকটা যেন এক অজানা ব্যথায় মুচড়ে উঠল তাঁর। জয়া বেগম চোখের জল সামলে নিয়ে অরার গায়ে হাত বুলিয়ে বলতে লাগলেন, “এই তো মা, আমি আছি তো। ভয় পাস না। তোর বড় আম্মু তোর পাশেই আছে।”


পাশে বসে থাকা রূপাও অরার একটা হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে ধরল। অরার এই অসহায়ত্ব দেখে ওর নিজের চোখেও পানি চলে এল। ও নিচু স্বরে বলল, “অরা, শান্ত হ। আমরা সবাই আছি তোর কাছে।কেউ তোকে ছেড়ে যাবে না।”

কিন্তু অরা তখনো ঘোরের মধ্যে। ওর কাঁপাকাঁপা ঠোঁট দুটো তখনো সেই হারানো মানুষদের ডাকছে। ওর কাছে মনে হচ্ছে ও যেন আবারও সেই আগুনের ধোঁয়ায় ঘেরা অন্ধকার ঘরটায় আটকা পড়ে আছে।



দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতেই জয়া বেগম আর রূপার অক্লান্ত সেবায় অরার শরীর ঘাম দিয়ে জ্বরটা ছাড়তে শুরু করল। ঘাম হওয়ার পর ওর শরীরের তপ্ত ভাবটা অনেকটাই কমে এসেছে,যদিও প্রচণ্ড দুর্বলতা রয়ে গেছে। অরা একটু চোখ মেলে তাকাতেই দেখল রূপা ওর হাত ধরে বসে আছে আর জয়া বেগম মাথায় জলপট্টি দিচ্ছেন। অরাকে চোখ মেলতে দেখে জয়া বেগম স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,

“যাক বাবা! গা এখন অনেকটাই ঠান্ডা।‘’

জ্বরটা ছেড়ে যাওয়ার পর অরা অনেকটা হালকা বোধ করতে শুরু করল।

বিছানা ছেড়ে উঠে বসতেই ওর মনে হলো শরীরে একটা চটচটে ভাব লেগে আছে, যা ওকে বেশ অস্বস্তি দিচ্ছে। অরা রূপার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে বলল,

“রূপা, আমি একটু গোসল করতে চাই। শরীরটা কেমন ভারী হয়ে আছে, একটু পানি পড়লে মনে হয় ফ্রেশ লাগবে।”

জয়া বেগম পাশে বসে ছিলেন, তিনি প্রথমে একটু ঘাবড়ে গিয়ে বললেন,

“সে কী রে মা! এই মাত্র জ্বর ছাড়ল, এখন গোসল করলে যদি আবার ঠান্ডা লেগে যায়?”

কিন্তু রূপা অরার অবস্থা দেখে বুঝতে পারল ও কতটা অস্বস্তিতে আছে। রূপা জয়া বেগমের হাত ধরে বলল,

“চাচিআম্মা, সমস্যা নেই। জ্বর তো ঘাম দিয়ে ছেড়ে গেছে। এখন হালকা কুসুম গরম পানিতে দ্রুত একটা গোসল দিয়ে নিলে ওর ঘুমটাও ভালো হবে আর শরীরটাও ঝরঝরে লাগবে। আমি সাথে আছি তো, আপনি চিন্তা করবেন না।”

জয়া বেগম একটু ইতস্তত করে রাজি হলেন।

“আচ্ছা বাবা, তাহলে তাড়াতাড়ি করিস। আর শ্যাম্পু করার দরকার নেই, শুধু শরীরটা ধুয়ে আয়।”


রূপা অরাকে ধরে ধরে বাথরুমে নিয়ে গেল। কুসুম গরম পানির ঝাপটা গায়ে পড়তেই অরার মনে হলো ওর দীর্ঘক্ষণের ক্লান্তি আর জ্বরের তপ্ত স্মৃতিগুলো ধুয়ে যাচ্ছে। রূপা তোয়ালে এগিয়ে দিতে দিতে দুষ্টুমি করে বলল,

“তোর আয়ান ভাইয়া সন্ধ্যায় ফিরবে, তার আগে তোকে তো একদম চনমনে দেখা চাই। ফ্রেশ না হলে উনি তো এসেই আবার জেরা শুরু করবেন!”

অরা তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে একটু ম্লান হাসল। গোসল শেষে বের হওয়ার পর সত্যিই ওকে অনেক বেশি সতেজ দেখাচ্ছে। গালের সেই জ্বরের লালচে ভাবটা কেটে গিয়ে এখন একটা স্নিগ্ধ আভা ফুটে উঠেছে।

জয়া বেগম ঘরে ঢুকে অরাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন।

“যাক, এখন তোকে দেখে একটু মানুষ মনে হচ্ছে। রূপা, ওকে একটু ভালো করে চুল শুকিয়ে দে তো। তারপর ও একটু জিরিয়ে নিক।”

অরা বিছানায় হেলান দিয়ে বসল।জানালার বাইরে বিকেলের আকাশটা ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে আসছে। রূপা অরার চুলশুকিয়ে দিতে দিতে কানে কানে বলল,

“এখন একটু খেয়ে দেয়ে ঘুমিয়ে নে। সন্ধ্যায় তো আবার তোকে 'বিশেষ' কোথাও যেতে হবে। শরীরটা যেন আবার না ভেঙে পড়ে।”

অরা কোনো কথা না বলে জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল। রোদ পড়ে আসছে, আর সেই সাথে ওর বুকের ভেতর একটা মৃদু উত্তেজনা বাড়তে শুরু করেছে। আজ সন্ধ্যায় আয়ান আসার পর কী হবে, সেটা ভেবেই ওর সবটুকু দুর্বলতা যেন নিমেষে উবে গেল। ও শুধু মনে মনে নিজেকে প্রস্তুত করছে এক নতুন শুরুর জন্য।



বিকেলের আলো ফুরিয়ে যখন চারপাশটা ধূসর হতে শুরু করেছে, অরা তখন আলমারি খুলে নিজের একটা পছন্দের থ্রিপিস বের করছিল। শরীরটা এখনো একটু দুর্বল,কিন্তু সন্ধ্যার সেই বিশেষ যাত্রার কথা ভেবে ও নিজেকে গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। ঠিক তখনই জয়া বেগম ওর ঘরে ঢুকলেন। হাতে একটা সুন্দর ভাঁজ করাশাড়ি। অরাকে থ্রিপিস বের করতে দেখে তিনি মৃদু হেসে বললেন,

“অরা মা, আজ থ্রিপিস না পরে এই শাড়িটা পর তো। আমি তোকে আজ নিজের হাতে সুন্দর করে শাড়ি পরিয়ে দিই।”

অরা একটু অবাক হয়ে বড় আম্মুর দিকে তাকাল।

“হঠাৎ শাড়ি কেনবড় আম্মু? এমনিতে শরীরটা একটু দুর্বল, শাড়ি সামলাতে পারব কি না কে জানে।”

জয়া বেগম ওর কাছে এসে মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, “কেন, তুই তো শাড়ি পরতে কত পছন্দ করিস! আজ অনেকদিন পর কোথাও একটু ঘুরতে যাচ্ছিস, শাড়ি পরলে তোকেকত ভালো লাগবে বল তো। আর আমি তো আছিই, সুন্দর করে পরিয়ে দেব, একটুও কষ্টহবে না তোর।”

অরা এক মুহূর্ত ভাবল। আসলেই তো, অনেকদিন শাড়ি পরা হয় না। আর

বড় আম্মু যখন এত শখ করে বলছেন, তখন আর না করতে পারল না। ও হেসে বলল,

“আচ্ছা ঠিক আছে, তুমি যখন বলছ তখন শাড়িই পরি। কিন্তু বেশি ভারী সাজ দিও না যেন।”

জয়া বেগম মনে মনে খুব খুশি হলেন।কারণ আয়ান, নির্দেশ দিয়েছে অরা

যেন আজ শাড়ি পড়ে আসে আর তিনি নিজেও চান তাঁর মেয়েটাকে আজ সবথেকে সুন্দরদেখাক। তিনি আলমারি থেকে ম্যাচিং ব্লাউজ আর গয়না বের করতে করতে বললেন,

“একদম না, তোকে তো হালকা সাজেই পরীর মতো লাগে। তুই আয় তো দেখি।”


জয়া বেগমপরম মমতায় অরাকে শাড়ি পরাতে শুরু করলেন। শাড়ির আঁচলটা কাঁধে তুলে দিতেই অরার রূপ যেন অন্যরকম হয়ে উঠল। জ্বরের পরের সেই ফ্যাকাশে ভাবটা ঢেকে গিয়ে মুখে একটা স্নিগ্ধ আভা ফুটে উঠেছে। রূপা দরজায় দাঁড়িয়ে দেখছিল, জয়াবেগম যাওয়ার সাথে সাথেই ও হাততালি দিয়ে বলে উঠল,

“উফ অরা! তোকে তো আজ চেনা যাচ্ছে না। আজ কেউ একজন তো নির্ঘাত কুপোকাত হবে!”

অরা লজ্জায় লালহয়ে রূপাকে ধমক দিয়ে বলল, “চুপ কর তো রূপা! সব সময় ইয়ার্কি ভালো লাগেনা।” কিন্তু আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে অরা নিজেই নিজের দিকে তাকিয়ে মুগ্ধহয়ে গেল। সিল্কের শাড়িটা ওর গায়ের সাথে চমৎকারভাবে মিশে আছে।

বাইরে তখন ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শুরু হয়েছে। গেটের কাছে একটা পরিচিত গাড়ির হর্ন শোনাগেল। অরার বুকটা ধক করে উঠল। তার মানে আয়ান ভাই চলে এসেছেন! জয়া বেগম এসেঅরার কপালে একটা কালো টিপ পরিয়ে দিয়ে বললেন,

“মাশাআল্লাহ! কারও নজর নালাগুক আমার মেয়ের ওপর।‘চল মা নিচে চল। আয়ান বোধহয় চলে এসেছে।”


অরা ধীরপায়ে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল। ওর শাড়ির আঁচলটা মেঝের সাথে হালকা ঘষাখাচ্ছে, আর সেই সাথে ওর মনের ভেতর এক অন্যরকম শিহরণ শুরু হয়েছে। আজসন্ধ্যার এই যাত্রাটা হয়তো আসলেই এক অন্য পৃথিবীর দিকে।

সিঁড়ি দিয়ে যখন অরা ধীর পায়ে নিচে নামছে, তখন ড্রয়িং রুমে সবেমাত্র আয়ান এসে ঢুকেছে। পরনে তার নেভি ব্লু কালারের একটা ফর্মাল শার্ট, ঠিক অরার শাড়ির রঙের সাথে মিলে গেছে যেন। আয়ান হয়তো ক্লান্ত ছিল, কিন্তু সিঁড়ির দিকে তাকাতেই তার সব ক্লান্তি যেন এক নিমেষে হাওয়ায় উবে গেল। অরাকে নেভি ব্লু শাড়িতে দেখে আয়ান এক মুহূর্তের জন্য পাথরের মতো স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার তীক্ষ্ণ চোখের মণি দুটো আজ যেন আরও বেশি গভীর দেখাচ্ছে।


অরা সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে থামতেই আয়ান অপলক দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। সেই দৃষ্টিতে আজ কোনো কঠোরতা নেই, আছে এক বুক মুগ্ধতা।

জয়া বেগম পাশ থেকে মৃদু হেসে বললেন, "দেখ তো বাবা, আমাদের অরাকে আজ কেমন লাগছে?‘’

আয়ান এবার চোখ সরাল না। ওর চাউনিটা আজ অন্যদিনের চেয়ে অনেক বেশি গভীর আর নেশালো। সে এক মুহূর্ত থামল, তারপর খুব

নিচু আর শান্ত স্বরে একটা অদ্ভুত শব্দ উচ্চারণ করল—

“স্যালভিয়া।”

জয়াবেগম আর অরা দুজনেই কিছুটা অবাক হয়ে ওর দিকে তাকাল। জয়া বেগম ভ্রু কুঁচকেবললেন,

“সেটা আবার কী?”

আয়ান কোনো উত্তর দিল না। সে ধীর পায়ে অরার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। ওর প্রতিটি পদক্ষেপে এক ধরনের সুপ্ত অধিকারবোধ আর মাদকতাকাজ করছে। অরার একদম সামনে গিয়ে যখন সে থামল, তখন অরার নাকে এল আয়ানের সেই চিরচেনা কড়া পারফিউমের ঘ্রাণ। আয়ান অরার চোখের অতলে নিজের দৃষ্টি ডুবিয়ে দিয়ে ফিসফিস করে বলল,

“রয়্যাল ব্লু স্যালভিয়া ফুলের রঙ দেখেছিস কখনো? ঠিক এই শাড়িটার মতো। অদ্ভুত এক নীল, যা মানুষের চোখ আর মন দুটোকেই আটকে রাখে। তোকে আজ ঠিক সেই ফুলটার মতোই লাগছে অরা... রহস্যময়ী স্যালভিয়া।”


অরা কোনো উত্তর দিতে পারল না, শুধু ওর হাতের আঙুলগুলো নেভিব্লু শাড়ির আঁচলটা শক্ত করে চেপে ধরল। আয়ান অরার দিক থেকে চোখ না সরিয়েই জয়া বেগমের দিকে তাকিয়ে বলল,

“আম্মু, আমরা আসছি। ফিরতে দেরি হতে পারে,চিন্তা করো না।”

কথাটা বলেই আয়ান ঘুরে দরজার দিকে পা বাড়াল। অরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো ওর পেছন পেছন হাঁটতে লাগল। ও জানে না এই স্যালভিয়া ফুলের বিশেষত্ব কী, কিন্তু আয়ান ভাইয়ার চোখে আজ যে নেশা ও দেখেছে, তাতে এটুকু স্পষ্ট যে আজকের রাতটা ওর জীবনের কোনো সাধারণ রাত হতে যাচ্ছে না।


গাড়ির লক খোলার শব্দ হলো। আয়ান নিজে দরজা খুলে দিয়ে অরার দিকে তাকিয়ে একটু রহস্যময় হাসল। সেই হাসিতে আজ যেন কোনো এক না বলা স্বীকৃতির ইঙ্গিত ছিল। আকাশটা আজ মেঘমুক্ত, আর সেই মেঘমুক্ত আকাশের নিচ দিয়ে আয়ানের কালো গাড়িটা অরাকে নিয়ে এক নতুন গন্তব্যের দিকে ছুটতে শুরু করল। গাড়ির কাঁচ তোলা, ভেতরে এসির বেশ ঠান্ডা বাতাস বইছে। কিন্তু অরা হঠাৎ খেয়াল করল ড্রাইভিং সিটে বসা আয়ানের কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে। লোকটা যেন ভেতরে ভেতরে ভীষণ অস্থির। অরা এতক্ষণ জানালার বাইরে রাতের শহরের দিকে তাকিয়ে ছিল, কিন্তু আয়ানের এই অস্বাভাবিকতা দেখে ও আঁতকে উঠে দ্রুত ওর দিকে মুখ ফিরাল।

“আয়ান ভাইয়া! আপনার কি শরীর খারাপ লাগছে? এসির মধ্যেও আপনি এভাবে ঘামছেন কেন?” অরা বেশ চিন্তিত গলায় জিজ্ঞেস করল।

আয়ান একবার আড়চোখে অরার দিকে তাকাল। সেই নেভি ব্লু শাড়িতে অরাকে আজ এতটাই মোহময়ী লাগছে যে আয়ানের দীর্ঘদিনের তৈরি করা সব দেয়াল যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সে গাড়ির স্টিয়ারিংটা আরও শক্ত করে চেপে ধরল, ওর হাতের রগগুলো ফুলে উঠেছে।আয়ান একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলে নেশালো কিন্তু ধরা গলায় বলল,

“আমার শুধু শরীর না অরা, আমার সব খারাপ হয়ে গেছে। তুই আমার সাজানো গোছানো পৃথিবীটা একদম এলোমেলো করে দিয়েছিস।”

অরা স্তব্ধ হয়ে গেল। আয়ান ভাই কী বলতে চাইছেন সেটা ওর সহজ মস্তিষ্কে চট করে ঢুকল না। ও আমতা আমতা করে বলল,

“আমি... আমি আবার কী করলাম?”

আয়ান এবার রাস্তার একপাশে গাড়িটা হঠাৎ ব্রেক কষে থামিয়ে দিল। তারপর অরার দিকে পুরো ঘুরে বসে ওর চোখের ওপর নিজের জ্বলন্ত দৃষ্টি রাখল। আয়ানের কপাল বেয়ে এক ফোঁটা ঘাম চিবুক দিয়ে নিচে নেমে গেল। সে ফিসফিস করে বলল,

“এই যে তুই আজ স্যালভিয়া ফুলের মতো নীল শাড়ি পরে সামনে বসে আছিস, এই যে তোর জ্বরের পরের এই স্নিগ্ধ মায়া—এইসব কিছু আমাকে পাগল করে দিচ্ছে। গত ১বছর ধরে নিজেকে সামলে রেখেছিলাম, কিন্তু আজ আর পারছি না। তুই জানিস না অরা, তুই কতটা অবাধ্যভাবে আমার শিরায় শিরায় মিশে গেছিস।”

অরা পাথরের মতো বসে রইল। আয়ানের গলার সেই নেশালো আর আর্ত সুর ওকে যেন এক অজানা ঘোরের মধ্যে ফেলে দিল। গাড়ির ভেতরে এসির বাতাসের চেয়েও এখন আয়ানের নিঃশ্বাসের তপ্ত আঁচ বেশি অনুভূত হচ্ছে। অরা বুঝতে পারল, আজ আয়ান ভাই কেবল ওর ভাইয়া হয়ে পাশে বসেনি, আজ সে এক অন্য পুরুষ যে তার প্রিয়তমাকে নিজের করে পাওয়ার তৃষ্ণায় জ্বলছে।

অরা কাঁপা কাঁপাগলায় শুধু বলতে পারল,

“আয়ান ভাই... আপনি ওভাবে কথা বলবেন না, আমার ভয় লাগছে।”


আয়ান একটু ঝুঁকে এসে অরার কপালে লেপ্টে থাকা একগুচ্ছ চুল কানের পেছনে সরিয়ে দিল। ওর আঙুলের ছোঁয়ায় অরা শিউরে উঠল। আয়ান আরও কিছুটা কাছে সরে এল। অরার কপালে নিজের কপাল ঠেকিয়ে সে খুব শান্ত স্বরে থামল। দুজনের নিশ্বাসের শব্দ তখন মিলেমিশে এক হয়ে গেছে।আয়ান খুব নিচু স্বরে বলল,

“ভয় নেই রাজরাণী, আমি আছি তো।”

আয়ানের এই গভীর আকুতিটুকু যেন বাতাসের স্তব্ধতায় মিশে গিয়েছিল। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই পাশ দিয়ে যাওয়া একটা গাড়ির তীব্র হর্নের শব্দে পুরো পরিবেশটা কাঁচের মতো ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। আয়ানের সম্বিৎ ফিরল মুহূর্তেই।সে বুঝতে পারল, রাস্তার মাঝখানেই সে গাড়ি থামিয়ে অরাকে নিয়ে এক ঘোরের মধ্যে চলে গিয়েছিল। তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল, নিজেকে দ্রুত সামলে নিয়ে সে সোজা হয়ে বসল।


ইঞ্জিন স্টার্ট দিয়ে সে যখন গিয়ার পরিবর্তন করল, ঠিক তখনই তার চোখ গেল পাশের সিটে বসা অরার দিকে।অরার দিকে তাকাতেই আয়ানের বুকটা ধক করে উঠল। অরার বড় বড় চোখ দুটো তখন টলমল করছে, এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ার অপেক্ষায়। তার মুখটা ভয়ে আর বিস্ময়ে ফ্যাকাসে হয়ে গেছে। নিজের এই অসংযত আচরণের জন্য আয়ান ভেতরে ভেতরে প্রচণ্ড অনুতপ্ত হলো। সে তো অরাকেআগলে রাখতে চেয়েছিল, কিন্তু তার এই হঠকারিতা মেয়েটাকে উল্টো ভয় পাইয়ে দিয়েছে।

নিজেকে সামলে নিয়ে আয়ান একটু দূরত্ব বজায় রেখে বসল। আয়ান এক হাত স্টিয়ারিংয়ে রেখে বাম হাতটা বাড়িয়ে অরার একটা হাত শক্ত করে চেপে ধরল। তার হাতের মুঠোয় অরার ছোট হাতটা একদম মিশে গেল। সামনের দিকে তাকিয়ে থেকেই খুব নিচু, ভারী গলায় সে বলল,

‘’সরি,রাজরাণী।প্লিজ, কান্না করে না। তোর চোখের পানি যে আমার সহ্য হয় না।আর এমন হবে না প্রমিস।‘’


আয়ানের কণ্ঠস্বরটা সামান্য কাঁপল কি? অরা টলমলে চোখে খেয়াল করল, আয়ান তার দিকে তাকাচ্ছে না ঠিকই, কিন্তু তার হাতের মুঠোর চাপ বুঝিয়ে দিচ্ছে সে কতটা অস্থির বোধ করছে।

এরপর আয়ান আর কোনো কথা বাড়াল না, শুধু গাড়ির গতি বাড়িয়ে দিল। আয়ান স্টিয়ারিং হুইলটা শক্ত করে চেপে ধরল। তার মনের ভেতর এক অদ্ভুত অস্থিরতা—অরার চোখের ওই জলটুকু তাকে বিদ্ধ করছে। সে মনে মনে নিজেকে শাসন করল; এভাবে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানো তার একদম উচিত হয়নি। অথচ অরার ওইকরুণ চাহনিটা তার মনের ভেতরের অপরাধবোধকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।

Comments

    Please login to post comment. Login